ফন্ট সাইজ:
থিম:
সন্ধিক্ষণে আবদ্ধ

১ম পর্ব

লেখক: পরশী হামামা তাহেরা

বউ চুরি করতে এসে যে শেষ পর্যন্ত নিজেকেই সেই বউয়ের সাজে সেজে বসতে হবে, তা ঘুণাক্ষরেও ভাবেনি ষোড়শী কন্যা বেলা। ভাগ্য যে তার জন্য এমন এক অদ্ভুত অধ্যায় লিখে রেখেছে, সে সম্পর্কে তার সামান্যতম ধারণাও ছিল না। না চাইলেও শেষ পর্যন্ত বিয়েটা তাকে করতেই হয়েছে। তাছাড়া আর অন্য কোনো উপায় ছিল না তার হাতে। বিয়ের বেনারসি, ভারী গয়না সাজে সে জড়সড় হয়ে বসে আছে।

রাগ, অভিমান আর বুকভরা দুঃখ নিয়ে প্রায় এক ঘণ্টা ধরে আহসান ভিলার বিশাল লিভিংরুমের নরম সোফায় বসে আছে সে। মুখটা গোমড়া করে সামনের দিকে তাকিয়ে থাকলেও চোখেমুখে স্পষ্ট তার চরম অস্বস্তির ছাপ। তার জীবনের সমীকরণটা মাত্র কয়েক ঘণ্টায় এত ওলটপালট হয়ে যাবে, তা সে ভাবতেও পারেনি।

বেলার ঠিক মুখোমুখি সোফায় বসে আছেন মালিহা রহমান। মুখে কঠোরতা ধরে রাখার চেষ্টা করলেও ভেতরে ভেতরে তিনি খুশি এবং ভীষণ অস্থির বটে। কারণ একদিকে নিজের একমাত্র মেয়ের ভবিষ্যৎ, অন্যদিকে পরিবারের সম্মান দুইয়ের মাঝখানে পড়ে যেন দিশেহারা হয়ে গেছেন তিনি। বারবার বেলার দিকে তাকাচ্ছেন, আবার চোখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। মা হয়েও তিনি পাষাণের মতো আজ বড্ড নির্দয় হয়েছেন। তার এই জোরপূর্বক সিদ্ধান্তের প্রতিফল এখন ঠিক কি বয়ে আনবে, তা নিয়ে এখন পর্যন্ত তিনি অবগত নন। তবে ওনার মতে যা করেছেন তা একদম ঠিক। তবে এইটা বুঝতে পারছেন মা-মেয়ের সম্পর্কটায় আগের চাইতেও আরো গভীরভাবে ফাটল ধরবে, কারণ এখনও পর্যন্ত বেলা ওনার দিকে একবারও তাকায় নি। বেলার এই নীরব অবজ্ঞা ওনার বুকেও বিঁধছে, কিন্তু পরিস্থিতির কাছে তিনিও আজ অসহায়।

আহসান ভিলার বিশাল জমকালো লিভিংরুমের বাতাস যেনো দমবন্ধ করা নীরবতায় ভারী হয়ে আছে। চারিদিকের আলোকসজ্জা, রজনীগন্ধার তীব্র সুবাস আর উৎসবের আমেজ যেন এক মুহূর্তের ঝড়ে বিষাদে রূপ নিয়েছে। লিভিংরুমজুড়ে অস্বস্তিকর এক নীরবতা বিরাজমান। উপস্থিত সবাই যেন বুঝতে পারছে, কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে তাদের জীবনের মোড় এমনভাবে ঘুরে যাবে, তা কেউ কল্পনাও করেনি। আর সেই অপ্রত্যাশিত ঝড়ের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে এখন নিশ্চুপ বসে আছে বেচারি বেলা।

রাদিল আহসান নিশ্চুপ হয়ে বাঁ পাশের বড় রাজকীয় সোফায় বসে আছেন গম্ভীর হয়ে। ভদ্রলোক মহা চিন্তার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছেন এ মুহূর্তে। বিয়েটা তো দিয়ে দিয়েছেন কিন্তু তার ভবিষ্যৎ কি বা কোথায় এসে থামবে তা নিয়ে বড্ড দ্বিধায় ভুগছেন। তার থেকে বড় কথা, ওনার ছেলে দানিশ আহসানকে নিয়ে। বিয়ে পড়ানোর পর মুহূর্তে যে ছেলে নিখোঁজ হয়েছে, এখন পর্যন্ত তার কোনো খোঁজখবর নেই, যাওয়ার সময় মুখে একটাও কথা বলেনি। তারপর থেকে তার কোনো খোঁজ নেই। সামিয়া আহসান কতবার ফোন দিয়েছেন তার হিসাব নেই, কিন্তু প্রতিবারই একই উত্তর ফোন বন্ধ। তাই বেচারা ভীষণ চিন্তিত।

আসলে ঘটনার সূত্রপাত হয়েছিল বিয়েবাড়ির এক চরম নাটকীয়তায়। বিয়ের কনে লিলা হঠাৎ করেই বিয়ের আসর থেকে নিখোঁজ হয়ে যায়। চারদিকে যখন হুলস্থুল পড়ে যায়, তখন মালিহা রহমান ও পরিবারের অন্য সদস্যরা মিলে বেলার ওপর চাপ সৃষ্টি করেন কনের সাজে বসার জন্য। পাত্র অর্থাৎ রাদিল আহসানের ছেলে দানিশ আহসানকে প্রথমে জানানোই হয়নি যে কনে পরিবর্তন হয়ে গেছে। কিন্তু ভাগ্য বা দুর্ভাগ্যবশত, ঠিক বিয়ে পড়ানোর শেষ মুহূর্তে দানিশের সামনে সবটা প্রকাশ পেয়ে যায়। সে জানতে পারে যে লিলার জায়গায় বেলা বসে আছে।

এই সত্যটা জানার পর মুহূর্তে দানিশ প্রচণ্ড ক্ষোভে ফেটে পড়ে। বিয়ের আসরেই বাবা রাদিল আহসানের সাথে তার বেশ কিছুক্ষণ তীব্র তর্কাতর্কি ও কথাকাটাকাটি হয়। দানিশ সাফ জানিয়ে দেয়, সে এই প্রতারণা মেনে নেবে না। কিন্তু রাদিল আহসান তখন পরিবারের সম্মান, সমাজের লোকলজ্জা আর আত্মীয়-স্বজনের সামনে মাথা হেঁট হওয়ার ভয়ে একেবারে ভেঙে পড়েন। শেষ পর্যন্ত বাবার কাতর অনুরোধ, চোখের জল আর তীব্র পিড়াপিড়িতে দানিশ বাধ্য হয়ে বিয়েতে রাজি হয়। কিন্তু তার ভেতরের ক্ষোভ আর অপমান সে ভুলতে পারেনি। কাজী সাহেবের সামনে অত্যন্ত অনিচ্ছার সাথে 'কবুল' বলার পরপরই সে বিয়ের আসর থেকে উঠে সোজা বেরিয়ে যায়। তারপর থেকে এখন পর্যন্ত তার কোনো খোঁজ নেই।

দানিশের মা সামিয়া আহসান কতবার যে ছেলের ফোনে কল দিলেন, তার কোনো ইয়ত্তা নেই। কিন্তু প্রতিবারই ওপাশ থেকে যান্ত্রিক কণ্ঠস্বর ভেসে আসছে, "The number you are trying to reach is switched off."

কথাটা কানে আসতেই বুকের ভেতরটা আরও হাহাকার করে উঠছে। ছেলে ছোটবেলা থেকেই জেদি, কিন্তু এমনভাবে বিয়ের আসর ছেড়ে উধাও হয়ে যাবে তা তিনি কল্পনাও করেননি।এদিকে ছেলের ফোন বন্ধ দেখে মায়ের মন তাই চরম উৎকণ্ঠায় কাঁপছে। একই সাথে তিনি স্বামী রাদিল আহসানের ওপর মনে মনে প্রচণ্ড ক্ষেপে আছেন। কারণ সামিয়া আহসান নিজেই এই তাড়াহুড়ো করে কনে বদলে বিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্তে একদম রাজি ছিলেন না। কিন্তু রাদিল আহসানের জেদ আর কথার ওপর কথা বলার ক্ষমতা ওনার ছিল না।

সবচেয়ে বড় কথা, নিজের বোনের মেয়েকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না—এই চিন্তায় সামিয়া আহসান ভেতর ভেতর মরে যাচ্ছেন, বোনকে কি জবাব দিবেন। আসলে সামিয়া আহসানের বোনের মেয়ে লিলার সাথেই ওনার ছেলে দানিশ আহসানের বিয়ে হওয়ার কথা ছিল। প্রায় কয়েক বছর দরে দানিশ কে বিয়ে করার কথা বলা হচ্ছে কিন্তু ওনার ছেলেটাতো প্রথম দিকে বিয়ে করতেই রাজি ছিল না। অনেক জোরাজুরি, অনুনয়-বিনয় আর পরিবারের চাপের পর যখন এই কয়েকদিন আগে সে বিয়ে করতে রাজি হলো, তখন সে নিজেই জানিয়েছিল যে সে লিলাকেই বিয়ে করবে। ছেলের মুখে এই কথা শুনে সামিয়া আহসানের চেয়ে খুশি আর কেউ সেদিন ছিল না। দানিশ আমেরিকাতে থাকে এবং ওনার বোনও সপরিবারে আমেরিকাতেই থাকেন। তাই দানিশ আর লিলা পরশুই মাত্র দেশে এসেছিল এই শুভ পরিণয়ের উদ্দেশ্যে। কিন্তু হায়! বিয়ের ঠিক আগ মুহূর্তে জানতে পারেন লিলা নিখোঁজ। তখন সামিয়া আহসানের মাথা আর কাজ করছিল না। একদিকে প্রিয় ভাগ্নি নিখোঁজ, অন্যদিকে লোকসমাজে তীব্র দুর্নাম রটার ভয়। এই উপায়হীন পরিস্থিতিতে বেলার মতো একটা নিষ্পাপ মেয়েকে বলির পাঁঠা হতে হলো।

রাত ক্রমশ গভীর হচ্ছে। ড্রয়িংরুমের দেয়াল ঘড়িটার টিকটিক শব্দ যেন সবার হৃদস্পন্দনের গতি বাড়িয়ে দিচ্ছে। সামিয়া আহসান সোফা থেকে উঠে ধীর পায়ে স্বামী রাদিল আহসানের দিকে এগিয়ে গেলেন। ওনার চোখেমুখে ক্লান্তি আর ক্ষোভের মিশ্রণতো আছেই নিজের একমাত্র ছেলের খুঁজ পাচ্ছেন না ।

তিনি রাদিল আহসানের সামনে দাঁড়িয়ে নিচু শক্ত গলায় বললেন,

"রাত অনেক হলো। এবার অন্তত লিভিংরুমের এই নাটকটা বন্ধ করুন আপনারা। আপনি কিছু মুখে দিয়ে আপনার প্রেসারের ওষুধটা নিয়ে অন্তত একটু রেস্ট নিন। না হলে প্রেসারটা আবার বেড়ে যাবে, এমনিতেই আপনি অসুস্থ হয়ে পড়বেন। তখন এই নতুন বিপদের মাঝে আপনাকে নিয়ে টানাটানি করার মতো শক্তি আমার থাকবে না।"

রাদিল আহসান একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে শূন্য দৃষ্টিতে তাকালেন। বুঝতেই পারছেন ওনার গিন্নি যে প্রচুর ক্ষেপে আচেন। সামিয়া আহসান একটু নিশ্বাস না নিয়েই আবার ক্ষুব্ধ স্বরে জিজ্ঞেস করলেন,

"লিলা আর দানিশের কোনো খোঁজ পেয়েছ? পুলিশকে কি জানানো হয়েছে? নাকি এখনো লোকলজ্জার ভয়ে হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকবেন? আমার বোনের মেয়ের যদি কিছু হয় তাহলে এই আপনাকে বলে দিলাম ব্যাপারটা খুব খারাপ হবে যে করেই হক লিলাকে খুব তাড়াতারি আমি দেখতে চাই। আর আমার ছেলেটা যে অমন রাগ করে বেরিয়ে গেল, ওর যদি কিছু হয়ে যায়, আমি কিন্তু কাউকে ক্ষমা করব না।"

ছামিয়া আহসান শেষের বাক্যটা মালিহা রহমানের দিকে তাকিয়েই বললেন। এতে অবশ্যই মালিহা ঠিকি বুঝতে পেরেছেন কথাটা যে ওনাকে উদ্দেশ্য করে বলা হয়েছে। রাদিল আহসান কোনো উত্তর দিতে পারলেন না স্ত্রীরির কথায়, কেবল কপালে হাত দিয়ে বসে রইলেন। সামিয়া আহসান এবার সোফায় বসে থাকা বেলার দিকে তাকালেন। বেলার মাথা নিচু করে এক দৃষ্টিতে ফ্লোরের দিকে চেয়ে আছে গাল বেয়ে পড়া অশ্রুরুর ফুটার গড়িয়ে পড়ার দাগ স্পষ্ট। এতক্ষণ ধরে এই ভারী বেনারসি আর গয়নার বোঝায় মেয়েটা ক্লান্ত হয়ে পড়েছে নিশ্চয়ই তবে তিনি ভারি অবাক হলেন বেলার এমন নির্জীব আচরণে। সামিয়া আহসান দীর্ঘশ্বাস ফেলে বাড়ির এক পরিচারিকাকে ডেকে বললেন, "বেলাকে রুমে নিয়ে যাও। অনেক ধকল গেছে ওর ওপর দিয়ে। ওকে ফ্রেশ হতে সাহায্য করো আর ভারী কাপড়গুলো বদলে হালকা কিছু পরিয়ে দাও।"

পরিচারিকা এসে বেলাকে নিয়ে রুমের দিকে রওনা দেন। বেলা ধীর পায়ে সোফা থেকে উঠে দাঁড়াল। ওর নিজেকে নিজের কাছে একদম নিশ্চল লাগছে। অতি কষ্টের সাথে দু’এক পা করে এগোতে লাগে, ওর কাছে প্রতিটি পদক্ষেপ যেন এক অজানা ভবিষ্যতের দিকে এক একটি ভারী পাথর চেপে বসার মতো। মালিহা রহমান মেয়ের যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইলেন, কিন্তু মুখ ফুটে একটা শব্দও বলতে যেনো কোনো শক্তি বা ভাষা খুঁজে পাচ্ছেন না।

[ বি:দ্রঃ আসসালামু আলাইকুম পাঠিকারা? আমি একজন নবীন লেখিকা তো আজকে নতুন গল্পের যাত্রা শুরু করলাম যানিনা কতটা ভালো লিখেছি তাও যথেষ্ট ভালো করার চেষ্টা করেছি। তবে আমার একটাই দুঃখ কেউ কোন রিয়াকশন বা মন্তব্য করেন না কোনো? আপনারাদের একটা বাক্যে একজন নবীন লেখিকার লেখার শক্তি দিগুণ বেড়ে যায় অথচ কেউ কোন মনোবল দেন না তাকে। যেটা খুবি দুঃখজনক ব্যাপার। প্লিজ আপনারা রেসপন্স করবেন একটুই আপনাদের কাছে আমার চাওয়া। আর হ্যাঁ আমি এই পর্বের রেসপন্স দেখেই নেক্সট পর্ব লিখবো। ধন্যবাদ আপনাকে। ]

#সন্ধিক্ষণে_আবদ্ধ

#সূচনা_পর্ব

#পরশী_হামামা_তাহেরা

ক্রমশ…..

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১ম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন