বাসায় ফিরে আসার প্রায় এক ঘণ্টা পেরিয়ে গেছে। কিন্তু সেই এক ঘণ্টা যেন শেষই হচ্ছে না—সময়টা যেন থমকে দাঁড়িয়ে আছে নির্দয় এক বাস্তবতার সামনে।
মীরার মা অবিরাম তাকে মারতেই থাকেন। থামার কোনো লক্ষণ নেই তার মধ্যে। একের পর এক চড়, ধাক্কা, টান—সবকিছু যেন জমে থাকা রাগ আর সন্দেহের বিস্ফোরণ হয়ে নেমে আসছে মীরার উপর। মেহের বারবার এগিয়ে এসে থামানোর চেষ্টা করছে, “খালা, থামুন! প্লিজ থামুন!”—কিন্তু কোনো কথাই যেন কানে পৌঁছাচ্ছে না তার।
ঘরের এক কোণে দাঁড়িয়ে মীরার ছোট ভাই আরিয়ান জোরে জোরে কাঁদছে। ভয় আর অসহায়ত্বে তার পুরো শরীর কাঁপছে। কিন্তু সেই কান্নাও যেন মীরার মায়ের মন গলাতে পারছে না। তার চোখে-মুখে তখন শুধু রাগ, হতাশা আর অবিশ্বাস।
অন্যদিকে মীরা—সে একদম নিঃশব্দ।
একটা শব্দও করছে না। যেন সবকিছু থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়েছে সে। তার গালে জমে থাকা লালচে থাপ্পড়ের দাগ, ঠোঁটের কোণে শুকনো রক্ত, হাতে-গলায় কালশিটে চিহ্ন—সবকিছুই স্পষ্ট। স্কুল ড্রেসের একপাশ ছিঁড়ে গেছে। হাঁটু ছোঁয়া লম্বা চুলগুলো এলোমেলো হয়ে ছড়িয়ে আছে। তাকে দেখে মনে হচ্ছে—কোনো অনুভূতিহীন পুতুল পড়ে আছে মেঝেতে, যার নিজের ব্যথা প্রকাশ করার শক্তিটুকুও নেই।
আজকের এই ঘটনার শুরুটা হয়েছিল দুপুরে।
অনেকদিন জোরাজুরির পর অবশেষে ঈশান আজ মীরার সঙ্গে দেখা করতে রাজি হয়েছিল। মীরা ভেবেছিল—আজ সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে, আজ সে তার সব প্রশ্নের উত্তর পাবে। কিন্তু সে জানত না, আজ তার জীবনের মোড় ঘুরে যাবে অন্যদিকে।
মীরার মা আজ তাকে অনুসরণ করেছিলেন। কারণটা একটাই—সন্দেহ। এতদিন তিনি কখনো মীরাকে সন্দেহ করেননি, কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে মীরার আচরণের পরিবর্তন তাকে ভাবিয়ে তুলেছিল।
মীরা যখন ঈশানের সঙ্গে দেখা করল, তখন সে বারবার জানতে চাইছিল—“কী হয়েছে? তুমি এমন কেন করছো? আমার ভুলটা কোথায়?” কথার এক পর্যায়ে মীরার চোখ ভরে ওঠে, সে কান্নায় ভেঙে পড়ে। কিন্তু ঈশান—সে চুপই থাকে। কোনো উত্তর দেয় না, কোনো ব্যাখ্যা না। যেন মীরার প্রশ্নগুলো তার কাছে কোনো গুরুত্বই রাখে না।
এই নীরবতাই সবচেয়ে বেশি আঘাত করে মীরাকে।
একসময় সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ে, হতাশার চরম সীমায় পৌঁছে সে বাড়ি ফিরে আসে।
বাসায় ঢুকেই ব্যাগটা রাখতে না রাখতেই মায়ের রাগান্বিত হাত তার চুলের মুঠি চেপে ধরে। টেনে হিঁচড়ে তাকে ঘরের মাঝখানে এনে ফেলে। কিন্তু তবুও—মীরা কোনো শব্দ করে না। না চিৎকার, না কান্না—কিছুই না।
বিকেলের দিকে মেহের আসে মীরার খোঁজ নিতে। দরজা বন্ধ দেখে তার মনটা কেমন অস্থির হয়ে ওঠে। তখনই সে দেখতে পায়—আরিয়ান বাইরে দাঁড়িয়ে কাঁদছে। কী হয়েছে জিজ্ঞেস করতেই সে কাঁপা হাতে ভেতরের ঘরের দিকে ইশারা করে।
মেহের আর দেরি না করে দৌড়ে ভেতরে ঢুকে পড়ে।
ভেতরে ঢুকেই সে যা দেখে, তাতে তার বুকটা কেঁপে ওঠে। সে ছুটে গিয়ে আবারও মীরার মাকে থামানোর চেষ্টা করে, কিন্তু তাতেও কোনো লাভ হয় না। যেন রাগে-অভিমানে অন্ধ হয়ে গেছেন তিনি।
আরও কিছুক্ষণ এই অবস্থার পর হঠাৎ করেই মীরা নিস্তেজ হয়ে পড়ে যায়।
সে জ্ঞান হারায়।
ঘরের ভেতর এক মুহূর্তের জন্য নিস্তব্ধতা নেমে আসে।
অনেকক্ষণ পর, বিকেলের আলো একটু নরম হয়ে আসার সময়, মীরার জ্ঞান ফিরে আসে। চোখ খুলতেই সে দেখতে পায়—মেহের তার মাথার পাশে বসে আছে, উদ্বিগ্ন চোখে তার দিকে তাকিয়ে।
মুহূর্তের মধ্যেই মীরা উঠে বসে মেহেরকে জড়িয়ে ধরে। আর তারপরই শুরু হয় তার কান্না—অপ্রতিরোধ্য, বুকভাঙা কান্না।
কিন্তু সেই কান্না শুধু শরীরের ব্যথার জন্য নয়—এটা মেহের খুব ভালো করেই বুঝতে পারে। এই কান্নার ভেতরে লুকিয়ে আছে ভাঙা বিশ্বাস, অপমান, অব্যক্ত প্রশ্ন আর এক গভীর একাকিত্ব।
মেহের কিছু বলতে পারে না। শুধু চুপচাপ তাকে জড়িয়ে ধরে রাখে।
তার নিজের ভেতরেও তখন এক অদ্ভুত অপরাধবোধ কাজ করতে থাকে। মনে হতে থাকে—এই সবকিছুর জন্য হয়তো সে-ই দায়ী। যদি সে ঈশানের সঙ্গে দেখা না করত, যদি সবকিছু এভাবে এগিয়ে না দিত—তাহলে হয়তো আজকের এই ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হতো না মীরাকে।
কিন্তু এখন আর কিছুই বদলানোর নেই।
শুধু নিঃশব্দে কষ্টগুলো জমে থাকে—একজনের বুকে, আরেকজনের অপরাধবোধে।
চলমান...
#নীলাঞ্জনা নূর
#তোমাতেই শেষ