#প্রেমোত্তাপ
#মম_সাহা
২২।
আকাশে ক্ষণে ক্ষণে মেঘ জমছে। ফেব্রুয়ারি শুরু না হতেই এমন ঝড়ের তান্ডব দেখে মনুষ্যজাতি বিভ্রান্ত। পাখিরা ঘর ছেড়ে বেরুচ্ছে না, দামী দামী গাড়ি করে অফিস যাওয়া কর্মকর্তাদের ভীড়ও নেই পথেঘাটে। কেবল দেখা যাচ্ছে রিকশাচালকদের। ভিজে টইটম্বুর হয়ে থাকা শার্টের সাথে লেগে আছে তাদের ক্ষুধার্থ জীর্ণশীর্ণ দেহখানি। শরীর দেখলেই বোঝা যায়, অভাবের কাছে বৃষ্টির বাহানা নিছকই হাস্যকর। বৃষ্টি হোক কিংবা খড়া, পেটের দায়ে এই মানুষ গুলোকে বেরুতেই হবে বাহিরে। তাদের যে বিশ্রাম নেওয়ার অবকাশ নেই। তাদের পেট যে ক্ষুধার আহাজারি করতে ব্যস্ত।
চিত্রা তার পড়ার টেবিলে বসে পা ঝুলাচ্ছে। বাহার ভাই মনযোগ দিয়ে পড়তে বসতে বলেছে। পড়াশোনা না করলে বাহার ভাই রাগ করবে। সেই রাগের কথা ভেবেই এত তোড়জোড় করে পড়তে বসা। অথচ তার মন পড়ে আছে বাহিরে। আগে যেমন পড়তে বসলে বনফুলকে ডাকতে ডাকতে পাড়া মাথায় তুলতো, আজও সেই পুরোনো কাজটি করতে ইচ্ছে করছে। অথচ আজ মনে এক রাশ অস্বস্তি। কাজটি করলে বনফুল প্রতিত্তর যদি না করে! তাহলে? তাহলে সে তো ভীষণ লজ্জা পাবে। চিত্রার আকাশ-পাতাল ভাবনার মাঝে তার ঘরে আবির্ভাব ঘটে ছোট্টো চেরির। গুটি গুটি পায়ে সে তার বুবুর কাছে এসে দাঁড়ায়। মিষ্টি কণ্ঠে বলে,
“বুবু, তুমি পড়া ফাঁকি দিচ্ছ?”
চেরির আধো কণ্ঠে তার ধ্যান কাটে। চমকে পাশ ফিরে তাকাতেই বাচ্চাটার হাস্যোজ্জ্বল মুখশ্রী চোখে পড়ল। সে চেরির গালটা আলগোছে টেনে দিয়ে বলল,
“পড়া ফাঁকি কই দিচ্ছি?”
“এইযে তুমি পড়ার টেবিলে বসে পা দোলাচ্ছ আর কি যেন ভাবছো! অথচ সব করছো কিন্তু পড়ছো না।”
চেরির দুষ্টুমি ভোরা কণ্ঠে চিত্রা চোখ ড্যাবড্যাব করে তাকাল। সন্দিহান কণ্ঠে বলল,
“ও বাবা! চেরিসোনা কি বুবুকে পাহারা দিচ্ছে? কে বলেছে তাকে এটা করতে, শুনি?”
“কেন, বাহার ভাই।”
চেরির উত্তর শুনে ভ্রু কুঁচকাল চিত্রা। অবাক স্বরে বলল,
“তুমি ওদের সঙ্গে আবার কথা বলতে গিয়েছিলে? তোমাকে না সবাই না করেছিল। ওদের সাথে যেন কথা না বলো।”
“কী করবো আমি, বুবু? বাহার ভাই এত আদর করে ডাকল, আমি রাগ করে থাকতেই পারলাম না। তার উপর সে লুকিয়ে আমার হাতে ইলিশ মাছও খেয়েছিল আমার রাগ ভাঙ্গাতে।”
“কী! কই আমরা তো জানিনা!”
“আরে, সে তো লুকিয়ে এসেছিল। তোমরা জানবে কীভাবে? বনফুল বুবু আমাকে কেমন কঠিন করে বলল— ‘চেরি তুমি যাও। সওদাগর বাড়ির বাতাস এলেই আমরা দরজা বন্ধ করে রাখি আর সেখানে তো ইলিশ মাছ বহু দূরের কথা।’ তারপর ওদের বাড়ির ঐ নোঙ্গর নামের আপুটা দরজা বন্ধ করে দিল। আমি দাঁড়িয়েই রইলাম অথচ ওদের একটুও মায়া হলো না, জানো বুবু?”
চেরির চোখ আবারও স্মৃতিচারণে টইটুম্বুর হয়ে উঠল। চিত্রা বুঝল বাচ্চাটার কষ্ট, তাইতো আদুরে হাতে কাছে টেনে নিল তাকে। মাথায় হাত বুলিয়ে দিল স্নেহের। চেরি মিহি ক্রন্দনরত কণ্ঠে বলল,
“আমাদের আগের বোকা বোকা বনফুল বুবু-ই ভালো ছিল, বুবু। এই বনফুল বুবুকে মোটেও ভালো লাগে না।”
বাচ্চাটার এই সরল সোজা স্বীকারোক্তিতে চোখ ভোরে এলো চিত্রারও। এই গম্ভীর পরিবেশ এড়াতেই সে চঞ্চল কণ্ঠে বলল,
“বনফুল বুবু দেখবে এখনই আমাদের সাথে কথা বলবে। চলো, আমরা আগের মতন সন্ধ্যাবেলা যে কবিতা বলে হাঁক ছাড়তাম, আজ সেটা বলি। দেখবে, তোমার বনফুল বুবু ঘরে থাকতেই পারবে না।”
চিত্রার অপরিপক্ক বুদ্ধিটি পছন্দ হলো চেরিরও। সে হাত তালি দিয়ে উঠল খুশিতে। ঘাড় কাত করে সায় দিল। তারপর দুটো চঞ্চল প্রাণই ছুটে গেল বারান্দায়। বুকে অদম্য সাহস এবং আশা নিয়ে দু'জন আওড়াল বহু পুরোনো সেই ছড়াটি,
“ভুল, ভুল, ভুল জীবনের সবটুকুই ভুল,
তার মাঝে ঠিক, কেবল তুই বনফুল।”
বার কয়েক কবিতাটি আওড়াল। আগে যখন চিত্রা সন্ধ্যাবেলা এই কবিতা বলে হাঁক পারতো, বনফুল দ্রুত লজ্জা মুখে উপস্থিত হতো। লাজুক স্বরে "যাহ্ বাদর" বলতো। অথচ আজ! আজ বার তিনেক ডেকেও সাড়া পেল না। ভেঙে গেল চঞ্চল প্রাণের তুমুল আশা। বুকভার করে উঠলো দু'জনের। তবে চিত্রার ক্ষতটা হলো একটু বেশিই গাঢ়। বন্ধুত্বের অকাল মৃত্যুতে সে চরমভাবে শোকাহত হলো। ভেঙে পড়ল বাজে ভাবে। শেষে আশার বিন্দুও নিঃশেষ হয়ে গেলো। ছোট্টো চেরি হয়তে বড়ো বোনের এই ভেতর ভেঙেচুরে যাওয়ার ব্যাপারটা বুঝল। ছোটে হাতে জড়িয়ে ধরল বোনের হাতটি। স্বান্তনার স্বরে বলল,
“তুমি মন খারাপ করো না, বুবু। বনফুল বুবুই হয়তো ঘুমুচ্ছে। জেগে থাকলে ঠিক উত্তর দিত।”
ছোটো বোনের কোমল স্বরে যেন চিত্রার ঠোঁট ভেঙে কান্না এলো। হাঁটু মুড়ে বসে জড়িয়ে ধরল বোনকেই। আমরা যখন ভীষণ ক্ষত পাই বুকের গভীরে, তখন এমন করেই আমরা মানুষকে আগলে ধরে একটু শান্তি চাই। চেরিও মন খারাপ করে বোনকে জড়িয়ে রাখল। ঠিক এর মাঝেই অপ্রত্যাশিত ঘটনাটি ঘটল। পাশের বিল্ডিং থেকে বহু পরিচিত সেই কণ্ঠ ভেসে এলো,
“যাহ্, বাঁদর।”
যা হওয়ার কথা ছিল না তা আকস্মিক ঘটে যাওয়ায় চেরি আর চিত্রার সহসাই বোধগম্য হলো না সেটা। কিন্তু মস্তিষ্কের নিউরনে যখন ছড়িয়ে গেলো সেই ধ্বনি তখন তারা বুঝল আজ অপ্রত্যাশিত কিছু ঘটে গেছে। বন্ধুর গুটিয়ে নেওয়া হাত আবার মেলে ধরেছে। আহ্বানে সাড়া দিয়েছে বন্ধু। চিত্রা, চেরি দু'জনই বিস্ফোরিত নয়নে সামনের দোতালা বিল্ডিংটির দিকে চাইল। বনফুল দাঁড়িয়ে আছে। করুণ হাসি ঠোঁটের কোণ ঘেঁষে। কেমন আধভাঙ্গা কণ্ঠে বলল,
“চলে যাচ্ছিলি নাকি? আর ধৈর্য নেই অপেক্ষার?”
চিত্রা কথা বলতে চাইল কিন্তু অতি আনন্দ যেন তার গলা চেপে বসে আছে, যার জন্য কথা বলতে চেয়েও বলতে পারছিল না। কেবল চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়ছিল নোনা অশ্রুর বিন্দু গুলো। চেরি বোনকে উৎসাহ দিল,
“বুবু, তাড়াতাড়ি কথা বলো। পরে যদি বনফুল বুবুই চলে যায় রাগ করে? কথা বলো তাড়াতাড়ি।”
চেরির চোখেও অশ্রু টলমল করছে। চিত্রা তখনই কেঁদে দিল খুব অসহায়ের মতন। অভিযোগ করে বলল,
“আমি ভালো নেই, বনফুল। তুই ক্যান আমারে দূরত্ব দিয়েছিস? আমার কষ্ট হয় ভীষণ।”
বনফুল উত্তরে কিছু বলতে নিয়েও কেন যেন চুপ করে গেল। তার করুণ হাসি মিলিয়ে গেল কিসের এক গম্ভীরতায়! কর্কশ কণ্ঠে কেবল বলল,
“ভালো নেই কে বলেছে? আজকাল তোদের অনেক মানুষ হয়েছে!”
বনফুলের কঠিন কণ্ঠের তোপে ফিকে হয়ে এলো চিত্রা ও চেরির আনন্দ। হুট করে কি হলো মেয়েটার? এই তো ভালো ছিল! চিত্রা অবাক চোখে তার পাশের বারান্দায় তাকাতেই থমকে গেল। নিরু নামের মেয়েটি তুহিন ভাইজানের বারান্দা পরিষ্কার করছে। হয়তো বনফুল এটা দেখেই রেগে গেছে। চিত্রা আগ বাড়িয়ে কিছু বলার আগেই হনহন করে স্থান ত্যাগ করল বনফুল। চিত্রা কেবল অসহায় চোখে দেখল সেটা। তুহিন ভাইজান ও নিরুর উপর তার রাগের পাল্লা আরেকটু বাড়ল। সে দিক-বিদিক শুন্য হয়ে নিজের বারান্দার ফুলের টবটি ছুঁড়ে মারল সেখানে। তুমুল শব্দে টবটি ভেঙেচুরে গেল। এই ভয়ানক শব্দ শুনে চমকে উঠল নিরু। ঘর থেকে ছুটে এলো তুহিন ভাইজান। সেকেন্ডের মাথায় পরিবারের সকলে ভীড় করল তুহিনের বারান্দায়। নিরু নিষ্পলক তাকিয়ে রইল চিত্রার দিকে। ডান পায়ে তার খানিক চোটও লেগেছে। তুহিন বিস্মিত ভঙ্গিতে চারপাশে চাইল। বোনের রুদ্রমূর্তির দিকে তাকিয়ে তার দৃষ্টি স্থির হলো। অবনী বেগম অবাক কণ্ঠে বললেন,
“কীভাবে ভাঙল এটা! নিরু? ব্যাথা পাওনি তো, মা?”
মেয়েটার চোখ-মুখ কোমল হয়ে এলো। মেঘমন্দ্র কণ্ঠে বলল,
“না আন্টি, ব্যাথা পাইনি। টবটা একপাশে রাখতে গিয়ে পড়ে গেছে।”
“এটা তো চিত্রার ফুলের টব। তুহিনের বারান্দায় কী করে এলো?”
প্রশ্নটি করে থামল মুনিয়া বেগম। পাশ ফিরে লাগোয়া বারান্দায় চিত্রাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তার ভ্রূদ্বয় কুঞ্চিত হয়ে এলো। কপাল কুঁচকে বললেন,
“চিত্রা, চেরি কী করছিস? এখানে আয়।”
চিত্রার শক্ত মুখের আদল ততক্ষণে বদলে অনুশোচনায় পরিণত হয়েছে। রাগের বশে সে নিজের ভারসাম্য হারিয়ে মেয়েটাকে আঘাত করেছে ঠিকই কিন্তু মেয়েটা কেমন তাকে বাঁচিয়ে দিল! অনুশোচনায় মাথা নত করে চিত্রা রুমে চলে গেল। শক্ত হাতে খিল দিল দরজায়। চেরিকেও বের করে দিল ঘর থেকে। তার আর বনফুলের মাঝে আজকে কোনো তফাত নেই। তারা নিজেদের ভালোবাসাকে এত বাড়াবাড়ি রকমের প্রাধান্য দিয়ে আশেপাশের সকল কিছুকে তুচ্ছ করে ফেলেছে। চিত্রার লজ্জায় মাথা নত হলো। আজ সে বড়ো বোকামি করে ফেলেছে। ভালোবাসা কি অন্ধ হতে শেখায়?
_
মধ্যরাতে তারা বিহীন আকাশের চাঁদ দেখতে মগ্ন চিত্রা। হুট করে খেয়াল করল বনফুল তার বাড়ি থেকে লুকিয়ে বের হয়ে যাচ্ছে। চালচলনে তার গোপনীয়তা। চিত্রারও সন্দিহান মস্তিষ্ক তার পিছু নিতে বলল। যেমন ভাবনা, তেমন কাজ। এই মধ্যরাতে নির্ভয়ে সে বন্ধুর পিছু ছুটলে। তোয়াক্কা করল না নিজের বিপদের কথা।
#চলবে...
[প্রতি এক দিন পর পর গল্প দিব বলেছিলাম। তাই করব। আর পর্বটি ১২০০ পর্বের। ছোটো মনে হলে বলে রাখি— ২৩ এর বর্ধিতাংশ দিব পরশু দিন। মানে একদিন পর পর। ভালোবাসা। আর এইখানটা একটু শ্লো আগাচ্ছে। কারণ সামনে গিয়ে দ্রুত মোড় ঘুরবে। অপেক্ষা করুন। ]