গল্পের নাম: #পাতাবাহার_(অনূভুতির অশ্রুমালা)
পর্ব :(১০)
লেখিকা:#সাদিয়া_আফরোজ
•
•
•
রাত নয়টা বেজে দশটা বাজতে চললো,তিতির অসহায় মুখ করে ডায়নিং রুমে বসে আছে , তার ঠিক সামনে আনিতা শেখ প্লেট হাতে নিয়ে ভ্রু কুঁচকে তিতিরের দিকে তাকিয়ে আছে। তিতিরের খেতে ইচ্ছে করছে না কিন্তু আনিতা শেখ জেদ ধরে বসে আছে,তিতিরকে ভাত খেতেই হবে। তিতির অসহায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে আনিতা শেখের দিকে,কিন্তু আনিতা শেখ সেই দিকে পাত্তা দিলো না। তিতিরের অসহায় চোখ দুটোতে মূহুর্তে হাঁসি ফুটে উঠলো। তিতির সামনে ঝুঁকে আনিতা শেখের কোলের উপর মাথা রাখলো। আনিতা শেখ তিতিরের এহেন কান্ডে চমকে উঠলো। তিতির মুচকি হেসে বলল,তুমি পুরো আমার মায়ের কপি, আমার মাও এমন করতো আমি না খেতে চাইলে এই ভাবে জেদ ধরে থাকতো। জানো আন্টি,আজ মা-বাবাকে খুব মনে পড়ছে বুকের ভেতর কেমন ব্যাথ্যা অনুভব হচ্ছে। আজ খাবার গলা দিয়ে নামবে না, কি করে খাবো বলো!
তিতিরের কথায় আনিতা শেখের চোখ ভিজে উঠলো। আনিতা শেখ প্লেটটা টেবিলের উপর রেখে তিতিরের মাথায় হাত বুলিয়ে দিলো। তিতির পরম আবেশে চোখ বন্ধ করে নিলো।
আযান সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় তিতিরের কথা গুলো শুনতে পেলো। আনিতা শেখ আযানকে দেখে হাত উঠিয়ে ইশারায় কিছু বলতে যাবে তার আগের আযান চোখ দিয়ে ইশারা করে চুপ থাকতে বলে।আনিতা শেখ ছেলের ইশারায় চুপ হয়ে গেল।
আযান তিতিরের পাশে দাঁড়িয়ে বলে,, মা তুমি এই দুবেনী ওয়ালী স্কুল বালিকাকে কোলে শোয়ালে কেন?
তিতির আযানের এহেন কথায় সোজা হয়ে বসে আযানের দিকে ভ্রু কুঁচকে তাকালো।
আযানের কথায় আনিতা শেখ চোখ গরম করে কিছু বলবে তার আগেই আযান থামিয়ে দিয়ে মুখ টিপে হেসে বলল, মা দেখো আবার কি ভাবে তাকাচ্ছে?
আযানের কথায় তিতির আনিতা শেখের দিকে তাকিয়ে কাঁদো কাঁদো হয়ে বললো,আন্টি দেখেছো কি বলছে? যাও খুন্তি নিয়ে আসো। খুন্তি দিয়ে দুটো মাইর দাও।
আনিতা শেখ ছেলের দিকে রাগি দৃষ্টিতে তাকিয়ে ইশারায় বললো, মেয়েটাকে না জ্বালালে তোর ভাত হজম হয় না? তোকে খুন্তি দিয়ে মারবো না বরং বাথরুম ব্রাশ দিয়ে মারবো।
মায়ের কথায় আযান অবাক হয়ে বললো,, তুমি আমার নিজের মা তো ? এইভাবে কেউ নিজের ছেলেকে বলে? মা এই পিচ্চি শুনলে ক্ষেপাবে আমাকে ।
তিতির আযানের কথা শুনে বাঁকা হেসে আনিতা শেখের হাতে ডায়রি তুলে দিয়ে বললো, আন্টি কি বলেছিলে একটু লিখে দাও তো!আমিও তো দেখি এই বুড়োকে কি বলে জব্দ করেছো?
আযান মায়ের দিকে অসহায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। আনিতা শেখ ছেলের দৃষ্টিকে তোয়াক্কা না করে ডায়রি নিয়ে লিখে তিতিরের হাতে ধরিয়ে দিয়ে কিচেনে চলে গেল। এই দিকে তিতির ডায়রি হাতে নিয়ে দেখে সেখানে লেখা, ওই বদটাকে বাথরুমের ব্রাশ দিয়ে পেটাবো বলেছি।
তিতির কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে শব্দ করে হেসে উঠলো। হাসতে হাসতে পেটে খিল ধরে গেছে। কোনো রকম হাঁসি থামিয়ে বললো,মিস্টার বুড়ো চাচার মত বন্ধু আপনাকে বাথরুমের ব্রাশ দিয়ে ধোয়া হবে।
আযান মুখ ফুলিয়ে তাকিয়ে আছে । তিতির আযানের দিকে তাকিয়ে আবার হেসে উঠলো। আযান তিতিরের হাঁসি দেখে মনে মনে খুব খুশী হলেও সামনে তা প্রকাশ করলো না। আযান ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে বলল,তুমি তো শত্রু বান্ধবী। তাই দাঁত দেখাচ্ছো।
তিতির মুখ টিপে হেসে বলল, ঠিক আছে ঠিক আছে দাঁত দেখাবো না।
আযান আড় চোখে তাকিয়ে দেখে তিতির এখনো হাসছে।
আযানের তাকানোতে তিতির মুচকি হেসে বলল, ওকে ওকে সত্যি আর হাসছি না।
আযান তিতিরের সামনে রাখা চেয়ারটাতে বসে বললো, ঠিক আছে আজকের জন্য মাফ করে দিলাম।
তিতির ভ্রু কুঁচকে বললো, আমি মাফ চাইনি হুহ!
আযান ভাব নিয়ে বললো চাইতে হয় না দেখলেই বুঝা যায়।
তিতির দোতলায় উঠার সিঁড়ির দিকে তাকিয়ে বলল,এইসব বাদ আগে বলুন এই দোতলায় কে থাকে? দেখে তো মনে হচ্ছে আপনি আর ভুত ছাড়া কেউ থাকে না।
আযান সিঁড়ির দিকে তাকিয়ে বলল, আসলেই আমি আর ভুত ছাড়া কেউ থাকে না।
তিতির মুচকি হেসে বলল,, আমার নানুর বাড়িটা আপনাদের বাড়ির মত ছিল। ছোট বেলায় আমি সিঁড়ি বেয়ে নামার সময় একবার পড়ে গেছিলাম এর পর থেকে দোতলায় উঠতাম না,আমার কাছে মনে হতো দোতলার ভুত গুলো আমাকে ফেলে দিয়েছে।
তিতিরের কথা আযান হেসে উঠে বললো, ধুর পাগলী! ভুত কোথা থেকে আসবে? বরং ছোট ছিলে তাই মনে হয়েছিল।
তিতির মুচকি হেসে বলল, তখন তো এতো কিছু বুঝতাম না।তাই ওসব বলতাম আর সবাই আমার খিল্লি উড়াতো।
আযান কিছু একটা ভেবে বললো, তোমার নানার বাড়িতে এখন কে থাকে?
তিতির কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,কেউ থাকে না। আর নানার বাড়িটাও এখন আর নেই।
আযান বেশ আগ্ৰহ নিয়ে বলল, কেন?
তিতির মুচকি হেসে বলল, আমার মা হচ্ছে এক মেয়ে,ঠিক আমার মত। নানা নানু মারা যাওয়ার পর জায়গা জমি সব মায়েরই ছিল।মা আর বাবা মিলে ওসব আল্লাহর ওয়াস্তে দান করে দেয়। এখন ওইখানে একটা মসজিদ হয়,আর আশেপাশের জমি গুলোতে কিছু অসহায় মানুষের বসতি বিশেষ করে যাদের আগে নিজেদের থাকার জায়গা ছিল না তারা থাকে।
তিতিরের কথায় আযান অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। ভাবছে যারা অসহায় মানুষের জন্য এতোটা করেছে তাদেরই মেয়ে আজ কতটা অসহায়।
তিতির আযানের দিকে তাকিয়ে বলল,,কি ভাবছেন মিস্টার ফ্রেন্ড?
আযান তিতিরের দিকে তাকিয়ে বলল, না কিছু না। অনেক রাত হয়েছে চলো খেয়ে নিবে।
তিতির অসহায় মুখ করে বললো,খেতে ইচ্ছে করছে না।
আযান উঠে দাঁড়িয়ে তিতিরের হুইলচেয়ারটা ঘুরিয়ে সামনে এগোতে এগোতে বললো, ইচ্ছে টিচ্ছে বলতে কিছু নেই খেতে হবে মানে খেতে হবে।
তিতির বলার মত কিছু পেলো না তাই চুপ করে আছে।
আনিতা শেখ খাবার সার্ভ করে বসে পড়লো। আযান খাবারের প্লেটে খাবার বেড়ে খেতে খেতে বলল, মা এই পিচ্চিকে খাইয়ে দাও তো।
আনিতা শেখ ভাত মেখে তিতিরের মুখের সামনে ধরল, তিতিরের ইচ্ছে করছে না ঠিকই কিন্তু খাওয়া ছাড়া উপায় নেই তাই খেয়েই নিলো।
তিতিরের দিন গুলো বেশ ভালোই কাটছে। শুধু মাথা গোঁজার ঠাঁই হয়নি বরং যত্ন করার মত মানুষও পেয়েছে তিতির। এর মধ্যে কেটে গেল এক সপ্তাহ। এই এক সপ্তাহে আযান আর তিতিরের বন্ধুত্বটা আরেকটু গাড় হয়েছে। তিতিরের কাছে মনে হচ্ছে অনেক বছর পর জিবনের অনিন্দ সুন্দর সময় গুলো এখন কাটাচ্ছে।
আজ তিতিরের পায়ের প্লাস্টার খুলেছে। তিতির বেশ খুশি ডাক্তার বলেছে তাড়াহুড়ো করে হাঁটা যাবে না,আস্তে আস্তে হাঁটতে হবে।ডাক্তারের চেম্বার থেকে বেরিয়ে গুটি গুটি পায়ে সামনে এগিয়ে গেল তিতির।আযান তিতিরের দিকে কিছুক্ষণ স্থির হয়ে তাকিয়ে তিতিরের পেছন পেছন গেল। আযান তিতিরের জন্য গাড়ির সামনের দরজা খুলে দিল, তিতির ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে বলল, পেছনে বসবো না?
আযান মাথা নিচু করে বললো , আপনার পায়ের প্লাস্টার যেহেতু খুলে ফেলেছে তাই এখন থেকে সামনেই বসবেন ম্যাম।
তিতির হেসে উঠে বলল, ঠিক আছে স্যার, আপনি যা বলবেন তাই হবে।
তিতির সামনে বসে পড়লো।
তিতিরের কথায় আযান মুচকি হেসে ড্রাইভিং সিটে বসে গাড়ি স্টার্ট দিল। তিতির জানালার কাচটা নামিয়ে দিলো।গাড়ি চলছে আপন গতিতে তার সাথে তিতিরের সামনের চুল গুলো অবাধ্য হয়ে চোখে মুখে আঁচড়ে পড়ছে। তিতির বিরক্ত হয়ে বার বার চুল গুলো কানের পেছনে গুঁজে দিচ্ছে।
আযান গাড়ি ড্রাইভ করার পাশাপাশি আড় চোখে তিতিরকে দেখছে। বিরক্ত হওয়ার কারনে তিতিরের কপালে তিনটা সূক্ষ ভাঁজ পড়েছে। আযানের কাছে তিতিরের বিরক্ত হওয়া চেহারাটা বেশ লাগছে। আযান মুচকি হেসে বলল, মাঝে মাঝে এমন বিরক্ত হয়েই থেকো পিচ্চি।
তিতির আযানের কথায় চোখ পাকিয়ে তাকালো।
এতে আযান শব্দ করে হেসে উঠে বললো, আচ্ছা সরি। বাইদা ওয়ে,রাগলেও মন্দ লাগে না।
গাড়ির সামনে রাখা পত্রিকা হাতে নিয়ে আযানের বাহুতে দুটো মেরে বললো,একদম হাসবেন না আপনার হাঁসি কুটনি বুড়ির মত।
তিতিরের এহেন কথায় আযানের হাসির আরো বেড়ে গেল।
তিতির মুখ গোমড়া করে বসে আছে।
আযান কোনো রকম হাঁসি থামিয়ে সামনে তাকিয়ে বললো, এতো ফুললে পরে কিন্তু ব্লাস্ট হয়ে যাবে।
তিতির আযানের দিকে চোখ পাকিয়ে তাকাতেই আযান এক হাত দিয়ে কান ধরে বললো, সরি তো।
আযানের এহেন কান্ডে তিতির ফিক করে হেসে উঠলো।
আযান মুচকি হেসে সামনে তাকিয়ে ভাবছে, এই মেয়েটার হাসিতে একরাশ প্রশান্তি খুঁজে পাওয়া যায় কেন?কি আছে এই মেয়েটাতে!আযানের নিজের জানা নেই আসলে কি হচ্ছে।
•
•
তিতির হাঁটতে পারছে দেখার পর থেকেই আনিতা শেখ এতো খুশি হয়েছে যে ,মনে হচ্ছে চাঁদ হাতে পেয়েছে। এই দুই দিনে তিতিরকে নিয়ে গোটা বাড়ি সফর করছে বেশ কয়েকবার। তিতিরও আনিতা শেখের সাথে তাল মিলিয়ে চলছে। দুপুরে আনিতা শেখ কিচেনে রান্না করছে আর পাশে তিতির বসে আছে। তিতিরকে কোনো কাজে হাত দিতে দিচ্ছে না শুধু পাশে বসিয়ে রেখেছে আনিতা শেখ। তিতির পাশে বসে রাজ্যের গল্প জুড়ে দিয়েছে। দুইজন রান্না আর গল্পের মধ্যে বিভোর । আযান পনেরো মিনিট হলো কিচেনের দরজায় দাঁড়িয়ে আছে সেটা দুই জনের মধ্যে একজনের চোখেও পড়েনি। আযান গলা খাকিয়ে দুই জনের দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টা করলো কিন্তু ফলাফল শূন্য। আযান কিছুক্ষণ ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে জোরেই বললো, দুই ড্রামা কুইন একটু আমার দিকেও নজর দাও!সেই কখন থেকে দাঁড়িয়ে আছি দুই জনের মধ্যে একজনেরও খবর নেই।
আযানের কথায় আনিতা শেখ আর তিতির ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে আবার নিজেদের মত করে গল্প জুড়ে দিলো।
আযান অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। এইদিকে তিতির মুখ টিপে হাসছে সাথে আনিতা শেখ নিজেও যোগ দিলো।
দুইজনের হাঁসি আযানের দৃষ্টি এড়ালো না। আযানের দেখা সবচেয়ে সুন্দরতম দৃশ্যের মধ্যে আজকের এই দৃশ্যটা। সত্যি বলতে দুইজনের মেলবন্ধনটা আযানের কাছে দারুন লাগে।
আযান মুচকি হেসে স্বস্থির নিঃশ্বাস ফেলে নিজের রুমের দিকে পা বাড়ালো।
দুপুরের খাওয়া দাওয়া শেষ করার পর আনিতা শেখ আর তিতির বিশ্রাম নিতে রুমে চলে গেল। আনিতা শেখ ঘুমিয়ে পড়লেও তিতির ঘুমালো না। তিতির বিছানা ছেড়ে উঠে বাড়ির বাইরে চলে গেল। গার্ডেন এরিয়াতে হেঁটে হেঁটে ফুল গাছ গুলোতে হাত ছুঁয়ে দিচ্ছে। হঠাৎ ছাদের কথা মনে হতেই তিতির ছাদের দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে সামনে পা বাড়ালো। এই বাড়িতে আছে যে একমাসেরও বেশি সময় হবে কিন্তু দোতলার ঘর আর ছাদটা কখনো দেখা হয়ে ওঠেনি। তিতির হেলতে দুলতে বাড়ির ভেতরে চলে গেলো। সিড়ি বেয়ে উপরে উঠতে উঠতে ভাবেই নিলো, যেহেতু আযান বাড়িতে নেই তাই তার রুমটাও একবার দেখে নেওয়া যাবে। যেই ভাবা সেই কাজ সিঁড়ি বেয়ে উঠে সোজা আযানের রুমে প্রবেশ করলো। রুমে ঢুকেই ভুত দেখার মত জোরে চিৎকার করে উঠল তিতির।
চলবে,,,
(ভুল ত্রুটি ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন।সবেতো শুরু (◠‿◕))