ফন্ট সাইজ:
থিম:
আমি তরুলতা

৫৭তম পর্ব

লেখক: সোফিয়া সাফা

#আমি_তরুলতা (৫৭)

#সোফিয়া_সাফা

জারা মনে মনেই বলল,

“আমার বোনটা এক মূহুর্তের জন্যও সুখি হতে পারলোনা আল্লাহ, এ কেমন ভাগ্য আমার বোনটার? আল্লাহ আমার বোনটার জীবনে একটু শান্তি দিও। ভাইয়া আপুকে সত্যিই অনেক ভালোবাসে, সে নিজের ভুল বুঝতে পেরেছে, আমি জানি ভাইয়াকে ছাড়া আপুও কোনোদিনও ভালো থাকতে পারবেনা। ভাইয়া যেন আপুকে আটকে রাখতে পারে আল্লাহ,”

জিদানের কান্নার শব্দে জারা নিজের রুমে চলে গেল,

“ওদেরকে একা ছেড়ে দেও, সবাই চলো এখান থেকে।”

নাজমুলের কথায় সম্মতি জানিয়ে সবাই চলে গেল। নীলাভ তরুকে কোলে নিয়ে তরুর কপালের সাথে নিজের গাল ঠেকিয়ে বসে আছে। সে কিছুতেই পারছেনা নিজের কান্না থামাতে, অবশ্য সে থামাতেও চায়না। তার কান্নার পানিতে যদি তরুর মনের ভেতরে জমে থাকা অভিমানের মরুভূমিতে বর্ষণ ঘটাতে পারে তাহলে সেটাই তার জন্য অনেক। সে চায় তরুর তপ্ত হৃদয়ে প্রেমের বর্ষন ঘটাতে, তরুকে নিজের সবটুকু উজার করে দিতে। হঠাৎ করেই নীলাভের গাল বেয়ে ১ ফোটা পানি তরুর চোখে পড়ে, তরুর চোখজোড়া নড়ে উঠল। কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানেই তরু চোখ মেলে তাকাল। নীলাভের সেদিকে খেয়াল নেই। সে একমনে কেদেই যাচ্ছে। তরু দ্রুতহাতে নীলাভকে সরিয়ে উঠে বসল, আচমকা এরকম হওয়াতে নীলাভ চমকে তাকাল,

“তরু,,,তুই ঠিক আছিস?”

তরু অদ্ভুত চোখে নীলাভের দিকে তাকাল, নীলাভ তরুর চাহনি দেখেই বুঝে গেলো যে তরুর সব মনে পড়ে গেছে।

“ঠিক নেই, আমি একদমই ঠিক নেই। আমি এখানে একদমই ঠিক নেই নীলাভ জাহির খান।”

“তরুউ, প্রাণ আমার। তুই একটু শান্ত হ, আমার কথাগুলো শোন,”

“নোহ এক্সকিউজ। আই ডোন্ট লাইক এক্সকিউজেজ,”

তরু দ্রুত উঠে দাড়াল,

“এনি,,,,,মিনি”

তরু চিৎকার করে এনি আর মিনিকে ডাকতে ডাকতে রুম থেকে বেরিয়ে গেল, নীলাভও পাগলের মতো তরুর পিছুপিছু বেরিয়ে এল,

“এনি,,,মিনি, কয়বার ডাক দিতে হবে?”

এনি মিনি দৌড়ে তরুর সামনে গিয়ে দাড়াল, তারা দুজনে তরুর দিকে তাকিয়ে দেখল, তরুর চোখেমুখে ক্লান্তির ছাপ, সোনালি রঙা চুলগুলোও এলোমেলো। টপসের বিভিন্ন অংশে ভাজ পড়ে গেছে, তবুও তরুকে বেশ স্নিগ্ধ লাগছে, যাকে বলে ন্যাচারাল বিউটি।

এনি—“জ্বি কুইন বলুন,”

“ড্যাডকে কল দিয়ে গাড়ি পাঠিয়ে দিতে বলো, আর সবকিছু গুছিয়ে নেও। তাড়াতাড়ি করো, আমাকে রাগিওনা ফল কিন্তু ভালো হবেনা, কথা যেনো রিপিট করতে না হয়।”

এনি সাথে সাথেই একটা ঢোক গিলে রাফিজ চৌধুরীকে কল দিল। রাফিজ চৌধুরী তো তরুর সুস্থ হবার খবর শুনে ভীষণ খুশি হল, এনি আর মিনি চলে আসতে নিলে তরু আটকিয়ে বলে,

“ওদেরকে দিয়ে যাও,”

এনি আর মিনি নীড় আর নৌশিকে তরুর কোলে দিয়ে দ্রুতপায়ে রেডি হতে চলে যায়। তরু নীলাভের দিকে তাকিয়ে দেখে নীলাভ অশ্রুসিক্ত নয়নে তার দিকেই তাকিয়ে আছে। তরু দ্রুত চোখ সরিয়ে নেয়, নীলাভকে পাশ কাটিয়ে সে আগে যেই রুমে থাকতো সেই রুমের সামনে গেল, নীলাভও তার পিছু পিছু এলো।

“ভেতরে বানী আছে দরজা খুলে ওকে বের করে দিন।”

নীলাভ একপাও নড়লোনা, তরু চিৎকার করে উঠল।

“কি বললাম শুনতে পাননি? কথা রিপিট করতে হচ্ছে কেনো? আমি এই বাড়ি থেকে যতদ্রুত সম্ভব বের হতে চাইছি।”

তরুর চিৎকার শুনে বাড়ির সবাই পুনরায় একত্রিত হলো, তরু জারাকে দেখে তাকে বলল,

“জারা, রুমের চাবিটা কোথায় আছে?”

জারা তরুর চিল্লানিতে ভয় পেয়ে গেল,

“ম,,,মায়ের রুমে আছে।”

“তাড়াতাড়ি আন, আর দরজাটা খুলে বানীকে বের করে দে, কথা যেনো রিপিট করতে না হয়।”

জারা অটোমেটিক চাবি আনতে সাবিনার রুমে চলে গেল। বাকি সবাই তো মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে, তরুর দিকে তাকানোর সাহসটুকুও পাচ্ছেনা কেউ। তরু সবাইকে চমকে দিয়ে শান্তকন্ঠে বলে উঠল,

“আপনাদের অনুশোচনা করার কোনো প্রয়োজন নেই, আপনারা সবাই নিজেদের জায়গা থেকে ঠিক ছিলেন।”

নাজমুল একটু সাহস পেয়ে বলে উঠল,

“আমরা ক্ষমা পাওয়ারও যোগ্য নই মা। তবুও বলছি ক্ষমা করে দেও আমাদেরকে, তুমি ক্ষমা না করলে যে আল্লাহও ক্ষমা করবেনা।”

তরু একটা ফোস করে শ্বাস ছাড়ল,

“ক্ষমা করে দিয়েছি অনেক আগেই। আপনাদেরকে নিয়ে আমার মনে বিন্দুপরিমাণ অভিযোগ নেই।”

সাবিনা আর নাহিদ চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে, কথা বলার মতো কোনো ভাষাই খুজে পাচ্ছেনা। জারা চাবি এনে দরজা খুলে দিলো, তরু ভেতরে ঢুকে নৌশি আর নীড়কে খাটে শুইয়ে দিল। তারপর ড্রয়ার থেকে একটা ব্যাগ আর বানীকে বের করলো। বানীকে ব্যাগে ঢুকিয়ে ব্যাগটা কাধে ঝুলিয়ে নিল, তারপর পুনরায় নীড় আর নৌশিকে কোলে নিয়ে বেরিয়ে যেতে লাগল। নীলাভ তো তরুর পিছুপিছুই যাচ্ছে, তরু ড্রইংরুমে আসতেই নীলাভ বলে ওঠে,

“তুই যদি চলেই যাস তাহলে এই বাড়ি থেকে তোর যা যা আছে সবকিছু নিয়ে তারপর যা।”

তরু অবাক চোখে পেছনে ফিরে তাকাল,

“আমার যা যা আছে আমি সব নিয়েই যাচ্ছি মিষ্টার খান, যদিও নীড় আর নৌশি শুধুমাত্র আমার নয়। বলতে গেলে ওরা পুরোটাই আপনার। কারণ আপনার কারণেই আমি ওদেরকে পেয়েছি, তাই ওদের উপর আপনার অধিকার সবচেয়ে বেশি। কিন্তু বর্তমানে ওদের আমাকে প্রয়োজন, আমি নিজের দায়িত্ব ভুলে যেতে পারিনা। তাছাড়া আমি এই দেশেই থাকবোনা, দেশে থাকলে প্রতিদিন ওদের খাবার পাঠিয়ে দিতাম। সেটা যেহেতু সম্ভব নয়, যতদিন আমাকে ওদের প্রয়োজন ততোদিন ওরা আমার সাথেই থাকবে।”

“আমি ওদেরকে রেখে যেতে বলছিনা শুধু তোর জিনিসগুলো নিয়ে যেতে বলছি।”

“আমার এবাড়িতে আর কিছুই নেই,”

“আছে,”

নীলাভ তরুর সামনে গিয়ে দাড়াল,

“আমি আছি, আমাকেও নিয়ে যা।”

নীলাভের কথা শুনে তরু হাসতে লাগল,

“আপনি আমার নন নীলাভ জাহির খান।”

বলেই তরু সামনের দিকে ঘুরবে তার আগেই নীলাভ তরুর সামনে হাটু মুড়ে বসে তরুর পাজোড়া জড়িয়ে ধরে, তরু থমকে যায়,

“কি করছেন ছাড়ুন,”

“আমি তোর তরু পুরোটাই তোর, আমাকে রেখে তুই যেতে পারবিনা।”

“দেখুন আমি ভীষণ রেগে যাচ্ছি, আমার পা ছেড়ে দিন।”

“আমি ছাড়তে পারবোনা তরু, আমি তোকে ছাড়তে পারবোনা। তোকে ভালো রাখার একটা সুযোগ দে তরু, একটা লাস্ট সুযোগ।”

“আহঃ আমার কোলে নীড় নৌশি আছে ওরা পড়ে যাবে। ছাড়ুন আমার পা,”

“এনি মিনি, তরুর কাছ থেকে ওদেরকে নিয়ে বাড়ির ভেতরে এসে বসো।”

এনি মিনি নীলাভের কথামতো পুনরায় বাড়ির ভেতরে এসে তরুর কোল থেকে নীড় আর নৌশিকে নিয়ে গেল।

“বেশিই বাড়াবাড়ি করছেন, এভাবে আমাকে আটকে রাখতে পারবেন না।”

“আমি তোকে আটকে রাখতে চাইনা তরু, আমি শুধু তোর পাশে থাকতে চাই। আমি আর কিচ্ছু চাইনা বিশ্বাস কর, আমি শুধু মাত্র তোকে পড়তে চাই। তোর নির্ঘুম রাতগুলোতে তোর মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে চাই। একজন সার্ভেন্ট হিসেবেও রাখতে পারিস আমাকে, তোর জীবনের একটা ডাস্টবিন হিসেবেও রাখতে পারিস আমাকে। তোর জীবনের সব খারাপ অপ্রয়োজনীয় জিনিসগুলো আমার দিকে ছুড়ে মারবি, আমি সেগুলো রিসাইকেল করে তোকে সুন্দর কিছু বানীয়ে দেবো। আমি তোর জীবন কাটাবিহীন ফুল দিয়ে সাজাতে চাই, আমি তোর মনের এমন একটা ডায়েরি হতে চাই যেই ডায়েরিতে তুই নিজের মনের সমস্ত কথা নির্ভয়ে নিঃসংকোচে লিখতে পারবি। আমি অবশ্য সেগুলো একবার লুকিয়ে পড়ে দেখবো তারপর সবচেয়ে নিরাপদ জায়গায় লুকিয়ে রাখবো। কাউকে বলবোনা প্রমিস, আমি তোর জীবনের সবচেয়ে সেইফ প্লেস হয়ে উঠবো, যেখানে এলে তুই শান্তিতে নিশ্বাস নিতে পারবি, নির্ভয়ে দুদন্ড বসতে পারবি। মনখুলে কাদতে পারবি। আমি কথা দিচ্ছি আমি তোকে হাসতে শেখাবো, কাদতেও শেখাবো। লাল রঙ বাদেও তোকে অন্য রঙের সৌন্দর্য উপভোগ করাবো। তুই আমাকে টিস্যু হিসেবেও ব্যবহার করতে পারবি তরু। আমি তোর প্রয়োজনে যেকোনো কিছু হতেই প্রস্তুত আছি। আমাকে শুধু একটা সুযোগ দে তরু, লাস্ট বারের মতো।”

নীলাভের কথাগুলো শুনে তরুর পাজোড়া অসাড় হয়ে এল। সে নিজেকে দূর্বল অনুভব করছে, প্রচন্ড দূর্বল অনুভব করছে।

“আ,,,আমি চাইনা আপনাকে,”

তরুর কন্ঠ কাপছে, তরু নিজেই অবাক হল।

“চাইতে হবেনা, আমি তোর। তুই না চাইলেও তোর, পৃথিবীর সবকিছু অন্যের অধীনে চলে গেলোও। আমি শুধু তোরই থাকবো।”

“আপনি আমাকে দূর্বল করার চেষ্টা করছেন,”

“আমি করছিনা তরু, আমি একটাও মিথ্যা বলিনি। আমি সত্যিই তোকে ছাড়া থাকতে পারবোনা। তোর আমাকে প্রয়োজন না হলে তুই আমাকে মে'রে ফেল।”

তরু নিজের চোখে পানির অস্তিত্ব টের পেল,

“লাস্ট বারের মতো বলছি ছাড়ুন আমাকে।”

“আমিও লাস্ট বারের মতো থেকে যেতে বলছি, আমি পারবোনা তোকে ছাড়া একমূহুর্ত বাচতে,”

তরুকে নেওয়ার জন্য লিজা, বিভান আর আভিক গাড়ি নিয়ে এসেছিল। তরুর দেরি হওয়ার কারণে তারা বাড়ির ভেতর ঢুকে পড়লো, কিন্তু এসে এই দৃশ্য দেখতে হবে তারা কল্পনাও করেনি। নীলাভ তরুর পা জড়িয়ে ধরে বসে আছে আর তরু তাকে ছাড়ানোর আপ্রাণ চেষ্টা করছে।

“তুই যদি একপা এই বাড়ির বাইরে রাখিস, আমি নিজেই নিজেকে শেষ করে ফেলবো।”

তরু চমকে তাকাল,

“আপনি আমাকে ব্ল্যাকমেইল করছেন?”

“বিশ্বাস না হলে পা রেখেই দেখ, ব্ল্যাকমেইল করছি কিনা।”

তরুর গলা শুকিয়ে এল,

“আপনি এরকম কিছু করবেন না। আপনি বলেছেন আমাকে আটকে রাখবেন না,”

নীলাভ তরুর পা ছেড়ে দিল,

“বেশ রাখলাম না, অবশ্য তোকে আটকে রাখার মতো শক্তি নেই আমার। আমি প্রচন্ড খারাপ একজন মানুষ, আমি তোর যোগ্য নই। কিন্তু তরু তুই চলে গেলে আমি কি করতে বেচে থাকবো বলতে পারিস? আমার তো মনে হয় আমাকে কষ্ট করে su!c!de ও করতে হবেনা, তুই চলে গেলে আমি এমনি ম…

নীলাভ নিজের কথাটুকু শেষ করার আগেই সবাইকে অবাক করে দিয়ে তরু এগিয়ে এসে নীলাভের গালে চড় বসিয়ে দিল। তরুর এরূপ কর্মকান্ডে বাড়ির প্রত্যেকটা মানুষ চমকে গেল, তরু নীলাভের গায়ে হাত তুলেছে কেউ বিশ্বাসই করতে পারছেনা। তরু একহাতে নীলাভের শার্টের কলার চেপে ধরে বলল,

“যদি ম'রে যাওয়া এতোটাই সহজ হতো, আমি আরও আগেই ম'রে যেতাম। পরপর দুবার বুকে গু'লি খেয়েও বেচে থাকতাম না, তোর থেকে দূরে থেকে এতোগুলো বছর কাটাতে পারতাম না। তোকে আয়ুকে হাগ করতে দেখে আই লাভ ইউ বলতে দেখেও আমি ম'রে গেলাম না কেনো? আমার কি ম'রে যাওয়া উচিৎ ছিলোনা বল? আমি এতো লড়াই করলাম কি তোর ম'রা মুখ দেখার জন্য? আমি জীবন্ত লাশ হয়ে বেচে আছি কি তোর মৃ*ত্যু দেখার জন্য? বলছিস না কেনো?”

নীলাভ কাদছে, তরু সহ্য করতে পারেনা। নীলাভের এই কান্না তরু সহ্য করতে পারেনা। তার ভীষণ রাগ উঠছে,

“ইউ আর আ লুজার, ইউ আর আ বিগ লুজার। আমি তোর জন্য এতো কিছু করলাম আর তুই বলছিস ম'রে যাবি? যা ম'রে যা, যা ম'রে যা। তোর কাছে আমার ভালোবাসার মূল্য কোনোদিনও ছিলোনা আজও নেই, যদি থাকতো এতো সহজে ম'রে যাওয়ার কথা উচ্চারণ করতে পারতিনা। ইউ আর আ লুজার, ইউ আর আ বিগ লুজার”

বলতে বলতেই তরু এলোপাথাড়ি নীলাভকে থাপ্পড় দিতে লাগল, নীলাভ চুপচাপ মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল। তরু নিজেও কান্না করছে সে আর পারছেনা এসব সহ্য করতে। এর বেশি সহ্য করা সম্ভব নয়। সে এখানে থাকলে ভেঙ্গে যাবে, একদম ভেঙ্গে যাবে, সে ভেঙ্গে যেতে চায়না। অনেক কষ্ট করে নিজেকে গড়েছে সে। ১২ বছর ধরে নিজেকে গড়েছে, সে ভেঙ্গে গেলে নিঃশেষ হয়ে যাবে। তরু নীলাভকে জোড়ে ধাক্কা দিয়ে উল্টো ঘুরে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায়। এনি, মিনিসহ বিভান, আভিক আর লিজাও তার পিছুপিছু চলে গেল।

,

খান ম্যানসনে পিনপতন নীরবতা, সবাই যেন নিজেদের জায়গাতেই জমে গেছে। নীলাভের পা দুটো অসাড় হয়ে এল৷ সে সেখানেই হাটু মুড়ে বসে পড়ে, নীলাভ একদৃষ্টিতে দরজার দিকে তাকিয়ে আছে, সবাইকে অবাক করে দিয়ে নীলাভ হাসতে লাগল,

“চলে গেছে, ও চলেই গেল। থাকলোনা আমার সাথে, থাকলোনা।”

সাবিনা নীলাভের দিকে এগিয়ে যেতে নিলে নীলাভ কেদে ওঠে,

“এসোনা, আমার কাছে এসোনা কেউ।”

নীলাভ উঠে দাড়ালো তারপর গটগট পায়ে নিজের রুমে গিয়ে দরজা লক করে দিল। বাড়ির সবাই প্রচন্ড ভয় পেয়ে গেল, সবাই নীলাভের দরজায় ধাক্কা দিতে লাগল, নীলাভ একপর্যায়ে বিরক্ত হয়ে বলল,

“বিরক্ত কোরোনা আমাকে। চিন্তা নেই আমি আ*ত্ম'হ*ত্যা করবোনা, তরুর ভালোবাসার মূল্য দিতে হবেনা? আমি ম'রে গেলে ওর লড়াই যে বিফলে চলে যাবে। যাও তোমরা নিজেদের কাজ করো গিয়ে,”

সাবিনা কাদছে নাজমুল শান্তনা দিয়ে বলল,

“ধৈর্য্য ধরো সাবিনা, সব ঠিক হয়ে যাবে।”

“কিচ্ছু ঠিক হবেনা গো, আমার ছেলেকে আমি চিনি ও ম'রে যাবে। আমি আমার ছেলেকে হারিয়ে ফেলবো।”

নাহিদ মাকে জড়িয়ে ধরল,

“শান্ত হও মা, আমাদেরকে পরিস্থিতি সামলাতে হবে এভাবে সবাই একসাথে ভেঙ্গে পড়লে কে কাকে সামলাবে বলোতো। জারা তো কাদতে কাদতে অজ্ঞানই হয়ে গেছে, আমি ওকে রুমে রেখে এসেছি। এরমাঝে তুমি যদি এরকম করো আমরা সবাই শেষ হয়ে যাবো মা।”

সাবিনা নাহিদের কথা বুঝতে পারল, সে নিজের চোখজোড়া মুছে নীলাভের উদ্দেশ্যে বলল,

“বাবা বোঝার চেষ্টা কর, তরু অভিমান করে চলে গেছে ঠিকই তবে ও ঘুরে ফিরে তোর কাছেই ফিরে আসবে দেখিস। ওকে একটু সময় দে, মেয়েটার দিকটাও ভেবে দেখ।”

“হুম মা আমি বুঝতে পেরেছি যাও তোমরা,”

এক এক করে সবাই চলে গেল। নীলাভ অনেকক্ষণ দরজার কাছেই বসে ছিল এখন রাত ১১ টা, সাবিনা অনেকবার নীলাভকে খেতে ডাকলেও নীলাভ বের হয়নি। উত্তরে বিরক্ত করতে নিষেধ করে দিয়েছে। নীলাভ আলমারি থেকে চাবিটা বের করে আর্ট রুমের সামনে এসে দাড়াল আজকে অনেক বছর পর সে এই রুমে যাবে। নীলাভ দরজা খুলে লাইট অন করতেই দেখল রুমটায় বেশি ধুলোবালি পড়েনি। তরুর যখন স্মৃতি ছিলো তখন হয়তো মাঝেমাঝেই আসতো এই রুমে। নীলাভ দেয়ালে টানানো তরুর পেইন্টিংটার দিকে তাকাল,

“তরু, আমার প্রাণপাখি। তুই নিজের জায়গা থেকে একচুলো সরলি না, এতোটাই অভিমান তোর আমার উপর? কলিজা আমার ফিরে আয়না। আমি আর সহ্য করতে পারছিনা, তুইও এতোটাই কষ্ট পেয়েছিলি তাইনা? তুই এর থেকেও বেশি কষ্ট পেয়েছিলি, কারণ আমি তোকে কখনো বিশ্বাস করিনি। তোর মুখের উপর বলে দিয়েছিলাম I hate you Torulota Ehsaan. তুই এতোকিছুর পরেও আমাকে ভালোবেসে গেলি? আমার মতো একটা লুজারকে ভালো না বাসলেই তো পারতি, তুই আবার আমাকে ভুলে যা তরুহ। আমি আর তোর সামনেও যাবোনা কখনো। কিন্তু জান তুই নিজেও তো কষ্ট পাচ্ছিস, আমি আজও তোকে কষ্টই দিয়ে গেলাম। আমার জন্য এখনো তুই কষ্ট পাচ্ছিস। তুই যদি আমাকে ছাড়া ভালো থাকতে পারতি আমি কোনোদিনও তোর সামনে যেতাম না, কিন্তু আমি তো জানি তুই আমাকে ছাড়া ভালো থাকতে পারবিনা।

নীলাভ সেখানেই বসে পড়ল, তার ভীষণ ক্লান্ত লাগছে, কাদতে কাদতে চোখ দুটোও ক্লান্ত হয়ে গেছে। এখন আর পানিও বের হচ্ছেনা, নীলাভ একটা শ্বাস ফেলে মেঝেতেই শুয়ে পড়ল।

“আমি আ*ত্ম'হ*ত্যা করবোনা, তবে সারভাইভ করতে পারবো কিনা জানিনা। তুই ঠিকই করেছিস তরু, আমার এভাবে কষ্ট পেতে পেতে ম'রে যাওয়া উচিৎ।”

রাত ১ টা,

তরু পুরো রুমে পায়চারী করছে আর চিল্লাচ্ছে,

“তোরা কি করেছিস, এক একটা অপদার্থ। আয়ু পালিয়ে গেলো কেমনে? আভিকের বাচ্চা,”

আভিক ভয়ে কাচুমাচু হয়ে দাড়াল,

“আমরা ওকে খোজার চেষ্টা করছি তো আলফা।”

“কোথায় খুজছিস ওকে?”

বিভান বলল, “পুরো বিডিতে ওকে খোজা হচ্ছে আলফা।”

“এক একটার মাথায় গোবর ঠাসা, এই তোদের কি মনে হয়? ও এখনো এই দেশে বসে আছে? ওকে লন্ডনে খোজ, পেয়ে যাবি।”

আভিক তরুর কথা শুনে চমকে তাকাল মেয়েটা সত্যিই অনেক বুদ্ধিমতী।

বিভান—“আচ্ছা আমি দেখছি তরু,”

“হুম যা এখান থেকে,”

লিজা—“তরু রাতে কি খাবি?”

“খাবোনা,”

“তরু তোর উপর নৌশি আর নীড় নির্ভরশীল, ওদের কথা ভেবে অন্তত খাবার স্কিপ করিসনা।”

তরু চুপ থেকে বলে উঠল,

“চাউমিন পাঠিয়ে দিতে বল।”

তরুর কথা শুনে ৩ জনই চলে গেল। তরু একটা শ্বাস ফেলে নৌশি আর নীড়ের দোলনার দিকে তাকাল, নীড় আর নৌশি কান্নাকাটি করে সবেমাত্র ঘুমিয়েছে ওরাও হয়তো বাবাকে মিস করছে, তরু মাথা ঝাকালো, কিন্তু সে জানে সে নীলাভের ভাবনা মাথা থেকে বের করতে পারবেনা। ছেলেটা শুরু থেকেই তার পুরো ভাবনাকে কন্ট্রোল করে রেখেছে। একজন সার্ভেন্ট খাবার দিয়ে গেলে তরু খেতে বসে কিন্তু খাবার মুখে দিতেই তার কান্না চলে আসে, তার ভীষণ মনে পড়ছে নীলাভের কথা,

“প্রেম আমার, তুমি আগে কেনো আমাকে বুঝলেনা? কেনো এতোটা দেরিতে বুঝলে, আমি আগে কেনো তোমকে বোঝাতে পারলাম না। আমি জানি তুমি অনেক কষ্ট পাচ্ছো, আগেও অনেক কষ্ট পেয়েছো। আমি কি করবো বলো? আমাদের ভাগ্যটা এরকম কেনো হলো?”

তরু চোখে পানি নিয়েই খাবার গুলো গিলছে,

“আমার তোমার কাছে ফিরে যেতে ইচ্ছা করছে, কি করবো? আমি সত্যিই অনেক নির্লজ্জ বেহায়া। তোমাকে ভালোবেসে আমার মাঝে আত্মসম্মান বলতে কিছুই অবশিষ্ট নেই।”

চলবে,

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৫৭তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন