ফন্ট সাইজ:
থিম:
হৃদতরঙ্গের নিঃশব্দী সুর

২য় পর্ব

লেখক: তাহিরাহ্ই রাজ

#হৃদতরঙ্গের_নিঃশব্দী_সুর

#তাহিরাহ্_ইরাজ

[২]

" শোনো মেয়ে! নিজেকে যদি বাংলা সিরিয়ালের ন্যাকু নায়িকা ভেবে থাকো তাহলে এখানেই অফ যাও। নাহলে কপালে দুঃখ আছে। "

.

আঁধারে ঘেরা রাত্রি। ঘড়ির কাঁটা সাড়ে এগারোর ঘরে। জানালার ধারে দাঁড়িয়ে লাজুক। পড়নে সফেদ রঙা সালোয়ার কামিজ। চুলে লম্বা বেনুনি করা। ওড়নায় হালকা আবৃত মাথা। দেহের উপরিভাগ শালীনতার সহিত আগলে রাখা। একমনে কিছু ভেবে চলেছে মেয়েটা। বিয়ের আজ দ্বিতীয় রাত। গতকাল বিয়ের প্রথম রাতে স্বামী মানুষটি এ ঘরে অনুপস্থিত ছিল। সে-ই যে বড় মালিক অর্থাৎ শ্বশুর মশাইয়ের ডাক পেয়ে ঘর থেকে বের হলো। গোটা রাত পেরিয়ে ভোরের আলো ফুটলো। সে আর ফিরলো না। লাজুক অপেক্ষায় ছিল। তার অপেক্ষায়। কিন্তু হৃদয়হীন, নি"ষ্ঠুর মানব সে। সে ফেরেনি। আজ তো দ্বিতীয় রাত। ঘড়ির কাঁটা নিজস্ব গতিতে বারোর কাছাকাছি অগ্রসর হচ্ছে। মানুষটা ফেরেনি এখনো। আদৌ ফিরবে কিনা জানা নেই। এভাবে কিভাবে চলতে পারে! মানুষটা যেন... হঠাৎই ভাবনায় ছেদ পড়লো। মৃদু শব্দে ঘরের দরজা খুলে গেল। ঘরে প্রবেশ হলো ' তার '। মোবাইলে ডুবন্ত তানসীভ ঘরে প্রবেশ করলো। ধীরপায়ে হেঁটে এগিয়ে গেল বিছানার ধারে। ধপাস করে দীর্ঘকায় শরীরটা এলিয়ে দিলো খাটের হেডবোর্ডে। সেভাবে বসেই মোবাইলে বুঁদ হয়ে রইলো। ঘরে যে সে ব্যতীত আরো কেউ একজন রয়েছে, তার ঘরণী রয়েছে। খেয়ালই নেই যেন। ওদিকে লাজুক কিছুটা সচেতন হয়ে উঠলো। যার অপেক্ষায় এতক্ষণ ছিল সে তো চলে এসেছে। এবার কি থেকে কি... কেমন এক অদ্ভুতুড়ে অনুভূতি হচ্ছে। একদম নতুন এ অনুভূতি। অপরিচিত। লাজুক নিজেকে ব্যস্ত রাখতে বেলকনিতে পা বাড়ালো। সেখানে জ্বলছে মৃদু আলো। বড়সড় মেঝের একাংশে বিছানো ফ্লোর বেড। সেখানে দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে বসলো মেয়েটা। পাশেই উল্টো করে রাখা কালজয়ী একটি বাংলা উপন্যাসের বই। বইটা ওরই। বিয়ের লাগেজে নিজের পোশাকের পাশাপাশি কিছু বই-ও এনেছে মেয়েটা। বই পড়তে তার যে বড্ড ভালো লাগে। বইয়ের পাতায় ধীরে ধীরে ডুবে গেল লাজুক। দু'জনে কিছুটা দূরত্বে দুই দুনিয়ায় মগ্ন। এভাবে ঘড়ির কাঁটা কখন যে সাড়ে বারোর ঘর অতিক্রম করেছে টেরই পায়নি লাজুক। হঠাৎই পুরো বেলকনিতে নিকষ অন্ধকার ঘনিয়ে এলো। চকিতে চমকালো মেয়েটা! বইয়ের ধ্যান কেটে গেল। এদিক ওদিক তাকাতে দৃষ্টিগোচর হলো মানুষটার পেছনকার অবয়ব। বেলকনির বাতিটা সে-ই নিভিয়েছে। ঘরে ফিরে যেতে যেতে কাটকাট গম্ভীর স্বরে ওকে জানান দিলো,

" আলো আমার অপছন্দ। "

লাজুক আস্তে করে বইটা বন্ধ করলো। রেখে দিলো একপাশে। মাথার ওড়না ঠিক করে ধীরে সুস্থে উঠে দাঁড়ালো। বেলকনি হতে প্রবেশ করলো শয়নকক্ষে। ঘরে এখন হালকা আলোর উপস্থিতি। ডিম লাইট জ্বলছে শুধু। তানসীভ বিছানার একপাশে তার বালিশটা ঠিক করে শোয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। লাজুক বিভ্রান্ত মনে দাঁড়িয়ে। তখুনি গম্ভীর স্বরে থেমে থেমে বলে উঠলো তানসীভ,

" শোনো মেয়ে! নিজেকে যদি বাংলা সিরিয়ালের ন্যাকু নায়িকা ভেবে থাকো তাহলে এখানেই অফ যাও। নাহলে কপালে দুঃখ আছে। "

লাজুক অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো কয়েক সেকেন্ড! কথাটার আগামাথা ঠিক বোধগম্য হলো না। হঠাৎ এসব কি বলছেন উনি? রাতবিরেতে সিরিয়ালের প্রসঙ্গ আসছে কোথা থেকে? মেয়েটা কিছু বুঝতে পারলো না। তবুও মৃদু-শান্ত কণ্ঠে বললো,

" সিরিয়াল আমি দেখিনা। "

তানসীভ বিছানায় টানটান হয়ে শুয়ে পড়লো। ত্যাছড়া কণ্ঠে বললো,

" ভালো। তাহলে বিয়ের পর খাট নাকি সোফা কোথায় ঘুমাবো, এই ধুমতানা নেই তো? "

লাজুক নেতিবাচক মাথা নাড়লো। না, নেই।

" চুপচাপ ঘুম যাও। কারো জন্য নিজের আরামের বিছানা ছাড়তে পারবো না। "

আর কোনো অতিরিক্ত শব্দ ব্যয় করলো না মানুষটা। বন্ধ করে নিলো চোখ। ঘুমের দেশে হারাতে পুরোপুরি প্রস্তুত সে। লাজুক বিভ্রান্ত-কৌতুহলী দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো স্বামীর দিকে। বিয়ের পর আজ দ্বিতীয় রাত। দু'জনের কথাও হচ্ছে দ্বিতীয়বারের মতো। এসময়ে এমন কথাবার্তা! অদ্ভুত!

•

রৌদ্রোজ্জ্বল দুপুর পেরিয়ে তখন ধরণীতে নেমেছে বিকেল। শহরের ব্যস্ততম রাস্তা। পথচারীরা হেঁটে চলেছে ফুটপাত ধরে। পাশেই কিছু ভ্রাম্যমাণ দোকানপাট। সবে ক্রেতাদের ভীড় জমতে শুরু করেছে। রাস্তার দুই ধারে সারি সারি বিল্ডিং মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে। আকস্মিক আটতলা এক বিল্ডিংয়ের সামনে এসে দাঁড়ায় কালো রঙের জিপ গাড়িটি। মৃদু শব্দে খুলে যায় গাড়ির দরজা। সদর্পে জিপ হতে নেমে আসে তানসীভ। মির্জা তানসীভ শাহ্। পড়নে তার নেভি ব্লু শার্ট। বুকের বোতাম সামান্য খোলা। কনুইয়ে তুলে রাখা শার্টের হাতা। চোখে কালো রোদচশমা। মুখে শীতল অথচ ভীতি সৃষ্টিকর এক নির্লিপ্ত অভিব্যক্তি। শহরের অন্যতম জনপ্রিয় এই নিউজ চ্যানেল অফিসের সামনে তৎক্ষণাৎ হইচই পড়ে যায়। কয়েকজন কর্মচারী অফিসের বাইরের রাস্তাটায় অবস্থান করছিল। দ্রুত পায়ে ভেতরে ঢোকে তারা। কেউ আবার ফিসফিস করতে থাকে গ্ৰাউন্ড ফ্লোরে।

" মির্জা তানসীভ শাহ্ এখানে?! "

তানসীভ ধীরপায়ে প্রবেশ করে অফিসে। তার পা ফেলার প্রতিটি গটগট শব্দ যেন পুরো ফ্লোর জুড়ে ভয় ছড়িয়ে দেয়। ভেতরে বসা কিছু সাংবাদিকদের চোখেমুখে আতঙ্ক স্পষ্ট। কেউ কেউ চেয়ার হতে দাঁড়িয়ে যায়। তাদের চোখেমুখে অপার বিস্ময়! তানসীভ এসে দাঁড়ায় সিনিয়র এক রিপোর্টারের টেবিল সম্মুখে। ধারালো চোখ দু'টো বিদ্ধ হয় সে-ই রিপোর্টারের অবয়বে। কিছুক্ষণের শ্বাসরুদ্ধকর নীরবতা। অতঃপর বাম পাশ হতে একজন সাংবাদিক কিছু বলার দুঃসাহস দেখায়। তৎক্ষণাৎ টেবিলে ধপ করে হাত চাপড়ে দেয় মির্জা উত্তরসূরী। সশব্দে টেবিলের ওপর রাখা ফাইল, কলম ছিটকে পড়ে মেঝেতে। আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে পুরো ফ্লোর জুড়ে। কিছু ব্যক্তি প্রথমবারের মতো স্বচক্ষে দেখে নেয়, এই মানুষটির অকল্পনীয় স্প'র্ধা। তানসীভ চোখ হতে রোদচশমা খুলে টেবিলের ওপর রাখে। ঘরজুড়ে পিনপতন ভূতুড়ে নিস্তব্ধতা। তার শাণিত চক্ষু জোড়া উপস্থিত মানুষগুলোর মুখে ঘুরে বেড়াতে থাকে। যে-ই ওই ভ'য়ঙ্কর দৃষ্টির কবলে পড়ে, সে-ই ভয়ে দৃষ্টি নত করে নেয়। একপ্রকার আটকে ফেলে নিঃশ্বাস। শুকিয়ে কাঠ হয় গলা। বাঁ পায়ের ধাক্কায় একটা চেয়ারে সশব্দে টান। বীরদর্পে রাজার ন্যায় চেয়ারটা দখল করে নেয় তানসীভ শাহ্। বাঁ পায়ের ওপর তুলে রাখা ডান পা। দেহ এলিয়ে রাখা চেয়ারে। অতি তীক্ষ্ণ, ধীরস্থির কণ্ঠে বলে ওঠে সে,

" মির্জা তানসীভ শাহ্ এর অনুমতি ছাড়া, তারই নামকে পুঁজি করে আজকাল রমরমা হেডলাইন ছাপানো হচ্ছে? মিস্টার জুলফিকার! আপনার স্পর্ধা দেখে আমি সত্যিই সারপ্রাইজড্! "

বিপরীতে বসে থাকা মধ্যবয়স্ক সিনিয়র রিপোর্টার কিছু বলতে উদ্যত হয়। কিন্তু থেমে যায় তানসীভের বিদ্রুপাত্মক বাক্যে,

" এখনো সময় আছে। নিজের ভালোটা নিজে বুঝতে শিখুন। আগামীকাল জাতীয় পত্রিকায় ভুল সংবাদ প্রকাশের জন্য ক্ষমা চেয়ে খবর ছাপবে। দেশবাসীর কাছে ক্ষমা চাইবে আপনার পত্রিকা। "

" হুমকি দিচ্ছেন? "

" অযথা আমায় তাতিয়ে দেবেন না। আগুন নিয়ে খেলার পরিণাম জানা আছে তো? ফুঁশ! ছাই হয়ে একদম হাওয়া। "

ফুঁ দিয়ে ছাই ওড়ানোর ভঙ্গি করে বাস্তবটা জানিয়ে দিলো সে। হঠাৎই বসা থেকে চট করে দাঁড়িয়ে পড়লো দীর্ঘকায় মানুষটা। দু হাতের তালুতে ভর দিয়ে টেবিলে কিছুটা অগ্ৰমুখী হয়ে ঝুঁকে গেল। হীমশীতল কণ্ঠে বললো,

" আমার নামে মিথ্যা যা যা ছেপেছে সবটাই মুছে ফেলা চাই। অ্যাজ স্যুন অ্যাজ পসিবল। "

জুলফিকার সাহেব উঠে দাঁড়ালেন। নির্ভীক কণ্ঠে বলে উঠলেন,

" ওগুলো মিথ্যা নয়। "

" আপনার ওই দুই পয়সার কলমের কালি শুকানোর আগেই, গোটা নিউজ চ্যানেল শূন্য করে দিতে পারি আমি। তাই সময় থাকতেই শুধরে যান। যা যা ছেপেছেন, সবটা মুছে জাতীয় পত্রিকায় ভুল সংবাদ প্রকাশের জন্য ক্ষমা চাইবেন।‌ নাহলে... "

রোদচশমার ডাট নি'ষ্ঠুরতার সহিত সিনিয়র এই সাংবাদিকের দিকে তাক করা। চাহনির তীব্রতা ভ'য়ঙ্কর। বাঁকা হেসে সানগ্লাস পড়ে নিলো তানসীভ নামক পুরুষটি। ঘুরে দাঁড়ালো। ডান কাঁধে মুখটা এনে রাখলো কয়েক সেকেন্ড। আরো একবার স্মরণ করিয়ে দিলো, ফাঁকা বুলি নয় কর্মে বিশ্বাসী সে। আর বিলম্ব নয়। আপন ভঙ্গিমায় রাজকীয় ছন্দে হাঁটতে লাগলো মানুষটি। অগ্রসর হতে লাগলো চ্যানেল অফিসের দরজায়। হাঁটার সে-ই নির্ভীক, ঔদ্ধত্য ছন্দে ভয় ধরে গেল উপস্থিত জনতার মনে। দরজা পেরিয়ে চলে গেল তানসীভ শাহ্। তার অনুপস্থিতিতে অফিস জুড়ে নেমে এলো ভারী নিস্তব্ধতা। জুলফিকার সাহেব শূন্য চোখে তাকিয়ে দরজায়। এভাবে ক্ষমতার অপব্যবহারে যুগে যুগে আর কতবার পরাজিত হবে সত্য?

•

সান্ধ্যকালীন প্রহর। ' গুলবাহার মঞ্জিল ' এর দোতলা। মাঝারি এক করিডোরে অবস্থিত একটি ছোটোখাটো গোলাকার কাঠের টেবিল। টেবিলকে কেন্দ্র করে রাখা তিনটা চেয়ার। বিপরীত দিকের দু'টো চেয়ারে বসে রয়েছে তারা। চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে আলাপণ চলছে দুই জা এর। লাজুক এবং ইফরাত।

" আন্টির সাথে কথা হয় লাজুক? "

" জ্বি ভাবী। "

" কেমন আছেন ওনারা সবাই? "

" আলহামদুলিল্লাহ্ ভালো আছে। "

" তোমার জন্য আন্টির নিশ্চয়ই খুব মন কেমন করছে? " প্রশ্ন করলো ইফরাত।

লাজুকের অভিব্যক্তিতে কিছুটা পরিবর্তন এলো। যা বাহ্যিকভাবে বোঝা মুশকিল।

" হ্যাঁ। মা হন তো। খারাপ লাগে। "

" আন্টিকে আসতে বলো তাহলে। কিংবা তুমিই গিয়ে একদিন দেখা করে এসো। ভালো লাগবে সবার। "

" ইনশাআল্লাহ্ যাবো নে ভাবী। "

ইফরাত মুচকি হাসলো,

" আচ্ছা। "

" আপনার পরিবারের সবাই কেমন আছেন? "

" আলহামদুলিল্লাহ্ ভালো আছে সবাই। "

লাজুক জিজ্ঞেস করলো,

" কে কে আছেন আপনার বাড়িতে? "

" আম্মু, আব্বু আর আমি। এই তিনজনের ছোট পরিবার আমাদের। এখন তো আমি এখানে। আছে শুধু ওরা দুইজন। "

" ওহ্। আঙ্কেল, আন্টির তাহলে তো খুব খারাপ লাগে, তাই না? "

" সে প্রথম প্রথম লাগতো। এখন মানিয়ে নিয়েছে ওরা। আমাকে ছাড়া দু'জন বরং বেশ ভালোই আছে এখন। "

" তাই নাকি? "

" হ্যাঁ। " ইফরাত শব্দহীন হেসে উঠলো।

" দু'জনে এই বয়সে এসে ধুমছে কোয়ালিটি টাইম স্পেন্ড করছে। আমি তো ছিলাম কাবাব মে হাড্ডি। হি হি। "

ইফরাতের সঙ্গে মৃদু হাসিতে যোগ দিলো লাজুক। ধোঁয়া ওঠা গরম গরম চায়ের সাথে আড্ডা জমে উঠলো দুই জায়ের। চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে ইফরাত আস্তে করে বলে উঠলো,

" দেবর মশাইয়ের কড়া লিকারের চা বেশ পছন্দের। "

লাজুক আনমনে আওড়ে উঠলো,

" কড়া লিকারের চা! "

•

রাত্রি তখন এগারোটা। ঘরজুড়ে নিস্তব্ধতা। লাজুক একমনে ধীরস্থির বিছানার চাদর টানটান করে রাখছে। বিছানা, বালিশ ঠিকমতো গুছানো শেষে সে এগিয়ে গেল কাবার্ডের নিকটে।‌ কাবার্ডের পাল্লা খুলতে গিয়ে হালকা যেন কাঁপন উঠলো হাতের আঙ্গুলে। সে কাবার্ড খুলতে দৃশ্যমান হলো স্বামী মানুষটির একগাদা পোশাক। হরেক রকমের রঙ বেরঙের পোশাক রয়েছে মানুষটার। তন্মধ্যে গাড় রঙের পোশাক বেশিই দেখা যাচ্ছে। লাজুক কিছুক্ষণ দৃষ্টি বুলিয়ে একটা পাতলা টিশার্ট এবং ঘরোয়া প্যান্ট বের করলো। কাবার্ডের পাল্লা আটকে দিয়ে পোশাক রাখলো বিছানার এককোণে। ধীরপায়ে এগিয়ে গেল ড্রেসিং টেবিলের সামনে। সেখানে রাখা একটা পারফিউমের বোতল সামান্য জায়গাচ্যুত হয়েছে। সেটা ঠিক করে রাখলো। ছিমছাম, গুছগাছ থাকতে তার বেশ ভালো লাগে। অথচ এই মানুষটা... একদম তার বিপরীত। হঠাৎ লাজুকের ভাবনায় ছেদ পড়ল। ঘরে প্রবেশ করলো তানসীভ। মোবাইল স্ক্রল করতে করতে ঘরে প্রবেশ করেছে। মুখে সেই চিরচেনা নিরাবেগ, হালকা ক্লান্তির ছাপ। বাইরে থেকে এসে ফ্রেশ না হয়ে ওভাবেই ধূলোবালি মাখা শরীরে ধপাস করে বসে পড়লো বিছানায়। লাজুক নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে তা দেখলো। অতঃপর ঘরের ছোটোখাটো সেন্টার টেবিলের ওপর কাঁচের গ্লাসে পানি ভরে রাখলো জগ থেকে। তানসীভের তোয়ালে নিয়ে ওয়াশরুমের হ্যাঙ্গারে ঝুলিয়ে রাখলো। ঘরের বড় আলোটা নিভিয়ে মৃদু আলো জ্বালিয়ে দিলো। এরপর বেরিয়ে গেল রুম থেকে। কিছুটা সময় অতিবাহিত হলো। ঘরে ফিরে এলো লাজুক। হাতে ট্রে। তাতে ঢাকা দিয়ে রাখা খাবার। সেন্টার টেবিলের ওপর খাবারের ট্রে রাখলো মেয়েটা। মিহি স্বরে বললো,

" ফ্রেশ হয়ে খেয়ে নিন। "

আর কিছু বললো না মেয়েটা। স্বামীকে নিজস্ব স্পেস দিতে সে চলে গেল বেলকনিতে। পুরোটা সময় জুড়ে মোবাইলে ধ্যান মগ্ন হয়ে রইলো তানসীভ। ঘরের বাতাসে তখন ভেসে বেড়াচ্ছে নাম না জানা এক দূরত্বের গন্ধ।

•

" ও ফিরেছে? "

ড্রেসিং টেবিলের সামনে চেয়ারে বসে রয়েছে ইফরাত। মুখে মেখে নিচ্ছে ময়েশ্চারাইজার। স্বামী রায়হান বিছানায় হেলান দিয়ে বসা। কোলে ল্যাপটপ। কিবোর্ডে আঙ্গুল চালাতে চালাতে স্ত্রীর উদ্দেশ্যে প্রশ্ন করলো সে। ইফরাত আয়নায় নিজের প্রতিবিম্বে দৃষ্টি রেখে বললো,

" হ্যাঁ ফিরেছে। "

" বিয়ে হয়েছে ওর। এখন আর একা নেই। তবুও এই অনিয়ম? "

" তুমি তো চেনো তোমার ভাইকে। তার স্বভাব চরিত্র তোমার অজানা নয়। "

ইফরাত স্বামীর দিকে তাকিয়ে কথাটা বললো। রায়হান স্ত্রীর দিকে তাকালো এবার। কিছুটা অসহায় কণ্ঠে বললো,

" অজানা নয় বলেই তো ভয় হচ্ছে রাত। "

" ভয়? " ইফরাত জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে।

" ভাইয়ের জীবনটা আর পাঁচ দশটা স্বাভাবিক ছেলের মতো নয় রাত। ও... ও লাজুকের জন্য ক্ষতির কারণ না হয়ে দাঁড়ায়। "

রায়হানের কণ্ঠে চিন্তার ছাপ। ইফরাত হালকা শ্বাস ফেলে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো। মাঝারি আকৃতির চুলগুলো হাত খোঁপা করতে করতে স্বামীর পাশে এসে বসলো। আলতো করে মাথা রাখলো স্বামীর কাঁধে। রায়হানের অন্তরে শান্তি বয়ে গেল যেন। ধীরে ধীরে শান্ত হলো সে। স্ত্রীর মাথায় মাথা ঠেকিয়ে চুপটি করে বসে রইলো। ইফরাত ওকে আশ্বস্ত করতে বললো,

" চিন্তা করো না তুমি। ইনশাআল্লাহ্ সব ঠিক হয়ে যাবে। আল্লাহ্ যখন ওদের জুটি বেঁধে দিয়েছেন নিশ্চয়ই কল্যাণকর কিছু ভেবে জুটিবদ্ধ করেছেন। হয়তো... লাজুকের উসিলায় তানসীভ একদিন শুধরে যাবে। ন্যায়ের পথে ফিরবে। "

" আই হোপ স্যো রাত। আই রিয়েলি হোপ স্যো। "

রায়হানের কণ্ঠে ঝড়ছে আশার বাণী। ইফরাত স্বামীর বাহু আঁকড়ে ধরে কাঁধে মাথাটা আরেকটু গাঢ় করে লেপ্টে দিলো। মৃদু কণ্ঠে বললো,

" ইনশাআল্লাহ্ এটাই হবে। দেখো তুমি। "

" হুম। "

•

বিকেলের স্নিগ্ধ-সোনালি রোদ বেলকনির মেঝেতে ছড়িয়ে রয়েছে। বাতাসে মিশে আছে ফুলের মিষ্টি ঘ্রাণ। কাছেপিঠে কোথাও থেকে ভেসে আসছে পাখির কলতান। লাজুকের পড়নে হালকা প্যাস্টেল রঙের সুতি সালোয়ার কামিজ। চুল এলোমেলোভাবে খোঁপা করা, আধাআধি ওড়নায় আবৃত। সে গাছের টবগুলোতে পানি দিচ্ছে ধীরে ধীরে। এক এক ফোঁটা পানি যেন পাতার আবরণে মুক্তোর মতো জ্বলজ্বল করছে। বেলকনির এক পাশে সারি সারি গাছ। মানিপ্ল্যান্ট, তুলসী, পিস লিলি, জুঁই, বেলি আর কয়েকটা ছোট ক্যাকটাস। ঝুলন্ত পটে ঝুলছে স্পাইডার প্ল্যান্ট আর ইংলিশ আইভি। সব মিলিয়ে বেলকনিটা যেন এক জীবন্ত সবুজাভ সমারোহ। সবুজের ভেতরে মিশে রয়েছে মিঠে আলো আর শান্তির পরশ।

লাজুক এক হাতে ছোট ঝাড়ু দিয়ে শুকনো পাতা সরাচ্ছে, অন্য হাতে তার স্প্রে বোতল। কাঁচের বোতল থেকে ফোঁটা ফোঁটা পানি পড়ছে পাতার গায়ে। পাতাগুলো যেন পানির পরশে এসে হালকা আলোয় ঝিকমিক করছে। মেয়েটি ধীরে ধীরে গাছের পাতায় হাত বুলিয়ে দেয়। কখনো একটা গাছের ডাল সোজা করে দেয়। কখনো শুকনো ফুল তুলে ফেলে। তার চোখে একরাশ শান্তি। ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি। একটু পর পাশের টবে একটা ছোট গাছের দিকে ঝুঁকে পড়ে লাজুক। মৃদু ত্যক্ত স্বরে বলে ওঠে,

" সূর্য মামা আজকাল খুব জ্বালাতন করছে। তাই না? কি গরম পড়েছে বাবা। উফ্। "

মেয়েটির কণ্ঠে মিশে রয়েছে দুষ্টু আভা। ছোট ছোট গাছের সঙ্গে নিজস্ব ভঙ্গিতে আলাপচারিতা চালিয়ে যায় সে। বড় আদুরে সে দৃশ্য! হঠাৎ একটা রঙিন প্রজাপতি এসে বসে জুঁই ফুলে। লাজুক মুচকি হেসে ওঠে সে দৃশ্যে। সূর্যের শেষ আলোয় তার মুখে পড়ে নরম আভা। চোখেমুখে উজ্জ্বলতা।

•

তমসাচ্ছন্ন রজনী। ঘরটিতে অনুপস্থিত আলোক রেখা। কেবল জানালার ফাঁক গলিয়ে চন্দ্রিমা ঢুকে পড়ছে ধূসর রেখা হয়ে। পুরোনো পর্দার ছায়া দেয়ালে নড়ছে ধীরে ধীরে। যেন কেউ চুপিসারে পাহারারত এ ঘরের বাতাসে। ঘরটির একাংশে একটি আরামকেদারা। তাতে বসে আছে এক ব্যক্তি। অন্ধকারে মুখশ্রী স্পষ্ট দৃশ্যমান নয়। চাঁদের আলোয় হালকা দেখা যাচ্ছে ঠোঁটের কোণে থাকা অদ্ভুতুড়ে হাস্যরেখা। মানুষটার হাতে একটি ফটোফ্রেম। কাঠের, ঝকঝকে তকতকে ফ্রেম। ফ্রেমে এক কিশোরীর ছবি। কিশোরীর চোখের গভীরতায় এক অপার শান্তির হদিস। ঠোঁটে মুচকি হাসি। অজ্ঞাত সে ব্যক্তি আলতো করে হাত বুলিয়ে দেয় কিশোরীর চোখেমুখে। যেন সে ছবিতে নয় বরং বাস্তবেই ছুঁয়ে চলেছে 'তাকে'। অথচ দু'জনের মধ্যে যোজন বিয়োজন দূরত্ব। ধরাছোঁয়ার বাইরে 'সে'। ফটোফ্রেমটি আস্তে করে কাছে আনে মানুষটি। গভীর চুমু এঁকে দেয় নারী মূর্তির কপালের ঠিক মধ্যিখানে। আবেশে বুজে আসে চক্ষু। ধীরে ধীরে অন্তরে র-ক্তক্ষরণ আরম্ভ হয়। ভেতরকার হিং-স্র সত্তা টগবগিয়ে বেরিয়ে আসতে চায়। হাতের আঙ্গুল শক্ত করে ডেবে বসে ফটোফ্রেমের কাঁচে। ফলস্বরূপ আঙ্গুলে ক্ষ'ত সৃষ্টি হয়। র-ক্তের ফোঁটা লেগে যায় মেয়েটির গালে। চাঁদের আলোয় র-ক্তমাখা মেয়েটির হাসি যেন আরো উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। তাতে বিমোহিত হয়ে চেয়ে থাকে সে-ই ব্যক্তি। ঠোঁটের কোণে বি-ধ্বংসী হাসির টান।

চলবে।

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ২য় পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন