পরের দিন সকালটা অন্য দিনের মতোই স্বাভাবিকভাবে শুরু হলো।
বাড়ির বড়রা যার যার কর্মস্থলের উদ্দেশে বেরিয়ে গেলেন। সকালের ব্যস্ততায় একসময় পুরো বাড়িটা যেন গুঞ্জন করতে লাগল। রান্নাঘর থেকে হাঁড়ি-পাতিলের শব্দ, কাজের লোকদের ব্যস্ততা, কারও অফিসে যাওয়ার তাড়া—সব মিলিয়ে বাড়িটা কিছুক্ষণের মধ্যেই নিজের চেনা ছন্দে ফিরে গেল।
বৃষ্টি আর রাফিদও স্কুলের জন্য বেরিয়ে গেছে।
বৃষ্টি চলে যাওয়ার পর থেকেই মীরার কেমন যেন ফাঁকা ফাঁকা লাগছিল। এই কয়েকদিনে মেয়েটা যেন মীরার সারাদিনের সঙ্গী হয়ে উঠেছে। বৃষ্টি থাকলে কখনো গল্প, কখনো হাসাহাসি, কখনো দুজন মিলে অকারণে তর্ক—সময়টা কীভাবে কেটে যায় মীরা টেরই পায় না।
আজ ঘরে বসে তাই ভীষণ একা লাগছিল।
মীরা ঘুম থেকে উঠে ফ্রেশ হয়ে নাশতা করে নিল। তারপর কিছুক্ষণ নিজের ঘরে বসে থেকেও মন টিকল না। শেষমেশ রান্নাঘরের সামনে গিয়ে দাঁড়াল।
বড় খালামনি সাবিহা ইসলাম আর ছোট খালামনি রিহানা ইসলাম দুজনেই তখন রান্নার কাজে ব্যস্ত। মীরা চুপচাপ দরজার পাশে দাঁড়িয়ে তাদের কাজ দেখছিল।
মীরা কিছু একটা বলতে যাবে, তার আগেই বড় খালামনি হঠাৎ ওর দিকে তাকালেন।
“মীরা, তোর বাবা ফোন করেছিল।”
মীরা চুপ করে তাকিয়ে রইল।
সাবিহা আবার বললেন,
“বলল, রিহান যেন তোকে নিয়ে আসে। তুই নাকি এখানে আসার পর থেকে বাড়িটা একদম ফাঁকা ফাঁকা লাগে ওনার কাছে। বলছিল, তোর জন্য নাকি খুব মন খারাপ করে। নিজের ভুলের জন্যও নাকি অনুতপ্ত।”
মীরার মুখটা মুহূর্তেই মলিন হয়ে গেল।
বাবা তাকে বাড়িতে নিয়ে যেতে চাইছেন—এই কথাটা শুনলে অন্য সময় হয়তো তার ভালো লাগত। কিন্তু এখন কেন যেন বুকের ভেতরটা আরও ভারী হয়ে গেল।
সে কোনো উত্তর দিল না।
ছোট খালামনি রিহানা এবার কথাটা ধরে বললেন,
“বাদ দাও বড় আপা। উনি ভালো মানুষ, সেটা আমি মানি। কিন্তু উনার মা...”
তিনি একটু থেমে নিঃশ্বাস ফেললেন।
“উনার মা একদমই ভালো না। আর সবচেয়ে বড় কথা হলো, উনি উনার মায়ের সব কথা শোনেন। আমি কিছুতেই বুঝি না, এত শিক্ষিত একজন মানুষ হয়েও উনি কীভাবে নিজের ভালো-মন্দটা আলাদা করে বুঝতে পারেন না!”
মীরা আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না।
কথাগুলো তার ভালো লাগছিল না। বাবাকে নিয়ে খালামনিদের এমন কথা শুনতে অস্বস্তি হচ্ছিল। তার মনে হচ্ছিল, সে যেন এমন একটা কথোপকথনের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে যেখানে তার কোনো পক্ষই নিতে ইচ্ছে করছে না।
চুপচাপ রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এল সে।
নিচের বসার ঘরে এসে টিভিটা অন করল। একটা কার্টুন চলছিল। মীরা সোফায় বসে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল।
কিছুক্ষণ পর বিরক্ত হয়ে টিভিটাও বন্ধ করে দিল।
নিজের ঘরে ফিরে এসে বিছানায় শুয়ে পড়ল মীরা।
এই বাড়িতে তার করার মতো আসলে তেমন কিছুই নেই। খালামনিরা তাকে কোনো কাজ করতে দেন না। কিছু করতে গেলেই বলে,
“থাক, তুই বস।”
কখনো মনে হয়, সে যেন এই বাড়ির অতিথি নয়—কোনো আদরের ছোট্ট বাচ্চা, যাকে সবাই কোলে নিয়ে ঘুরবে।
কিন্তু সারাদিন এভাবে বসে থাকলে তো মানুষের নিজের চিন্তাগুলোই বেশি জেঁকে বসে।
মীরা চোখ বন্ধ করল।
কিছুক্ষণ পর কখন ঘুমিয়ে পড়েছিল, নিজেও জানে না।
বিকেলের দিকে ঘুম ভাঙল তার।
ঘুম থেকে উঠে দেখল বৃষ্টি স্কুল থেকে ফিরে এসেছে। দুজন কিছুক্ষণ পর পাশাপাশি বসে গল্পে মেতে উঠল। বৃষ্টি সারাদিনের স্কুলের গল্প করছিল, আর মীরা মাঝেমধ্যে হেসে হেসে ওর কথা শুনছিল।
অনেকদিন পর ঠক ঠক করে ঘরের দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ হলো।
বাইর থেকে পরিচিত একটা গলা ভেসে এলো,
“মীরা, ভেতরে আসব?”
মীরা সঙ্গে সঙ্গে বুঝে গেল।
“হ্যাঁ ভাইয়া, আসো।”
দরজা ঠেলে রিহান ভেতরে ঢুকল।
ঘরে ঢুকেই বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে বলল,
“বৃষ্টি, তুই একটু বাইরে যা তো। মীরার সঙ্গে একটু কথা আছে।”
বৃষ্টি সঙ্গে সঙ্গে মুখ বাঁকিয়ে বলল,
“আচ্ছা, বুঝেছি। আমাকে বের করে গোপন মিটিং হবে।”
রিহান হেসে বলল,
“যা তো!”
বৃষ্টি আর কিছু না বলে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
দরজা বন্ধ হতেই রিহান একটা চেয়ার টেনে মীরার মুখোমুখি বসল।
কিছুক্ষণ মীরার দিকে তাকিয়ে থেকে হঠাৎ বলল,
“তুই এখন কী করতে চাইছিস?”
মীরা অবাক হয়ে ভ্রু কুঁচকাল।
“মানে?”
রিহান খুব স্বাভাবিক গলায় বলল,
“পড়াশোনা করবি, নাকি ওই সুগার ড্যাডিকে বিয়ে করে সংসার করবি?”
মীরার মুখ সঙ্গে সঙ্গে গম্ভীর হয়ে গেল।
“ভাইয়া, তোমার যদি এরকম উল্টাপাল্টা কথা বলে আমাকে রাগানোর উদ্দেশ্য থাকে, তাহলে আমি চলে যাচ্ছি। তুমি থাকো।”
মীরা উঠে দাঁড়ানোর ভান করতেই রিহান হেসে ফেলল।
“আরে দাঁড়া দাঁড়া! মজা করছিলাম।”
মীরা আবার বসে পড়ল, তবে মুখটা এখনো ভার।
রিহান এবার একটু গম্ভীর হলো।
“শোন, কলেজে ভর্তি হওয়ার সময় হয়ে যাচ্ছে। এটা নিয়ে তোকে এখন থেকেই ভাবতে হবে। তোর রেজাল্টও খারাপ হয়নি। শুধু একটু এদিক-ওদিকের জন্য A+টা মিস হয়েছে। সামনে যদি মন দিয়ে পড়িস, সেটা আবারও কাভার করতে পারবি।”
মীরা চুপ করে শুনছিল।
রিহান বলল,
“কিন্তু তার আগে একটা জিনিস জানতে চাই। তোর নিজের স্বপ্নটা কী?”
মীরা কিছুক্ষণ নীরব থাকল।
তারপর খুব আস্তে বলল,
“আমি তোমার মতো ভার্সিটিতে পড়ব।”
রিহানের মুখে হালকা হাসি ফুটে উঠল।
“ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে?”
মীরা মাথা নেড়ে বলল,
“হুম।”
“তাহলে সেটাই হবে তোর প্রথম লক্ষ্য।
কলেজে ভর্তি হওয়ার সময় হয়ে গেছে। তুই এখান থেকে এখনই চলে যেতে না পারলেও সমস্যা নেই। এখান থেকেই কলেজে ভর্তি হয়ে যাবি। তারপর ধীরে ধীরে সব ঠিক করব।”
মীরা এবার একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল।
রিহান কিছুক্ষণ চুপ থেকে,
“আর একটা কথা, মীরা।”
মীরা নরম চোখে তাকাল।
“জীবনে আগে-পিছে যা হয়েছে, সবকিছু নিয়ে পড়ে থাকিস না। এগুলো তোর পুরো জীবন না।”
মীরার চোখের দৃষ্টি ধীরে ধীরে নিচু হলো।
রিহান গলা আরও খানিকটা কোমল করে...
“আমি জানি, এই বয়সে তুই অনেক কিছুর মধ্য দিয়ে গেছিস। অনেক মানুষ তোকে কষ্ট দিয়েছে। কিন্তু তার মানে এই না যে তোর সামনে আর ভালো কিছু নেই।
আর ঈশানের কথা ভেবে রাত জেগে কাঁদবি না।”
মীরার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।
রিহান সেটা বুঝেও কথাটা থামাল না।
“মেহেরকেও ধীরে ধীরে ভুলে যা। যারা তোকে কষ্ট দিয়েছে, তাদের নিয়ে নিজের জীবন আটকে রাখার কোনো মানে নেই। কলেজে উঠলে নতুন মানুষ চিনবি, নতুন পরিবেশ পাবি। দেখবি, অনেক কিছু নিজে থেকেই বদলে যাবে।”
মীরা নিচু গলায় বলে,
“সবকিছু কি সত্যিই ঠিক হয়ে যাবে?”
রিহান একটু হেসে..,
“সবকিছু হয়তো তোর মতো করে হবে না। কিন্তু তুই ঠিক হয়ে যাবি। এটাই আসল।”
কথাটা শুনে মীরা চুপ রইল।
রিহান এবার চেয়ার থেকে একটু সামনে ঝুঁকে বলে,
“আর শোন, ভবিষ্যতে যদি কখনো কাউকে তোর জীবনে আনতে ইচ্ছে করে, আগে ভালো করে চিনবি। শুধু ভালোবাসলেই হবে না, মানুষটা তোকে সম্মান করে কি না, তোর পাশে থাকে কি না—এসবও দেখতে হবে।”
মীরা কিছু বলল না।
“আর একটা কথা মনে রাখিস—তুই যাকে পছন্দ করবি, যদি সে সত্যিই ভালো মানুষ হয়, তাহলে আমি নিজে দাঁড়িয়ে থেকে তোদের বিয়ে দেব।”
মীরা অবাক হয়ে ভাইয়ার দিকে তাকাল, বেন খুব অদ্ভুত কিছু শুনেছে।
রিহান হেসে বলল,
“কথা দিলাম।”
তারপর একটু থেমে আবার বলা শুরু করে ,
“কেউ তোর পাশে থাকুক বা না থাকুক, আমি সবসময় তোর পাশে আছি। এটা নিয়ে কখনো দ্বিতীয়বার ভাববি না। বুঝেছিস?”
মীরার চোখের কোণে হালকা পানি জমে উঠল।
সে শুধু মাথা নেড়ে বলল,
“হুম।”
রিহান সঙ্গে সঙ্গে কথার গাম্ভীর্যটা কাটিয়ে,
“এই তো। এবার হাস।”
মীরা হালকা করে হাসল।
রিহানও হাসল।
“আজ সন্ধ্যায় তোর কলেজের ফর্ম পূরণ করতে যাব। কী কী লাগবে সেটা আগে জেনে রাখিস। আর বাসায় কিছু দরকার হলে তোর ভাবিকে বলবি। লজ্জা পাওয়ার কিছু নেই।”
“আচ্ছা।”
“ঠিক আছে, তাহলে আমি যাই।”
রিহান উঠে দরজার দিকে এগিয়ে গেল।
দরজার কাছে গিয়ে আবার ফিরে তাকাল।
“আর হ্যাঁ, বেশি চিন্তা করবি না।”
মীরা মাথা নেড়ে ,
“ঠিক আছে ভাইয়া।”
রিহান বেরিয়ে গেল।
দরজা বন্ধ হওয়ার পর মীরা কিছুক্ষণ একই জায়গায় বসে রইল।
রিহানকে সে ভীষণ ভালোবাসে।
একজন বড় ভাই হিসেবে নয় শুধু—তার কাছে রিহান যেন এমন একজন মানুষ, যার কাছে নিজের সব ভয়, কষ্ট আর দুর্বলতা নিয়ে দাঁড়ানো যায়।
জীবনে এত কিছু হারিয়েও একটা জায়গায় মীরা সত্যিই ভাগ্যবান।
সে রিহানের মতো একজন ভাই পেয়েছে।
সন্ধ্যার পর বাড়ির পরিবেশটা আবার বদলে গেলবাইরে থেকে একটানা কলিংবেলের শব্দ আসছে।
একবার।
দুবার।
তারপর আবার।
বৃষ্টি বিরক্ত হয়ে বিছানা থেকে উঠে দাঁড়াল।
“কে এতবার কলিংবেল বাজাচ্ছে?”
মীরা তখন নিজের ঘরেই ছিল।
বৃষ্টি নিচে নেমে গেল।
সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে সে ভাবছিল, হয়তো কোনো ডেলিভারি এসেছে। কিন্তু নিচে গিয়ে দেখল, বাইরে থেকে আবার কলিংবেল বাজছে।
বাড়ির অন্যরা তখন যে যার কাজে ব্যস্ত।
বৃষ্টি দরজার কাছে গিয়ে দাঁড়াল।
কিন্তু দরজার ওপাশে কেউ যেন কথা বলছে না।
আবার বেল বাজল।
বৃষ্টি এবার একটু বিরক্ত হয়ে দরজা খুলে দিল।
আর ঠিক সেই মুহূর্তেই—
তার পায়ের নিচ থেকে যেন মাটি সরে যাওয়ার উপক্রম।
দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটাকে দেখে বৃষ্টির মুখের সমস্ত রং এক মুহূর্তে বদলে যায়।
কয়েক সেকেন্ড সে কোনো কথাই বলতে পারল না।
শুধু বড় বড় চোখে তাকিয়ে রইল।
তারপর হঠাৎ দরজাটা আগের মতো রেখেই সে ঘুরে দাঁড়াল।
এক দৌড়ে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে চলে যায় সে।
“আপু!”
মীরার ঘরের দরজা ঠেলে বৃষ্টি ঢুকে হাঁপাতে হাঁপাতে..
“আপু... নিচে চলো!”
মীরা অবাক হয়ে উঠে ।
“কী হয়েছে?”
বৃষ্টি কিছু বলতে পারলো না।
শুধু মীরার হাতটা শক্ত করে ধরে..
“তুমি নিচে চলো... এখনই।”
মীরার বুকের ভেতর অজানা একটা আশঙ্কা তৈরি হলো।
“কে এসেছে?”
বৃষ্টি কোনো উত্তর দিল না।
শুধু হাত ধরে তাকে টেনে নিচে নামাতে লাগল।
সিঁড়ির শেষ ধাপে এসে মীরা যখন দরজার দিকে তাকাল—
তখন তার পা যেন সত্যিই থেমে গেল।
চোখের সামনে যা দেখছে, সেটা যেন বিশ্বাসই করতে পারছে না।
এটা কীভাবে সম্ভব?
এখানে সে কেন?
মীরার চোখ ধীরে ধীরে বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল।
তার বুকের ভেতরটা হঠাৎ প্রচণ্ড জোরে ধুকপুক করতে শুরু করল।
ঠিক তখনই—
চলমান...
#নীলাঞ্জনা নূর
#তোমাতেই শেষ।