ফন্ট সাইজ:
থিম:
বসন্তের প্রথম প্রেম

১ম পর্ব

লেখক: আইজা রহমান

নিঝুম রাতে হঠাৎ মুখের উপর কারো উষ্ণ নিঃশ্বাসের ছোঁয়া পেয়ে জাইরা এক লাত্থি মারে সামনের মানুষটিকে। মানুষটি ছিটকে কিছুটা দূরে পড়ে যায়। নিস্তব্ধ ঘরটাতে একটা ভারী কিছু পড়ার শব্দ হয়— ‘ধপাস!’

জাইরা তড়িঘড়ি উঠে বসে হাপাতে হাপাতে লাইট জ্বালায়। আলোর ঝটকায় চোখ কুঁচকে আসলেও সামনে মেঝেতে পড়ে থাকা মানুষটিকে দেখে জাইরা ফাটা বেলুনের মতো চুপসে যায়। কলিজাটা যেন ধক করে এক মুহূর্তের জন্য থেমে গেল তার।

মেঝেতে বসে বুকের পাঁজরে হাত চেপে জাইরার দিকে রক্তচোক্ষে তাকিয়ে আছে রিশান। রাগে-ক্ষোভে রিশানের সুঠাম কপালের রগগুলো নীল হয়ে ফুটে উঠেছে। জাইরা ভয়ে নিজের গায়ের চাদরটা শক্ত করে আঁকড়ে ধরে শুকনো ঢোক গিলে।

“এই স্টুপিড! তুই কি ঘুমের মধ্যে ক্যারাটে প্র্যাকটিস করতেছিলি?”

জাইরার দিকে ওইভাবেই তাকিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে চিবিয়ে চিবিয়ে বললো রিশান। পরে ব্যথায় কুঁকড়ে নিজের পাঁজরের দিকে তাকিয়ে হায়হুতাশ করে উঠলো—

“আল্লাহ গো! মনে হইতেছে লিভারটা নিজের জায়গা ছেড়ে এখন কিডনির সাথে আড্ডা দিতে গেছে। হাড়গুলো আস্ত আছে তো?”

জাইরা এতোক্ষণ ভয়ে আধমরা হয়ে থাকলেও ‘লিভার-কিডনি’র ডায়লগটা শুনেই সে তড়িৎ বেগে তাকালো পরে আহাজারি করতে থাকা ছেলেটার চোখের দিকে । কালো কুচকুচে মনি জোড়ায় চোখ যেতেই তার মেজাজটা চড়ে গেল। কারণ সে এতোক্ষণ যাকে ভেবে যমের মতো ভয় পাচ্ছিল এটা সে নয়; এ তারই ১ মিনিট পরে জন্ম নেওয়া তার জমজ ভাই জিসান। নিজের উপরই বিরক্ত বোধ করলো জাইরা । রিশান কেন তার রুমে আসতে যাবে? নিজের মাথায় নিজেই গাট্টা মারলো । জিসান এর দিকে চোখ যেতেই তেতে উঠল সে । জমজ হওয়ার সুযোগ নিয়ে এই ছেলেটা তাকে কতবার যে হার্ট অ্যাটাক করিয়েছে তার ইয়ত্তা নেই।

.

.

.

আসুন এই পরিবারের সাথে আপনাদের পরিচয় করিয়ে দেই—

এই বাড়ির বড় ছেলে তারেক রহমান, তার বউ সেতু বেগম। তাদের দুই জমজ ছেলে—আইমান বিন রিশান ও জিসান রহমান। রিশান জিসানের থেকে মাত্র এক মিনিটের বড়। তারা এবার অনার্স থার্ড ইয়ারে পড়ছে। তাদের চেহারা হুবহু এক । পার্থক্য শুধু চোখের মণিতে । রিশানের চোখের মণি ধূসর-নীল , ও জিশানের চোখের মণি কুচকুচে কালো । চেহারায় তারায একরকম হলেও স্বভাব-চরিত্রে আসমান-জমিন ফারাক।

রিশান যথেষ্ট মেচিউর, শান্ত আর গম্ভীর টাইপের। ভার্সিটির টপ স্টুডেন্ট, কথা বলে মেপে মেপে। তাকে দেখলে যে কেউ নির্দ্বিধায় বলবে সে এক আদর্শ ভদ্র ঘরের ছেলে।

অন্যদিকে জিসান হলো এক নাম্বারের ভণ্ড। সারাদিন টইটই করে ঘুরে বেড়ানো আর মানুষের মাথা চিবিয়ে খাওয়া ছাড়া তার আর কোনো কাজ নেই।

বাড়ির ছোট ছেলে জিয়াউর রহমান, তার বউ জাইমা বেগম। তাদের একমাত্র মেয়ে—জাইরা ইবনে অরা।

সে হলো জিসানের ফিমেল ভার্সন। সারাদিন জিসানের সাথে মিলে বাড়িতে লঙ্কাকাণ্ড বাঁধিয়ে রাখে। বাড়িতে সমবয়সী অন্য কোনো মেয়ে না থাকায় সে সব সময় জিসানের সাথেই থাকে। ছোটবেলায় রিশানকে তাদের দলে আনার জন্য তারা অনেক উসকাতো। রিশান এইসবে বিরক্ত হয়ে একদিন এক ‘রাম ধমক’ দেয়। সেই থেকে জাইরা রিশানকে বাঘের মতো ভয় পায়। ভুলেও তার ছায়া মাড়ায় না। আর পড়াশোনা! সে এবার ইন্টার সেকেন্ড ইয়ারে পড়ছে । পুরোপুরি ডাব্বামার্কা স্টুডেন্ট। কোনোমতে টেনেটুনে পাস করে।

.

.

.

চলুন এবার গল্পে ফিরি!

জিসানের কথায় বিরক্ত হয়ে জাইরা এবার ঝাঝালো কণ্ঠে বললো—

“বেশ করেছি। এতো রাতে আমার রুমে কি করছো তুমি? লজ্জা করলো না মাঝরাতে একটা মেয়ের রুমে এভাবে ঝুঁকতে? আচ্ছা ঢুকছো সেটাও মানলাম, আমার মুখের ওপর ঝুঁকে কি করছিলে হ্যাঁ? চুমু খাওয়ার শখ হয়েছিল?”

“এহ! নিজেকে কি তোর বিশ্বসুন্দরী মনে হয় হ্যাঁ?? আমি এসেছিলাম তোকে বলতে যে রিশান ছাদে গেছে। ভাবলাম দুজন গিয়ে ওর সাথে একটু মজা করতাম। কিন্তু ও মা! এসে দেখি তুই গন্ডারের মতো হাঁ করে নাক ডেকে ঘুমাচ্ছিস। আর তোর মুখের ওপর একপাল মশা জামাই-বউ খেলা খেলছিল। সেগুলোই মারতে যাচ্ছিলাম।”

একটু থেমে আবার পাঁজরে হাত বুলিয়ে ফোঁস করে বললো—

“কিন্তু তুই তো লাত্থি মাইরা লিভার কিডনি সব একসাথ করে দিলি। বেয়াদব কোথাকার!”

জাইরা ভেংচি কেটে বললো— “ভালোই করেছি! বেশি পকপক না করে ঘর থেকে বের হও।”

“আচ্ছা এইসব বাদ দে, চল ছাদে যাই। রিশানকে না আজ কেমন জানি লাগছে।”

“নাহহহহহহহহ!” জাইরা চিল চিৎকার দিয়ে উঠলো। “আমি যাব না। ভাইয়া দেখলে একদম কাঁচা চিবিয়ে খাবে।”

“ ষাঁড়ের মতো চিল্লাস না , আমি আছি চল । ”

“ না আমি যাব না।”

জিসান কোনো কথা শুনলো না। জাইরাকে জোর করে এক প্রকার আলুর বস্তার মতো টেনেহিঁচড়ে ছাদের দিকে নিয়ে গেল। সিঁড়িঘরের অন্ধকার চিরে যখন তারা ছাদের দরজার কাছে পৌঁছালো, তখন হুট করেই একটা ভারী কিন্তু মোলায়েম কণ্ঠ ভেসে এলো।

“হেই সামিরা, কী খবর তোমার?”

কথাটা শুনেই সিঁড়িতে থাকা জিসান আর জাইরার পা স্থির হয়ে গেল। রিশান কোনো মেয়ের সাথে ফোনে কথা বলছে? তাও আবার এত রাতে? আর গলার স্বরটা এতোটা নরম কেন? তারা দুজন একে অপরের দিকে তাকালো। ঘনঘন কয়েকবার চোখের পলক ফেলে দুজনই ভ্রু কুঁচকে ইশারায় বললো— ডাল মে কুছ কালা হ্যায়!

“চল দেখি রিশান কার সাথে এভাবে প্রেমে মজেছে।” জিসান ফিসফিস করে বললো।

“না না, আমি যাব না। ভাইয়া দেখলে বকবে।” জাইরা ভয়ে ভয়ে বললো।

“আরে চল না বলদি, আমি আছি তো। গোপন কিছু পাইলে সারাজীবন ওকে ব্ল্যাকমেইল করতে পারবো।” জিসান জাইরাকে আশ্বস্ত করে ঘাপটি মেরে দরজার পাশে দাঁড়িয়ে কান পাতলো।

ওপাশ থেকে রিশানের কণ্ঠ ভেসে আসছে—

“ওহ আচ্ছা, এই প্রবলেম। ঠিক আছে আমি তোমাকে কালকে ভার্সিটিতে এসে সব বুঝিয়ে দিব। টেনশন করো না সামিরা... ওকে রাখছি তাহ...”

বাকিটুকু আর বলা হলো না। ছাদের দরজায় জাইরা সজোরে ধাক্কা খেল কাঠের সাথে। রিশানের সিক্সথ সেন্স প্রচণ্ড প্রখর। সে সাথে সাথে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি ফেললো দরজার দিকে। জাইরা ভয়ে কাঁপতে শুরু করেছে। জিসান শুকনো ঢোক গিললো।

“ একটু স্থির থাকতে পারিস না? খালি লাফালাফি করিস !”

জাইরা ঠোঁট উল্টে বলল—

“ আমি কি করলাম! ”

“জিসান, বাইরে বের হ।” রিশানের সেই ধমকানো কণ্ঠটা যেন ছাদের স্তব্ধতা চিরে দিল।

জাইরা ভয়ার্ত চোখে জিসানের দিকে তাকালো। জিসান বের হওয়ার আগেই পুনরায় গমগমে আওয়াজ ভেসে এলো—

“তোর পেছনের ওই বিচ্ছুটাকেও সামনে নিয়ে আয়।”

জাইরা তো ভয়ে কাঠ! পা যেন মাটিতে গেঁথে গেছেন। কোনোমতে জিসান তার হাত ধরে বাইরে বের করে আনলো।

জাইরা জিসানের পিছনে আড়াল হয়ে উঁকি দিলো।

চাঁদের দুধসাদা আলোয় রিশান প্যান্টের পকেটে হাত গুঁজে দাঁড়িয়ে আছে। পরনে কালো পাতলা টি-শার্ট। গায়ের তামাটে রংটা চাঁদের আলোয় যেন এক অদ্ভুত পুরুষালী আভিজাত্য ছড়িয়ে দিচ্ছে। হালকা বাতাসে অগোছালো চুলগুলো কপালে এসে পড়ছে। রাতের হালকা আলোতে তার ধূসর-নীল চোখজোড়া চকচক করছে । এই রাগী মুখে রিশানকে আজ অন্যদিনের চেয়েও বেশি সুন্দর লাগছে । কিন্তু সেই সৌন্দর্য দেখার সুযোগ কোথায়? রিশান তাদের দুজনের দিকে জ্বলন্ত চোখে তাকিয়ে আছে।

“তোরা দুজন দরজার পিছনে কী করছিলি?”

রিশানের শীতল প্রশ্নটা শুনে জাইরা বুঝতে পারলো, আজ তাদের খবর আছে!

চলবে..?

#বসন্তের_প্রথম_প্রেম

#লেখনীতে_আইজা

#সূচনা_পর্ব

(আমি নতুন লেখিকা , সবাই একটু সাপোর্ট করবেন প্লিজ!🌸)

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১ম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন