#আমি_তরুলতা (৫৮)
#সোফিয়া_সাফা
কয়েকদিন পর,,,
কেটে গেছে বেশ কয়েকদিন, এরই মাঝে আয়ুকে খুজে পাওয়া গেছে। সেই সাথে জমশেদের দেশের বাইরের সমস্ত কুকীর্তি সম্পর্কেও জানা গেছে, তরু বাংকারে বসে আছে তার চারপাশে লিজা, বিভান, আভিক আছে। আর সামনেই সাফেদ, জমশেদ, জসিম আর আয়ুকে বেধে রাখা হয়েছে।
“কিরে আয়ু? তোর জীবনের আয়ু ফুরিয়ে এসেছে দেখছি। লন্ডনে গিয়েও শেষ রক্ষা হলোনা রে?”
“তুই আমাকে মা'রতে পারবিনা তরু,”
“মা'রবোনা তো, আমি কি তোকে মা'রতে পারি বল? তুই আমার লাভকে বাচিয়েছিলি না?”
আয়ু তরুর কথা শুনে চমকে তাকাল,
“আমি নীলাভকে বাচিয়েছিলাম?”
“হ্যাঁ ও একদিন পানিতে পড়ে গিয়েছিলো তুই-ই তো সবাইকে ডেকে এনেছিলি তাইনা?”
কথাটা শুনে আয়ু ঘামতে লাগল, সে ভাবতে পারছেনা শুধুমাত্র এই কারণে তরু তাকে এখনো বাচিয়ে রেখেছে। ইশ তরু যদি কোনো ভাবে সেদিনের আসল ঘটনাটা জানতে পারে তাহলে তরু নির্ঘাত তাকে পিসপিস করে কে'টে কুত্তাদের খাওয়াবে। আয়ু একটা ঢোক গিলে বলল,
“হ্যাঁ হ্যাঁ আমিই ওকে বাচিয়েছিলাম তরু, নইলে তোর লাভ সেদিনই শেষ হয়ে যেতো। আমাকে তুই ছেড়ে দে প্লিজ, আমি আবারও লন্ডনে চলে যাবো আর কক্ষনো এইমুখী হবোনা।”
জসিম বলে উঠল,
“ওকে ছাড়বেন না আপনারা, আমি যেদিন নেহাকে খু'ন করেছিলাম সেদিন ও আমাকে দেখেছিল তারপরও কাউকে কিছুই বলেনি। ও যদি সেদিন সব বলে দিতো তাহলে আজকে আমাকে এতো টর্চার সহ্য করতে হতোনা। প্লিজ আপনারা আমাকে মে'রে ফেলুন আমি আর এসব সহ্য করতে পারছিনা।”
লিজা বলল, “কিহ! আয়ু তুই দেখেছিলি সেদিন সবটা?”
তরু দায়সারা ভাবে বলল, “হাহ দেখবে সেটাই স্বাভাবিক, আমিও জানতাম যে ও দেখেছিল। ও সবকিছু দেখেও নীলাভকে ভুল বোঝানোর জন্য টেনে এনেছিল,”
বিভান বলল, “তুই এসব জানার পরেও ওকে কিচ্ছু বললি না?”
“আমি অকৃতজ্ঞ নই, ও আমার প্রেমকে বাচিয়েছিল। সেই হিসেবে ও আমাকে মে'রে ফেললেও আমি ওকে মা'রতে পারবোনা।”
আভিক বলল, “তরু কাম অন, এনজের সেদিন মৃ'ত্যু ছিলোনা, তাই ও বেচেছে। আয়ুর জন্য নয়,”
“তা জানি, তবুও উছিলা তো ওই ছিলো,”
আয়ু কান্নাজরিত কন্ঠে বলল, “আমাকে ছেড়ে দে তরু,”
“হোয়াট ডিড ইউ সে?”
বলেই তরু হাসতে লাগল, তরুর সেই ভয়ানক হাসি দেখে সামনের সবাই কেপে উঠল। এই হাসির মানে একটাই যে এই মুহূর্তে ভয়ানক কিছু ঘটতে চলেছে,
“আমি তোকে ছেড়ে দেবো? বোকা কোথাকার, এতোটাও ভালো বলে মনে করিস না।”
আভিক ভ্রু কুচকে তাকায়, “তুই ওকে ছাড়বিও না মা'রবিও না তাহলে কি করবি?”
“ওকে সেলে নিয়ে আটকে রাখ ২-৩ দিন পরপর একবার খাবার দিবি,”
কথাটা শুনে আয়ু চমকে তাকাল, “না প্লিজ না, আমাকে ছেড়ে দে তরু।”
“তোর কাছে দুটো অপশন আছে তুই নিজেই নিজেকে শ্যুট করবি, আর নয়তো সেলে যাবি। দ্রুত ডিসাইড কর,”
আয়ুর কাছে আর অপশন নেই, মনে মনে ভাবল,
“তরু যদি একবার জানতে পারে যে আমার জন্যই নীলাভ সেদিন পানিতে পড়ে গিয়েছিল তাহলে আমাকে জ্যান্ত আগুনে পুড়িয়ে মা'রবে। নইলে আরও ভয়ানক কিছু করবে, তার চাইতে আমি নিজেকেই নিজে শ্যুট করে দেবো সেটাই ভালো।”
“আমি নিজেকে নিজে শ্যুট করতে চাই। সেলে পচে ম'রার থেকে গু'লি খেয়ে ম'রাই ভালো,”
তরু ডান দিকে ঘাড় বাকিয়ে ডাক দিল, “নিকো নিকো, ওকে পাশের রুমে নিয়ে গিয়ে একটা গান দে। এখানে বসে ওর হাতে গান দেওয়া সেফ নয়।”
আয়ু চমকে তাকাল তরুর দিকে, তরু এতো বেশি বুদ্ধিমতী, এই জন্যই বোধহয় তারা সবাই মিলেও তরুর একটা চুলও ছিড়তে পারেনি। তরু সবসময়ই কুল ভাবে ভেবে চিন্তে কাজ করে, সামনে বসে থাকা লোকটার নেক্সট মুভমেন্ট সম্পর্কে আন্দাজ করার বিশেষ ক্ষমতা রয়েছে তরুর মাঝে। নিকোলাস আয়ুকে পাশের একটা রুমে নিয়ে গিয়ে তার হাতে একটা বন্দুক ধরিয়ে দেয়,
“এটায় একটাই গুলি আছে, যদি কোনোভাবে গুলিটা ওয়েস্ট করে ফেলিস তাহলে কিন্তু সেলেই পচে ম'রতে হবে। তাই গুলিটাকে ভালো ভাবে কাজে লাগা।”
নিকোলাস রুমটাকে লক করার আগেই আয়ু নিজের মাথায় নিজেই শ্যুট করে দেয়।
আভিক অবাক হয়ে গেল, “বাবাহ তরু তুই এসব কিভাবে করিস বলতো, তুই বলেছিস তুই ওকে মা'রবি না। কিন্তু ও ম'রেও গেল আর তুই নিজের কথাও রাখলি। ক্যায়া বাত ক্যায়া বাত,”
তরু একটা রহস্যময়ী হাসি দিয়ে উঠে দাড়াল,
জসিম কাতর গলায় বলল, “আপনারা যাবেন না প্লিজ আমাদেরকেও মে'রে ফেলুন।”
সাফেদ তাল মেলালো, “হ্যাঁ আমিও আর এসব সহ্য করতে পারছিনা মে'রে ফেলুন আমাদেরকে।”
তরু একবার সবার দিকে তাকাল, সাফেদ আর জসিমের অবস্থা খুবই শোচনীয়, তাদের ডান হাত কে'টে ফেলা হয়েছে। জমশেদের কিছুক্ষণ আগে হাতের আঙ্গুল কা'টা হয়েছে যার ফলস্বরূপ সে অজ্ঞান হয়ে গেছে।
তরু ঘাড় কাত করে বলল, “তোদের গোড়াটা যেদিন উপরে ফেলতে পারবো সেদিনই মু'ক্তি পাবি। তার আগে নয়,”
বলেই তরু বেরিয়ে গেল, তার পিছুপিছু বাকিরাও বেরিয়ে গেল,
***
আয়ুর মা সানা কেদেই যাচ্ছে, নীলাভ সোফায় বসে আছে, নীলাভের চেহারা দেখেই বোঝা যাচ্ছে তার শরীর ভালো নেই। আজ শুক্রবার হওয়াতে অফিস বন্ধ,
সানা বলল, “বাবা তুমি আমার মেয়েটাকে খুজে এনে দেও প্লিজ,”
সাবিনা বলল, “সানা আয়ু যে লন্ডন চলে গেছে সেটা আমাদেরকে তো কখনো বলিসনি, লন্ডনেই বা কবে গেলো ও?”
“যেদিন তরুর সত্যিটা সবার সামনে এলো সেদিনই আমার মেয়েটা লন্ডনে চলে গিয়েছিল। আমার মনে হচ্ছে তরুই আমার মেয়েকে আটকে রেখেছে,”
নাহিদ বিরক্তি মাখা কন্ঠে বলল, “তরু কিভাবে আটকে রেখেছে? আয়ু তো লন্ডনে আছে তাইনা? আপনারা সব সময় সব ব্যপারে তরুকে টেনে আনেন কেনো? গিয়ে দেখুন কোনো ছেলের সাথে ভেগে গেছে হয়তো।”
“বাবা ও ২দিন ধরে আমার ফোন তুলছেনা। কারো সাথে চলে গেলে আমার ফোনটা তুলতোনা বলো? ও তোমাদের খালাতো বোন সেই জন্য হলেও নীলাভকে বলোনা আমার মেয়েটাকে একটু খুজে বের করে দিতে…
সবাই নীলাভের দিকে তাকাল কিন্তু নীলাভ যেন কারো কোনো কথাই শুনছেনা। চুপ করে বসে আছে, সাবিনার অনেক খারাপ লাগলো নীলাভের চেহারা দেখে, ছেলেটা না ঠিকমতো খেতে পারছে আর নাতো ঘুমাতে পারছে, চোখের নিচেও কালো দাগ পড়ে গেছে। ছেলের এই অবস্থা দেখে একজন মা কি পারে সহ্য করতে? সাবিনাও কেদে উঠল মনেমনে বলল,
“আমার ছেলেটাকে বোধহয় বাচাতেই পারবোনা। হে আল্লাহ আমার ছেলের মৃ'ত্যু দেখানোর জন্য আমাকে বাচিয়ে রেখেছো?”
সানা বলল, “নীলাভ কিছু বলছোনা কেনো? বাবা কিছু অন্তত বলো, তুমি না পারলে অন্তত তোমার পরিচিত কাউকে বলো আমার মেয়েটাকে খুজে এনে দিতে,”
নীলাভ মুখে কিছু না বলে কাউকে কল দিতে যাবে তার আগেই জারা সেখানে এসে বলে ওঠে, “ভাইয়া আয়ু আপুকে নিয়ে আমার একটা অভিযোগ আছে, আমি চাই আপনি আগে সেটা শুনুন। তারপর আয়ুকে খুজে এনে যা করার করবেন।”
জারার কথা শুনে নীলাভ বাদে উপস্থিত সবাই অবাক চোখে জারার দিকে তাকায়,
নাহিদ বলে, “তোমার আবার কিসের অভিযোগ?”
জারা শ্বাস ফেলে বলল, “আয়ু মোট ৬ বার তরু আপুসহ আমাদের সবাইকে মে'রে ফেলতে চেয়েছে,”
জারার কথা শুনে নীলাভ এবার জারার দিকে তাকায়, জারা একটা ভিডিও প্লে করে সবাইকে দেখাল, যেখানে দেখা যাচ্ছে আয়ু চুপিচুপি কিচেনে এসে খাবারে কিছু মিলিয়ে দিয়ে চলে যাচ্ছে। নীলাভ এবার বসা থেকে উঠে দাড়াল, চোখ বড়বড় করে সানার দিকে তাকিয়ে বলল,
“আপনি কোনো চিন্তা করবেন না মিসেস সানা। আয়ুকে আমি পার্সোনালি খুঁজে বের করার চেষ্টা করবো।”
সানা চোখজোড়া মুছে বলল, “সত্যি বলছো বাবা? তুমি এতোকিছুর পরেও আমার মেয়েকে খুঁজে বের করবে?”
“হুম খুঁজে বের না করলে ওকে মা'রবো কি করে? মা'রতে হলেও তো আগে খুঁজে বের করতে হবে তাইনা?”
“ও তোমাদের সবাইকে মারতে চায়নি, শুধু তরুকেই মারতে চেয়েছিল কারণ আয়ু তোমাকে ভালোবাসতো বাবা ও তোমাকে তরুর সাথে মেনে নিতে পারেনি।”
জারা বলল, “হুম জানি তো আমাদের সবাইকে তো শুধু ৬ বার মে'রে ফেলতে চেয়েছিল আর আপুকে ৬০০ বার মে'রে ফেলতে চেয়েছিল। আপনি এটাই বলতে চাইছেন তাইনা আন্টি? আপনি ভাবতে পারছেন? নীড় আর নৌশি তখন আপুর পেটে ছিল, আপনি বলতে চাইছেন যে আয়ু আপু ভাইয়াকে ভালোবেসে তারই ছেলেমেয়েকে মে'রে ফেলতে চেয়েছিল তাইনা?”
নীলাভ সানার দিকে তেড়ে যেতে নেবে তার আগেই নাহিদ আর সাবিনা তাকে থামিয়ে দেয়,
নাহিদ বলল, “নীলাভ আমি দেখছি,”
নাহিদ সানার দিকে তাকিয়ে বলল,
“আন্টি আজকে থেকে আপনাদের সাথে আমরা আমাদের সমস্ত সম্পর্ক ছিন্ন করলাম, নাতো আপনি আমাদের মায়ের বোন হন আর নাতো আমরা আপনাদের কিছু হই, আপনি বেরিয়ে যান।”
সানা সাবিনার দিকে এগিয়ে যেতে নিলে সাবিনা বলে ওঠে,
“শুনতে পাসনি? বেরিয়ে যা আমার বাড়ি থেকে, তোর বোন মা'রা গেছে। কক্ষনো আর বোন বলে ডাকবিনা, ছিহঃ ভাবতেও লজ্জা করছে তুই আমার মায়ের পেটের বোন তো? জারাকে দেখে শেখ বোন কাকে বলে, নিজেকে আর কক্ষনো বোন বলে দাবি করিসনা। আমি ভাবতেই পারছিনা যেই বোনকে নিজের ভাগের টা খাইয়ে বড় করেছি সেই বোন আমার সংসারটাকে শেষ করে দিয়েছে, আমাদের আজকের এই পরিস্থিতির জন্য তুই আর তোর মেয়েই দায়ী। সেদিন যদি আয়ু নীলাভকে ডেকে নিয়ে ভুলভাল না বোঝাতো তাহলে আমার সংসার এভাবে শেষ হয়ে যেতোনা,”
সানা আর শুনতে পারলোনা, উল্টো দিকে ঘুরে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল। নীলাভ কাদছে, সাবিনাও কাদছে। জারা এসে সাবিনাকে শান্তনা দিতে লাগল,
“মা আমি স্যরি তবে আমাকে এটা বলতেই হতো আমি সবকিছু জেনেও চুপ করে থাকতাম কি করে বলুন? বাড়িতে আপু নেই এই সময় সানা আন্টির এই বাড়িতে থাকাটা আমার ভয় বাড়িয়ে দিচ্ছিলো। সে যদি আবারও আমাদের মা'রার চেষ্টা করে সেটা ভেবেই আমি সব বলে দিয়েছি।”
সাবিনা বলল, “না মা তুমি একদম ঠিক কাজ করেছো। সানার তোমাকে দেখে শেখা উচিৎ যে বোনের পাশে কিভাবে দাড়াতে হয়। কিভাবে বোনকে ভালোবাসতে হয়, তুমি শুধু একজন ভালো বোনই নও, তুমি একজন ভালো মেয়ে, বউ, মা আর সবশেষে একজন ভালো মানুষ। আমাদের প্রত্যেকের তোমাকে দেখে শেখা উচিৎ,”
জারা সাবিনাকে জড়িয়ে ধরল, সাবিনার মাঝে সে সত্যিকারের মাকে খুঁজে পায়, সাবিনা সবসময় তাকে আদর করে, প্রয়োজনে শাসনও করে। অন্যদিকে জহুরা তাকে বোঝেনা, সবসময় উল্টো পাল্টা বোঝাতে চায়। যদিও মায়ের মতো কেউ হতে পারেনা তবুও সাবিনা তার শাশুড়ী হিসেবে বেস্ট, তরুর সত্যিটা জানার আগেও সে জারার সাথে কখনো বাজে বিহেভ করেনি। যদিও তরুর শাশুড়ী হিসেবে সাবিনা খুবই বাজে ছিলো। নীলাভ তরুর কথা মনে করে কাদছে, মেয়েটা একা কতোগুলো দিক সামলেছে ভাবতেই তার কলিজা শুকিয়ে আসছে,
নাহিদ সান্ত্বনা দিয়ে বলল, “কাদিস না নীলাভ, এভাবে নিজেকে কষ্ট দিসনা। তরুও কিন্তু চায়না তুই কষ্ট পাস। শুধু ওকে একটু সময় দে,”
“আমি সময় দিচ্ছিতো ভাইয়া কিন্তু এতো এতো অনুশোচনা নিয়ে কিভাবে বাচবো? আমি যে তরুর যোগ্য নই এই সত্য কথাটা এতোটা ভারী কেনো ভাইয়া? আমি এর ভার সহ্য করতে পারছিনা। কথাটা সত্যি বলেই কি এতোটা তেতো স্বাদের? আমার নিজের উপরেই তিক্ততা জন্মাছে ভাইয়া, আমি অনুশোচনার সমুদ্রের অতল গভীরে হারিয়ে যাচ্ছি। আমি ব্যর্থ মানুষ ভাইয়া, আমি একজন প্রেমিক, স্বামী আর পরিশেষে বাবা হিসেবেও ব্যর্থ।
নাহিদ আর কি বলবে ভেবে পেলোনা। নীলাভ চোখ মুছে নিজের রুমে চলে গেল।
,
,
,
আরও কয়েকদিন কেটে গেল, সন্ধ্যা পেরিয়ে ধরনীর বুকে রাত নেমেছে। এহসান মঞ্জিলে আজকে শুধু জহুরা আর সাফোয়ানই আছে। তাজিম মাইশাকে নিয়ে মাইশার বাবার বাড়িতে গেছে। ইদানীং জহুরার ব্যাবহার অনেক অদ্ভুত লাগে সাফোয়ানের কাছে, এখন আর আগের মতো তরুকে নিয়েই পড়ে থাকেনা জহুরা,
“ইদানীং দেখছি তুমি কথাই বলোনা ব্যাপারটা কি?”
জহুরা তাজিমের বাচ্চার জন্য কাথা সেলাই করছিল। অবশ্য এসবের এখন আর চল নেই, শখ থেকেই করছে,
“আমি নিজেও জানিনা, তবে কথা বলতে ইচ্ছাই করেনা। জারা আমার সাথে কথা বলা একেবারে বন্ধ করেই দিয়েছে, আজকাল নিজেকে বড়ই একা একা লাগে। সবসময় মনে হয়, কোনো এক অদৃশ্য শক্তি বারবার আমার গলা চেপে ধরে। আমি বুঝতেই পারিনা যে এরকম টা কেনো হয়। আমি সেই ভয়েই আর কথা বলিনা,”
“শুনলাম আয়ু নামের মেয়েটা নাকি বেশ কয়েকবার খান ফ্যামিলির প্রত্যেককে মে'রে ফেলতে চেয়েছিল, তুমি তো তখন সেখানে ছিলে তুমি এই ব্যাপারে কিছু জানতে?”
সাফোয়ানের কথা শুনে জহুরা সেলাই করা থামিয়ে চোখ বড়বড় করে সাফোয়ানের দিকে তাকাল,
“কিহ! আয়ু ভালোনা সেটা জানতাম কিন্তু এতোটা খারাপ? একজন মানুষ আরেকজনকে কিভাবে জানে মে'রে ফেলতে চাইতে পারে? তাছাড়া ওর সাথে খান ফ্যামিলির অতো বড় কোনো শত্রুতাও তো ছিলোনা।”
“ও নেহার খু'নির সাথে হাত মিলিয়ে এরকম টা করেছিল।”
কথাটা শুনে জহুরা সব বুঝতে পারল,
“তুমি এই বিষয়ে সত্যিই জানতেনা?”
জহুরা ছলছল চোখে সাফোয়ানের দিকে তাকায়,
“আমি যদি বলি আমি এসব ব্যাপারে কিছুই জানতাম না তুমি আমাকে বিশ্বাস করবে?”
“নাও করতে পারি, আজকালকার যুগে প্রমাণ ছাড়া আবার কেউ কাউকে বিশ্বাস করেনা।”
জহুরার চোখ বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ল, সে বুঝতে পেরেছে সাফোয়ান তরুকে ইঙ্গিত করেই কথাটা বলেছে।
“তুমি আমার আপনজন, আমার মুখের কথাই বিশ্বাস করবে সেটা আমি জানি।”
“আচ্ছা জহুরা তুমি আমার তরু মায়ের আপনজন হওয়ার চেষ্টা কেনো করলেনা বলোতো? মা'হারা মেয়েটা মায়ের ভালোবাসা পাওয়ার জন্য কতোটা ছটফট করতো। তখন তুমি কেনো পারলেনা ওর মা হতে?”
“মা শুধু একজনই হয়, আমি চাইলেও কখনো তরুর মা হতে পারতাম না। তবে ভেবে দেখোতো আমি প্রথম থেকেই কি তরুর পর ছিলাম?”
সাফোয়ান ভেবে দেখল যে, সাফোয়ান বিয়ে করতে না চাইলেও তরুর কথা ভেবে বিয়ে করেছিল। প্রথম যেদিন জহুরা এই বাড়িতে বউ হয়ে এসেছিল সেদিন তরুর বয়স মাত্র ২ মাস ছিল, জহুরা প্রথম প্রথম তরু আর তাজিমকে খুব ভালোবাসতো কিন্তু তাজিম কিছুতেই জহুরাকে মেনে নিতে পারতোনা। একসময় বাধ্য হয়েই সাফোয়ান তাজিমকে বিদেশে থাকা তার এক খালাতো বোনের কাছে পাঠিয়ে দিল। সমস্যা শুরু হয় তখন যখন জহুরা নিজে মা হয়, অবশ্য জারাকে জন্ম দেওয়ার কোনো প্ল্যানই সাফোয়ানের ছিলোনা। জারা ছিলো অনাকাঙ্ক্ষিত, জারা হবার পর থেকেই জহুরা তরুর থেকে দূরে সরে যায়। তরু প্রথম থেকেই একদম শান্তশিষ্ট ছিল অল্পতেই কেদে ফেলতো, জহুরার ছোটো ছোটো অবহেলা গুলোও সে সহ্য করতে পারতোনা। তরু জহুরাকেই প্রথম মা বলে ডেকেছিল কিন্তু জহুরা সেই ডাকটা ধরে রাখতে পারেনি, সে তরুর মা হতে পারেনি। আস্তে আস্তে অকারণেই তরুকে তার বিরক্ত লাগতো, সে না চাইতেও তরুর সাথে খারাপ বিহেভ করে ফেলতো। এভাবেই একসময় পর তরু তার চোখের কাটা হয়ে যায়, তরুর প্রতি সাফোয়ানের ভালোবাসাটাও জহুরার কাছে ভালো লাগতোনা, মনে হতো সাফোয়ান শুধু তরুকেই ভালোবাসে, খাবার খেতে বসলে তরুকেই ডাকতো, একটা কিছু আনলে শুধু তরুর জন্যই আনতো। সে ভাবতো জারা অনাকাঙ্ক্ষিত ছিলো বলে সাফোয়ান জারাকে দেখতেই পারেনা। জহুরা সাফোয়ানের সাথে বিয়ে হবার আগে অবিবাহিতা ছিল। একজন অবিবাহিতা মেয়ে স্বামীর ঘরে আসার পর স্বামীর প্রথম ঘরের ছেলেমেয়েকে মেনে নেওয়াটা কতোটা কষ্টকর ছিলো সেটা সে হারেহারে টের পেয়েছে। জহুরা বিয়ের আগে জানতো পর্যন্ত না যে সাফোয়ানের ছেলেমেয়ে আছে। সবমিলিয়ে তার পরিস্থিতি খারাপ হতে শুরু করে সে তরুকে মেনে নিতে চাইলেও মেনে নিতে পারেনি।
পুরোনো কথা ভাবতেই সাফোয়ান একটা শ্বাস ফেলল। তার উচিৎ ছিলো জারাকেও তরুর মতো ভালোবাসা। কিন্তু সে আসলে তরুর মা ছিলোনা বলে তাকে একটু বেশিই ভালোবাসতো এটা সত্যি ছিল। হয়তো তরু আর জহুরার মাঝেকার সম্পর্ক খারাপ হওয়ার পেছনে সেও দায়ী ছিল। তাইতো সে পুরোপুরি ভাবে কখনোই জহুরাকে দোষ দিতে পারেনি।
জহুরা বলে উঠল, “সবকিছু ঠিক হয়ে গেলে আমি তরুর কাছে গিয়ে ক্ষমা চেয়ে নেবো। নইলে সেই অদৃশ্য শক্তিটা আমাকে শ্বাসরোধ করে মে'রে ফেলবে।”
জহুরার চোখে পানি, “আমি জানোতো কখনো তরুর জায়গায় নিজেকে রেখে ভাবিনি, যদি ভাবতাম তাহলে মা'হারা মেয়েটার সাথে কোনো প্রকার পরিস্থিতিতেই বাজে বিহেভ করতাম না। আচ্ছা সাফোয়ান তরুর কাছে ক্ষমা চাইলে ও আমাকে ক্ষমা করে দেবেতো?”
সাফোয়ান কান্নার মাঝেও হেসে উঠলেন,
“ও নিশ্চয়ই দেবে জহুরা। তরুর মনটা খুব নরম, উপরে উপরে নিজেকে যতই শক্ত দেখাক না কেনো আমি জানি ও আমাদেরকে ক্ষমা করে দেবে,”
,
,
,
বেশ কিছুদিন পর,,,
“নীলাভ কোথায়?”
লিজা নীলাভের লোকেশন দেখে বলল,
“এনজে এখন অফিসে আছে তরু,”
“ভালো। বিভানের কি অবস্থা?”
বিভান হাসিমুখে বলল,
“আজকে বহুদিন পর মোমোর সাথে কথা বললাম। পাগলি মেয়েটা আমাকে দেখেই কান্নাকাটি করল, বাবাকে পাঠিয়ে দিয়েছি ওর বাবার কাছে, বিয়ের দিন তারিখ ঠিক করেই আসবে।”
আভিক গলা পরিষ্কার করে বলল,
“তুই আরেকটা বিয়ের দাওয়াত পেতে চলেছিস তরু,”
তরু কথাটা শুনে স্বাভাবিক স্বরেই বলল,
“একটা কেনো ২টো পাবো।”
বিভান অবাক হয়ে গেল, “কি বলছিস, আবার কার বিয়ে?”
“কার আবার আভিক আর লিজার বিয়ে, সেই হিসেবে আমরা তো দুদিক থেকেই দাওয়াত পাবো তাইনা?”
তরুর কথাটা শুনে সবচাইতে বেশি অবাক হল বিভান, আভিক আর লিজা তো মুখটা ছোটো করে তরুর দিকে তাকাল।
আভিক বলল, “এটা আনফেয়ার তরু, তুই এটাও জানতি? কাম অন, এটা একটা সারপ্রাইজ ছিলো। তোর চমকে যাওয়া উচিৎ ছিলো,”
“আমি তো আগে থেকেই জানতাম চমকে যাবো কেনো?”
বিভান বলল, “তোরা এসব কি বলছিস? আমি কিছুই বুঝতে পারছিনা। আভিক আর লিজার বিয়ে হবে? মানে সিরিয়াসলি?”
তরু উত্তরে বলল, “হুম তুই নিজের চোখ পকেটে নিয়ে ঘুরিস নাকি? ওরা যে শুরু থেকেই লাইন মা'রছে বুঝতে পারলি না গাধা একটা।”
আভিক বলল, “ও গাধা নয় তরু, তুই একটু বেশিই বুদ্ধিমতী। ওর না জানাটাই স্বাভাবিক, কারণ আমিই মাত্র ২ দিন আগে লিজাকে প্রপোজ করেছি।”
“২ দিন আগে করলেও তুই যে প্রথম দেখাতেই ওকে ভালোবেসে ফেলেছিলি সেটা আমি বুঝতে পেরেছিলাম। আর লিজাও তোকে শুরু থেকেই ভালোবাসতো তোরা যে একে অপরকে লাইন মারতি সেটা তো পরিষ্কারই ছিলো। প্রপোজ ২দিন আগে কেনো করলি সেটাই বুঝতে পারছিনা। তোরা অনেক স্লো রে,”
আভিক খানিকটা রেগে গেল, “হ আমরা স্লো হয়েছি ভালো করেছি, তুই তো অনেক ফাষ্ট। বয়সে আমাদের ছোটো হয়েও একদম বিয়ে শাদি করে দু দুটো বাচ্চার মা হয়ে বসে আছিস।”
তরু হাই তুলে বলল, “তোরা জীবনযুদ্ধে পিছিয়ে গেছিস, আমার মনে হয় তোদের বিয়ের আগে আমি শাশুড়ীও হয়ে যাবো।”
কথাটা শুনে ৩ জনই চোখ বড়বড় করে তরুর দিকে তাকায়,
“এভাবে তাকিয়ে আছিস কেনো? যদি সেটা না চাস তারাতাড়ি বিয়ে করে বাচ্চা ডাউনলোড কর। কে বলতে পারে তোদের মধ্যে কারো মেয়ে হলে ভাগ্যক্রমে আমি আমার ছেলের জন্য আনতেও পারি।”
বিভান চমকে গেল, “রিয়েলি? আমি এক্ষুনি যাচ্ছি দাড়া,”
আভিক বাধা দিয়ে বলল, “তুই যাবি কেনো? লিজা চল আমরা আগে যাবো, ওর আগে আমি মেয়ের বাবা হবো। নীড় বাবার সাথে আমার মেয়েরই বিয়ে হবে।”
বিভান মুখ বাকিয়ে বলল, “হ, স্বপ্নে হবে তোর, যে প্রপোজ করতেই ৫ বছর লাগিয়ে দিয়েছে সে নাকি আমার আগে মেয়ের বাবা হবে। হুহ শখ কতো, আমাকে দেখে শেখ আমি তোর থেকে চালু আছি, আমিই আগে মেয়ের বাবা হবো আর নীড় বাবার শ্বশুরও আমিই হবো।”
আভিক শার্টের হাতা গোটাতে গোটাতে বলল, “আচ্ছা দেখা যাক,”
ওদের ঝগড়া দেখে লিজা নিজের হাসি চেপে রাখতে পারলোনা।
,
,
,
চলবে,