#বসন্তের_প্রথম_প্রেম
#লেখনীতে_আইজা
পর্ব ১৮
❌ কপি করা নিষিদ্ধ ❌
*
*
সময় আবহমান । দেখতে দেখতে কেটে গেল ছয়টি মাস । হেমন্তের বিকেলের একফালি রোদ জানালা ভেদ করে বিছানায় বসে থাকা জাইরার উপর পড়ছে । তার পাশে উপুড় হয়ে ঘুমোচ্ছে রিশান । জাইরা বাড়ন্ত পেটের দিকে তাকিয়ে রিশানের নামে হাজার অভিযোগ করছে ।
তার মতে , রিশান তার একটা কথাও শুনে না । একটু ও খেয়াল রাখে না । অথচ ছেলেটা সারাক্ষণ তার পিছনে পড়ে থাকে । তার ক্ষণে ক্ষণে মুড সুইং হয় , সেসব সহ্য্ করে । সব অভিযোগ স্বীকার করে বুকে টেনে নেয় । আরো কতো কি ! এইযে গত রাতে , সারারাত জাইরাকে কোলে করে ঘুম পাড়িয়েছে নিজে একফোঁটা ও ঘুমায় নি । আবার সকাল থেকে এতো এতো আবদার , সেই সব কিছু বিনা বাক্যে পূরণ করেছে । তাই সে ক্লান্ত হয়ে এখন একটু ঘুমিয়েছে ।
কিন্তু এসব বোঝা তো জাইরার কর্ম নয় । সে সারাক্ষণ নিজের অনাগত বাচ্চার কাছে অভিযোগ করে । এখন রিশানের ঘুমানো নিয়ে অভিযোগ করছে ।
—“ তোর পাপা আমাকে একটু ও ভালোবাসে না । দেখ , কেমন পড়ে পড়ে ঘুমাচ্ছে ! সারাক্ষণ আমাকে এভোয়েড করে , একটুও কেয়ার করে না । ”
অভিযোগ করা শেষ হলে সে রিশানের দিকে তাকালো । উদম শরীরে রোদ পড়ে কেমন জ্বলজ্বল করছে । সে আঙুল দিয়ে রিশানের পিঠে খোঁচা দিলো । কিন্তু রিশান তাতে নড়ে পর্যন্ত শুলো না । জাইরার অভিমানের পাল্লা আকাশ ছুঁলো এবার । চোখ ভরে উঠলো যেন টোকা দিলেই পানি গড়িয়ে পড়বে । সে নাক টেনে বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো । এখন খুব একটা হাঁটাহাঁটি ও করতে পারে না । ধীর পায়ে গিয়ে বারান্দায় দাঁড়ালো ।
জাইরা কিছুক্ষণ আকাশের দিকে তাকিয়ে রইল । হঠাৎ পেটের ভেতর একটা মৃদু ধাক্কা অনুভব করল সে । ছয় মাস পূর্ণ হতে চলেছে , এখন ছোট্ট প্রাণটার উপস্থিতি প্রতি মুহূর্তে টের পায় সে । আলতো করে পেটে হাত রাখল , মুহূর্তেই তার সব দুঃখ দূর হয়ে গেলো । অদ্ভুত প্রশান্তি ছড়িয়ে পড়ল তার সারা মুখে । মুচকি হাসলো সে ।
রিশান ঘুম থেকে উঠে জাইরাকে না পেয়ে বারান্দায় ছুটে এলো । দেখলো জাইরা পেটে হাত দিয়ে মুচকি হাসছে । সেও হেসে এগিয়ে গেল । পিছন থেকে জড়িয়ে ধরলো প্রিয়তমা স্ত্রীকে । মৃদু কন্ঠে বললো ,
—“ এখানে কি করছ ? ”
অপর পক্ষ থেকে কোনো উত্তর এলো না । সে বুঝলো জাইরা অভিমান করেছে ।
—“ অরাপাখি? ”
—“............”
—“ অরা? ”
—“.............”
—“ এই জান? ”
—“..........”
—“ আরিশের আম্মু? ”
—“ কার আম্মু? ”
ততক্ষণাৎ ঘুরে দাঁড়াল জাইরা । রিশান ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসলো । সে জানতো এভাবে ডাকলেই জাইরা কথা বলবে ! সে একদম জাইরার কাছাকাছি ঝুঁকে এলো । এক ইঞ্চি পরিমাণ ফাঁকা আছে হয়তো । একজনের নিঃশ্বাস অন্যজনের মুখে পড়ছে । জাইরা অপ্রস্তুত হয়ে দু'পা পিছিয়ে যেতে চাইলো কিন্তু পারলো না । রিশান তাঁর কোমর আঁকড়ে ধরলো । কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিসিয়ে বললো ,
—“ আমাদের ছেলে ! ”
বলেই জাইরার পেটে হাত রাখল । জাইরা হালকা ঝাঁকি দিয়ে উঠলো । ঠোঁটের কোণে হাঁসি রেখে বললো ,
—“ নাম টা কিন্তু দারুন ! আমার খুব পছন্দ হয়েছে । ”
পরক্ষণেই মুখে আঁধার নেমে এলো । রিশানকে ধাক্কা দিয়ে বললো ,
—“ ছাড়ো আমাকে । তুমি আমাকে ভালোবাসো না । সরো ! কথা নেই তোমার সাথে । ”
—“ সরি অরাপাখি ! ”
—“ আইসক্রিম খাবো ! ”
—“ আচ্ছা ওয়েট । আমি নিয়ে আসছি । ”
রিশান যেতে চাইলে জাইরা তার হাত টেনে ধরলো । রিশান পিছনে ফিরে ভ্রু উঁচিয়ে ইশারায় জিজ্ঞেস করল —কি হয়েছে?
জাইরা ইনোসেন্ট ফেস বানিয়ে বললো ,
—“ আমি যাবো । ”
—“ ওহ চলো তাহলে ! ”
রিশান তার হাত ধরে নিতে গেলে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে রইল ।
—“ কি হলো ? যাবে না ? ”
—“ কোলে যাবো !!! ”
হাত মেলে দিলো জাইরা । কেমন আল্লাদী মুখ করে তাকিয়ে আছে , এমন ভাব যে উপেক্ষা করার উপায় নেই । রিশান ও উপেক্ষা করতে পারলো না । সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে জাইরাকে কোলে নিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে গেল ।
*
*
*
—“ এইযে শুনছেন ? ”
—“ হ্যাঁ বলো ! ”
ফোনের দিকে তাকিয়েই উত্তর দিলো জিসান । আলিজা'র ভীষণ রাগ হলো । তাকে উপেক্ষা করছে? তার থেকে ফোন বড় হলো ? সে এক থাঁবা দিয়ে জিসানের হাত থেকে ফোন কেড়ে নিলো । কিছু বুঝে ওঠার আগেই ফোনটা মেঝেতে ছুড়ে ফেলল ।
জিসান হতভম্ব হয়ে আলিজা'র দিকে তাকাতেই দেখলো — আলিজা তার দিকে রক্তচক্ষু নিক্ষেপ করে তাকিয়ে আছে । ভাব এমন যেন , এখনি তাকে টুপ করে গিলে ফেলবে ।
—“ কি হয়েছে? ”
বোকা বোকা হাসি দিয়ে জিজ্ঞেস করল জিসান ।
আলিজা তার চুলের গোছা ধরে টানতে টানতে চিৎকার করতে লাগলো ,
—“ আমার থেকে তোর মোবাইল বড়? আমাকে রেখে তুই মোবাইলকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছিস !! মানিকচন্দ্রের বাচ্চাআআআ !!! ”
জিসান তব্দা খেয়ে তাকিয়ে রইল । এই ছিল তার কপালে ? সে তো আদর্শ বউ চেয়েছিলো কিন্তু এ তো অতিরিক্ত আদর্শ হয়ে গেছে । মোবাইল নিয়ে ও জেলাস ফিল করছে ! তার উপর আপনি থেকে তুই ? আর কী বললো মানিকচন্দ্র ! চোখেমুখ কুঁচকে নিলো জিসান । সে সারাজীবন এইসব ভাষা ব্যবহার করেছে , সে তো ভেবেছিলো বিয়ের পর বউয়ের শাষনে ছেড়ে দিবে কিন্তু বউ নিজেই তো এসব ভাষা ব্যবহার করছে । মাটিতে কপাল ঠুকতে ইচ্ছে হচ্ছে তার !!
—“ আবার কী ভাবছিস? ”
কপালে টোকা দিলো আলিজা । জিসান আকাশকুসুম ভাবনা ছেড়ে বেরিয়ে এলো । সে তড়িঘড়ি আলিজার কপাল , গলা চেক করে বললো ,
—“ নাহ জ্বর তো নেই ! তাহলে কী তোমাকে ভূতে ধরেছে নাকি বউ? ”
—“ চুপপপপপপপপ !!!! ”
চিৎকার দিয়ে উঠলো আলিজা । জিসান অসহায় মুখ করে তাকিয়ে রইলো তার দিকে । কিছুক্ষণের মধ্যেই আলিজার রাগ কান্নায় পরিণত হলো । সে জিসানের বুকে ঠাঁই নিয়ে কেঁদে ভাসাচ্ছে ! আর জিসান তার কান্না থামানোর চেষ্টা চালাচ্ছে ।
—“ বউ ! এই চাশমিস? আ'ম সরি বউ । আর কখনো তোমার সামনে মোবাইলই ধরবো না প্রমিজ । প্লিজ জান কাঁদে না । ”
আলিজা নাক টেনে কান্না থামানোর চেষ্টা করলো । কান্নাল তোড়ে হেঁচকি উঠছে । ক্ষণে ক্ষণে ফুঁপিয়ে উঠছে সে । জিসান তাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো । বারবার আওড়ালো ,
—“ সরি চাশমিস ! সরি !!! ”
*
*
*
রান্নাঘরের স্লাবে বসে আইসক্রিম খাচ্ছে জাইরা । পাশেই রিশান গাজর চপ করছে । কারণ জাইরার ইচ্ছে আইসক্রিম খাওয়ার পর নুডুলস খাবে । উদ্ভট ইচ্ছে ! কিন্তু তাতে রিশানের বিন্দুমাত্র বিরক্তি নেই । সে বরাবরই জাইরার জন্য কেয়ারিং , আর এখন তো তার নিজের বাচ্চা জাইরার গর্ভে । সে ধীরে সুস্থে নুডুলস রান্না শেষ করলো এতক্ষণে জাইরার আইসক্রিম খাওয়া কমপ্লিট ।
রিশান তাকে কোলে করে নিয়ে ডাইনিং টেবিলে বসালো তারপর সামনে নুডুলস দিয়ে খেতে ইশারা করলো ।
—“ খাইয়ে দাও প্লীজ ! ”
—“ আচ্ছা ! ”
রিশান মুচকি হেসে খাওয়াতে লাগলো । জাইরা খেতে খেতে বললো ,
—“ কালকে ঘুরতে নিয়ে যাবে ? ”
—“ যাব । ”
জাইরা খুশি হয়ে গেল । প্রফুল্ল কন্ঠে বললো ,
—“ আচ্ছা তাহলে কালকে আরিশের জন্য খেলনা , ড্রেস কিনে আনবো । ”
—“ ঠিক আছে । ”
ঘর জুড়ে পিনপিন নিরবতা নেমে এলো । জাইরা চুপচাপ খেয়ে আবার হাত বাড়িয়ে দিলো । রিশান বিনা বাক্যে তাকে কোলে তুলে রুমের দিকে পা বাড়ালো ।
তারা মূলত গত দু'দিন আগে হসপিটালে গিয়েছিলো । সেখানেই আল্ট্রাসনোর মাধ্যমে জানতে পেরেছে যে তাদের ছেলে হবে তাই এতো তোড়জোড় । নাম ও ঠিক করে ফেলেছে তারা । না জানি ভূমিষ্ঠ হওয়ার পরে কি করবে ।
রিশান ধীর পায়ে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠলো । সে কোন রিস্ক নিতে রাজি নয় ! জাইরা বা তার অনাগত সন্তানের কিছু হয়ে গেলে সে নিঃশ্ব হয়ে যাবে !
জাইরা তার গলা জড়িয়ে চুপচাপ এইসব কান্ড দেখছে । সত্যি তার নিজেকে ভাগ্যবতী বলে মনে হচ্ছে । কতো আদর , কতো যত্ন এইসব কি অন্যকোথাও পেতো সে ? ভাবতেই ঠোঁটে হাসি খেলে গেল । আরো শক্ত করে রিশানের গলা জড়িয়ে ললাটে অধর ছোঁয়ালো ।
চলবে..........
( একটু রেসপন্স কইরো পাখিরা 👉👈 । তাহলে লেখার আগ্রহ বাড়ে । আর ছোট্ট একটা মন্তব্য করতে ভুলো না । ❤️❤️)
#bangla_story #for_you #aizas_tales