#আমি_তরুলতা (৩৯)
#সোফিয়া_সাফা
(The Jealousy)
পরেরদিন,
,
আজকে তাজিম আর মাইশার গায়ে হলুদের অনুষ্ঠান। গায়ে হলুদের অনুষ্ঠান যার যার বাড়িতেই আলাদা ভাবে করা হবে। গায়ে হলুদের অনুষ্ঠানও বেশ ভালো ভাবেই শেষ হয়ে যায়। এভাবেই বিয়ের দিন চলে আসে। তরু আর নীলাভ রেডি হয়ে নিচে ড্রইংরুমে এসে বসলো। তরুর পরণে একটা পার্পেল রঙের ভারী জর্জেট শাড়ি আর নীলাভের পরণে ডার্ক চকলেট রঙের স্যুট। তাদের দুজনকে ভীষণ সুন্দর লাগছে। জারা আর নাহিদও ম্যাচিং করে ম্যাজেন্টা রঙের শাড়ি আর স্যুট পড়েছে। এদিকে নীলাভ তো তরুর থেকে চোখই সরাতে পারছেনা।
“ওকে মা'রার আগে মনে হয় ওই আমাকে মে'রে ফেলবে।” (মনে মনে)
তরুর চোখে চোখ পড়তেই তরু চোখ টিপ দেয়। নীলাভ হেসে ফেলে, তাজিমকে বর সাজে ভীষণ সুদর্শন লাগছে। তার পরণে গোল্ডেন কালারের শেরওয়ানি। তাদের জন্য একটা বড় কার রেডি করা হয়েছে, সেই কারে তাজিম, তরু, নীলাভ, জারা, নাহিদ, আর সাফোয়ান যাবে। বাকিরা সবাই অন্য গাড়িতে যাবে। জহুরা যাবেননা সে বাড়িতেই থাকবে মাইশাকে বরণ করে ঘরে তোলার জন্য।
দুপুর ১২ টার দিকেই সবাই সাভার টাউনের উদ্দেশ্যে রওনা দিলো। তাদের পৌছাতে পৌঁছাতে ২ টা বেজে যায়। মাইশার বাবা, ভাই গেইট থেকে তাদের রিসিভ করে স্টেজে নিয়ে গিয়ে বসায়। সেখানে গিয়েই তরু আর নীলাভ জানতে পারে মাইশার ভাই হচ্ছে মাহির। যে কিনা তাদের সাথেই জব করে। মাহির তো তাদেরকে দেখে অনেক খুশি হয়ে যায়। মাহির তার বোনের বিয়ের উপলক্ষে ছুটি নিয়েছিলো কিন্তু মাইশাই যে তার ছোট বোন সেটা নীলাভ বা তরু জানতো না। নীলাভ তাদের বাড়িতে ১ বার এসেছিলো কিন্তু সেদিন মাইশা কে সে দেখেনি।
মাহির তরু আর নীলাভের দিকে এগিয়ে গিয়ে বলে,
“স্যার আমি তো আপনাদেরকে দেখে অবাকই হয়ে গিয়েছিলাম। আমার এটা জেনে অনেক ভালো লাগছে যে তাজিম ভাইয়ের সাথে আপনাদের রিলেশন আছে।”
মাহিরের কথা শুনে নীলাভ কিছু বলার আগেই তরু বলে ওঠে,
“হ্যাঁ স্যার আপনাকে দেখেও আমাদের অনেক ভালো লাগছে। আসলে তাজিম ভাই আমার একমাত্র জা'য়ের বড় ভাই হয়।”
তরুর কথা শুনে খান ফ্যামিলির সবাই একে অপরের দিকে চাওয়া চাওয়ি করলো। মাহির তরুর কথা শুনে হাসলো। আসলে সে প্রথম দিন থেকেই ত্রানাকে পছন্দ করতো, কিন্তু সে সেটা বলার আগেই নীলাভের সাথে ত্রানার বিয়ে হয়ে গেছে। তারপর থেকে আর ত্রানার সাথে সে আগ বাড়িয়ে কথা বলেনি। আর ত্রানা তো কখনোই প্রয়োজন ছাড়া কারো সাথেই কথা বলেনা। তবে আজকে ত্রানা নিজে থেকেই তার সাথে কথা বলেছে যা দেখে সে খুশি হয়ে গেছে।
তাদের কথার মাঝেই কয়েকজন মেয়ে সেখানে এসে সবার সাথে কথা বলতে শুরু করে।
মাহির সবার উদ্দেশ্যে বলে, “বেয়াই সাহেব আর সাহেবারা এরা হচ্ছে আমার কাজিন।”
৩জন মেয়ে এগিয়ে এসে বললো
*আসসালামু আলাইকুম বেয়াই সাব।
জারার ২ জন খালাতো ভাই এগিয়ে এসে বললো।
“ওয়ালাইকুম আসসালাম বেয়াইন সাহেবা।”
মাহির হাসিমুখে সবার সাথে পরিচয় করিয়ে দিলো,
“ও আমার ফুপুর মেয়ে ওর নাম অহনা। আর ও হলো আমার মামাতো বোন মিথিলা। আর ও হলো আমার খালাতো বোন ইশরাত।”
তাদের সাথে ২ জন ছেলেও আছে যারা হচ্ছে অহনা আর ইশরাতের ভাই। ইশরাত নামের মেয়েটা একটু বেশিই চঞ্চল টাইপের সবার সাথে আগ বাড়িয়ে এসে কথা বলছে। নীলাভসহ বাকি সবাই চুপচাপ বসে আছে শুধু জারার খালাতো ভাইবোন ৪ জনই কথা বলছে, একপর্যায়ে এসে মনে হতে লাগলো ইশরাত নীলাভের দিকে একটু বেশিই মনোযোগী।
কিছুক্ষণ পর মাহিরের কাজিনরা সবার জন্য শরবত নিয়ে এলো। এক এক করে সবার হাতে দিলো। ইশরাত নীলাভের হাতে শরবত দিলে নীলাভ সেটা নেওয়ার জন্য হাত বাড়ালো কিন্তু ইশরাত সেটা দিলোনা, যার জন্য নীলাভ ইশরাতের দিকে তাকালো। আর তাকানোর সাথে সাথেই ইশরাত নীলাভের দিকে তাকিয়ে একগাল হেসে চোখ টিপ মারলো। নীলাভ তো একদম হকচকিয়ে গেলো।
তখনই কিছু ভাঙ্গার শব্দে ইশরাত আর নীলাভ দুজনেই পাশে তাকালো। পাশে তাকাতেই নীলাভ অবাক হয়ে গেলো, তরু হাতে থাকা শরবতের গ্লাসটা ভেঙ্গে ফেলেছে। আর গ্লাস টাই গুড়ো হয়ে ঝনঝন শব্দ তুলে ফ্লোরে ছড়িয়ে পড়েছে।
“আরে কিভাবে হলো এটা? তোর কোথাও লাগেনি তো?”
বলেই নীলাভ উঠে দাঁড়িয়ে তরুকে সরিয়ে অন্য সাইডে দাড় করালো। তরু তো স্থিরচোখে নীলাভের দিকেই তাকিয়ে আছে। ইশরাত তরুর দিকে তাকাতেই তরু রক্তচোখে তার দিকে তাকালো। তরুর ভয়ানক চোখজোড়া দেখে ইশরাতের অন্তরআত্মা কেপে উঠলো। মাহির একজন কাজের লোককে দিয়ে কাচ গুলো পরিষ্কার করিয়ে ফেললো। তরুর ডান হাতের কিছুটা অংশ কেটে গিয়েছে, নীলাভ অসহায় দৃষ্টিতে তরুর দিকে তাকালো। কেউ না বুঝলেও নীলাভ বুঝলো যে তরু কেনো এরকম টা করেছে।
“এরকম টা করার কি খুব দরকার ছিলো?”
তরু শান্তচোখে নীলাভের দিকে তাকালো,
“আর একবার ওই মেয়েটা এরকম কিছু করলে আমি ওর চোখ তুলে ফেলবো।”
তরুর শান্ত শীতল কন্ঠ শুনে নীলাভ তাজ্জব বনে গেলো, এতোটুকু কারণে তরু ওর চোখ তুলে ফেলবে?
“মেয়েটা হয়তো ভালো করে বুঝতে পারেনি যে আমি ম্যারিড। সেই জন্যই এমন করেছে কিন্তু তুই তো জানিস তাইনা যে আমি কোনো মেয়ের দিকেই ফিরে তাকাবোনা।”
“তুমিও তাকাবেনা আর কেউ তোমার দিকেও তাকানোর সাহস করবেনা৷ ওকে ফাস্ট আর লাস্ট ওয়ার্নিং টা দিয়ে আসছি ওয়েট।”
তরু সেদিকে যেতে নিলে নীলাভ তরুর হাতের কব্জি টেনে ধরে তাকে আটকে বলে।
“হাতটা কেটে গেছে আগে ব্যান্ডেজ করে দেই তারপর যাস।”
,
নীলাভ তরুর হাত ব্যান্ডেজ করে দিচ্ছে, তরু একদৃষ্টিতে নীলাভের দিকে তাকিয়ে আছে আর ভাবছে,
“কি করলে তোমার দিকে কেউ এভাবে তাকাবেনা প্রেম? আমি যে সহ্য করতে পারিনা। যদি পারতাম তাহলে তোমাকে এমন একজায়গায় লুকিয়ে রাখতাম যেখানে কারো নজর লাগবেনা। কিন্তু তুমি যে বন্দি করে রাখার মতো জিনিস নও।”
নীলাভ তরুর হাত ছেড়ে দিয়ে বলে,
“তোর যেতে হবেনা, আমি ওর ভাইকে বলে দিচ্ছি যে আমার দিকে যেনো তার বোন আর না তাকায় ওকে?”
তরু একটা বাকা হাসি দিয়ে বললো।
“ইউ নো নীলাভ? my favourite colour is red, সো আই লাইক ব্লাড। বিপজ্জনক কাজ আর ট্রাবল ক্রিয়েট করতেও ভালোবাসি। এসব ওই মেয়েকে ভালো করে বুঝিয়ে দিও। নইলে তোমাকে ২য় বার দেখার জন্য চোখদুটোই থাকবেনা। আর তুমিও যদি না চাও যে তোমার জন্য অন্য কারো লাইফ চলে যাক তাহলে নিজের উপরে কারো নজর লাগতে দিওনা।”
কথাটা শুনে নীলাভ মনে করলো তরু জেলাসির বশে এসব বলছে, কিন্তু সেতো জানেনা যে তরু যা বলেছে সে সেটাই করবে। নীলাভ মুচকি হেসে বলল,
“তাই নাকি? তাহলে আয়ুকে কিভাবে সহ্য করেছিস এতোবছর?”
নীলাভের কথাটা শুনে তরু চোখ সরিয়ে নিলো,
“ওর কাছে আমি কৃতজ্ঞ, সেই জন্যই কিছু বলিনি।”
কথাটা শুনে নীলাভ ভ্রু কুচকে তাকালো।
“কিসের জন্য?”
তরু একটা শ্বাস ফেলে বললো।
“মনে নেই তুমি তো সাতার জানতেনা। একবার তুমি পুকুরে পড়ে গিয়েছিলে, আর আয়ুই তো সবাইকে ডেকে এনেছিলো। সেদিন ও কাউকে না ডাকলে আমি তোমাকে কোথায় পেতাম?”
নীলাভ শান্ত চোখে তরুর দিকে তাকালো। মেয়েটা কি সত্যিই তার জন্য এতো পাগল? সে বুঝতে পারছেনা যে কেনো তরু তার জন্য এতো পাগল, সে তো তাকে সবসময় কষ্ট দেয় তবুও মেয়েটা সে বলতে অজ্ঞান। সে বুঝতে পারছেনা তরুর এতো ভালোবাসা পেয়ে সে কি খুশি হবে নাকি দুঃখী হবে?
“এতোটা ভালো বাসিস আমাকে?”
“হুম তোমাকে ততোটা ভালোবাসি যতোটা নিজেকেও কখনো বাসিনি।”
জারা তরুর কাছে এসে বসলে নীলাভ উঠে অন্যদিকে চলে যায়। তারপর ইশরাতের ভাইয়ের কাছে গিয়ে বলে।
“উনি কি আপনার বোন?”
নীলাভের ইশারাকৃত দিকে তাকিয়ে ইশরাতের ভাই বলল,
“হুম আমি ইশরাতর ভাই ইয়াশ, ও কি কিছু করেছে?”
নীলাভ কিভাবে বলবে বুঝতে পারছেনা সে গলা পরিষ্কার করে বলে।
“আসলে আমি বিবাহিত, কয়েকদিন পরে দুটো বাচ্চার বাবা ও হয়ে যাবো। কিন্তু আপনার বোন হয়তো আমাকে পছন্দ করে ফেলেছে।”
কথাটা শুনে ইয়াশ ইশরাতের দিকে তাকায়। দেখে ইশরাত এখনো নীলাভের দিকেই তাকিয়ে আছে। যা দেখে ইয়াশ একটু নরম কন্ঠে বলে,
“আই এম স্যরি ভাই। আপনি প্লিজ এসব মাহির ভাইয়াকে বলবেন না।”
“না মিস্টার শেখ যখন আপনাদের পরিচয় করিয়ে দিলো তখনই আমি জানতে পেরেছি যে আপনি ওনার ভাই হন। সেই জন্যই ভাবলাম আপনাকে বলাটাই ঠিক হবে।”
“আমি আমার বোনকে বুঝিয়ে বলবো ভাইয়া।”
“হ্যাঁ প্লিজ, আমার বউ আমার ব্যাপারে অনেক বেশিই পসেসিভ, আরেকবার যদি ও আপনার বোনকে আমার দিকে এভাবে তাকাতে দেখে আমি নিজেও জানিনা ও কি করবে। আপনি ওনাকে এখনি গিয়ে বুঝিয়ে বলুন, উনি যেনো আমার দিকে ভুল করেও না তাকায়। এমনও হতে পারে এই ছোট্ট কারণে বিয়েটাই ভেঙ্গে যাবে।”
কথাটা শুনে ইয়াশ শকড খেলো। সে দ্রুত পায়ে ইশরাতের দিকে এগিয়ে গিয়ে তাকে প্রথমে বুঝিয়ে বলতে লাগলো,
“মাহির ভাই তো আমাদের পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলো তখন তুই শুনিসনি যে উনি ম্যারিড?”
“হুম তাতে কি আমার ওনাকে পছন্দ হয়েছে।”
“উনি ওয়ার্নিং দিয়ে গেছে। ওনার ওয়াইফ অনেক পসেসিভ আরেকবার ওনার দিকে তোকে তাকাতে দেখলে অনেক খারাপ কিছু হতে পারে।”
ইশরাত মুখটা ছোটো করে বলল, “হুম ওনার ওয়াইফ যেভাবে আমার দিকে তাকিয়েছিলো, আর একটু হলে আমার হার্ট অ্যাটাকই হয়ে যেতো।”
“তারপরেও কোন সাহসে তাকিয়ে আছিস?”
“উনি একটু বেশিই হ্যানসাম আমার কি দোষ? একটু তো তাকিয়েইছি এরকম করার কি আছে?”
“দেখ এরকম কিছু করবিনা যাতে আমাকে তোকে টেনে হিচড়ে এখান থেকে নিয়ে চলে যেতে হয়। আর আমাদের মান সম্মানের কথাও মাথায় রাখ। আজকে তোর জন্য কোনো ঝামেলা হলে মাহির ভাই কিন্তু আমাদের ছেড়ে দেবেনা।”
ইয়াশ আরও কিছু কড়া কথা বলে তাকে শাসালো। ইশরাত তাতে ভয় পেয়ে কথা দিলো যে নীলাভের দিকে আর তাকাবেনা।
বিয়ে হয়ে গেলো, এখন সবাই খেতে বসেছে। তরুর হাত কেটে গিয়েছে তাই নীলাভ তাকে খাইয়ে দিচ্ছে।
রাত ৮ টা
রাতের খাবার খেয়ে মাইশাকে নিয়ে সবাই রওনা হলো এহসান মঞ্জিলের দিকে, মাইশার সাথে ইশরাতের আসার কথা থাকলেও সে আসেনি। ইয়াশ তাকে আসতে দেয়নি, অহনা আর মিথিলা এসেছে। সারাদিন ভারী পোশাকে থেকে জারা আর তরুর অবস্থা খারাপ,
নীলাভ বলল, “এই জন্যই বলেছিলাম শাড়ি পড়তে হবেনা।”
তরু মাথায় হাত দিয়ে বলল, “হুম, সেই সুযোগে অন্য মেয়েদের দিকে তাকাতে পারতে তাইনা?”
নীলাভ তরুর কথা শুনে হাসলো। মেয়েটা আগের থেকেও বেশি পসেসিভ হয়ে গেছে। সেই তখন থেকেই তরু তার সাথে ভালো করে কথা বলছে না। ওই বাড়িতে থাকাকালীন পুরোটা সময় তরুর কাছেই বসে থাকতে হয়েছে। একমুহূর্তের জন্যও তরু তাকে দৃষ্টি সীমানার বাইরে যেতে দেয়নি।
,
অন্যদিকে তাজিম কার ড্রাইভ করছে এই গাড়িতে মাইশা, তাজিম, অহনা আর মিথিলা এসেছে। মাইশা তো পুরোটা রাস্তাতেই কান্নাকাটি করছে, তাজিম প্রথমে শান্তনা দিলেও পরে বিরক্ত হয়ে বলল,
“এরকম করছো মনে হচ্ছে আমি তোমাকে কিডন্যাপ করে নিয়ে যাচ্ছি। কিন্তু বাস্তবে তো তুমিই আমাকে কিডন্যাপ করেছো।”
কথাটা শুনে মাইশা কান্না থামিয়ে তাজিমের দিকে তাকালো।
“তুমিই আমাকে কিডন্যাপ করে তোমাদের বাড়িতে নিয়ে যাচ্ছো। আমি তোমাকে কিডন্যাপ করলে তো আমাদের বাড়িতে নিয়ে যেতাম।”
তাজিম হাসি আটকে বলল, “তুমিই তো কিডন্যাপ হওয়ার জন্য আমার পিছু পিছু ঘুরেছো। এখন আমি কিডন্যাপ করলেই দোষ?”
মাইশা রাগী চোখে তাজিমের দিকে তাকালো।
“অহনা আর মিথিলার সামনে চুপ থাকো নইলে আমি তোমাদের বাড়িতে যাবোনা।”
অহনা আর মিথিলা পেছনের সিটে বসে তাদের ঝগড়া দেখে মিটিমিটি হাসছে।
অহনা বলল, “না আপু তোমরা ঝগড়া কন্টিনিউ করো আমরা কানে তুলো গুঁজে নিচ্ছি কিচ্ছুটি শুনবোনা।”
মিথিলা তাল মেলালো, “হ্যাঁ হ্যাঁ আপি তোমরা চালিয়ে যাও।”
মাইশা পেছনে ঘুরে বলল, “একদম মজা নিবি না নইলে তোদের দুটোকে এখানেই ফেলে রেখে চলে যাবো। এমনি মন মেজাজ ভালো নেই।”
মাইশার কথা শুনে দুজনেই একদম চুপ হয়ে গেলো।
,
তরু, নীলাভ, জারা আর নাহিদ তাদের নিজেদের গাড়িতে করেই এহসান মঞ্জিলে ফিরছে। জারার শরীর ভালো নেই, বারবার বমি করছে।
নাহিদ রাগী কন্ঠে বলল, “এবার ভালো হয়েছে? কতোবার বলেছি তোমার শরীর খারাপ লাগলে আমাকে বলবে। এতো শরীর খারাপ আগে বললেনা কেনো?”
জারা বমি করতে করতে ক্লান্ত হয়ে গেছে, এখন একটু বমিটা কমেছে।
“বললে তো তুমি আমাকে নিয়ে আগেই চলে আসতে তাই বলিনি।”
নাহিদ কিছু না বলে জারার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগলো। জারা নাহিদের কাধে মাথা রেখে ঘুমানোর চেষ্টা করতে লাগলো।
তরু ফোনে তাদের গ্রুপে ম্যাসেজের মাধ্যমে কথা বলছিলো।
—ওর ওপর সবসময় নজর রাখবি।
লিজা রিপ্লাই দিলো,
—হ্যাঁ ও আমাদের নজরেই আছে,
আভিক বলল,
—আমরা তো কালকে আসছিই, তখন বাকি কথা বলবো।
বিভান বলল,
—আমি তো আসতে পারবোনা। এনজে আমাকে চিনে ফেলবে। আর বুঝে যাবে তরুই আমাকে দিয়ে মোমো আর তার বিয়ে ভেঙ্গে দিয়েছিলো।
তরু রিপ্লাই দিলো,
—তুইও আসবি, নীলাভের সামনে না পড়লেই হলো।
বিভান বলল,
—আচ্ছা ঠিক আছে,
নীলাভ আড়চোখে বারবার তরুর দিকে তাকাচ্ছে। সে বোঝার চেষ্টা করছে যে তরু ফোনে কি করছে।
“সামনের দিকে ফোকাস করো, নইলে এক্সিডেট করবে। ভুলে যেওনা যে গাড়িতে আমরা ৭ জন আছি।”
কথাটা শুনে নীলাভ অবাক হলো, সে যে তরুর দিকেই তাকিয়ে ছিলো সেটা তরু তার দিকে না তাকিয়েই বুঝলো কি করে? তবে তরু ঠিকই বলেছে তার সামনের দিকেই ফোকাস করা উচিৎ নীলাভ একটা শ্বাস ফেলে সামনের দিকে তাকালো।
রাত ১০ টা নাগাদ সবাই এহসান মঞ্জিলে ফিরে আসে। সবাই ক্লান্ত থাকায় মাইশা আর তাজিমকে তাদের রুমে রেখে এসে যার যার রুমে গিয়ে শুয়ে পড়ে।
পরেরদিন সকাল হতেই দূর দূরান্ত থেকে আত্মীয় স্বজন আসতে শুরু করে সাবিনা আর নাজমুলও এসেছেন।
এদিকে তরু ছাদে থাকা চেয়ারে বসে বিভান, লিজা আর আভিকের সাথে কথা বলছে। তারা কিছুক্ষণ আগেই এহসান মঞ্জিলে এসেছে। তরুর অবস্থা দেখে ৩ জন্যই গোলগাল চোখে তাকিয়ে আছে। তরু তাদের চাহনি দেখে গলা পরিষ্কার করে বলে,
“কি হয়েছে এভাবে তাকিয়ে আছিস কেনো?”
লিজা তরুর সামনের চেয়ারে বসে চোখ পরিষ্কার করে আবারও তরুর দিকে তাকায় তারপর বলে ওঠে,
“কিরে তুই দেখি মোটু হয়ে গেছিস? তোর ডায়েটের এই হাল কেনো?”
বিভান বলল, “আরে এনজে বোধহয় ওকে খাইয়ে খাইয়ে হাতি বানিয়ে ফেলতে চাইছে।”
লিজা বলল, “কি বলিস? হাতি বানিয়ে ওকে দিয়ে কি করবে?”
আভিক সিরিয়াস কন্ঠে জিজ্ঞেস করে, “কিরে তরু তোর এই অবস্থা কেনো?”
তরু হাতে থাকা ব্যানানা মিল্কশেকে চুমুক দিয়ে বলে,
“তোরা কি গাধা? আমাকে দেখেও বুঝতে পারছিস না?”
তরুর কথা শুনে ৩ জনই একে অপরের দিকে তাকালো কিন্তু কেউই কিছু বুঝতে পারছেনা। তরু গম্ভীর কন্ঠে বলে উঠলো,
“পেটে দু দুটো খরগোশের বাচ্চা আছে। সেই জন্যই আমার শরীরের এই অবস্থা।”
কথাটা শুনে ৩ জনই হা হয়ে গেলো। তারপর একসাথে চিল্লিয়ে উঠলো,
*কিহ?
তরু গম্ভীর কন্ঠে বলল, “হিশশ আস্তে বল।”
আভিক ফিসফিসিয়ে বলে, “তুই প্রেগন্যান্ট?”
“হু,”
লিজা বলল, “দু দুটো মানে টুইন বেবি?”
“হু,”
লিজা ফের বলল, “কয়মাস?”
“চার মাস”
বিভান বলল, “চার মাস? তুই আমাদেরকে বলার প্রয়োজন মনে করিসনি?”
“নোহ! দরকার হয়নি তাই বলিনি।”
আভিক সিরিয়াস গলায় বলল, “কি বলিস? দরকার নেই মানে? এই খবরটা যদি সাফেদের লোকেরা জানে কি হবে ভেবে দেখেছিস?”
“তখন ভাবার দরকার হয়নি, তবে এখন দরকার আছে। খবরটা হয়তো এতোক্ষণে ওদের কানেও পৌঁছে গেছে।”
লিজা বলল, “হ্যাঁ, বাড়িতে অনেক বাইরের লোকও আছে৷ আমি হলফ করে বলতে পারি তাদের মধ্যেই ওদের স্পাই আছে। তোর এখন বিশেষ সুরক্ষায় থাকা উচিৎ।”
“হ্যাঁ আমার জন্য স্পেশাল সিক্রেট বডিগার্ডের ব্যবস্থা কর।”
তরুর কথায় ৩ জনই রাজি হলো তবে কিছুক্ষণ পরেই বিভান বলে ওঠে, “এসব কিভাবে হয়ে গেলো তরু? তুই তো বাচ্চাদের দেখতেই পারিস না। আর সেই তুই এতো তাড়াতাড়ি?”
তে বিরস কন্ঠে বলল, “এটা একটা ভুল সিদ্ধান্ত ছিলো। এর জন্যই আমাদের কাজ পেছাতে হয়েছে। নীলাভের জন্যই এই ঝামেলা বয়ে বেড়াচ্ছি।”
লিজা বলল, “তুই তো তোর কাজ শেষ করে বাহিরে চলে যাবি তখন বাচ্চাদের কি হবে?”
তরু হাতে থাকা গ্লাসটা শক্ত হাতে চেপে ধরলো। কয়েক মূহুর্ত পর নিজেকে সামলে নিয়ে বললো, “আমি এবো*রশন করে ফেলতে চেয়েছিলাম কিন্তু নীলাভের জন্য করতে পারিনি।”
আভিক বলল, “তোদের দুজনের সম্পর্কের টানাপোড়েনে শুধু শুধু বাচ্চাদেরকে কষ্ট পেতে হবে।”
তরু শ্বাস ফেলে বলল, “ওদেরকে নিয়ে চিন্তা করার জন্য নীলাভ আছে। তোরা নিজেদের কাজে ফোকাস কর।”
বিভান ফট করেই বলে ফেলল, “আমি বলিকি তুই নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করার পর এনজের সাথে থেকে গেলেই তো হয়। তুই তো এনজেকে ভালোবাসিস তাহলে কেনো ওর থেকে দূরে চলে যাবি বলে ঠিক করেছিস?”
তরুর মুখ থমথম করছে। সে তাচ্ছিল্যের সুরে বলতে লাগলো,
“হাহ ভালোবাসা। ভালোবাসার উর্ধ্বে চলে গিয়েছিলো ব্যাপারটা। তবে আস্তে আস্তে সবকিছুই তিক্ত হয়ে যাচ্ছে। সব সত্যি জানার পর নীলাভ আমাকে পেতে চাইবে, আকড়ে ধরতে চাইবে। তখন কেনো আমি ওর কাছে যাবো? যেখানে নীলাভ এক মূহুর্তের জন্য আমাকে বিশ্বাস করতে পারেনি সেখানেই বা কেনো থাকবো আমি? ভেবেছিলাম ওকে আমাকে ভালোবাসতে বাধ্য করবো, ও আমাকে বিশ্বাস করবে। অন্তত আমার কাছে জানতে চাইবে যে নেহা হ'ত্যার দিন ঠিক কি ঘটেছিলো। কিন্তু আমি জানতাম না যে ও আমাকে ভালোবেসে এতোটাই অসুখী। আমাকে ঘৃনা করতে না পেরে ম'রেও যেতে চেয়েছিলো। শুধুমাত্র প্রমাণ বের করার জন্য জমশেদ আর জসিমকে বাচিয়ে রেখেছি। নইলে এতোদিনে ওদেরকে মে'রে ফেলাও হয়ে যেতো। আমি শুধু চাই ও আমাকে ভালোবাসার কারণে নিজেকে যাতে ঘৃনা না করে। আর কিছুই চাইনা আমার। তারপর ও যেভাবে ইচ্ছা সেভাবে থাকুক আই ডোন্ট কেয়ার।”
লিজা মাথা নিচু করে বলল, “এনজে তো তখন তোকে ফিরে পাওয়ার জন্য পাগল হয়ে যাবে। তুই পারবি তো তোর লাভকে সেভাবে কষ্ট পেতে দেখতে?”
লিজার প্রশ্নে তরু ভীষণ রেগে গেলো। দাতে দাত পিষে বলল,
“কেনো? আমাকে ফিরে পেতে কেনো চাইবে? ও আমাকে পাওয়ার যোগ্যই নয়। আয়ুর মতো একটা মেয়েই ওর জন্য ঠিক আছে।”
তরুকে রেগে যেতে দেখে ৩ জনই চুপ হয়ে গেলো। ৫ মিনিট পর তরু ঠান্ডা কন্ঠে বলল, “আয়ুর উপর নজর রাখিস।”
আভিক বিরক্ত হয়ে বলল, “তুই বারবার ওই মেয়েটার কথাই কেনো বলছিস?”
তরু আভিকের দিকে তাকিয়ে বলল, “কারণ যখন শত্রুরা সোজা রাস্তা ধরে আমি অব্ধি পৌছাতে ব্যর্থ হবে তখন ওরা আমি অব্ধি পৌছাতে অন্য রাস্তা খুজবে। সো ওকে নজরবন্দি করে রাখবি।”
লিজা বলল, “ওই মেয়েকে এভাবে মুক্ত রাখা মোটেও ভালো সিদ্ধান্ত বলে মনে হচ্ছেনা।”
তরু গম্ভীর কন্ঠে বলল, “যা বললাম তাই কর। ওকে মে'রে ফেলতে পারবোনা।”
তরুর কথার উপর আর কেউ কথা বলতে পারলোনা। তরু বিভানের দিকে তাকিয়ে বলল, “বিভান, মোমোকে ভালোবাসিস ঠিক আছে। কিন্তু ও যেন কোনোভাবেই আমাদের ব্যাপারে কিছু জানতে না পারে। দরকার হলে সামনের বাকি কয়েকটা মাস ওর সাথে যোগাযোগ বন্ধ রাখ।”
আভিক বলল, “হ্যাঁ আমারও সেটাই মনে হয়। আর তাছাড়া জমশেদ হায়দার যদি মোমোর ব্যাপারে জানতে পারে তাহলে ওর লাইফও রিস্কে পড়ে যাবে।”
বিভান বুঝতে পারলো তরু আর আভিক ঠিক কথাই বলছে। তাই সে মাথা নাড়িয়ে সায় জানালো।
“আমি ওকে রাজি করিয়েও ফেলেছি এই বলে যে, সামনের বছর আমি ওকে বিয়ে করে নেবো। ও বলেছে আমার জন্য অপেক্ষা করবে।”
চলবে,