#বসন্তের_ফিনল্যান্ড
#সূচনা_জাফরিন
#পর্ব-১২
অনেকটা দিন এভাবেই যেন পার হয়ে গেল। প্রায় ছয়মাস শেষের দিকে আফশীন এই দেশে এসেছে।পড়ালেখা জব সব মিলিয়ে নিজ দেশের ক্যালেংকারির কথা যেন ভুলেই গেছে সে। আজ তার মা ফোন করেছিল,
"ফাইনাল পরীক্ষা দিয়েই দেশে ফিরবে তুমি বুঝলে?"
"এখনো অনেক দিন বাকি আছে মা। "
"সেটাই তো সমস্যা।"
আফশীন যেন আর কিছু বলতে পারলোনা, ছোট বেলার গভীর এক ভুলের কারণে মার সাথে কখনই তার সখ্যতা গড়ে উঠতে পারেনি। মা কে বুঝাতেই পারেনি, যে ভুল তার দ্বারা হয়েছিল সেটা কেবল একটি দুর্ঘটনা ছিল, যেটা তার বাচ্চা মন আজও ভুলতে পারে না। সেই ভুলের মাশুল হয়তো আজীবন বয়ে যেতে হবে। তিনি আগেও কন্যা বিদ্বেষী ছিলেন, তার মতে পৃথিবীতে যার মেয়ে আছে তার সবচেয়ে বড় ঘাটা,খাইয়ে, পড়িয়ে সবটা দিয়ে বিয়ে দিলেও সেই একই কাজ আজীবন, মুক্তি কখনই মিলে না,তারউপর ছোট হয়ে থাকতে হয় মেয়ের শ্বশুর বাড়ির কাছে।
আফশীন আজ অনেকদিন পর ছাদে গিয়ে বসেছে সারাদিনের ক্লান্তি গুলো যেন নিমিষেই চলে যায় এই প্রকৃতির সামনে।কোথাও কিছু নেই শুধু প্রাণবন্ত বাতাস।
"হে আমাদের পালনকর্তা! সরল পথ প্রদর্শনের পর তুমি আমাদের অন্তরকে সত্যলংঘনে প্রবৃত্ত করোনা এবং তোমার নিকট থেকে আমাদিগকে অনুগ্রহ দান কর। তুমিই সব কিছুর দাতা।সূরা আল ইমরান : ৮"
হঠাৎ পেছন থেকে কেউ বলল:
" বলুন ইয়া আল্লাহ! তুমিই সার্বভৌম শক্তির অধিকারী। তুমি যাকে ইচ্ছা রাজ্য দান কর এবং যার কাছ থেকে ইচ্ছা রাজ্য ছিনিয়ে নাও এবং যাকে ইচ্ছা সম্মান দান কর আর যাকে ইচ্ছা অপমানে পতিত কর। তোমারই হাতে রয়েছে যাবতীয় কল্যাণ। নিশ্চয়ই তুমি সর্ব বিষয়ে ক্ষমতাশীল।সূরা আল ইমরান : ২৬"
আফশীন অবাক নয়নে তাকিয়ে রইলো, মেয়েটি তো তেহজিব কিন্তু সে এই ছাদে কি করে এলো?মনে মনে অনেক প্রশ্ন এলেও মুখে কিছু বলল না।
তেহজিব হাসলো "কেমন আছো তুমি?"
"জ্বি ভালো, আপনি? "
"আমিও ভালো আছি। "
আফশীন পেছনে উঁকি দিলো কিন্তু একাই তেহজিব কে দেখতে পেলো।
তেহজিব নজর লক্ষ্য করল"কাউকে খুঁজছো তুমি? "
আফশীন মৃদু হেসে বলল "আপু একা এসেছেন? "
"হ্যাঁ " একটু তাজা হাওয়ার উদ্দ্যেশে।
ওহ তুমি ভাবছো, আমি এখানে কেন? "
আফশীন ইতস্ততভাবে বলল"জ্বি হ্যাঁ"
তেহজিব হাসলো, আমি এখানে গত একমাস ধরে আছি অথচ দেখো তোমার সাথে আমার দেখাই হয়নি!
"একমাস ধরে?"
"হ্যাঁ।"
"তাই নাকি?"
" মিফ এখানে রেস্ট্রনের ফ্রেঞ্চাইজ করতে চাই। নতুন ভাবে আরেকটি শাখা হবে তাই ওর যাওয়া আসা খুব বেশিই হয়ে যাচ্ছে, তাই ভাবলাম, আমরা না হয় ফিনল্যান্ডেই শিফ্ট হয়ে যায়,যতদিন কাজ শেষ না হয়।
"এইখানে কোন ফ্ল্যাটে আছেন?"
তেহজিব হাটতে হাঁটতে বলল "জেরিমি স্যারের আরেকটি ফ্ল্যাট ছিল সেটাই আপাতত রেন্টে নিয়েছি, শিয়া সব ম্যানেজ করেছে।পরে অন্য কোথাও স্যাটেল হবো, তাড়াহুড়ো তে এটাই বেস্ট অপশন ছিল।
"ওহ আচ্ছা।"
"তুমি আমার সাথে দেখা করতে এসো, আমার ভালো লাগবে।স্বদেশে বুঝা না গেলেও বিদেশে বুঝা যায়, দেশের মানুষ আর ভাষা কি জিনিস।"
"জ্বি, ঠিকাছে যাব।"
জেবিন কোরিডর থেকে বের হয়ে ক্যাম্পাসের সিড়িতে বসলো।কী এক জ্বালা সামনে এক্সাম আছে।পড়াতে মন বসছেনা তার।
ড্যামিয়েন এর সাথে দেখা হয়ে গেল
"জেবিন প্রিপারেশন কেমন?"
"জানিনা পরীক্ষা দিলেই বুঝবো।"
"সরজমিনে নামলে বুঝি সুপার ওমেন হয়ে যাও?"
বিরস মুখে বলল"হ্যাঁ হয়তো। "
"আমরা গ্রুপ স্টাডি করবো বিকেলে, তুমি চাইলে জয়েন করতে পারো। "
"কার বাসায়? "
"স্যাম এর বাসায়। "
জেবিন বলল"জানাবো পরে।"
:
:
:
বাসায় ফিরে গিয়ে টেবিলে বসেছে সে, বুক সেল্ফ থেকে কিছু বই নিয়ে পড়ার টেবিলে এলো। হঠাৎ পুরোনো চিরকুট গুলো হুরহুর করে বেড়িয়ে পড়েছে।
জেবিন দীর্ঘশ্বাস ফেললো "এক বছর ধরে এই ছোট ছোট চিরকুট গুলোতে ছেলেটি প্রেম নিবেদন করতো আর এখন কি না সে তার টাইপের মেয়ে না?
পোলান কি জানতো না,জেবিন সবসময় টম বয় ছিল?কখনওই আবেদনময়ী চলাফেরা সে করেনি।অন্য মেয়েদের মতো আজ অব্দি কোনো ছেলের প্রতি প্রেমময় দৃষ্টি দেয়নি।বন্ধুতো অনেক আছে কিন্তু পোলান কে সে একটু সময় দিয়েছিল এই চিরকুট গুলোর কারণে।
তার মনে হয়েছিল, পোলান তাকে খুব খেয়াল করে, যত্ন করে, তার প্রতিটি লেখায় বিরল কিছু ছিল বলেই ঢোক গিলে সাই দিয়েছিল মেয়েটি।
সবকিছু একপাশে সরিয়ে পড়ালেখায় মনোযোগ দিলো জেবিন।
খানিকবাদে বোতলে পানি আনতে গিয়ে দেখা হলো ওপেল এর সাথে।
জেবিন কোনো কথা বললো না। ওপেল পেছন থেকে ডাকলো।
"পড়ছো তুমি?"
জেবিনের খুব অভিমান হলো পুরো একমাস পর আজ ছেলেটি সেঁধে এসেছে কথা বলতে।তবে সে তো কথা বলবে না এবং তা ই হলো।
পাশ কাটিয়ে সোজা নিজের ঘরে চলে গেল।
ওপেলের মুখখানা চুপসে গেছে,হাতে একটা নোট বই ছিল।
:
:
আরো এক সপ্তাহ কেটে গেল,
জেরিমি আগের মতোই ব্যস্ত আছে।সকাল থেকেই হঠাৎ তুষারপাত হচ্ছে। টিভিতে, সোশাল মিডিয়ায় রাস্তা ব্লকের খবর বলছে। ভার্সিটির কাজ শেষ করে বাসার দিকে যাচ্ছে আজ আর অফিসে না যাওয়ায় ভালো হবে ভাবছে।
প্রায় বাসায় ফিরে গাড়ি পার্ক করছে ওমনি মুঠো ফোন বেজে উঠলো।
গাপি কল করেছে।
"স্যার আজ কি আর আসবেন?"
"না, আমি বাসায় ফিরেছি, তুমিও চলে যাও। "
"ঠিকাছে স্যার।"
:
:
গরম জামা গায়ে জড়িয়ে জানালায় দাঁড়ালো জেরিমি। ভাবছে এক কাপ কফি হলে ভালো হয়। কফি বানিয়ে বসতে যাবে ঠিক তখনই দরজার কলিং বেল টা বেজে উঠলো।
জেমি এসেছে
"আহ, মেভিস তো নেই ও মায়ের সাথে বাইরে, ফল হওয়ার কারণে ওরা ফিরবে না।"
জেমি মাথা নাঁড়িয়ে বলল"আমার কাজিন ঘরে ফিরেনি, মা চিন্তা করছে, শেষবার ফোনে বলেছিল অফিসে, এখন মোবাইলে সংযোগ দিচ্ছে না।
আপনার অফিসের নম্বর টা দিবেন?
জেরিমি অবাক হলো "আফশীন ঘরে ফিরেনি?ঘড়ির দিকে তাকালো" কিন্তু অফিস তো বন্ধ করেছে আরো পঁয়তাল্লিশ মিনিট আগে। ওর থাকার কথাও না এতোক্ষণ।
গাপি কে কল করল "আফশীন কোথায়? "
"ম্যাম তো চলে গিয়েছে, যখন আপনাকে কল করেছি তার একটু আগে।"
"কিন্তু ও আজ অফিসে এতোক্ষণ কেন ছিল? "
"কি যেন জরুরি কিছু বাকি ছিল বলেছে।"
জেরিমি আর কোনো কথা না বাড়িয়ে আফশীনের মোবাইলে কল দিতে লাগলো। পাঁচবার কল দেওয়ার পর একবার রিং পড়লো কেবল।
আফশীন "হ্যালো বলতেই জেরিমি বলল"তোমার লোকেশন সেন্ড করো আমায়।"
"স্যার আমি আটকে গেছি। সব রাস্তা বন্ধ করে দিয়েছে, রাস্তায় হাটা মুশকিল। "
সাধারণত ফলে রাস্তা ভীষণ পিচ্ছিল থাকে প্রস্তুতি ছাড়া বরফে হাটা খুবই রিস্ক, প্রচন্ড রকমের পিছলে পড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তার উপর আছে হাড় কাপানো শীত। এই শীতে দ্রুত রক্ত জমাট বেঁধে মানুষের প্রাণ নাশের রেকর্ড আছে প্রচুর।
জেরিমি বের হয়ে পড়েছে শীতের জামা নিয়ে। মোবাইলে এখনো আফশীনের লোকেশন আসেনি।
জেমি কে বলল"চিন্তা করোনা, আমি নিয়ে আসবো। "
গাড়ি নিয়ে কিছু দূর যেতেই ম্যাসেজ এলো আফশীনের।
জেরিমি স্পিড বাড়িয়ে দিলো। খানিকবাদে প্রায় অনেকটা জনশুন্য হয়ে পড়েছে এলাকা টা কিন্তু আফশীন কে সে কোথাও পাচ্ছেনা।কিছু কিছু লোকাল আধখোলা দোকানেও খোঁজ নিয়ে দেখেছে কী আশ্চর্য মেয়েটি কোথাও নেই।কলের পর কল দিয়েই চলেছে তাও কোনো খবর নেই।
একটু পর দেখলো কিছু জায়গায় ইমারজেন্সি অ্যাম্বুলেন্স যাচ্ছে, দু চারজন পিছলে পরে মাথা ফেটেছে আবার গুরুতর আহত হয়েছে। দিগ্বিদিক তাকিয়ে দিশেহারা লাগছে জেরিমির। সে যেন আগে কখনো এমন ভয় পায়নি।
চলবে,,,
(ইন শা আল্লাহ, আগামী পর্ব শনিবার দিবো।)