#আমি_তরুলতা (০৮)
#সোফিয়া_সাফা
ঘরের বাতাস থমকে গেছে। জানালার পর্দা ধীরে ধীরে দুলছে। হাসপাতালের সাদা দেয়ালগুলো আরো বেশি নিঃসঙ্গ, নির্বাক। বিছানায় পাশ ফিরে শুয়ে আছে তরু। তার হাতে স্যালাইনের টিউব ঝুলছে। পাশে চুপচাপ বসে আছেন ডাক্তার ও তাজিম। তাজিম গম্ভীর গলায় বলে,
"ডাক্তার, আপনি যান। আমি কিছুক্ষণ পর আপনার সঙ্গে কথা বলছি।"
ডাক্তার কেবল একবার তরুর দিকে তাকিয়ে তারপর গলাটা নরম করে বলেন,
"ঠিক আছে। তবে প্লিজ, ভবিষ্যতে যেন এরকম কিছু না হয়।"
বলেই তিনি নীরবে চলে যান।
ঘরে তীব্র নীরবতা। তাজিম তরুর দিকে ফিরে তাকায়। চোখে এক অদ্ভুত মায়া, যন্ত্রণার গভীর ছায়া। তারপর রাগ আর বেদনার মিশ্র স্বরে ডাকে—
"তরু...."
তরুর দেহে যেন কোনো প্রাণ নেই। সে শুয়ে আছে নিথর, চোখের পাতা পর্যন্ত স্থির। তাকে দেখে মনে হচ্ছে, সে এখন আর অনুভব করে না কিছুই—সে কেবল একটা 'জড় বস্তু'।
তাজিম শান্ত কন্ঠে জিজ্ঞেস করে ওঠে—
"তরু, কেন করছিস এমন?"
তরু উত্তর দিলোনা,
"চুপ করে থাকিস না প্লিজ। তরু, কেন ভুলতে পারছিস না তাকে? সে তোর জীবনটা এলোমেলো করে দিয়েছে তরু! তবুও কেন তার জন্য নিজেকে বারবার ক্ষতবিক্ষত করছিস, কেন?"
তরুর চোখ হঠাৎ আগুনের মতো জ্বলে ওঠে।
"Because I Fu*king love him. শুনেছো তুমি? আমি তাকে ভালোবাসি। আর তাকে যদি না পাই, আমি সবকিছু ধ্বংস করে ফেলবো। তাকে আমার চাই। আর এমন পরিস্থিতি তৈরি করবো যাতে সে আমাকে ভালোবাসতে বাধ্য হয়।"
তাজিম চোখ বন্ধ করে একটু সময় নেয়, বোনের এই উন্মত্ততা সহ্য করা সহজ নয়।
"তোর যা ইচ্ছা কর, কিন্তু এভাবে নিজেকে কষ্ট দিস না।"
"দেবো না, যদি আমাকে আটকানোর চেষ্টা না করো। আমাকে সাহায্য করো তাহলে।"
এক মুহূর্ত স্তব্ধতা। তারপর হৃদয়ের গহীন থেকে উঠে আসে তাজিমের সম্মতি।
"তুই যা বলবি আমি তাই করবো, কিন্তু আমাকে তুই কথা দে, আর কখনো এমন করবি না।"
তরুর ঠোঁটে এক তাচ্ছিল্যের হাসি। সেই হাসি বেদনার, অবজ্ঞার, এবং নিয়তির প্রতি একরোখা চ্যালেঞ্জ। মাথা নেড়ে সায় দেয় সে।
"এবার বল, আমাকে কী করতে হবে?"
তরুর কণ্ঠে ধীরে ঝরে পড়ে পরিকল্পনার প্রথম ধাপ:
"বেশি কিছু না, জাস্ট আমার পরিচয় লুকিয়ে রাখতে আমাকে সাহায্য করতে হবে। আর আমাকে ওই বাড়িতে থাকার ব্যবস্থা করে দিতে হবে।"
তাজিম চোখ বড় বড় করে তাকায় তরুর দিকে।
"তুমি কিন্তু বলেছো যে আমাকে সাহায্য করবে।"
তাজিম কোনো জবাব না দিয়ে কেবিন ছেড়ে বাইরে চলে আসে। ঠিক তখনই করিডোরে মাইশার সঙ্গে দেখা হয়ে যায়। মাইশার মুখে তাজিমকে দেখে আনন্দের ঢেউ খেলে যায়।
"আরে তাজিম, তুমি এখানে?"
তাজিম ভেতরে ভেতরে বিরক্ত হলেও মুখে জোরপূর্বক হাসি ফুটিয়ে তোলে—
"আরে মাইশা তুমি! আমি তো দুদিন আগেই বাংলাদেশে এসেছি। তুমি এখানে কী করছো?"
"আমি তো গত মাসেই এখানে নিউরোলজিস্ট হিসেবে জয়েন করেছি। তা তুমি কি এখন থেকে দেশেই থাকবে তাজিম?"
কথার মাঝেই মাইশার ফোন বেজে ওঠে। সেই সুযোগে তাজিম একটানা হাঁটতে হাঁটতে হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে আসে।
সকাল দশটা। সূর্যের তেজ ধীরে ধীরে শহরের জানালাগুলোকে আলতো করে গরম করে তুলছে। নীলাভ তার অফিসে এসে পৌঁছেছে কিছুক্ষণ আগেই। গায়ে অফ হোয়াইট শার্ট, ব্ল্যাক জিন্স। চোখে ঘুম নেই, বরং সিদ্ধান্তের দৃঢ়তা আর পরিকল্পনার ছায়া।
সাফেদ শাহরিয়ারের কেইস নিয়ে সে আজ নতুন একটি স্ট্র্যাটেজি বানিয়েছে, এবং সেটিই সে বুঝিয়ে দিচ্ছে সহকর্মীদের—সকালবেলার প্রথম ব্রিফিং রুম যেন গরম কফির গন্ধে মিশে আছে রুদ্ধশ্বাস তদন্তের উত্তাপে।
নীলাভ, মিনার সহ আরও কয়েকজন অফিসার দাঁড়িয়ে। হঠাৎ, গলার স্বর শক্ত করে নীলাভ বলে উঠলো—
"সেদিন বেঁচে যাওয়া লোকটার কি অবস্থা?"
মিনার এগিয়ে এসে কাগজপত্র দেখে দ্রুত জবাব দেয়,
"অবস্থা এখনো আগের মতোই, কথা বলার মতো পরিস্থিতিতে নেই। তবে চিকিৎসা চলছে। আশা করা যায়, কয়েকদিনের মধ্যে কথা বলার মতো কন্ডিশনে চলে আসবে।"
নীলাভ একবার ভ্রু কুঁচকে ভাবলো। তারপর মাথা নেড়ে বলে,
"গুড। শোনো, ওর লোকেশন যেনো কেউ না জানতে পারে, ফুল প্রটেকশনে রাখবে লোকটাকে। আর হ্যাঁ, কথা বলার মতো কন্ডিশনে আসলেই আমাকে কল দেবে। ক্লিয়ার?"
"ইয়েস স্যার।"
"ওকে, সবাই সবার কাজে মনোযোগ দাও।"
কথা শেষ করে নীলাভ ডেস্কে রাখা কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ফাইল দেখতে শুরু করে। আলো-ছায়ায় ফাইলে জমে থাকা ধুলোবালি যেন তদন্তের ক্লান্তি আর সময়ের চিহ্ন। এমন সময় আবার ফিরে আসে মিনার, হাতে আরেকটি ফাইল।
"স্যার, আপনি যেই মেয়েটার বিষয়ে ইনফরমেশন দিয়ে যাচাই করতে বলেছেন, সেই মেয়ের ব্যাপারে সব কিছু খতিয়ে দেখা হয়েছে।"
নীলাভ ফাইলগুলো নামিয়ে রেখে মিনারের দিকে ঘুরে তাকায়, চোখে তীক্ষ্ণ আগ্রহ।
"বাহঃ, এতো তাড়াতাড়ি সব কালেক্ট করতে পারবে ভাবিনি। বলো, তাহলে সব ইনফরমেশন কি সঠিক ছিলো?"
মিনার কিছু কাগজ উল্টে চেক করে আবার ফাইলের ওপর চোখ বুলিয়ে জানায়—
"ইয়েস স্যার, মেয়েটার নাম ত্রানা চৌধুরী, বাবা রাফিজ চৌধুরী, আর মায়ের নাম রাহনুমা নাজনীন। মেয়েটির মা ১২ বছর আগেই মা'রা গিয়েছে। মেয়েটা পড়াশোনার জন্য ১২ বছর লন্ডনে ছিলো। ৩–৪ দিন আগেই বাংলাদেশে ব্যাক করেছে।"
নীলাভ মনোযোগ দিয়ে শুনছিলো। এবার সে একটু সামনে ঝুঁকে প্রশ্ন করে,
"তার ফ্যামিলিতে বর্তমানে কারা কারা আছে আর তাদের পেশা কি? সেই ব্যাপারে কিছু জানতে পেরেছো?"
"তার বাবা একজন বিজন্যাস ম্যান, আর সেই মেয়েটাই তাদের একমাত্র সন্তান। তাছাড়া আর কেউ নেই।"
"ওয়েট, বিজন্যাস ম্যান রাইট?"
"জ্বি স্যার।"
এবার নীলাভ বুঝতে পারলো যে কেনো নামটা তার পরিচিত লেগেছিলো। হয়তো বাবার মুখে, কিংবা ভাইয়ের কোনো আলোচনায় কখনো শুনেছিলো। যেহেতু মেয়েটির বিরুদ্ধে কোনো সন্দেহজনক কিছু পাওয়া যায়নি, নীলাভ এবার আর মনোযোগ সেদিকে না দিয়ে একটা প্রশান্তির নিঃশ্বাস ফেলে ডেস্কে ফিরে যায়।
---
দুই দিন পর, বিকেলবেলা।
রোদ কিছুটা নরম হয়ে এসেছে। শহরের ভিড় কমে এসেছে ক্যাফের কোণার দিকটায়। উইন্ডো সিটে বসে আছে নীলাভ আর আয়ু, মুখোমুখি।
নীলাভের সামনে রাখা তার প্রিয় ব্যানানা মিল্কশেক। ঠোঁটে নিয়ে এক চুমুক দিয়ে সে হালকা হেসে বলে—
"তাহলে তুমি তোমার কথা রাখলে তাইনা?"
আয়ু কোনো উত্তর দেয় না। তার দৃষ্টি জানালার বাইরের দিকে স্থির, কিন্তু মনে যেন অন্য কিছু চলছে।
চিন্তিত চোখে নীলাভ তার দিকে তাকিয়ে আবার প্রশ্ন করে—
"Are you okay আয়ু?"
আয়ু এবার চারপাশটা একবার দেখে নেয়। ক্যাফের ফিকে আলো আর দূরের কোলাহল ভেদ করে সে নিচু স্বরে বলে ওঠে,
"আমি আমার নম্বর চেইঞ্জ করে ফেলেছি নীল, আমার নতুন নম্বর দিয়ে তোমাকে আজকে সকালে কল দিয়েছিলাম দেখো, ওটাই আমার নতুন নম্বর, আগের নম্বরে আমাকে আর পাবেনা।"
নীলাভ কপালে ভাঁজ ফেলে বলে—
"হঠাৎ নতুন নম্বর?"
"হ্যাঁ, আর প্লিজ এবার এটা নিয়ে বিশ্লেষণ করতে বসে যেওনা, এমনি আমাদের হাতে সময় কম, এসব বিষয়ে কথা বলে সময় নষ্ট করার কোনো মানে হয়না।"
কথাটা বলার সঙ্গে সঙ্গেই আচমকা আয়ু উঠে এসে নীলাভের কোলে বসে পড়ে। মুহূর্তের জন্য ক্যাফের আসবাবপত্র, আশেপাশের শব্দ, সব যেন থমকে যায় নীলাভের কাছে। সে বিস্ময়ে চমকে ওঠে। আয়ুর সাহস আর আচরণ—সবকিছুই তাকে কিছু সময়ের জন্য অন্য জগতে নিয়ে যায়। কিছুক্ষণ পর আয়ু আবার নিজের সিটে ফিরে গিয়ে গম্ভীর গলায় বলে—
"নীলাভ, তুমি আমার জন্য সব করতে পারবে তাইনা?"
নীলাভ হেসে বললো—
"বলেই দেখো…"
"তুমি সি আইডির চাকরিটা ছেড়ে দাও প্লিজ।"
মুহূর্তেই নীলাভের মুখ থেকে হাসি উধাও হয়ে গেল।
"হঠাৎ এই কথা কেনো বলছো আয়ু? আর তুমি তো জানোই ছোটোবেলা থেকেই আমার স্বপ্ন ছিলো সি আই ডি অফিসার হওয়ার, আর আমার স্বপ্নটা পূরণ হয়েছে। তুমিই বলো না, পৃথিবীর ক'জন মানুষ নিজেদের স্বপ্ন পূরণ করতে পারে? আর আমি পূরণ করার সুযোগ পেয়েও কেনো ছেড়ে দেবো?"
"কারণ এটা অনেক রিস্কের, আর এইসব কাজে শত্রু বাড়ে।"
আয়ুর এই কথায় নীলাভের মন খারাপ হয়ে যায়। আয়ু ভুল বলেনি। কিন্তু সত্যিই কি স্বপ্ন এতো সহজে ছেড়ে দেওয়া যায়?
"আমি জানি আয়ু, কিন্তু তাও কিছু করার নেই। তুমি ড্যান্সার হতে চাও, এটা যেমন তোমার লক্ষ্য, তেমনি আমার কাজটাও আমার লক্ষ্য আর প্যাশন। তুমি আর ওটা সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়। আমি সবসময় আশা করবো, আমি যেমন তোমার লক্ষ্য পূরণে তোমার পাশে আছি, তেমনি তুমিও আমার পাশে থাকবে।"
নীলাভের কণ্ঠে একরাশ আবেগ আর আন্তরিকতা। প্রতিউত্তরে আয়ু আর কিছুই বলে উঠতে পারেনা।
২ দিন পর,
সকালের স্নিগ্ধ আলোয় আয়ু ডাইনিং টেবিলের এক কোণে বসে চুপচাপ নাশতা করছিল। জানালার ফাঁক গলে মৃদু রোদ তার কাঁধ ছুঁয়ে যাচ্ছিল, হঠাৎ করেই তার ফোনটা কম্পন তুলে উঠলো। আয়ু চমকে ওঠে—চোখ যায় স্ক্রিনে।
একই নম্বর। সেই ভয়ানক নম্বর—যেটা থেকে ঠিক এক সপ্তাহ আগে ব্ল্যাকমেইল করা হয়েছিল তাকে। বুকের ভেতর ধুকপুক ধুকপুক করছে। নখ ঠেকিয়ে রাখে স্ক্রিনে, কিন্তু কল রিসিভ করে না। কলের বিরতিহীন কম্পনে হাত-পা যেন জমে আসে তার। হঠাৎই স্ক্রিনে একটা মেসেজ ভেসে ওঠে। সেই অদৃশ্য ভয়, অজানা আতঙ্ক যেন এক লাফে গলা পর্যন্ত উঠে আসে। শরীর জুড়ে ঠান্ডা ঘাম, কপালে বিন্দু বিন্দু জল। চোখ স্থির করে আয়ু মেসেজটা পড়ে—
“কিরে নম্বর চেইঞ্জ করে ফোন না ধরে কি ভেবেছিস আমার হাত থেকে বেঁচে যাবি? তোর নিজের জানের মায়া নেই তাইনা রে। কত বড় সাহস তোর, বারবার বলার পরেও এনজেকে জড়িয়ে ধরেছিলি আবার কোলেও বসেছিলি কেনো? কেনো এখনো ওর সাথে যোগাযোগ রেখেছিস?...”
মেসেজটা পড়া শেষ হতে না হতেই আবারও ফোনটা কাঁপে। এবার আর আয়ু রিসিভ না করে থাকতে পারে না। কাপা কাপা হাতে রিসিভ করে:
"হ্যালো?"
ওপাশ থেকে এক গম্ভীর, কর্কশ, পুরুষালি কণ্ঠ ভেসে আসে, যেন কোনো অন্ধকার গলির অতল থেকে উঠে আসা এক অশুভ ছায়া—
“শোন তোকে এই চান্সটা দেওয়া হয়েছে এই শর্তে যে তুই এনজের থেকে দূরে থাকবি। নেক্সট টাইম যেনো মিস্টেক না হয়, আর হ্যাঁ শুনে রাখ এরপর ওর আশেপাশে তোকে দেখলে তোকে জানে মে*রে ফেলবো। তাই যদি বাঁচতে চাস, আজই নিজের সিম পাল্টে বাসা চেইঞ্জ করে চলে যাবি। আর তোর জন্য আরেকটা ভালো খবর হচ্ছে তোর ফ্লাইটের তারিখ এগিয়ে এনে সামনের সপ্তাহে রাখা হয়েছে। এবার যেনো কথার নড়চড় না হয়। তোর কপাল ভালো যে সে তোকে খতম করে দেয়নি এখনো। জানি না কেনো তোকে বাঁচিয়ে রেখেছে, যাই হোক কথার হেরফের হলে কি হবে তা আমি নিজেও জানি না।...”
সব শুনে আয়ুর জবান বন্ধ হয়ে যায়। শূন্য দৃষ্টিতে সামনের দিকে তাকিয়ে থাকে কিছুক্ষণ। তারপর হঠাৎ করে তার সামনে থাকা গ্লাসটা তুলে আছড়ে ফেলে দেয় মেঝেতে। কাঁচের চূর্ণবিচূর্ণ শব্দে ছুটে আসে তার মা, সানা।
"কিরে, কি হয়েছে?"
আয়ু তার মাকে বলে—
"মা, আবারও সেই লোকটা কল করেছিলো। আমি তো নম্বর চেইঞ্জ করে ফেলেছিলাম, তারপরও সে কিভাবে নম্বর পেলো আমার? তার ওপর আমি কখন কোথায় যাচ্ছি সব খবর কিভাবে পাচ্ছে সে?"
সানা চিন্তিত স্বরে বলে—
"আমার মনে হয় এটা নীলাভের কোনো শত্রু হবে। প্রায় ৫-৬ বছর ধরে বহুবার আমাকে কল করে ব্ল্যাকমেইল করছে। যাতে আমি কিছুতেই তোর আর নীলাভের বিয়েটা হতে না দেই।"
"কি বলছো মা? তুমি আমাকে এসব আগে বলোনি কেনো? আমি তাহলে নীলাভকে বলে এর পেছনের কালপ্রিটকে যে করেই হোক খুঁজে বের করতাম।"
"এই জন্যই বলিনি, আমাকে বারবার বলা হতো বিয়ের ডেট পিছিয়ে দিতে। আর এও বলেছিলো আমি যদি কাউকে এই ব্যাপারে কিছু জানাই তাহলে আমাকে আর তোকে তারা মে*রে ফেলবে।"
"আর এখন তো আমাকেই সরাসরি কল করে নীলাভের থেকে দূরে থাকতে বলছে। বলেছে তাদের কথা শুনলে বিখ্যাত ড্যান্সার হয়ে ভালোভাবে বাঁচতে পারবো। আর না শুনলে সবচেয়ে করুন মৃ'ত্যু নাকি আমার হবে।"
আয়ুর মা কিছুক্ষণ ভেবে বলে—
"যা বুঝলাম তুই নীলাভের থেকে দূরে থাকলে তোর কোনো ক্ষতি তারা করবে না। তুই বরং তাদের ডিলে রাজি হয়ে যা, এটা তোর জন্য অনেক বড় সুযোগ আয়ু। ওই সি আই ডি নীলাভের সাথে থাকলে তুই কখনোই ভালোভাবে বাঁচতে পারবি না। তোর জীবন সবসময় রিস্কের মধ্যে থাকবে। তার চেয়ে তুই লন্ডনে চলে যা, তাতে তুই সেইফ থাকবি।"
আয়ু অবাক চোখে তার মায়ের দিকে তাকায়। কারণ তার মা যে এসব বলছে, তার বিশ্বাসই হচ্ছেনা।
"মা তুমি এসব বলছো? আরে ছোটো থেকে তুমিই তো বলতে নীলাভের সাথে রিলেশন রাখতে, তাহলে এখন কি হলো?"
"এই জন্যই বলিনি, আমাকে বারবার বলা হতো বিয়ের ডেট পিছিয়ে দিতে। আর এও বলেছিলো আমি যদি কাউকে এই ব্যাপারে কিছু জানাই তাহলে আমাকে আর তোকে তারা মেরে ফেলবে।"
"আর এখন তো আমাকেই সরাসরি কল করে নীলাভের থেকে দূরে থাকতে বলছে। বলেছে তাদের কথা শুনলে বিখ্যাত ড্যান্সার হয়ে ভালোভাবে বাঁচতে পারবো। আর না শুনলে সবচেয়ে করুন মৃ'ত্যু নাকি আমার হবে।"
আয়ুর মা কিছুক্ষণ ভেবে বলে—
"যা বুঝলাম তুই নীলাভের থেকে দূরে থাকলে তোর কোনো ক্ষতি তারা করবে না। তুই বরং তাদের ডিলে রাজি হয়ে যা, এটা তোর জন্য অনেক বড় সুযোগ আয়ু। ওই সি আই ডি নীলাভের সাথে থাকলে তুই কখনোই ভালোভাবে বাঁচতে পারবি না। তোর জীবন সবসময় রিস্কের মধ্যে থাকবে। তার চেয়ে তুই লন্ডনে চলে যা, তাতে তুই সেইফ থাকবি।"
আয়ু অবাক চোখে তার মায়ের দিকে তাকায়। কারণ তার মা যে এসব বলছে, তার বিশ্বাসই হচ্ছেনা।
"মা তুমি এসব বলছো? আরে ছোটো থেকে তুমিই তো বলতে নীলাভের সাথে রিলেশন রাখতে, তাহলে এখন কি হলো?"
আয়ুর কথার উত্তরে তার মা বলে—
"দেখ আয়ু, তখন নীলাভদের কোনো শত্রু ছিল না, তারা বড়লোক ছিল। তাই তখন বলতাম। কিন্তু এখন বলছিনা আর। ধর যদি তোদের বিয়েটা হয়েও যায়, তাহলেও তোর জীবনের ঝুঁকি থেকেই যাবে আয়ু। এই সব কিছু শুরু হয়েছে নীলাভ সি আই ডি তে জয়েন করার পরপরই। আরে তুইই বল, নীলাভ এর সি আই ডি তে জয়েন করার কি দরকার ছিল? ওরা তো অনেক বড়লোক, তাই না? বোকা ছেলে। ভেবেছিলাম লেখাপড়া শেষ করে পারিবারিক বিজনেসে জয়েন করলেই ওর সাথে বিয়ে দেবো। কিন্তু ছেলেটা পুলিশে জয়েন করে আমার সব প্ল্যান শেষ করে দিলো।"
মায়ের কথাগুলো শুনে আয়ু কিছুক্ষণ চুপ থাকে। তারপর ধীরে ধীরে উঠে গিয়ে কাপড় গুছাতে শুরু করে। যেন মনে মনে একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে সে।
---
আজ শুক্রবার। সাপ্তাহিক ছুটির এই অলস দিনে নীলাভ বাড়িতেই রয়েছে। দুপুরে খাওয়াদাওয়ার পর নিঃশব্দে নিজের ঘরে ফিরে আসে সে। ক্লান্ত শরীরটা নিয়ে বিছানায় গা এলিয়ে দেয়, ঘুম নয়, বরং একটা অবসন্ন নিস্তব্ধতায় ডুবে থাকার মতো অবস্থা। হঠাৎ করেই যেন প্রকৃতির স্বর বদলে যেতে শুরু করে। একটানা ছুটে আসা মেঘে ঢেকে যায় আকাশ। মৃদু বাতাসে জানালার পর্দা দুলে ওঠে। মুহূর্তেই শুরু হয় ঝিরিঝিরি বৃষ্টি। বাইরের আলো ম্লান হয়ে এসে ঘরজুড়ে ছায়া ফেলে। চারপাশটা ধীরে ধীরে যেন বিষণ্ন হয়ে ওঠে,
এই আকস্মিক পরিবর্তনে নীলাভ চমকে ওঠে। খাটের সাথে লাগোয়া জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করে—কেনো প্রকৃতির রূপ হঠাৎ করেই বদলে গেছে! তবে সঙ্গে সঙ্গেই নিজেকে বোঝায়—গ্রীষ্মের শুরুর দিকে এমন বৃষ্টির ছোঁয়া অস্বাভাবিক নয়। নীলাভ চোখ ফিরিয়ে দেয়ালের দিকে তাকায়, যেখানে টাঙানো আছে আয়ু আর তার ছবি। সেই ছবির দিকেই স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে সে। যেন কিছু একটা অস্বাভাবিক মনে হচ্ছে তার। অল্পক্ষণ পরেই বিছানা ছেড়ে ধীরে ধীরে উঠে গিয়ে ছবিটার সামনে দাঁড়ায়। চোখের দৃষ্টি এবার আরও নিবিড়, আরও অনুসন্ধানী। কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে শেষমেশ সে বুঝতে পারে—ফ্রেমটা বদলে গেছে।
ভ্রু কুঁচকে যায় তার। খুব সামান্য একটা পার্থক্য, কিন্তু নীলাভের তীক্ষ্ণ চোখ তা এড়ায়নি। সে ঠিক বুঝে উঠতে পারে না কখন, কে, আর কেনো এই ছোট্ট পরিবর্তনটা করল? দিনের বেশিরভাগ সময়টাই বাইরে কাটায় সে, এই পরিবর্তনের কোনো ক্লু নেই তার কাছে। তার ভাবনার মাঝে হঠাৎ করেই বাইরের আকাশ চিড়ে জোরে বিদ্যুৎ চমকে ওঠে। চোখের সামনে যেন ক্ষণিকের জন্য দিন-রাত এক হয়ে যায়। এর পরপরই বৃষ্টির তীব্রতা বেড়ে যাত, নীলাভ আয়ুর ছবির দিক থেকে চোখ সরিয়ে এবার ব্যালকনির দিকে এগিয়ে যায়। তার ঘরের সাথে একটা খোলামেলা, প্রশস্ত ব্যালকনি আছে। যেটা তার খুব প্রিয় একটা জায়গা। যদিও ব্যস্ত রুটিনের কারণে সেখানে সময় কাটানোর সুযোগ খুব একটা হয় না। সে ব্যালকনিতে রাখা একটা কাঠের চেয়ারে গা এলিয়ে বসে পড়ে। বাইরে তাকিয়ে দেখে, আকাশ জুড়ে ধূসর কুয়াশা নামছে ধীরে ধীরে। গাছের পাতাগুলো বৃষ্টিতে ভিজে চকচক করছে। চারদিকে কেবল বৃষ্টির একটানা শব্দ,
এই পরিবেশেই হঠাৎ আয়ুর কথা মনে পড়ে যায় তার।
সঙ্গে সঙ্গেই অনুভব করে, গত ৩–৪ দিন ধরে তাদের ঠিকঠাক কথা হচ্ছেনা। যখন আয়ু ফ্রি থাকে, তখন সে ব্যস্ত থাকে তার কাজ নিয়ে। আর যখন সে একটু সময় বের করে, তখন আয়ু আবার ব্যস্ত থাকে ড্যান্স নিয়ে। এটা নতুন কিছু নয় তাদের জীবনে। কিন্তু এবার যেন আয়ুকে একটু বেশিই ব্যস্ত মনে হচ্ছে। সে বেশি না ভেবেই মোবাইলটা হাতে নিয়ে আয়ুর নম্বরে কল করে। কিন্তু ওপাশ থেকে এক নারীকণ্ঠ ভেসে আসে—
"আপনি যেই নম্বরে কল করেছেন সেই নম্বরে এক মুহূর্তে সংযোগ প্রদান করা সম্ভব হচ্ছেনা, কিছুক্ষণ পর আবার চেষ্টা করুন। Sorry the number you’ve dialled are currently unreachable, please try again later."
নীলাভ বিরতিহীন কয়েকবার কল করে। প্রতিবার একই জবাব। অবশেষে বিরক্ত হয়ে রুমে ফিরে আসে। শরীরটা যেন আরও ভারী হয়ে উঠেছে। বিছানায় শুয়ে পড়ে সে। অন্ধকার ঘর, ঠান্ডা হাওয়া, বৃষ্টির শব্দ আর নিজের ভেতরের এক অজানা অস্বস্তি নিয়ে সে নিজেকে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করে—
"হয়তো খারাপ আবহাওয়ার কারণে নেটওয়ার্ক পাচ্ছেনা।"
শরীরের ওপর হিমেল আবহাওয়ার প্রভাব ধীরে ধীরে ক্লান্তি বাড়িয়ে দেয়। চোখে নামে ঘুমের পর্দা। কিন্তু সে জানতো না—এই বৃষ্টি, এই নিস্তব্ধতা আসলে এক নতুন ঝড়ের পূর্বাভাস। জীবনের এমন এক অধ্যায় শুরু হতে চলেছে, যা শুধুমাত্র প্রেম, পেশা কিংবা পরিকল্পনার নয়—একটি জীবন-মরণ সত্যের দ্বন্দ্ব।
চলবে,,,