#নিষিদ্ধ_নীল_চিঠি
#পর্ব_১৩
#সায়মা_নূর
ভালোবাসা এক অদ্ভুত অনুভূতি যার স্পর্শে মানুষ নিজেকেই নতুন করে চিনতে শেখে। এটা শুধু কাউকে ভালো লাগা নয়, বরং তার সুখে নিজের সুখ খুঁজে পাওয়া। তার কষ্টে নিজের মন ভারী হয়ে যাওয়া।ভালোবাসা মানে সবসময় কাছে থাকা নয় কখনো দূরত্বেও গভীর টান থাকে।
মনে হয় সে নেই তবুও আছে প্রতিটা চিন্তায় প্রতিটা নিঃশ্বাসে।ভালোবাসা মানুষকে কোমল করে আবার শক্তও করে। তাকে আরও যত্নশীল করে আরও ধৈর্যশীল করে ভালোবাসা শিখায় অপেক্ষা করতে।
আর কখনো নিজেকে ভুলে গিয়ে অন্য কারও জন্য বাঁচতে কখনো শুধু একজন মানুষের জন্য পুরো পৃথিবীটাকেই বিশেষ মনে হয়।সবচেয়ে সুন্দর ব্যাপার হলো ভালোবাসা কখনো জোর করে আসে না, আর জোর করে থাকেও না।
এটা নিজের মতো করে আসে, নিজের মতো করেই থাকে আর যাকে ছুঁয়ে যায়। তার জীবনটা চিরদিনের জন্য একটু হলেও বদলে দেয়।
মায়া আনন্দপুর যাওয়ার পরের দিন। আদরচাঁন বেগম আর আরিজা মিলে মায়া কে বড় কবিরাজের কাছে নিয়ে গেলো। কবিরাজ ঝাড়ফুঁক করে ওষুধ দিল,তাবিজ দিল পানি পড়া দিলো আর সাথে বেঁধে দিল একগাদা নিয়ম। যেমন: খাবারে কোন তেল মসলার জাতীয় কিছু খাওয়া যাবে না,মাছ-মাংস একদম নিষেধ/কাঁচা মরিচ দিয়ে ভর্তা ভাত খেতে হবে তাও আম পাতার ভর্তা,কাঁঠাল পাতার ভর্তা, আলু ভর্তা।
সন্ধ্যার পর ঘরের বাহিরে যাওয়া যাবে না। এমনকি এই ঔষধ নেওয়া চলাকালীন বাড়ির সীমানা পার হওয়া যাবে না। গোসল করে ভেজা চুল খুলে রাখা যাবেনা।যথা সম্ভব পেটে চাপ পরে এমন কাজ করতে হবে। যেমন ঘর লেপা অথবা রশী লাফানো এই সব নিয়ম মেনে চলতে হবে একটানা পনেরো দিন সাথে নিয়মিত ওষুধ নিলে তবেই (মা সি ক) দ্রুত হবে।
গ্রামবাসী অগোচরে হচ্ছে এসব কেউ বুঝতে পারলে নানান কথা বলবে। মায়ার শারীরিক দোষ আছে এমন কথা ছড়াবে। আদরচাঁন বেগমের করা নজরদারিতে এইসব নিয়ম মেনে চলতে হচ্ছে মায়ার নিয়মিত মাটির ঘর লেপা।
দিনে দুইবার করে রশি লাফানো, ভর্তা ভাত,কবিরাজের থেকে আনা তিতা ওষুধ খাওয়া। মায়া ভর্তা ভাত খেতে হচ্ছে তাই বাদশা মিয়া বাড়িতে কোনো মাছ-মাংস রান্না নিষেধ করে দিয়েছে। মায়া যা খাবে তাই সবার খেতে হবে।
এসবের প্রভাবে ছোট্ট মায়ার বাপের বাড়ী আসার ছয় দিনের মাথায় গা কাঁপিয়ে জ্বর উঠলো।সেই জ্বর পাঁচ দিনেও ভালো হলো না।তাতেও আদরচাঁন বেগম কবিরাজের আদেশ অমান্য করলো না।সবকিছুই নিয়ম মেনে চললো কিন্তু অসুস্থতার কারণে,ঘর লেপা আর রশি লাফানো বন্ধ হয়ে গেলো।
মায়ার পুরোটা দিন যেমন তেমন পার হলেও,রাতটা যায় প্রচুর জ্বরে ভুগে কাঁপতে কাঁপতে। আরিজা অগোচরে আঁচলে মুখ গুজে কাঁদে মেয়ের জন্য বাদশা মিয়া এখানে ওখানে ঘাপটি মেরে বসে থাকে। মা তো তাই সহ্য হয় না মেয়ের যন্ত্রণা তারা হাল ছেড়ে দিচ্ছে বার বার এসব বন্ধ করতে চাইছে।
কিন্তু আদরচাঁন বেগম হাল ছাড়ার মহিলা না।সে পুরো রাত জেগে সেবা করে যাচ্ছে নাতনির।রাতে যখন মায়ার শরীর কেঁপে জ্বর আসে আদরচাঁন বেগম তখন তাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে। মাথায় হাত বুলিয়ে অনেক কিছু বলে বোঝায়।
আদরচাঁন : তুই যে এইনো জ্বরে কাঁপতাছোস হেইনো যদি তোর সোয়ামি আর একখান বিয়া কইরা বস তহন কি করবি?মায়ার জ্বরে মুখ চোখ লাল হয়ে গেছে। সে বহু কষ্টে লাল চোখ দুটো মেলে তাকালো চোখের কোনায় জল চিকচিক করছে তার।
মায়া : বিয়া করতো কেন, আমি আছি না হের বউ !
আদরচাঁন : তুই তো কুনো কামের না সোয়ামিরে ঠিকঠাক আদর দিতে পারছ না। তুই হের কুনো কামের না।দেখগা হেয় আরো একখান বিয়া করছে নাইলে তোরে দেখবার আইয়ে না কিলেগ্গা ?
এবার মায়ার কিছু বলে না দাদিকে জড়িয়ে ধরে কান্না করে। আদরচাঁন বেগম অবাক হলো। সে ধারনা করেনি যে মায়া এই দুষ্টুমি তে কান্না করবে। সে তো মায়ার মুখে তার সোয়ামি সম্পর্কে একটু কথা শুনতে চেয়েছিলো তাই এসব বলছে। কিন্তু মায়ার আচরণের সে বুঝতে পারল সোয়ামির প্রতি তার নাতনি কতোটা দুর্বল।
অন্য দিকে মীর মুখ ফুটে বলতে পারছেনা যে সে শশুর বাড়ি যেতে চায়। বাড়ির একটা লোকে ও মায়ার বেপারে কিছু বলছে না। আগেও বেড়াতে গিয়েছে মায়া তখন মা-দাদী মায়ার কথা তুলেছে। নিয়ে আসতে বলেছে তার বাবাকে কিন্তু এখন যেনো এই নামের কাউকে তারা চেনে না।
প্রত্যেকের এমন আচরণে আশ্চর্য মীর । আরশাদ আলী খুব চিন্তিত যা হচ্ছে তা কতোটা যুক্তিযোগ্য তাই চিন্তা করছে। মন্জু খাতুনকেও ইদানিং চুপচাপ লক্ষ্য করছে তিনি।রাতে সবাই একসাথে খাবার খেতে বসে। মীরের মলিন মুখ নজর এড়ালো না আরশাদ আলীর।
সে পুরুষ মানুষ অন্য পুরুষের মনের অবস্থা ভালোই বুঝতে পারছে। কিন্তু কিছু করার নাই।ভাত সামনে নিয়ে বসে আছে মীর আজ বাড়িতে মায়ার পছন্দের হাঁস রান্না হয়েছে। হাঁস মায়ার পছন্দ যানার পর থেকেই তো সে নিয়মিত কিনে আনে।
সপ্তাহে দুই থেকে তিন দিন হাঁসের গোশত রান্না হতো শুধু তার বউর জন্য। মায়াও খুব তৃপ্তি নিয়ে খেতো। জ্ঞান হওয়ার পর থেকে বিয়ের আগ পর্যন্ত হাঁসের গোশের উপর একপ্রকার অনীহা ছিল মীরের।
খুব ইচ্ছা হলে পাতে তুলতো আগ্রহ নিয়ে খেয়েছে নাকি বিয়ের আগে তার মনে নেই। কিন্তু যেদিন থেকে দেখলো তার বউ হাঁসের গোশ খুব আগ্রহ নিয়ে খায়। সেদিন থেকে এই খাবারের উপর মীরও খুব আগ্রহ তৈরি হলো। কারণ সংসার জীবনে যেন তার বউর নিজের পছন্দের খাবারের উপর আগ্রহ নষ্ট না হয়।
মীর ছোট থেকে দেখে বড় হয়েছে নিজের বাবা মা কে,তার বাবা আরশাদ আলী যেই খাবার পছন্দ করে না। তা যদি তার আম্মার মন্জু খাতুনের খুব পছন্দের হয়েও থাকে। তার পরেও সে সেটা রান্না করে না।আবার যেই খাবার টা তার আব্বার খুব পছন্দের সেটা যদি তার আম্মার অপছন্দেরও হয় তারপরও সে সেটা রান্না করে।
আর ছোট্ট থেকেই মীর তার আম্মার এই ত্যাগের উপর কঠিন ভাবে বিরক্ত।সংসার জীবনের সকল ত্যাগ মেনে নেওয়া মানিয়ে নেওয়ার বিষয়গুলোতে সবসময় নারীদেরকে কেন এগিয়ে থাকতে হবে। নারী-পুরুষ উভয় দ্বারা সংসারের সৃষ্টি, একজন দিয়ে তো সংসার চলবে না। তাহলে ত্যাগের ক্ষেত্রে শুধুমাত্র নারীরা কেনো!তাছাড়া মেনে নেওয়া মানিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে তো বড়দেরকে এগিয়ে আসা উচিত! (বড় বলতে স্বামীকে বোঝানো হয়েছে)
বাচ্চারা সব সময় বাবা -মা কে দেখেই অনেক কিছু শিখে। তবে সেই শিক্ষা গুলোর মধ্যেও ভেদাভেদ আছে। অনেকেই ভালো দিকটা শেখে অনেকেই উল্টোটাই শেখে। মীর ভালো দিকটাই বেছে নিয়েছে।
এই যে তার বউর পছন্দ টা প্রাধান্য দিতে গিয়ে তার অপছন্দের জিনিসটা এখন পছন্দের তালিকায় যোগ হয়েছে। এটাতে তার দুইটা সুবিধা হয়েছে। প্রথমত বউকে তার পছন্দের খাবারটা ত্যাগ করতে হলো না। বউ খুশি, দ্বিতীয় তার পছন্দের তালিকায় আরেকটা খাবার যোগ হলো।
মীর ভালো দিকটা বেঁচে নিয়েছে কিন্তু অনেক ছেলেরা পুরোপুরি উল্টোটা বেছে নেয়। তাদের চিন্তা ভাবনা এমন হয় যে বউ হতে হবে মায়ের মতো সংসারে মায়ের মতোই মেনে নেবে, মানিয়ে নেবে। ত্যাগ করবে তবেই না সংসার সুখের হবে। অনেক পুরুষরা তো মুখের ওপর নারীদেরকে বলেই দেয় যে মায়ের কাছ থেকে শেখো আমার মা পারলে তুমি কেন পারবে না!
মায়ার পছন্দের খাবার সামনে দেখেই মীরের খাওয়ার উপর অনিহা সৃষ্টি হয়ে গেল। সে আর খাবার খেতে পারল না। সবার মধ্য থেকে চুপচাপ হাত ধুয়ে উঠে চলে গেল।তা লক্ষ্য করে রাজিয়া বেগম চটে গেল। এত সময় তো চুপ ছিল কিন্তু এই পর্যায়ে ছেলের বউকে উদ্দেশ্য করে বলল।
রাজিয়া : এই হা রা ম জা দি র বিচ্ছুইন তরে না করছিলাম না। হাঁস রান্দিছ না দেখছোস দেখছোসনি এহন আমার নাতি হারা রাইত না খাইয়া থাকবো। মন্জু খাতুন আগে থেকেই ভয়ে ছিলো।
এখন শাশুড়ির এমন আচরণে কেঁপে উঠলো সে তো ইচ্ছা করেই রান্না করেছে। যাতে মীর মায়ার কথা ওঠায় কিন্তু তেমন কিছু হলো না। না খেয়ে চুপচাপ চলে গেলো।
রাজিয়া : বাপজান কিছু কসনা কেন এই ছিনালের ঘরের ছিনাল রে দিনে দিনে মাথায় উইডা পড়তাছে আমার কতা হনে না। আরশাদ আলী মন্জু খাতুনের দিকে তাকাতেই সে কান্না করে দেয় কান্নারত কন্ঠে বলে।
মন্জু : পরশুর আগের দিন মীর হাট থেইকা কিনা আনছিলো। জাল দিয়া রাখতে রাখতে নষ্ট হইয়া যাইতাছিল। তাই ভাবলাম রাইন্ধালাই খাইলে হালাল হইয়া যাইবো। তাছাড়া মার(আম্মার) তো পছন্দ খাউন।
রাজিয়া : দেখ দেখ বাপজান এহন তোর বউএ আমার দোষ দিতাছে কিন্তু আমি না করছিলাম কতা হুনে নাই।
আরশাদ : মন্জু তোমারে কতোদিন কইছি। আমার আম্মায় যেন তোমার উপরে রুষ্ট না হয়। তার কতা সবার আগে হুনবা এমন কি আমারোও । কথাটি লেই অর্ধেক প্লেট খাবারে হাত ধুয়ে উঠে গেল আরশাদ আলী মন্জু খাতুন কান্না করছে আজ তার আর খাওয়া হলো না। তবে রাজিয়া বেগম দিব্যি খাচ্ছে হাঁসের গোশতের তরকারি দিয়ে পেট ভরে খাচ্ছে।
রাতে মীর অন্ধকার ঘরে জানালা খুলে বসে বিড়ি টানছিল, আর গুন গুন করে গান গাইছে
মনের জোরে চলছে রে দেহ
দেহের ভেতর মন
সেই মনে আজ লাগছে ভালো রূপমনি কাঞ্চন
সেতো আসে যায়
সেতো আসে যায়
যার জন্যে চান্দে চান্দে
এতো চন্দ্রগ্রহণ...ওহো
☆♡☆♡
মনের জোরে চলছে রে দেহ
দেহের ভেতর মন
সেই মনে আজ লাগছে ভালো রূপমনি কাঞ্চন
সেতো আসে যায়
সেতো আসে যায়
যার জন্যে চান্দে চান্দে
এতো চন্দ্রগ্রহণ...ওহো..
☆♡☆☆♡☆
মীরের বুকটা জ্বলছে তার বউ যাওয়ার সময় সাজগোজ করার জিনিস নিতে চাইলো। সে না করলো তা মনে হতেই বুক বেশি জ্বলে বুকের এই জ্বলন কমাতে বই কেই চাই। কথাটা ভেবেই বিড়িতে জোরে টান দিলো।তখনি কাঠের দরজায় শব্দ হলো।
মীর দ্রুত বিড়ি জানালা দিয়ে ছুড়ে মারে ততক্ষণে মন্জু খাতুন ঘরে ঢুকেছে। মাকে দেখে মীর সোজা হয়ে বসে। মন্জু খাতুনের হাতে হারিকেন। সে একটু তার ছেলের অবস্থানটা বুঝে হারিকেনের আলোটা কমিয়ে দিলো। মীর মায়ের এরূপ আচরণ দেখে জিজ্ঞেস করলো।
মীর : কিছু কি হইছে আম্মা কিছু কইবা ?
মন্জু খাতুন চিন্তিত খুব শাশুড়ি আর স্বামীর অগোচরে ছেলের সাথে কথা বলার সুযোগ পায় না। তাই রাতে পায়খানা যাওয়ার উসিলায় বের হয়েছে। দিনে যতোটা সময় মীর বাড়িতে থাকে শাশুড়ির জন্য কাছে যাওয়ার সাহস পায় না।তাকে এক প্রকার চোখে চোখে রাখে রাজিয়া বেগম।
সবাই ঘুমিয়েছে এটাই সুযোগ কথাটা বলে দ্রুত ঘরে চলে যাবে সে। মন্জু খাতুন খুব ধীরে ছেলের কাছে এগিয়ে যায়। মীর কিছু বলার আগেই হাত দিয়ে ইশারা করে চুপ থাকতে। ফিসফিস করে বলে।
মন্জু : আব্বা আমার লগে বাইরে আয় কতা আছে।মীর ভুরু কুঁচকায় কি কথা যা এতো ফিসফিস করে বলতে হবে। মীরের অ অদ্ভুত লাগলো তবে সে মায়ের সাথে বাহিরে চলে গেল।বাড়ির দক্ষিণ দিকের সুপারি বাগানে,সুপারি গাছের নিচে মন্জু বেগম আর মীর দাঁড়িয়ে।
মীর : কি হইছে আম্মা জটিল কিছু নাকি???
মন্জু : আব্বা আমি এতো খুইলা কইবারা পারুম না। তুই কালকে সহালেই আনন্দপুর যা বৌ রে আনতে। আমার মনে হয় কিছু একটা ঘটতাছে ।কিন্তু কি আমি পুরা জানিনা,তয় তোর বাপ দাদির ভাব ভালা না।মীর আশ্চর্য হলোনা তারো মনে হচ্ছে কিছু একটা ঘটতে গোপনে।
মীর : এই কথা কইতে এলো লুকোচুরি কেন আম্মা।
মন্জু : তোর দাদি ইদানিং খালি আমারে হুমকি দেয় শাসায়। আমি পরের বাড়ির মেয়ে তোর বেপার যাতে কতা না কই।কইলে হের পুতেরে কইয়া আমারে বাপের বাড়ি পাঠাই দিবো।
মীর : আপনে তা শুনে ডারান কেন আপনার কি পুত নাই ? মন্জু খাতুন কান্না করে দেয় মীর অবাক হয়। এক পা কবরে তবুও তার দাদির তেজ কমেনা, সারাজীবন ধরেই তার আম্মার উপরে হুকুমদারী করে গেলো।তখনি রাজিয়া বেগমের গলা শোনা গেলো।
রাজিয়া : বৌ কই গেছো, পায়খানায় কি ঘুমাইছো নাকি।সর্বনাশ মন্জু খাতুন শাশুড়ির গলা শুনে মীর কে রেখেই ছুটে, শাশুড়ি দেখলে সর্বনাশ, কেলেঙ্কারি হয়ে যাবে।
এই বয়সে বড় ছেলের সামনে অপদস্ত হতে চায় না সে। মীর গোটা রাত না ঘুমিয়ে শুধু ভেবেছে। তার আম্মার বলা কথা কি এমন ঘটছে তার অগোচরে।বিড়ির এক একটা টানের সঙ্গে ভাবনাতে ডুবে সকাল হওয়ার অপেক্ষা করে।
বউ তুলে আনার পরে একবারের জন্যও মীর শশুর বাড়ি যায় নি। তাই লজ্জা লাগছে খুব সকালে ঘুম থেকে উঠেই কাউকে কিছু না বলেই সে রওনা দিয়েছে মায়ার বাড়ি আনন্দপুরের উদ্দেশ্যে।
প্রথম বার শশুর বাড়ি যাবে তাই মীর বাজার থেকে মিষ্টি_ফল, পান-সুপারি,ছোট শালা-শালির জন্য বিস্কিট ,কেক চানাচুর, নিমকি। শশুরের জন্য লুঙ্গি, শাশুড়ি-দাদি শাশুড়ির জন্য কাপড় শালাশালীর জন্য কাপড় এক ভ্যান ভরে বাজার করলো। পাঁচটা দেশি মোরগ ,পাঁচ কেজি গরুর গোশত , পাঁচটা বড় মাছ, কাঁচা সবজি কিনে নিয়ে রওনা হলো মায়ার বাড়ির উদ্দেশ্যে।
আদরচাঁন বেগম নাত জামাই দেখেই হায় হায় করে উঠলো। আরিজা বেগম জামাই আপ্যায়নে লেগে গেল। বাদশা মিয়া অবাক হয়েছে অনেক মীরের আসার কথা না । মায়ার সবে মাত্র জ্বর ভালো হয়েছে কিন্তু শরীর দুর্বল।
তা ছাড়া কবিরাজের ঔষধ-নিয়ম মানতে গিয়ে মায়া একদম গৃহবন্দী। দাদি তাকে করা পাহারাদারিতে রাখছে। মীর মায়াকে দেখে চমকায় কেমন মলিন হয়ে আছে তার বউর মুখ।চেহারায় অসহায়ত্বের ছাপ যেন এই দুনিয়ায় তার আপন কেউ নেই।
মীরের বুক কাঁপে তার ইচ্ছা করে বুকের ভেতর ঢুকিয়ে নিতে তার বউ কে। কিন্তু পারে না ঘর ভর্তি মানুষ আশেপাশের বাড়ি থেকে সবাই জামাই দেখতে এসেছে।
নানান লোকে নানান কথা বলছিলো কেউ প্রশংসা করছে। কেউ আবার খোঁচা দিয়ে ধাক্কা মেরে কথা বলছে। বলারই কথা কতদিন হয়েছে বিয়ের আজ পর্যন্ত শ্বশুর বাড়ি আসেনি।গ্রামের একটা সমস্যা ঘন ঘন শ্বশুরবাড়িতে গেলেও মানুষ হাসাহাসি করে নানান কথা শোনায়। আবার একেবারে না গেলেও তাদের কথার শেষ নেই। দুপুরে মীর কে খাবার বেড়ে দেয় মায়া আশেপাশে কেউ নেই দেখে মীর বলে।
মীর : বউ তোমার কি হইছে মুখটা এমন কেন বাপের বাড়ি আইছো খুশিতে নাচতে নাচতে তয় এহন মুখ কালা কেন?
মায়া কোন কথা বলে না চুপ থাকে । মীর অবাক হলো চরম, খাওয়া এখনো শুরু করেনি মায়ার দিকে তাকিয়ে আছে।
মীর : বউ চুপ কেন তুমি! কি হইছে?
মায়ার মাথা নিচু ছিল।হঠাৎ মায়া চোখ তুলতেই। মীর দেখলো মায়া কান্না করছে নিরবে।এমন তো মায়া কখনো করে না। মায়া কখনো মীরের কোনো কথার উত্তর না দিয়ে থাকেনি। তাহলে আজ কান্না কিসের। মীরের বুক কাঁপতে শুরু করলো। অস্থির লাগছে ভেতরটা।মীর খাবার প্লেট সামনে থেকে সরিয়ে, দুই হাত বাড়িয়ে আঁকড়ে ধরে তার বউকে, শক্ত করে জড়িয়ে নেয় বুকে। অস্থির কন্ঠে বলে।
মীর : কান্দ কেন কও মায়া চুপ কোনো কথা বলছে না। মীর অবাক এর চূড়ান্তে। মীর মায়াকে ছেড়ে দিয়ে দুহাতে মায়ার গাল আঁকড়ে ধরে চোখের পানি মুছে। মায়ার কান্নারত মুখে তাকিয়ে থাকে। মীর মায়ার চোখে তাকিয়ে বুঝতে চাচ্ছে কি সমস্যা। কিন্তু কিছু বুঝতে পারলো না মীর বললো।
মীর : এই জিবনে আমি ভাবতাম আমি কোন কিছুরেই ডরাই না আল্লাহ ছাড়া। কিন্তু আইজ মনে হইতাছে আমি তোমার চুপ থাহারে খুব ডরাই বউ তুমি আমার বুক কাপাইতাছো আর চুপ থাইকো না কতা কও।নাক টানলো মায়া বললো।
মায়া : দাদি কয় আন্নে বিয়া করছেন ?
মীর : হ তা তো করছিঐ তোমারে।
মায়া : না আমি না আরেকখান ?
মীর : একটা বিয়া কইরাই আমি পস্তাইতাছি আরো করুম? মীরের কথা যেনো শুনলো না মায়া সে তার মতো করেই বললো।
মায়া : ঐ বউ রেও সাজন পাতি আর সব কিইনা দিছেন যা আমারে দিছেন। মায়া হিংসা দেখে মীরের ভালো লাগছে। এমন মায়াকে সে কখনো দেখিনি। কেমন বড় বড় আচরন করছে তার বউ মীর একটু মজার ছলে বলল।
মীর: হ সব তো দিতেই হয় তোমারে যা যা দিছি তারেও সব দিছি।মায়া আহত কন্ঠে বলে।
মায়া : চু চুমুও আর আদরো ?
মীর : তা তো দিতেই হয় আদর না দিলে বউ কান্দে যে।হঠাৎ মায়া মীরের বুকে দুহাতে কিল ঘুষি দিতে শুরু করে বলে।
মায়া : আমি কতো কষ্ট করতাছি,কতো খারাপ লাগা সহ্য করতাছি। হুদা ভাত খাইয়া থাকতাছি।দাদির কথা হুইনা বাড়ির বাইরে যাই নাই বাগানে ফল ফুল তুলতে যাই নাই কার লাইগা কার লাইগা কার লাইগা।
মীর অবাক হলো প্রচুর, এটা সে কোন মায়া কে দেখছে। এই মায়া তো একদম অপরিচিত তার কাছে। মায়া কান্না করেই বা কি বলছে। মীর বুঝতে পারলো না মায়ার কথা। তবে এই বাড়িতে কিছু যে ঘটেছে সেটা বুঝতে পারলো ভালো হবে।
মীর মায়ার হাত আঁকড়ে ধরে শক্ত করে।মায়া থামছে না। মীর মায়া কে থামাতে দ্রুত বিসমিল্লাহ বলে মায়ার পুরো মুখে ঠোঁট ছোঁয়ায়। যতক্ষণ না মায়ার শান্ত হচ্ছিল। মীর মায়া কে শক্ত করে বুকে জড়িয়ে ধরে।
মীর : আমার একটা সোনা বউ তা হইলো তুমি।মায়া নাক টানে মীরের বুকে নাক ঘষে হেঁচকি তুলে বলে।
মায়া : সত্য তো!
মীর : হ সত্য বউ তোমারে খুব মনে পরছে।এই কয়দিন তুমি ছাড়া খুব কষ্ট পার করছি।
মায়া : আমিও মীর মায়া কে বুক থেকে তুলে তার মুখের দিকে তাকিয়ে বলে।
মীর : আমিও কি সোনা পাখি ।
মায়া: আমারও খুব কষ্ট হইছে আন্নের কতা খুব মনে পরছে।
মীর : তাই বউ তয় আইজ তুমি আমার ঠোঢে একখান চুমা দেও দেহি বরাবরের মতো বাধ্য মায়া মীরের কথায় তার ঠোঁটের কাছে এগিয়ে যেতেই। মীর বাঁধা দিলো বললো।
মীর :আগে বিসমিল্লাহ কও বউ।
মায়া : আন্নে তো কইছুই।
মীর : তুমিও কইবা।
মায়া : আচ্ছা বিসমিল্লাহ উম্মাহ কথাটি বলেই প্রথমবারের মতো মায়া মীরের ঠোঁটে ঠোঁট রাখে। মীর আবারো শক্ত করে তাকে বুকে জড়িয়ে নেয়।আদর আপ্যায়ন শেষে মীর নিজের হাতে মায়া কে খাইয়ে দেয়।
আদরচাঁন বেগম ঘরের বেড়ার ওপাশ থেকে দাঁড়িয়ে সমস্ত কিছুই শুনলো নাতনি আর নাতনি জামাইয়ের কথা যা শুনে সে খুব সন্তুষ্ট হলো তার মনে থাকা কালো মেঘ নিমিষেই বৃষ্টি হয়ে ঝরে গেল।
মায়া কে সঙ্গে নেওয়ার কথা বলতেই বাদশা মিয়া বাধা দিলো মীর অবাক হলো। না যেতে দেওয়ার কারণ জানতে চাইলে বাদশা মিয়া বলে।
বাদশা : দেহ বাপজান তোমার লগে লোক চুরি করতাম না। মায়ারে নাইওর আনার সময় তোমার বাপ-দাদি সরাসরি কইয়া দিছে।এক মাসের মধ্যে মায়া যদি তোমার লগে থাহার উপযুক্ত না হয়। তাইলে এই বিদায় শেষ বিদায় এক প্রকার তারাইয়া দিছে আমার মাইয়াডারে।কইছে মায়া রে ছাড়ানখাড়ান কইরা তোমারে আবারো বিয়া দিব।
১২ দিন তো হইয়া গেছে আমি মাইয়ারে কবিরাজ দেখাইছি চিকিৎসা চলতাছে। আল্লাহ যদি সহায় হয় আমার মাইয়ার সংসার হইবো। আর না চাইলে হইবো না।মীর আশ্চর্য হলো সে এসবের কিছুই জানেনা, তার বাপ-দাদি তাকে কিছু না বলেই এত বড় সিদ্ধান্ত নিয়ে নিল। তার বউকে বাড়ি থেকে বের করে দিল। বাদশা মিয়া আবার বলে।
বাদশা : তোমার দাদি কইছে আমার মায়া নাকি গুড়মা (হিজলা) দেখতে মাইয়া মানুষ। কিন্তু মাইয়া না। আমরা ইচ্ছা কইরা মিছা কথা কইয়া বিয়া দিয়া তোমার জীবন নষ্ট কইরা দিছি। শোনো বাপজান আমার মায়া যদি স্বামীর সংসার করার উপযুক্ত হয় তবুও আমি আমার মাইয়া তোমারে দিমু না।
হয়তো তুমি না যাইনাই আইছো আর কোনদিন আইবা না এই বাড়িতে। মীরের পায়ের নিচের মাটি কাঁপছে।তার বউকে দেবে না কি বলে এসব! এত জঘন্য কথা তার দাদি তার বউকে কিভাবে বলতে পারলো। মীর অনেক অনুরোধ করলো তার শ্বশুরকে শাশুড়িকে দাদি শাশুড়িকে । মায়া কে সাথে নিয়ে ফেরার জন্য কিন্তু কেউ দিলোনা।
উল্টো শ্বশুরবাড়িতে নিয়ে যাওয়া প্রত্যেকটা জিনিস ভ্যানে তুলে দিল। মায়া শুধু কান্না করলো। স্বামীর প্রতি যে কতটা অনুভূতি তার তৈরি হয়েছে। সেটার পরিমাণ বোঝে না মায়া। তবে ছোটরা যেমন খেলনার জন্য কান্না করে ঠিক সেভাবেই চিৎকার করে কাঁদল। বাদশা মিয়া মেয়ের কান্না সহ্য করতে না পারে বাড়ি থেকে বের হয়ে গেল। বাড়ির আঙিনায় দাঁড়িয়ে মীর স্পষ্ট শুনতে পেল তার বউর চিৎকার-কান্না জ্বলে পুড়ে ছারখার হলেও মীরের হৃদয় পুরো গ্রাম তাকিয়ে দেখল এই ঘটনা।
জ্বলে যাওয়া হৃদয় নিয়ে হিংস্র ক্ষুধার্ত বাঘের মতো বাড়ি ফিরে এলো মীর।এসেই ক্ষুধার্ত বাঘের মত প্রথম থাবাটা বসালো রাজিয়া বেগম এর উপর। কুড়াল হাতে ছুটলো রাজিয়া বেগমের বুকে কোপ বসাতে তখন ভয়ে রাজিয়া বেগম চিৎকার করে উঠে।
মীর: ঐ চু ত মা রা নি_খা ন কি মা গি তুই কোন সাহসে আমার বউরে গুড়মা কইলি। বুড়ি ন ডী বুড়া বয়সে এখনো তোর ঝাল কমেনা। খারা খারা তুই আইজ তোর শেষ কইরাই দম নিমু।
রাজিয়া : ও মাইয়া মাইয়া গো কেডা কুনো আছো গো, বাঁচাও আমারে বাঁচাও গো ও মাইয়া মাইয়া গোওওওওও রাজিয়া বেগমের জোরে চিৎকার শুনে পাশের ক্ষেতে কাজ করা লোকেরা দৌড়ে এসে মীর কে আটকায়।
ভয়ে রাজিয়া বেগম প্রতিবেশীদের বাড়িতে আশ্রয় নেয়। মীর কুড়াল হাতে বাড়ির বারান্দায় বসে থাকে বাবার অপেক্ষা। আরশাদ আলী স্কুল থেকে ফিরে এ ঘটনা শোনার পর ক্ষেপে যায়। মীরকে কিছু বলতে গেলে মীরও ক্ষেপে যায়। বাপ ছেলের মধ্যে আর এক দফায় তর্ক হয়।
আরশাদ আলী তখন ছেলেকে সরাসরি জানিয়ে দেয় অউপযুক্ত মেয়ে নিয়ে সংসার করা যাবেনা এটা অমঙ্গল। তাদের কথার বিরুদ্ধে গেলে বাড়ি থেকে বের হয়ে যেতে হবে। মীর তখন সরাসরি তার বাবাকে বলে দেয়। তার ভাগের সম্পত্তি তাকে বুঝিয়ে দেওয়া হোক। সে আলাদা হয়ে যাবে তার বউকে নিয়ে। আরশাদ আলী রেগে যায় মীরের কথায় আপত্তি জানালো।
আরশাদ : কিসের সম্পত্তির ভাগ দিতাম? সম্পত্তির এক কানা ভাগো দেওয়া হইবো না যদি অউপযুক্ত বউ নিয়ে থাকতে চাছ তয়।
মীর : আচ্ছা লাগতো না আন্নের সম্পত্তির ভাগ কিন্তু ১০ বছর ধরে আমি যা যা উপার্জন করছি। আমার পয়সায় যা যা গড়া হইছে। সে সব আমারে দিয়া দেন। নয়তো আমি সালিশ ডাকমু গ্রামে। আরশাদ আলী চিন্তায় পড়ে যায়।
মীরের পয়সায় তো গড়েছেন অনেক কিছু, তার মাস্টারির বেতনের টাকা দিয়ে সংসার তো ততটা চলে নাই এখনো চলে না। মীর আগে থেকেই ভালো করে জানত কিভাবে কাদেরকে জব্দ করতে হয়।
চুপ করে বসে থেকে চোখের সামনে সব নষ্ট হতে দেখার লোক তো সে না মাথায় বুদ্ধি না থাকলে এমনি এমনি তো আর ব্যবসায় সফলতা অর্জন করছে না। আরশাদ আলী একদম স্থির হয়ে গেল মীর তাকে চুপ থাকতে দেখে তীক্ষ্ণ হাসে।
মীর : বাড়ির আঙিনায় ভ্যান ভরা সদাই পাতি আছে। অন্নের মায়েরে লইয়া এহনি আনন্দপুর যাইবেন পায়ে ধরবেন কেমনে আনবেন কি করবেন জানি না। রাইতের মধ্যে আমি আমার বউরে আমার বাড়িত চাই। আরশাদ আলী চুপচাপ বসে শুনছে।
মীর : আর অন্নের মায়েরে কইবেন। আমার আম্মা আর বউরে সম্মান কইরা মাইন্না চলতে না হইলে কুড়ালের কোপ পরের বার ঠিক ঠিক জায়গা মতোই পরবো।কথাটি বলেই কুড়াল ছুঁড়ে মারে উঠানে কোনো দিকে না তাকিয়ে লুঙ্গির কোনা দুহাতে তুলে, ধুপ ধাপ পা ফেলে বাড়ি থেকে বের হয়ে যায়।
চলবে.......