ফন্ট সাইজ:
থিম:
তোমাতেই শেষ

৫ম পর্ব

লেখক: নীলাঞ্জনা

মীরার ঈশানকে ভালো লাগার শুরুটা অনেক আগের—তখন সে সবে সপ্তম শ্রেণিতে পড়ত। সেই ছোট্ট বয়সে, না বোঝা অনুভূতির মাঝেই কখন যে ঈশানের প্রতি তার এক অদ্ভুত টান তৈরি হয়েছিল, সে নিজেও বুঝতে পারেনি। তবে সেই টান ধীরে ধীরে বড় হতে হতে একসময় ভালোবাসায় রূপ নেয়। কিন্তু তাদের সম্পর্কটা গড়ে উঠতে সময় লেগেছিল অনেকটা—মীরা যখন দশম শ্রেণিতে উঠেছে, তারও কয়েক মাস পর গিয়ে তাদের প্রেমের সম্পর্কটা স্পষ্টভাবে শুরু হয়।

তবে সম্পর্কের শুরু থেকেই মীরার ভেতরে একটা ভয়, একটা সীমারেখা সবসময় কাজ করত। সে কখনোই এমন কিছু করার সাহস পায়নি, যেটা তাদের সম্পর্কের সীমা অতিক্রম করে যায়। তার কাছে প্রেম মানে ছিল সম্মান, দূরত্ব আর একধরনের পবিত্রতা। মাঝে মাঝে তার মনে হতো—তাদের সম্পর্কটা যেন নব্বই দশকের কোনো গল্পের মতো, যেখানে ভালোবাসা আছে, কিন্তু ছোঁয়ার তাড়াহুড়া নেই; আছে অপেক্ষা, লজ্জা আর একধরনের অদৃশ্য দূরত্ব।

কিন্তু মীরা জানত না—এই অনুভূতিটা হয়তো শুধু তার দিক থেকেই এতটা গভীর।

একদিন তার খালাতো ভাই রিহান তাকে বলেছিল, “জীবনে আবেগের চেয়ে বিবেক দিয়ে চলা অনেক বড় জিনিস। আবেগ মানুষকে ভাসিয়ে নিয়ে যায়, অনেক কিছু নষ্ট করে দেয়। কিন্তু যদি এই আবেগকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারিস, তাহলে তোর চেয়ে সুখী আর কেউ হবে না।”

এই কথাগুলো মীরার মনে গভীরভাবে গেঁথে গিয়েছিল। সে চেষ্টা করত প্রতিটা মুহূর্তে নিজেকে সামলে রাখতে, আবেগের ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখতে। কারণ রিহান ভাই ছিল তার জীবনের সবচেয়ে কাছের আর বিশ্বাসযোগ্য মানুষদের একজন—বন্ধুর মতোই, যে তাকে সবসময় ঠিক পথটা দেখাত।

ঈশানের সঙ্গে মীরার দেখা হতো মাঝেমধ্যেই। তারা একসঙ্গে কিছু সময় কাটাত—কখনো হাঁটাহাঁটি, কখনো নিঃশব্দে বসে থাকা, কখনো ছোট ছোট কথায় ভরা মুহূর্ত। তারপর মীরা আবার বাসায় ফিরে আসত। এই সীমাবদ্ধ, সংযত সম্পর্কটাকেই তার কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর মনে হতো। সে ভাবত—এত দূরত্ব রেখেও যদি কেউ এত সুখী হতে পারে, তাহলে এর চেয়ে সুন্দর সম্পর্ক আর কী হতে পারে?

কিন্তু এই সুখের আড়ালেই ছিল আরেকটা চাপা অস্বস্তি।

বাসায় ফিরলেই তাকে মুখোমুখি হতে হতো তার মায়ের নানা প্রশ্নের। “কোথায় গিয়েছিলি?”, “এত দেরি হলো কেন?”, “কার সঙ্গে ছিলি?”—এমন অসংখ্য প্রশ্ন। মীরা কখনোই মিথ্যা বলতে খুব একটা পারত না, তবুও পরিস্থিতির চাপে পড়ে সে চেষ্টা করত কিছু না কিছু বলে এড়িয়ে যেতে। কারণ সে জানত—তার মা যদি কোনোভাবে এই সম্পর্কের কথা জানতে পারে, তাহলে তার জীবনটা এক মুহূর্তেই বদলে যাবে।

এই লুকোচুরি, ভয় আর ভালোবাসার মাঝেই দিন কেটে যাচ্ছিল।

এভাবেই প্রায় সাত মাস পার হয়ে যায় তাদের সম্পর্কের।

কিন্তু হঠাৎ করেই মীরা একটা পরিবর্তন টের পেতে শুরু করে।

ঈশান আগের মতো আর দেখা করতে চায় না। মীরা বারবার বললেও সে কোনো না কোনো অজুহাতে এড়িয়ে যায়। মেসেজ করলে আগের মতো দ্রুত রিপ্লাই আসে না—কখনো ঘণ্টার পর ঘণ্টা, কখনো পুরো দিন পার হয়ে যায়। ফোন করলে সে রিসিভ করে না, কিংবা করলে খুব সংক্ষিপ্তভাবে কথা বলে।

আর যখন মীরা কিছু জিজ্ঞেস করে, তখন ঈশানের উত্তরগুলো হয় খুব সাধারণ—“ক্লাস ছিল”, “বাইরে ছিলাম”, “ব্যস্ত ছিলাম”—এমন হাজারো অজুহাত।

এই পরিবর্তনটা মীরাকে ভেতর থেকে ভেঙে দিতে শুরু করে।

সে বুঝতে পারে কিছু একটা ঠিক নেই, কিন্তু ঠিক কী হচ্ছে, সেটা সে ধরতে পারে না। তার ভেতরে অজানা একটা ভয় কাজ করতে থাকে—যদি এই সম্পর্কটা আর টিকে না থাকে?

মেহের তাকে বোঝানোর চেষ্টা করত, “হয়তো সত্যিই ব্যস্ত থাকে। সবসময় তো আর একই রকম থাকা যায় না।” কিন্তু মীরার মন কিছুতেই সেটা মানতে চাইত না।

তার মনে হতো—যে মানুষটা একসময় তাকে ছাড়া থাকতে পারত না, সে হঠাৎ করে এতটা দূরে চলে যেতে পারে কীভাবে?

সবচেয়ে কষ্টের বিষয় ছিল—ঈশান কখনোই খোলাখুলি কিছু বলত না। মীরা বারবার জানতে চাইলেও সে স্পষ্ট করে কিছুই বলত না। যেন একটা অদৃশ্য দেয়াল তৈরি হয়ে গেছে তাদের মাঝে।

মীরা চুপচাপ সব সহ্য করত। সে নিজের কষ্ট, নিজের ভয়—কিছুই পুরোপুরি কারও সঙ্গে ভাগ করে নিতে পারত না।

শুধু একা একাই ভাবত—সে কী ভুল করল? কোথায় কম পড়ল?

কিন্তু সেই প্রশ্নের উত্তর আর কখনোই খোলাখুলি জানা হয়ে ওঠেনি তার।

চলমান...

#নীলাঞ্জনা নূর

#তোমাতেই শেষ

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৫ম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন