#বসন্তের_ফিনল্যান্ড
#সূচনা_জাফরিন
#পর্ব-১৩
ম্যারিমা এই ম্যারিমা
এমন ডাক শুনে মুখটা যেন তিতো হয়ে এলো আফশীনের। জানালার বাইরে তাকিয়ে ছিল কী সুন্দর করে।
পেছনে ফিরে বলল "এখানে কারো মা থাকেনা, স্টুপিড ইংরেজ।"
"হোয়াট? "
"কিছুনা বলছিলাম কি হয়েছে?এতো বিশ্রী করে ডাকছ যে?"
ওপেল বলল"তোমার নামটাই বিশ্রী এতে আমার কি দোষ? "
"জ্বি জ্বি ধন্যবাদ "বোকা ইংরেজ "
"আবার কিছু বললে তুমি?"
আফশীন পাত্তা না দিয়ে বললো "আমার মুখ, আমার স্বাধীনতা। "
"তোমার জন্য আন্টি কাপড় আর খাবার পাঠিয়েছে, বলেছে দুপুরে রিলিজ করা হবে তখন উনি আবার আসবে তোমাকে নিয়ে যেতে।"
আফশীন বিরবির করে বলল"আন্টির চামচা।"
দরজা খুলেই হন্তদন্ত করে ঢুকলো আওসাফ "আফশীন কেমন আছিস এখন? বেশি ব্যাথা পেয়েছিস না?"
হস্পিটালের বেডে বসা আফশীন, ভাইকে জড়িয়ে ধরে বলল"না আমি ঠিকাছি। "
আওসাফ আবেগি হয়ে বলল"বিশ্বাস করবি, আমি তোর খবর শুনেই অস্থির হয়ে গেছি কিন্তু ফলের কারণে আসতেও পারছিলাম না।রাস্তা গুলো এখনো পরিষ্কার করছে।
আফশীন বলল:
যা কিছু রাত ও দিনে স্থিতি লাভ করে, তাঁরই। তিনিই শ্রোতা, মহাজ্ঞানী।আল আনআম: ১৩"
আওসাফ স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে মৃদু হাসলো।
আজ দুইদিন হলো আফশীন হস্পিটালে, সেদিন অতিরিক্ত বরফের কারণে বাসায় ফিরতে তো পারেনিই বরং ফল সম্পর্কে ধারণা না থাকায় আছাড় খেয়ে বেশ ভালোয় চোট পেয়েছে, হাতে, মাথায় এবং পায়ে এখন ব্যান্ডেজ লাগানো।
:
:
বিকেলে বাসায় ফিরেছে তারা।আফশীন বেডরুমে শুয়ে আছে।
কী অদ্ভুত একটা ব্যাপার খালার মুখে শুনেছে জেরিমি তাদের কল দিয়ে হস্পিটালের কথা বলেছিল অথচ জ্ঞান ফেরার পর থেকে একটা বারের জন্য ও জেরিমির সাথে তার যোগাযোগ হয়নি।উল্টো দেশ থেকে ফোনের উপর ফোন আসছে।
আফশীনের বাবা একটু আগেও কল করেছে"বলেছে মা খুব চিন্তিত তাকে নিয়ে।"এতে
আফশীন একটু খুশি হয়েছে।
:
:
:
জেবিনের আর মাত্র একদিন বাকি পরীক্ষার। প্রেজেন্টশন আকারে সব তৈরি করে বুঝাতে হবে কিন্তু কেমন কঠিন লাগছে সব,এর মধ্যে আফশীন কে নিয়ে ও বেশ চিন্তিত ছিল।
নোট বই খুলে পড়ছিল তখন চিরকুটের একটি লেখা পাশেই টেবিলে উঁকি দিচ্ছে। কি মনে করে যেন হাতে নিয়ে পড়লো সেটি।
আবার খাতায় নজর দিতেই আচমকা মনে হলো কিছু একটা অস্বাভাবিক।
নোটের মার্ক করা কিছু কিছু লিখা আছে যার সাথে চিরকুটের বর্ণমালা গুলোর মিল পাচ্ছে,একই স্টাইলের লিখা।
জেবিনের সন্দেহ হলো তৎক্ষণাৎ সে ডেমিয়ান কে কল করলো "হ্যালো তুমি যে নোট গুলো দিয়েছ ওগুলোতে একটু সমস্যা হচ্ছে, হেল্প করতে পারবে?
উত্তরে ডেমিয়েন বলল "কোন নোটের কথা বলছো?
"ঐ যে রেখে গেলে না!"
"আমি কখন দিয়েছিলাম? "
জেবিন ভ্যাবাচেকা খেয়ে গেল "ওহ দুঃখিত, তুমি তো ডেমিয়ান, ভুলে তোমার নম্বর লেগে গিয়েছে।
"ইটস ওকে,তুমি কাকে কল করেছ? তবে যে কোনো সাহায্য লাগলে বলতে পারো। "
"আচ্ছা, পরে কল দিব।"
জেবিন অবাক হলো"তার মনে হয়েছিল ডেমিয়েন সেই ছেলে কিন্তু এখন তো সবই উল্টাপাল্টা লাগছে।তাই কথা ঘুরিয়ে কোনোভাবে রেখে দিয়েছে ফোন।
জেবিন একটু ভাবলো যদি পোলান তাকে নোট দিয়ে থাকে তবে ব্রেকআপের পরে যে নোট পেয়েছিল, কেন সে এমন করতে যাবে? পোলান হতেই পারে না।
দরজায় নক এর আওয়াজ হলো।বই খাতা বন্ধ করে গিয়ে দেখে কেউ নেই, প্রিন্ট করা শীট রাখা আছে নিচে। হাতে নিয়ে উল্টে পাল্টে দেখল সে,
বুঝতে পারলো ওপেল দিয়ে গেছে, আবার এসে পড়তো বসলো, খানিকবাদে হঠাৎ মনে এলো "ওপেল নয় তো?"
"নানা কীসব ভাবছি, ও তো ভালো করে কথায় বলেনা, মন চাইলে হ্যালো বলে, না চাইলে বাই বলে। "
:
:
তেহজিব গেল আফশীন কে দেখতে।
আজ চারদিন হলো, আফশীনের অনেকটা ভালো লাগছে শরীর।
তেহজিবের কোলে ছোট্ট একটা বিদেশি পুতুল। নীল চোখ, চুলের রং খয়েরি। সাত আটমাস হয়তো বয়স হবে।
আফশীন শুধু বাচ্চার দিকেই তাকিয়ে আছে। তেহজিব হাসলো।
আফশীন বলল"কিছু মনে করবেন না। মা শা আল্লাহ আমার অনেক ভালো লাগছে ওকে দেখতে।দেখতে বিদেশি হলেও আপনার চেহরা ভাসমান ওর মধ্যে।
তেহজিব বলল"হ্যাঁ সেটা মিফ ও বলে।
আফশীন খুব দুঃখিত হলো, তেহজিবের বেবি গার্ল কে কোলে নিতে না পেরে।
"তুমি ভালো হয়ে যাও একবার, তারপর রোজ এসে ওর সাথে খেলতে পারবে।"
"সত্যি তো? বিরক্ত হবেন না তো?"
"উঁহু একদম নয়।আমার মা চলে যাবে ক'দিন পরেই, তখন একা হয়ে যাব, ঘরে কেউ এলে বরং ভালোই লাগবে।"
"ঠিকাছে। "
আফশীন ইতস্ততভাবে আবার বলল "জেরিমি স্যার এর সাথে দেখা হয়েছে আপনার?"
"না তো।"
"ওহ আচ্ছা, আমি ভেবেছি উনি যায় হয়তো। "
না ফ্ল্যাট উপর নিচে হওয়াতে দেখা হয়না।
:
:
আফশীন বারান্দায় বসে আছে আর ভাবছে "জেরিমি তাকে একটা ম্যাসেজ ও করলোনা কেবল গাপি কল করে বলেছে সুস্থ হলে অফিসে যেতে,এখন অফিসের চিন্তা করতে হবেনা।
:
:
কাজ থেকে ফিরছে মিফ ক্লান্তি নিয়ে সোফায় হেলান দিলো। তেহজিব তাকে জড়িয়ে ধরে বলল"জনাব আজকে এতো লেইট যে। "
"সরি ডিয়ার, কয়েক জায়গায় মিটিং ছিল।"
মিসেস নাহার এলো এক গ্লাস শরবত আর এক প্লেট নাস্তা নিয়ে।মিফ হেসে হাত বাড়ালো "মা অনেক ধন্যবাদ, আপনি চলে গেলে কে আমার এতো খেয়াল রাখবে?
তেহজিব বুকে একটা ছোট্ট কিল বসালো। মিফ খুব ব্যথা পাওয়ার নাটক করে বলল "দেখেছেন মা, জুস তো বানাতে শেখেনি তবে স্বামী কে মারতে শিখে গেছে, আপনার ভদ্র মেয়েটা।
আচ্ছা এইঞ্জেল কই?"
নাহার জবাব দিলো "ঘুমিয়ে পড়েছে। আমিও ঘুমোতে যাচ্ছি আগামীকাল ফ্লাইট আছে আমার।তোমরাও আর বাচ্চামি করোনা"
তেহজিব মিফ এর বুকে মাথা রেখে চুপচাপ শুয়ে রইলো।
"এই বেশতা ভ্যান, মন খারাপ চলবেনা। "
"জানোই তো মা ছাড়া একা হয়ে যাব।"
"ডোন্ট ওরি, আমরা ও শীঘ্রই চলে যাব। "
তেহজিবের একটা কথা মনে পড়ে গেল, মুহূর্তেই মাথা তুলে চঞ্চল ভঙ্গিতে বলল "মিফ জানো, আমি না কিছু একটার আভাস পাচ্ছি, যেমন টা আমাদের ছিল! "মিফ ভ্রু কুচকে বলল"কিসের আভাস?
"মিস্টার জেরিমি লুইস নিশ্চয়,,,
মিফ ক্ষেপে গেল"সে কি আবার তোমাকে কিছু বলেছে? দেখো ওর থেকে দূরে থাকবে, আগেও বলেছি আমি অন্য কোথাও ঘর নিবো। তুমি খামোখা শিয়ার কথা ধরে এখানে এলে। উল্টোপাল্টা কিছু হলে না, আমি ওকে,,
তেহজিবের সব রকমের উত্তেজনা নিমিষেই ফুস করে বের হয়ে গেল দীর্ঘশ্বাসে, কপাল চাপরে বললো "হাই আল্লাহ, কখনো তো আমার পুরো কথাটা শোনো। "
"আমাকেও বলো শুধু কি আল্লাহ কে শোনাবে?"
"ধ্যাত পাগল, জেরিমি লুইস আমাকে কিছু বলেছে কিনা সেটা না জেনেই এত কথা বলার মানে আছে?"
মিফ মুখ ভার করে বলল"আমি কি জানি, আমার আগের সবকিছু মনে পড়ে যায় তোমার মুখে ওর নাম শুনলে।
তেহজিব হাসলো "জলকুঁকড়ে কোথাকার। "
"কী একটা ডাকো খালি। "
তেহজিব আবার হাসলো "তো ডাকব না, তুমি হলে সেরা মিস্টার জেলাস সুইডেন। "
"হ্যাঁ! আমি একশোবার জ্বলবো তাতে কী?"
"আচ্ছা আসল কথাটা তো শোনো। আমার মনে হচ্ছে ঘটনার পুনরাবৃত্তি হবে। "
মিফ এবার রহস্য বুঝে হাসলো "তাই নাকি? "
"হুম"
:
:
জেবিন আরো একটি পরীক্ষা দিয়ে বের হলো ভালোই হয়েছে আজ। বাসায় ফিরে তার প্ল্যান হলো ওপেলের হাতের লিখা চেক করা কিন্তু কীভাবে যাবে? আজ অব্দি কখনো ঐ ঘরে প্রবেশ করেনি সে।
উঁকি ঝুঁকি মারা শুরু করে দিলো রুমের সামনে।
এক পর্যায়ে ওপেল বাইরে থেকে এসে জেবিন কে দেখতে পেলো এমন করতে, জেবিন পেছন ফিরে উদাস ভঙ্গিতে চলে যাবে এমন সময়, ওপেলের মুখোমুখি হলো।
ইশ এমন হাতেনাতে ধরা খাবে সে চিন্তায় করেনি।
ওপেল স্বাভাবিক ভাবে জিজ্ঞেস করলো "কোনো সমস্যা? "
জেবিন আমতা আমতা করে বলল নানু বলে:
অধিক প্রতিদানের আশায় অন্যকে কিছু দিবেন না।সূরা আল মুদ্দাস্সির :৬"
কথাটা বলেই দৌড় লাগালো, এদিকে ছেলেটির মাথায় কিছু ঢুকলোনা।
চলবে,,,,