#নিষিদ্ধ_নীল_চিঠি
#পর্ব_১৪
#সায়মা_নূর
আরশাদ আলী অনেকক্ষণ চুপ করে বসে থাকে। উঠানের মাটিতে গেঁথে থাকা কুড়ালের দিকে তাকিয়ে তার বুকটা কেঁপে ওঠে। সে বুঝতে পারে। আজ এই ঝগড়া না থামালে ঘর ভাঙ্গন শুরু হয়ে যাবে। আরশাদ আলী ধীরে ধীরে উঠে পাশের বাড়িতে যায়। যেখানে রাজিয়া বেগম আশ্রয় নিয়েছে।
আরশাদ : আম্মা লন বাড়িত লন এমনে পালাইয়া থাকলে কিছু সমাধান হইবো না। রাজিয়া বেগম ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে মাথা নাড়ে।
রাজিয়া :আমি ওই বাড়িত আর যামু না। তোর পুতে আমারে মাইরা ফেলইবো ! আরশাদ আলী দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে।
আরশাদ : আন্নে না গেলে ঘরটা ভাঙবো পোলাডা আগুন হইয়া গেছে। আন্নের কি দরকার আছিলো বৌ এর বাপের তাইন (বাপের কাছে) বৌ সমন্ধে ঐ কতা কওয়ার! আম্মা আন্নের কতায় আমি বেয়াইরে এক মাসের সময় দেওয়াও কতা কইছিলাম না? হুনছিলাম তো আন্নের কতা। কিন্তু আন্নে এইডা কি কাম করলেন? ঐ কথা কি আন্নের কওয়া ঠিক হইছে?
রাজিয়া : যা কইছি ঠিকই তো কইছি!
আরশাদ : আন্নের ঠিক ভুল আন্নের কাছেই রাহুইন। আমি আন্নের কথা হুনছিতো,এহন আন্নেও আমার কতা হুনুইন, লন আমার লগে নাইলে সংসার ভাঙ্গবো।
রাজিয়া : সংসার ভাঙ্গলে ভাঙ্গবো, নতুন সংসার হইবো ঐ মাইয়া হাছাই(সত্যি)গুড়মা,ওরে দিয়া সংসার হইবো না। আরশাদ আলী যানে তার মা ঘাড় তেড়া। কিন্তু তার ছেলেও তো বউ এর জন্য হিংস্র বাঘ হয়ে আছে। তাকে আপাতত ঠান্ডা না করলে সত্যি সত্যি ঝামেলা বড় হয়ে যাবে। আরশাদ আলী এর একটা সম্মান আছে। সে কিছুতেই সম্মান নষ্ট হোক এমন কিছু করবে না।
তাই তার মাকেই বোঝাতে চেষ্টা করে।অনেক বুঝানো হলো। গ্রামের দু-একজন মুরুব্বিকে সাথে নিয়ে। শেষ পর্যন্ত রাজিয়া বেগমকে রাজি করানো হয় কিন্তু সে শর্ত দেয়। মীর যেন তার সামনে না আসে। আর মায়া উপযুক্ত না হলে দুজনকে একসাথে থাকতে দেওয়া যাবে না। আরশাদ আলী আপাতত মায়ের কথার তালে তাল মিলালো নয়তো তাকে সঙ্গে নেওয়া অসম্ভব।
মীর বসে আছে বড় কদম গাছের নিচে। সেই কদম গাছ যার নিচে সে তার বউকে কোলে নিয়ে বসে ঈদের চাঁদ দেখেছিলো। কি মন মুগ্ধকর আবেগপ্রবণ ছিল সময়টা।ভাবেই মীর একের পর এক বিড়ি টানছে।মীরের বুকের ভেতরটা দাউ দাউ করে জ্বলছে রাগ। অপমান আর অসহায়তার আগুনে পুড়ে এক অস্থির মানুষে পরিণত হয়েছে সে।
নিজের প্রিয় মানুষকে নিয়ে অপমানের কথা শুনে তার বিবেক আর সংযম দুটোই যেন ভেঙে পড়েছে।মায়ার সেই চিৎকার-কান্নার শব্দ তার কানে এখনো ভেসে আসছে। অচেনা এক ভয় তাড়া করছে তাকে যদি সত্যিই তার বউকে আর না দেয়।তখন কি করবে সে মীর সিদ্ধান্ত নিয়েছে পরিবার থেকে আলাদা হতে তার কোনো আপত্তি নাই।
তবে যাকে নিয়ে আলাদা হতে চায় সেই যদি ফিরে না আসে তখন? তখন কি মীর সালিশ ডাকবে দরবার বসাবে। কিন্তু মায়া অপউযুক্ত এটা বললেই তো সে সালিশে হেরে যাবে। তখন আর তার কথা কেউ কান দেবেনা। এ সমাজ অপউযুক্ত একটা মেয়ের সাথে সংসার করতে দেবে না।
সমাজের এ কেমন নিয়ম অপউযুক্ত একটা মেয়েকে বিয়ে করা যায়। কিন্তু সংসার করা যায় না? রাগে মীরের ইচ্ছা করছে যে এই নিয়মটা বানিয়েছে তার মাথা ফাটিয়ে দিতে। মীর কদম গাছের নিচে পায়চারি করতে থাকে। আর ভাবতে থাকে কি করবে।ভাবতে ভাবতে আবারো রাগে তার মাথা গরম হয়ে যায়, সে পুনরায় বাড়ির দিকে হাঁটা ধরে।
মাগরিবের আজান পড়েছে আরশাদ আলী তার মাকে নিয়ে বসে আছে। বাদশা মিয়ার ঘরে। আদরচাঁন বেগম চিৎকার চেঁচামেচি করছে তাদেরকে দেখে। রাজিয়া বেগম শক্ত মুখে বসে সব শুনছে।
আদরচাঁন : কেলা কেলা(কে) কেল্লাইগা আইছে আমার বাড়িত। আমার নাতনিরে কান্দানে লাইগা দিনে রাইতে তামাশা চলতাছে। আমার নাতনিরে কি ফালাইন্না(ফেলনা) মনে করছে রে যার যেমনে ইচ্ছা হেমনেই কান্দাইবো অলক্ষীর বিছূইন সব।
বাদশা : আহ্ আম্মা চুপ থাহুইন!
আদরচাঁন : গোলামের পুত তুই চুপ থাক। এই অলক্ষীর বিছূইন(অলক্ষ্মীর বাচ্চা) এর গুষ্টিরতে নাতনি বিয়া দেয়াই আমাগোর ভুল হইছে। আমার নাতনি রে বাড়িতনে বাইর কইরা দিয়া। এহন আবার দল ধইরা তামশা শুরু করছে! রাজিয়া বেগম বুঝতে পারছে অলক্ষীর বিছূইন তাকে বলছে।
এর জন্যই সে আসতে চায়নি আসতোও না যদি না মীর পূণরায় বাড়ি ফিরে উঠানে ফেলে যাওয়া কুড়ালটা আবারো হাতে তুলে তার দিকে না ছুটতো।মীরের ভয়ে তখন রাজিয়া বেগম দিক দিশা ভুলে ছেলের হাত ধরে ভ্যানে চড়ে বসেছে। রাজিয়া বেগম ঠিক ধারণা করেছিলো। এবাড়িতে আসলে তাকে নানান কথা শোনানো হবে এবং হচ্ছেও।
অনেক সময় ধরে আদরচাঁন বেগম যা তা কথা শুনিয়ে যাচ্ছে তাকে। প্রত্যেকটা কথা যে তাকে খোঁচা মেরেই বলা হচ্ছে সেটা সবাই বুঝতে পারছে। কিন্তু এখন আর চুপ থাকতেই পারল না। মেজাজ হারিয়ে চিৎকার করে বলে উঠলো।
রাজিয়া : তা আন্নের গুষ্টিতো খুব লক্ষ্মীর বিছূইন আছে। তয় এতদিন হইছে বিয়ার আন্নের নাতনি এখনো জামাইয়ের সুখ পাওয়ার উপযুক্ত হইলো না কে।
আদরচাঁন : ও মাইয়া মাইয়া গো মাইয়া যারা সুখ পাইবো। তাগোর তাড়াহুড়া নাই সব তারা তো দেহি আন্নের।শইলে কি বিগার(যৌ ব নে র জ্বালা)বেশি নাহি।
রাজিয়া : হ অন্নের বিগারের মতোই।
আদরচাঁন : তয় এতোই যহন বিগাইর্রা মাগি তাইলে আমার নাতনির যায়গায় কয়ডা দিন নিজেই হুইতা(শুয়ে)পরতাইন নাতির লগে।
রাজিয়া : ও মাইয়া মাইয়া গো মাইয়া ও আরশাদ রে আরশাদ রে হুনছোস নি রে হুনছোস নি, এই বেডি কি কইলো রে কি কইলো। ও বাপজান রে আইজ নাত বউ থুইয়া ঐ ছিনাল রেই লইয়া লো।
আদরচাঁন : ও মাইয়া মাইয়া গো মাইয়া ঐ ছিনাল। আমার কি ল্যাং নাই রে আমি কি খালি কলসি রে।মাগি আমার নাতনি যে গুড়মা কইছোস না।যা দিতাম না আমার নাতনি রে তোর নাতির লগে তুইইইই হুতিছ।
মীর : এই সব জংলি ছিনাইল্লা বুড়ি টুড়ির ছায়াও এই মীর পাড়াইবো না।হঠাৎ করেই দুই বুড়ির ঝগড়ার মধ্যে এসে হাজির হলো মীর। সবাই থতমত খেয়ে যায়। তাকে দেখে গোসল করে পরিপাটি হয়ে পোশাক পরিবর্তন করে শরীরে এক গাধা সুগন্ধি মেখে এসেছে। নতুন জামাই নতুন জামাই ভাব।
রাজিয়া বেগমের নাতিকে দেখেই কুড়ালের কথা মনে পড়ে গেল। একদম চুপচাপ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল ছেলে আরশাদের পাশে যেন এতক্ষণ ধরে তর্ক করা মহিলাটি সে না। তবে চমকে গিয়ে পর মুহুর্তেই মুখে বলি ফুটল আদরচাঁন বেগমের।
আদরচাঁন : এই এই জংলি বুড়ি ছিনাইল্লা বুড়ি কারে কইছো তুমি। যদি আমারে কইয়া থাকো তাইলে এই জংলি বুড়ির নাতনিও তো জংলি আছে। তাইলে তারে নিবার আইয়ো কেল্লেগা বারবার। মীর একটু এগিয়ে একটু ঝুঁকে আদরচাঁন বেগমের কানের কাছে ফিসফিস করে বলল।
মীর : কারন আমার কচি জংলি পছন্দ বুড়ি জংলি না। আদরচাঁন বেগম মীরের মতোই কানের কাছে ফিসফিস করে বললো।
আদরচাঁন : তয় হুনো মিয়া তোমার লগে গোপন কতাডা কইয়া দেই আইজ।
মীর : কি কতা জংলি বুড়ি।
আদরচাঁন : তোমার কচি জংলি তিনদিন ধইরা লাল পানিতে ভাসতাছে। বুঝবার পারছোনি মিয়া তোমার বউর কি হইছে পারলে লগে লইয়া যাও।
কথাটি বলেই আদরচাঁন বেগম আঁচল দিয়ে মুখ ঢেকে শরীর কাঁপিয়ে হাসে। রাজিয়া বেগম তা দেখেই চোখমুখ খিচে নিলো।তার নাতির সাথে এতো ফুসুর ফুসুর কেন হিংসা হলো তার।মীর আদরচাঁন বেগমের কথা মানি বুঝতেই। তাৎক্ষণিক তার বুকটা কাঁপতে শুরু করল।
তখন কার বলা মায়ার কথাগুলো মনে হলো তার এখন সে বুঝতে পারল মেয়েটা কেন তখন খাবার বেড়ে দিয়ে ওই রকম বড়দের মতো।বউদের মতো আচরণ করেছিলো আর দেরি করে না মীর।গলা ছেড়ে ডাকে।
মীর : মায়া আআআআআ.. প্রথমবারের মতো মীর নাম ধরে ডাকলো মায়াকে পেট ব্যথায় মায়া বিছানায় গুটিসুটি মেরে শুয়ে সব শুনছিল। তবে সবার চিল্লাচিল্লিতে মীরের উপস্থিতি বুঝতে পারে নাই। কিন্তু এখন মীরের কথা শুনেই একপ্রকার লাফিয়ে নামলো বিছানা থেকে।দ্রুত পায়ে পাশের ঘর থেকে বের হয়ে এলো।
মায়া: কিতা ? মীর তাকায় মায়ার মুখের দিকে। মুখটা কেমন মলিন হয়ে আছে কান্না করে চোখ মুখ ফুলিয়ে ফেলেছে। চেহারাটা কেমন ফ্যাকাসে হয়ে গেছে। মীর অদ্ভুত দৃষ্টিতে পর্যবেক্ষণ করে মায়া কে।তার দৃষ্টি মায়ার কোমর থেকে মুখ অবধি ঘুরেফিরে কোমরে এসে স্থির হচ্ছে গলাটা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে তার। মীরের বুক কাঁপছে,শুকনো ঢোক গিলে বললো।
মীর : যা যাইবার পারবা আমার লগে এহন। মায়া মূহুর্তেই দুহাতের তালু দ্বারা দু চোখের কোনায় জমে থাকা জ্বল ঘষে মুছে ঝটপট বলে।
মায়া : আমারে কিন্তু নতুন সাজন পাতি কিইনা দেওয়োন লাগবো।
মীর : আর কিছু না?
মায়া : আমাদের বাগানের তাজা ফল আইনা দেওয়োন লাগবো।
মীর : হুম আর ?
মায়া : আ.. আর.. আর অন্য বউ আনা যাইতো না। আমি একলাই থাহুম আর কেউ না।
মীর : একলাই থাকবা।
মায়া :আমি আন্নের বুয়ের(দাদীর) ঘরে থাকতাম না আর।
মীর : আমি থাকবার দিতামও না।
কথাটি বলে মীর মায়ার হাত ধরে ওই অবস্থাতেই বাড়ি থেকে বের হয়ে গেলো। উপস্থিত কারোরই সাহস হলো না তাকে আটকাবার। বাদশা মিয়া কিছুই বললেন না। কোন বাবা মা চায়না তার মেয়ের সংসার ভেঙ্গে যাক। আর আরশাদ আলী তো লজ্জায় চুপ করে বসে আছেন। সে একজন মাস্টার এবং একজন মেয়ের বাবা হয়ে যা করেছে তাতে সে অনুতপ্ত।
তবে রাজিয়া বেগম প্রচুর পরিমাণে অপমান বোধ করছিলেন। সে একটু উগ্র স্বভাবের সব সময় সবার ওপর নিজের আধিপত্য বজায় রেখে চলাটা পছন্দ করেন। অন্যভাবে চিন্তা করতে গেলে এটা তারোও দোষ না। তাদের পরিবেশ থেকে পারিপার্শ্বিক সমাজ থেকে যেটা শিখেছে সেটাই তো সে করবে।
মাত্র সাত বছর বয়সে বিয়ে হয়ে গিয়েছিল রাজিয়া বেগমের যেই সময়টাতে তার খেলাধুলা করার বয়স ছিল সেই সময়টাতে তার সংসারের হাল ধরতে হয়েছে। মাথার ওপরে ছিল কঠিন শাশুড়ি দাদি শাশুড়ি তাদের সাথে তাল মিলিয়ে থাকতে হয়েছে। স্বামী নামক লোকটা তো সারাদিন ক্ষেত খামারে কাজ করে এসে রাতে শুধু সাথে ঘুমাতো কখনো পাশে বসে জিগ্গেস করেনি কি অবস্থায় চলছে দিন তার।
সেই ছোট বয়সে শাশুড়ি আর দাদি শাশুড়ির কাছে যা শিখেছে সেটুকুই ছিল তার শিক্ষা। এবং সেই শিক্ষা টাই নিজের মধ্যে ধরে রেখেছে। শাশুড়িদের হতে হবে খুব কঠিন ছেলেদেরকে হাতে রাখতে হবে বৌমাদেরকে মাথায় তোলা যাবে না। যেমনটা তার সাথে তখন হয়েছিল। সে তো এখনো সেখানেই পড়ে আছে। আর এমনটাই ধারাবাহিকভাবে যুগের পর যুগ ধরে চলছে। আরশাদ আলী বাদশা মিয়ার কাছে ক্ষমা চাইলো।
বললো এতদিন ধৈর্য ধরেছে তাদের উচিত ছিল আর কটা দিন সময় দেওয়া। যার বউ তার সমস্যা নেই। সেখানে তাদের আগ বারিয়ে বাড়াবাড়ি করাটা ঠিক হয়নি। ওনার মা রাজিয়া বেগমের আচরণেও সে দুঃখ প্রকাশ করলেন। বাদশা মিয়াও আর ঝামেলা চাচ্ছেন না। যেখানে তার মেয়ে সংসার করবে।সে হাসলেন আরশাদ আলীর কথায়।
বললেন অতীত ভুলে নতুন করে শুরু করতে। সম্পর্ক ঠিক করার জন্য মীরের কিনে আনা ভ্যান ভর্তি বাজার গ্রহণ করল বাদশা মিয়া।তবে এই রাতে আরশাদ আলী আর রাজিয়া বেগমকে বাড়ি ফিরতে দিলো না আরিজা বেগম আর আদরচাঁন বেগম মেয়ের শশুর আর দাদী শাশুড়িকে রেখে দিল জোর করে। সম্পর্ক ঠিক করার জন্য তারাও থেকে গেলেন।
মীর শশুর বাড়ির আঙিনা পার হতে মায়া কে পাজা কোলে তুলে নিলো। মায়া অবাক হলো পরে যাওয়ার ভয়ে মীরের গলা দু'হাতে জড়িয়ে ধরলো। মাত্রই রাত সাতটা বাজে তবুও যেন পুরোটা গ্রাম ঘুমিয়ে নাক ডাকছে। মীরের ঠোঁটে তখন জ্বলন্ত সিগারেট লুঙ্গির কোছায় ম্যাচ আছে তারপরও এক হাতে মায়া কে কোলে রেখেই অন্য হাতে সিগারেট ঠোঁট থেকে সরিয়ে একটু থেমে দাঁড়িয়ে আয়তাল কুরসি পরে মায়ার আর নিজের শরীরের ফু দিয়ে নিলো।
সামনে বড় খোলা মাঠ পাশে বাঁশবন ও আছে। তার বউজান অসুস্থ যদি খারাপ বাতাস লাগে তাহলে তো সর্বনাশ। দিনের বেলাতেই গ্রামের রাস্তায় কোনো যানবাহন থাকে না আর এখন তো রাত। আনন্দপুর বাজারে গিয়ে যদি একটা রিকশা অথবা ভ্যান পাওয়া যায়।
এই রাস্তাটুকু মীরের হেঁটে যেতে হবে তবে তার বউ কে হাঁটতে দেবে না সে।এইটুকু নি একটু শরীর কোলে নিয়ে সারাটা রাতই তো হাঁটতে পারবে সে তাছাড়া এই কয়দিন তার বুকটা যেই পরিমাণ জ্বলছে মায়া কে বুকে রেখে সেই জ্বলনটাও তো কমাতে হবে।মীর গ্রামের মাটির মেঠো পথে হেটে যাচ্ছে মায়া কে কোলে নিয়েই।হাঁটতে হাঁটতেই মায়ার গালে গাল ঘষে বলে।
মীর : বউ শইলডা কি বেশি খারাপ লাগতাছে।পেট কি বেশি বেদনা (ব্যথা) করতোছে ?
মায়া : হ পেট বেদনা করতাছে সব ভিজা ভিজা লাগতাছে !
মায়ার সহজ স্বীকারোক্তিতে নিজের জটিলতা খুলে বলাটি মীরের কাছে খুব ভালো লাগে। বুকের মধ্যে একটা শান্তি অনুভব হলো মায়া কে তার নিজের একান্তই নিজের ব্যক্তিগতো নিজের শরীরের অংশ মনে হল। মীর হাঁটা থামিয়ে দাঁড়িয়ে পরলো বুকের ভিতরের অস্থিরতা কমছে না তার। জোসনা রাত তো না তারপরও মায়ার মুখ খানা স্পষ্টই দেখতে পেল খুব কাতর কন্ঠে আবদার করে বলল।
মীর : লক্ষী আমার ঠোডে একটা চুমা খাও তো।
মায়া : আচ্ছা "বিসমিল্লাহ" উম্মাহ মীরের অন্তরে শান্তি লাগল। শান্তিতে শান্তিতে বুকটা ভরে গেল বুকের মধ্যে সে কি আনন্দ। কি একটা অধিকারবোধ তার বউ তার বলা প্রত্যেকটা কথা অক্ষরে অক্ষরে শুনে। ঠোঁটে ঠোঁট রাখা অবস্থাতেই মীর অস্পষ্ট সুরে "বিসমিল্লাহ" বলে সে নিজেই মায়ার ঠোঁট গভীরভাবে আঁকড়ে ধরল।চোখ বন্ধ করে মায়া কে নিজের ভেতরে মিশিয়ে নিতে পাগল হলো। তিন মিনিটের গাঢ় চুম্বনের পর ঠোঁট ছেড়ে মীর নিঃসংকচে মায়া কে বললো।
মীর : শইলেরডা হইয়া গেছে তোমার তুমি বড় হইছো বউ আমার কিন্তু এর চেয়েও বড় বড় অনেক আদর চাই। মায়া প্রতিবারের মতো সহজ স্বীকারোক্তি।
মায়া : আচ্ছা।
মীর :হেই আদর কিন্তু অন্যরকম বউ যন্ত্রণা হইবো কষ্ট হইবার পারে দিবা তো করতে ?
মায়া : আদর করলে কষ্ট হইবো কেন?
মীর : হেডি একটু বিশেষ আদর বউ প্রথমে এক-দুই বার কষ্ট হইবো। পরে সহ্য হইয়া যাইবো সব জামাই বউ এর ভিতরেই হয় সইবার পারতা না। মায়া কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থাকে। মীরের খুব ইচ্ছা হচ্ছে মায়ার মুখ থেকে শুনতে।কারন মায়ার মুখে সহজ কথা শুনলে তার অন্তরে খুব শান্তি লাগে। মীর মায়ার মুখে তাকিয়েই রইলো।
মায়ার তখন মনে পরলো নারগিসের আর রাজিয়া বেগমের স হ বা স সম্পর্কে বলা কথাগুলো সে চুপচাপ ভাবছিল তা তাকে চুপ থাকতে দেখে মীর বলে।
মীর : কি ভাবতাছো বউ আদর করবার দিতানা ?মায়ার ঝটপট উত্তর।
মায়া : হ হ দিমু তো ।
মীরের তো মিলন করার তাড়া আছে সে বিবাহিত পুরুষ ইচ্ছা তো থাকবেই। তবে সেসবের থেকেও তার খুশির কারণ হচ্ছে। তার বউ এখন উপযুক্ত।তার বউ এখন তার সাথে থাকতে পারবে। তাদের মধ্যে আর কেউ থাকবেনা।থাকবে না কোন প্রকার সামাজিক কিংবা পারিবারিক বিধি নিষেধ।এখন থেকে প্রতিরাতে বউকে বুকে জড়িয়ে শান্তিতে ঘুমাতে পারবে।
এবং প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে সে তার বউর মিষ্টি আদরি মুখখানা দেখতে পারবে। মীর প্রচুর খুশি হয় মায়ার কপালে কপাল ঠেকিয়ে নাকে নাক ঘষে মন ভরে জোরে শ্বাস টানে। মায়ার মুখ ছোট ছোট চুমু খায় আর বলে।
মীর : আমার লক্ষ্মী বউ আমার চান্দের টুকরা বউ আমার ছয় বাচ্চার আম্মা বউ। মায়া অবাক হয়ে বলে।
মায়া : ছ ছ ছয় বাচ্চা ! ছয় বাচ্চা কই ?
মীর : তোমার পেডে। মায়্ দ্রুত তার পেটে হাত দিয়ে বলে।
মায়া : কই কই নাই তো মীর হো হো করে শব্দ তুলে হাসে বলে।
মীর : হইবো হইবো সময় হইলেই বাইর হইবো কথাটি বলেই মীর দ্রুত মায়া কে নিয়ে হাঁটা ধরে হাঁটতে হাঁটতে বলে।
মীর : তোমার দাদি কি পড়াইসে তোমারে বউ সুতির নেকরা ?
মায়া : হ হেডিই তো দিছে ভিইজা গেছে মনে হয় কেমন লাগতাছে!
মীর তা শুনে আরো দ্রুত হাঁটে আনন্দপুর বাজারের কাছে এসে একটা ভ্যান পায়। তবে ভ্যান চালক এই রাতে উছমানপুর যাবেনা। মীর ভ্যান চালককে তিন গুণ বেশি ভাড়া দিয়ে রাজি করায় এবং খুব দ্রুত ভ্যান চালাতে বলে।
অন্য দিকে আরিজা ঝটপট হাতে কিছু সময়ের মধ্যেই তৈরি করে ফেলল অনেক খাবার রাতে খাওয়া দাওয়া শেষ হতেই মায়ার দাদী আদরচাঁন বেগম পানের খিলি রাজিয়া বেগম এর হাতে দিয়ে বললো।
আদরচাঁন : চিন্তা কইরেন না বু আপনার নাত বৌ আল্লাহ চাইলে খুব শীঘ্রই সুসংবাদ দিব। এতো সময় মলিন মুখে বসে থাকা রাজিয়া বেগমের মুখে এই পর্যায়ে হাসি ফুটে। কারণ যত যাই হোক না কেন অপ্রাপ্ত অউপযুক্ত একটা মেয়েকে স্বামীর কাছে পাঠিয়ে সে গুনাহ করতে চাইছিল না তাছাড়া মঙ্গল অমঙ্গল এরও ব্যাপার আছে তবে আদরচাঁন বেগমের বলা কথা শুনে সে উত্তেজিত হয়ে বলে।
রাজিয়া : সত্য সত্য কইতাছুই ।
আদরচাঁন : তয় তাই না হইলে কি আমি নাতনি যাইবার দিতাম জীবনো। আমরাও কিন্তু মঙ্গল অমঙ্গল মানি বুবু আমগোর কাল থেকেই তো এডি চলতাছে। আমরাও তো মানছি দেইখা বড় হইছি। কথাটি বলেই আদরচাঁন বেগম চোখ টিপে হাসে সঙ্গে রাজিয়া বেগমও হাসে পুনরায় বলল।
আদরচাঁন : তয় আন্নে কিন্তু একটা বড় মাপের ছিনাল আছুইন। আন্নে কেমনে আমার নাতনিরে গুড়মা (হিজড়া)কইলেন। আবার হুনছি গাছন্ত ওষুধ খাওয়াইয়া মা র বা র চাইছিলেন ! এ কথা শুনে রাজিয়া বেগম কি বলবে বুঝতে পারছে না। আদরচাঁন বেগমের হাত ধরে অনুনয় করে ক্ষমা চায়। আর কখনো এমন কিছু হবে না বলে আশ্বস্ত করে।তারপর দুজনেই একসাথে হাসে পান চাবায় অবশেষে তাদের দুজনের মনের আশা পূরণ হবে এবার।
চলবে......