#আমি_তরুলতা (৪৮)
#সোফিয়া_সাফা
নীলাভ গিয়ে লাইট টা অফ করে দিয়ে এসে আলতো হাতে তরুর কাপড় চেইঞ্জ করে দিলো। তবে তার এসব চিন্তাই মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে, সে কি আসলেই কোনো ভুল করছে? আসলেই কি তরু নেহাকে খু'ন করতে পারে? যেই মেয়েটা তাকে এতোটা পরিমাণে ভালোবাসে তার পক্ষে কি তার বোনকেই খু'ন করা সম্ভব?
নীলাভ তরুর কাপড় গুলো ধুয়ে, ওয়াশরুমেই মেলে দিলো, তার মনে পড়লো আজকে সে শাওয়ার নেয়নি, আয়ুকে কোলে নিয়েছিলো, খাইয়েও দিয়েছিলো, তার তো শাওয়ার নিয়ে তরুর কাছে যাওয়া উচিৎ ছিলো। নীলাভ ভালো করে শাওয়ার নিয়ে বেরিয়ে এলো, গায়ে যেই শার্ট টা ছিলো সেটা গিয়ে ডাস্টবিনে ফেলে এলো। তারপর এসে তরুর মাথায় জলপট্টি দিতে লাগলো।
রাত ৮ টা নাগাদ তরুর জ্ঞান ফেরে, তরুকে চোখ খুলতে দেখে নীলাভ খুশি হয়ে যায়।
“তরুহ, ঠিক আছিস? কেমন লাগছে এখন?”
চোখ মেলে নীলাভকে পাশে বসে থাকতে দেখে তরু নিজেও উঠে বসতে নেয় কিন্তু নীলাভ থামিয়ে দিয়ে বলে,
“উঠতে হবেনা রেস্ট নে, তোর গায়ে অনেক জ্বর। আমি খাবার আনছি খেয়ে ওষুধ খেয়ে নিবি।”
তরু নিজের বাহু থেকে নীলাভের হাত সরিয়ে দিয়ে বলে,
“আমি ঠিক আছি, নিজের খেয়াল নিজে রাখতে পারবো। ইউ ক্যান গো,”
বলেই তরু খাটের বাইরে পা রাখতে নেবে কিন্তু তার মাথা ঘুরে যায়। নীলাভ তরুকে ধরে পুনরায় খাটে বসিয়ে দেয়,
“সারাদিন না খেয়ে থেকে শরীরের কি অবস্থা করেছিস? তারপরও বলছিস যে নিজের খেয়াল রাখতে পারবি?”
তরু ফের নীলাভের হাত সরিয়ে দিয়ে বললো,
“ভালো ভাবে বলছি, বেরিয়ে যাও রুম থেকে। এই রুমে তোমার আসার দরকার নেই,”
নীলাভ অবাক চোখে তাকায়, “আ…মি কোথায় যাবো?”
তরু শান্তকন্ঠে বলে ওঠে, “ওহ ভুলে গিয়েছিলাম এটা তো তোমার বাড়ি, সেই হিসেবে আমি তোমাকে বেরিয়ে যেতে বলতে পারিনা। ওকে আমিই চলে যাচ্ছি,”
তরু উঠে দাঁড়ায় নীলাভ তাকে ধরতে গেলে তরু হাত উচিয়ে না বলে, তরুর শান্ত চাহনি দেখে নীলাভের পাজোড়া থমকে যায়, এগিয়ে যাওয়ার সাহস পায়না। তরু আলমারি থেকে বানীকে বের করে হাতে তুলে নেয় তারপর ধীরপায়ে দরজার দিকে পা বাড়াতেই নীলাভ অসহায় কন্ঠে বলে ওঠে,
“ত…তোকে যেতে হবেনা, আমিই চলে যাচ্ছি। আসবোনা এই রুমে, তুই এই অবস্থায় বাইরে যাসনা প্লিজ।”
তরু থেমে যায়, নীলাভ এই সুযোগে কিছু বলতে চাইলে তরু বলে ওঠে।
“নো এক্সকিউজেজ, আই ডোন্ট লাইক এক্সকিউজেজ আমি তোমার কোনো কথা শুনতে চাইনা, আমাকে কোনো কিছু বোঝাতেও এসোনা। তুমি এতোদিন যা বোঝাতে চেয়েছিলে তা আমি আজ বেশ ভালো করেই বুঝে গেছি,”
“তরুউ…
“আমি সত্যিই তোমাকে বুঝতে পারিনি। আমাকে এভাবে বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ নীলাভ খান, তোমার যেখানে ইচ্ছা যেতে পারো এবার। ভয় নেই তোমার বাচ্চাদের কোনো ক্ষতিই করবোনা আমি, বাধ্য হয়ে আর আমার সাথে থাকতে হবেনা। ইউ ক্যান গো নাও,”
নীলাভ উপায় না পেয়ে চলে যাওয়ার জন্য দরজা অব্ধি আসতেই তাজিম রুমে প্রবেশ করে তার সাথে মাইশা আর জারা ও আছে, নীলাভ কিছুটা নিশ্চিন্ত হয়ে ড্রইংরুমে যেতেই দেখতে পায় সাফোয়ানও এসেছেন,
“জহুরা অনেকদিন হয়েছে, আমাদের সাথে তুমি আজকে বাড়িতে ফিরে যাবে।”
জহুরা যাবেনা বলতে চাইলেও বলতে পারেনা সে এই বাড়িতে এসেছে দেড় মাসের বেশি সময় হয়ে গেছে। এখনো যদি সে থাকার কথা বলে বিষয়টা সাবিনা, নাহিদ ভালোভাবে নাও নিতে পারে, আর সাফোয়ানের কথার উপর সে কিছু বলতেও পারবেনা। জহুরা প্রসঙ্গ পাল্টে বললেন,
“তোমরা হঠাৎ এই বাড়িতে, আমাকে তো জানাও নি যে এই বাড়িতে আসবে।”
“জারা কল দিয়ে বললো তরুর ব্যাপারে। না এসে থাকতে পারলাম না, মেয়েটাকেও দেখতে ইচ্ছা করছিলো খুব,”
সাফোয়ানের কথা শুনে জহুরা মুখ বাকিয়ে বলেন,
“তো যাওনা গিয়ে দেখে এসো,”
সাফোয়ান চাপা শ্বাস ফেললেন, “তুমি জানো যে আমি যেতে পারবোনা। মেয়েটার সাথে অন্যায় করেছিলাম যে।”
নীলাভকে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে সাফোয়ান বলে উঠলেন,
“কেমন আছো বাবা? মেয়েটা অনেক জ্বালাচ্ছে তাইনা?”
নীলাভ এগিয়ে এসে বলল, “না আংকেল, তেমন কিছুই নয়। উল্টো আমিই ওকে ভালো রাখতে পারছিনা,”
“তুমি ওকে ভালো রাখতে চাও?”
নীলাভ উত্তর দিলোনা, এরই মাঝে আয়ু নিচে নেমে এসে নীলাভের উদ্দেশ্যে বলল, “নীলাভ আমার না মনটা ভালো লাগছেনা, চলোনা কোথাও থেকে ঘুরে আসি।”
“হোয়াই নট, আমি তোমাকে তোমাদের বাড়ি পর্যন্ত ছেড়ে দিয়ে আসতেই পারি, যাবে?”
“নীল তুমি চেইঞ্জ হয়ে গেছো, আগে কখনোই আমার সাথে এভাবে কথা বলতে না।”
“আমি চেইঞ্জ হয়ে যাইনি আয়ু। উল্টো এটাই আমার আসল রূপ,”
“আমাকে বিয়ে করবে বলে তুমি প্রতিজ্ঞা করেছিলে, সেটার কি হবে নীল?”
“আমি স্বীকার করেই নিয়েছি যে আমি সেই প্রতিজ্ঞা পূরণে ব্যর্থ হয়েছি। আর তুমি এতো কিছুর পরেও কিভাবে এক্সপেক্ট করো যে আমি তোমাকে এখনো বিয়ে করবো? যেখানে তুমি লন্ডনে বসে প্রতিনিয়ত বয়ফ্রেন্ড চেইঞ্জ করে গেছো, তো বলিকি যাওনা তাদের মধ্যে থেকে কাউকে বিয়ে করে নেও। সে অবশ্যই তোমাকে ঘুরতে নিয়ে যাবে।”
আয়ু আর কথা না বাড়িয়ে নিজের রুমে ফিরে গেলো।
তরু চুপচাপ বানীকে কোলে নিয়ে খাটের একসাইডে বসে আছে,
“তুই আমাকে বলেছিলি নিজের কোনো ক্ষতি করবিনা, তাহলে এসব কি তরু?”
তাজিমের প্রশ্নে তরু ঠান্ডা কন্ঠে বলল,
“মাথাটা প্রচুর গরম হয়ে গিয়েছিলো সেই জন্যই শাওয়ারের নিচে বসে ছিলাম, কখন সেন্স হারিয়ে ফেলেছি নিজেও জানিনা।”
“আপু আমি অনেক বেশিই ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম, প্লিজ তুমি আর কক্ষনো এমন কোরোনা।”
তরু জারার কথা যেনো শুনলোই না সে একমনে বানীকে পর্যবেক্ষণ করতে লাগলো, মাইশা বলল,
“তাজিম আমার মনে হয় তরুকে আমাদের বাড়িতে নিয়ে যাওয়া উচিৎ, আমার যতটুকু মনে হচ্ছে তরুর মানসিক অবস্থা ভালো নেই। এখানে থাকাটা ওর জন্য রিস্কি হয়ে যাবে,”
জারা ও তাল মিলিয়ে বলল, “হ্যাঁ আমারও সেটাই মনে হয়, এই আয়ু- আপুর পিছনেই লেগে আছে।”
তাজিম তরুর দিকে তাকিয়ে বলে উঠল, “যদি তরু আমাদের সাথে যেতে রাজি হয় তবেই না আমরা ওকে নিয়ে যেতে পারবো,”
তাদের কথার মাঝেই নীলাভ সবার জন্য শরবত আর মিষ্টি নিয়ে আসে, সে দরজার সামনেই দাঁড়িয়ে বলে,
“ভাবী এগুলো একটু নেও তো।”
জারা ভ্রু কুচকে নীলাভের দিকে এগিয়ে গিয়ে বলে,
“আপনি আনতে গেলেন কেনো ভাইয়া? আমাকে ডাক দিতে পারতেন আর হানা খালাই বা কোথায়?”
নীলাভ একবার তরুর দিকে তাকায়, ট্রে টা জারার হাতে দিয়ে তারপর নিজের কান চুলকাতে চুলকাতে বলে,
“আ…ম খালা রান্না করছেন, আর তুমি তো কথা বলছিলে তাই ভাবলাম আমিই নিয়ে আসি।”
নীলাভ যাচ্ছেনা দেখে জারা বলল, “ভাইয়া ভেতরে আসুন না…
নীলাভ আসতে নেবে কিন্তু তরুর কথায় থেমে যায়,
“ভাইয়া আমি তোমাদের সাথে যেতে রাজি আছি,”
তাজিম কিছু বলার আগেই নীলাভ ২ পা পিছিয়ে গিয়ে বলল,
“আমি ভেতরে আসবোনা তরু, তুই এই বাড়িতেই থাক। আমি তোর অনুমতি ছাড়া তোর ধারে কাছেও ঘেঁষবোনা।”
“আমি তোমাদের সাথেই যাবো ভাইয়া আর এটাই ফাইনাল।”
“তরুহ প্লিজ,”
“আমার যা বলার ছিলো বলে দিয়েছি,"
জারা বলল, “সে নাহয় ঠিক আছে, তোমরা এগুলো খাও আর আজকে তোমাদের যাওয়া হচ্ছেনা। আপুর শরীর ভালো নেই, তার উপর অনেক রাত হয়ে গেছে তোমরা যেতেই চাইলে কালকে যেতে পারবে।”
মাইশা আর তাজিম রাজি হলো, তরুর শরীর ভালো নেই এই অবস্থার জার্নি করা ঠিক হবেনা। নীলাভ আর কিছু না বলে মন খারাপ করে চলে যায়, নীলাভ তরুর জন্য নন স্পাইছি চাউমিন রান্না করতে বলেছিলো। কারণ তরু ঝাল খাবার খেতে পারেনা, নীলাভ এই কয়েকদিনে ব্যাপার টা লক্ষ্য করেছে। হানা সেটাই রান্না করে তরুর কাছে নিয়ে এলো, তরু সেগুলো খেয়ে জ্বরের ওষুধ খেয়ে নিলো।
রাতে সবাই খাওয়া দাওয়া করে যে যার রুমে চলে গেছে, শুধুমাত্র নীলাভ ড্রইংরুমে বসে বসে টিভি দেখছে, সে গেস্টরুমের দিকে তাকিয়ে দেখলো তরু অল্রেডি দরজা লাগিয়ে হয়তো শুয়ে পড়েছে, নীলাভ বেশিকিছু না ভেবে উপরে নিজের রুমে চলে গেলো। আজকে অনেকদিন পর সে এই রুমে শোবে, তার পাশের যেই রুমটায় তরু থাকতো সেই রুমটা বাদে তাদের বাড়ির সবগুলো রুমই আপাতত বুক। বাড়ির সবাই উপরের রুমগুলোতেই ঘুমিয়েছে, তরুই একমাত্র নিচের গেস্টরুমে শুয়েছে, হানা অবশ্য ২ রুম পরের রুমটাতেই থাকে। নীলাভ বিছানায় শুয়ে ঘুমানোর চেষ্টা করতে লাগলো,
,
এদিকে, তরু বিছানায় শুয়ে স্বস্তি পাচ্ছেনা, শুধু এপাশ ওপাশ করছে। মাথাটা ব্যথায় টনটন করছে, জ্বরটা বেড়েছে বোধহয়। তরু অজান্তেই নিজের পেটের উপর হাত রেখে বিরবির করে বলল,
“তোদের জন্য কতকিছু করছি দ্যাখ, স্মোক করা ড্রিংকস করা থেকে শুরু করে স্লিপিং পিল নেওয়া অব্ধি ছেড়ে দিয়েছি। রাগের মাথায় যেন কিছু না করে বসি সেইজন্যই শাওয়ার অন করে বসে ছিলাম এরপরও যদি সবাই বলে আমি জন্ম দিয়েই তোদের মা হতে পারিনি সেটা কি মানবি তোরা?”
তরু নিজের কথায় নিজেই অবাক হলো, নিজের পেটের উপর থেকে দ্রুত হাত সরিয়ে নিলো।
“জ্বরের ঘোরে উল্টো পাল্টা বকছি বোধহয়, এই জ্বর আসার জন্যও তোরাই দায়ী, নীলাভের ছেলেমেয়ে বলে কথা অল্পতেই জ্বর চলে আসবে সেটাই স্বাভাবিক। ওর ও তো অল্পতেই জ্বর চলে আসে।”
কথাটা বলেই আনমনে হাসলো তরু, আগের দিনগুলো যেনো ফিরে এসেছে আজকে। এভাবেই তো সে লন্ডনে থাকাকালীন রাতগুলোতে নীলাভের কথা ভাবতো, তারপর সহ্য করতে না পেরে স্লিপিং পিল নিতো। কিন্তু আজকে তাও নিতে পারবেনা।
অন্যদিকে নীলাভও ঘুমাতে পারেনি সারারাত, সে ফোন অন করে দেখলো এখন ভোর চারটা বাজে। নীলাভ আর থাকতে না পেরে রুম থেকে বেরিয়ে এলো, ধীরপায়ে সিড়ি ডিঙিয়ে তরুর রুমের সামনে এসে দাড়ালো। একটা বড় শ্বাস টেনে দরজায় নক করার উদ্দেশ্যে হাত উঠালো কিন্তু কিছু একটা ভেবে নক করলোনা।
তরু পুরোটা রাত এপাশ ওপাশ করেই কাটিয়েছে কিন্তু এখন হঠাৎ করেই সে অস্বাভাবিক কিছু অনুভব করছে, তরু সমস্ত শক্তি খাটিয়ে উঠে বসলো, নীলাভ দরজার বাইরেই বসে ছিলো। তরুর গোঙানির শব্দ শুনে নীলাভ দরজায় হাত রাখতেই দরজা খুলে গেলো, তরু দরজা লক করেনি। পুরো রুম অন্ধকার তরু ব্যাথায় ককিয়ে উঠছে ক্ষনে ক্ষনে, নড়াচড়ার শক্তি টুকুও নেই তার শরীরে। নীলাভ লাইট জ্বালাতেই দেখলো তরু ব্যাথায় ছটফট করছে, নীলাভকে আসতে দেখে তরু হাত বাড়ালো নীলাভের দিকে।
“নী…লাভ হে…ল্প।”
নীলাভ বিছানায় রক্তের চিহ্ন দেখামাত্রই দৌড়ে এলো তরুর কাছে। তরুকে বুকের মাঝে চেপে ধরে জোরে জোরে শ্বাস নিয়ে জিজ্ঞেস করলো,
“এখনো তো ডেটের ১৭ দিন বাকি আছে, এখনই কেনো?”
তরু কিচ্ছু বলতে পারছেনা, নীলাভ নিজের ফোনটা বের করে প্রথমেই নাহিদকে কল দিলো। জিদানের জন্য জারা নাহিদ স্বজাগই ছিলো, নীলাভের কল পেয়েই রিসিভ করলো।
“ভাইয়া তরুর অনেক পেইন হচ্ছে তুমি এক্ষুনি নিচে এসো। ওকে হসপিটালে নিয়ে যেতে হবে।”
নীলাভের সিরিয়াস কন্ঠ শুনে নাহিদ তাড়াহুড়ো করে উঠে দাড়ালো,
“জারা তরুর পেইন উঠেছে, তুমি এক্ষুনি মা আর বাবাকে গিয়ে বলো। আমি গাড়ি বের করছি, যারা যারা যাবে তাদেরকে নিয়ে একেবারে রেডি হয়ে এসো।”
কথাটা শুনে জারা ঘাবড়ে গেলো, তবুও নিজেকে সামলে জিদানকে নিয়ে বেরিয়ে গেলো।
এদিকে তরু নীলাভের হাত খামছে ধরে ব্যাথা কমানোর চেষ্টা করছে, তরু বহু কষ্টে বলে উঠলো।
“নীলাভ আমার যদি ক…কিছু হয়ে যায়, ওদেরকে দ…দেখে রাখবে তো?”
কথাটা শুনে নীলাভ তরুর সামনে হাটু মুড়ে বসে বলে,
“কিচ্ছু হবেনা তোর সাহস রাখ,”
তরু আবারও নীলাভের হাত ধরে আস্তে আস্তে বলল,
“আমি ম*রে গেলে ত…তুমি চাইলে আবারও ব…বিয়ে করতে করতে পা…রো কিন্তু তার আগে ও…দের মে'রে ফেলো… কেমন? প্লিজ ওদেরকে কখনো সৎ মা…য়ের মুখ দেখিওনা,”
কথাটা শুনে নীলাভ নিজের বুকে তরুর মাথা চেপে ধরলো,
“এভাবে বলিস না, আমি তোকে বোঝাতে পারিনি এটা আমার নিজেরই ব্যার্থতা। আমাকে নিয়ে তোর মনে এসব চিন্তা আসছে সেই জন্য আমি নিজেই দায়ী তরু।”
তরু বিরবির করে বলে উঠলো, “নী…লাভ ওরা আসবে, তুমি প্লিজ সাথেই থেকো।”
নীলাভ তরুর কথাটার মানে বুঝতে পারলোনা।
“কারা আসবে তরু? কাদের কথা বলছিস?”
“যা…রা নেহা আপুকে মে'রেছিলো তা…রা আসবে, তুমি সবার খেয়াল রে…খো প্লিজ।”
তরু আর কিছু বলতে পারলোনা তার আগেই বাড়ির সবাই চলে এলো, তাজিম তো এসেই তরুর মাথায় হাত রেখে বললো,
“সোনা বোন আমার একদম ভয় পাবিনা, আমরা সবাই আছে তো তোর সাথে।”
নীলাভের উদ্দেশ্যে বললো,
“নীলাভ ওকে নিয়ে হসপিটালে চলো কুইক,”
নীলাভ তাজিমের কথামতো তরুকে কোলে তুলে নিলো, দ্রুতপায়ে ড্রইংরুম পেরিয়ে বাড়ির বাইরে চলে এলো। তার সঙ্গে জারা, মাইশা, তাজিম আর সাফোয়ানও পা মেলালেন। সাবিনা আর নাজমুলও চিন্তিত মুখে গেট অব্ধি আসলেন, তরুর অবস্থা দেখে অজান্তেই সাবিনার চোখজোড়া ভিজে উঠলো যা সে সবার আড়ালেই মুছে ফেললেন তবে নাজমুল বিষয় টা লক্ষ্য করছেন,
“তুমিও যাবে ওদের সাথে?”
সাবিনা উত্তর না দিয়েই বাড়ির ভেতরে চলে যান, নাহিদ ড্রাইভ করছে। নীলাভ ব্যাকসিটে তরুকে জড়িয়ে ধরে বসে আছে তরুর আরেক পাশে জারা আছে,
মাইশা জিদানকে নিজের কাছে রেখেছে। মাইশা, সাফোয়ান আর তাজিম তাদের নিজেদের গাড়িতে করেই হসপিটালে যাচ্ছে। তরুর জ্ঞান আছে, তবে কিছু বলার মতো শক্তি তার শরীরে নেই। জারা তরুর হাত পা উষ্ণ রাখার চেষ্টা করছে, তখনই তরু জারার হাত চেপে ধরে, জারা অবাক চোখে তরুর দিকে তাকায়। তখনই জারার কিছু মনে পড়ে আর সে নিজের ফোনটা বের করে আভিকের নম্বরে একটা ম্যাসেজ পাঠিয়ে তরুর ব্যাপারে জানিয়ে দেয় আর হস্পিটালের লোকেশন সেন্ড করে, আভিকের নম্বর তরুই তাকে দিয়েছিলো। নীলাভ বারবার চোখদুটো মুছছে তবে বারবারই তার চোখের সামনে টা ঝাপসা হয়ে আসছে, তরুর চেহারা লাল হয়ে গেছে সে বারবার নীলাভের শার্ট খামছে ধরছে,
“আর একটু তরু আমরা এসেই গেছি। ভাইয়া তাড়াতাড়ি চালাও,”
১০ মিনিটের মাথায় তারা হসপিটালের সামনে এসে পৌছায়, এখন ভোরবেলা হলেও চারপাশ অন্ধকার। আশেপাশে আজানের ধ্বনি প্রতিধ্বনিত হচ্ছে, তাজিম হস্পিটালের ভেতর থেকে স্ট্রেচার আনলে নীলাভ তরুকে গাড়ি থেকে বের করে স্ট্রেচারে শোয়ায়। তরু তখনও নীলাভের শার্টের বুকের অংশটা খামছে ধরে ছিলো, নাহিদ আগেই কল করে ডাক্তার রেডি রাখতে বলেছিলো। তরুকে ওটিতে নেওয়ার সময় তরু যেতেই চাইছিলো না, তরুর অবস্থা দেখে নীলাভ আর নিজেকে সামলে রাখতে পারেনা, তরুর গালে দুহাত রেখে কান্নাজরিত কন্ঠে বলে,
“একদম ভয় পাবিনা কলিজা, আমি বাইরেই অপেক্ষা করছি তোর জন্য। কথা দিচ্ছি তুই না ফেরা অব্ধি এখানেই দাড়িয়ে থাকবো, তোর কোনো ভয় নেই। আমি, তোর প্রেম আছি তো তোর সাথে।”
বলেই নীলাভ তরুর কপালে একটা চুমু দেয়, তরু নীলাভের শার্ট ছেড়ে দেওয়া মাত্রই নার্সরা তরুকে ভেতরে নিয়ে দরজা লাগিয়ে দেয় নীলাভ সেখানেই দাঁড়িয়ে যায়।
,
আভিক নিজের বেডরুমে ঘুমিয়ে ছিলো পরপর কয়েকটা ম্যাসেজ আসার শব্দে তার ঘুম আলগা হয়ে গেছে। সে ফোনটা হাতে নিয়ে ম্যাসেজ গুলো দেখা মাত্রই তার ঘুম ছুটে যায়। বিভান আর লিজাকে তৎক্ষনাৎ কল দিয়ে তরুর ব্যাপারে জানিয়ে দেয় তারপর নিজেও দ্রুত রেডি হয়ে বেরিয়ে পড়ে। গাড়ি স্টার্ট দেওয়ার আগে তরুর ড্যাড রাফিজ চৌধুরীকেও খবরটা জানিয়ে দেয়।
,
সকাল ৭ টার দিকে সাবিনা আর নাজমুল এসে উপস্থিত হয়, চিন্তায় সাবিনা কিছুতেই বাড়িতে থাকতে পারছিলেন না, সাবিনা দেখলো নীলাভ তরুর কেবিনের সামনেই দাঁড়িয়ে আছে। নাজমুল গিয়ে নাহিদের কাছে জিজ্ঞেস করলেন,
“ডক্টর কি বলেছে?”
নাহিদ একবার জারার দিকে তাকালো, মেয়েটা তখন থেকে কেদেই চলেছে। মাইশা, তাজিম আর সাফোয়ানকে শান্তনা দিচ্ছে,
“বাবা তরুর শরীরের কন্ডিশন অনু্যায়ী নরমাল ডেলিভারি সম্ভব নয়, সি সেকশন করতে হবে। সেটা ডক্টর আগেই বলেছিলো। তবে বর্তমানে তরুর অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ হচ্ছে যার জন্য সবাই চিন্তিত,”
সাবিনা গিয়ে নীলাভের কাধে হাত রেখে বললেন,
“তুই চিন্তা করিসনা নীলাভ, বাচ্চাদের কিছুই হবেনা দেখিস,”
নীলাভ সাবিনার দিকে না তাকিয়ে নিজের হাতের দিকে তাকালো, তার হাতে তরুর রক্ত লেগে আছে।
“তোমরা তরুর কথা ভাবছোনা মা? কেনো, তরু নেহা আপুকে খু'ন করেছিলো সেইজন্য? আচ্ছা মা আজ যদি তরুর কিছু হয়ে যায় তারপর যদি আমরা জানতে পারি যে তরু খু'ন করেনি তখন আমরা নিজেদের ক্ষমা করতে পারবো তো?”
কথাটা শুনে সাবিনা ভ্রু কুচকে তাকায়, “তুই নিজের চোখে দেখেছিস, তারপরও এই কথা বলছিস?”
“সেটাই মা, তবে চোখের দেখাও ভুল হতে পারে। যেমন তরু দেখেছে আমি আয়ুকে কোলে নিয়েছি, কিন্তু তরু দেখেনি কিভাবে তোমরা আমাকে বাধ্য করেছিলে আয়ুকে হসপিটালে নিয়ে যেতে। আচ্ছা মা সেদিনও এরকম কিছুই ঘটেনি তো? যেটা আমরা কেউই দেখিনি,”
“তুই নিজের চোখের দেখাকে সন্দেহ করছিস? তাছাড়া ছুরি থেকেও তো শুধুমাত্র ওরই হাতের ছাপ পাওয়া গিয়েছিলো।”
“আচ্ছা মা যদি আমার চোখের দেখা আর তরুর বিরুদ্ধে পাওয়া প্রমাণগুলোও কখনো ভুল বলে প্রমাণিত হয় তখন আমরা সেটা মেনে নিতে পারবো তো?”
কথাটা শুনে সাবিনা স্তব্ধ হয়ে গেলেন। এর আগে নীলাভকে এভাবে কথা বলতে সে কখনো দেখেননি, বলতে গেলে নীলাভ সবসময়ই বিষয়টা এড়িয়েই গেছে। তাহলে হঠাৎ কেনো নীলাভ এই বিষয়ে ভাবছে, তাহলে কি নীলাভ তরুকে কোনোভাবে বাচানোর চেষ্টা করছে? সাবিনা রাগি কন্ঠে বলে ওঠেন,
“তুই ওর দোষগুলো আড়াল করার চেষ্টা করিসনা নীলাভ, কিংবা কোনো ভাবে ওকে বাচানোরও চেষ্টা করিসনা। আমার মেয়েকে খু'ন করার শাস্তি ওকে পেতেই হবে।”
কথাটা বলেই সাবিনা চলে যায়, নীলাভ একটা তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে চোখজোড়া বন্ধ করে নেয়।
“আমি যদি কখনো নিজের চোখে না দেখতাম তাহলে আমিও তোকেই বিশ্বাস করতাম তরু যদি তোর বিরুদ্ধে হাজারও প্রমাণ থাকতো তবুও, যেভাবে সাফোয়ান আংকেল আর তাজিম ভাই তোকে বিশ্বাস করে।”
কিছুক্ষণ পর ডক্টর লুসি তরুর কেবিন থেকে বেরিয়ে এলো, নীলাভ একটা দম নিয়ে তার সামনে গিয়ে দাড়ালো, তাজিম, জারা আর সাফোয়ানও এগিয়ে এলেন।
“ডক্টর তরু আর বাচ্চারা ঠিক আছেতো?”
লুসি নিজের সার্জিক্যাল মাক্সটা খুলে শান্তকন্ঠে বললো,
“আপনাদেরকে খুশির খবর টাই আগে দিচ্ছি, সেটা হলো আপনার ১ ছেলে আর ১ মেয়ে হয়েছে। দুজনেই একদম সুস্থ আছে। আর খারাপ খবরটা হচ্ছে, মিসেস খানের জ্ঞান ফেরেনি, যদি আগামী ৬ ঘন্টার মধ্যে ওনার জ্ঞান না ফেরে তাহলে… যেকোনো কিছু ঘটে যেতে পারে।”
কথাটা শুনে নীলাভের পায়ের নিচ থেকে মাটি সরে গেলো যেন, এতোক্ষণ নিজেকে কন্ট্রোল করে রাখলেও এবার সে আর নিজেকে সামলাতে পারলোনা,
“তরুহ…
চলবে,
শব্দসংখ্যা- ২৫০০+