ফন্ট সাইজ:
থিম:
তোমাতেই শেষ

৯ম পর্ব

লেখক: নীলাঞ্জনা

মীরা তার খালামনিদের বাসায় আছে প্রায় দশ দিন হলো।

মীরার বড় খালামনি আর ছোট খালামনি—দুজনই ঢাকায় একই বাসায় থাকেন। এতদিন মীরারা ঢাকায় ছিল না বলে খালামনিদের বাসায় আসা-যাওয়াটাও খুব একটা হয়ে উঠত না। কিন্তু এখন যেহেতু ওরা ঢাকায় এসেছে, তাই চাইলেই মীরা খুব সহজে খালামনিদের কাছে চলে আসতে পারে।

অথচ ঢাকায় আসার পরও এতগুলো দিন পেরিয়ে গেলেও মীরা এই বাসায় আসেনি।

মীরার মায়েরা তিন বোন। তিনজনের মধ্যে মীরা'র মা মাহিরা ইসলাম। বড় বোন সাবিহা ইসলা, আর ছোট বোন রিহানা ইসলাম।

সাবিহা ইসলামের স্বামী মুহাম্মদ ফারহান খান ঢাকার একজন স্বনামধন্য ব্যবসায়ী এবং একটি প্রতিষ্ঠিত কোম্পানির মালিক। তাদের দুই ছেলে—বড় ছেল রিহান খান শান্ত, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। আর ছোট ছেলে রাফিদ খান নিলয়, সপ্তম শ্রেণিতে পড়ে।

মীরার ছোট খালা রিহানা ইসলামের স্বামী মুহাম্মদ রাশেদুল ইসলাম একজন স্বনামধন্য আইনজীবী। তাদের একমাত্র মেয়ে।সায়মা ইসলাম বৃষ্টি, এবার নবম শ্রেণিতে উঠেছে।

আর মীরার নিজের পরিবারে বাবা মাহফুজ চৌধুরী, একজন সরকারি কর্মকর্তা। মা মাহিরা ইসলাম। আর তাদের দুই সন্তান—মীরা এবং তার ছোট ভাই, যে এখন তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ে।

এই বিশাল পরিবারটার মধ্যে মীরা যেন সবারই আদরের।

দশ দিনে তার কোনো কিছুরই কমতি হয়নি। বড় খালামনি বারবার খোঁজ নেন, ছোট খালামনি নিজের মেয়ের মতো করে মীরার যত্ন করেন। বৃষ্টি তো সারাক্ষণ মীরার সঙ্গেই থাকে। এমনকি রাতে মীরার সঙ্গেই ঘুমায়।

তবুও...

মীরার মনটা যেন কোথাও আটকে আছে।

তার মায়ের কাছে।

প্রতিদিন মায়ের সঙ্গে ফোনে কথা হয়। কখনো দীর্ঘ সময়, কখনো অল্প। মা জিজ্ঞেস করেন, খেয়েছে কি না, কেমন আছে, কখন ঘুমাবে—সবই। মীরাও মায়ের সঙ্গে কথা বলে।

কিন্তু ফোনের ওপাশের মাকে কি আর কাছে থাকা মায়ের মতো লাগে?

লাগে না।

মাকে ভীষণ মনে পড়ে মীরার।

কয়েকদিন আগে ফোনে কথা বলার সময় মা হঠাৎ বলেছিলেন, তার বাবা—অর্থাৎ মীরার বাবা—প্রতিদিন মীরার কথা জিজ্ঞেস করেন।

“মীরা কবে আসবে?”

“ওকে আর কতদিন ওখানে রাখবে?”

“বাড়িতে নিয়ে আসো।”

এমনকি বারবার মীরাকে বাড়িতে ফিরিয়ে আনার কথাও বলছিলেন তিনি।

মা তখন হেসে হেসে বলেছিলেন, “এত তাড়াতাড়ি যাবি আসবি না। আর তোর বিয়ে টা নিয়ে তোর বাবা খুব অনুতপ্ত। নিজেই বিয়ে ভেঙে দিয়েছেন। কোনো বিয়েও হচ্ছে না তোর।”

মীরা তখন কিছু বলেনি।

কিন্তু মায়ের কথার আড়ালে যেন অদ্ভুত একটা জেদ টের পেয়েছিল সে। মনে হচ্ছিল, মা ইচ্ছে করেই যেন বাবাকে একটু কষ্ট দিচ্ছেন। বাবার মীরাকে দেখতে ইচ্ছে করছে—জেনেও মেয়েকে এত তাড়াতাড়ি বাড়িতে ফিরতে দিচ্ছেন না।

এসব ভাবলেই মীরার বুকটা কেমন ভার হয়ে আসে।

এই ছয় দিনে আরেকজন মানুষও মীরাকে বেশ আদর করে ইশরাত মনি।

ইশরাত আর রিহানের গল্পটা একটু আলাদা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে গিয়েই দুজনের পরিচয়। পরিচয় থেকে বন্ধুত্ব, তারপর ধীরে ধীরে সম্পর্ক। প্রায় দুই বছর তারা একে অপরকে ভালোবেসেছে। কিন্তু হঠাৎ ইশরাতের পরিবার থেকে বিয়ের জন্য চাপ আসতে শুরু করলে রিহান আর দেরি করেনি।

ইশরাতকে বিয়ে করে সোজা নিজের বাসায় নিয়ে আসে।

অবশ্য তাদের বিয়েটা এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে হয়নি। রিহান নিজেও এখনো পড়াশোনা করছে, নিজের পায়ে পুরোপুরি দাঁড়াতে পারেনি। তাই বড় কোনো আয়োজন করে বিয়ে করার মতো পরিস্থিতিও হয়নি।সে নিজের টাকায় বড়ো করে অনুষ্ঠান করবে। আপাতত ইশরাত রিহানদের বাসাতেই থাকে।

মীরার কাছে ইশরাতকে খুব ভালো লাগে।

মেয়েটার মধ্যে কেমন একটা শান্ত ভাব আছে। সুন্দর চেহারা, নরম ব্যবহার—আর প্রায় সবসময় মাথায় ওড়না দিয়ে রাখে। ওকে দেখলেই মীরার মনে হয়, মেয়েটার চারপাশে যেন একরাশ স্নিগ্ধতা লেগে আছে।

ইশরাতও মীরাকে কম ভালোবাসে না।

সারাদিন এটা-সেটা বুঝিয়ে বলে। মন খারাপ করে বসে থাকতে দেখলে পাশে এসে বসে। কখনো মজা করে, কখনো বোঝায়—

“সবসময় মন খারাপ করে থাকলে হবে? জীবনটা এত সহজে থেমে যায় না, মীরা।”

কিন্তু মনকে বোঝানো কি এত সহজ?

সেদিনও বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যার দিকে মীরা আর থাকতে না পেরে রিহান ভাইয়ার ঘরের দরজায় গিয়ে দাঁড়াল।

হালকা করে দরজায় নক করতেই ভেতর থেকে রিহানের গলা ভেসে এল,

“ভাইয়া... আসবো?”

“হ্যাঁ, আয়। কিছু বলবি?”

মীরা ধীরে ধীরে ঘরে ঢুকল। কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে থেকে বলল,

“ভাইয়া, বাসায় যাব।”

রিহান ল্যাপটপ থেকে চোখ তুলে মীরার দিকে তাকাল।

“তোর মা যেতে নিষেধ করেছে না এত তাড়াতাড়ি?”

মীরা মাথা নিচু করে রইল।

রিহান এবার একটু হাসল।

“আর তাছাড়া এখানে থাকতে তোর সমস্যা কী? এটা তো তোরই বাড়ি। এত অস্থির হচ্ছিস কেন?”

মীরা কোনো উত্তর দিল না।

কিছুক্ষণ পর রিহান মজা করার ভঙ্গিতে বলল,

“আর শোন, সারাদিন এভাবে প্যাঁচার মতো মুখ করে থাকিস না। একটু হাস। তোকে খুবই বিচ্ছিরি লাগছে দেখতে।”

মীরা বুঝতে পারল, ভাইয়া ইচ্ছে করেই ওকে রাগানোর চেষ্টা করছে।

কিন্তু মীরা কিছুই বললো না।কোনো পাল্টা কথা না বলে চুপচাপ ঘর থেকে বেরিয়ে এল মীরা।

নিচের ডাইনিং স্পেসে এসে দেখল, বৃষ্টি আর রাফিদ টিভি দেখছে।

মীরাকে দেখেই রাফিদ একটু সরে গিয়ে জায়গা করে দিল।

“আপু, এখানে এসো।”

মীরা গিয়ে ওর পাশে বসল।

টিভিতে কী চলছিল, সে জানত না।

কেন দেখছিল, সেটাও জানত না।

শুধু বসে ছিল।

মনটা ভালো করার জন্য।

কিন্তু মন ভালো হলো না।

কিছুদিন পরই কলেজে ভর্তি হওয়ার সময়। কোন কলেজে ভর্তি হবে, কোথায় পড়বে—এসব নিয়েও মীরার মাথায় হাজারটা প্রশ্ন।

তার বাবা আদৌ তাকে পছন্দের জায়গায় পড়তে দেবেন কি না, সেটাও সে জানে না।

মীরার সবচেয়ে বড় ইচ্ছা—রিহান ভাইয়ার মতো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়বে।

কিন্তু স্বপ্ন দেখা আর স্বপ্ন সত্যি হওয়া তো এক কথা নয়।

কী আছে তার কপালে?

সে জানে না।

হয়তো সবকিছু ঠিকঠাক হবে।

আবার হয়তো হবে না।

এর মাঝেই হঠাৎ বৃষ্টি মীরার কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে বলল,

“আচ্ছা আপু, শোন তো...”

মীরা ওর দিকে তাকাল।

“কী?”

বৃষ্টি খুব গম্ভীর মুখ করে বলল,

“তোর সঙ্গে যে লোকটার বিয়ে ঠিক করছে, সে কি অনেক টাকার মালিক?”

মীরা ভ্রু কুঁচকে বলল,

“আমি জানি না।”

“উফ! তুই আসলেই একটা বোকা আপু।”

মীরা চুপ করে রইল।

বৃষ্টি এবার আরও আগ্রহ নিয়ে বলল,

“এত পড়ে কী হবে বল তো? এর চেয়ে টাকা-ওয়ালা একটা লোককে বিয়ে করে জীবনটা এনজয় কর!”

মীরা এবার চোখ বড় বড় করে তাকাল।

“এমন কথা বলিস না।”

“কেন? এমনিতেই তো বুড়ো। কয়দিন পর এমনিতেই মরে যাবে।”

মীরা এবার আর চুপ থাকতে পারল না।

“আমি না হয় খালামনিকে বলি, তোর সঙ্গে বিয়েটা দিয়ে দিতে। তোর যেহেতু এতই ইচ্ছে।”

বৃষ্টি সঙ্গে সঙ্গে মাথা নেড়ে বলল,

“দিলে তো ভালোই হবে। কিন্তু আমার তো কোনো কুটনি দাদি নেই, যে আমার বাবাকে ভুলভাল বুঝিয়ে বিয়েতে রাজি করাবে!”

মীরা আর নিজেকে সামলাতে পারল না।

হেসে ফেলল।

এই মেয়েটা সত্যিই অদ্ভুত!

বিয়ে করার জন্য যেন ওর জীবনটাই পড়ে আছে।

তাদের হাসি-ঠাট্টার মাঝেই বাইরে সন্ধ্যা নেমে এলো।

কিছুক্ষণ পর মীরার বড় খালু ঘরে ঢুকলেন। ডাইনিংয়ে মীরা আর বৃষ্টিকে পাশাপাশি বসে থাকতে দেখে হাসতে হাসতে এগিয়ে এলেন।

“কী ব্যাপার? আমার দুই মা একসঙ্গে বসে কী করছে?”

মীরা হেসে বলল,

“তেমন কিছু না, খালু। টিভি দেখছিলাম।”

ঠিক তখনই ইশরাত এসে তার শ্বশুরকে এক গ্লাস পানি এগিয়ে দিল।

মীরা চুপচাপ তাকিয়ে রইল।

এই বাড়ির মানুষগুলো তাকে এত ভালোবাসে।

এত যত্ন করে।

তবুও কেন যেন তার মনে হয়, সে এখানে নিজের বাড়িতে নেই।

সে যেন আশ্রয় নিয়ে আছে।

এই অনুভূতিটাই তাকে সবচেয়ে বেশি কষ্ট দেয়।

মীরা ধীরে ধীরে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে নিজের ঘরে এলো। ঘরে ঢুকে কিছুক্ষণ বসে রইল। কিন্তু আজ ঘরের চার দেয়ালও যেন ভালো লাগছিল না।

হঠাৎ মনে হলো, ছাদে গেলে হয়তো একটু ভালো লাগবে।

মা অবশ্য সন্ধ্যার পর ছাদে যেতে নিষেধ করেছিলেন।

কিন্তু আজ আর মায়ের কথাটা মনে রাখার মতো মন ছিল না।

মীরা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুলগুলো হাত দিয়ে গুছিয়ে আধখোঁপা করে নিল। মাথায় সুন্দর করে ওড়নাটা টেনে নিল। তারপর নিঃশব্দে ছাদের দরজা খুলে বাইরে চলে গেল।

ছাদটা সত্যিই সুন্দর।

চারপাশে কত রকমের ফুলের গাছ!

সন্ধ্যা নামলেই ফুলের মিষ্টি ঘ্রাণে পুরো বাড়িটা ভরে যায়। হালকা বাতাসে ফুলের গন্ধ এসে মীরার মনটাকে ছুঁয়ে যাচ্ছিল।

মীরা ধীরে ধীরে ছাদের এক কোণে রাখা দোলনাটার কাছে গিয়ে বসল।

দোলনাটা খুব আস্তে আস্তে দুলতে লাগল।

আকাশে তখন চাঁদের আলো ছড়িয়ে পড়েছে।

মীরা আকাশের দিকে তাকিয়ে রইল।

কেন যেন সারাদিন তার মনটা এত বিষণ্ণ থাকে?

কোনো কিছুর মধ্যেই কেন সে আনন্দ খুঁজে পায় না?

সবাই তাকে ভালোবাসে।

খালামনিরা তাকে নিজের মেয়ের মতো করে রাখে।

বৃষ্টি সারাক্ষণ তার পাশে থাকে।

রাফিদ তাকে আপু বলে ডেকে কাছে বসায়।

রিহান ভাইয়া মজা করে হলেও হাসানোর চেষ্টা করে।

ইশরাত এত যত্ন নেয়।

তবুও...

মায়ের কথা মনে পড়লেই বুকের ভেতরটা হু হু করে ওঠে।

ছোট ভাইটার কথাও ভীষণ মনে পড়ে।

হয়তো এই মুহূর্তে সে মায়ের পাশে বসে আছে।

হয়তো টিভি দেখছে।

হয়তো মীরাকে খুঁজছে।

মীরার চোখ দুটো হঠাৎ ভারী হয়ে এলো।

সে দ্রুত চোখ নামিয়ে নিল।

“আর কতদিন?”

নিজের মনেই প্রশ্নটা করল মীরা।

আর কতদিন এভাবে থাকবে সে?

সবাই তাকে ভালোবাসলেও কেন তার মনে হয়, সে এখানে নিজের ইচ্ছায় নেই?

কেন মনে হয়, সে যেন এই বাড়িতে এসে আশ্রয় নিয়েছে?

আগে তো এই বাড়িতে কতবার এসেছে।

তখন তো এমন লাগেনি।

তাহলে আজ কেন সবকিছু এত অচেনা মনে হচ্ছে?

মীরা দোলনা থেকে উঠে দাঁড়াল।

ছাদের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত পর্যন্ত ধীরে ধীরে হাঁটতে লাগল। চাঁদের আলোয় তার ছায়াটাও মেঝের ওপর লম্বা হয়ে পড়ে রইল।

কিছুক্ষণ পর মীরা আবার আকাশের দিকে তাকাল।

হয়তো সামনে কী আছে সে জানে না।

কলেজ কোথায় হবে, পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারবে কি না, তার জীবনে সত্যিই সেই বিয়েটা হবে কি না—কিছুই জানে না।

শুধু এটুকু জানে...

সে নিজের জীবনটা নিজের মতো করে গড়তে চায়।

রিহান ভাইয়ার মতো একদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গেট দিয়ে হেঁটে ঢুকতে চায়।

নিজের একটা পরিচয় বানাতে চায়।

কিন্তু সেই স্বপ্নগুলো আদৌ তার জন্য অপেক্ষা করছে কি না—তা সময়ই জানে।

আর মীরা?

সে শুধু অপেক্ষা করতে পারে।

অনেকক্ষণ ছাদে থাকার পর অবশেষে ঘরে ফিরে এল মীরা।

দরজা বন্ধ করে বিছানায় গিয়ে চুপচাপ বসে রইল।

বাইরে তখনও চাঁদের আলো।

আর মীরার ভেতরে?

সেখানে যেন এক অদৃশ্য সন্ধ্যা নেমে আছে।

#চলমান...

#নীলাঞ্জনা নূর

#তোমাতেই শেষ।

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৯ম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন