#সন্ধিক্ষণে_আবব্ধ [০২]
#পরশী_হামামা_তাহেরা
আহসান মঞ্জিল ভিলার এই থমথমে পরিবেশে হয়ে যাওয়া ঝরে লিভিংরুমের বাতাস তখন এক দমবন্ধ করা নীরবতায় ভারী হয়ে আছে। চারিদিকের চোখধাঁধানো আলোকসজ্জা, প্রবেশদ্বারে ঝোলানো তাজা রজনীগন্ধার তীব্র সুবাস আর উৎসবের আমেজ যেন এক মুহূর্তের ঘূর্ণিঝড়ে লণ্ডভণ্ড হয়ে চরম বিষাদে রূপ নিয়েছে। সামিয়া আহসান যখন ধীরপায়ে এগিয়ে এসে পরিচারিকাকে ডেকে বেলাকে ভেতরের ঘরের দিকে নিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিলেন, তখন ওনার নিজের মনের ভেতরও এক অদ্ভুত টানাপোড়েনের তীব্র মানসিক দ্বন্দ্ব কাজ করছিল।
একটুখানি শান্ত মাথায় ভাবলে, বেলার ওপর ওনার ব্যক্তিগত তো কোনো রাগ,বা ক্ষোভ বা ঘৃণা থাকার বিন্দুমাত্র কারণ ছিল না। কনে হিসেবে বেলাকে অপছন্দ করার মতো কোনো খুঁত খোঁজা অসম্ভব। সতেরো ছুঁইছুঁই এই ষোড়শী কন্যা দেখতে বেশ মিষ্টি, শান্ত, আর এক অদ্ভুত মায়াবী ও নিষ্পাপ চেহারার অধিকারী। পড়াশোনায় যেমন ভালো, তেমনই তার চালচলনও অত্যন্ত মার্জিত। সমস্যাটা আসলে বেলাকে নিয়ে নয়; সমস্যাটা ছিল আকস্মিক পরিস্থিতির লিলার মতো একটা চঞ্চল মেয়ের বিয়ের আসর থেকে এভাবে আচমকা নিখোঁজ হয়ে যাওয়া এবং দানিশের মতো জেদি ও আত্মসম্মানবোধ সম্পন্ন ছেলের বাবার ওপর রাগ করে বিয়ের পিঁড়ি থেকে উঠেই নিখোঁজ হয়ে যাওয়া।
তাই সামিয়া আহসান বেলার ম্লান মুখের দিকে তাকিয়ে নিজের স্বভাবসুলভ গাম্ভীর্য বজায় রাখলেও, মুখ ফুটে আর কোনো কঠোর বা তাচ্ছিল্যভরা কথা বলতে পারলেন না। সিনেমার পর্দায় দেখা চেনা ছকের নির্বোধ, কুটিল শাশুড়িদের মতো অহংকারবশত নতুন কনেকে খোঁচা দিয়ে বা তাচ্ছিল্য করে কটূকথা শোনানোর মতো সস্তা ব্যক্তিত্বের মানুষ অন্তত পক্ষে সামিয়া আহসান নন। তিনি উচ্চশিক্ষিত, সুশীল সমাজের একজন মার্জিত ও রুচিশীল নারী হিসেবে নিজের আত্মমর্যাদা ও অন্যের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করতে জানেন। এই চরম বিপদের মুহূর্তেও তিনি বুঝতে পারছিলেন যে, পুরো ঘটনায় এই নিরপরাধ মেয়েটার কোনো হাত নেই; সে কেবল পরিস্থিতির শিকার মাত্র। তিনি শুধু চাইলেন, এই ভয়াবহ মানসিক ধকলের পর মেয়েটা যেন অন্তত কিছুটা সময়ের জন্য হলেও একটু স্বস্তি পায়, নিজের ওপর থেকে এই ভারী গয়না আর পোশাকের বোঝা নামাতে পারলে এখন একটু ভারটা কমবে।
পরিচারিকার পেছনে পেছনে বেলা নিস্প্রাণ পুতুলের মতো ধীর পায়ে ভেতরের অলিন্দের দিকে এগোচ্ছিল, ঠিক তখনই পেছন থেকে মালিহা রহমান ধীর পায়ে মেয়ের দিকে এগিয়ে এলেন। এতক্ষণ সবার উপস্থিতিতে নিজের ভেতরে যে জড়তা আর দ্বিধাবোধ কাজ করছিল, তা ঝেড়ে ফেলে তিনি পা বাড়ালেন। ওনার মনে এক চরম ভয় আর সংকোচ কাজ করছিল জেদি রাগচটা আর অভিমানী মেয়েটা যদি এই রাগের মাথায় সবার সামনে এমন কিছু বলে বা করে বসে, যাতে ওনার এত বছরের তৈরি করা সম্মান এক মুহূর্তে ধুলোয় মিশে যায়! লোকলজ্জা আর অপমানের ভয়টাই ওনার কাছে তখন বড় হয়ে উঠেছিল।
মায়ের চেনা হাতের ছোঁয়া বেলার কাঁধে পিঠের ওপর পড়তেই বেলার পুরো শরীরটা যেন এক তীব্র ঘৃণায় আর রাগে আড়ষ্ট, শক্ত হয়ে গেল। মালিহা রহমান বেলার কাঁধের ওপর আলতো করে হাত রেখে চারপাশটা একবার দেখে নিয়ে নিচু ও অনুনয় জড়ানো গলায় বললেন,
"বেলা... শান্ত হ মা। যা হওয়ার, তা তো চোখের পলকেই হয়ে গেছে। এখন আর পেছনের দিকে তাকিয়ে লাভ কী? দেখ, আমি আজ এখানে যা কিছু করেছি, তা সম্পূর্ণ তোর ভবিষ্যৎ ভালোর কথা চিন্তা করেই করেছি। পৃথিবীর কোনো মা কি কখনো তার নিজের সন্তানের খারাপ চাইতে পারে? বল? আমিও তো তোর মা। তেমনি আমিও চাইনি আমার একমাত্র মেয়ের জীবনে কোনো বড় বিপর্যয় বা খারাপ কিছু ঘটুক। তাই বিয়েটা যেভাবেই, বা যে পরিস্থিতির মাঝেই সম্পন্ন হয়েছে না কেন। তা আল্লাহর বিধান মনে করে মেনে নে। আর এখন নিজের মনটাকে শক্ত কর।"
মায়ের মুখ থেকে ভবিষ্যৎ ভালো আর মায়ের ভালোবাসা’র মতো গালভরা শব্দগুলো শুনে বেলার ভেতরের সুপ্ত আগ্নেয়গিরিটা যেন আচমকা ফেটে পড়ল। সে এক ঝটকায় মালিহা রহমানের হাতটা নিজের কাঁধ থেকে সরিয়ে দিল। বেলার চোখের জলের দাগ এতক্ষণে শুকিয়ে চামড়ায় টান ধরেছে, আর সেই শুষ্ক চোখে এখন আর কোনো দুর্বলতা বা কান্নার লেশমাত্র নেই; সেখানে এখন কেবল জমা হয়ে আছে বছরের পর বছর ধরে পুষে রাখা তীব্র ক্ষোভ, অবহেলা আর বুকভরা অভিমানের জ্বলন্ত অঙ্গার।
বেলার সাথে তার জন্মদাত্রী মায়ের সম্পর্কটা যে কোনোকালেই স্বাভাবিক বা মধুর ছিল না, তা এই পরিবারের আর কারো অজানা নয়। বেলার বয়স যখন মাত্র আট বছর, তখন তার বাবার আকস্মিক বিচ্ছিন্নের পর মালিহা রহমান একাকীত্ব আর জীবনের অনিশ্চয়তার অজুহাতে আসিফ আহসানকে দ্বিতীয় বিয়ে করেছিলেন। আট বছরের একটা অবুঝ, মাতৃহীনপ্রায় শিশুকে নিজের স্বার্থে, নিজের নতুন জীবনের সুখের জন্য এভাবে ফেলে চলে যাওয়াটা বেলা কোনোদিনই তার মন থেকে মেনে নিতে পারেনি, ক্ষমা করতে পারেনি।
যদিও বেলার সৎ বাবা আসিফ আহসান অত্যন্ত সজ্জন এবং দয়ালু মানুষ; তিনি বেলাকে নিজের গর্ভজাত মেয়ের মতোই স্নেহ, আদর আর ভালোবাসায় আগলে রাখতে চেয়েছিলেন কেননা ভদ্রলোকের কোনো সন্তান ছিলো না। কিন্তু মায়ের প্রতি বেলার ভেতরের সেই যে গভীর ক্ষত আর দূরত্ব তৈরি হয়েছিল, তা সময়ের সাথে সাথে কমার বদলে আরো প্রকট হয়েছে। তীব্র অভিমানে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে বেলা তার মায়ের এই রাজপ্রাসাদসম নতুন সংসারে না থেকে, চিরকালের জন্য নিজের নানার বাড়ির সাধারণ পরিবেশেই আশ্রয় নিয়েছিল। এর আগে মাত্র দু-একবার বিশেষ পারিবারিক প্রয়োজনে সে এই আহসান মঞ্জিলের চৌকাঠ মাড়িয়েছিল, তাও ছিল নামমাত্র সময়ের জন্য।
কিন্তু অতীতের সব রাগ আর ক্ষোভের উত্তাপকে ছাপিয়ে আজ নিজের মায়ের ওপর বেলার ভেতরের রাগের পারদ থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে সর্বোচ্চ সীমায় পৌঁছে গেছে। আপাতত লিভিং রুমে এখন আর কেউ নেই; বাইরের অতিথিরা অনেক আগেই বিদায় নিয়েছে আর বাড়ির বাকি সদস্যরাও ক্লান্ত ও বিপর্যস্ত শরীরে নিজ নিজ ঘরের গন্তব্যে চলে গেছেন। ফাঁকা, নিস্তব্ধ সেই বিশাল হলের মাঝে বেলা নিজের পা দুটোকে জোর করে থামিয়ে দিল। সে নিজের হাত দুটো মুঠো করে, দাঁতে দাঁত চেপে নিজের অবাধ্য রাগটাকে নিয়ন্ত্রণে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করল, কিন্তু নাহ্,আজ সে পুরোপুরি বিফল। বেলার দুচোখ ফেটে যেন আগুন বেরোচ্ছে। সে তার মায়ের দিকে রাগে লাল হয়ে যাওয়া চোখে সরাসরি তাকিয়ে অত্যন্ত শক্ত, ধারালো নিখুঁত উচ্চারণে বলল,
"তুমি তো ঠিক এটাই চেয়েছিলে, তাই না মা? নিজের মেকি সামাজিক মর্যাদা, নিজের স্বার্থ আর অন্ধ জেদ বজায় রাখার জন্য আজকে আমাকে এভাবে একটা সম্পূর্ণ অপরিচিত, নিকৃষ্ট জায়গায় এনে বলির পাঁঠা বানিয়ে দিলে? তুমি কি একবারও, মাত্র এক সেকেন্ডের জন্যও আমার কথা ভেবেছ মা? হ্যাঁ, জিজ্ঞেস করছি তোমাকে’ ভেবেছ কি একবারও এই বেলার কথা? ভাবনি মা ভাবনি? জন্ম নেওয়ার পর থেকে সবসময় তো নিজের ইচ্ছা, নিজের সিদ্ধান্তটাই আমার ওপর জোর করে চাপিয়ে দিয়ে আসছ। আর আজও তার কোনো ব্যতিক্রম করলে না! শেষ পর্যন্ত সেটাই হলো, যেটা তুমি আর তোমার এই তথাকথিত সমাজ চাইল।"
থেমে বেলা বুকভরে একটা তপ্ত শ্বাস নিয়ে গলার আওয়াজ আরো এক ধাপ চড়িয়ে বলল,
"কেন মা? আমার কি নিজের কোনো স্বাধীনতা নেই? আমার কি নিজের কোনো পছন্দ-অপছন্দ বা বেঁচে থাকার ইচ্ছা থাকতে নেই? আচ্ছা, আজকে একটা কথা পরিষ্কার করে বলো তো, তোমার এই সাজানো জীবনে আমার মূল্যটা ঠিক কতটুকু? আমি কি এতটাই সস্তা আর অমূল্যহীন তোমার কাছে? ওহ, আমি তো ভুলেই গিয়েছিলাম, আমার মূল্য তোমার কাছে কতটুকু হবে তা তো অনেক আগেই প্রমাণিত! সেই ছোট্টবেলায়, যখন আমার বয়স মাত্র আট বছর কিছু বোঝাল ওঠার বয়সও হয়নি, তখন তো তুমি এই আট বছরের মেয়েটাকে একলা, অসহায় অবস্থায় ফেলে রেখে নিজের নতুন সংসার বাঁধতে চলে এসেছিলে। তখন যেহেতু আমার প্রতি তোমার কোনো মাতৃত্ব বা দায়িত্ববোধ জাগেনি, তাহলে আজ কিসের এত মাতৃত্ব দায়িত্ববোধ দেখাতে আসছ? যখন তোমাকে আমার সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ছিল, রাতের অন্ধকারে যখন একা একা কেঁদেছি, তোমার অপেক্ষায় দিন গুণেছি, তখন কোথায় ছিলে তুমি? তখন তো তুমি পাশে ছিলে না! তাহলে এখন কেন এসেছ আমার অভিভাবক সাজতে? মনে রেখো মা, তোমার কোনো সাহায্য বা দায়িত্বের প্রয়োজন আমার কোনোদিন পড়বে না। তারপরও কেন তুমি বারবার আমার শান্ত জীবনে ফিরে এসে আমার জীবনটাকে এই দুর্বিষহ নরক বানিয়ে তুললে? কেন মা? কেন? কেন করলে এমন?"
কথাগুলো বলতে বলতে বেলার গলার স্বর ভেঙে এল। সে আর নিজের আবেগ ধরে রাখতে পারল না। মালিহা রহমানের দুই কাঁধ নিজের দুই হাত দিয়ে শক্ত করে চেপে ধরে, ঝাঁকুনি দিতে দিতে অঝোরে কান্না শুরু করল বেলা। এতক্ষণের ধরে রাখা শক্ত বাঁধটা ভেঙে সে বিলাপের সুরে ভাঙা গলায় কথাগুলো উগরে দিতে লাগল।
মালিহা রহমান মেয়ের এই তপ্ত, ধারালো সত্য কথার তীরের সামনে একেবারে পাথর বনে গেলেন। ওনার মুখের সমস্ত যুক্তি যেন এক নিমেষে হারিয়ে গেল। বেলার প্রতিটি কথাই তো সত্যের এক একটি নির্মম রূপ! সত্যিই তো, সেদিন তিনি এক চরম অনিশ্চয়তার মুখে দাঁড়িয়ে নিজের এই ছোট্ট মেয়েটাকে ফেলে চলে এসেছিলেন। বেলার বাবার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন হওয়ার পর ওনার পুরো জীবনটা ওলটপালট হয়ে গিয়েছিল, স্বামীর পরিবারের সাথে সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর তিনি তীব্র মানসিক অবসাদে বলতে গেলে ডিপ্রেশনের শিকার হয়েছিলেন। লাইফটা তখন ওনার কাছে এতটাই দুর্বিষহ আর অন্ধকার হয়ে উঠেছিল যে, তিনি এক প্রকার নিরুপায় হয়েই নিজের জীবনের সুরক্ষার জন্য স্বার্থপরের মতো সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। যার ফলে সেই অবুঝ মেয়েটার প্রতি মায়াটুকুও ওনার মনে স্থান পায়নি।
যদিও পরবর্তীতে তিনি বেলাকে নিজের সাথে এই বাড়িতে এনে রাখতে চেয়েছিলেন, কিন্তু বেলার ভেতরের তীব্র জেদ আর মায়ের প্রতি জমে থাকা পাহাড়সম অভিমানের কারণে সে আসেনি। সে তার মায়ের প্রতি এতটাই ঘৃণা আর অভিমান পুষে রেখেছিল যে, মায়ের সাথে সব ধরনের যোগাযোগ ও কথা বলা সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিয়েছিল। সেই আট বছর বয়স থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত মা-মেয়ের এই আলগা সম্পর্কটা ধীরে ধীরে আরো গভীর অবনতির দিকে ধাবিত হয়েছে।
কিন্তু আজ মালিহা রহমান যা করেছেন, তা কোনো আবেগের বশে করেননি। তিনি ঠান্ডা মাথায় ভেবে দেখেছেন যে, লিলার মতো একটা মেয়ে ঘর ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার পর এই ধনী ও প্রভাবশালী আহসান পরিবারের বড় ছেলের বিয়ে যদি ভেঙে যায়, তবে তার আঁচ ওনার নিজের সংসারেও এসে পড়বে। তার চেয়ে বড় কথা, বেলার মতো একটা পিতৃহীন মেয়ের বিয়ে যদি এই রাজকীয় বংশের একমাত্র ছেলের সাথে হয়ে যায়, তবে বেলার ভবিষ্যৎ আজীবনের জন্য সুরক্ষিত হয়ে যাবে। আজ হয়তো মেয়েটা তাকে ভুল বুঝছে, তাকে পৃথিবীর সবচেয়ে নিষ্ঠুর মা ভাবছে, তাতে ওনার কিছু যায় আসে না। কিন্তু মেয়ের মুখ থেকে এই নির্মম সত্যগুলো শোনার পর ওনার নিজের মনের সুপ্ত কুঠুরিতেও তীব্র কষ্ট, দুঃখ আর এক অব্যক্ত বেদনা যেন মোচড় দিয়ে উঠল। তিনি তো বেলার কোনো ক্ষতি চাননি; মায়ের মন থেকে মেয়ের ভালোর জন্যই তো এত বড় ঝুঁকিটা নিলেন। মেয়েকে কাছে পাবার আর রাখার জন্যইতো এমন করা। ওনার মনে এখনো এক দৃঢ় বিশ্বাস আছে, আজ হয়তো বেলা রাগের মাথায় অন্ধ হয়ে আছে, কিন্তু জীবনের কোনো এক পর্যায়ে গিয়ে সে ঠিকই বুঝতে পারবে যে তার মা সেদিন যা করেছিল, তা বেলার মঙ্গলের জন্যই করেছিল।
মালিহা রহমান নিজের ভেতরের এই অপরাধবোধ আর কান্নাকে আড়াল করে, মুখে এক কৃত্রিম কঠোরতা বজায় রাখার চেষ্টা করলেন অত্যন্ত শান্ত গলায় বললেন,
"পরিস্থিতি এমন এক সংকটের মুখোমুখি এসে দাঁড়িয়েছিল যে, তখন আমার নিজের আর কিছু করার বা ভাবার অবকাশ ছিল না, বেলা। এখানে স্বয়ং বড় ভাইজান (রাদিল আহসান) নিজে তোর হাত চেয়ে বসেছেন। যে মানুষটার ওপর আমাদের এই পুরো পরিবারের অস্তিত্ব টিকে আছে, ওনার মুখের ওপর আমি ‘না’ বলি কীভাবে? তাছাড়া তখনকার পরিস্থিতি এতটাই উত্তাল ছিল যে, তোকে ছাড়া আর কাউকেই বিকল্প হিসেবে ভাবা যাচ্ছিল না। আর তুই তো তখন আরেক অগটন ঘটালি তাতে তো তোকেই সমাজ আর আমাদের এই দুই পরিবারের সম্মান রক্ষা করতে হতো।"
মালিহা রহমানের মুখে এই পুরোনো আর ক্লিশে সম্মানের দোহাই শুনে বেলা কান্না থামিয়ে অদ্ভুত, তাচ্ছিল্যের হাসি হাসল। চোখের কোণে নোনা জল চিকচিক করলেও ঠোঁটের কোণে সেই বাঁকা তাচ্ছিল্যের হাসির রেখার টান বজায় রেখেই সে বলল,
"পরিবারের সম্মান? কিসের পরিবার? কার পরিবার, হ্যাঁ? এক্সকিউজ মি, মিসেস মালিহা রহমান, এটা আমার পরিবার নয়! আপনি ভুল শব্দ ব্যবহার করলে। এটা হবে আপনার নিজের তৈরি করা, আপনার একার ভালো থাকার পরিবার। বুঝলেন? আমার কোনো পরিবার নেই।"
বেলা একটা দীর্ঘ ও তিক্ত দীর্ঘশ্বাস ফেলে একটু থামল, তারপর চারদিকের বিশাল দেয়ালগুলোর দিকে তাকিয়ে আবার বলল,
"কী অদ্ভুত আর নির্মম নিয়তি, দেখেছন মা? যে বাড়ির ছায়া পর্যন্ত আমি আমার জীবদ্দশায় কোনোদিন মাড়াতে চাইনি, আজ ভাগ্যের কোন পরিহাসে আপনি নিজের হাতে আমাকে এই সোনার খাঁচায় চিরদিনের জন্য বন্দি করে দিলেন!"
আসলে ভাগ্যের এক অদ্ভুত এবং নির্মম রসিকতা লুকিয়ে ছিল এই আকস্মিক বিয়ের সমীকরণে। মালিহা রহমানের দ্বিতীয় স্বামী, অর্থাৎ বেলার সৎ বাবা আসিফ আহসান হলেন এই আলিশান আহসান ভিলার ছোট কর্তা এবং বাড়ির বড় কর্তা রাদিল আহসানের আপন ছোট ভাই। সেই সুবাদে মালিহা রহমান সম্পর্কে রাদিল আহসানের ছোট ভাইয়ের বউ, অর্থাৎ এই বাড়ির ছোট বউ। এতকাল বেলা তার মায়ের এই নতুন শ্বশুরবাড়ির নাম শুনলে নাক সিটকাত, নিজেকে এই আভিজাত্যের আড়ালে থাকা জটিল পরিবারটি থেকে শত হাত দূরে সরিয়ে রাখত। অথচ আজ ভাগ্যের চাকা এমন এক নাটকীয় মোড় নিল যে, খোদ রাদিল আহসানের একমাত্র ছেলে এবং এই বংশের উত্তরসূরি দানিশ আহসানের সাথেই তার বিয়ে হয়ে গেল! অর্থাৎ, মায়ের ছোট জা হিসেবে থাকা নতুন শ্বশুরবাড়িই এখন বেলার নিজের খোদ প্রধান শ্বশুরবাড়ি হয়ে দাঁড়াল। সম্পর্কে যে মালিহা রহমান ওনার মা, এখন থেকে এই বাড়ির আইন অনুযায়ী তিনি বেলার ছোট চাচি শাশুড়িও বটে! সম্পর্কের এই জটিল ও অদ্ভুত জটলা বেলার কাছে এক বিরাট প্রহসন মনে হতে লাগল।
বেলার এই ধারালো, যুক্তিপূর্ণ এবং অবাধ্য কথাবার্তা শোনার পর মালিহা রহমানের মুখটা ক্ষণে ক্ষণে ফ্যাকাশে আর রক্তহীন হয়ে গেল। ওনার বলার মতো আর কোনো ভাষা অবশিষ্ট রইল না। তিনি খুব ভালোভাবেই বুঝতে পারলেন মা-মেয়ের মাঝখানের যে ফাটলটা এত দিন ধরে অবহেলা আর দূরত্বের কারণে একটু একটু করে আলগা হয়েছিল, আজকের এই জোরপূর্বক বিয়ের ঘটনার পর তা আর জোড়া লাগার নয়। এই ঘটনা তাদের দুজনের সম্পর্ককে এক নতুন, বিশাল ও চিরকালের মতো এক অপূরণীয় দূরত্বে রূপ দিল।
বেলা আর নিজের সময় নষ্ট করতে চাইল না; মায়ের ফ্যাকাশে মুখের দিকে শেষবারের মতো এক তীব্র অবজ্ঞার দৃষ্টি হেনে, নিজের ভারী জড়ি জড়ানো বেনারসির লেহেঙ্গার ওড়নার আঁচলটা এক হাতে শক্ত করে টেনে ধরল। তারপর চোখের জল মুছে হনহন করে সিঁড়ি বেয়ে ওপরের তলার সেই অজানা, অচেনা ঘরের উদ্দেশ্যে সার্ভেন্টের সাথে চলে গেল।
বিশাল লিভিংরুমে একা দাঁড়িয়ে থাকা মালিহা রহমান কেবল মেয়ের চলে যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে রইলেন। ওনার চারপাশটা যেন এক নিমিষেই ফাঁকা হয়ে গেল। বুক চিরে বেরিয়ে আসা এক দীর্ঘ আর অজানা আশঙ্কার দীর্ঘশ্বাস ফেলে তিনি অন্ধকার বারান্দার দিকে চোখ রাখলেন, যার শেষ কোথায় বা এর ভবিষ্যৎ কী তা ওনার নিজেরও জানা নেই।
~~~
রাত তখন গভীর। ঘড়ির কাঁটায় কাঁটায় রাত দুইটা বেজে সাত মিনিট। চারদিকের জমকালো আলো আর কোলাহল এখন স্তিমিত, আহসান ভিলার এক কোণে থাকা বিশাল অন্ধকার স্টোর রুমটিতে তখন কেবলি এক গা ছমছমে নীরবতা। সেই অন্ধকার ঘরের এক কোণে, ধুলোবালির মাঝে অচেতন হয়ে পড়েছিল একটি মেয়ে।
ধীরে ধীরে বাইরের মেঘ কেটে গিয়ে আকাশের চাঁদের আলো জানালার ভাঙা কাচ গলিয়ে ঘরের ভেতর এসে পড়ল। সেই আবছা রুপালি আলোয় অন্ধকার ঘরটির ভেতরটা সামান্য চেনা যাচ্ছিল। লিলার অবশ হয়ে থাকা চোখের পাতা দুটো পিটপিট করে কেঁপে উঠল। মাথাটা ভীষণ ভারী হয়ে আছে, যেন কেউ ওর ভেতরের সব চিন্তা-ভাবনা স্তব্ধ করে দিয়েছে। সে চোখ দুটো পুরোপুরি খোলার আপ্রাণ চেষ্টা করল। চোখ মেলে দেখলো চারপাশের পরিবেশটা তার চেনা নয়। এইটা অনুভব করতেই তীব্র এক অচেনা অনুভূতি আর ভয়ের চাদর যেন তাকে চারদিক থেকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরল।
নিজেক সম্পূর্ণ এক অপরিচিত জায়গায় আবিষ্কার করে সে আঁতকে উঠল। কোনোমতে দুই হাতের ওপর ভর দিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়াতে গেল লিলা। কিন্তু চেষ্টা করতেই পুরো পৃথিবীটা যেন তার চোখের সামনে তীব্র গতিতে চক্কর দিয়ে উঠল। চোখের সামনে সবকিছু অন্ধকার হয়ে এলো এবং পরক্ষণেই সে ধপাস করে আবার ফ্লোরের শক্ত শীতল বুকে আছড়ে পড়ল।
"উফ! আমার মাটাটা এটো তীব্র ব্যটা কচ্ছে কেন? আমি... আমি এখানে কীভাবে এলোম?"
লিলা দুই হাত দিয়ে নিজের মাথাটা শক্ত করে চেপে ধরল। তার মাথায় চট করে একটা চিন্তা বিদ্যুৎ খেলে যাওয়ার মতো ভেসে উঠল আরে আজ তো তার বিয়ে হওয়ার কথা ছিল! দানিশের সাথে তার দীর্ঘদিনের চেনা সম্পর্কের এক অন্য শুভ পরিণতি হওয়ার কথা ছিল আজ। সে তো নিজের ঘরেই পোশাক আর গয়না পরে তৈরি হচ্ছিল। তাহলে বিয়ের সেই আলো ঝলমলে আসর ছেড়ে সে এই ধুলোবালি অন্ধকারে ঘেরা স্যাঁতসেঁতে স্টোর রুমে কীভাবে এসে পৌঁছাল?
লিলার মনের ভেতর একের পর এক প্রশ্ন জাগতে লাগল, কিন্তু কোনোটারই উত্তর তার জানা নেই। শেষ মুহূর্তের কোনো স্মৃতিই সে মনে করতে পারছে না। একটা তীব্র কুয়াশা যেন তার মস্তিষ্ককে গ্রাস করে রেখেছে। সে শুধু মনে করতে পারছে সে নিজের ঘরে একা ছিল, তারপর... তারপর আর কিছুই মনে নেই! উফ,, কি হচ্ছে টা কি তার সাথে?
লিলার ছোটবেলা থেকেই অন্ধকারের প্রতি এক তীব্র ফোবিয়া বা ভয় রয়েছে। এই ঘুটঘুটে অন্ধকার আর নিস্তব্ধতা তার ভেতরের ভয়কে আরও হাজার গুণ বাড়িয়ে দিল। আবছা আলোতে যতটুকু দেখা যায়, সেটার ওপর ভর করেই সে আবার উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করল। হাতড়ে হাতড়ে, দেয়ালে ভর দিয়ে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে কয়েক পা এগোতেই মেঝের ওপর রাখা কোনো এক ভারী লোহার বা কাঠের জিনিসের সাথে তার পায়ের এবং মাথার এক কোণের তীব্র ধাক্কা লাগল।
"আহহহ!" তীব্র ব্যথায় তার মুখ থেকে একটা আর্তনাদ বেরিয়ে এলো। ব্যথার চোটে তার চোখ থেকে নোনা জল গড়িয়ে পড়ল। কিন্তু সেই ব্যথাকেও ছাপিয়ে গেল তার বেঁচে ফেরার এবং এই বন্দিদশা থেকে মুক্তি পাওয়ার তীব্র আকুতি। বুঝে উঠতে পাড়লো না তার সাথে এমন কেনো হলো, তারতো কারো সাথে কোন শত্রুতা নেই, আরে শত্রুতা কি কেউ কেই চিনেনা নিজের মায়ের বোনের পরিবার ছাড়া তাও হাতেগোনা কয়েকজন।
কোনোমতে আবার নিজেকে সামলে নিয়ে লিলা অন্ধকারের মাঝে হাতড়াতে লাগল। কিছু দূর যাওয়ার পর তার হাত একটা কাঠের মসৃণ তলে ঠেকল। অভিজ্ঞতায় সে বুঝল এটা একটা বড় দরজা। দরজার ছোঁয়া পেতেই লিলার অবশ প্রায় প্রাণে যেন নতুন করে স্বস্তির হাওয়া লাগল। লিলা আর এক মুহূর্তও দেরি না করে দুই হাত দিয়ে দরজার ওপর সজোরে আঘাত করতে লাগল এবং চিৎকার করে বলতে লাগল:
"এক্সকিউজ মি! কেউ আছেন বায়রে? হ্যালো... প্লিজ হেল্প মি! প্লিজ কেউ আমাকে এখান টেকে বের করুন! হ্যালো... কেউ আছেন?"
সে অনবরত দরজায় ধাক্কা দিতে লাগল, নখ দিয়ে আঁচড় কাটতে লাগল। এক মিনিট, দুই মিনিট করে প্রায় এক ঘণ্টা কেটে গেল। লিলার গলার স্বর বসে গেছে, শরীর ক্লান্তিতে ভেঙে পড়ছে, কিন্তু বাইরের দিক থেকে কোনো সাড়া শব্দ পাওয়া গেল না। এক ঘণ্টা অনবরত চিৎকার আর চেষ্টার পর বেচারি লিলার শরীর সম্পূর্ণ নিস্তেজ হয়ে এলো। অতঃপর দরজার গোড়াতেই ধপাস করে বসে পড়ল,বুকটা ঘন ঘন ওঠানামা করছিল তীব্র শ্বাসকষ্টে।
ঠিক সেই সময়ে, আহসান ভিলার মূল ভবনের অন্য প্রান্তে তিনজন পরিচারক সমস্ত রুমগুলো একে একে চেক করছিল। বিয়ের বিশাল অনুষ্ঠানের পর কোনো মূল্যবান জিনিসপত্র বা দরকারি সামগ্রী কোথাও ফেলে রাখা হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত করাই ছিল তাদের কাজ। তারা প্রতিটি খালি ঘরের লাইট জ্বালিয়ে দেখছিল এবং লক করে দিচ্ছিল।
তাদের মধ্যে শফিক নামের অভিজ্ঞ লোকটি হঠাৎ থামলেন। তিনি তার সাথে থাকা তরুণ পরিচারক শাকিলকে উদ্দেশ্য করে গম্ভীর গলায় বলল,
"এই শাকিল, ওই কোণের দিকে দেখ তো, কিছু বাড়তি জিনিসপত্র আর ডেকোরেশনের সামান পড়ে আছে। ওইগুলা সব এক জায়গায় কর আর কষ্ট করে এই স্টোর রুমে রেখে আয়। দেখিস না আবার ভেঙে টেঙে ফেলিস না। "
"আচ্ছা ভাই, রাখছি," শাকিল বাধ্য ছেলের মতো বলল।
সে মেঝের ওপর থেকে জিনিসগুলোর বাক্স দুই হাতে তুলে নিয়ে করিডোর বেয়ে স্টোর রুমের দিকে রওনা দিল। স্টোর রুমের দরজার সামনে এসে পকেট থেকে চাবি বের করে তালাটা খুলল সে। ভেতরে অন্ধকার থাকায় সে বেশি দূর না গিয়ে দরজার কাছেই জিনিসগুলো নামিয়ে রাখল। এরপর দরজাটা আবার টেনে এনে তালাটা আটকে দিয়ে যেই না চলে যেতে যাবে, অমনি তার কানের পাশ দিয়ে একটা অদ্ভুত, খসখসে শব্দ ভেসে এলো।
শাকিল থমকে দাঁড়িয়ে গেল। সে এক পলক পেছনে তাকাল। কিন্তু করিডোরের মৃদু আলো ছাড়া আর কিছুই তার চোখে পড়ল না। মনে মনে ভাবল,
‘ধুর! রাত অনেক হয়েছে, ঘুমে চোখ জড়িয়ে আসছে। হয়তো মনের ভুল। তাছাড়া ইঁদুর টিদুর হবে হয়তো। ’ তাই আবার উল্টো ঘুরে চার-পাঁচ কদম এগিয়ে যেতেই এবার অত্যন্ত স্পষ্ট একটা মানুষের গলার ক্ষীণ আওয়াজ তার কানে এলো। গভীর রাতে এমন পরিত্যক্ত জায়গায় মানুষের গলার আওয়াজ শুনে শাকিল স্বাভাবিকভাবেই ভীষণ ঘাবড়ে গেল। তার গায়ের লোম যেন খাড়া হয়ে উঠল।
এমন সময় দূর থেকে শফিক তার দেরি দেখে ক্ষুব্ধ স্বরে ডেকে উঠল, "ওই কি রে শাকিল! হলো তোর? তাড়াতাড়ি আয়, ঘুমাবি না? ওখানে ওমন মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে কী করছিস? জিনিসপত্র রেখে এসেছিস তো?"
শফিকের গলার আওয়াজ পেয়ে শাকিল প্রায় দৌড়ে ওনার দিকে এগিয়ে গেল। ওনার হাতটা শক্ত করে ধরে ফিসফিস করে কাঁপানো গলায় বলল, "শফিক চাচা... ওই স্টোর রুমে কেউ আছে মনে হয়! একটু ভালো করে দেখুন না। এই নিশি রাতে ওই অন্ধকার ঘরে কে থাকবে বলুন? নির্ঘাত কোনো প্রেতাত্মা বা ভূত-প্রেতের কাণ্ড!"
শফিক শাকিলের কথা শুনে হোহো করে হেসে উঠতে গিয়েও চারপাশের গম্ভীর পরিবেশের কথা চিন্তা করে চেপে গেল। সে ধমকের সুরে বলল,
"এই কী বলছিস যা তা ফালতু কথা! কিছু উল্টাপাল্টা খেয়ে আসিসনি তো আবার? হ্যাঁ? আমি এত বছর ধরে এই আহসান মঞ্জিলে কাজ করছি, আজ পর্যন্ত এমন কোনো অলৌকিক কিছু দেখলাম না। আর তুই আজ নতুন এসে ভূতের গল্প ফাঁদছিস? চল, ঘুমাতে চল।"
"কিন্তু শফিক ভাই, আমি সত্যি বলছি..." শাকিলকে পুরো কথা শেষ করতে না দিয়েই শফিক আবার বললেন,
"আরে চল তো, বেশি কথা বলিস না। সকালে আবার জলদি উঠতে হবে। কয়েক ঘণ্টা না ঘুমালে শরীর খারাপ করবে। আয় তো বাবা।"
শাকিল আর কিছু বলার সাহস পেল না। কিন্তু তারা দুজনে যেই না পা বাড়াবে, তখনই আবার সেই স্টোর রুমের দিক থেকে কাঠের ওপর ধুপধাপ আঘাতের শব্দ ভেসে এলো। এবার শুধু শাকিল নয়, শফিক নিজেও স্পষ্ট সেই শব্দ শুনতে পেলেন। ওনার নিজের ভেতরের অবহেলা এবার এক নিমেষে কেটে গেল। ওনার কপাল যেন চিন্তার রেখায় কুঁচকে গেল।
শাকিল ভয়ে ওনার পেছনে লুকিয়ে বলল, "শফিক চাচা, এই দেখুন! আমি বলেছিলাম না? এখন নিজেই দেখুন আবার শব্দ আসছে! আমি আগেই ভেবেছি এতো বড় মহল যেখানে নিশ্চয়ই এমন প্রেতাত্মা তো থাকবেই। "
শফিক এবার বেশ গম্ভীর হয়ে তাকালেন সামনের দিকে ও সতর্কও হলেন বঠে। তিনি ধীর পায়ে সেই অন্ধকার করিডোর ধরে স্টোর রুমের দরজার দিকে এগিয়ে গেলেন যেখানটায় থেকে আওয়াজ ভেসে আসছে। শাকিলও ওনার পেছনে আঠার মতো লেগে রইল। দরজার একদম কাছাকাছি গিয়ে শফিক একটু গলার আওয়াজ চড়িয়ে জিজ্ঞেস করলেন,
"কে? কে ওখানে? ভেতরে কি কেউ আছো?"
ওনার কথা শেষ হতে না হতেই ভেতর থেকে দরজায় নতুন করে তীব্র আঘাত করা হলো। সাথে সাথে একটা অত্যন্ত দুর্বল স্পষ্ট মেয়েলি কণ্ঠস্বর ভেসে এলো
"হেল্প... হেল্প মি! এই যে বাইরে কেউ আছেন? আমাকে শুনটে পাচ্ছেন? প্লিজ আমাকে এখান টেকে বের করুন! প্লিজ!"
এত রাতে স্টোর রুমের ভেতর থেকে এমন স্পষ্ট মেয়েলি কান্নার আওয়াজ শুনে দুজনেই চরমভাবে অবাক হলো। শফিক আর এক সেকেন্ডও নষ্ট না করে শাকিলকে নির্দেশ দিলেন,
"শাকিল, তাড়াতাড়ি কর! দরজার তালাটা খোল!"
শাকিল কাঁপতে কাঁপতে পকেট থেকে চাবি বের করল। ভয়ে তার হাত কাঁপছিল, যার কারণে চাবিটা তালার ছিদ্রে ঢুকতে চাইছিল না। কোনোমতে জোর করে সে তালাটা খুলে দিল এবং দরজাটা এক টানে মেলে ধরল।
দরজা খুলতেই ঘরের ভেতরের আবছা আলো-আঁধারির মাঝে তারা দেখতে পেল একটি মেয়ে অত্যন্ত জরাজীর্ণ অবস্থায় মেঝে থেকে ওঠার চেষ্টা করছে। মেয়েটির পরনে ছিল আধুনিক একটা ঢিলেঢালা কার্গো প্যান্ট আর ওপরে একটা শর্ট কুর্তি। সারা শরীরে এবং কাপড়ে স্টোর রুমের জমে থাকা বছরের পর বছরের পুরনো ধুলোবালি আর মাকড়সার জাল লেগে আছে। ধুলোর কারণে মেয়েটি অনবরত কাশছিল।
শাকিল পরিস্থিতি বেগতিক দেখে দ্রুত করিডোরের দেয়ালের মেইন সুইচবোর্ড থেকে স্টোর রুমের বাইরের বারান্দার বড় বড় লাইটগুলো জ্বালিয়ে দিল। আলো জ্বলে ওঠার সাথে সাথে মেয়েটির চেহারা একদম পরিষ্কারভাবে দৃশ্যমান হলো।
মেয়েটি দেখতে অত্যন্ত ফর্সা ও সুন্দরী, কিন্তু এই মুহূর্তে তার চোখ-মুখ ফুলে একাকার হয়ে আছে। দীর্ঘ সময় ধরে তীব্র অন্ধকার আর ভয়ের মাঝে অনবরত কান্নাকাটি করার কারণে তার চোখের নিচে কালচে দাগ পড়ে গেছে। সে প্রচণ্ড ভয়ে কাঁপছিল এবং ঘন ঘন বড় বড় শ্বাস নিচ্ছিল, যেন তার শরীরে অক্সিজেনের তীব্র অভাব দেখা দিয়েছে, আর হবেই বা না কেন নাইক্টোফোবিয়া আছে তার ।
শফিক সাহেব মেয়েটির মুখের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন। ওনার চোখের মণি দুটো চড়কগাছে উঠে গেল। তিনি নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিলেন না। বিস্ময়ে ওনার মুখ থেকে বেরিয়ে এলো,
"লিলা ম্যাম! আপনি? ম্যাম, আপনি এখানে কী করে এলেন? আর রুমের বাইরে তো তালা দেওয়া ছিল, তাহলে আপনি ভেতরে কীভাবে ?"
শাকিলও লিলার কাছে এসে ওর এই অবস্থায় দেখে চরম অবাক কণ্ঠে বলে উঠল,
" মানে এনি সেই যে নিখোঁজ যার সাথে দানিশ স্যারের বিয়ে হওয়ার কথা ছিলো? লিলা ম্যাম! আপনি না বিয়েবাড়ি থেকে পালিয়ে গিয়েছিলেন? তাহলে এই বন্ধ স্টোর রুমে আপনি কী করছেন? আপনাকে খোঁজার জন্য সেই দুপুর থেকে বাড়ির সবাই, বড় স্যার থেকে শুরু করে পুলিশ পর্যন্ত হয়রান হয়ে গেছে! আর আপনি এখানে এভাবে আটকে ছিলেন আল্লাহ?"
এই দুজনের একের পর এক প্রশ্ন আপাতত লিলার কানে পৌঁছাচ্ছিল না। তার মস্তিষ্ক এখনো সেই তীব্র ভয়ের ট্রমা থেকে বের হতে পারেনি। লিলা শুধু বুঝতে পারছে সে বেঁচে আছে এবং আলোর মুখ দেখেছে। তীব্র তৃষ্ণায় তার বুক ফেটে যাচ্ছিল। সে অত্যন্ত অস্ফুট স্বরে, প্রায় ফিসফিস করে কোনোমতে বলল,
"ও..ওয়া-টার...প্লী-জ.... গিভ মি.. আই নীড সাম ওয়া-টার....প...প্লী-জ......"
শফিক সাহেব লিলার এত মৃদু কণ্ঠের ভাষা কথা ঠিক বুঝতে না পারলেও, শাকিল ঠিকই ধরে ফেলল যে ম্যাম পানি চাচ্ছেন। সে আর এক মুহূর্তও দাঁড়িয়ে না থেকে ডাইনিং রুমের দিকে তীব্র গতিতে দৌড়ে গেল। চার মিনিটের মাথায় ডাইনিং টেবিলে গিয়ে সে একটা কাচের বড় জগ আর গ্লাস হাতে তুলে নিল।
তাকে এভাবে হন্তদন্ত হয়ে পানি নিতে দেখে ডাইনিংয়ের দায়িত্বে থাকা প্রবীণ পরিচারিকা ববিতা কৌতূহলী হয়ে কিছু বলতে যাচ্ছিল। কিন্তু তাকে থামিয়ে দিয়ে শাকিল এক নিঃশ্বাসে বলে উঠল, "ববি আপা! আপনি এখনই কয়েকজন মহিলা পরিচারিকাকে সাথে নিয়ে ওই পেছনের স্টোর রুমের সিড়ির দিকে তাড়াতাড়ি আসুন তো! লিলা ম্যামকে পাওয়া গেছে! উনি পেছনের ওই অন্ধকার স্টোর রুমে আটকে ছিলেন!"
শাকিলের কথা শুনে ববিতার হাত থেকে প্লেট পড়ে যাওয়ার উপক্রম হলো। ও চিৎকার করে বলল,
"কী বলছিস তুই শাকিল? লিলা ম্যামকে পাওয়া গেছে? সত্যি বলছিস?"
"হ্যাঁ আপা, হ্যাঁ! আপনি জলদি করুন। কয়েকজন মহিলাকে পাঠান। ম্যামের অবস্থা একদম ভালো না, শরীর ভীষণ দুর্বল আর কাপড়ে ধুলোবালি লেগে আছে। ওনাকে ধরে ভেতরে আনতে হবে। আর আপনি নিজে গিয়ে বড় স্যার আর বড় ম্যাডামকে এই খবরটা দিন। ওনারা হয়তো রুমে এখনো চিন্তায় মরে যাচ্ছেন।"
"হ্যাঁ, হ্যাঁ, শাকিল আমি এখনই যাচ্ছি! তুই জলদি পানি নিয়ে যা, আমি সবাইকে খবর দিচ্ছি,"
ববিতা আর এক মুহূর্তও নষ্ট করলো না ও ভেতরের মহলের দিকে ছুটতে লাগল।
প্রথমে কয়েকজন পরিচারিকাকে স্টোর রুমের দিকে পাঠিয়ে দিল লিলার দেখভালের জন্য। আর নিজে বুকভরা উত্তেজনা আর আতঙ্ক নিয়ে সামিয়া আহসান এবং রাদিল আহসানের ঘরের দিকে দৌড়াল, এই চরম অবিশ্বাস্য খবরটি সবার কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য।
[ বি:দ্রঃ আজকের পর্ব কিন্তু চার হাজার বড় একটা পর্ব দিয়েছি। সুন্দর মতামত করবেন, আর হে আমি কালকেই গল্প দিয়ে দিতাম কিন্তু কালকে থেকে লোডশেডিং এতো পরিমানে দিচ্ছে তা বলার বাহিরে তাই আমিও বসে বসে গল্প লিখতে লিখতে বড় একটা পর্ব করে ফেলেছি খুশি তো এইবার আপনারা। তাহলে বেশি বেশি রিঅ্যাক্ট কমেন্ট করবেন যাতে পরবর্তী পর্ব সক্কাল সক্কাল লিখে ফেলতে পারি, ধন্যবাদ আপনাদেরকে। ]
ক্রমশ......