গল্পের নাম:#পাতাবাহার_(অনূভুতির অশ্রুমালা)
পর্ব :(২১)
লেখিকা:#সাদিয়া_আফরোজ
•
•
•
•
আযানের করা প্রশ্নে তিতিরের কোনো হেলদোল নেই। বরং সে প্রশ্নের বেড়াজালে জড়িয়ে গেছে।
আযান কাতর দৃষ্টিতে তাকিয়ে উত্তরের অপেক্ষা করছে।
বেশ কিছুটা সময় অতিবাহিত হওয়ার পর তিতির মৃদু শব্দে ডেকে উঠলো,, আযান,,!
তিতিরের ডাকটা আযানের হৃদয়ের কম্পন ক্ষানিটা বাড়িয়ে দিলো। আযান চেয়েও সাড়া দিতে পারলো না, শুধু দৃষ্টি ঘুরিয়ে তিতিরের মায়া ভরা দৃষ্টিতে আবদ্ধ হলো।
তিতির অজস্র মায়া ভীড় করা চোখে আযানের দিকে চেয়ে বললো,, জানি না ভালোবাসি কিনা,কখনো বেসেছি কিনা তাও জানি না। কাউকে ভালোবাসা কিংবা তার ভালোবাসায় পড়া এইসব কখনো হয়ে উঠেনি। যখন এইসব বুঝবো তখনই কঠিন বাস্তবতার মুখে পড়েছি।
তিতিরের কথা শুনে আযান চুপ করে আছে। বলার মত কিছু পেলো না ।
তিতির আযানের দিকে প্রশ্নবিদ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে শান্ত স্বরে বলল,, আচ্ছা আযান! ভালোবাসা কেমন হয়? সেটাকি ছোঁয়া যায়? নাকি অনূভুতিতেই সীমাবদ্ধ! যদি অনূভুতিই হয়ে থাকে, তাহলে সে অনূভুতি কেমন হয়?ভালোবাসতে ঠিক কি প্রয়োজন হয়? ভালোবাসার মানুষ নিজ থেকেই আসে নাকি খুঁজতে হয়?
আযান অবাক দৃষ্টিতে তিতিরের দিকে তাকিয়ে ভাবছে,, বাস্তবতাকি মানুষকে এতোটা অনূভুতি হীন করে দেয়? নাকি অনূভুতি বুঝার ক্ষমতা নিংড়ে নেয়!
আযান কিছুটা সময় চুপ করে থেকে তিতিরের চোখে চোখ রেখে বললো,,, ভালোবাসা হচ্ছে একটা অনুভুতি।যেটা না ধরা যায় না ছোঁয়া যায় শুধু অনুভব করা যায়। জিজ্ঞেস করেছিলে না!ভালোবাসতে কি লাগে? ভালোবাসা জাত-পাত,যোগ্যতা, টাকা-পয়সা, পদমর্যাদা, সুন্দর অসুন্দর খুঁজে না,ভালোবাসা শুধু ভালোবাসা খুঁজে। ভালোবাসার মানুষ খুঁজতে হয় না তিতির! সুখ আর ভালোবাসা আপনা আপনি ধরা দেয়। এই দুটো কেউ খুঁজলে পায় না আর পেলেও সে মঙ্গলময় হয় না বুঝলে?
তিতির কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে বলল,কই বললেন নাতো ভালোবাসার অনুভূতি কেমন হয়!
আযান মৃদু হেসে বলল, ভালোবাসার অনুভূতি কেমন হয় তা বললেও বুঝবে না। যেদিন কারো অপেক্ষায় পুরো দিন বসে থাকবে,তার সামান্য দূরত্বে মন ক্ষতবিক্ষত হবে,তার গলার আওয়াজ আর উপস্থিতি টের পেতেই হৃদস্পন্দন স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি হয়ে যাবে, তার মুখের আদল তোমার হাসির কারণ হবে সেই দিন বুঝবে ভালোবাসার অনুভূতি কেমন।
তিতির মুচকি হেসে বলল, কাউকে ভালোবাসেন?
তিতিরের প্রশ্নে আযানের বুকটা মৃদু কেঁপে উঠলো।আযান বুঝতে পারছে না কি উত্তর দিবে।আযান এমন প্রশ্নের উত্তর দেয়ার জন্য একদমই তৈরি ছিল না ।
তিতিরের মন মস্তিষ্ক উদগ্রীব হয়ে অপেক্ষা করছে আযানের উত্তর শুনার জন্য। তিতির জানে না এই উত্তর শুনার জন্য কেন তার এতো তাড়া।
আযান আসফাস করছে কি ভাবে উত্তর দিবে তা ভেবে। এই দিকে প্রায় পুরোপুরি সবুজের মাঝে বিলীন হতে চললো।
আযান তিতিরের দিকে তাকিয়ে অপ্রকাশিত সত্য প্রকাশ করবে মাত্র এমন সময় আযানের মুঠোফোন বেজে উঠল।
মুঠোফোনে আওয়াজে দুজনের ধ্যান ভাঙল। আযান স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। মোবাইল হাতে নিয়ে দেখে মা ফোন করেছে।
তিতির আযানের মুখপানে চেয়ে আছে।
আযান ফোন রিসিভ করতেই , মায়ের মায়া ভরা চেহারাটা ভেসে উঠলো।যদিও মায়াভরা চেহারার মধ্যে রাগের আভাস পাওয়া যাচ্ছে।
আযান কিছু বলবে তার আগেই আনিতা শেখ ইশারা করে বললো,, সত্যি করে বলতো তুই কি তিতিরকে নিয়ে ভেগেছিস? তাড়াতাড়ি মেয়েটাকে বাড়ি দিয়ে যা বলছি!নয়তো তোকে খুন্তি দিয়ে পেটাবো।
আযান হা করে তাকিয়ে আছে, ইন্নালিল্লাহ্ বলেকি?
আযানের অমন হা করে থাকা দেখে , তিতির আযানকে ধাক্কা দিয়ে বললো, আন্টি কি বলেছে?
আযান অবাকতার রেশ কাটিয়ে বললো,,মা এইসব কি বলছো? তোমার ছেলে অতোটাও খারাপ না। এতো টুকু বিশ্বাস তো রাখো ছেলের উপর!
আনিতা শেখ ভ্রু কুঁচকে ইশারায় বললো,, একটুও বিশ্বাস নেই। নওটঙ্কি! তাড়াতাড়ি বাড়ি দিয়ে যা আমার পিচ্চিকে।
আযান মাথা চাপড়ে বললো, ঠিক আছে, আসছি ।
তিতির বিস্ময় নিয়ে মা ছেলের কথা শুনছে।শুনলেও বুঝতে পারলো না কিছুই।
আযান কল কেটে তিতিরের দিকে তাকিয়ে বলল,,চলো তোমার ডাক পড়েছে।
তিতির অবাক হয়ে বললো,,, আমার ডাক পড়েছে মানে?
আযান দুঃখী চেহারা করে বললো,মা বলেছে তার পিচ্চিকে বাড়ি দিয়ে আসতে।
তিতির ঠোঁট চেপে হেসে উঠে বললো, চলুন যাওয়া যাক।
সূর্যাস্ত শেষে সন্ধ্যা নেমেছে। আবছা আলো এখন অন্ধকারের রূপ নিয়েছে। আযান ফ্লাস লাইট জ্বালিয়ে তিতিরকে নিয়ে গাড়িতে উঠলো। আযান জানালার কাচটা উঠিয়ে দিলো,এতে তিতির প্রচুর পরিমাণে বিরক্ত। আযান গাড়ি স্টার্ট দিতে দিতে বলল, ঠান্ডা লেগে যাবে।
তিতির গাড়ির কাচ পুরোপুরি খুলে দিয়ে বললো, লাগবেনা বরং এইভাবে থাকলে দম আটকে মরে ভুত হয়ে যাবো।
তিতিরের কথা শুনে আযান মুচকি হেসে গড়ি চালানোয় মনোযোগ দিলো।
শুনশান রাস্তায় গাড়ি চলছে আপন গতিতে। অন্ধকার আরো প্রগাঢ় হচ্ছে সাথে নিস্তব্ধতা। আযান বেশ কিছুটা সময় পর তিতিরের দিকে তাকালো। এরই মধ্যে তিতির ঘুমিয়ে পড়েছে। বাতাসের ঝাপটায় চুল গুলো মুখে উপর এসে পড়ায় খুব বিরক্ত সে। ঘুমের কারনে বারবার মাথাটা হেলে পড়ছে। আযান গ্লাস তুলে দিয়ে গাড়ি স্লো করলো। খুব যত্ন করে তিতিরের মাথাটা নিজের কাঁধে রেখে এলোমেলো চুল গুলো গুছিয়ে কানের পেছনে গুঁজে দেয়। ঘুমের কারনে আযানের কত শত অনূভুতি তিতিরের অগোচর প্রকাশ হচ্ছে হিসেব নেই।
বাড়ি ফিরতে ফিরতে প্রায় পনে নয়টা বেজে গেল। আযান বাড়ির দরজার সামনে এসে গাড়ি থামায়। তিতির তখনও গভীর তন্দ্রায় নিমগ্ন। তিতির জেগে উঠে নিজেকে যদি আযানের বাহুডোরে আবদ্ধ অবস্থায় দেখে তাহলে লজ্জায় মরে যাওয়ার মত অবস্থা হবে। আযান নিজেও অপ্রস্তুত পরিস্থিতিতে পড়বে।তাই আস্তে করে তিতিরকে সিটের সাথে হেলান দিয়ে বসিয়ে দিলো। আযান নিজে সোজা হয়ে বসে তিতিরকে মৃদু আওয়াজে ডাকতে লাগলো। কিন্তু তিতির নড়ে চড়ে আবার ঘুমিয়ে পড়েছে। শেষে আযান না পেরে গাড়ির হর্ন বাজিয়ে দিলো। তিতির প্রচন্ড রকমের বিরক্ত হয়ে চোখ খুললো।
আযান তিতিরের দিকে তাকিয়ে বলল, অলরেডি আপনার দুই ঘুম এই গাড়িতে পুরন হয়ে গেছে। বাড়ি চলে এসেছি এইবার তো উঠুন!
আযানের কথায় তিতির অবাক হয়ে বললো, এইটুকু সময়ে চলে এসেছি!
আযান মাথা চাপড়ে বললো, আল্লাহ! এইটুকু সময়? তিতির ঘড়ি দেখো অলরেডি নয়টা বেজে গেছে।
তিতির অবিশ্বাস্য নজরে আযানের দিকে তাকিয়ে আছে।
আযান ঘড়ি দেখি বললো,, দেখো!
তিতির চোখ বড়বড় করে বললো,, আল্লাহ! আন্টি এতক্ষন একা ছিল?
আযান গাড়ির দরজা আনলক করে বললো ,, হ্যা।
তিতির তাড়াতাড়ি গাড়ি থেকে নেমে বাড়ির দরজার দিকে যেতে যেতে বললো,, ইস!বড্ডো ভুল হয়ে গেছে। সব আপনার জন্য,সব আপনার দোষ।
আযান তিতিরের কথা শুনে হা হয়ে গেছে।
সব আমার দোষ! আমি কি করলাম?
আনিতা শেখ সোফায় বসে টিভি দেখছে।বাড়ির দরজা খোলা থাকায় তিতির নিঃশব্দে এসে আনিতা শেখের পাশে বসলো।
আনিতা শেখ তিতিরের উপস্থিত আরো আগেই টের পেয়েছে তাও চুপ করে আছে। কারন গাড়ির হর্ন এর শব্দ পেয়ে দরজা নিজেই খোলা রেখে ছিল।
তিতির আনিতা শেখের কোলে মাথা রেখে গুটিশুটি মেরে সোফায় শুয়ে পড়লো। আনিতা শেখ তিতিরের এহেন কান্ডে মুচকি হেসে তিতিরের মাথায় হাত বুলাতে শুরু করলো।
মমতাময়ীর মমতায় জড়ানো হাতের স্পর্শে মুচকি হেসে চোখ বন্ধ করলো তিতির।
এইদিকে আযান সব গুলো শপিং ব্যাগ নিয়ে দুহাত ভর্তি করে ফেলেছে। বাড়ির ভেতরে ঢুকতেই দেখতে পেলো মায়ের কোলে তিতির পিচ্চি বাচ্চার মত গুটিগুটি মেরে শুয়ে আছে।
আযান ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে সামনে এগিয়ে গেলো।
আনিতা শেখের ভাব খানা এমন যে , আযান আসায় সে দারুন বিরক্ত।
আযান মায়ের ভাবমূর্তি দেখে মুচকি হেসে বলল,, এইবার খুশিতো! তখন যেভাবে বলেছিলে আমার নিজেকেই মেয়ে ধরা মনে হচ্ছিল।
তিতির চোখ খুলে অনিতা শেখের দিকে তাকিয়ে বলল, জানো আন্টি আমাকে আজ জঙ্গলে রেখে আসবে বলেছিল।
তিতিরের কথায় আনিতা শেখ কড়া চোখে আযানের দিকে তাকালো।
আযান হা করে তিতিরের দিকে তাকিয়ে আছে। এই ভাবে ধরিয়ে দিলো?
আযান নিজেকে সামলে নিয়ে চোখ ছোট ছোট করে বললো,, পিচ্চি মেয়ে তোমার দু বেনী আমি সত্যি কেঁটে দিবো।
তিতির ঠোঁট ফুলিয়ে আনিতা শেখকে জড়িয়ে ধরে বললো, দেখেছো আন্টি?
আনিতা শেখ আযানের দিকে তাকিয়ে ইশারায় বলল, আমি উঠি একবার, এর পর তোকে খুন্তি দিয়ে পেটাবো। তোর কত বড় সাহস তুই আমার পিচ্চিকে ভয় দেখাস!
আযান কাঁদো কাঁদো মুখ করে দাঁড়িয়ে আছে।
এইদিকে তিতির মুখ চেপে হাসছে। তা দেখে ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে বলল, মা দেখো তোমার পিচ্চি হাসছে,আর তুমি আমাকে বকছো?
আনিতা শেখ নিজেও মুখ টিপে হাসছে।
আযান তিতির আর মায়ের চালাকি বুঝতে পেরে বললো, দুইটাই ড্রামা কুইন।
তিতির হেসে উঠে বললো,আর আপনি নওটঙ্কি।
আযান মায়ের দিকে তাকিয়ে বলল, সব দেখছি শিখিয়ে ফেলেছো বাদরটাকে। বাদর শিক্ষা হয়ে গেলে এইবার দুজন মিলে শপিং ব্যাগ গুলো খুলে দেখো,আমি ফ্রেশ হয়ে আসছি।
আনিতা শেখ ব্যাগ গুলো খুলে খুলে দেখছে।আর তিতির চলে গেল ফ্রেশ হতে।
রাতে খাওয়া দাওয়া শেষ করে যে যার রুমে ঘুমাতে চলে গেল। এইদিকে আযান চুপিচুপি দরজা খুলে বেরিয়ে পড়ল। গাড়িতে রেখে আসা শপিং ব্যাগটা হাতে তুলে নিয়ে আবার বাড়ির ভেতর ফিরে আসলো। দরজা বন্ধ করে পেছনে ঘুরতেই দেখে তিতির সন্দিহান দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে আছে।
আযান চোরের মত এদিক ওদিক তাকাচ্ছে।এ
চলবে,,,,
(ভুল ত্রুটি ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন।)