ফন্ট সাইজ:
থিম:
হৃদতরঙ্গের নিঃশব্দী সুর

১ম পর্ব

লেখক: তাহিরাহ্ই রাজ

" নিজের অপকর্ম লুকাতে শেষমেষ বিয়ের মতো পবিত্র এক সম্পর্ককে হাতিয়ার বানালেন, মির্জা তানসীভ শাহ্? "

বিশালাকার, অভিজাত ডুপ্লেক্স বাড়ির বাইরে স্থির দাঁড়িয়ে কালো রঙা গাড়িটি। কৃত্রিম রঙ বেরঙের আলো ছড়িয়ে রয়েছে বাড়ির গোটা আঙিনায়। আকস্মিক গাড়ির পেছনাংশের দরজা খুলে গেল। মৃদু, ভূতুড়ে সে শব্দ মিশে গেল বাতাসে। বিন্দুমাত্র কালক্ষেপণ না করে, বড় কদম ফেলে গাড়ি থেকে বেরিয়ে এলো দীর্ঘকায়, পেশিবহুল দেহের অধিকারী পুরুষটি। শ্যাম বর্ণের দেহে জড়ানো আঁটসাঁট কৃষ্ণকালো পাঞ্জাবি। জিন্স প্যান্ট। পাঞ্জাবির হাতা গুটিয়ে তুলে রাখা দু কনুইয়ে। হাতের রগ ফুলে ফেঁপে দৃশ্যমান যেন। গলায় চিকন চেইন। ডান হাতে ব্রেসলেট। চোখের তারায় গম্ভীরতার কালো গহ্বর। বাড়ির দৈত্যকায় বড় ফটক ভেতর থেকে আঁটকে রাখা। সতর্ক চাহনিতে পাহারায় দু'জন ওয়াচম্যান। বাইরে অপেক্ষায় অনেকগুলো কৌতূহলী মুখ। তাদের মধ্যে মিডিয়ার লোকদের অভাব নেই। তেমনই একজন সাংবাদিক থেকে উক্ত প্রশ্নটি নি-ষ্ঠুর তীরের ন্যায় ছুঁড়ে দেয়া হয়েছে। যা স্পষ্ট আঘাত হেনেছে মির্জা তানসীভ শাহ্ এর কানে। হাতের মুঠো শক্ত। চাপ দাঁড়িতে আবৃত কঠোর চোয়াল। দু ভ্রুয়ের নিচে চক্ষু জোড়ায় জ্ব'লছে অগ্নিকুণ্ড। শিরা উপশিরায় দপদপ করছে ক্রো'ধ। নিঃশব্দে, বিনা বাক্য ব্যয়ে তানসীভ বড় বড় কদম ফেলে বাড়ির দিকে এগিয়ে গেল। সিঁড়ির চার কদম ডিঙিয়ে পৌঁছে গেল দোরগোড়ায়। সেথায় দাপুটে ভঙ্গিতে পিঠে দু'হাত বেঁধে, শিরদাঁড়া টানটান সোজা রেখে নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে পাঞ্জাবি পরিহিত জহুরুল সাহেব। মির্জা জহুরুল শাহ্। তানসীভ বাঁ কাঁধে মুখখানি এনে আব্বার দিকে তাকালো। দু জোড়া অগ্নি ঝড়া চক্ষুর সাক্ষাৎ হলো। মুখে শব্দ নেই। উত্তেজনা বইছে হৃদযন্ত্রে। ক্ষণিকের জন্য চোখের ভাষায় স্বল্প, গুরুগম্ভীর আলাপণ হলো যেন। অতঃপর দ্রুততার সাথে দৃষ্টি সরিয়ে নিলো তানসীভ। প্রবেশ করলো বাড়িতে। ' গুলবাহার মঞ্জিল ' এ। ওদিকে তখনো কালো রঙা গাড়িটির অভ্যন্তরে বসে রয়েছে সে রমণী। ভেজা চোখে অবলোকন করে চলেছে সবটুকু। দেখে নিলো তার সদ্য বিবাহিত স্বামীর হৃদয়হীন আচরণ।

•

সময় তখন প্রায় মধ্যরাত। ঘরের অভ্যন্তরে অতি আদরে ছড়িয়ে রয়েছে নরম আলো। বিছানার ওপরাংশে সিলিং বেয়ে ঝুলন্ত ছোট ছোট ফেইরি লাইট। যার ঝিকিমিকি আলোয় ঘরে ছড়াচ্ছে স্বপ্নিল এক আভা। বিছানার দু'পাশে দেয়ালে ঝোলানো রয়েছে হালকা গোলাপি ও সোনালি রঙের স্বচ্ছ কাপড়ের ড্রেপ। যেন আলো আঁধারির সঙ্গে মিলেমিশে নীরব-নান্দনিক এক উজ্জ্বলতা তৈরি করছে এরা। বিছানার চারিপাশ ঘিরে রয়েছে ছাউনি টানা সাদা নেট। নরম শিহরণ জাগানিয়া গোলাপের পাপড়ি ছড়িয়ে রয়েছে বিছানায়। মোহনীয় সুগন্ধি পৌঁছাচ্ছে নাসিকা গ্রন্থিতে। বিছানার একপাশে বেড সাইড টেবিলের ওপর রাখা রুপালি ট্রে। যাতে সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে চলেছে সুগন্ধি মোমবাতি। পাশে ছোট্ট কাঁচের বাটি ভর্তি গোলাপের পাপড়ি। পানিতে ভাসমান পাপড়িগুলো খেলায় মত্ত যেন। বিছানার অপর অংশে ড্রেসিং টেবিলের ওপর দৃশ্যমান বড় একটি কাঁচের ফুলদানি। তাতে তাজা টিউলিপ ও গোলাপ সাজানো। ফেইরি লাইটের কৃত্রিম আলোয় ফুলগুলোর রঙ আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। ঘরের বড় জানালায় ভারী পর্দা টেনে দেওয়া। পর্দার ফাঁক গলিয়ে চাঁদের স্নিগ্ধ দ্যুতি, মেঝেতে এক টুকরো রূপালি ছায়া ফেলে রেখেছে।

" এসো ছোট মালকিন। স্বাগতম তোমার নতুন রাজ্যে। "

ঘরের দরজা খুলে গেল। নববধূ লাজুকের আগমন হলো তার নতুন ঠিকানায়। ওকে স্নেহ, আদরের সহিত আগলে রেখেছে বড় জা ইফরাত। সে-ই হাস্যোজ্জ্বল দুষ্টুমিতে মাত্র স্বাগত জানালো ওকে। 'লাজুক' বিনিময়ে হালকা লজ্জা মিশ্রিত হাসি উপহার দিলো। ওর অপর পাশে রয়েছে কিছু ননদ, জা। আপন নয়। নিকটাত্মীয় তারা। সকলে মিলে নতুন বউকে ঘিরে আমোদ করে চলেছে। বড় বড় জায়েরা কিছু দুষ্টুমি মাখা কথা বলছে ওর কানে কানে। লজ্জায় কান গরম হয়ে উঠছে রমণীর। সহসা চমকে উঠলো সকলে! ঘরের বেলকনি হতে আগত মৃদু শব্দ কারোর উপস্থিতি জানান দিচ্ছে। এক ভাবী সহাস্যে বললেন,

" ওরে বাবা! দেবর মশাইয়ের দেখছি তর সইছে না আর। নতুন বউয়ের আগে উনি নিজেই হাজির। "

একযোগে হেসে উঠলো সকলে। ' লাজুক ' হালকা সচেতন হয়ে উঠলো। স্নায়ুতে বয়ে গেল অজানা ভয়, কৌতুহলী শিহরণ। ইফরাত স্নেহের স্বরে বললো,

" লাজুক, আমরা তাহলে আসছি বোন। থাকো তুমি। তোমার উনির বোধহয় তর সইছে না আর। "

মৃদু হাসি, দুষ্টুমির তাল অবশেষে কেটে গেল। একে একে বিদায় নিলো সকলে। ঘরটায় রয়ে গেল লাজুক একাকী। দরজা ওপাশ থেকে চাপিয়ে দেয়া হয়েছে। মেয়েটা বিভ্রান্ত চোখে দাঁড়িয়ে। কি থেকে কি করবে জানা নেই। আজকের এই রাত, এমন পরিস্থিতি জীবনে এই প্রথম যে। সে কি এভাবে দাঁড়িয়ে থাকবে নাকি... বসবে? লাজুক দাঁড়িয়ে রইলো। হালকা নড়েচড়ে ঘরটা দেখতে লাগলো। কিছুটা সময় অতিবাহিত হলো তার নতুন ঠিকানা অবলোকন করতে করতে। আকস্মিক... সশব্দে খুলে গেল বেলকনির চাপিয়ে রাখা দরজা। উদোম ঘামে ভেজা পেশিবহুল দেহ। এলোমেলো চুল। ঠোঁটের ফাঁকে গুঁজে রাখা সিগারেট। নাভীর বেশ কতটা নিচে বিপজ্জনক সীমানায় পড়া ট্রাউজার। ক্লান্ত, শ্রান্ত মুখশ্রী। মির্জা সাহেব দাঁড়িয়ে। এতক্ষণের ফুলেল সুগন্ধ ছাপিয়ে সিগারেটের বিদঘুটে গন্ধ ছড়িয়ে পড়লো ঘরটায়। আস্তে করে নাক চেপে ধরলো লাজুক। চোখেমুখে তার মৃদু অস্বস্তির রেশ। সবটা তীর্যক দৃষ্টিতে লক্ষ্য করলো তানসীভ। সিগারেটের ধোঁয়া ফুঁকতে ফুঁকতে এসে দাঁড়ালো ওর মুখোমুখি। স্থির হয়ে দাঁড়ালো। ঠোঁটের ফাঁক হতে হাতে ঠাঁই পেয়েছে সিগারেট। এক জোড়া সুগভীর-রহস্যঘেরা কালো মণি আটকালো তার নববধূর অবয়বে।

রমণীর গৌর বর্ণ দেহে জড়িয়ে লাল বেনারসীর ভারী আবরণ। যার প্রতিটি নকশা যেন চোখধাঁধানো সোনায় আঁকা। সূক্ষ্ম জরির কাজ শোভা পাচ্ছে শাড়ির ভাঁজে ভাঁজে। লাল রঙা বেনারসীতে সাধারণের ভীড়ে রাজকীয়তার ছাপ। মাথা আবৃত রয়েছে লালচে সোনালী দোপাট্টায়। যার মোলায়েম ভাঁজে ভাঁজে ঢাকা পড়েছে ললনার ঘন কালো চুল-কাঁধ। সোনা রঙা আবেশ জড়িয়ে যেন অঙ্গে। মুখে নেই অতিরিক্ত সাজসজ্জার চাকচিক্য। বরং হালকা ন্যাচারাল মেকআপে ফুটে উঠেছে তার বাস্তবিক-প্রকৃত সৌন্দর্য। গোলাপি আভাযুক্ত গাল, কোমল ঠোঁট আর চোখের গভীরে যেন লাজুকতার অভেদ্য ঝিলিক। লাজুকের এই বেশভূষায় স্পষ্ট দৃশ্যমান সারল্য। তবুও এই সরলতার আবরণেই অপরূপা লাগছে তাকে! তানসীভ ধীরে ধীরে কেমন মোহাচ্ছন্ন হয়ে উঠলো! হঠাৎ মৃদু যন্ত্রনা। সিগারেটের উত্তপ্ততা আঙ্গুল ছুঁতে, ঘোর কেটে গেল। লাজুকের দৃষ্টি কিছুটা অবনত করে রাখা। চোখের সামনে উদোম দেহে পুরুষটি যে দাঁড়িয়ে। তানসীভ দৃষ্টি হটিয়ে ডানে ঘুরে দাঁড়ালো। সিগারেটে আরেকটি সুখটান দিয়ে নীরব রইলো কিছুক্ষণ। বিশ্রী ধোঁয়া মিশে গেল বাতাসে। অতঃপর এমন একটা বাক্য উচ্চারণ করলো, যা নিঃসন্দেহে বিয়ের প্রথম রাতে যেকোনো নববধূর জন্য সম্পূর্ণ স্তব্ধকর!

" এ বিয়েতে আমার মত ছিল না। "

বিয়ের পর দু'জনের একত্রে, নিরিবিলি এই প্রথম সময় কাটানো। আজকের এই মধুর রাত। একটু অন্যরকম। আবেশে সোহাগে কাটানোর কথা। কিন্তু এখানে ঘটছে একদম ভিন্ন কিছু। কিছুটা সময় নীরবেই অতিবাহিত হলো। দু'জনের অন্তঃস্থলের খবর অজানা।

" বিয়েটা করতে চাইনি আমি। "

তানসীভ কঠিন স্বরে আরেকটু তিক্ততা যোগ করলো বুঝি। কিছু মুহূর্ত নীরবে, নিঃশব্দে অতিবাহিত হলো। 'লাজুক' তপ্ত শ্বাস ফেললো। ধীরপায়ে হেঁটে অগ্রসর হলো ড্রেসিং টেবিলের কাছে। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নববধূ। তানসীভের অভিব্যক্তি বোঝা দায়। তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে ওর কার্যকলাপ দেখে চলেছে। লাজুক আস্তে ধীরে দেহে জড়ানো গহনা খুলতে লাগলো। এত ভারী সোনার গহনায় অভ্যস্ত নয় সে। গায়ে কাঁটার ন্যায় ক্ষণে ক্ষণে বিদ্ধ হচ্ছে যেন। যথাসম্ভব দ্রুত গহনাগুলো খুলে ফেললেই আরাম। কিছু মুহূর্ত কেটে গেল। শরীর হতে গহনার ভার সরিয়ে ফেললো মেয়েটা। স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো। বাম হাতের সর্বশেষ চুড়ি খুলতে খুলতে আয়নায় নিজের প্রতিবিম্বে তাকালো এবার। মৃদু কণ্ঠে যা বললো লাজুক, তাতে বিনা সাবধানী বার্তায় পুরো ঘরজুড়ে নিউক্লিয়ার বো-মা বি"স্ফোরণ হলো যেন।

" বিয়েটা... আমিও করতে চাইনি। "

হঠাৎ কানে এলো শঙ্কিত-ধীরস্থির পুরুষালি কণ্ঠস্বর,

' ছোট ভাইজান! '

লাজুক হালকা সচেতন হয়ে উঠলো। ঘরের বাইরে কেউ দাঁড়িয়ে। ডাকছে এই হৃদয়হীন বান্দাকে।

' বড় মালিক আপনাকে ডাকছে। '

তানসীভ বহিরাগত ডাকে সাড়া না দিয়ে, ধীরপায়ে এগোতে লাগলো নববধূর দিকে। আয়নায় স্বামীর লম্বাটে অবয়বে তাকিয়ে মেয়েটা। বুকের ভেতর তীব্র গতির হৃদস্পন্দন। হাঁটি হাঁটি পায়ে একদম ওর বাম পাশে এসে দাঁড়ালো মানুষটা। দু'জনার শরীর ছুঁই ছুঁই প্রায়। অন্তঃস্থলের হাল লুকাতে লাজুক দৃষ্টি অবনত করে নিলো। একটুখানি সরে দাঁড়ালো ডানে। হঠাৎ... মির্জা তানসীভ শাহ্ সশব্দে এক টানে ড্রেসিং টেবিলের সামনে রাখা চেয়ার থেকে হাতে নিলো ধূসর রঙের শার্টটি। শার্টে দু হাত গলিয়ে বোতাম লাগাতে লাগাতে আড়চোখে তাকালো ওর দিকে। অতঃপর বড় বড় কদম ফেলে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল সে। ঠোঁটে তখনো জ্বলছে সিগারেট। অধিক নীরবতা আর সিগারেটের ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন করে গেল ঘরটি। চোখের পাতা বুজে ঘনঘন শ্বাস ফেলতে লাগলো লাজুক। উফ্! সে কি এক শিহরণী আবেশ!

•

' গুলবাহার মঞ্জিল '। দোতলা, অভিজাত এ বাড়ির অন্দরমহলে সর্বত্র যেন শৌখিনতা এবং রাজকীয়তার ছাপ। চকচকে মার্বেল মেঝে। দেয়ালে দৃশ্যমান সোনালী ফ্রেমের আর্টওয়ার্ক। লেদারের আরামদায়ক সোফার পাশে ক্রিস্টালের তৈরি ল্যাম্প। মাথার ওপরে ঝুলন্ত অবস্থায় রয়েছে মাঝারি আকারের এক শৌখিন চ্যান্ডেলিয়ার। জানালায় টেনে দেয়া ভারী ভেলভেট পর্দা। সব মিলিয়ে সে এক অনন্য সৌন্দর্য! যার পুরো কৃতিত্ব এককভাবে এ বাড়ির জ্যেষ্ঠ পুত্রের।

ভোর সকাল থেকেই ব্যস্ত হয়ে ওঠে এ বাড়ির অন্দরমহল। পরিস্কার পরিচ্ছন্নতা, রান্নাবান্না, বাগানের যত্ন। সব মিলিয়ে বাড়িতে শোরগোল পড়ে যায় বেশ সকাল হতেই। এ মুহূর্তে রান্নাঘরে চলছে সকালের খাবারের আয়োজন। গৃহকর্মীরা ব্যস্ত হাতে একে একে কয়েক পদ তৈরি করে ফেলছে। ঘড়ির কাঁটা এখন আটের ঘরে। নয়ের মধ্যেই সব পদ তৈরি হয়ে টেবিলে হাজির হওয়া চাই। ঠিক নয়টা পনেরো মিনিট নাগাদ এ বাড়িতে প্রাতরাশ আরম্ভ হয় যে।

.

' লাজুক! ভেতরে আসতে পারি? '

দরজার বাইরে ইফরাত। ভেতরে প্রবেশ করার জন্য অনুমতি সূচক মুখশ্রীতে দাঁড়িয়ে। কিছুক্ষণের মধ্যেই ঘরের দরজা খুলে গেল। লাজুক দাঁড়িয়ে। চোখেমুখে সরলতা, জিজ্ঞাসু ভাব। আস্তে করে নম্র কণ্ঠে সালাম দিলো মেয়েটি,

" আসসালামু আ'লাইকুম। "

ইফরাত প্রত্যুত্তরে মিষ্টি হেসে সালামের উত্তর দিলো,

" ওয়া আ'লাইকুমুস সালাম। গুড মর্নিং! ঘুমে ডিস্টার্ব করলাম না তো? "

হালকা ঠোঁট প্রসারিত করলো লাজুক। ইফরাত ইচ্ছে করেই প্রশ্নটা করলো। কেননা লাজুক'কে দেখে মোটেও মনে হচ্ছে না যে সে সদ্য ঘুম থেকে উঠেছে। আগেই উঠেছে। চেহারা, পোশাকে সতেজতার ছাপ।

" না। আগেই উঠেছি। ভেতরে আসুন ভাবী। "

লাজুক হালকা ডানে সরে জায়গা দিলো। ইফরাত হাসিমুখে ঘরে প্রবেশ করলো। পুরো ঘরে একনজর চোখ বুলিয়ে নিশ্চিত হলো ঘরের মালিক অনুপস্থিত। সকাল সকাল নববধূকে রেখে গেল কোথায় সে? ফুলশয্যার রাত ছিল গতকাল। পরদিন সকালেই বিবিকে একা রেখে মিয়া অনুপস্থিত। ইফরাত নিজ অভিব্যক্তি গোপন করে ছোট জায়ের দিকে ঘুরে তাকালো। হাস্যোজ্জ্বল মুখে বললো,

" নতুন বাড়ি। নতুন পরিবেশ। ঘুম কেমন হলো? "

" ভালো। " স্বল্প শব্দে উত্তর সারলো লাজুক।

" ভালো? নাকি খুউউব ভালো? হা? "

মিটিমিটি হাসছে ইফরাত। লাজুক অনিচ্ছুক হালকা হাসার চেষ্টা করলো।

" কি? বলবে না কেমন কাটলো প্রথম রাত? আচ্ছা ঠিক আছে। বলতে হবে না। বুঝি বুঝি সবই বুঝি। আফটার অল অভিজ্ঞ বলে কথা। "

ইফরাতের কথায় দুষ্টুমির আভাস। যা স্পষ্ট টের পাচ্ছে লাজুক। তবে এর বিপরীতে তেমন খাস অভিব্যক্তি প্রকাশ করলো না সে। ইফরাত বললো এবার,

" এই যে... দেবর পত্নী। যা বলতে এলাম শোনো এবার। "

লাজুক মনোযোগী হলো। ইফরাত বললো,

" তুমি তো এ বাড়ির নতুন সদস্য।‌ স্বাভাবিক ভাবেই এখানকার রীতিনীতির সঙ্গে পরিচিত নও। তাই সকাল সকাল ঘুমে ব্যাঘাত ঘটাতে চলে এলাম। কিছু মনে করো না যেন। "

লাজুক মেয়েটা কৌতুহলী দৃষ্টিতে তাকিয়ে।

" এখন বাজে পৌনে নয়টা। নয়টা পনেরোতে এ বাড়িতে ব্রেকফাস্ট সেরে নেয়া হয়। একদম শার্প নয়টা পনেরোতে। একটুও এদিক ওদিক করা যাবে না। সবাইকে উপস্থিত থাকতে হবে। নাহলে... "

লাজুকের চোখেমুখে জিজ্ঞাসু ভাব। ইফরাত নিচু গলায় বলে গেল,

" নাহলে আব্বা রাগ করবেন। আর আমাদের নিশ্চয়ই উচিত নয় আব্বাকে রাগানো। তাই না? "

লাজুক হালকা করে মাথা নাড়লো। ইতিবাচক ভঙ্গিতে। ইফরাত মুচকি হেসে বললো,

" তুমি তাহলে রেস্ট নাও। কাল কম তো ধকল গেল না। একটু পর নিচে চলে এসো কিন্তু। একদম দেরি করো না আবার।"

" জ্বি। " আস্তে উত্তর দিলো লাজুক।

" আচ্ছা। থাকো তাহলে। কোনো দরকার পড়লে আমাকে জানিয়ো। "

লাজুক মাথা নাড়লো। ইফরাত আর কথা না বাড়িয়ে মুচকি হেসে চলে গেল। বড় জায়ের প্রস্থান পথে তাকিয়ে রইলো লাজুক।

.

সময় তখন নয়টা বেজে পাঁচ মিনিট। দোতলার সিঁড়ি বেয়ে আস্তে ধীরে নেমে আসছে মিসেস মির্জা তানসীভ শাহ্। পড়নে তার হালকা নীলচে সালোয়ার কামিজ। ওড়নায় আবৃত শরীরের উপরিভাগ, মাথা। ছোট ছোট কিছু চুল ওড়নার ফাঁক দিয়ে দৃশ্যমান। মেয়েটা একমনে সিঁড়ি বেয়ে নামছে। হঠাৎই... পিলে চমকে উঠলো তার! পাশ দিয়ে বিধ্বং-সী এক সাইক্লোন বয়ে গেল যেন। বুকে হাত রেখে ঘাবড়ে যাওয়া চেহারায় দাঁড়িয়ে রইলো লাজুক। ঘনঘন শ্বাস পড়ছে। পিটপিট করছে চোখ দু'টো। কাঁপছে ঠোঁট জোড়া। আস্তে ধীরে ধাতস্থ হয়ে নিচে তাকালো সে। লোকটা ধপাস করে বসেছে সোফায়। এতটাই জোর খাটিয়ে ওই দৈ"ত্যাকার শরীর নিয়ে বসেছে যে সোফা গভীরে ডেবে না যায়। একটু আগে যেভাবে সাইক্লোনের গতিতে ওর পাশ কাটিয়ে দোতলা থেকে নিচে নামলো! উফ্। ভারী ঘাবড়ে গিয়েছে মেয়েটা। লাজুক আস্তে করে দৃষ্টি সরিয়ে নিলো। সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে ভাবতে লাগলো নিচে এখুনি নামবে কিনা। নামলেই তো ওই মানুষটার মুখোমুখি হতে হবে।

" লাজুক! ওখানে দাঁড়িয়ে আছো কেন? এদিকে এসো। "

ইফরাতের কণ্ঠ। ওকে ডাকছে সে। রান্নাঘরে রয়েছে। লাজুক কিছু একটা অযুহাত পেল। আস্তে করে নিচে নেমে এলো। সোজা চলে গেল রান্নাঘরে। এদিক ওদিক মোটেও দৃষ্টিপাত করলো না। তানসীভ তখন আয়েশ করে সোফায় হেলান দিয়ে বসে রয়েছে। মগ্ন সোশ্যাল মিডিয়া স্ক্রলিংয়ে। চক্ষুর সাদা অংশ হালকা লাল রঙ ধারণ করেছে। ক্লান্তির ছাপ চোখেমুখে। নববধূর দিকে ফিরে তাকানোর মতো ইচ্ছা কিংবা সময় কোনোটাই নেই তার। যা স্পষ্ট লক্ষ্য করলো বিপরীত দিকের সোফায় বসে থাকা রায়হান। মির্জা রায়হান শাহ্। তানসীভের বড় ভাই।

.

নয়টা বেজে পনেরো মিনিট। মেহগনি ডাইনিং টেবিলে সাজানো খাবারদাবার। লিনেন ছয় চেয়ারে বসে রয়েছে পরিবারের পাঁচজন সদস্য। লাজুক বসেছে ইফরাতের পাশে। স্বামী মানুষটি থেকে যথাসম্ভব দূরে। খাবারের মেনুতে রয়েছে আজ চিঁড়ের খিচুড়ি। মিক্সড সবজি। আটার রুটি। ফ্রেশ ফলের সালাদ। ক্রিমি টক দই যার ওপরে ছিটানো পুদিনা পাতা। এ বাড়ির ভিন্নধর্মী, পুষ্টিকর খাবারের আয়োজন দেখে লাজুক কিছুটা চমকেছে বটে! এখন থেকে এসব খাবারে তাকেও অভ্যস্ত হতে হবে! মৃদু নিঃশ্বাস ত্যাগ করে, খাবার খাওয়ার আগের দোয়া মনে মনে পাঠ করলো লাজুক। যেই না খাবার মুখে তুললো, তখুনি কানে এলো শ্বশুর জহুরুল সাহেবের গম্ভীর, ঠাণ্ডা কন্ঠস্বর,

" মিডিয়ার লোকদের বেশি বাড় বেড়েছে। এদেরকে এখুনি থামাতে হবে। নইলে সামনে আরো বিপদ। "

লাজুকের হাত থেমে গেল। বন্ধ হলো খাওয়া। সজাগ হলো কান। এক চামচ খিচুড়ি মুখে তুলে শীতল কণ্ঠে বললো তানসীভ,

" হয়ে যাবে। "

" যা করার দ্রুত করো। আর না পারলে আগেই জানিয়ে দাও। শেষ মুহূর্তে গণ্ডগোল পাকিয়ে ফেলো না যেন। " স্পষ্ট বাক্যে জানিয়ে দিলেন জহুরুল সাহেব।

জোরালো ভঙ্গিতে দু চোখের পাতা বন্ধ হলো মানুষটার। কঠোর হলো চোয়াল। আস্তে করে বললো,

" ভরসা করতে পারেন। "

" হুম। "

সন্দিহান মনে সম্মতি জানালেন জহুরুল সাহেব। তানসীভ আর কিচ্ছুটি বললো না। খাবারের সঙ্গে গিলে নিতে লাগলো ভেতরকার উদীয়মান ক্রো'ধ। খিচুড়ির ওপর দাঁত দিয়ে লাগাম ছাড়া আ'ক্রমণ করতে লাগলো যেন। ভেতরে ফোঁস ফোঁস করছে সাপের মতন। একই টেবিলের অপর পাশে মাথা নিচু করে খাবারের প্লেটে আঁকিবুঁকি করে চলেছে লাজুক। সবটা বি"ষাক্ত লাগছে তার। দমবন্ধকর। আমাদের চারিপাশ এতটা টক্সিক, জটিল কেন? কেন এত বি"ষধর কীটদের বসবাস এই সমাজে? কেনইবা হয় তাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ?

•

রৌদ্র তপ্ত এক দুপুর। জনাকীর্ণ সে বাজার। চারপাশে লোকেদের হইচই। মাছ, মাংস, সবজির দোকানে চলছে ক্রেতা বিক্রেতার মধ্যকার দর কষাকষি। বাতাসে মিশে রয়েছে মাছ, মশলার সংমিশ্রণে সৃষ্ট উদ্ভট গন্ধ। অকস্মাৎ... ভারী কোলাহল থেকে ভূতুড়ে নিস্তব্ধতা নেমে আসে গোটা বাজার জুড়ে। চাপা, অদৃশ্য এক ভয়ে কেঁপে ওঠে বিক্রেতা গোষ্ঠী। রাস্তার ধুলো উড়িয়ে বাজারের ঠিক মধ্যিখানে এসে দাঁড়ায় কালো রঙের জিপ গাড়িটি। চকিতে সচেতন হয়ে ওঠে সকলে। সশব্দে গাড়ির দরজা খুলে বেরিয়ে এলো তানসীভ। মির্জা তানসীভ শাহ্। গায়ে কালো রঙের ঢিলেঢালা হাফ শার্ট। শার্টের বোতাম অর্ধেক খোলা। দেখা মিলছে নিচে পরিহিত টিশার্টের। হালকা এলোমেলো চুল। গলায় চিকন চেইন। চোখে রোদচশমা। বাম হাতে ঘড়ি এবং ডান হাতে ব্রেসলেট। তানসীভের দুই পাশে দল ধরে হাজির হলো নি'ষ্ঠুর ধাঁচের কিছু ব্যক্তি। হাতে লাঠিসোঁটা, ছু'রি। উপস্থিত সকলের অন্তরে ভয় জাগ্রত হলো। ঘোর অন্ধকার নামলো চোখের তারায়। তানসীভ চোখের ইশারা করলো সঙ্গীদের। অর্থাৎ,

' শুরু কর। '

এক লাফে তানসীভ গাড়ির বনেটে উঠে বসলো দাপুটে ভঙ্গিতে। দু পা বনেটের নিম্নাংশে স্থির। ঠোঁটের ফাঁকে গুঁজে রাখা সিগারেট। চোখেমুখে মায়াদয়া অনুপস্থিত। সঙ্গী একজন হাঁক ছেড়ে উঠলো,

" এই যে, টাকা বের কর সব্বাই। আজ কেউ ছাড় পাবি না। "

" এদিকে।‌ এদিকে আয়। লাইন ধরে দাঁড়া সবাই। "

একে একে লাইন ধরে দাঁড়ালো বিক্রেতারা। বাধ্যগত ভঙ্গিতে চাঁদা দিতে লাগলো। তানসীভের পাশেই দাঁড়িয়ে এক চ্যালা। চাঁদা সংগ্রহ করছে। পাঁচ টাকার একটি কয়েন হাতে খেলছে তানসীভ। ঠোঁটে জ্বলছে তখনো সিগারেট। কিন্তু চোখমুখের অভিব্যক্তি কঠোর। নি'ষ্ঠুর। বয়স্ক একজন দোকানদার চাঁদা বাড়িয়ে কাঁপা কণ্ঠে বলে উঠলো,

" বাবা, বেচাকেনা আগের মতো আর নাই। লাভ হয় নাই তেমন। এই মাসে পুরো টাকাটা দিতে পারতাছি না। একটু সময় দাও। "

চেঁচিয়ে উঠলো বাপ্পি নামের একজন,

" সময়? কিসের সময়? গত মাসেও বুইড়া তুই ভঙ ধরছিলি। এইবারো তাই? চুপচাপ বের কর টাকা। "

বুড়ো দোকানদার ভঙ্গুর গলায় বলতে চাইলো,

" বাবারা, বেচাকেনা খারাপ... এত টাকা তো জোগাড় হয়নি। একটু দয়া করো। সময় দাও... "

সিগারেটের বিশ্রী, বি-ষাক্ত ধোঁয়া হাওয়ায় ভেসে গেল। রোদচশমা নামলো চোখ থেকে সামান্য একটুখানি নিচে। নাকের ডগায় ঝুলিয়ে রাখলো। গমগমে-বিদ্রুপের স্বরে বললো তানসীভ,

" দয়া দেখানোর জন্য ওপরে একজন আছে কাক্কু। মির্জা তানসীভ শাহ্ ওসব মায়াদয়া জানে না। জানে শুধু... পাওনা বুঝে নিতে। তো.. "

চোখের ভাষায় তীর্যক নির্দয়তার ছাপ। ঠোঁটে বিদ্রুপাত্মক হাসি। বয়স্ক মানুষটি কেঁদে উঠলো। বাধ্য হলো। আশেপাশে তাকিয়ে চরম অসহায় বোধ করলো। কম্পিত হাতে পকেট থেকে বাকি টাকা বের করলো সে। পরিশোধ করলো পুরোটা চাঁদা।

" অ্যাই... চুপ কর! না হলে তোর ওই ভাঙারী দোকান ভেঙে গুঁড়িয়ে দেবো। "

" এটা দিয়ে কোন কচু হবে? তুই কি আমাদের ভিখারি ভাবছিস? দে পুরোটা। "

মির্জা তানসীভ শাহ্ এর দলবল একেকজন দোকানদারের সঙ্গে এমন বিরূপ আচরণ করে চলেছে। আর দলনেতা হিসেবে স্বল্প শব্দে কিংবা চোখের ইশারায় নির্দেশ প্রদান করছে তানসীভ। একজন নতুন দোকানদার একটু বাকবিতন্ডায় জড়িয়ে পড়ে ওদের সঙ্গে। ফলস্বরূপ তানসীভের কঠোর, নির্দয় নির্দেশে মুহুর্তের মধ্যেই সেথায় হইচই সৃষ্টি হয়। প্রকাণ্ড এক লা'থে চোখের পলকে ভ্যানে থাকা সব সবজি, উল্টে মাটিতে ঠাঁই পেল। নির্দয়ভাবে গড়াগড়ি খেতে লাগলো মৌসুমী সবজিগুলো। ভয়ে সেখানে উপস্থিত ক্রেতা, বিক্রেতারা পিছিয়ে যায়।

জমিনে দা'ম্ভিক রূপে দাঁড়িয়ে তানসীভ। ঠোঁট হতে সরিয়ে নেয় জ্ব'লন্ত সিগারেট। দু ঠোঁট গোল করে বাতাসে ছড়িয়ে দেয় বি'ষাক্ত ধোঁয়াটা। ঔদ্ধত্যপূর্ণ কণ্ঠে উপস্থিত সকলের উদ্দেশ্যে জানান দেয়,

" মির্জা তানসীভ শাহ্ ফাঁকা বুলি ছাড়ে না। পাওনাটা ঠিক আদায় করে নেয়। "

চলবে।

#হৃদতরঙ্গের_নিঃশব্দী_সুর

#তাহিরাহ্_ইরাজ

#সূচনা_পর্ব

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১ম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন