ফন্ট সাইজ:
থিম:
নিষিদ্ধ নীল চিঠি

৮ম পর্ব

লেখক: Sayma Noor
#নিষিদ্ধ_নীল_চিঠি 
 #পর্ব_৮ 
#সায়মা_নূর 
গ্রামের গরম যেন আলাদা এক অনুভূতি—শহরের মতো কংক্রিটে আটকে থাকা তাপ নয়, বরং মাটির গন্ধে মিশে থাকা এক ধরনের ঝাঁঝালো উষ্ণতা। দুপুরবেলা মাঠের ওপর দিয়ে গরম হাওয়া বয়ে যায়, তালগাছের পাতা কাঁপে ধীর ছন্দে, আর পুকুরের পানি পর্যন্ত যেন নিস্তেজ হয়ে থাকে। 
এমন সময় দূরে কোথাও কোকিল ডাকে, আর সেই ডাকের মাঝেই বোঝা যায়—জাম পাকার দিন এসে গেছে।জামগাছের নিচে ছায়াটা হয় সবচেয়ে শান্ত। গাছভরা কালচে-বেগুনি জাম, টুপটাপ করে পড়ে মাটিতে। ছোট ছেলেমেয়েরা লুঙ্গি বা গামছা পেতে দাঁড়িয়ে আছে। কে আগে কুড়িয়ে নেবে সেই প্রতিযোগিতা। কারও হাত, কারও ঠোঁট—সবই রঙিন হয়ে যায় জামের রসে,যার উপর পাকা জাম পড়ছে তারই পোশাক জামের রঙে রঙিন হয়ে যাচ্ছে।
তবুও সেদিকে কারো খেয়াল নেই একটু টক, একটু মিষ্টি জামের স্বাদ, যেন গরমের ক্লান্তি ভুলিয়ে দেয় মুহূর্তেই।মায়া বসে আছে বাড়ির উওর দিকের শেষ প্রান্তে,বসে বসে দেখছে ক্ষেতের ওই প্রান্তের বাড়ির আঙিনায় জাম গাছের নিচে বাচ্চাদের হৈ চৈ, তার জ্বর সেরেছে, দুইদিন জ্বরে ভুগছে সে, এখন সুস্থ তবে মুখটা মলিন, অসুস্থতার প্রলেপ লেপ্টে আছে চেহারায়। 
জাম গাছের নিচে বাচ্চাদের দিকে তাকিয়ে মায়া ভাবছে,  এই গাছের নিচে যদি সে থাকতো আর সে যদি এভাবে কাপড় নষ্ট করে জামকুড়াতো তাহলে এতক্ষণে তার মা আরিজার হাতের কয়েকটা কিল তার পিঠে যায়গা পেয়ে যেতো।মনটা ভালো নাই তার মায়ের কথা মনে পরছে খুব।বড়আব্বাকেও মনে পড়ছে, ঈদের কয়েকদিন আছে মাত্র, এখন পর্যন্ত ঈদের নতুন পোশাক কেনা হয়নি তার,, এত দেরি নতুন কাপড় কিনতে কখনই হতো না নিজের বাড়িতে থাকলে। 
এতদিনে সে একশ বার তার বড়আব্বাকে বলে ফেলতো নতুন পোশাক কিনে দেওয়ার কথা। আর বাদশা মিয়াও সবার আগেই তাকে কিনে দিত, কিন্তু এটা শ্বশুর বাড়িতে তার প্রথম ঈদ, মন খুলে মুখ ফোটে কাউকে কিছু বলতে পারছে না। 
নারগিস ও নেই সে চলে যেতেই মায়া সঙ্গীহীন হয়ে গেছে, বাড়িতে মাত্র তিনটা মানুষ,সে তার শাশুড়ি আম্মা,আর দাদী শাশুড়ি।শশুর এর স্কুল ছুটি ঈদের জন্য তাই সেও দোকানে ছুটে আর মীরও দোকানে ব্যস্ত ঈদের সময়টা খুব বেচাকিনা হয়। 
মীরের সাথে দুই দিন ধরে তার সাক্ষাৎ হচ্ছে না,আসলে সময় মিলছে না। মীরের রাতে ফিরতে দেরী হয় তখন মায়া ঘুমিয়ে পরে। আর সেহরির পরে মসজিদে নামাজ পড়তে যায়, সেখান থেকেই দোকানে চলে যায়। মায়ার জ্বর থাকার কারণে তাকে সেহেরীতে ডাকা হয়নি, তাই দেখা হয়নি লোকটার সাথে।সবমিলিয়ে মায়ার মনে হঠাৎ অভিমান ভর করেছে। 
তবে অভিমানটা কার ওপর সে বুঝতে পারছে না।তাই মন খারাপ করেই দুপুর বেলা বাড়ির শেষ আঙ্গিনায় চুপচাপ বসে আছে।নারগিসের বলা কথাগুলো হজম হয়ে গেছে তার, হবেই বা না কেন,কপালে যার দাদি শাশুড়ি রাজিয়া বেগমের মত একজন বুড়ি থাকে। তার এর থেকেও বেশি ডেঞ্জারাস বিষয় হজম করতে শিখতে হয়। রাজিয়া বেগম নারগিসের থেকেই চারগুণ বেশি ফরজ গোসল আর স্বামী স্ত্রীর স হ বা স সম্পর্কে বুঝিয়েছে  তাকে। তাই বেশি শুনতে শুনতে এখন ভয় কেটেই গেছে তাঁর।
আসরের ওয়াক্তে বাদশা মিয়া ভাতিজির শশুর বাড়ী এসে হাজির হলো, ঈদে ভাতিজির শশুর বাড়ীর সবাই জন্য কেনাকাটা করে এনেছে সাধ্য অনুযায়ী। মায়ার জন্য বাসন্তী রঙের একটা শাড়ি কাপড় এনেছে, মন্জু খাতুন এর জন্য কলাপাতা রঙের আর রাজিয়া বেগমের জন্য আকাশী রঙের শাড়ি কাপড় এনেছে, বেয়াই আরশাদ আলী শাহর  জন্য সাদা লুঙ্গি, আর একমাত্র ভাতিজির জামাই মীরের জন্য কালো লুঙ্গি সাদা পাঞ্জাবি। 
তাছাড়া নিজের ক্ষেতের টাটকা সবজি সহ নিজেদের মাঠে চাষ করা পোলাওয়ের চাউল/,হাতে বানানো পিঠা, হাতে বানানো সেমাই, গাছের নারিকেল, কলসি ভরা গরুর দুধ, নিজেদের খেজুর গাছের রস দিয়ে হাতে বানানো খেজুরের গুড়, আরিজা বেগমের নিজের খামারের পালা দুইটা হাঁস আর চারটা দেশি মোরগ,পুকুর থেকে তোলা টাটকা দেশি মাছ। গাছ পাকা বেল, জাম্বুরা,জাম ।ভ্যান ভর্তি করে নিয়ে হাজির হয়েছেন তিনি।যা উঁকি ঝুঁকি মেরে দেখছে পুরো গ্রাম  আশেপাশের বাড়ির প্রতিবেশীরা। তারা তখন মীরের শ্বশুরবাড়ির প্রশংসায় পঞ্চমুখ,তার কারণ প্রতিটি জিনিস তাদের হাতের গড়া।কাপুর গুলো ছাড়া,বাকি একটাও বাজার থেকে কিনে আনতে হয় নি তাই।
চাচা শ্বশুরের আগমনের কথা শুনে মীর দোকান কর্মচারীদের কাছে রেখে দ্রুত বাড়ি আসে, আর এসেই দেখে তার বউ নাকের জলে চোখের জলে। বাদশক মিয়া এই বাড়িতে পা রেখেই শুনতে পেরেছে মেয়ের অসুস্থতার কথা,আর এখন মেয়েকে কাঁদতে দেখে সে অস্থির, গোমরা মুখে বসে শুনছে মেয়ের আহাজারি। মীর বারান্দায় দাঁড়িয়ে স্পষ্ট শুনছে মায়ার বলা কথাগুলো।
 মায়া : বড়আব্বা আম্মা কেমন আছে, দাদি কেমন আছো চাচাতো ভাই এর কথা জিজ্ঞেস করে। বড়আব্বা আমার এইনো ভালালাগেনা আন্নে হেগরে কন আমি আন্নের লগে বাড়িত জামু।
বাদশা: কিন্তু আম্মা আন্নে তো ক‌ইছিলেন এইবার ঈদ আন্নে এনোই করবেন তয় এহন এইকতা কেন ?সরল মায়ার অভিমানে বুক ফুলে উঠে, সংকোচ ছাড়াই মুখ ফুটে বলে দেয়
মায় : হেইডা আমার ইচ্ছা ছিল না আপনার জামাই বাবার ইচ্ছা দিছ।হেয় যা ক‌ইবার ক‌ইছিল তাই ক‌ইছি‌। ভাতিজির কথায় বাদশা মিয়া বুঝতে পারলো জামাই চাচ্ছে এই ঈদে মায়া তার কাছে থাকুক। বাদশা মিয়া পুরুষ মানুষ,তাই একজন পুরুষের মনের ভাব বুঝতে পারে। বিয়ের পর তিন নাম্বার ঈদ এটা, তিন বছর পার হয়ে যাচ্ছে মেয়েটা এখনো উপযুক্ত হলো না।পুরুষ মানুষ এতদিন ধৈর্য ধরে আছে এটাই তো অনেক, তাই সে জামাইয়ের ইচ্ছার বিরুদ্ধে যাওয়ার সাহস করল না। ভাতিজি কে বুঝিয়ে রেখে গেল। বিয়াই মশাই আরশাদআলী কে অনুরোধ করে বলে গেল ঈদের পরের দিন মেয়েকে যেন আনন্দপুর নিয়ে যাওয়া হয়।
বাদশা মিয়া চলে গেল সন্ধ্যায় ইফতারির পরে। তাকে বিদায় দিয়ে মীর আজ আর দোকানে ফিরলো না। রাস্তা থেকেই বাড়িতে চলে এলো, তার মন ভালো নেই মায়ার বলা কথা তার মনে অশান্তি সৃষ্টি করেছে। সে কখনোই তার বউকে অযত্নে রাখে নাই। সব প্রয়োজন পূরণ করে, তার ভালো-মন্দ খেয়াল রাখে। তাহলে কেন চলে যেতে চাইলো, কেন বললো ভালো লাগেনা।বাড়ির উঠান ফাঁকা, মীর এসব ভাবতে ভাবতে নিজের ঘরে ঢুকে, মায়া তখন তার ঘরেই ছিলো। বাদশা মিয়া তার জন্য যা যা কিনে এনেছে তাই গুছিয়ে রাখছিল।
 মীর বাড়ি নেই তাই দাদি রাজিয়া সহজেই সন্ধ্যার পর তাকে এই ঘরে আসতে দিয়েছে। কিন্তু এখন মীরকে দেখে মায়া অবাক হল খুব।মীরও অবাক হলো তবে প্রকাশ না করে এগিয়ে গিয়ে বিছানায় বসলো।‌মায়া হাতের কাপুর রেখে পা বাড়ায় দরজার দিকে।
মীর : আমি কি তোমারে যাইবার ক‌ইছি বউ?
মায়া দাঁড়িয়ে পরে, সবসময়ের মত সহজ সরল মায়া বলে।
মায়া : বু কয় রাইতে আন্নের লগে এক ঘরে থাকা যাইবো না,তাই।
মীর : বু কি তোমার স্বামী লাগে যে হের কতা এতো মানবা তুমি।
মায়া : আল্লাহ বু স্বামী হইব কেমনে হেয় তো বুড়া বেডি একটা ! স্বামী তো আন্নে।
মীর : তয় তার কতা এতো মানো যে!ক‌ই আমার কতা তো মানো না।
মায়া : আন্নের কতাও তো মানি সব।
মীর : হ তার নমুনা তো দেখছি আইজ, আমার বলা গোপন কতা তুমি তোমার বাহেরতাই (বড়বাবার কাছে)কইলা! কেন?এবার মায়ার ভেতরের অভিমান গুলো গলে চোখের পানি হয়ে বইতে লাগলো। মায়া কে কাঁদতে দেখে মীর অবাক হলো, বিছানা থেকে উঠে দাঁড়ালো মূহুর্তে ,কিছু বলতে যাবে তার আগে মায়া নাক টেনে কান্নরত কন্ঠে বলল।
মায়া : আমারে ঈদের কেনাকাটা এখনো ক‌ইরা দেন নাই আন্নে।নারগিস আফা ক‌ইছে যাগোর বিয়া হয় তাগো তো স্বামী ঈদে কতোকিছু কিনা দেয়। বাড়িত থাকতে দশ রোজায় বড়আব্বা আমারে সব কিনা দিছে সবার আগে। কিন্তু এই বাড়িত আমার কোনো কিছুই হয় না আগে। সব বু এর ইচ্ছায় হয়,আর এহন নারগিস আফা নাই তাই একলা এই বাড়িত থাকতে আমার ভালা লাগেনা।
মীর : এই বাড়িত ভালা না লাগলেও এনোই থাহুন লাগবো তোমার, কারণ এই বাড়িত তোমার স্বামী থাহে। আর বিয়ার পর মাইয়াগোল স্বামীর লগে থাহুন লাগে, তোমারোও থাহুন লাগবো‌ তা তোমার ইচ্ছার বিরুদ্ধে হ‌ইলেও আর কাইন্দা ভাসাইলেও, এহন এইডাই তোমার বাড়ি বাপের বাড়িত তোমার কিছুই নাই বুঝছো। মায়ন কান্না করে,অভ্যাসগত ভঙ্গিতে কাঁদতে কাঁদতে বলল।
মায়া :হ হ বুঝছি! 
মীর:কি বুঝছো !
মায়া : আন্নেগোর ইচ্ছায় হ‌ইবো সব।
মীর : আরে আমার কতায় কি তাই বুঝা যায়?
মায়া : তয় কি বুঝা যায়?
মীর অস্থির শ্বাস ফেলে,সে বুঝাচ্ছে এক আর তার বউ বুঝছে আরেক। এই ছোট ব‌উকে সে কিভাবে বুঝাবে, ব‌উকে ছাড়া সে নিজেই থাকতে চাচ্ছে না। তখনকার চাচার কাছে অভিযোগ করা কথাগুলো শুনে যে তার মনে অশান্তি সৃষ্টি হয়েছে। যত যাই হোক মায়ার এই বাড়িতে থাকতে ভালো লাগে না কথাটি মীরের সহ্য হচ্ছে না। 
ইদানিং মীর মায়াকে ছাড়া থাকতে পারছে না। হক মায়া উপযুক্ত নয় তার সাথে ভাব বিনিময় না হক তবুও মায়া তার সামনে থাক এটাই তো শান্তি।মীর নিজেকে শান্ত করে ডান হাত বাড়িয়ে ইশারা করে মায়াকে বলে।
মীর : এনো আমার কাছে আও এহনি, চাইর দিন ধ‌ইরা চুমা খাই না আমি,চুমার অভাবে হাহাকার করতাছে বুকে। মায়া মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে অশ্রু বিসর্জন করছে নিরবে। সে আগাচ্ছে না দেখে মীর আবার বলে।
মূর: বউ তুমি কি হুনবার পারনাই আমার কতা,কাছে আও জলদি।
মায়া : না আইতাম না!
 মীর : কারন ?
মায়া : আন্নের মুহে বিড়ি বাস(গন্ধ) করে চুমার গলে আমার মুহেও আহে্ বিড়ির বাস। মীর অবাক হয়, এতো দিন ধরে চুমু খাচ্ছে আর এই মেয়ে কিনা আজ এই কথা বলছে। তাকে উপেক্ষা করে এখনো দূরে দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু মীরও নাছোড়বান্দা সে যখন মুখে বলেছে চুমু খাবে তাহলে সে খাবেই। নিজের ইচ্ছাকে কখনোই সে দমিয়ে রাখেনি।
 মীর এবার এগিয়ে গিয়ে সামনে ঢেক্সুর উপরে রাখা শাবান লেজেন্স এর কৌটো থেকে একটা লজেন বের করে মুখে দেয়। মায়া ভ্রু কোচকে তাকিয়ে দেখে মীর কে। মীর লজেন্স চাবাতে চাবাতেই মায়ার দিকে হাঁটে। কাছে এসে মায়ার কমর জড়িয়ে ধরে বলে।
 মীর : আমার বিড়ি টানা ঠোঢে তোমারে চুমান ফরজ কাজ বউ অভ্যাস করো।বিসমিল্লাহ উম্মাহ উম্মাহ উম্মাহ.....মীর মায়ার গালে,মুখে চুমু খায় অনেক ।
মীর : আর তোমার অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান ও চিকিৎসাসহ মৌলিক ভরণ-পোষণের দায়িত্ব আমার ওপর ফরজ বা বাধ্যতামূলক বউ।
মায়া : তয় আমার কি কাম ?
মীর : তোমার কাম আমি ডাকলেই আমার ডাকে সারা দাওয়া। কাছে আ‌ইতে ক‌ইলে আওয়া। আমি যতো ইচ্ছা চুমামু, তোমার বাঁধা না দেওয়া বুঝতো ।মায়া মাথা নাড়ায় মুখে বলে। 
মায়া : আইচ্ছা মীর মায়া কে বিছানায় বসিয়ে খাটের নিচ থেকে একটা বড় চামড়ার ব্যাগ বের করে। ব্যাগ খুলে ব্যাগের ভেতর থেকে পাঁচটা পাঁচ রঙের শাড়ি কাপড় বের করে বিছানায় রাখে। সঙ্গে এক বক্স চুরি, নেলপালিশ, লিপস্টিক ,কাজল, আই ব্রো এবং নতুন আনা আলতার কৌটা ,দুই ধরনের চামড়ার জুতা।
মীর : এই নেও বউ, আমার দোকানের লেটেস্ট মডেলের নতুন তোলা সবচেয়ে দামি কাপড়,এঢি তোমার ঈদের কাপড় আর সাজন পাতি সব। চাইরদিন আগেই আনছি কিন্তু তহন তোমার জ্বর আসিলো তাই দেওয়ার সুযোগ পাই নাই। দেহতো পছন্দ হ‌য় নাকি বউ?মায়া হা করে তাকিয়ে আছে,এতো সুন্দর কাপড় জীবনে দেখেনি সে, চোখে জল নিয়েই হাসলো মায়া বললো।
মায়া : এত্তো সুনদর কাপড় আমি জিবনেও দেহি নাই।
মীর : জীবনডা কতাঢুক তোমার! তয় এহন থেকে আজীবন দেখবা। এবার খুশি তো বউ?
মায়া : হ মেলা খুশি,,,সবডি আমার?
মীর : সব তোমার‌ই,এইবার অভিমান শেষ হ‌ইছে আমার বউর,আর ক‌ইবা এনো থাকতে ভালা লাগেনা হুম" 
মায়া : না আর ক‌ইতাম না,কিন্তু ঈদ তো একটা দিন থাহে,এতো কাপড় পড়ুন কহন! মীর হলুদ রঙের শাড়িটা তুলে মায়ার মাথা সহ গোটা শরীরে পেঁচিয়ে দিয়ে বলে।
মীর : চান রাতের দিন একটা পরবা, ঈদের দিন সহালে একটা পারবা, দুফুরে একটা পরবা,বিহালে একটা পরবা আর রাইতে একটা পরবা বুঝছো আমার হইলদা টিয়া বউ।কথাগুলো শুনেই মায়া খিলখিল করে হেসে উঠলো। হ‌ইলদা টিয়া শুনে মায়া খুব খুশি হলো তা দেখে অন্তরে শান্তি অনুভব হলো মীরের।
মায়া : আমি হ‌ইলদা টিয়া?
মীর : হ আমার হ‌ইলদা টিয়াপাখি তুমি। কেন পছন্দ হয় নাই আমার দেওয়া অদুইয়া নাম 
মায়া : হ‌ইছে তো অনেক সুনদর।মীর মায়া কে আবারো শক্ত করে চেপে ধরে ঠোঁটে গাভীর চুমু আঁকলো।মায়া দুহাতে মীরের শার্টের বুকের অংশ খামচে ধরে। মীরের এতো কাছে আসাতে হঠাৎ মায়ার।নারগিসের আর রাজিয়া বেগমের বলা স হ বা স সম্পর্কের কথা মনে পরে গেলো, মূহুর্তেই মায়ার শরীর কম্পন ধরল। মীর অনুভব করলো তা তবে মায়াকে না ছেড়ে আরো শক্ত করে ধরে চুমু দিয়েই গেল। মীরর চিন্তা বরাবরই অন্য ধাঁচের,এইসব তো হবেই তাদের মধ্যে তা এতো সময় দেওয়ার কি আছে,তার থেকে বরং বউ কাঁপতে কাঁপতেই মেনে নিক তাকে। তাছাড়া যথেষ্ট সময় তো সে দিচ্ছে বউকে উপযুক্ত হওয়ার, এটাই তো অনেক, এর থেকে বেশী আশা কি, কোনো পুরুষ মানুষের কাছে করা যায়।
পরদিন থেকে আবারো আগের মতোই দিন চলতে থাকে। মায়া আগের মতোই মীরের কাছে যায়।কথা বলা সব ঠিক চলছে। রাজিয়া বেগম তা দেখে ভাবলো তার বুঝানো কাজে লেগেছে। কিন্তু সে তো আর জানে না তার নাতি কত চালু মাল। তলে তলে ঠিকই সে তার ছোট বউকে তার পছন্দের জিনিস দিয়ে খুশি করে রেখেছে।দেখতে দেখতে ঈদ চলে এলো, চাঁদ রাতের দিন সন্ধ্যা পর্যন্ত মায়া শাশুড়ির সাথে সংসারের কাজ করলো অনেক।
বাড়ি ঘর ঝাড়ু দিয়ে পরিষ্কার করা, বিছানার চাদর পরিবর্তন।মন্জু খাতুনের সব ধরনের কাঁচা মসলা বাটায় সাহায্য করা, মীরের কাপড় কাচা, টিউবল থেকে পানি উঠানো আবার শশুরকে খাবার বেড়ে খাওয়ানো। একগাদা থালা বাসুন পুকুরের পানিতে ধোঁয়া। এসব করতে করতে সন্ধ্যা হয়ে গেছে। মায়া সন্ধ্যায় গোসল করেছে এবং মীরের বলা কথা মাথায় রেখেই। মীরের এনে দেওয়া কাপড় থেকে হলুদ রঙের শাড়ি পরেছে। পায়ে আলতা দিয়েছে, গাছ থেকে তুলে রাখা মেহেদি পাতা মন্জু খাতুন বেটে দিয়েছিল, সেই বাটা মেহেদি দিলো হাতের আঙুলে এবং তালুতে গোল বৃত্তের মতো মেহেদী লাগালো।
 মেহেদী শুকিয়ে যেতেই, শুকনো মেহেদি তুলে হাতে সরিষার তেল মেখে নিল এতে করে মেহেদির রং দ্রুত গারো হয়।হঠাৎ করেই বাহিরে কারো কান্নাকাটি শব্দ শুনেই মায়া দ্রুত বাহিরে এলো।দেখলো নারগিস দাঁড়িয়ে কান্না করছে। নারগিসের পাশেই একটা বুড়া লোক মুখ কালো করে দাঁড়িয়ে আছে। মায়া চিনলো এটা নারগিসের শশুর। মীর ছাড়া বাড়ির সবাই আছে। এমন কি মায়ার দেবর শাহজাহান ও আছে, গতকাল সন্ধ্যায় শাহজাহান এসেছে, মাদ্রাসা ছুটি তো আরো আগে হয়েছে তবে সামনে তার পরীক্ষা তাই সে এতদিন আসেনি। 
উপস্থিত সকলের কথা শুনে মায়া যা বুঝল।নারগিস নাকি খুব কান্নাকাটি করছিল বাড়িতে আসার জন্য তাই তার শশুর বাধ্য হয়ে তাকে রেখে যেতে এসেছে। এবং এটাও বলছে আলআমিন অনেক ক্ষেপে আছে। নারগিসর এমন বাচ্চামি ব্যবহারে,বিয়ের পর এখন পর্যন্ত শশুর বাড়ি একটাও ঈদ করেনি নারগিস। ঐ বাড়িতে থাকেও না বেশি দিন। তাদের কথার মাঝেই মীর এসে উপস্থিত হয়।এবং সমস্ত বিষয়ে শুনলো। এতদিন মীরের এই সমস্ত ব্যাপারে কোন মাথাব্যথা ছিল না।
বরাবরই ভাবতো তার বোন ছোট , তাই সব সময় বোনের পক্ষ নিয়েছে। কিন্তু এখন মীরের নারগিসের এই আচরণ বেয়াদবি মনে হচ্ছে। তার বউ যদি এই আচরণ করতো তবে অবশ্যই সে রেগে যেত। যেমনটা আলআমিন রেগে গিয়ে নারগিসকে থাপ্পড় মেরেছিল। মীরের তো সামান্য মায়ার তার বাবার কাছে কান্না করে থাকবে না বলাটাই সহ্য হয়নি।
তাহলে আলআমিন কতটা সহ্য করছে।বাড়ির সবাই নারগিস কে বোঝাচ্ছে, অন্তত ঈদের দিন টুকু শ্বশুরবাড়িতে কাটিয়ে পরের দিন চলে আসার কথা বলছে। নারগিসের শশুরো বসে আছে। তার ছেলে খুব রেগে আছে। কালকে একটা ঈদের দিন ছেলেটা মন মেজাজ খারাপ থাকুক তা উনি চায় না, তাই ধৈর্য ধরে একটু বুঝিয়ে শুনিয়ে যদি বৌমাকে সঙ্গে নিতে পারে। তাছাড়া নারগিসকে উনি পছন্দ করে ছেলের বউ বানিয়েছে। এ কারণে ছেলের মায়ের কথার শেষ নেই। নারগিসের সাথে বিয়ে করিয়ে তার ছেলের জীবন নষ্ট হয়ে গেছে।
এই বলে বলে মাথা নষ্ট করে দেয় সারাদিন মহিলা। তাই নারগিসের শ্বশুর নিজের স্ত্রীর কথার হাত থেকে বাঁচার জন্য চুপচাপ বসে আছে। কালকে একটা ঈদের দিন নিজের স্ত্রী ছেলের গোমরা মুখ দেখতে সে ইচ্ছুক না।তবে নারগিসেরর ন্যাকা কান্না করেই যাচ্ছে।
রাজিয়া : আমার বুবু না ভালা এমন করিস না, সোয়ামির মনে আঘাত দিলে গুনাহ হয় তো,তোর সোয়ামির ইচ্ছাডাও বুঝ আইজ যাগা ঈদের পরের দিন আইয়া পরিছ।
নারগিস : না না না আমি ঐ বাইত ঈদ করুম না, আমি যাইতাম না
মন্জু : কেন যাইতি না,বিয়া কি তুই একলাই ব‌ইছোস,তর চেও ছুডো মাইয়ারা কি জামাইবাইত থাহে না! এমন চললে সংসার টিকবো?
নারগিস: তা আমি হুনবার চাই না আম্মা, আমি যাইতাম না যাইতাম না যাইতাম না।এসবের এক পর্যায়ে মীর প্রচুর রেগে যায়। ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যায় তার এবং রেগে গিয়ে নারগিসের গালে জোড়ে একটা থাপ্পড় বসিয়ে দেয় দিয়ে বলে।
মীর : শু য়ো রে র  বাচ্চা নাটক চো দা স, এখন এই মুহূর্তে তুই শশুর বাড়িত যাবি,ঐ বাড়িই তোর আসল বাড়ি এই বাড়িত এহন তুই মেমান(মেহমান)বুজছোস, জামাই ছাড়া আর এনে আবিনা,যহন আ‌ইবি জামাইয়ের লগেই আইবি।এক মুহূর্তে পুরো বাড়ি স্তব্ধ হয়ে গেল, প্রত্যেকে অবাক হলেও প্রচুর, সব সময় মীর তো উল্টাসুরের গান গাইতো। আজকে যেন সঠিক সুরের গান গাইলো। নারগিস ও কান্না থামিয়ে চুপ হয়ে গেল,,এই শাসন টাই যথেষ্ট ছিল নারগিসের পাগলামি ঠিক হবার জন্য। নারগিস সবার সাথে বসে রাতের খাবার খেলো।এবং ভালোভাবে সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে, শ্বশুরের সাথে চুপচাপ শ্বশুরবাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে গেল।তবে মীরের এমন আচরণে খুব ভয় পেয়ে গেল মায়া। সে ভুলেও মীরের মুখের দিকে তাকাচ্ছে না। 
২৯ বছর বয়সী মীরের তা বুঝতে সমস্যা হলো না সে বুঝে নিল। তার রাগান্বিত রূপ দেখাই বউর এই চুপসে যাওয়া।রাতে ঈদের চাঁদ দেখার জন্য।মায়া বারান্দায় এসে দাঁড়ালো। মীর যেনো এই সুযোগের অপেক্ষায় ছিল,সে এক মূহুর্ত দেরি না করে। মায়াকে পাঁজা কুলে তুলে দক্ষিণ দিকের বাগান ধরে হাটা লাগলো।
মায়া : আরে আরে কি করতাছুইন!ক‌ই নিতাছুই আমারে?
মীর : আমার হ‌ইলদা টিয়ারে চান দেহাইবার নেই। বিয়ের পর আমাগোর একলগে প্রথম ঈদ দুইজনে একলগেই চান দেখুম কথাটি বলতে বলতেই সুপারি বাগানের ভেতর দিয়ে বড় বড় পা ফেলে সামনের দিকে হাঁটতে থাকে মীর। হালকা চাঁদের আলোতে অন্ধকারে মায়া ভয়ে চুপ করে থাকে। তাকে চুপ থাকতে দেখে মীর বলে। 
মীর : মুহের(মুখের)ভিতর কি ঘাও হ‌ইছে বউ,কতা ক‌ও না যে।চান দেখবা না আমার লগে?
মায়া : না দেখতাম না চান। মীর এক হাত দিয়ে মায়ার গালে আলতো করে চেপে ধরে বলে।
মীর :কি ক‌ইছো বউ আবার ক‌ও মায়া ছটফট করে উঠলো। নিজের গাল থেকে মীরের হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করে বলল। 
মায়া : উমমমমমম দুক্কু লাগে, ছাড়ুন আন্নের হাত মেলা শক্ত। 
মীর :না তোমার গাল মেলা নরম মীর হাসলো, মায়ার গাল ছেড়ে দিলো বাগান পার হয়ে অনেকটা হেঁটে এসে কদম ফুল গাছের নিচে থামলো। তবে কোল থেকে মায়া কে নিচে নামালো না মীর মায়াকে কোলে নিয়েই কদম গাছের গোড়ায় বসে পরে। গাছ ভর্তি কদম ফুল ফুটে আছে,  কদমের গন্ধে জায়গাটা মোহনীয় হয়ে আছে।সামনে বিশাল ধান ক্ষেত, উপরে খোলা আসমান আর তার মধ্যখানে অর্ধ বাঁকা চাঁদ, জায়গাটা খুব মনোমুগ্ধকর, মায়া মাথা ঘুরিয়ে চতুরদিকে দেখে। 
মীর: কি পছন্দ হ‌ইছে জায়গাটা?
মায়া : হ অনেক সুনদর
মীর : হায় হায় বউ রাইতে বাইরে কিছু দেখলে সুন্দর ক‌ওয়া লাগেনা। খারাপ কিছুতে হুনলে সর্বনাশ। মায়া ভয়ে মীরের গলা আঁকড়ে ধরে মূহুর্তেই, মীর তো এটাই চাইছিল,সেও দুই হাতে শক্ত করে মায়া কে জড়িয়ে নেয় বুকে। চোখ বুজে বলে
মীর : বউ তোমার অঙ্গ মেলা নরম,আমার ভেতরের মানুষটা তোমার গায়ের বিশেষ অংশে হাত দিতে খালি খোঁচায়।কি করমু ?
মায়া :কি ? কি অংশ মীর মায়া কে ছেড়ে দিয়ে, তাকায় তার মুখে,মুখ থেকে গলা,গলা থেকে বুকের কাছে দৃষ্টি এনে থামায়। বিনা সংকোচে মীর সেই বিশেষ অঙ্গে ইশারা করে। তার ডান হাতের তর্জনী আঙুল দিয়ে মায়ার বুকের শাড়ির অংশে হালকা খোঁচা মেরে বলে। 
মীর :এই যে এই অংশে মায়া শুকনো ঢোক গিলে, অনেক অজানা জিনিস গুলো সে এখন জানে। তার শরীরটা হালকা কাপছে, মীর অনুভব করছে বেশ। যখন থেকে মীর জানতে পেরেছে মায়া স্বামী স্ত্রীর সম্পর্ক সম্পর্কে অবগত হয়ে গেছে তখন থেকে মীর তার মুখের কথা লাগামহীন করে দিয়েছে। যা আগে কখনো বলেনি তা বলতে শুরু করেছে। 
মীর :বউ আবারো আমার গলাডা জরাইয়া ধরো তো শক্ত কইরা।আরো একটু অনুভব করি তোমার নরম গা।মায়া শুনে তার কথা,কাঁপা হাতে পূর্ণের নেয় আবারো মীরের গলাটা জড়িয়ে ধরে। মীর এবার আগের থেকেও শক্ত করে চেপে ধরে তাকে।
মায়া : আহ্ দুক্কু পাই তো।
মীর : পাইলে পাও, সহ্য কর।কথাটি বলেই মীর অস্পষ্ট সুরে বিসমিল্লা বলে,মায়ার উন্মুক্ত ঘাড়ে ঠোঁটে চেপে ধরে। মায়া সত্যিই চোখ বন্ধ করে সহ্য করছে সব, ইদানিং মীরের স্পর্শে সেও অন্য রকম কিছু অনুভব করে।
চলবে......

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৮ম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন