#আমি_তরুলতা (৪৯)
#সোফিয়া_সাফা
“তরুহ,”
নীলাভ কাদতে লাগলো, সে চিৎকার করে কাদছে। তার কান্নার শব্দে চারপাশ ভারী হয়ে উঠলো, নাহিদ আর নাজমুল এসে নীলাভকে সামলাতে লাগলো। জারা তাজিম আর সাফোয়ান তো দৌড়ে তরুর কাছে চলে এলো। তরুর হাতে রক্তের স্যালাইন আর মুখে অক্সিজেন মাক্স লাগানো,
“আপু,”
জারা আর কিছু বলতে পারলোনা তরুর মাথায় হাত রেখেই কেদে উঠলো। সাফোয়ান আর তাজিম ও তরুর পাশে দাড়িয়ে দাঁড়িয়ে কাদছে,
“আমার মেয়েটা আমার প্রতি এক আকাশ পরিমাণ অভিযোগ নিয়েই শুয়ে আছে তাজিম। আমাকে কি ক্ষমাটুকু চাওয়ার ও সুযোগ দেবেনা?”
তাজিম বলল, “তোমার প্রতি তরুর কোনো অভিযোগ নেই বাবা। ও তোমাকে অনেক আগেই ক্ষমা করে দিয়েছে,”
সাফোয়ান শব্দ করে কেদে ওঠেন, পাশে থেকে বাচ্চার কান্নার আওয়াজ পেয়ে জারা সেদিকে চলে যায়। বাচ্চাদুটোকে দেখে অজান্তেই জারার মুখে হাসি ফুটে ওঠে, বাচ্চাদুটো দেখতে একদম পুতুলের মতোই কিউট হয়েছে। জারা একজনকে কোলে নিয়ে তাজিমের দিকে এগিয়ে যায়। তাজিমের উদ্দেশ্যে বলে,
“ভাইয়া দেখোনা, আপু ওদেরকে খরগোশের বাচ্চা বলেই ডাকতো। আর ওরা দেখতেও একদম খরগোশের মতোই কিউট হয়েছে,”
ওদের কথার মাঝেই সেখানে সাবিনা প্রবেশ করে, সে মূলত বাচ্চাদের কান্নার শব্দ পেয়েই এসেছেন। সাবিনা গিয়ে আরেকজনকেও কোলে তুলে নেয়, নাহিদ নীলাভকে ধরে ধরে নিয়ে আসে বাচ্চাদেরকে দেখানোর জন্য। কিন্তু নীলাভ কিছুতেই স্বাভাবিক থাকতে পারছেনা, নীলাভ বাচ্চাদের দিকে না তাকিয়েই আগে তরুর কাছে চলে যায়, তরুর হাতটা জড়িয়ে ধরে বলে।
“প্রাণপাখি, তুই রাগ করেছিস আমার ওপর? আমি খুব খারাপ তাইনা, তুই আমাকে যা শাস্তি দিবি আমি সব মেনে নেবো প্লিজ একবার চোখ মেলে তাকা। তরুহ কেনো এভাবে পোড়াচ্ছিস আমাকে? আমি আর সহ্য করতে পারছিনা। তুই আমার সাথে কথা বল, রাগ করেই বলনা বেরিয়ে যেতে। আমি কিচ্ছু মনে করবোনা, তুই দরকার হলে আমাকে মে'রে ফেল। আমি বাধাও দেবোনা, তবুও এতোবড় শাস্তি দিসনা। আমি বাচতে পারবোনা বিশ্বাস কর, যদি যেতেই হয় আমাকেও তোর সঙ্গে নিয়ে যা।”
নীলাভের কান্না দেখে সবাই অবাক চোখে নীলাভের দিকে তাকিয়ে আছে, তবে এইসবের মাঝে সবচাইতে বেশি কষ্ট হয়তো বাচ্চাগুলোই পাচ্ছে, তা তাদের কান্নার বেগ দেখেই বোঝা যাচ্ছে। সাবিনা বাচ্চাটা নিয়ে নীলাভের দিকে এগিয়ে যায়,
“দেখনা তোর ছেলেটা কেদেই চলেছে, একবার ওকে কোলেও নিবিনা? এই ছেলেমেয়ের জন্য কতোকিছু করলি আর এখন ওদেরকেই অবহেলা করছিস?”
নীলাভ একবার সাবিনার কোলে থাকা নীড়ের দিকে তাকায়, মূহুর্তেই তার তরুর বলা কথাগুলো মনে পড়ে,
“যদি তুমি ওদেরকে বেস্টটা দিতে না পারো বা ওদের যদি কখনো আমাকে প্রয়োজন হয় তাহলে ওদেরকে আমি নিজের সাথে নিয়ে যাবো।”
কথাটা মনে পড়তেই নীলাভ নীড়কে কোলে তুলে নেয়, নীড়কে কোলে নিতেই নীলাভের মনটা শান্ত হয়ে যায়, আর নীড়ও কান্না থামিয়ে পিটপিট চোখে বাবার দিকে তাকায়,
“দেখলে দুনিয়াতে আসতে না আসতেই কিরকম বাবার নেওটা হয়েছে। এতোক্ষণ কেদেকেটে একাকার করে দিচ্ছিলো।”
নীলাভ নীড়কে কোলে নিয়ে উঠে দাঁড়ায়, জারা নৌশিকে কোলে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। নৌশিকে দেখে তার খুব শান্তশিষ্ট মনে হলো, কিন্তু তখনই তাকে ভুল প্রমাণ করে দিয়ে নৌশিও গলা ফাটিয়ে কেদে উঠলো। নীলাভ দ্রুতপায়ে সেদিকে গিয়ে আরেকহাতে নৌশিকে কোলে তুলে নিলো, নীলাভ কোলে নিতেই দুজনেই চুপ। পিটপিট চোখে নীলাভের দিকেই তাকিয়ে আছে, নীলাভ কান্নার মাঝেই দুজনের কপালে কিস করলো। তারপর দুজনের কানের কাছেই মুখ নিয়ে ধীরে সুস্থে আজান দিতে লাগলো,
এদিকে নাহিদ জারার কাছে গিয়ে বলল,
“দেখলে একদম জিদানের মতোই হয়েছে বাপ কা বেটা, বাপ কা বেটি। তোমরা জন্ম দিয়েছো ঠিকই কিন্তু দুনিয়াতে এসে ওরা আগে বাপকেই চিনেছে,”
জারা মুখ বাকিয়ে বললো, “হাহ, আগে আগে দ্যাখো হোতা হ্যা ক্যায়া।”
নাহিদ ভ্রু কুচকে তাকালো,
“যখন পেটে টান পড়বে তখন সেই মাকেই দরকার হবে, তোমরা ওদের প্রিয়জন আর আমরা হলাম প্রয়োজন। প্রিয়জন যে কেউ হতে পারলেও প্রয়োজন সবাই মেটাতে পারেনা বুঝলে।”
কথাটা শুনে নাহিদ অবাক চোখে জারার দিকে তাকিয়ে রইলো, নীড় আর নৌশি কিছুক্ষণের মধ্যেই নীলাভের কোলে ঘুমিয়ে পড়লো। নীলাভ গিয়ে তাদের দোলনায় শুইয়ে দিলো।
,
বেলা ১২ টা,
নীলাভ তরুর হাতটা ধরে বসে আছে, তরুর এখনো জ্ঞান ফেরেনি। নীলাভ নিঃশব্দে কেদেই চলেছে, সেই সাথে বাচ্চা দুটোও পাল্লা দিয়ে কান্নাকাটি করছে। সাবিনা নীড় আর নৌশিকে কিভাবে সামলাবে বুঝতেই পারছেননা,
জারা বলল, “মা ওদের ক্ষুধা লেগেছে, বাচ্চা মানুষ একটু পর পরই ক্ষুধা লাগবে সেটাই স্বাভাবিক,”
সাবিনা বিরক্তিভরা চোখে জারার দিকে তাকালেন,
“দেখছো তো আর্টিফিশিয়াল মিল্ক খাওয়ানোর চেষ্টা করছি কিন্তু ওরা তো মুখেই নিচ্ছে না। এরকম করলে কিভাবে সামলাবো বলোতো?”
সাবিনা না পেরে নীলাভের কাছে গেলো, “বাচ্চাদুটো কাদছে, তুই ওদের কাছে না গিয়ে এখানে বসে আছিস? হ্যাঁ রে তোর ওদের জন্য মায়া হচ্ছেনা?”
নীলাভ মুখে কিছু না বলে তরুর হাতটা সাবধানে রেখে বাচ্চাদের দিকে এগিয়ে গেলো। প্রথমে নৌশিকে কোলে নিয়ে খাওয়ানোর চেষ্টা করলো, কিন্তু কিছুতেই কিছু হচ্ছেনা। নাহিদ এগিয়ে এসে বলল,
“ওরা খাচ্ছেনা কেনো সেটাই বুঝতে পারছিনা, ক্ষুধা লেগেছে বলে কান্না করছে কিন্তু খাচ্ছেনা। আজিব,”
জারা বলল, “৯ টার দিকে তো আমি এগুলোই খাইয়েছিলাম তখন তো খেয়ে নিয়েছিলো।”
নীলাভ এবার বেশ চিন্তায় পড়ে গেলো। সে ডাক্তারকে ডেকে আনলো। ডাক্তার এসে চেক-আপ করে বললেন,
“এতটুকু বাচ্চাকে এসব আর্টিফিশিয়াল মিল্ক খাওয়ানো উচিৎ হয়নি। আই থিংক ওদের পেট ব্যাথা করছে।”
নাহিদ বলে উঠলো, “আপনি এভাবে বলছেন কেনো ডক্টর? যেসব বাচ্চাদের জন্মের সময়ই মা মা'রা যায় তারা কি এগুলো খেয়ে বেচে থাকেনা?”
“আমি সেটা একবারও বলিনি, তবে এগুলো খাওয়ালে এরকম সমস্যা হতেই থাকবে।”
বলেই ডক্টর চলে গেলেন, নীলাভের অবস্থা নাজেহাল একদিকে বাচ্চাদের সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে অন্যদিকে তরুর চিন্তায় সে পাগলপ্রায়।
সাবিনা বললেন, “নীলাভ তোর অবস্থাও ভালো ঠেকছে না, কিছু খেয়ে নেনা বাপ।”
নীলাভ অসহায় চোখে মায়ের দিকে তাকালো, নৌশি কাদতে কাদতে ঘুমিয়ে গেছে কিন্তু নীড়কে কিছুতেই রাখা যাচ্ছেনা, কেদেই চলেছে।
“ওদেরকে আমি রাখতে পারবোনা মা, আমার মনে হয় এইজন্যই তরু এবো*রশন করে ফেলতে চেয়েছিলো।”
নীলাভের কথা শুনে সবাই বিষ্মিত হলো, নীলাভ এসব বলছে কেউ যেনো মানতেই পারছেনা।
নাহিদ বলল, “নীলাভ শান্ত হ, আস্তে আস্তে ওরাও অভ্যস্ত হয়ে যাবে।”
“ওদের কষ্ট হচ্ছে, তরু বারবার বলেছিলো ওদের যেনো কষ্ট না হয়। আমিও বলেছিলাম ওদের কষ্ট হবেনা,”
নীড় কেদেই চলেছে,
নীলাভ অসহায় কন্ঠে বলল, “ওর হয়তো অনেক পেট ব্যাথা করছে।”
নীলাভ নীড়কে কোলে নিয়েই এগিয়ে গেলো তরুর দিকে সাফোয়ান আর তাজিম তরুর পাশেই বসে ছিলো। নীলাভ যেতেই সাফোয়ান উঠে গিয়ে চেয়ার খালি করে দেয়, নীলাভ সেখানে বসে নীড়কে বলতে লাগলো,
“মাকে ডাকো, আমার উপর রাগ করে আছে। তাই আমি ডাকলে সাড়া দিচ্ছেনা, তোমার উপর তো রেগে নেই। যতই শক্ত মনের হোকনা কেনো তোমার ডাক উপেক্ষা করতে পারবেনা।”
নীড় তো আর নীলাভের কথা বুঝলোনা, সে তো শুধু কেদেই যাচ্ছে। নীড়ের কান্না দেখে নীলাভ আবারও কাদতে লাগলো, তরুর হাতটা তুলে নিয়ে নীড়ের মাথায় রাখলো।
“তরু চোখ খোল। প্লিজ জান, আমি ওদেরকে রাখতে পারছিনা, ওদের তোকে প্রয়োজন। তুই আসবিনা? অন্তত দ্বায়িত্ব পালন করার জন্য হলেও একবার কোলে নে ওদের। শুধু একবার,”
নীলাভ কাদছে তখনই সে অনুভব করলো সে তরুর যেই হাত ধরে আছে সেই হাত নড়ে উঠলো। নীলাভ তরুর দিকে তাকাতেই দেখে তরুর চোখের পাতাও নড়ছে,
“তরুহ,”
নীলাভ সবার দিকে তাকিয়ে বললো, “সবাই দেখোনা তরুর জ্ঞান ফিরেছে, তরু রেসপন্স করছে।”
নীলাভের কথা শুনে সবাই একসাথে তরুর দিকে এগিয়ে এলো। কয়েক মূহুর্ত যেতেই তরু চোখ মেলে তাকালো, নীলাভের হাত থেকে নিজের হাতটা সরিয়ে মুখ থেকে অক্সিজেন মাক্সটা খুলে ফেললো, জারা এগিয়ে এসে তরুর মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললো,
“আপু… আপু তুমি ঠিক আছো?”
তাজিম তো খুশিতে আবারও কেদেই ফেলেছে, সাফোয়ান আর জারা ও কাদছে তবে এটা খুশির কান্না। তরু পুরোপুরি ভাবে চোখ মেলে তাকালো, তারপর উঠে বসতে নিলে নীলাভ বাধা দিয়ে বলে।
“উঠছিস কেনো? শুয়ে থাক,”
তরু নীড়ের দিকে আঙ্গুল দিয়ে ইশারা করে মৃদু কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো,
“ও… কাদ…ছে কেনো? কে ওকে কষ্ট দিয়েছে?”
“এমনি তোর জন্য কাদছিলো।”
“ওকে আ…মার কাছে দেবে?”
কথাটা শুনে নীলাভ কান্নার মাঝেই হেসে ওঠে, নীড়কে তরুর পাশে শুইয়ে দিয়ে বলে,
“ও কার মতো হয়েছে বলতো? তুই তো কখনোই কাদিস না, নৌশিও কেদেছিলো তবে ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে গেছে। কিন্তু ও পুরো এনার্জি ওয়েস্ট করে কেদেই যাচ্ছে।”
“তোমার ম…তো হয়েছে,”
“আমি কখন কাদলাম?”
“এখ…নো কাদছো,”
তরুর কথা শুনে নীলাভ দ্রুতহাতে নিজের চোখজোড়া মুছে নিলো। তরু নীড়ের মাথায় হাত রাখতেই নীড় ঠোঁট ফুলিয়ে কেদে ওঠে, তরু ভড়কে গিয়ে উঠে বসে।
“কি হয়েছে ওর, এতো কাদছে কেনো?”
তরু যেনো নীড়ের কান্না শুনে নিজের কষ্টই ভুলে গেছে নীড়কে কোলে নিয়ে হাত পা গভীর ভাবে পর্যবেক্ষণ করতে করতে লাগলো,
“কোথায় ব্যাথা পেয়েছে?”
তরুর পাগলামি দেখে সবাই অবাক চোখে তাকিয়ে রইলো এটাই কি সেই মেয়ে যে কিনা প্রতিনিয়ত বাচ্চাদের এবো*রশন করিয়ে ফেলতে চাইতো, কথায় কথায় বলতো বাচ্চাদের কথা ভাবার মতো টাইম নেই। এগুলো সব নন প্রফিটেবল কাজ? জারা এগিয়ে এসে ফিসফিসিয়ে বলল,
“আপু ওদের অনেক ক্ষুধা লেগেছিলো, তুমি তখন সেন্সলেস ছিলে তাই বাধ্য হয়েই আর্টিফিশিয়াল মিল্ক খাইয়েছিলাম, ওসব খেয়েই ওদের পেটে ব্যাথা করছে।”
কথাটা শুনে তরু চোখ কটমট করে জারার দিকে তাকালো, জারা ভয় পেয়ে ২ পা পিছিয়ে গেলো,
“কে বলেছে ওসব খাওয়াতে?”
নীলাভের দিকে ইশারা করে বললো,
“ও বলেছে তাইনা?”
জারা একটা ঢোক গিলে তাজিমের কাছে চলে যায়। তরু এবার নীলাভের চোখে চোখ রেখে বলে,
“ওগুলো কাদের খাওয়ায় জানো? যাদের মা ম'রে যায় তাদের খাওয়ায় তুমি কোন সাহসে ওদের ওসব খাওয়াতে বলেছো হ্যাঁ? আমি কি ম'রে গেছি?”
তরুর কথা শুনে এক এক করে সাফোয়ান, নাহিদ, তাজিমসহ নাজমুলও বেরিয়ে যায়। নীলাভ গলা পরিষ্কার করে বলে,
“তুই মেনে নিচ্ছিস যে তুই ওদের মা?”
নীলাভের কথা শুনে তরু চুপ হয়ে যায় পরক্ষণেই বলে ওঠে,
“সম্পর্ক মেনে না নিলেই শেষ হয়ে যায়না। জন্মসূত্রে আমিই ওদের মা, জন্ম যখন দিয়েছি দায়িত্ব পালনও করবো। তোমার মতো irresponsible নই, যে দায়িত্ব দেখলেই পালিয়ে যাবো।”
নীলাভ দাঁড়িয়ে গিয়ে বললো, “ওকে তাহলে তুই বরং দায়িত্ব পালন কর, আমি বাইরে গেলাম।”
বলেই নীলাভ বাইরে বেরিয়ে গেলো, নীড়ের কান্না থামেনি। এরই মাঝে নৌশিরও ঘুম ভেঙ্গে যায়,
“জারা ওকে নিয়ে আয়,”
জারা নৌশিকে নিয়ে তরুর কোলে দিলো, তরু মায়াভরা চোখে একবার নীড় আর একবার নৌশির দিকে তাকিয়ে বলল,
“কাদেনা ছানাপোনা,”
জারা ভয়ে ভয়ে বললো, “এভাবে থামবেনা আপু,”
তরু ভ্রু কুচকে বলে ওঠে, “কিভাবে থামবে?”
সাবিনা এগিয়ে এসে রাগী কন্ঠে বললেন, “এই মেয়ে তুমি কি জানোনা কিভাবে থামবে? ওদেরকে খাওয়াও,”
তরু জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে সাবিনার দিকে তাকিয়ে আছে, সাবিনা এবার রেগে না গিয়ে ভালো করেই বললেন,
“ব্রেষ্টমিল্ক খাওয়াও, সেটাই এই বয়সী বাচ্চাদের জন্য সবচাইতে নিরাপদ খাবার। জারা ওকে ভালো করে বুঝিয়ে দেও আমি বাইরে গেলাম।”
কথাটা বলেই সাবিনা বাইরে চলে গেলো, নীলাভ বাইরেই বসে ছিলো নীড় আর নৌশির কান্না থেমে যাওয়াতে সে একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল, তখনই আয়ু এসে উপস্থিত হলো। আয়ু এসেই নীলাভের গা ঘেঁষে বসে বললো,
“স্যরি নীল আমার আসতে অনেক দেরি হয়ে গেছে, বাচ্চারা কোথায়? চলো আমি গিয়ে ওদের সামলাবো।”
আয়ুর কথা শুনে নীলাভ বিরক্তি সূচক শব্দ উচ্চারণ করে সরে বসলো,
“আয়ু প্লিজ চুপ করো, তোমার ঘ্যানঘ্যানানির চাইতে বাচ্চাদের কান্নার শব্দগুলোও বেশি ভালো লাগে আমার কাছে।”
“কি বললে? যাক বাদ দেও, খালামনি সকাল থেকেই আমাকে কল দিয়েছিলো কিন্তু আমার ফোন সাইলেন্ট ছিলো। আমার ঘুম ভাঙ্গতেই আমি চলে এসেছি নীল। চলো এবার তুমি আর আমি মিলে বাচ্চা সামলাবো।”
“দরকার নেই ওদের সামলানোর জন্য ওদের মা-ই যথেষ্ট,”
“কিহ! তরুর জ্ঞান ফিরেছে? ও বেচে গেছে?”
আয়ুর কথা শুনে নীলাভ রাগী চোখে আয়ুর দিকে তাকায়,
“খবর টা শুনে তুমি হয়তো খুশি হলেনা তাইনা?”
আয়ু আমতাআমতা করে বলল, “খুশি হওয়া বা না হওয়ার কি আছে, এমনিতেও ওর সময় ঘনিয়ে আসছে।”
“কি বলতে চাও তুমি?”
আয়ু সামনে ইশারা করে দেখালো নাজমুল, সাবিনা আর নাহিদ কোনো একটা বিষয় নিয়ে তর্ক করছে। আয়ু বাকা হেসে বললো,
“তুমি কি জানো ওরা কোন বিষয়ে কথা বলছে?”
নীলাভ ভ্রু কুচকে সামনে থাকা ৩ জনের দিকে তাকালো কিন্তু তারা কোন বিষয়ে কথা বলছে সেটা বুঝতে পারলোনা।
“ওরা তরুকে কিভাবে মা'রবে সেই বিষয়েই কথা বলছে,”
কথাটা শুনে নীলাভ দাঁড়িয়ে যায়, দ্রুত পায়ে তাদের ৩ জনের দিকে এগিয়ে যায়।
নাহিদ বলে, “নীলাভ নিজে বলেছিলো বাচ্চারা জন্ম নেওয়া মাত্রই ও ওকে মে'রে ফেলবে কিন্তু এখন নীলাভই ওকে বাচানোর জন্য ম'রে যাচ্ছে।”
সাবিনা বললেন, “আমাদেরকে বাচ্চাদের কথাও ভাবতে হবে নাহিদ।”
“তো কি বলতে চাও তুমি মা?”
নাজমুল বললেন, “নাহিদ একদম ঠিকই বলছে সাবিনা, নীলাভ ক্রমশই দূর্বল হয়ে পড়ছে। আমাদের আর তরুকে সময় দেওয়া ঠিক হবেনা।”
নাহিদ ফের বলল, “সেটাই, মা ছাড়াও বাচ্চারা বেচে থাকে, ওদের ও অভ্যাস হয়ে যাবে। আমাদেরকে যা করার তাড়াতাড়ি করতে হবে।”
তাদের কথা শুনে নীলাভ ২ পা পিছিয়ে যায়, তখনই তারা ৩ জন নীলাভের দিকে তাকায়।
সাবিনা ফিসফিসিয়ে বললেন, “নীলাভ কি সব শুনে ফেলেছে?”
“শুনুক মা, তুমি ওকে বোঝাও ও যেনো ভুলেও আমার কাজে বাধা হয়ে না দাঁড়ায়।”
নীলাভ উল্টো দিকে ঘুরে ফট করেই তরুর কেবিনে ঢুকে যায়। তরু জারার সাথে কোনো একটা বিষয় নিয়ে আলোচনা করছিলো, নীলাভ কে আসতে দেখে তরু আর জারা চুপ হয়ে যায়।
“আপু আমি জিদানের কাছে যাচ্ছি, ভাবি হয়তো ওকে রাখতে রাখতে অল্রেডি বিরক্ত হয়ে গেছে।”
কথাটা বলেই জারা বেরিয়ে গেলো, জারা যাওয়া মাত্রই নীলাভ দরজা লাগিয়ে তরুর সামনে এসে বসে। পাশে তাকিয়ে দেখে নীড় আর নৌশি দোলনায় ঘুমোচ্ছে। নীলাভ হঠাৎ করেই তরুর হাত ধরে বলে,
“আমাদেরকে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এখান থেকে পালিয়ে যেতে হবে তরু।”
তরু ভ্রু কুচকে নীলাভের দিকে তাকায়, “মানেহ? পালিয়ে যাবো কেনো?”
“ওরা তোকে মে'রে ফেলবে,”
তরু বুঝতে পারলো নীলাভ কি বলতে চাইছে, তরু ঠান্ডা কন্ঠে বলল,
“কিন্তু আমি তো শুধুমাত্র তোমার হাতে ম'রতে চাই।”
“তরুহ!”
“কি হয়েছে?”
তরু পাশের টেবিলের উপরে থাকা ফল কাটার ছুরিটা নীলাভের হাতে ধরিয়ে দিলো,
“তোমার কাছে লাস্ট সুযোগ আছে আমাকে মে'রে ফেলার। তুমি যদি আমাকে মে'রে ফেলতেই চাও তাহলে দ্রুত কাজটা করে ফেলো।”
নীলাভ শক্ত করে ছুরিটা ধরলো তারপর বিষ্মিত চোখে তরুর দিকে তাকালো, তরু দেখলো নীলাভের চোখজোড়া লাল হয়ে গেছে, যেই হাত দিয়ে ছুরিটা ধরে রেখেছে সেই হাতটা অনবরত কাপছে। তরু একটা বাকা হাসি দিয়ে নীলাভের এলোমেলো চুলগুলোয় হাত বুলিয়ে দিতে লাগলো,
“হেল্প করবো তোমাকে?”
তরু ফট করেই নীলাভের হাত ধরে ছুরিটা নিজের পেটেই ঢুকিয়ে দিতে যাবে কিন্তু তার আগেই নীলাভ ছুরিটা দূরে ছুড়ে ফেলে দিয়ে তরুকে জড়িয়ে ধরে।
“আমি তোকে মা'রতে পারবোনা, হ্যাঁ আমি স্বীকার করে নিলাম যে আমি তোকে মা'রতে পারবোনা।”
নীলাভ তরুকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো, কিন্তু তরু তাকে ধরেনি, তরু অদ্ভুত ভাবে হাসতে লাগলো। তরুর হাসির শব্দ শুনে নীলাভ আরও শক্ত করে তরুকে জড়িয়ে ধরলো, তরু ফিসফিসিয়ে নীলাভের কানে কানে বলল,
“আমার চলে যাওয়ার সময় এসে গেছে মিষ্টার খান। আমাকে এবার চলে যেতে হবে। এভাবে জড়িয়ে ধরেও আর আটকে রাখতে পারবেনা।”
তাদের কথার মাঝেই দরজায় কেউ নক করে, বেশ কয়েকবার নক করার পরেও নীলাভ শুনলোনা যেন। সে এখনো তরুকে জড়িয়ে ধরে আছে,
“দরজাটা খুলে দিয়ে এসো।”
নীলাভ অনবরত কাপছে, তার গলা শুকিয়ে আসছে। সে ভীষণ ভয় পাচ্ছে, এটা ভেবে যে এক্ষুনি হয়তো কেউ এসে তরুকে তার কাছ থেকে কেড়ে নিয়ে যাবে।
“দরজাটা খুলে দেও,”
তরুর শান্ত কন্ঠ শুনে নীলাভ আরও অস্থির হয়ে গেলো,
“আমি খুলবোনা, ওরা তোকে মে'রে ফেলবে।”
চলবে,