ফন্ট সাইজ:
থিম:
আমি তরুলতা

৬১তম পর্ব

লেখক: সোফিয়া সাফা

#আমি_তরুলতা (৬১)

#সোফিয়া_সাফা

কিছুক্ষণ পর তরু খাবার নিয়ে নীলাভের সামনে এসে বসল, নীলাভ তখন ফোনে কারো সাথে কথা বলছিল।

“এয়ারপোর্টে সার্চ করে দেখো, আমার তো মনে হয়না যে ও বিডিতে ফিরে এসেছে।”

নীলাভ আরও কিছুক্ষণ কথা বলে ফোন রেখে দেয়, তরু জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে নীলাভের দিকে তাকিয়ে আছে,

“কে ছিলো?”

নীলাভ উঠে বসে বলে,

“তরু তুই আমাকে আয়ুর ব্যাপারে বলিসনি কেনো? এটলিস্ট আমি তখন ওর ব্যাপারে জানলে ওকে বাড়িতে রাখতাম না।”

“সেই জন্যই বলিনি,”

“মানে?”

“তার আগে বলো তুমি আয়ুকে খুজছো কেন?”

“কেনো আবার ওকে মে'রে ফেলবো সেই জন্যই খুজছি। এক বার পাই ওকে,”

“খুজতে হবেনা বাদ দেও ওর কথা।”

“তরু তোর কি মনে হয় আমি ওকে ছেড়ে দেবো? কক্ষনো না, আমার তো মনে হচ্ছে ওর জসিমের সাথেও হাত ছিল। কারণ সেদিন গেট টুগেদারে আয়ু আর জসিমকে আমি একসাথে দেখেছি, হয়তো ওরাই ওকে দিয়ে আমাদেরকে মা'রতে চেয়েছিল কিন্তু আমি বুঝতে পারছিনা এতো বছর আমাদেরকে মা'রার চেষ্টা না করে তুই আসার পরেই কেনো করলো?”

“জসিমের বাবা জমশেদের সাথে ত্রানা চৌধুরীর পার্সোনাল শত্রুতা ছিল সেই জন্যই আমি আসার পর ওরা আমার সাথে সাথে তোমাদেরকেও মে'রে ফেলতে চেয়েছে। কারণ আমি ত্রানা চৌধুরী রূপে ছিলাম,”

“কিসের শত্রুতা?”

“সেটা তোমার না জানলেও চলবে,”

“তরু, তুই ভালো করেই জানিস আমাকে তুই সবকিছুই বলতে পারিস। আমি তোর পর কেউ নই, উল্টো আমিই তোর সবচাইতে আপন।”

“আমি জানি, কিন্তু সেসব জানার তোমার প্রয়োজন নেই।”

নীলাভ একটা শ্বাস ছাড়ল,

“তুই জসিমকে শাস্তি দিয়েছিস তো?”

তরু ভ্রু কুচকে নীলাভের দিকে তাকাল,

“আমি বলতে চাইছি, ও আমার আপুকে খু'ন করেছিল। ওদের তো শাস্তি পাওয়া উচিৎ তাইনা? আচ্ছা জসিম, জমশেদ আর সাফেদের জন্য কোনো মিসিং কেস করা হলোনা কেনো? আর ওদের নিখোঁজ হওয়ার বিষয়টাও মিডিয়ার কেউই জানলোনা কেনো, ওরা কোথায় আছে তরু?”

“আমি সেসব বলতে পারবোনা, আমি অতো কিছু জানিও না আমিতো উলফ স্কোয়াডের একজন গ্যাংস্টার মাত্র এর বেশি কিছুই নই। আর তুমি চিন্তা কোরোনা ওদেরকে মে'রে ফেলা হয়েছে, আশা করি তোমার আর কোনো প্রশ্ন নেই।”

নীলাভ অবাক চোখে তরুর দিকে তাকাল, তরু একজন গ্যাংস্টার? উলফ স্কোয়াডের হয়ে কাজ করে?

“এতোবড় একটা গ্যাং কিভাবে আইনের চোখের আড়ালে আছে?”

“বিকজ এটা আইনের উপরে, এটা পুরো আইনকেই কন্ট্রোল করে। আমি তোমাকে এতোকিছু এই জন্যই বলছি কারণ আমি চাই তুমি যেন এসব নিয়ে বেশি ঘাটাঘাটি না করো। জসিমকে খোঁজার চেষ্টা না করো, আর এই গ্যাং সম্পর্কেও তদারকি না করো।”

“আচ্ছা সেসব আমি করবোনা। আমি জানি তুই জসিমকে প্রাপ্য শা'স্তিটা দিয়েছিস, তবে আমি আয়ুকে খুঁজে বের করবোই। ওকে না মা'রা পর্যন্ত আমার শান্তি হবেনা।”

“ও তোমাকে বাচিয়েছিল নীলাভ, তুমি ওকে মা'রতে চাইতে পারোনা।”

নীলাভ ভ্রু কুচকে তরুর দিকে তাকায়,

“সেদিন ও না থাকলে তুমি পানিতে ডুবে যেতে।”

“ও আমাকে বাচায়নি তরু উল্টো ওর জন্যই আমি পানিতে পড়ে গিয়েছিলাম।”

“কিহ?”

“হুম সেদিন আমি পুকুর পাড়ে বসে একটা পেইন্টিং করছিলাম। হঠাৎ আয়ু সেখানে আসলো আর আমার সাথে কথা বলতে লাগল, আমি ওর দিকে না তাকিয়ে পেইন্টিকে মনোযোগ দিচ্ছিলাম। পেইন্টিং টা কমপ্লিট হলে ও পেইন্টিং টা দেখার জন্য নিয়ে ইচ্ছা করেই পানিতে ফেলে দিয়েছিল। যদিও ও অভিনয় করে বলেছিল যে ওর হাত ফসকেই নাকি পড়ে গেছে, পেইন্টিং টা আমি অনেক পরিশ্রম করে এঁকেছিলাম আর সেটা পুকুরের একদম সাইডেই পরেছিল। যার জন্য আমি তড়িঘড়ি করে উঠাতে গিয়ে নিজেও পানিতে পড়ে যাই। আমাকে পড়ে যেতে দেখে আয়ু ভয় পেয়ে চলেই যেতে নিয়েছিল কিন্তু ও সামনে তাকিয়ে ভাইয়াকে আসতে দেখতে পায়, আর ভাইয়া ওর ভীত চেহারা দেখে ওকে জিজ্ঞেস করতেই ও ভয় পেয়ে বলে দেয় যে আমি পানিতে পড়ে গেছি। যেটা শুনে ভাইয়া বাবাকে ডেকে আনে, আর তারপর ভাইয়া আর বাবা মিলেই আমাকে পানি থেকে তোলে।”

“শিট এসব তুমি আমাকে সেদিন বলোনি কেনো?”

“সেদিন আমি বলতে চেয়েও ফিরিয়ে নিয়েছি, কারণ তুই তখন রেগে ছিলি। আর তুই বলেছিলি আয়ু আমাকে সেদিন বাচিয়েছিল বলেই নাকি তুই আমাকে আর আয়ুকে একসাথে দেখেও আয়ুকে কিছুই বলিসনি, তো আমি ভেবেছিলাম আমি সত্যিটা বললে তুই ওকে কিছু না বলার কারণে আফসোস করবি।”

“আমি সত্যিই আফসোস করছি ও সবচেয়ে করুণ মৃত্যুর প্রাপ্য ছিল।”

“মানে?”

“মানে ও বেচে নেই,”

নীলাভ স্বাভাবিক স্বরেই বলে,

“মে'রে ফেলেছিস?”

“নাহ ও আ*ত্ম'হ*ত্যা করেছে।”

“আচ্ছা তোকে কে বলেছিল যে আয়ু সবাইকে ডেকে এনেছিল?”

“সেদিন তুমি পানিতে পড়ে গিয়েছিলে শোনার পর আমি তোমাকে দেখতে তোমাদের বাড়িতে গিয়েছিলাম। তখন ড্রইংরুমে বসে মিসেস সানা শাশুড়ীজী কে বলছিল যে আয়ু না থাকলে নাকি তোমাকে বাচানোই যেতোনা, ওই নাকি সবাইকে ডেকে এনে তোমাকে বাচিয়েছে, এসব শুনে শাশুড়ীজী তো তাকে অনেক ধন্যবাদ দিচ্ছিলেন।”

“ওহ এই ব্যাপার,”

“যাক বাদ দেও খাবার খেয়ে ওষুধ খেয়ে নেও।”

খাওয়া দাওয়ার শেষে তরু ফার্স্ট এইড বক্স এনে নীলাভের সামনে বসে,

“দেখি হাতটা দেও,”

নীলাভ বিনাবাক্যে প্রথমে বাম হাতটা এগিয়ে দিল, তরু পুরনো ব্যান্ডেজ খুলে রক্ত পরিষ্কার করতে লাগল। নীলাভ লক্ষ্য করলো তরুর হাত কাপছে,

“গ্যাংস্টার তরুলতা এহসান যার প্রিয় রঙ লাল, যে কিনা ব্লাড লাইক করে, তো ব্লাড দেখে তার হাত কাপছে কেন?”

নীলাভের কথা শুনে তরু সরাসরি নীলাভের চোখের দিকে তাকায়, নীলাভ তরুর চোখ দেখে থমকে যায়। তরুর চোখ লাল হয়ে গেছে,

“ক কি হয়েছে তোর?”

“তোমাকে মে'রে ফেলতে ইচ্ছা করছে কিন্তু পারছিনা।”

নীলাভ হেসে উঠল, নীলাভের হাসি দেখে তরুর রাগ আরও বেড়ে গেল।

“হেসোনা, আমি সিরিয়াসলি বলেছি। আচ্ছা পুনর্জন্ম বলতে কিছু নেই তাইনা?”

“নো,”

“এই জন্য, শুধুমাত্র এই জন্যই মা'রতে পারছিনা তোমাকে। নইলে এই জন্মে তোমাকে মে'রে নিজেও ম'রে যেতাম। তারপর পরের জন্মে দুজনে একটা সুস্থ স্বাভাবিক লাইফ লিড করতাম।”

“তুই এভাবে কেনো বলছিস? আমি তো ভাবলাম তুই এটা লাইক করবি,”

“স্যরি বাট আই ডিড'ন্ট লাইক ইট,”

“রিয়েলি? তাহলে তুই নিজেই এই হাতে লিখে দে,”

নীলাভের কথা শুনে তরু অন্যদিকে তাকায় তখনই তার চোখ থেকে ২ ফোটা পানি গড়িয়ে পড়ে, তরু নীলাভের অগোচরে মুছতে চাইলে নীলাভ তরুর হাত ধরে ফেলে, তরুর মুখটা সামনে এনে বলে,

“কাদছিস কেনো? তোর সত্যিই পছন্দ হয়নি?”

তরু মাথা নাড়িয়ে না বলে, “আমার কাছে কোনো সুপার পাওয়ার থাকলে আমি অতীতে গিয়ে এটা যেভাবেই হোক আটকাতাম। নইলে এই দাগগুলো ভ্যানিস করে দিতাম,”

“নো, এগুলো ভালো লাগছে আমার। আমি এরকমটা করে স্যাটিসফাইড হয়েছি, আমার মনে হচ্ছে এগুলো আমার আরো আগেই করা উ,,,

নীলাভ আর কিছু বলার আগেই তরু নীলাভের গালে চড় বসিয়ে দিল, নীলাভ বিন্দুমাত্র চমকালো না। সত্যি বলতে তরুর থাপ্পড় খেতেও তার অদ্ভুতভাবে ভালো লাগছে, নীলাভকে হাসতে দেখে তরুর গা জ্বলে যাচ্ছে,

“আর একবার আজেবাজে কথা বললে গলা চে'পে মে'রে ফেলব।”

“আমি গ্যারান্টি দিচ্ছি তুই আমাকে সকাল বিকাল থাপ্পড় দিলেও আমি এরকম কিছুই করবোনা। শুধুমাত্র আমার সাথে থাক, তুই আমার থেকে দূরে গেলেই এরকমটা হবে।”

“ব্ল্যাকমেইল করছো?”

“আমি সাদা বা কালোবার্তা বুঝিনা তবে এটা সতর্কবার্তা।”

তরু একটা চাপা শ্বাস ফেলল,

“তুমি কিন্তু আস্তে আস্তে অনেক বেশিই বেহায়া আর নির্লজ্জ হয়ে যাচ্ছো। আমি বয়সে তোমার ছোটো হয়েও তোমাকে থাপ্পড়াচ্ছি আর তুমি আমাকে শাসন না করে উল্টো আশকারা দিচ্ছো।”

“কি করবো বল তোর থাপ্পড় খেতেও ভালো লাগে।”

“হুদাই ফ্লার্ট কোরোনা তো।”

“এসব ফ্লার্ট নয়, এসব ভালোবাসা। আর যে যাকে যতো বেশি ভালোবাসে সে তার সামনে ততো বেশিই নির্লজ্জ আর বেহায়া হয়ে যায়।”

কথার মাঝেই নীলাভের ফোন বেজে ওঠে, নীলাভ কলটা রিসিভ করে কানের কাছে ধরে,

“হ্যালো বাবা কোথায় তুই? এভাবে কাউকে কিছু না বলে কোথায় চলে গিয়েছিস?”

“শান্ত হও মা, আমি তরুর সাথে আছি। চিন্তা কোরোনা,”

নীলাভ কল কেটে দিয়ে তরুর দিকে তাকায়, তরু নীলাভের হাতে ব্যান্ডেজ করে দিয়েছে।

“তরু বাড়িতে কখন যাবি?”

তরু কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলে ওঠে,

“আমি যাবোনা নীলাভ, তোমার যখন ইচ্ছা হবে তুমি এসো। বাট আমি যাবোনা,”

কথাটা শুনে নীলাভ অবাক চোখে তাকিয়ে রইল, সে তরুর হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে বলল,

“কেনো যাবিনা তরু? তুই আমাদেরকে কি কখনোই ক্ষমা করতে পারবিনা?”

“আমি ক্ষমা করে দিয়েছি, কিন্তু ক্ষমা করে দিলেই যে যেতে হবে তেমন তো কোনো কথা নেই।”

“তরু ওটা তোরও বাড়ি,”

“হুম, আমার বাড়ি হলে আমাকে যেতে বলতে হবেনা নীলাভ। আমি নিজে থেকেই তো যাবো,”

নীলাভ বুঝতে পারল যে তরুকে বলে খুব একটা লাভ হবেনা। শুরু থেকেই তরু যা যা বলে এসেছে সে তাই তাই করেছে। নিজের কথা থেকে একচুলোও সরেনি,

“বেশ তাহলে আমিও যাবোনা, তুই যেখানে থাকবি বাচ্চারা যেখানে থাকবে আমিও সেখানেই থাকবো।”

তরু চমকে নীলাভের দিকে তাকাল,

“পাগলের মতো কথা বলোনা, আমি চাইনা শাশুড়ীজী সহ ওই বাড়ির লোকেরা আমাকে নিয়ে উল্টো পাল্টা ভাবুক।”

“এখানে উল্টো পাল্টা ভাবার কি আছে?”

“আছে, তুমি ওই বাড়ির ছেলে। তোমার ওই বাড়িতেই থাকা উচিৎ, নইলে সবাই ভাববে আমি তোমাকে তাদের থেকে আলাদা করে ফেলতে চাইছি।”

“তো ভাবুক, আমার বাবারাও তো ৩ ভাই। তারা কি সবাই একসাথে আছে? নেইতো তাইনা? আমাদেরও আলাদা হয়ে যাওয়া উচিৎ,”

তরু বসা থেকে উঠে দাড়াল,

“আজেবাজে কথা বলবেনা, তোমার বাবা মা এখনো জীবিত আছেন। অন্তত তারা থাকাকালীন তোমাদের আলাদা হওয়া উচিৎ নয়। আর আমার মনে হয়না ভবিষ্যতেও তোমাদের আলাদা হওয়ার প্রয়োজন পড়বে।”

“তুই যা চাইবি তাই হবে, বর্তমানেও আর ভবিষ্যতেও।”

“বেশি বউ ভক্ত হওয়া ভালো লক্ষ্মণ নয়, আমি কখনোই এসব চাইনা।”

“আমি যা বলি তাতেই দোষ হয়ে যায়, দেখ তরু আমার সোজাসাপ্টা কথা তুই যেখানে থাকবি আমিও সেখানেই থাকবো। আমি তোকে ছাড়া থাকতে পারবোনা, অনেক থেকেছি।”

“তুমি বাড়িতে চলে যাও, পরে আবার এসো।”

“না, আমি আজকে অফিসেও যাবোনা।”

তরু উপায়ন্তর না পেয়ে রুম থেকে বেরিয়ে যেতে নেয় তার আগে নীলাভের উদ্দেশ্যে বলে,

“এখন রেস্ট নেও, শরীর ভালো নেই তোমার। কিন্তু বিকেলে বাড়িতে যাচ্ছো,”

“তুইও যাবি?”

“আর কি করার আছে, আমি ওসব বউদের মতো হতে পারবোনা যারা বাড়িতে যাওয়ার পর সংসার ভাগ হয়ে যায়।”

কথাটা বলেই তরু খাবারের প্লেট গুলো নিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে যায়। নীলাভের তো এখনো বিশ্বাসই হচ্ছেনা যে তরু খান ম্যানসনে ফিরতে রাজি হয়ে গেছে, নীলাভ তো অনেক খুশি হয়েছে। সে তো তরুকে ছেড়ে এই জন্য যেতে চাইছিল না কারণ তার ভয় হচ্ছিল, তরু যদি আবারও হারিয়ে যায়। অনেক সাধনার পর সে তরুর দেখা পেয়েছে, কিভাবে তাকে রেখে চলে যেতো সে?

বিকেল বেলা, তরু নীলাভকে নিয়ে খান ম্যানসনের সামনে এসে নামল। তাদের সাথে নীড়, নৌশি আর এনিমিনিও আছে,

“শিট, এই প্রথম এমনটা হলো যে আমি যা বলেছি আমি সেটা করতে পারিনি। বলেছিলাম আর কক্ষনো এই বাড়িতে আসবোনা,”

“তরুউ কি ভাবছিস?”

তরু না বোধক মাথা নেড়ে কলিংবেল প্রেস করল। কয়েক সেকেন্ড বিলম্ব করে হানা এসে দরজা খুলে দিল, হানা তো তরুকে দেখে প্রচন্ড খুশি হয়ে গেল, সে এক ছুটে বাড়ির সবাইকে ডেকে আনতে গেল। তরু ভ্রু কুচকে নীলাভের দিকে তাকাল,

“আমি আসবো সেটা কাউকে বলোনি?”

“না, আমি সবাইকে সারপ্রাইজ দিতে চেয়েছিলাম”

“আমাকে দেখে সারপ্রাইজ হওয়ার মতো কি আছে?”

“দেখতেই পারবি, শুধু দোয়া কর যেনো তোকে দেখে খুশির ঠেলায় কেউ হার্ট অ্যাটাক করে না ফেলে।”

“আমাকে দেখে সবাই খুশি হবে? নাকি শুধু নীড় আর নৌশিকে দেখে, কোনটা?”

নীলাভ অবাক চোখে তরুর দিকে তাকাল,

“তোর জন্যও আর নীড় নৌশির জন্যেও,”

হলোও তাই বাড়ির সবাই তরুকে দেখে ভীষণ খুশি হয়েছে, সবাই বলতে বাড়িতে এই সময়ে শুধু জারা সাবিনা আর হানাই আছে নাহিদ আর নাজমুল অফিসে আছে। জারা তো তরুকে জড়িয়ে ধরে কেদেই দিয়েছে।

“আপু আমি স্বপ্ন দেখছিনা তো, তুমি সত্যিই এসেছো?”

তরুর হাসি না আসলেও সে হাসার চেষ্টা করে বলল,

“বিশ্বাস করানোর জন্য চিমটি কাটবো?”

“হ্যাঁ আপুই,”

জারা বলার সাথে সাথেই তরু জারাের হাতে চিমটি কাটল, জারা ব্যাথা পেয়ে তরুকে ছেড়ে দাড়াল।

“ব্যাথা পেয়েও ভালো লাগছে,”

তরু সামনে তাকিয়ে দেখল, সাবিনাও কান্না করছেন। হয়তো সেও তরুকে জড়িয়ে ধরতে চাইছে কিন্তু পারছেনা। তরু কিছু না বলেই দাঁড়িয়ে রইল,

“মা নীড় আর নৌশিকে দেখবেনা?”

সাবিনা মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল, নীলাভ আর কিছুই বলল না। তরু ব্যাপারটা বুঝতে পেরে এনিমিনি কে ডাক দিল,

“এনিমিনি যাও ওদেরকে শাশুড়ীর কাছে নিয়ে যাও।”

তরুর কথামতো এনিমিনি নীড় আর নৌশিকে সাবিনার কাছে নিয়ে গেল। সাবিনা কান্নাভরা চোখে একবার তরুর দিকে তাকিয়ে দেখে তরুও তার দিকেই তাকিয়ে আছে, সাবিনা এক এক করে দুজনকেই কোলে নিয়ে অনেক আদর করলেন। আজকে তার মনে হচ্ছে সংসারে পুনরায় সুখ শান্তি ফিরে এসেছে, এরপর নীলাভ তরুকে নিয়ে নিজেদের রুমের সামনে আসে, তরু রুমের ভেতরে ঢুকেই চমকে যায়। প্রচন্ড শকের কারণে তার হাতে থাকা ব্যাগটাও মেঝেতে পড়ে যায়। তরু আশেপাশে তাকিয়ে দেখে রুমের পূর্ব দিকের দেয়ালের পুরোটায় তার পেইন্টিং ঝোলানো,

“কি হলো? এভাবে তাকিয়ে আছিস কেনো?”

“এসব কি?”

“পেইন্টিং গুলোর আসল জায়গাতেই পেইন্টিং গুলো থাকা উচিৎ তাইনা?”

“তুমি আরও পেইন্টিং করেছো?”

তরু সেদিকে এগিয়ে গিয়ে দেখল, প্রত্যেকটা নতুন পেইন্টিংয়ে তাকে ভিন্ন ভিন্ন রকমের সুন্দর লাগছে, সবচাইতে বেশি সুন্দর পেইন্টিং টিতে তাকে একদম নীল রঙের এঞ্জেলের মতো লাগছে, নীল রঙের ড্রেস তার সাথে নীল রঙের চোখ, নীল রঙের অর্নামেন্টস, চাঁদের নীল আলো আর সমুদ্রের নীল পানি। এতো নীলের মাঝে তরুর সোনালী চুলগুলো উড়ছে, তরুর চেহারাতে থাকা সবগুলো তিল নিখুঁত জায়গাতে বসানো হয়েছে। সবচাইতে নিখুঁত লাগছে তরুর গোলাপি ঠোঁটের উপরে থাকা তিলটা, তরু নিজের পেইন্টিং দেখে নিজেই প্রেমে পড়ে গেল। চোখদুটো চিকচিক করে উঠল, তাকে দেখে মনে হচ্ছে সে মহামূল্যবান কিছু প্রত্যক্ষ করে ফেলেছে।

“ওভাবে তাকিয়ে থেকে নিজের উপর নিজেই নজর লাগাবি নাকি?”

“আমি মোটেও এমন দেখতে নই, এতো সুন্দর দেখতে মানুষ হয় নাকি?”

“ভুল বললি, আমার চোখে তুই এর চাইতেও বেশি সুন্দর দেখতে,”

তরু অবাক চোখে নীলাভের দিকে তাকায়, তরুর চোখে পানি দেখে নীলাভ আরও বেশি অবাক হয়ে যায়। তরু খুশিতে কান্না করে দিয়েছে, এতো ছোটো ছোটো জিনিসেই তরু খুশি হয়ে যায় নীলাভ মাত্রই বুঝতে পারলো। তাকে কষ্ট দিয়ে কান্না করানোর চেয়ে খুশি করে কান্না করানো সহজ। তরুকে এভাবে দেখে নীলাভের প্রচন্ড ইচ্ছা করছে তরুকে ভালোবাসতে, বুকে জড়িয়ে ধরতে। নীলাভ তরুর দিকে এগিয়ে গিয়ে হাসিমুখে বলে,

“অল্রেডি তোর জন্য পাগল হয়ে গেছি, এরকম ফেস বানিয়ে আমার তৃষ্ণা আরো বাড়িয়ে দিসনা প্লিজ।”

নীলাভের কথাশুনে তরু নীলাভকে ধাক্কা দিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে গেল।

“উফস ও এতো অদ্ভুত বিহেভ করে কেন? কবে যে আমি ওকে পুরোপুরি ভাবে বুঝতে পারবো, যাক আমি বরং আমার আজকের কাজটাই মন দিয়ে করি।”

তরু ড্রইংরুমে বসে জারার কথা শুনছিল। মেয়েটা সানার বিষয়ে তরুকে বলছে, তরুও বোনের কথা মন দিয়ে শুনছে, তখনই নীলাভ তরুর সামনে এসে বলে,

“তরু আমি একটু বাইরে যাচ্ছি,”

“ওকে, আংটিটা পরেছো?”

নীলাভ হাল্কা হেসে তরুকে নিজের হাতের আংটিটা দেখায়, তারপর বেরিয়ে যায়,

জারা বলল, “কিসের আংটি আপু?”

“ওসব বাদ দে তুই কি যেন বলছিলি,”

“ওহ হুম তারপর,,,

৩ঘন্টা পর, জারা নিজের রুমেই বসে ছিল তখনই তার ফোন বেজে ওঠে, নীলাভ কল দিয়েছে।

“হ্যালো,”

“ভাবী তুমি কোথায় আছো? আর তরু কোথায় আছে?”

“আমি তো নিজের রুমে আছি ভাইয়া, আপু কোথায় আছে জানিনা।”

“ওহ তুমি গিয়ে একটু দেখোতো যে ও কোথায় আছে।”

জারা রুম থেকে বেরিয়ে নীলাভের রুমের সামনে এসে দেখল তরু বাচ্চাদের নিয়ে শুয়ে আছে।

“আপু বাচ্চাদের নিয়ে রুমে শুয়ে আছে,”

“ওহ আচ্ছা, ভাবী একটা কাজ করতে পারবে?”

“হুম বলুন না ভাইয়া কি করতে হবে?”

“কোনো ভাবে তরুকে তোমাদের রুমে নিয়ে যাও। তারপর আমাকে একটা মিসড কল দিও,”

জারা পাল্টা কোনো প্রশ্ন না করেই রাজি হয়ে গেল। নীলাভ কল কেটে দিতেই জারা দরজায় নক করল, তরু আড়মোড়া ভেঙে বলল,

“ভেতরে আয়, বাইরে দাঁড়িয়ে উঁকিঝুঁকি দিচ্ছিস কেনো?”

জারা ভেতরে এসে বসল, কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলে উঠল।

“আপু ওরা ঘুমিয়েছে?”

“হুম মাত্রই ঘুমিয়েছে,”

“আপু তোমার সাথে কিছু কথা আছে,”

“বল,”

“এখানে বসে বললে, বাচ্চারা উঠে যাবে। তুমি বরং আমাদের রুমে চলো।”

তরু ভ্রু কুচকে জারাের দিকে তাকাল,

“ওদেরকে একা রেখে আমি যেতে পারবোনা জারা, তোর যা বলার এখানেই বল।”

“ধুর এখন কি করবো? ভাব জারা ভাব, আইডিয়া।” (মনে মনে)

“আপু আসলে তোমাকে জিদানের ব্যাপারে কিছু বলার ছিল। এখানে বসে বলতে পারবোনা। তুমি আমাদের রুমে চলোনা মাত্র ৫ মিনিটের জন্য ওদের চারপাশে বালিশ দিয়ে গেলেই তো হবে। প্লিজ আপু বেশি সময় লাগবেনা, প্লিজ।”

তরু না করতে গেলে জারাের চেহারা দেখে না করতে পারেনা,

“ওকে চল,”

তরু বাচ্চাদের চারপাশে বালিশ দিয়ে জারার সাথে চলে যায়। জারার রুমে যেতেই জারা নীলাভকে একটা মিসড কলড দেয়, নীলাভ দ্রুত পায়ে বাড়ির ভেতর ঢুকে নিজেদের রুমে চলে যায়। এদিকে তরু জারার রুমে আসতেই জারা তাকে জিদানের কাছে নিয়ে যায়।

“আপু দেখোনা জিদানের শরীরটা বোধহয় ভালো নেই। সকাল থেকে ব্রেষ্টমিল্ক ছাড়া কিচ্ছু খাচ্ছেনা,”

জারার কথা শুনে তরু খানিকটা বিচলিত হয়ে গেল।

“কি বলিস, তাহলে তুই ওকে নিয়ে এখনো বসে আছিস কেনো?”

“কি করবো আপু?”

“কি করবি আবার ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাবি।”

তরু জিদানের কপালে হাত রাখল,

“তাপমাত্রা তো ঠিকই আছে, তাহলে কি হলো?”

তরু কিছু একটা মনে করে বলে ওঠে,

“ওয়েট ওর তো এখনো ৬ মাস হয়নি, তাহলে ও অন্য কিছু খাবেনা সেটাই তো স্বাভাবিক। তুই ওকে কেনো অন্য কিছু খাওয়াতে চাইছিস?”

“শিট ধরা খেয়ে গেলাম মনে হয়।” (মনে মনে)

জারা ভাবলো তরু হয়তো জারার উপর রেগে যাবে কিন্তু জারাকে চমকে দিয়ে তরু বলল,

“দেখ জারা আমি বুঝতে পারছি ব্রেষ্টফিডিং করানোটা অনেক অস্বস্তিকর কিন্তু বাচ্চার ভালোর জন্য এটা করা উচিৎ। তাই অন্তত ৬ মাসের আগে অন্য কিছু খাওয়ানোর চেষ্টা করিসনা। বুঝলি? ওর তো ৫ মাস হয়েই গেছে আর ১ থেকে দেড় মাস পর ব্রেষ্টমিল্কের পাশাপাশি অন্য কিছু খাওয়ানোর চেষ্টা করবি।”

জারা তরুর কথার পৃষ্ঠে কি বলবে ভেবে পেলোনা। তবে জারা বুঝতে পারলো তরু বাচ্চাদের প্রতি কতোটা কনসার্ন।

“ওতো ঘুমোচ্ছে, চিন্তা করিসনা আমি গেলাম।”

তরু রুমে ঢুকে দেখলো নীলাভ বাচ্চাদের পাশে শুয়ে আছে,

“এইযে মিষ্টার,”

নীলাভ ভ্রু কুচকে তরুর দিকে তাকাল,

“আপনি এভাবে বাইরের থেকে এসে বাচ্চাদের কাছে যেতে পারেন না, যান আগে হাত মুখ ধুয়ে আসুন।”

নীলাভ একটা শ্বাস ফেলে ফ্রেশ হতে চলে গেল। ১৫ মিনিট পর বেরিয়ে এসে দেখল তরু নীড়কে কোলে নিয়ে বসে আছে,

“ও উঠে গেছে?”

“হুম, আচ্ছা তুমি কোথায় গিয়েছিলে?”

“তুই তো জানিসই কোথায় গিয়েছিলাম।”

তরু থমকে গেল, তাহলে কি নীলাভ আংটির ব্যাপারে জেনে গেছে? শিট তখন তরু স্পেসিফিক ভাবে আংটিটার কথা জিজ্ঞেস করে ফেলেছিল যেটা করা উচিৎ হয়নি।

“কিহ এটাই তো ভাবছিস তাইনা যে আমি আংটিটার কথা কিভাবে জানলাম?”

“কি বলতে চাইছো?”

“কিছুই বলতে চাইছিনা। তুই আমার উপরে নজর রাখতেই পারিস। আমার সমস্যা নেই, আমার আড়াল করে রাখার মতো কিছুই নেই।”

“রিয়েলি? তাহলে তুমি ৩ ঘন্টা ধরে হাইওয়ের রাস্তায় কি করছিলে?”

নীলাভ হাসল,

“তুই সত্যিই আমার উপরে নজর রাখিস তাইনা? আমার সন্দেহ ছিলো কিন্তু এখন পুরোপুরিভাবে সিওর হলাম।”

তরু থতমত খেয়ে গেল,

“হ্যাঁ নজর রাখার দরকার হয়েছে রেখেছি, তোমার প্রবলেম আছে?”

“আমার কোনো প্রবলেম নেই,”

“তাহলে বলছোনা কেনো যে ৩ ঘন্টা তুমি হাইওয়ের রাস্তায় গাড়িতে বসে বসে কি করছিলে?”

তরু থেমে গেল, নীলাভ হাসছে, তরু কিছু একটা ভেবে বলে উঠল,

“তার মানে তুমি আংটিটা খুলে ফেলেছিলে তাইনা? যেন আমি তোমার লোকেশন না জানতে পারি। তাইতো?”

“হুম ইউ আর আ ক্লেভার গার্ল।”

তরু নীড়কে শুইয়ে দিয়ে নীলাভের সামনে এসে দাড়াল,

“তুমি গতকাল রাতেও জেনে-বুঝেই আংটিটা খুলে রেখে গিয়েছিলে?”

“আমার সন্দেহ হয়েছিল, এই আংটিটা ছাড়া তো আর তেমন কিছু নেই যেটায় ট্র্যাকিং ডিভাইস থাকতে পারে, সেই জন্যই আমি ওটা খুলে রেখে গিয়েছিলাম যাতে তুই কোনোভাবেই আমার সঠিক লোকেশন জানতে না পারিস।”

তরু ভীষণ রেগে গেল,

“কালকের টা নাহয় বুঝলাম কিন্তু আজকে তোমার এটা খোলার কি দরকার পড়ল?”

“আমি সিওর হওয়ার জন্য এরকমটা করেছি। আর খুলবোনা হ্যাপি?”

তরু রেগেমেগে নীলাভকে ধাক্কা দিল।

“আস্তে আস্তে তুমি অনেক খারাপ হয়ে যাচ্ছো।”

নীলাভ হাসতে হাসতেই বলল,

“কথায় কথায় এভাবে ধাক্কা দিচ্ছিস কেনো আজব,”

“তাহলে কি করবো?”

“ধাক্কা না দিয়ে কিস দিলে ব্যাপারটা ভালো হবে।”

“কিস পেতে চাইলে পরিশ্রম করতে হয়, এমনি এমনি পাওয়া যায়না।”

“আমি পরিশ্রম করতে প্রস্তুত। কি করতে হবে বল,”

“আমি বলবো কেনো? আমি কি তোমাকে কিস করার জন্য পাগল হয়ে আছি নাকি?”

“এভাবে বলতে পারলি?”

“তো কিভাবে বলবো?”

নীলাভ হাসছে তরুর এরকম স্ট্রেইট ফরওয়ার্ড কথা তার শুনতে ভালোই লাগে। তরুকে এভাবে রাগাতেও তার ভালোই লাগছে,

“বেশি হেসোনা, যাও এখান থেকে।”

“কেনো? আমি জানি আমাকে হাসতে দেখতে তোর ভালো লাগে।”

“হুম সবকিছু জানিয়ে দিয়েছি বলেই তো সেগুলো আমার উপরেই প্রয়োগ করছো।”

“আচ্ছা বাবা সব দোষ আমার স্যরি, আর কিছু বলবোনা।”

“স্যরি বলতে হবেনা হাসিটা অফ করে বাইরে যাও।”

তরুর কথা শুনে নীলাভ হাসতে হাসতেই রুম থেকে বেরিয়ে গেল।

চলবে,

শব্দসংখ্যা- ৩০০০+

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৬১তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন