গল্পের নাম: #পাতাবাহার_(অনূভুতির অশ্রুমালা)
পর্ব :(৯)
লেখিকা:#সাদিয়া_আফরোজ
•
•
•
আযান তিতিরের দিকে তাকিয়ে দেখে তিতির মুখ ঢেকে কাঁদছে। আযান নিজের চোখের কোনে জমে থাকা জল মুছে বড়করে দুবার নিঃশ্বাস নিয়ে নড়েচড়ে বসলো। দুবার তিতিরকে ডাকতে গিয়ে চুপ হয়ে গেল।শেষে তিতিরের দিকে ঝুঁকে হুইলচেয়ারের হাতলের ওপর হাত রেখে বলল, তিতির প্লিজ আর কেঁদো না।দেখো তোমাকে শান্তনা দেয়ার মত ভাষা আমার জানা নেই। শুধু এতটুকুই বলবো নিজেকে শক্ত রাখো।
তিতির অশ্রুসিক্ত চোখে আযানের দিকে তাকিয়ে কাঁপা কাঁপা গলায় বলল,, রেখেছিলাম নিজেকে শক্ত। যখন বাবা মাকে গোসল করিয়ে খাটিয়াতে শোয়ালো তখনও শক্ত ছিলাম। কাঁদিনি শুধু স্থির হয়ে দু'জনের খাটিয়া ধরে বসে ছিলাম। আর মনে মনে ঠিক করে নিলাম আমি তাদের সাথে চলে যাবো। বাড়ি থেকে চল্লিশ কদম গুনে বের করছিল, আমার কাছে মনে হচ্ছিল আমার ভেতর থেকে আমিটাকেই নিয়ে যাচ্ছে। এতোটাই ডেস্পারেট হয়ে গেছিলাম যে জানাজা পড়ার সময় আমি মসজিদের পাশে বসে ছিলাম। কিন্তু ওরা কেউ আমাকে যেতে দিলো না! আমাকে জোর করে ধরে রাখলো। বাবা মাকে কবর দিয়ে সবাই তো বাড়িতে চলে এলো। কিন্তু আমি! আমি কবরের পাশে গিয়ে বসে রইলাম।আমি যেই মানুষটা কবরের পাশে তো দুরের কথা , কেউ মারা গেলেও ভয়ে দেখতে যেতাম না। সেই আমি সন্ধ্যা ওবদি কবরের পাশে বসে রইলাম। পরে সবাই মিলে বাড়িতে নিয়ে গেলো। পুরো রাত বাবা মায়ের রুমে কাটিয়ে দিলাম। মা বাবার অভাব কি তা হাড়ে হাড়ে টের পেতে লাগলাম। আমার বার বার ইচ্ছে করছিলো,আমি আমার জিবনটা ওদের দিয়ে দেই আর ওদের হয়ে আমি কবরে শুয়ে পড়ি।
তিতিরের কথায় আযান স্তব্ধ হয়ে গেল। এতোটা কষ্ট সয্য করেছে মেয়েটা ভাবতেই অবাক লাগে।
তিতির চোখ মুছে বললা, জানেন,, পুরো এক সপ্তাহ নিজেকে ঘর বন্দী করে রেখেছিলাম। বের হলেই বাবা মায়ের কবরের পাশে বসে থাকতাম। এই একসপ্তাহে আমি পুরোপুরি অসুস্থ হয়ে পড়লাম,মানুষিক রোগীর মত। খাওয়া দাওয়া বন্ধ করে দেওয়াতে দুবার সেন্সলেস হয়ে পড়েছিলাম, তখন ডাক্তার স্যালাইন দিয়ে যায়। খাবার খেতে না চাইলে আগে মা জোর করে খাইয়ে দিতো , কিন্তু মা ছিল না তাই কেউ জোর করে খাইয়েও দিতো না। আর না খাবার গুলো গলা দিয়ে নামতো। এইদিকে চাচির হাবভাব চেন্জ হতে লাগলো, কেমন জানি গা ছাড়া ভাব। কিন্তু আমি সেই দিকে তেমন খেয়াল দেই নি কারন আমার মধ্যে আগের আমিটাই ছিলাম না। তিতির চোখ মুছে নিয়ে আবার বলল,,মা-বাবা মারা গেছে যে সবে দশদিন হলো । আমি মা-বাবার রুম থেকে বেরিয়ে আমার রুম পেরুতেই চাচীর গলার স্বর ভেসে এলো। চাচী কোনো কারনে চাচ্চুকে শ্বাসাচ্ছে। চাচীর আওয়াজ অনুসরণ করে তাদের রুমের দিকে এগিয়ে গেলাম। রুমের সামনে দাড়াতেই চাচীর কথায় স্তব্ধ হয়ে গেলাম। চাচী চাচ্চুকে বলছে, তোমার ভাই ভাবী মরে উদ্ধার করে গেছে। এখন তুমি যদি আমার আর মুহিবের কথা না ভাবো তাহলে খুব খারাপ হবে। এখন আর ভাগ বাটোয়ারা করার কিছু নেই সবই আমাদের। চাচীর কথায় চাচ্চুর কোনো প্রতিক্রিয়া নেই উনি উল্টো বলছে ,আর কিছুদিন যাক সবটা বুঝে নিবো।
এইসব শোনার পর আর কিছু শোনার মত অবস্থায় ছিলাম না। কোনোরকম দৌড়ে মা-বাবার রুমে ঢুকে দরজা লাগিয়ে কাঁদতে লাগলাম। এতোটা অসহায় নিজেকে কখনো মনে হয়নি যতটা ওদের কথা শুনে মনে হয়েছে।
চিন্তা করে দেখুন! দুটো মানুষ মারা গেছে তাদের জন্য খারাপ লাগাতো দূর উল্টো মরে যাওয়াতে দিব্যি খুশি। শুধু মাত্র টাকা পয়সা আর সম্পত্তির জন্য। ধীরে ধীরে আমি পুরো নিস্তব্ধ হয়ে গেলাম। বাবা-মা মারা যাওয়ার একমাস পর থেকে চাচির বদলানো রূপটা পুরোপুরি সামনে এলো। আমার বাবা বাইরের কোনো লোককে ঘরের মধ্যে এলাউ করতো না , বিশেষ করে চাচির ভাই আর ভাইয়ের ছেলেদের। কিন্তু চাচি তার ভাইয়ের পুরো পরিবারকে এনে বাড়িতে তুললো। আমাকে পুরোদমে কোনঠাসা করে দিলো। আমার রুমটাতে তার ভাই আর ভাইয়ের বউ ঘুমাতো। আমি মা-বাবার রুমে থাকতাম ,এতেও না তাদের সয্য হলো না। শেষে স্টোর রুমে জায়গা হলো আমার। আস্তে আস্তে ক্লিয়ার হতে লাগলো ,বাবা কেন চাচীর ভাই আর ভাইয়ের ছেলেদের বাড়িতে আসা পছন্দ করতো না। ওরা বাপ বেটা সুযোগ পেলেই গায়ে হাত দেওয়ার চেষ্টা করতো। আমি ওদের দেখলেই ঘাবড়ে যেতাম। চাচী আমাকে দিয়ে সারাদিন কাজ করাতো, ওনার ভাই ভাবীর সব রকম সেবা যত্ন করতে হতো। চাচ্চু এইসব দেখেও না দেখার ভান করতো। আমি শুধু কাদঁতাম মাঝে মাঝে নিজেকে শেষ করে দেয়ার চিন্তা ভাবনা করতাম।এর মধ্যে আমার রেজাল্ট আউট হয়। খুব বেশি ভালো রেজাল্ট না করলেও খুব খারাপও হয়নি। খুশি হয়ে চাচী আর চাচ্চুকে জানালাম । এতে তাদের মধ্যে কোনো ভাবাবেগ হলো না। উল্টো চাচি বলে বসলো "মেয়ে মানুষের এতো পড়ালেখা নিয়ে মাতামাতি করতে নেই"। আমি চাচ্চুকে ভার্সিটিতে এডমিশন নেয়ার কথা বলতেই চাচি গর্জে উঠে বললো"টাকা গাছে ধরে না,বাপের টাকা দিয়ে পারলে ভর্তি হও"। ব্যাস শেষ! সব স্বপ্ন জলাঞ্জলি দিয়ে দিলাম।পার হয়ে গেল একটা বছর,একবছরে আমাদের বিল্ডিং এর প্রায় সবাই চাচির এ রূপের সাথে পরিচিত হয়ে গেলো। কিন্তু কেউ কিছু বলার সাহস পেতো না। সব সয্য করতে লাগলাম সয্য না করেও উপায় নেই, মা-বাবা না থাকলে সয্য করতে হয়।
আযান তিতিরের দিকে তাকিয়ে স্থির হয়ে বসে আছে। ভাবছে, মেয়েটা যতটা সহজ ভাবে বলছে ততটা সহজ ছিল না। আচ্ছা এমনও কি হয়? এতোটা নিষ্ঠুর মানুষ কি করে হতে পারে?আযান ভেবেই কুল পাচ্ছে না।
তিতির কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে তাচ্ছিল্য করে হেসে বলল, একটা মেয়ে শত দুঃখ কষ্ট সহ্য করেও থাকতে পারে, কিন্তু যেখানে তার সম্মান নিয়ে টানাটানি শুরু হয় সেখানে থাকা দুঃসাধ্য হয়ে পড়ে। আমার জন্যও ওই বাড়িতে থাকা সেই রাতের পর থেকে দুঃসাধ্য হয়ে পড়েছিল। ওইদিন বাবা-মাকে খুব বেশি মনে পড়ছিল।তাই সকালে ওনাদের কবরের পাশে গিয়ে কিছুক্ষণ বসলাম। খারাপ লাগা এতোটাই তীব্র ছিল যে , রাতে একপ্রকার কাঁদতে কাঁদতে ঘুমিয়ে পড়লাম। ঘুমের মধ্যে মনে হচ্ছে কেউ বাজে ভাবে আমার পিঠে বার বার হাত ছুঁয়ে দিচ্ছে। স্পর্শটা খুব বাজে ভাবে ক্রমশ বাড়তে লাগলো।আমি খুব ভয় পেয়ে গেলাম।চোখ খুলে পুরুষ অবয়ব দেখে জোরে চিৎকার করে উঠলাম। ডায়নিং রুমের লাইট জ্বালানো ছিল। সেই লাইটের কিছুটা আলো স্টোর রুমে পড়তো,যার ফলে আমার বুঝতে এতো টুকু ভুল হয়নি পুরুষ অবয়বটা চাচির ওই ভাইয়ের । চিৎকার দেয়ার সাথে সাথে লোকটা দৌড়ে চলে গেল। নিজের প্রতি নিজে ঘৃনা হতে লাগলো, একপ্রকার চিৎকার করে কাঁদতে লাগলাম। চিৎকার আর কান্নার শব্দে চাচ্চু আর চাচি ছুটে এলো। আমি কাঁদতে কাঁদতে ওনাদের সব কিছু বললাম। কিন্তু চাচি বিশ্বাস করলো না উল্টো চাচ্চুকে আমার নামে উষ্কে দিলো।চাচি তার ভাইকে ডেকে এনে জিজ্ঞেস করতেই উনি সব অস্বীকার করলো ,এতে আমি মিথ্যা প্রমাণিত হই। ফলস্বরূপ চাচি আমার গায়ে হাত তোলে,চাচাও কম যায়নি অনেক মারলো। টানা দুইদিন জ্বর ছিল , আমার কারনে চাচির ভাই নাকি অপমানিত হয়েছে তাই রাগ করে চলে গেল। ওনার অপমান বোধের কারনে আমার জিবনটা আরো বেশি কঠোর হয়ে পড়লো।পান থেকে চুন খসলেই গায়ে হাত তুলতো।চাচি নিজে মেরে শান্তি না পেলে তার ছেলেকে উস্কে দিতো,ছেলেও মায়ের বাধ্য ছিল যার দরুন মায়ের কথা শুনে আমাকে বেল্ট দিয়ে মারত। কতবার হাতে পায়ে ধরতাম হিসেব নেই।সব চেয়ে মজার ব্যাপার কি জানেন!এতো মারের পরেও মরিনি,কৈ মাছের জান ছিল।কৈ মাছের জান না হলে কি,মার খাওয়ার পরও ঘরের সব কাজ করে ফেলতাম।মানুষ কাজের লোকের সাথেও বোধহয় এমন আচরণ করে না যেটা আমার সাথে করতো।আমি ভুলেই গেলাম আমি ওই বাড়ির মেয়ে ছিলাম। এতো আঘাতের পরও বাড়ি থেকে বের হওয়ার চিন্তা করতাম না। কারন যে ঘরে নিরাপদ না,সে রাস্তায় বের হলেতো কথাই নেই। নানা নানিও ছিল না যে তাদের কাছে চলে যাবো,তাই এতো কষ্টের মধ্যেও পড়ে ছিলাম।এইবারও বাড়ি থেকে বের হতাম না,যদি ওরা বের না করে দিতো। সকালে চাচি হাত পুড়ে দেয়ার পর স্টোর রুমে বসে কাঁদতে লাগলাম এমন সময় দরজা বন্ধ হওয়ার আওয়াজ পেলাম। তাকিয়ে দেখি চাচির ভাইয়ের ছেলে। আমার দিকে তাকিয়ে কেমন বিশ্রীভাবে হাসছে। নোংরা চাহনিতেই বুকের ভেতর ধক করে উঠল। আমি শাড়ির আঁচল টেনে নিয়ে নিজেকে পুরো ঢেকে ফেললাম। ছেলেটা নোংরা দৃষ্টিতে তাকিয়ে বিদঘুটে হাঁসি দিয়ে আপত্তিকর প্রস্তাব রাখলো। আমি রেগে গিয়ে থাপ্পড় মেরে দেই, আমার দেয়া থাপ্পড়ে তার ইগোতে লাগলো।সে ইগো সেটিসফেকশনের জন্য আমার গায়ে হাত দিতে চাইলো। আমি পাশ থেকে পুরোনো কাঠ উঠিয়ে মাথায় বাড়ি মেরে দিলাম। কথায় আছে না!যাকে দেখতে নারি তার চলন বাঁকা। আমার চাচি আমাকে সয্য করতে পারতো না তাই আমার কথা শুনলো না। বরং ভাইপোর আঘাতটাই চোখে পড়লো। চাচিতো বাড়ি মাথায় তুলে ফেললো , চাচাকে ফোন করে বাড়িতে ডেকে আনলো। চাচা আমার মা-বাবা তুলে আমাকে কথা শোনালো এতে আমি প্রতিবাদ করতে চাইলে আমাকে বেল্ট দিয়ে মারতে শুরু করলো। চাচির রাগ বাড়লো বই কমলো না, ঘর থেকে বের করেই দিল। এর পর রাস্তায় বেরিয়ে পড়লাম আর এক্সিডেন্ট হয়ে গেল। বাকিটাতো আপনি জানেন।
আযান যাষ্ট হা হয়ে গেছে মনে হচ্ছে কোনো উপন্যাস পড়ছে , যে উপন্যাসের প্রতিটা পাতা অশ্রু দিয়ে লেখা।
তিতির আযানের দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বলল, আপনার কথা মত আজ দুঃখ গুলোকে শূন্যে উড়িয়ে দিলাম।বেশ ভার তো তাই হয়তো উড়তে একটু সময় নিবে।
আযান তিতিরের দিকে পূর্ণ দৃষ্টি রেখে চোখ মুখ শক্ত করে বললো,, ট্রাস্ট মি তিতির! ইচ্ছে করছে ওদের সবাইকে মেরে ফেলতে, যাষ্ট মেরে ফেলতে।
তিতির মুচকি হেসে বললো, মারার দরকার নেই। আমি ওদের মাফ করে দিয়েছি।বাবা সব সময় বলতো "তোমাকে কেউ আঘাত করলে তুমি তাদের পাল্টা আঘাত কোরো না। এতে তোমার আর ওদের মধ্যে কোনো পার্থক্য থাকবে না।" তাই মাফ করে দিলাম।
তিতিরের কথায় আযান অবাক হলো। আযান উঠে দাঁড়িয়ে তিতিরের দিকে তাকিয়ে বলল,, তোমাকে শান্তনা দেওয়ার মত শব্দ আমার ঝুলিতে নেই। তবে করুনা কিংবা দয়াও হচ্ছে না । বরং তোমার প্রতি সম্মানটা হাজার খানেক বেড়ে গেলো।
তিতির মুচকি হাসলো , অতঃপর আযানের দিকে তাকিয়ে বলল, দুঃখ উড়িয়ে দিলে আসলেই নিজেকে হালকা মনে হয়।
আযান তিতিরের দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বলল, তুমি দুঃখ উড়িয়ে দাওনি তিতির বরং তোমার দুঃখের ভার কারো হাতে তুলে দিয়েছো।
আযানের কথার মানেটা তিতির বুঝতে পারলো না । আযানও বুঝিয়ে দিলো না। বরং তিতিরকে নিয়ে বাড়ির ভেতরে চলে গেল।
( ভুল ত্রুটি ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন। পড়ার পর অবশ্যই নিজেদের মতামত জানাবেন।)