#বসন্তের_প্রথম_প্রেম
#লেখনীতে_আইজা
পর্ব : ০২
“তোরা দুজন দরজার পিছনে কী করছিলি?”
কাটকাট কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল রিশান। জাইরা যে মাথা উঁচু করে উঁকি দিয়েছিল, সেটা তড়িঘড়ি নামিয়ে জিসানের আড়ালে গিয়ে এমনভাবে সেঁধিয়ে গেল যেন সে ওখানে নেই, সে একটা অদৃশ্য ছায়া। জিসান বুঝতে পারল ধরা যখন খেয়েই গেছে, তখন একটু ‘ইমোশনাল ড্রামা’ করা যাক। সে একটা তেলতেলে হাসি দিল।
“কই ভাই? তুই মনে হয় ভুল দেখেছিস। আমরা তো ছাদে একটু হাওয়া খেতে এসেছিলাম। ইদানীং যে হারে গ্লোবাল ওয়ার্মিং বাড়ছে রে ভাই, রোদে মানুষের মাথা গরম আর আমাদের বডি গরম। এই দেখ, ঘেমে একদম নাস্তানাবুদ হয়ে গেছি!”
জিসান হাত দিয়ে বাতাস করার মতো অভিনয় করল । রিশান এক পা এগিয়ে এসে তীক্ষ্ণ চোখে তাকাল।
“লুকিয়ে লুকিয়ে আমার কথা শুনছিলি?”
জিসান এবার জিহ্বায় কামড় দিয়ে এমন ভাব করল যেন আকাশ থেকে পড়েছে।
“ছি ছি ভাই! আমরা কেন তোর কথা শুনতে যাব? আমরা কি ডিটেক্টিভ? আর বিশ্বাস কর ভাই, তুই যে ওই ‘সামিরা’ নামক মেয়েটার সাথে আলাপ করছিলি, আর কাল ভার্সিটিতে গিয়ে তাকে ‘স্পেশাল কেয়ার’ দিবি বললি—তা আমরা একদমই শুনি নাই। কিচ্ছু না!”
জাইরা ভয়ের মাঝেই খিলখিলিয়ে হেসে উঠল। নিজের কথা নিজেই ফাঁস করার জন্য জিসান যে এ বছর অস্কার পাবে, সেটা নিশ্চিত। দুই জোড়া চোখ তৎক্ষণাৎ জাইরার ওপর নিবদ্ধ হলো। জাইরা যখন ঠাহর করতে পারল সেও ফেঁসে গেছে , হাসির ডিব্বা আটকে গেল ।
“জিসান, তুই তোর রুমে যা। এখনই!”
ব্যাস! জিসানকে আর পায় কে? রিশানের ধমক খাওয়া মানেই বিরিয়ানির প্যাকেটে এলাচ পড়া। সে বড় বড় কদম ফেলে এমনভাবে ছাদ থেকে পালালো যেন পেছনে বাঘ তাড়া করেছে। যাওয়ার সময় মনে মনে বলল, ‘সরি বোন জাইরা, জান বাঁচানো ফরয!’
জাইরাও সুযোগ বুঝে জিসানের পিছু নিতে চাইল। কিন্তু দু-কদম বাড়াতেই পেছন থেকে সেই গমগমে কণ্ঠ ভেসে এল—
“ তুই কোথায় যাচ্ছিস? ”
জাইরার পা সেখানেই ব্রেক কষল। সে রোবটের মতো মাথা ঘুরিয়ে একটা কাষ্ঠহাসি দিয়ে বলল—
“রিশান ভাই! তুমিই তো বললে যেতে। তাই আমি... মানে...”
“যাকে বলেছি সে গেছে। তুই এদিকে আয়!”
জাইরা বুঝল আজ শনি তার ললাটে তাণ্ডব করছে। রিশানের সামনে গিয়ে দাঁড়ানো মাত্রই সে কানে এক অসহ্য যন্ত্রণা টের পেল। রিশান তার কানটা এমনভাবে মুচড়ে ধরল যেন সে কোনো এফএম রেডিওর টিউনিং করছে!
“তোকে ছোট আম্মু এসব শিখিয়েছে? লুকিয়ে চুরিয়ে মানুষের
কথা শোনা? লজ্জা করে না?”
জাইরা এবার ডুকরে কেঁদে দিল। সবার সামনে চঞ্চল জাইরা রিশানের সামনে এলেই কেমন যেন ‘ভেজা বিড়াল’ হয়ে যায়। সে কান্নামিশ্রিত কণ্ঠে বলল—
“রিশান ভাই, বিশ্বাস করো আমি আসতে চাইনি। ওই জিসান নামক শিম্পাঞ্জিটা আমাকে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে এসেছে।”
রিশান এবার হাত আলগা করল। জাইরার লাল হয়ে যাওয়া কানের দিকে একবার তাকিয়ে শীতল গলায় বলল—
“আজকের মতো ছেড়ে দিলাম। এরপর যদি দেখেছি, তবে একটা বেতের বাড়িও নিচে পড়বে না। সব পিঠের ওপর পরবে। যা এখন!”
জাইরা চোখ মুছতে মুছতে ‘উসাইন বোল্ট’ স্টাইলে দৌড়ে রুমে চলে গেল।
.
.
.
এদিকে জিসান তো রুমে গিয়ে চিন্তায় শেষ। জাইরাকে ওভাবে বাঘের মুখে একা ফেলে চলে আসাটা কি ঠিক হলো?
রিশান যদি ওকে মারে, তবে তো দোষটা ওর ঘাড়েও আসবে।
হঠাৎ অনেক জোরে দরজা আটকানোর শব্দ হলো— ‘ধড়াম!’
“রহমান-কুঞ্জে” বড়রা নিচে থাকে আর ছোটরা থাকে দোতলায়। সিঁড়ি বেয়ে উঠেই একদম সিরিয়াল ভাবে তিনটা রুম। প্রথম রুমটা রিশানের, তারপরেরটা জিসানের আর সবশেষে জাইরার। পাশাপাশি রুম হওয়ার দরুন জিসান শব্দটা বেশ জোরেই শুনেছে।
সে বুঝল রিশান নির্ঘাত জাইরাকে ঝাড়ি দিয়ে রুমে পাঠিয়েছে। ভাবল একবার গিয়ে জাইরাকে সান্ত্বনা দেবে, আবার ভাবল— “আরে অনেক রাত হয়ে গেছে, এখন গেলে নির্ঘাত আমিও ঝাড়ি খাব। কাল সকালে দেখা যাবে।”
এই ভেবে সে নিশ্চিন্তে নাক ডেকে ঘুমিয়ে গেল।
.
.
.
রুমে ঢুকে আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়াল জাইরা। কানটা টকটকে লাল হয়ে আছে। সে আয়নায় নিজের কান দেখে নিজেই আঁতকে উঠল।
“গম্ভীর গরু কোথাকার! কানটারে মুচড়ায়ে তো একদম লাল মরিচ বানায়ে ফেলছে! ওরে পাইলে আমি আজ...”
পরক্ষণেই মনে পড়ল জিসানের কথা। রাগে তার শরীর জ্বলছে।
“শালা গিরগিটির বাচ্চা! আমাকে ফাঁসিয়ে দিয়ে নিজে হিরো সেজে পগার পার হয়ে গেল? এর প্রতিশোধ আমি নেবই। আজ থেকে জিসান আমার লিস্টে ‘ব্লকড’!”
রাগে গজগজ করতে করতে সে বিছানায় শুয়ে পড়ল। যদিও রাগ হচ্ছিল, তাহলে নিজেকে কোনমতে শান্ত করে ঘুমের দেশে পাড়ি দিল ।
.
.
.
পরদিন সকালে ‘রহমান কুঞ্জ’-এর পরিবেশটা যেন কোনো থ্রিলার মুভির মতো গুমোট। বাড়ির দুই বিচ্ছু আজ একদম নিশ্চুপ। জাইরা নাস্তার টেবিলে মাথা নিচু করে এমনভাবে খাচ্ছে যেন সে ভাত নয়, বিষ খাচ্ছে। জিসান কয়েকবার জাইরার দিকে তাকিয়ে চোখ মারল, ইশারা করল, কিন্তু জাইরা তাকে পাত্তাই দিল না।
বড়রা খেয়ে উঠে গেলে টেবিলে বাকি রইল শুধু তারা দুজন
।
“ওই বিচ্ছু! এমন করছিস কেন? মনে হচ্ছে তুই সদ্য বিধবা হয়েছিস!” জিসান ফিসফিস করল।
জাইরা নিরুত্তর। সে যেন পৃথিবীর সব কানে কম শোনা মানুষের সর্দারনি। জিসান এবার উপায় না দেখে তার নিজস্ব ‘ট্যালেন্ট’ বের করল। সে বেসুরো গলায় গেয়ে উঠলো—
🎶 Tell me why are you so sad...
Tell me I'm your best friend..
I want helping you so that
Your heart doesn't break... 🎶
জাইরা তখন পানি খাচ্ছিল। জিসানের এই ‘খিচুড়ি ইংরেজি’ আর ওই ফাটা বাঁশ মার্কা গলার গান শুনে সে আর হাসি চেপে রাখতে পারল না।
মুখের সবটুকু পানি পিচকিরির মতো ছিটকে গিয়ে পড়ল সরাসরি জিসানের মুখে ! জিসান একদম স্ট্যাচু হয়ে বসে রইল। জাইরা এবার হাসতে হাসতে চেয়ার থেকে গড়িয়ে পড়ার দশা।
“এই বেয়াদব! তোর জন্য কি আমি এখন রেইনকোট পড়ে খেতে বসবো ?” জিসান শার্ট মুছতে মুছতে রাগ দেখানোর চেষ্টা করল।
জাইরা হাপাতে হাপাতে বলল— “ভাইয়া! তুমি এই গান কোথা থেকে শিখেছো? এই গান যে গেয়েছে, তার তো ফাঁসি হওয়া উচিত!”
“টিকটকে দেখেছিলাম রে! ভাবলাম বোনটা আমার স্যাড, একটু এন্টারটেইন করি। তুই তো উল্টো আমাকে গোসল করায়ে দিলি!” জিসান মাথা চুলকে বলল।
“ইশ! বাংলাদেশে ট্যালেন্টের কোনো দাম নেই। আমি প্রধানমন্ত্রী হলে তোমারে আর ওই গায়করে ‘বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ’ পুরস্কার দিতাম!” জাইরা আবার হাসিতে ফেটে পড়ল।
জাইরার রাগ মিটে গেছে দেখে জিসান হাফ ছেড়ে বাঁচল।
জাইরা এবার হুট করেই গম্ভীর হয়ে ফিসফিস করল—
“ভাইয়া শোনো! একটা টপ সিক্রেট কথা আছে। কান পাতো!”
জিসান কৌতূহলী হয়ে এগিয়ে কান পাতল। জাইরা ফিসফিস করে বলল—
“আম্মু-আব্বুরা সবাই আজ ফুফুর বাড়ি যাবে রাতে।। আর রিশান ভাই তো বাড়িতে থাকাও না থাকা এক কথা। শোনো, জিসান ভাইয়া... একটা ‘বোতল’ এনো কিন্তু!”
জিসান খুশিতে এক লাফে চেয়ারের ওপর উঠে দাঁড়ালো। সে মুভি স্টাইলে মাথা নুইয়ে বলল—
“তথাস্তু মহারানি! আপনার হুকুম তামিল করাই এই গোলামের কাজ!”
দুজনে একটা বিজয়ী হাসি দিয়ে ‘হাই-ফাইভ’ করল। তাদের চোখেমুখে এখন সন্ধ্যার সেই পার্টির উত্তেজনা।
চলবে..?
#bangla_story #Romantic #aiza