ফন্ট সাইজ:
থিম:
বসন্তের প্রথম প্রেম

২০তম পর্ব

লেখক: আইজা রহমান

#বসন্তের_প্রথম_প্রেম

#লেখনীতে_আইজা

পর্ব ১৯

❌ কপি করা নিষিদ্ধ ❌

*

*

একটা বৃষ্টিমুখর দিনের শুরু । হেমন্তকালে বৃষ্টি যদিও দুর্লভ ব্যপার । কিন্তু আজকের দিনটা বৃষ্টি দিয়েই শুরু হয়েছে । ক্ষণে ক্ষণে বর্জ্যপাত হচ্ছে । ঝড়োহাওয়া বইছে বাহিরে । রহমান কুঞ্জে বরাবরই খুশির আমেজ থাকে । আজকে ও তার ব্যতিক্রম নয় । সকাল সকাল সবাই ঘুম থেকে উঠে ডাইনিং টেবিলে স্থান নিয়েছে । খিচুড়ির গন্ধে চারপাশ মৌ মৌ করছে । সবাই সবার মতো খাচ্ছে ও খোশগল্প জুড়েছে । শুধু রিশান নিজে খাওয়া বাদ দিয়ে জাইরা'কে খাওয়াচ্ছে । কারণ ম্যামের হাত দিয়ে খেতে ইচ্ছে করছে না !

খাওয়া শেষে বৃষ্টির মধ্যেই দুই দম্পতি শপিং এ বেড়োলো । মলে এসে দুই জুটি দুদিকে আলাদা হয়ে গেল । রিশান জাইরা গেল বেবিদের ড্রেস এর সাইডে । অনেক অনেক ড্রেস কিনলো । তারপর ফেরার পথে ফুচকা খেতে চাইলো জাইরা । রিশান এতবার নিষেধ করলো কিন্তু জাইরা কী কারো কথা শোনার মেয়ে ? সে ড্যাং ড্যাং করে ফুচকা খেতে চলে গেল , সাথে আলিজা'কে ও নিতে ো না । দুই ভাই দীর্ঘশ্বাস ফেলে তাদের পিছু পিছু গেলো ।

এতো এতো খুনসুটির মধ্যেই দুটি মাস গড়িয়ে গেল । জাইরা'র পেট পরিপূর্ণ ভাবে উঁচু হয়ে গেছে । ডক্টর বলেছে এই সপ্তাহের মধ্যেই জাইরার কোল আলো করে নতুন অতিথি আসবে। খুশির খবরের পাশাপাশি রহমান কুঞ্জে এখন এক চাপা উত্তেজনা আর দুশ্চিন্তা। রিশান তো নিজের ইচ্ছে অনিচ্ছা সব বাদ দিয়ে চব্বিশ ঘণ্টা জাইরার ছায়ার মতো লেগে থাকে ।

​বাইরে তখন ঝমঝম করে বৃষ্টি পড়ছে । জাইরা জানালার পাশে বসে বৃষ্টির শব্দ শুনছিল । হঠাৎ করেই তলপেট থেকে এক তীব্র ব্যথার ঢেউ ধেয়ে এলো তার শরীরে । মুহূর্তের মধ্যে তার ফর্সা মুখটা নীল হয়ে গেল । হাত দিয়ে শক্ত করে জানালার গ্রিলটা চেপে ধরল সে ।

​— "রিশান! উফ্... রিশান কোথায় তুমি?"

​জাইরার কণ্ঠস্বর যন্ত্রণায় বুজে আসছে। রিশান মাত্র ওয়াশ রুম থেকে বের হয়ে টাওয়াল দিয়ে ফেস মুছতেছিলো , জাইরার কন্ঠ শুনে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকিয়ে স্তব্ধ হয়ে গেল । জাইরার অবস্থা দেখে ওর কলিজা শুকিয়ে গেল । টাওয়াল ফেলে দৌড়ে জাইরার কাছে গেল ।

​— " অরা! কী হয়েছে ? ব্যথা কি খুব বেশি ? " রিশান ওর হাত দুটো আঁকড়ে ধরল।

​জাইরা কোনোমতে বলল, "খুব... খুব টান লাগছে রিশান। মনে হচ্ছে ভেতরটা কেউ দুমড়ে দিচ্ছে । আ..আমি সহ্য করতে পারছি না ! "

​রিশান দেখল জাইরার কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমছে। এই আদিম যন্ত্রণার কাছে সে কতটা অসহায় তা প্রতি মুহূর্তে টের পাচ্ছে । রিশান কী করবে ভেবে পাচ্ছে না । এই মুহূর্তে নিজেকে তার পাগল পাগল লাগছে । সে জাইরাকে পাজাখোলা করে কোলে তুলে নিল।

​— "কিচ্ছু হবে না পাখি , আমি আছি তো । একদম ভয় পাবে না।"

রিশান তড়িঘড়ি নিচে নেমে চিৎকার দিয়ে সবাইকে ডাকলো । সবাই ধরফিয়ে বেড়িয়ে এলো নিজেদের কক্ষ থেকে । রিশান জিসানের উদ্দেশ্যে কোনমতে বললো ,

—" জিসান দ্রুত গাড়ি বের কর । " ​

এই বলে সে জাইরা'কে সামলাতে ব্যস্ত হয়ে পড়লো । জিসান ততক্ষণাৎ ছুটলো ।

গাড়িতে ওঠার পর ব্যথার তীব্রতা আরও বাড়ল। প্রতি মিনিটে মিনিটে জাইরা যন্ত্রণায় ককিয়ে উঠছে । রিশানের শার্টের হাতাটা সে খামচে ধরে আছে । রিশান জাইরার হাত শক্ত করে ধরে রেখেছে , সে নিজেও কাঁপছে । জাইরাকে হারানোর ভয়ে নাকি বাবা হওয়ার উত্তেজনায় বোঝা গেল না । ঢোক গিলে সামলালো নিজেকে । জাইরাকে সাহস দেওয়ার জন্য সে নিজেকে শক্ত রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করছে ।

​— " রিশান , আমার খুব কষ্ট হচ্ছে... মনে হচ্ছে দম বন্ধ হয়ে আসছে। " জাইরা কাঁদতে কাঁদতে বলল।

​রিশান ওর কপালে একটা চুমু খেয়ে ধরা গলায় বলল,

" আর একটু লক্ষ্মীটি, আমরা পৌঁছে গেছি। আমাদের ছোট্ট সোনা আসছে অরা , এই কষ্টটুকু শুধু তার জন্য। "

​হাসপাতালের করিডোরে যখন জাইরাকে অপারেশন থিয়েটারে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল , তখন রিশানের মনে হচ্ছিল তার হৃদপিণ্ডটা কেউ ছিঁড়ে নিয়ে যাচ্ছে। জাইরার সেই আর্তনাদ আর যন্ত্রণাকাতর মুখটা ওর চোখের সামনে ভাসছে । বাইরের বৃষ্টির শব্দের সাথে মিলেমিশে একাকার হয়ে গেল জীবনের সবচাইতে কঠিন অথচ সুন্দর এক অপেক্ষার মুহূর্ত ।

সে থিয়েটারের সামনে বসে রইল । চোখের পানি বাঁধ মানছে না । জাইরার কিছু হয়ে গেলে সে কি করে বাঁচবে ? ভাবতেই গলা শুকিয়ে এল তার । আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করতে লাগলো , জাইরার যেন কিছু না হয় । বড্ডো অশান্ত লাগছে তাকে । পরিবারের সদস্যরা তাকে ক্রমশ শান্তনা দিয়ে যাচ্ছে । কিন্তু এই পরিস্থিতিতে শান্ত হওয়া কী আদৌ সম্ভব ?

সকল অপেক্ষা , ভয় , উত্তেজনার অবসান ঘটিয়ে থিয়েটারের ভিতর থেকে নবজাতক শিশুর কান্নার আওয়াজ ভেসে এলো । সবাই আলহামদুলিল্লাহ বলে উঠল । রিশান ততক্ষণাৎ উঠে থিয়েটারের সামনে গিয়ে দাঁড়ালো ।

কিছুক্ষণের মধ্যেই থিয়েটারের দরজা খুলে গেল । একজন নার্স সদ্য জন্মানো শিশুকে নিয়ে বেড়িয়ে এসে জিজ্ঞেস করল ,

—“ পেশেন্টের হাসবেন্ড কে ? ”

—“ আমি । ”

নার্স ঘাড় ঘুরিয়ে রিশানকে পা থেকে মাথা অব্দি পরখ করে মুচকি হাসি দিয়ে বললো ,

—“ কনগ্রাচুলেশন স্যার । আপনি ছেলে সন্তানের বাবা হয়েছেন । ”

বলেই রিশানের দিকে শিশুটিকে বাড়িয়ে দিলো । রিশান মা-বাবা , জিসানের দিকে তাকালো । তারা চোখ বন্ধ করে আশ্বাস দিলো । তারপর সে নিজের প্যান্টে হাত মুছে বাড়িয়ে দিলো । নার্স যত্ন সহকারে বাচ্চাকে তার হাতে তুলে দিলো । রিশান আলতো করে আঁকড়ে নিলো । বাবার কোলে এসেই নিষ্পাপ শিশুটি হেসে উঠলো । রিশান তার হাসি দেখে চোখ ভর্তি পানি নিয়েই হেসে উঠলো ।

বাবা হওয়ার অনুভূতি সত্যিই দারুন হয় । রিশান সেটা আজকে বুঝতে পেরেছে । পরক্ষনেই জাইরার কথা মনে আসতেই নার্সকে জিজ্ঞেস করলো ,

—“ অরা কেমন আছে ? ঠিক আছে তো ! ”

নার্স আশ্বস্ত করে বললো ,

—“ জ্বি একদম ঠিক আছে । কিছুক্ষণ পরেই কেভিনে শিফ্ট করা হবে । ”

রিশান অধৌর্য হয়ে বললো ,

—“ কখন ? এখন কী ওকে একটু দেখতে পারি প্লিজ । ”

—“ এতো অধৌর্য হবেন না । থিয়েটারে ঢোকার পারমিশন নেই । ”

রিশান ঠোঁট নেড়ে আরো কিছু বলতে চাইলো কিন্তু তার আগেই জিসান এগিয়ে এসে বললো ,

—“ আচ্ছা তখনই দেখা করবে । ”

নার্স মাথা নেড়ে চলে গেল । জিসান হাত বাড়িয়ে বললো ,

—“ দে ওকে আমার কোলে দে । আমি ওর কানে আযান দিবো । ”

—“ কেন ওর বাপ কি মরে গেছে ? দূর হ ! ”

ঝটপট উত্তর দিলো রিশান । জিসান মুখ বাঁকিয়ে দাঁড়িয়ে রইলো । রিশান বাবুর কানে আযান দিয়ে প্রশান্তির হাসি দিয়ে বললো ,

—“ আমার আব্বা । আমার ছেলে । আমার আরিশ ! ”

জাইরা'কে কেভিনে শিফ্ট করা হলো । রিশান গিয়ে বেডে শোয়া জাইরা'কে পরখ করতে লাগলো ।

এই অল্পকিছু সময়ের মধ্যেই মেয়েটর মুখ কেমন ফ্যাকাশে হয়ে গেছে । চোখের নিচে কালি পড়ে গেছে । রিশান দীর্ঘশ্বাস ফেলে তার পাশে বসলো । বন্ধ চোখ জোড়ার চুমু খেলো । পুরো ফেস জুড়ে চুমুর বন্যা বসিয়ে দিলো ।

কিছুক্ষণ পর জাইরার জ্ঞান ফিরলো । রিশান তা দেখেই নড়েচড়ে বসল । উদ্বিগ্ন হয়ে জিজ্ঞেস করলো ,

—“ ঠিক আছো তুমি? কষ্ট হচ্ছে কোথাও ? ”

—“ না ঠিক আছি আমি । আরিশ কোথায় ? ”

রিশান ইশারায় পাশের দোলনায় হাত-পা নাড়তে থাকা আরিশ'কে দেখিয়ে দিলো । জাইরা সেদিকে তাকিয়ে স্মিত হেসে বললো ,

—“ ফেস আমার মতো হয়েছে আর চোখ তোমার মতো । ”

—“ হ্যাঁ দেখো আবার তোমার মতো ওর চোখ দেখে না কোনো মেয়ে পাগল হয়ে যায় । ”

দু'জনেই একসাথে হেসে উঠলো । রিশান জাইরার ললাটে অধর ছুঁইয়ে বললো ,

—“ অবশেষে আমরা পূর্ণ হলাম অরাপাখি । ”

চলবে...........

( রেসপন্স কইরো । চুপিচুপি পড়ে চলে যাও কেন ? একটু লাইক কমেন্ট ও কইরো । 🥹🪷)

#for_you #bangla_story #aizas_tales

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ২০তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন