#আমি_তরুলতা (৪০)
#সোফিয়া_সাফা
নীলাভ ব্রেকফাস্ট করে এসে দেখে তরু রুমে নেই সে তরুকে খুজতে খুজতে সাবিনা আর নাজমুলের জন্য বরাদ্দকৃত রুমের সামনে এসে দাঁড়ায়। সে শুনতে পায় জহুরা আর সাফোয়ান সাবিনা আর নাজমুলের সাথেই কথা বলছেন। নীলাভ সেদিকে চলে যায়,
সাফোয়ান বললেন, “আপনারা এসেছেন আমি খুব খুশি হয়েছি।”
সাবিনা আর নাজমুল চুপ করে রইলেন,
সাফোয়ান ফের বললেন, “আমি জানি আপনারা তরুর ব্যাপারটার জন্য অনেক বেশিই কষ্ট পেয়েছেন। কিন্তু আপনারা বিশ্বাস করুন তরু নেহাকে খু'ন করেনি।”
কথাটা শুনে সাবিনা তেতে উঠলেন,
“শুনুন আপনাদের এসব অযৌক্তিক কথাবার্তা শুনতে আমরা আসিনি। তরুই যে নেহাকে খু'ন করেছিলো সেটাতো ১২ বছর আগেই প্রমাণ হয়ে গিয়েছিলো। নীলাভ আর আয়ু নিজেদের চোখে দেখেছিলো, ছুরি থেকে ওর হাতের ছাপ পাওয়া গিয়েছিলো, তার ওপর ও নিজের মুখে স্বীকারও করেছিলো।”
সাবিনাকে রেগে যেতে দেখে জহুরা এগিয়ে আসলেন,
“আপা আপনি শান্ত হোন, সাফোয়ানের কথায় কিছু মনে করবেন না। নিজের মেয়ে বলে উনি ব্যাপারটা লুকানোর চেষ্টা করবেন সেটাই স্বাভাবিক। আমাকেও বাধ্য করেছিলো ব্যাপার টা লুকিয়ে রাখতে, এমনকি জারাকেও কখনো এই বিষয়ে জানাতে দেয়নি। সে চায়নি জারা আর তরুর বন্ডিং নষ্ট হয়ে যাক।”
সাবিনা বললেন, “কিন্তু শাক দিয়ে তো আর মাছ ঢাকা যায়না। আপনারাই দেখুন আপনারা আড়াল করে রাখলেও আমরা জেনেই গেছি।”
তাজিম বলে উঠলো, “আন্টি তরু আপনাদের জানিয়েছে বলেই আপনারা জানতে পেরেছেন। নয়তো কখনোই জানতে পারতেন না।”
তাজিমের কথা শুনে সবাই তার দিকে তাকায়। তাজিম সবেমাত্রই সাবিনা আর নাজমুলের রুমে প্রবেশ করেছে। নীলাভ খাটের এক সাইডে বসে আছে। জারা আর নাহিদও চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে।
সাবিনা বললেন, “ও নিজের পরিচয় দিয়ে কোনো অসাধ্য সাধন করেনি। ও আমাদের বিশ্বাস নিয়ে খেলেছে। আর আমাদের কষ্ট দেওয়ার জন্যই এরকম একটা পরিস্থিতি ক্রিয়েট করেছে যাতে ও পরিচয় দিলেও আমরা ওকে কিছুই করতে না পারি।”
তাজিম অবাক চোখে সাবিনার দিকে তাকালো,
“আপনি বলতে চাইছেন, তরু ইচ্ছে করেই প্রেগন্যান্ট হয়ে গেছে? শুধু মাত্র আপনাদের থেকে বাচার জন্য?”
সাবিনা চুপ হয়ে গেলেন। তাজিম একটা শ্বাস ফেলে বলল,
“তরু বহুবার এবোরশন করতে চেয়েছে আপনারাই করতে দেননি। আমার বোনের কোনো শখ নেই আপনাদের বংশধরদের জন্ম দেয়ার।”
তাজিমের কথায় এবার নীলাভ রেগে গেলো,
“তো কে বলেছিলো আমাকে বিয়ে করতে? কেনো এতো অভিনয় করে বিয়ে করলো আমাকে? আমি তো জোর করিনি,”
তাজিম শান্তকন্ঠে বলল, “সেটা তুমি বুঝবে না নীলাভ জাহির খান, আমার বোনের দূর্বলতাটাই তো তুমি। জানো আমার কাছে যদি কোনো সুপার পাওয়ার থাকতো তাহলে আমি সেই পাওয়ার ব্যবহার করে সর্বপ্রথম তরুর মস্তিষ্ক থেকে তোমাকেই মুছে ফেলতাম।”
নীলাভ বাকা হেসে বলল, “ভাগ্যিস নেই। নয়তো আমার বোনের খু'নি খোলা আকাশে শ্বাস নিয়ে বেড়াতো। আমার কি মনে হয় জানেন? আপনার বোনকে ওর কর্মের ফল ভোগ করতেই হবে সেই জন্যই নিয়তি ওকে এতো বছর পর আমার কাছে টেনে এনেছে।”
“নিয়তি অবশ্যই টেনে এনেছে তবে ওকে কর্মের ফল ভোগ করাতে নয় তোমাদেরকে কর্মের ফল ভোগ করাতে।”
তাজিমের কথায় নীলাভের রাগ ক্রমশই বেড়ে যাচ্ছে,
“আমাদেরকে? সিরিয়াসলি? আচ্ছা আপনাদের এতো বড় বড় কথা কোথা থেকে আসে বলুন তো? লজ্জা করেনা একজন খু'নির সাইড নিতে? কিসের ভিত্তিতে আপনারা বাবা ছেলে এখনো তরুকেই সাপোর্ট করেন?”
“বিশ্বাসের ভিত্তিতে সাপোর্ট করি। যেটা তোমার মাঝে নেই নীলাভ খান।”
নীলাভ তাচ্ছিল্যের হেসে বলল, “বিশ্বাস করবো? আমি নিজের চোখে দেখেছি ওই আমার বোনকে খু'ন করেছিলো।”
“সেটা আমি বা আমার বাবা বিশ্বাস করিনা। তুমি মিথ্যা বলছো, বা ভুল দেখেছো। আমার বোন যখন বলেছে যে ও খু'ন করেনি তখন ও খু'ন করেনি। যদি ওর বিরুদ্ধে হাজার টা প্রমাণ ও থাকে তবুও আমি ওকেই বিশ্বাস করবো।”
নীলাভ এবার ভীষণ রেগে গেলো। সে তাজিমের দিকে এগিয়ে যাবে তার আগেই তরু সেখানে এসে পড়ে।
“কি হচ্ছে এখানে? নীলাভ তুমি কি আমার ভাইয়ের উপর হাত তুলতে চাইছো?”
তরুর গম্ভীর কন্ঠ শুনে নীলাভ স্থির হয়ে যায়। সাবিনা বলে ওঠেন,
“আমরা এক্ষুনি নিজেদের বাড়িতে চলে যাবো। এখানে এসে এভাবে অপমানিত হবার কোনো মানেই নেই।”
জহুরা বললেন, “আপা প্লিজ আপনারা এভাবে রেগেমেগে চলে যাবেন না। তরুর শাস্তি আপনারা আমার মেয়েকে দেবেন না।”
সাবিনা কারো কথা শুনলেন না নীলাভ আর নাহিদের উদ্দেশ্যে বললেন, “নীলাভ নাহিদ রেডি হয়ে নে।”
নীলাভ আর নাহিদ নিজেদের রুমে চলে যেতে নিলে তরু বলে ওঠে, “আপনাদের ইচ্ছা হলে আপনারা চলে যেতেই পারেন। কিন্তু আমি আজকে কোথাও যাবোনা।”
তরুর কথার প্রেক্ষিতে নীলাভ থমকে গেলো। দাতে দাত চেপে বলল, “তুইও আমাদের সাথেই যাবি।”
তরু ভ্রু কুচকে বলল, “আমি তোমার কথা মানতে বাধ্য নই, তোমার যেখানে ইচ্ছা যাও। কিন্তু আমি কোথাও যাবোনা। আর শোনো তুমি যদি এক পাও এই বাড়ির বাইরে রাখো তাহলে আমি আর কক্ষনো খান ম্যানসনে পা রাখবোনা।”
কথাটা বলেই তরু চলে গেলো। নীলাভ অবাক চোখে তরুর যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইলো। মেয়েটা ইদানীং তাকে নাকে দড়ি দিয়ে ঘোরাচ্ছে। সাবিনাসহ বাকি সবাই বুঝতে পারলো তাদের অনিচ্ছা থাকা সত্ত্বেও তাদেরকে আজকে এখানেই থাকতে হবে।
দুপুরের খাওয়া দাওয়ার পর বাইরের সবাই নিজ নিজ বাড়িতে ফিরে যায়। এখন এহসান মঞ্জিলে শুধু জারার খালার আর মামার পরিবার আছে। আজকে বাইরের আবহাওয়া ভালো নেই। সন্ধ্যা নামতেই আকাশজুড়ে মেঘ করেছে, ক্ষনে ক্ষনেই বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। আজকে বিভিন্ন গেইম খেলার কথা থাকলেও সকালের ওই ঘটনাকে কেন্দ্র করে জারার মন ভালো নেই। সে বিকাল থেকেই নিজের রুমে শুয়ে বসে আছে। নাহিদ রুমে নেই হয়তো ড্রইংরুমে আছে। জারা বসেই ছিলো তখনই তার মা জহুরা সেখানে আসেন। জহুরা জারার সামনে বসে বললেন,
“শরীর কেমন আছে এখন?”
জারা কিছু না বলে অন্যদিকে তাকায়। তার কিছুই ভালো লাগছেনা। সবকিছু কেমন যেনো বিষন্ন লাগছে।
“দেখ জারা, আমি তোকে এর আগে অনেক ভাবেই সতর্ক করেছিলাম। কিন্তু তুই-ই আমার কথায় পাত্তা দিসনি।”
“এখন আর এসব বলে কোনো লাভ নেই। সবদিক থেকেই অন্ধকার ঘনিয়ে আসছে। ঠিক কি হতে চলেছে আমি বুঝতে পারছিনা।”
“দেখ জারা তুই শুধু তরুকে এড়িয়ে চলবি। তাহলেই হবে, নাহিদ তোকে অনেক ভালোবাসে ও তোকে সব সবসময় প্রোটেক্ট করবে।”
জারা তাচ্ছিল্যের হাসলো।
“আমি নিজের জন্য না আপুর জন্য চিন্তা করছি। আমি আপুকে সেইভ করতে চাই। নীলাভ ভাই আপুকে মে'রে ফেলবে।”
জহুরা জারার কথায় বেশ বিরক্ত হলেন, “সত্যিটা জানার পরেও তুই আপু আপু করে ম'রছিস কেনো? নীলাভ আর আয়ু নিজেদের চোখে দেখেছিলো।”
“তোমার কি মনে হয়? আমি আমার আপুকে বিশ্বাস না করে নীলাভ ভাইয়ের কথা বিশ্বাস করবো? কি প্রমাণ আছে যে নীলাভ ভাই-ই সত্যি কথা বলছে আর আমার আপু মিথ্যা কথা বলছে? “
“নীলাভের কথা বিশ্বাস করতে বলিনি তো, ছুরি থেকে তরুর হাতের ছাপ পাওয়া গিয়েছিলো।”
কথাটা শুনে জারা নিশ্চুপ হয়ে গেলো। তরুর বিরুদ্ধে যথেষ্ট প্রমাণ ছিলো বলেই তাকে ফা'সির রায় দেওয়া হয়েছিলো। নীলাভ নিজের চোখে দেখেছে বলাতে নীলাভকেও দোষ দিতে পারছেনা জারা। কিন্তু সেতো আর নিজের চোখে দেখেনি সে তরুকে বিশ্বাস করতেই পারে। তাজিম আর সাফোয়ানের মতো সেও তরুকেই বিশ্বাস করতে চায়। কিন্তু তরুর পক্ষে যেখানে একটাও প্রমাণ নেই সেখানে সে কি করবে? জহুরা জারার ব্যাপার টা বুঝতে পারলেন,
“তোদেরকে তরু বশ করে রেখেছে তাই তোরা অন্ধ হয়ে গেছিস। শোন সত্যিটা অস্বীকার করলেই সত্য কখনো মিথ্যা হয়ে যাবেনা।”
জারা শ্বাস ছাড়লো, সে এসব আর নিতে পারছেনা। কোনটা সত্যি আর কোনটা মিথ্যা সে এবার গুলিয়ে ফেলছে। তার কি করা উচিৎ?
“কোনটা সত্যি আর কোনটা মিথ্যা আমি সেটা জানিনা। আর জানতেও চাইনা, আমি শুধুমাত্র আমার আপুকে প্রোটেক্ট করতে চাই। আমার আপু নেহা আপুকে খু'ন করে থাকলেও সে তখন ছোটো ছিলো। সে হয়তো ভুল করে তেমন কিছু করে ফেলেছিলো। তার সেই ভুলের শাস্তি স্বরুপ তাকেও মে'রে ফেলা কতোটা যৌক্তিক?
“ভুলে যাসনা ওকে মৃ*ত্যুদন্ড দেওয়া হয়েছিলো। সেই ক্ষেত্রে ওকে মে'রে ফেলাই উচিৎ। আর নেহার জায়গায় তোর নিজের বোন হলে তুই কি পারতি তার খু'নিকে প্রোটেক্ট করতে? সেইদিক থেকে নীলাভ ঠিক সিদ্ধান্তই নিয়েছে।”
কথাটা শুনে জারার ভালো লাগলোনা, “তুমি এখন যাও মা, আমার ভালো লাগছেনা।”
জহুরা চলে গেলেন।
,
কিছুক্ষণ আগেই তাজিম আর মাইশা সবার সাথে ডিনার করে নিজেদের রুমে এসেছে। যদিও সন্ধ্যা থেকেই বাইরের আবহাওয়া থম মেরে আছে। এরকম আবহাওয়া মাইশা এর কাছে খুব ভালো লাগে। সে ব্যালকনিতে গিয়ে দাড়ালো। বাড়ির কথা খুব মনে পড়ছে, তাকে মন খারাপ করে দাড়িতে থাকতে দেখে তাজিম তার পাশে এসে দাড়ালো।
“আজকে তো তোমাদের বাড়ির সবাই এসেছিলোই। আর কালকে আমরা ওই বাড়িতেও যাচ্ছি, তাই মন খারাপ কোরোনা।”
মাইশা মাথা নাড়ালো। তারপর কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলে উঠলো।
“আমাকে বলোনি কেনো যে জারার জা তরু আমার আপন ননদ হয়?”
কথাটা শুনে তাজিম চমকালো।
“কে বলেছে এসব?”
“এরকম রিয়েক্ট করছো কেনো? তুমি কি সারাজীবন আমার কাছ থেকে ব্যাপার টা লুকিয়ে রাখতে চাইছিলে নাকি?”
তাজিম মাইশা এর দিকে ঘুরে তাকিয়ে বললো,
“ব্যাপারটা টা বেশ জটিল সেই জন্যই ভেবেছিলাম আস্তেধীরে জানাবো। তুমি কিভাবে জানলে?”
“সকাল বেলা আমি জারার রুমের দিকে যেতে নিয়েছিলাম তখনই শুনলাম তুমি উঁচু গলায় কারো সাথে কথা বলছো, আমি সেদিকে গিয়ে দেখলাম ত্রানাও দরজার সামনে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সব শুনছে। আমি সেদিকে এগিয়ে গিয়েই তোমাদের সব কথা শুনতে পেয়েছিলাম। যদিও আমি পুরোটা বুঝতে পারিনি। কিন্তু এটুকু বুঝেছি যে ত্রানা আসলে তোমার বোন আর ওর আসল নাম তরু। কিন্তু আমি বুঝতে পারছিনা যে তরুর হাজব্যান্ড কেনো তোমার সাথে ওভাবে কথা বলছিলো আর তরু যে তোমার বোন এটাই বা আমাকে আগে বললেনা কেনো?”
“হুম ও আমার আপন বোন। তুমি যখন এইটুকু জেনেই গেছো আর লুকাবো না কিছু।”
“হ্যাঁ আমিও জানতে চাই।”
তাজিম তারপর মাইশা কে নিজের দৃষ্টিকোণ থেকে সমস্ত ঘটনা খুলে বললো। সব শুনে মাইশা বুঝতে পারলো যে তরুর হাজব্যান্ড কেনো তাজিমের সাথে ওভাবে কথা বলেছিলো।
“এবার বলো তোমার কি মনে হয় আমার বোন নেহাকে খু'ন করেছে?”
মাইশা কি বলবে বুঝতে পারছেনা। যদিও তার মনে হচ্ছে তরুই অপরাধী তবুও সে অবশ্যই নিজের হাজব্যান্ডের পক্ষে।
“আমি অলওয়েজ তোমার পক্ষে, তুমি যেহেতু বলেছো তরু খু'ন করেনি তাহলে করেনি।”
তাজিম একটা শ্বাস ছাড়লো। সে মাইশা কে ব্লেইম করতে পারবেনা, কারণ সবাই-ই প্রমাণে বিশ্বাসী আর তার কাছে তরুর পক্ষে কোনো প্রমাণ নেই। এই জন্যই সে মাইশাকে এসব জানাতে চায়নি। তবে মাইশা তাকে ভালোবাসে তাই সে তাকে নিয়ে নিশ্চিন্ত। মাইশা তরুর ব্যাপারে যা কিছুই মনে করুক না কেনো তরুর খারাপ চাইবেনা। অন্তত তার কথা ভেবে চাইবেনা।
,
নীলাভ তরুর রুমে শুয়ে শুয়ে ফোন চাপছিলো। সে ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখে এখন ১১ টা বাজে। যা দেখে সে দরজার দিকে তাকালো। তরু রুমে নেই, কোথায় আছে সেটাও সে বুঝতে পারছেনা। ৮ টার দিকে ডিনার করার পর থেকেই সে তরুকে আর দেখেনি। এতোক্ষণ স্বাভাবিক লাগলেও এখন তার কেমন যেনো লাগছে। তাজিমের সাথে অমন ব্যবহার করার পর থেকেই তরু নাতো তার সাথে কথা বলেছে আর নাতো তার সামনে এসেছে।
“ও আমাকে এক মূহুর্ত শান্তি দেবেনা বলেই ঠিক করে রেখেছে।”
নীলাভ উঠে গিয়ে তরুকে খুজতে শুরু করলো। পুরো বাড়ি খুজেও সে তরুকে কোথাও পেলোনা।
“কোথায় গেলো ও? আমাকে টেনশন দেওয়ার জন্যই এরকম করছে।”
নীলাভ কি করবে বুঝতে পারছেনা তরুর ফোনে অনেকবার কল করেও দেখেছে কিন্তু তরুর ফোন বন্ধ বলছে। বাইরে বৃষ্টি পড়া শুরু হয়ে গেছে। নীলাভের চিন্তা আরও বেড়ে যাচ্ছে, তখনই তার মনে পড়ে,
“পুরো বাড়ি খুজে দেখেছি কিন্তু ছাদে আর বাগানে গিয়ে দেখিনি তো। আগে ছাদে গিয়ে দেখে আসি।”
ভাবতেই নীলাভ ছাদের উদ্দেশ্যে হাটা ধরে। ছাদের দরজার সামনে আসতেই সে তরুকে দেখতে পায়, তরু রেলিঙের ওপর হাত রেখে দাঁড়িয়ে আছে। নীলাভ ধীর পায়ে তরুর পাশে গিয়ে দাঁড়ায়।
“বৃষ্টির ভেতর দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কি করছিস?”
তরু নীলাভের দিকে না তাকিয়েই বলল, “জীবনের হিসেব মেলাচ্ছি।”
“রুমে চল।”
তরু কিছুই বললোনা। নীলাভ তরুর হাত ধরতেই তরু হাত সরিয়ে নেয়। আর নিজেও দূরে সরে দাঁড়ায়,
“যাও এখান থেকে,”
নীলাভ বিরক্ত হলো।
“তরুহ চল এখান থেকে, এই অবস্থায় বৃষ্টিতে ভেজা ঠিক হবেনা।”
“প্লিজ আমাকে একা ছেড়ে দাও।”
“রুমে গিয়ে একা থাকিস, বিরক্ত করবোনা।”
“আমি যাবোনা এখন।”
নীলাভ একটা শ্বাস ফেলে তরুর দিকে এগিয়ে গেলো,
“কি হয়েছে, কেনো জেদ করছিস?”
“এমনি ভালো লাগছেনা।”
“আচ্ছা স্যরি বলছি, আমার তোর ভাইয়ের সাথে ওভাবে কথা বলা ঠিক হয়নি। চল এবার।”
তরু নীলাভের দিকে তাকালো।
“তুমি স্যরি বলছো কারণ তোমার মনে হচ্ছে স্যরি বলা উচিৎ, তুমি এই জন্য স্যরি বলছোনা যে তোমার ভুল হয়েছিলো আর তুমি সেটা বুঝতে পেরেছো। Don’t say sorry without realisation.”
“তরুহ বৃষ্টি পড়ছে প্লিজ চল এখান থেকে। দরকার হলে আমি তোর ভাইয়ের কাছে গিয়ে ক্ষমা চেয়ে নেবো।”
“দরকার হলে? তুমি বুঝতে পারছোনা যে কি করা উচিৎ?”
নীলাভ ভ্রু কুচকে তরুর দিকে তাকালো। অন্ধকার হওয়াতে তরুর চেহারা বোঝা যাচ্ছেনা। তবে বৃষ্টিতে ভেজার কারণে তরু কাপছে, হয়তো ঠান্ডা লাগছে। নীলাভ এবার ভীষণ রেগে গেলো। সে তরুর হাত ধরে টেনে নিয়ে যেতে লাগলো।
“পাগলামি সব রুমে গিয়ে করবি। এটা জেদ করার জায়গা নয়।”
তরু আর জোর করলোনা নীলাভের সাথে রুমে চলে এলো। নীলাভ হাল্কা ভিজলেও তরু পুরোপুরি ভিজে গেছে, নীলাভ তরুর কাপড় বের করে তরুর হাতে দিলো।
“চেঞ্জ করে আয়।”
তরুর চোখমুখ লাল হয়ে গেছে, সে কোনো কথা না বলেই ওয়াশরুমে চলে গেলো। ১৫ মিনিটের মাথায় তরু বেরিয়ে এলো। নীলাভ নিজেও কাপড় চেঞ্জ করে নিয়েছে। তরুকে বের হতে দেখে নীলাভ তরুর হাত ধরে তরুকে বেডে বসালো। তারপর একটা তোয়ালে দিয়ে তার মাথা মুছে দিতে লাগলো।
“যদি ঠান্ডা লাগেনা, তাহলে তোর খবর আছে।”
তরু বিরসকন্ঠে বলল, “আমার ঠান্ডা লাগেনা। আর তুমি এতো দরদ দেখাচ্ছো কেনো? আমি ম'রে গেলেই তো তোমার শান্তি।”
নীলাভ ১ মূহুর্তের জন্য থমকে গেলো, কিছুক্ষণ পর স্বাভাবিক কন্ঠে বললো, “বাচ্চাদের জন্য দেখাচ্ছি.”
তরু চুপ করে রইলো।
“শোন তরুহ, আমি বুঝতে পেরেছি যে তোর ভাইয়ের সাথে ওভাবে কথা বলা ঠিক হয়নি। আসলে আমি রাগের মাথায় ওরকম ব্যবহার করে ফেলেছিলাম। আমি বুঝে শুনে, আর ভুল স্বীকার করেই স্যরি বলেছি। তোর ভাইকেও বলে দেবো।”
নীলাভের কথা শুনে তরু কিছু বলতে যাবে তার আগেই তরু হাচি দিতে লাগলো। নীলাভ শান্ত চোখে তরুর দিকে তাকালো, সে যেই ভয়টা পেয়েছিলো সেটাই হয়েছে। তরু তো নিজের অবস্থা দেখে অবাকই হয়েছে। এই প্রথম তার ঠান্ডা লেগেছে,
“এবার হয়েছে? কে বলেছিলো ছাদে গিয়ে দাড়িয়ে থাকতে? বাড়িতে কি আর জায়গা ছিলোনা?”
“আমার ঠান্ডা কিভাবে লাগলো? এর আগে,,,হাচচচচ্ছি”
তরু আর কিছু বলতে পারলোনা, তার হাচিই থামছেনা।
“হয়েছে হয়েছে, আর কিছু বলতে হবেনা। সবসময় এক লাইন বেশি বুঝবি আর তার প্রভাব বাচ্চাদের উপর পড়বে।”
নীলাভ উঠে চলে যেতে নিলে তরু তার হাত ধরে ফেলে।
“কোথায় যাচ্ছো?”
“আসছি ওয়েট,”
নীলাভ নিচে চলে গেলো। তারপর পানি গরম করে একটা বোলে করে তরুর কাছে নিয়ে এলো। তরুর দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, “গরম পানির ভাপ নে। ভালো লাগবে,”
তরু কথা না বাড়িয়ে গরম পানির ভাপ নিতে লাগলো, নীলাভ বেডের অন্যপাশে বসে জিজ্ঞেস করলো,
“তোর ফোনের কি হয়েছে?”
“চার্জ নেই অফ হয়ে গেছে।”
“দে আমি চার্জে দিয়ে রাখছি।”
তরু ইশারায় বেড সাইডে থাকা ফোনটা দেখিয়ে দিলো। নীলাভ ফোনটা নিয়ে চার্জে লাগিয়ে অন করতেই ফোনের স্ক্রিনে তার নিজের ঘুমন্ত মুখের ছবি ভেসে উঠলো। নীলাভ একটা বিরক্তির শ্বাস ফেললো।
“সব জায়গাতেই আমার ছবি রাখাটা ইম্পর্ট্যান্ট?”
তরু ভ্রু কুচকে নীলাভের দিকে তাকালো।
“অবশ্যই ইম্পর্ট্যান্ট, সেই জন্যই রেখেছি। তোমার ভালো না লাগলেও আমার কিছু করার নেই।”
নীলাভ ফোনটা রেখে বেডের উপর বসতেই তার একটা চিন্তা মাথায় এলো। সে তরুর দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো।
“তার মানে আমার সন্দেহই ঠিক ছিলো, ক্লাব থেকে পাওয়া ফোনটা তোরই ছিলো?”
গরম পানির ভাপ নিয়ে তরুর এখন একটু ভালো লাগছে। সে বোল টা রেখে নীলাভের দিকে তাকিয়ে বলল,
“হুম, আমি ছাড়া আর কে তোমার ছবি ওয়ালপেপার বানানোর সাহস দেখাবে?”
“তাহলে মিথ্যা বলেছিলি কেনো?”
“মিথ্যা না বললে তুমি বুঝে যেতে যে আমি তোমাকে আগে থেকেই চিনি। তারপর আমাকে নিয়ে আরো গবেষণা করতে। সেই জন্যই মিথ্যা বলেছিলাম।”
“ফোনে কোনো সিমকার্ড ছিলোনা কেনো?”
“ভাইয়া বারবার কল দিয়ে বিরক্ত করছিলো সেই জন্য ভেঙ্গে ফেলেছিলাম।”
নীলাভ কিছু একটা ভেবে বলল,
“তুই আমার এতো এতো ছবি কোথায় পেয়েছিস? তুই তো দেশের বাহিরে ছিলি,”
তরু অন্যদিকে তাকিয়ে বলল, “ইচ্ছা থাকলে সব পাওয়া যায়। দুরত্ব কোনো ফ্যাক্ট নয়।”
নীলাভ আর কিছু বললোনা। পরেরদিন নীলাভ তাজিমের কাছে গিয়ে স্যরি বললো। তারপর বিকালের দিকে তারা সবাই খান ম্যানসনে ফিরে আসে।
চলবে,