গল্পের নাম:#পাতাবাহার_(অনূভুতির অশ্রুমালা)
পর্ব :(১৭)
লেখিকা:#সাদিয়া_আফরোজ
•
•
•
•
রাইয়ানের এংগেইজমেন্টের দিনের ঘটনাটার দুইদিন হলো,এই দুইদিনে তিতির অনেক চুপচাপ হয়ে গেছে। তাই রাত থেকেই আযান ডিসাইড করে নিয়েছে কাল অফিসে যাবে না, বরং তিতিরকে নিয়ে কোথাও গিয়ে ঘুরে আসবে।এতে আনিতা শেখ নিজেও সহমত পোষণ করলো। সকাল সাড়ে নয়টায় আযান ঘুম থেকে উঠে ফ্রেশ হয়ে কিচেনের দিকে ছুটলো। উদ্দেশ্য কিচেনে বসে নাস্তা করা সাথে তিতিরকে ক্ষেপানোর চেষ্টা।কিচেনের সামনে গিয়ে উঁকি দিতেই আনিতা শেখের চোখাচোখি হয়ে গেল। আনিতা শেখ ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে আছে।
এতে আযান সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে বললো, ইয়ে মানে তুমি কি করছো?
আনিতা শেখ খুন্তি হাতে নিয়ে ভ্রু কুঁচকে ইশারায় আযানকে ডাকলো।
আযান জোর পূর্বক হাসার চেষ্টা করে এগিয়ে গেল।
আনিতা শেখ খুন্তি রেখে মুচকি হেসে ইশারায় বললো,দুবেনি ওয়ালী পিচ্চি পরী এইখানে নেই। বাইরে বেরিয়েছে,মনে হয় গার্ডেন এরিয়ার দিকে গেছে।
আযান মুচকি হেসে মাকে জড়িয়ে ধরে কপালে চুমু দিয়ে বলল, লাভ ইউ মা।
আনিতা শেখ মুচকি হেসে ইশারায় বাইরে যেতে বললো।
আযান কিচেন থেকে বেরিয়ে সোজা বাড়ির বাইরে চলে গেল। গার্ডেন এরিয়া পুরোটা দেখলো কিন্তু কোথাও তিতিরকে খুঁজে পেলো না। খুঁজে না পেয়ে আযান এক প্রকার ভয় পেয়ে গেছে। দৌড়ে গেইটের কাছে গিয়ে দেখে গেইটের তালা খোলা। দারোয়ান চাচা যবে থেকে দেশের বাড়িতে গেছে তবে থেকে সব সময় গেইটের তালা আযান নিজেই খুলে দেয়। এই কয়েক মাসে নতুন কোনো দারোয়ান আযান রাখেনি।আযান গেইট থেকে বেরিয়ে চারপাশটা ভালো করে দেখে দৌড়ে বাড়ির ভেতরে চলে গেল। আনিতা শেখ আযানকে এইভাবে দৌড়ে আসতে দেখে ইশারায় জিজ্ঞেস করলে,আযান কিছু না বলে সরে যায়। আনিতা শেখ আর কিছু জিজ্ঞেস করলো না বরং নিজের কাজে মন দিলো। এই দিকে আযান পাগল প্রায়। সব ঘর চেক করছে কিন্তু কোনো ঘরে তিতির নেই। দোতলায় গিয়েও দেখলো তাতেও নেই। আযানের চোখ মুখ রক্ত বর্ণ ধারন করেছে। মনের মধ্যে ক্ষীণ একটা আশা নিয়ে কোনোরকম দৌড়ে ছাদে উঠলো। ছাদের একটা পাশ দেখে আরেকটা পাশের দিকে গিয়ে থমকে গেল। তিতির ফুল গাছ গুলোতে পানি দিচ্ছে আর গুন গুন করে গান গাইছে। আযান একপা দুপা করে তিতিরের দিকে এগিয়ে গেলো।
তিতির পাছনে ফিরে আযানকে দেখে চমকে উঠলো। আযানের চোখ মুখ লাল হয়ে আছে, কপাল বেয়ে টপ টপ করে ঘাম ঝরছে। তিতির দু কদম সামনে এগিয়ে আযানের দিকে তাকিয়ে বলল,কি হয়েছে আপনার?এমন চিন্তিত দেখাচ্ছে কেন?
আযান বড় করে নিঃশ্বাস ফেলল, নিঃশ্বাস ফেলার ধরন বলে দিচ্ছে বুকের উপর থেকে একটা বড় পাথর সরে গেছে।
তিতির তা দেখে কিছু বলতে যাবে,, তার আগেই আযান তিতিরকে জড়িয়ে ধরল।
আযানের আচমকা জড়িয়ে ধরাতে তিতির স্তব্ধ হয়ে গেছে।তিতিরের হাত থেকে পানির পাইপটা পড়ে গেছে। তিতির বুঝতে পারছে না ঠিক কি রিয়েক্ট করা উচিৎ!কয়েক সেকেন্ড পর তিতির অনুভব করতে পারলো তিতিরের ঘাড় বেয়ে তরল কিছু গড়িয়ে পড়ছে।কেন জানি মনে হলো আযান কাঁদছে! তিতির কাঁপা কাঁপা গলায় বলল, আযান! আপনি ঠিক আছেন?
আযান তিতিরের কথার উত্তর দিলো না বরং তিতিরের মাথাটা বুকের সাথে চেপে ধরে কান্না জড়ানো গলায় বললো,,আমি ভয় পেয়ে গেছিলাম তিতির, আমি ভেবেছিলাম তুমি আমাদের ছেড়ে চলে গেছো। মা বললো তুমি গার্ডেন এরিয়াতে কিন্তু আমি খুজে দেখি তুমি নেই। গেইটও পুরো খোলা ছিল,বিশ্বাস করো নিজেকে কেমন পাগল পাগল লাগছিলো। সব গুলো রুম খুঁজে দেখেছি কোথাও পাইনি। দেখ তিতির এমন আর কখনো করবে না,এমন করলে একদম মেরে ফেলবো। যেখানে যাবে বলে যাবে, হোক সেটা গার্ডেন কিংবা ছাদ। একদম মেরে ফেলবো কোথাও না বলে গেলে।
তিতির আযানের কথা শুনে হা হয়ে গেলো। কিছুক্ষণ আগেই গার্ডেন এরিয়া থেকে ছাদে এসেছে, আর এর মধ্যে এতো কান্ড হয়ে গেলো? আযানকে দেখেই বুঝা যাচ্ছে আযান বেশ ভয় পেয়েছে। কিন্তু কাঁদছে কেন! তিতির ভেবে পাচ্ছে না।তিতির আস্তে করে ডেকে উঠলো, আযান!
তিতিরে ডাকে আযানের হুশ ফিরলো। আযান তিতিরকে ছেড়ে খানিকটা দূরে দাঁড়িয়ে মাথা নিচু করে বললো, সরি আসলে,
তিতির আযানের দিকে তাকিয়ে দেখে আযানের চোখ বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছে। তিতির আযানকে কিছু বলতে না দিয়ে বললো, এই দিকে আসুন!
আযান তিতিরের দিকে তাকালো। তিতির দু কদম সামনে এগিয়ে আযানের চোখের জল মুছে দিলো।
তিতিরের কাজে আযান যেন বরফ হয়ে গেল।
তিতির আযানের টিশার্টের কোনা ধরে টেনে দোলনার পাশে এনে বললো, বসুন !
আযান কেন জানি তিতিরের কথা ফেলতে পারলো না,তাই বলার সাথে সাথে বসে পড়লো। তিতির দোলনার আরেক পাশে বসে আযানের দিকে তাকালো। তিতিরের তাকানোতে আযান অপ্রস্তুত হয়ে পড়লো।
তিতির কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে বলল, গেইটের তালা আমিই খুলে ছিলাম,দশ মিনিট হবে তালাটা খুলে সোজা ছাদে চলে এসেছি।
আযান আস্তে করে বললো, বলে আসোনি কেন?
তিতির আযানের দিকে শান্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,, পুরুষ মানুষ তখনই কাঁদে যখন তাদের অনূভুতি পিঠ বাস্তবতা দেয়ালে ঠেকে যায়। তবে তাদের কান্না দুর্বলতার বহিপ্রকাশ।
আযান তিতিরের দিকে তাকালো
তিতির আযানের চোখে চোখ রেখে বললো, আপনি কেঁদেছেন কেন?
আযান তিতিরের মুখের আদলে শান্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল, অনূভুতির পিঠ বাস্তবতার দেয়ালে ঠেকে গেছে ভেবে।
তিতির ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, মানে?
আযান মুচকি হেসে বলল, ভেবেছিলাম আমার বান্ধবীকে কেউ নিয়ে গেছে তাই।
তিতির আযানের দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বললো,পুরুষ মানুষের কাঁদতে নেই, তার মানে এই নয় যে তারা কষ্ট পায় না তাদের কান্না আসে না। তবে তাদের কান্নাটা হোক সবার অগোচরে।আর আপনি তো অপ্রয়োজনীয় কিছুর জন্য চোখের জল নষ্ট করলেন। নিজেকে দুর্বল প্রমাণ করলেন।
আযান তিতিরের কথার ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে বলল, অপ্রয়োজনীয়!তাও তুমি? আমার কাছে তো খুব বেশি প্রয়োজনীয় মনে হয়। কারন তুমি আমার ফ্রেন্ড।তাও খুব স্পেশাল ফ্রেন্ড।
তিতির মুচকি হেসে বলল, আমি আকাশ নই বরং শরৎএর মেঘ, যে কোথাও স্থায়ী না। আমি ভেসে আসা পুঞ্জ মেঘ , বাতাসের ঝাপটায় একজায়গা থেকে অন্য জায়গায় ভেসে যাবো। চিন্তা করে দেখুন ভেসে আসা মেঘের জন্য কষ্ট পেয়ে লাভ আছে? বরং বড় লোকসান, কারন শরৎতের মেঘ ভেসে বেড়ানোর জন্যই আসে এর জন্য মন খারাপ করা কিংবা চোখের জল ফেলা বোকামো ছাড়া কিছুই না।
আযান তিতিরের কথায় মুচকি হেসে বলল,শরৎএর মেঘ না বরং কারো আকাশ।
তিতির ভ্রু কুঁচকে তাকালো।
আযান তিতিরের চোখে চোখ রেখে বললো,, বুঝবে না তুমি এখনো পিচ্চি।
তিতির চোখ ছোট ছোট করে তাকালো।
তিতিরকে জড়িয়ে ধরার ব্যাপারটা মনে হতেই আযান মাথা নিচু করে বললো, আ'ম সরি তিতির, আসলে ভয় পেয়ে তোমাকে,,
তিতির বুঝতে পেরেছে আযান জড়িয়ে ধরার ব্যাপারটায় বেশ গিল্টি ফিল করছে তাই থামিয়ে দিয়ে বললো, ইট'স ওকে আমি বুঝতে পেরেছি।
আযান মাথা নিচু করেই আছে। তিতির বুঝতে পেরেছে আযান খুব বেশি ভয় পেয়ে গেছে,যার ফলে জড়িয়ে ধরেছে। তবে আযানের জড়িয়ে ধারায় হারানোর ভয় ছাড়া কিছুই ছিল না। তাই তিতির আযানকে স্বাভাবিক করতে বললো, অপচয় কারী সয়তানের ভাই আর আপনি তো সয়তানের বড় চাচার মত কাজ করছেন!
আযান মাথা তুলে অবাক নয়নে তাকালো।
তিতির মুখ ফুলিয়ে বললো, দেখুন আপনার জন্য টবে পানি দিতে পারিনি উল্টো পাইপের পানি গুলোতে পুরো ছাদ ভেসে গেছে।এতে অনেক অপচয় হয়েছে আর হচ্ছে, তাড়াতাড়ি গিয়ে লাইনটা বন্ধ করে আসুন!
তিতিরের কথায় আযান একদম ভ্যাবাচেকা খেয়ে গেছে।
তিতির আযানকে ধাক্কা দিয়ে বললো, আপনি যাবেন?
আযান কোনো রকম "হু" বলে দৌড়ে পাইপ লাইন বন্ধ করতে চলে গেল।
তিতির আযানের যাওয়ার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলো, তবে মনে মনে আযানের বলা একটা কথা বার বার বেজে উঠছে," শরৎ এর মেঘ না বরং কারো আকাশ"
চলবে,,,,
(ভুল ত্রুটি ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন।)