গল্পের নাম:#পাতাবাহার_(অনূভুতির অশ্রুমালা)
পর্ব :(২০)
লেখিকা:#সাদিয়া_আফরোজ
•
•
•
•
আযানের বলা কথায় তিতির স্তব্ধ হয়ে গেছে। তিতির কিছু বলতে নিয়েও চুপ করে গেছে।
ম্যানেজার হেসে উঠে তিতিরকে উদ্দেশ্য করে বলল, ম্যাম কেমন আছেন?
তিতির আযানের দিকে তাকিয়ে জোর পূর্বক হাসার চেষ্টা করে বললো,জ্বী আলহামদুলিল্লাহ ভালো।
ম্যানেজার মুচকি হেসে বলল, আমাদের রেস্টুরেন্টে প্রথম এলেন তাই আমি চাইবো আপনি নিজের মত করে সবটা ঘুরে দেখুন আর অর্ডার করুন। আমরা যথা সাধ্য চেষ্টা করবো নিজেদের বেস্ট দেয়ার।
তিতির ম্যানেজারের কথা শুনে বললো, জ্বী আচ্ছা।
আযান আড় চোখে তাকিয়ে তিতিরকে দেখছে।
ম্যানেজার মুচকি হেসে প্রস্থান করলো।
ম্যানেজার যেতেই তিতির কোমরে হাত দিয়ে রাগী দৃষ্টিতে আযানের দিকে তাকালো।
আযান তিতিরের দিকে তাকিয়ে জোর পূর্বক হাসার চেষ্টা করে বললো,ইয়ে মানে,,!
তিতির ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে বলল,, তো কি যেন বলছিলেন তখন! ও হ্যা !আমি ম্যানেজারের সম্মানিত স্যারের ওয়াইফ আর ওনার ম্যাম?
আযান আশেপাশে তাকিয়ে তিতিরের হাত ধরে একপাশে নিয়ে গিয়ে বললো,, চুপ করো!আগে কথা তো শুনো!
তিতির এক ভ্রু কিঞ্চিত উঁচু করে বলল, কি!
আযান হাত দিয়ে তিতিরের কপালে আলতো করে টোকা দিয়ে বললো,আগে ভ্রু ঠিক করো, এমন ভাবে ভ্রু উঁচু করে তাকাচ্ছো যেন আমি চোর।
তিতির মুখ টিপে হেসে বলল,চোর নয় বরং আস্ত একটা বুড়ো ডাকাত,যে সুন্দরী আনিতা শেখের মাসুম দুবেনী ওয়ালা পিচ্চি পরীকে নিয়ে মিথ্যা বলেছে।
তিতিরের কথায় আযান অবাক হলেও পরে শব্দ করে হেসে উঠে বললো, আমার ড্রামা কুইন মায়ের সাথে থাকতে থাকতে তুমি পুরোই তার মত হয়ে গেছো। পিচ্চি ড্রামা কুইন একটা!
তিতির চোখ ছোট ছোট করে তাকিয়ে বললো,সব সাইডে রেখে সত্যিটা বলুন!
আযান ইশারায় তিতিরকে বসতে বলে নিজেও বসে পড়লো।
তিতির আযানের দিকে উত্তরের অপেক্ষায় তাকিয়ে আছে।
আযান বললো, এই রেস্টুরেন্টে প্রায় আসা হয়। বেশিরভাগ সময় এইখানে অফিসিয়াল মিটিং গুলো হয়ে থাকে। আর সেই সুবাদেই ম্যানেজার এতোটা ভালো করে চেনে আমায়। তবে এই প্রথম কোনো মেয়ের সাথে দেখেছে, খারাপ-ভালো অনেক কিছুই ভাববে। আজকাল ভালোর চাইতে খারাপ চিন্তাটাই মানুষের মস্তিষ্ক দখল করে বেশি। তবে আমি চাইনা অন্তত তোমাকে জড়িয়ে খারাপ কিছু তার মাথায় আসুক।তাই তো তার কথায় হ্যা বলে দিলাম।
তিতির অবাক হয়ে গেছে। আসলেই তো !এই চিন্তাটা আমার মাথায় কেন আসেনি? লোকটাকে যতটা দেখছি ততটাই আবাক হচ্ছি।
তিতির বিস্ময় ভরা দৃষ্টিতে তাকিয়ে এইসব ভাবছে।
আযান চুলে হাত চালিয়ে বললো,, তাছাড়া আজকের আতিথিয়তা একটু বেশিই স্পেশাল হবে মনে হচ্ছে। বউ নিয়ে গেলে লাভ আছে দেখছি।
আযানের কথায় তিতির বাঁকা চোখে তাকিয়ে বললো,,, তো বউ নিয়ে যান!হুদ্দাই একটা অবলা নারীকে নিয়ে আসলেন কেন?
আযান আফসোস করে বললো, বুঝলে তিতির আজ কাল সবাই সবার কলিজা দিয়ে দিবে কিন্তু কেউ তার নিজের একটা বউ দিবে না। তাহলে তুমিই বলো আমি বউ নিয়ে কেমনে যাবো?
আযানের কথা শুনে তিতির হা করে তাকিয়ে আছে।
কার বউ কে দেয়!কি বললাম আর কি বুঝলো!
তিতির বললো, কারো বউ কেউ কেন দিবে! আপনি বরং বিয়ে করে ফেলুন তাহলেই তো বউ হয়ে যাবে।
আযান তিতিরের দিক থেকে চোখ সরিয়ে ওয়েটারের দিকে তাকিয়ে আস্তে করে বললো ,রাজি থাকলে এখনই বউ করে নিবো শুধু একবার হ্যা বলো!
তিতির আযানের দিকে অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। কথাটা স্পস্ট শুনতে পেয়েছে তিতির কিন্তু মন মস্তিষ্ক বলছে ভুল শুনেছে। কারন আযান এমন কথা বলবেই না। তিতির কনর্ফম হওয়ার জন্য বললো,, কিসের হ্যা বলবো!
আযান তিতিরের কথায় হকচকিয়ে গিয়ে বললো, আমি যা অর্ডার করবো তা পছন্দ হলে হ্যা বলতে বলেছি।
তিতির বুঝতে পারলো আসলেই সে ভুল শুনেছে। তবে আযানের কথাটা তিতিরের পছন্দ হলো না। কেন জানি অবচেতন মন চাইছে প্রথমে ভুল শুনা কথাটা সত্যি মনে করতে। তবে কেন সেটা সে নিজেও জানে না।
তিতির চুপ করে বসে আছে আর ভাবছে, আসলেই কি আমি আযানের কাছে অমনটা আশা করি? না না ছিঃ এমন কখনোই না। মনের ভুল মনে থাকাই ভালো।
আযান তিতিরের দিকে তাকিয়ে আছে। তিতিরের হঠাৎ কি হলো বুঝতে চেষ্টা করছে।
এমন সময় ওয়েটার এসে বললো,, আসসালামুয়ালাইকুম স্যার ,ম্যাম ! আজ আমাদের রেস্টুরেন্টের পক্ষ থেকে আপনাদের জন্য স্পেশাল কিছু অর্ডার করা আছে। অনুমতি দিলে আমরা তা সার্ভ করবো।
ওয়েটারের কথায় তিতির ভাবনার জগৎ থেকে বিদায় নিয়ে বাস্তবে ফিরে এলো। আযান সালামের উত্তর দিয়ে বললো, অবশ্যই। আর হ্যা ম্যানু কার্ডটা নিয়ে আসবেন প্লিজ।
ওয়েটার "ওকে স্যার" বলেই চলে গেল।
আযান তিতিরের দিকে তাকিয়ে বলল, হঠাৎ হঠাৎ কোথায় হারিয়ে যাও বলোতো?
তিতির মাথা নেড়ে বললো,, কোথাও না।
আযান সন্দেহের দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,, তাই!
তিতির হেসে উঠে বললো, হ্যা!
আযান মোবাইল বের করতে করতে বললো,ঠিক আছে তাহলে। আসো আমরা কয়েকটা ছবি তুলে নেই,মাকে দেখাতে হবে।
অতঃপর আযান তিতির সহ বেশ কয়েকটা সেলফি তুলে নিলো।
রেস্টুরেন্ট থেকে বের হতে হতে প্রায় দুটো বেজে গেছে। আযান তিতিরকে নিয়ে লম্বা পথ পাড়ি দিলো। তিতির কোনো প্রশ্ন করলো না বরং এই লম্বা পথ পাড়ি দেওয়াটা উপভোগ করতে লাগলো।
শহর থেকে বেরিয়ে প্রায় ৬ কিলোমিটার পেরিয়ে গড়ি থামলো। আযান কয়েক মিনিট বসে থেকে চারপাশটা দেখে নিলো। তিতির আশপাশে তাকি দেখছে জায়গাটা কোথায়।
শুনশান রাস্তা মনে হয়না ঘন্টা খানেকের মধ্যে কোনো গাড়ি এই রাস্তা ক্রস করে। রাস্তার একটা পাশে অনেক গাছপালা তবে আরেটা পাশে দূর দূরান্তে কোনো গাছ নেই,পুরোটাই ধান ক্ষেত।
আযান গাড়ি থেকে নেমে তিতিরের পাশের দরজাটা খুলে দিল। তিতির গাড়ি থেকে নেমে বললো, এইখানে কেন এসেছি?
আযান বাঁকা হেসে বলল, তোমাকে এইখানে ফেলে রেখে যাবো তাই।
আযানের কথায় বিন্দুমাত্র পাত্তা দিলো না তিতির।
আযান ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে বলল,, সত্যি রেখে যাবো!
তিতির বিরক্ত হয়ে বলল, ঠিক আছে । আগে বলুন কোন দিকে যাবো?
আযান হতাশার নিঃশ্বাস ফেলে ধান ক্ষেতের দিকে দেখিয়ে বললো , ওই দিকটায়।
তিতির একপা দুপা করে সামনে এগিয়ে যেতে লাগলো। সূর্যটা পশ্চিমে হেলে পড়ছে তার মাঝে তিতির এগিয়ে যাচ্ছে সামনে।তিতিরকে দেখে মনে হচ্ছে শুভ্রময়ীর খুব তাড়া সূর্য অস্ত যাওয়ার। আযান তাড়াতাড়ি মোবাইল বের করে তিতিরের কয়েকটা ছবি তুলে নিলো।আযান গাড়ির দরজা লক করে দ্রুত পায়ে হেঁটে তিতিরের পাশে দাঁড়ালো।
তিতির সামনে তাকিয়ে বললো,, আমি না কখনো সমুদ্রের তীরে বসে সূর্যাস্ত দেখিনি। তবে মনে হচ্ছে তার আর প্রয়োজন নেই।
আযান তিতিরের মুখের আদলে শান্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে।
তিতির দৃষ্টি ঘুরিয়ে আযানের দিকে তাকিয়ে বলল,, কারন সবাই সমুদ্রের তীরে বসে সূর্যাস্ত দেখলেও কেউ কখনো সবুজের মাঝে সূর্যাস্ত দেখেনি যেমনটা আমি দেখছি।
আযান মুচকি হেসে বলল,, উঁহু! একদিন তুমিও সমুদ্রের নোনা জলে পা ভিজিয়ে সূর্যাস্ত দেখবে।আজ না হয় সবুজের মাঝে সূর্যাস্ত দেখো। তবে হ্যা এই ভাবে নয়।
তিতির কিছু বলতে নিবে তার আগেই আযান তিতিরের হাত ধরে সামনে এগিয়ে নিয়ে যেতে লাগলো। পিচঢালা রাস্তা থেকে কিছুটা দূরে গিয়ে থামলো আযান। চারপাশে ধান ক্ষেত হলেও মাঝখানে একটা জমিতে পুকুরে মত করে কাঁটা, তার পাশে বাঁশ দিয়ে বেঞ্চ বানানো।
আযান তিতিরকে বেঞ্চে বসিয়ে নিজেও বসলো।
বেশ কিছুটা সময় পিনপিনে নিরবতা শেষের আযান বলে উঠলো, কাউকে ভালোবাসো তিতির?
চলবে,,,,,,