ফন্ট সাইজ:
থিম:
হৃদতরঙ্গের নিঃশব্দী সুর

৩৩তম পর্ব

লেখক: তাহিরাহ্ই রাজ

#হৃদতরঙ্গের_নিঃশব্দী_সুর

#তাহিরাহ্_ইরাজ

[অন্তিম অধ্যায়]

ভর সন্ধ্যা। বুকের ভেতর অবিরাম পিটিয়ে চলেছে অদৃশ্য হাতুড়ি। ঘরজুড়ে এমাথা থেকে ওমাথা অস্থির ভঙ্গিতে পায়চারি করে চলেছেন আমিরুল সাহেব। কপাল বেয়ে ঝরে পড়ছে ঘাম। শার্টের কলার টেনে কিছুটা ছড়িয়ে দিলেন। টেনে নিতে চাইলেন সতেজ শ্বাস। তবুও রুদ্ধ হয়ে আছে বক্ষস্থল। গ্রেফতার হয়েছেন বস জহুরুল সাহেব। জহুরুল সাহেবের বিশ্বস্ত হিসাবরক্ষক ছিলেন তিনি। বাধ্য অনুচর। বসের কোটি কোটি টাকা চোরাপথে সাদা করেছেন উনি। বছরের পর বছর ধরে মির্জা জহুরুল শাহ্ এর অসংখ্য অপরাধ, জালিয়াতি, দুর্নীতির জীবন্ত দলিল তিনি। এমনকি রূপা মা'র্ডার কেস সম্পর্কে টের পেয়েছিলেন বস ও তিনি। তবুও নিজ স্বার্থে চুপ ছিলেন। তানসীভ বিপদে জেনেও মুখ খোলার সাহস করেননি। সে-ই প্রভাবশালী জহুরুল সাহেব আজ কারাবন্দী। পায়ের তলায় জমিন দুলছে ওনার। এস.কে, জহুরুল সাহেব একে একে আউট হচ্ছে সকলে। আমিরুল সাহেবের মনের ভেতর অপরাধবোধ, ভয় একসঙ্গে দংশন করছে। লোভে পাপ, পাপে মৃ'ত্যু! তবে কি এবার ওনার পালা? সহসা ঘরের ভয়ার্ত নীরবতা ভেঙে চুরমার হলো। বেজে উঠলো মোবাইলের নোটিফিকেশন। তীক্ষ্ণ সে শব্দ বু'লেটের মতো আঘাত করলো কানে। থমকে গেলেন উনি। কম্পিত হাতে টেবিলের ওপর থেকে মোবাইল নিলেন। স্ক্রিনে ভেসে উঠেছে অজ্ঞাত নাম্বার থেকে আগত টেক্সট মেসেজ। কাঁপা কাঁপা আঙ্গুলে মেসেজ ওপেন করলেন আমিরুল সাহেব। স্থির হয়ে গেল চোখের মণি।

' নাউ ইটস্ ইয়্যর টার্ন। '

কার্পেটের মেঝেতে ছিটকে পড়লো মোবাইল। ঝিমঝিম করে উঠলো মাথা। সারা শরীর এক নিমিষে বরফের মতো ঠান্ডা হয়ে গেল। বুঝতে বাকি রইলো না মেসেজ প্রেরক কে! থেমে নেই। থেমে নেই মির্জা তানসীভ শাহ্। একে একে সকলে ধ্বং'সের মুখে। ঘোর, অমোঘ বিপদ আজ আমিরুল সাহেবের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে। অট্টহাসি হাসছে। পালানোর কোনো পথ অবশিষ্ট নেই।

•

বিকেলের স্নিগ্ধ, মনোরম আলো প্রবেশ করছে ঘরে। বিছানায় শায়িত মিনারা বেগম। গুলবাহার মঞ্জিলের অভিশ'প্ত, গুমোট পরিবেশ থেকে অবশেষে মুক্তি পেলেন তিনি। আশুলিয়ার এই বাড়ির চারপাশে সবুজ প্রকৃতি। বাতাসে নেই পাপাচারের গন্ধ। নির্মল সতেজতা ছড়িয়ে আকাশে বাতাসে। শাশুড়ির শিয়রে বসা লাজুক। পরম যত্নে কপালে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। ঘন্টাখানেক পূর্বে ডক্টরের চেকআপ শেষে বাড়ি ফিরেছে তারা। ডক্টর নিশ্চিত করেছেন মা এখন আলহামদুলিল্লাহ্ বিপদমুক্ত। বি'ষের ভ'য়ঙ্কর উপস্থিতি নেই শরীরে। তবে অত্যন্ত বাজে প্রভাব রয়ে গিয়েছে। সেরে উঠতে দীর্ঘস্থায়ী সময় প্রয়োজন। যত্ন, ভালোবাসা প্রয়োজন। সর্বোপরি মহান রবের রহমত প্রয়োজন। ইনশাআল্লাহ্ সেরে উঠবেন তিনি। ক্লান্ত চোখে তাকিয়ে মিনারা বেগম। কাঁপা কাঁপা গলায় ক্ষীণ কণ্ঠে বলে উঠলেন,

" ঠি ক হয়ে যা-বো? "

" জ্বি মা। ডক্টর আঙ্কেল বলেছেন তো। আপনি ইনশাআল্লাহ্ সুস্থ হয়ে যাবেন। আবার সেই আগের মতো হাঁটাচলা করতে পারবেন। দুনিয়াটা উপভোগ করতে পারবেন।‌ "

" পারবো? "

কণ্ঠে কেমন অবিশ্বাসের ছাপ। দীর্ঘদিন ধরে এই পক্ষাঘাতগ্রস্ত জীবন আপন হয়ে উঠেছে। চিরন্তন সত্য মনে হয়েছে। এর ব্যতিক্রম সম্ভব? লাজুক মুচকি হেসে ইতিবাচক মাথা নাড়লো। আশ্বস্ত করলো ওনাকে। মিনারা বেগম চুপটি করে শুয়ে রইলেন। খোলা জানালা গলিয়ে বাইরের প্রকৃতিতে তাকালেন। নিজেকে নিজেই বললেন যেন,

" ওখা-নে পাঠা-বে না তো? "

কণ্ঠে আকুতি, ভয়। মায়ের হাত নিজ দুই হাতের মুঠোয় শক্ত করে ধরলো লাজুক। শান্ত, দৃঢ় স্বরে বললো,

" না মা। ওই অভিশ'প্ত বাড়িতে আর কখনো যাবো না আমরা। আপনার ছেলে ওনার মতামত জানিয়ে দিয়েছেন। আমিও ওনার সঙ্গে একমত। ওই পাপাচারী অধ্যায় চিরকালের জন্য বন্ধ। ইনশাআল্লাহ্ এখন থেকে আপনি এখানেই থাকবেন। আমাদের সঙ্গে। কি? থাকবেন তো মা? আপনার ছোট ছেলের বউ কিন্তু মোটেও জাঁদরেল নয়। বউ-শাশুড়ি মিলে ইনশাআল্লাহ্ খুব সুন্দরভাবে মিলেমিশে থাকবো। সুখে থাকবো। "

বলতে বলতে জড়িয়ে গেল কণ্ঠস্বর। ঝাপসা হলো দৃষ্টি। মিনারা বেগমের ফ্যাকাশে মুখে ফুটে উঠলো এক চিলতে হাসি। মুঠোবন্দী মায়ের হাতে আলতো করে গাল ঠেকালো লাজুক। বিড়বিড় করে উঠলো,

" ইনশাআল্লাহ্ আপনি সুস্থ হয়ে যাবেন মা। একটু মনোবল শক্ত রাখুন। "

দরজায় দেহের একপাশ হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে তানসীভ। শান্ত, স্থির চাহনি। গভীর চোখে তাকিয়ে জন্মদাত্রী মা এবং জীবনসঙ্গিনীর দিকে। নূর! তপ্ত মরুর ন্যায় জীবনে হয়ে উঠেছে এক পশলা সতেজ বৃষ্টি। নিমিষেই দূর করে দিয়েছে সকল ক্লান্তি। পাপাচারের মেঘলা আচ্ছাদন সরিয়ে সে যেন এক চিলতে মিঠে রোদ্দুর। তার জীবনের অন্যতম মনোরম, শ্রেষ্ঠ সত্য এ রমণী। তার নূর! ধীরে ধীরে ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠলো সরু রেখা। অবশেষে পরম শান্তিতে থিতু হলো জীবন। তার ছোট্ট পরিবার। ইনশাআল্লাহ্ সুস্থ হয়ে উঠবে মা। রহমত, বরকত বর্ষিত হবে পাপমুক্ত দুনিয়ায়। হৃদয়ের অন্তঃস্থল থেকে আশাবাদী সে।

•

অন্ধকারাচ্ছন্ন ঘর। নেভানো আলো। বহিরাগত রাতের অন্ধকার গ্রাস করে নিয়েছে ঘরের অভ্যন্তর। নিকষ কালো অন্ধকারে বেডের এক কিনারে হাঁটুতে মুখ গুঁজে বসা লাজুক। নিঃশব্দে কেঁদে চলেছে। বুকভাঙা শব্দহীন সে কান্না। বুকের ভেতর চেপে বসেছে ভারী পাথর। দম বন্ধ হয়ে আসছে। শ্বশুর আব্বার জবানবন্দীতে আজ গ্ৰেফতার হয়েছে বাবা। তার জন্মদাতা পিতা। কান্নার তোপে বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে। বিগত কয়েক মাসে বাবার আচরণ সন্দেহজনক ছিল। রহস্যজনক। বাবার বদলে যাওয়া রূপ, অস্থিরতা, লুকোছাপা ভাব। নজর এড়ায়নি তার। সন্দেহ হতো। তবুও অবুঝ মন বলতো। হয়তো সে অতিরিক্ত ভাবছে। হয়তো সে পরিস্থিতি ভুল বুঝছে। হয়তো বাবা নির্দোষ। পাপের নোং'রা, অন্ধকার দুনিয়ায় পুরোপুরি তলিয়ে যেতে পারেনি। সততা আজো অটুট। তবে সবটা আজ মিথ্যে প্রমাণিত হলো। গ্রেফতার হলেন বাবা। মাথা নিচু। পুলিশের সামনে আত্মপক্ষ সমর্থনের ছিল না কোনোরূপ চেষ্টা। লজ্জায় অবনত চোখ। কিছুতেই ভুলতে পারছে না লাজুক। শৈশবের সে-ই সৎ, নীতিবান, আত্মসম্মানী বাবা কবে, কখন, কিভাবে হারিয়ে গেলেন? সৎ পথে চলার নির্দেশ দিয়েছেন চিরকাল। সেই বাবা আজ সামান্য অর্থের মোহে নিজেকে বিক্রি করে দিলেন? কি করে বাবা হয়ে উঠলেন অচেনা অপরাধী? চরম সত্যের মুখোমুখি হয়ে লাজুক আজ বড্ড অসহায়। একা।

ঘন অন্ধকারে ছেয়ে আছে ঘর। আস্তে করে খুলে গেল দরজার পাল্লা। নিঃশব্দে ভীষণ পরিচিত ওম মিশে গেল বাতাসে। ভেতরে প্রবেশ করলো তানসীভ। দৃষ্টি নিবদ্ধ হলো তার নূরে। আলো জ্বালালো না তানসীভ। ক্ষতবিক্ষত মনের জন্য অন্ধকার ই উত্তম আড়াল। শব্দহীন এগিয়ে গেল সে। বসলো সঙ্গিনীর পাশে। ক্ষণে ক্ষণে কেঁপে চলেছে কোমলমতি শরীর। এমন করুণ অবস্থা ক্ষ'তবিক্ষত করে তুলছে তাকে। কোনোরকম সান্ত্বনা দিলো না তানসীভ। দিলো না কৈফিয়ত কিংবা যুক্তির অবতারণা। পরম মমতায় চওড়া হাত দু'টো এগিয়ে দিলো। ভঙ্গুর কাঁচের পুতুলকে নীরবে নিভৃতে বুকের ভেতর টেনে নিলো। আকস্মিক এই স্পর্শে শক্ত হয়ে উঠলো রমণীর শরীর। পরক্ষণেই টের পেল আপন মানুষটির সুবাস। ভেতরকার সবটুকু বাঁধ এক নিমেষে ভেঙে গেল। টিশার্টের কলার দু হাতে চেপে ধরলো লাজুক। বুকের মাঝে মুখ লুকালো। এতক্ষণের চেপে রাখা নিঃশব্দ কান্না এবার বাঁধভাঙা হয়ে ঝড়ে পড়লো। ভিজে গেল মানুষটার বুক। আরো শক্ত, নিবিড়ভাবে বাহুডোরে আগলে নিলো তানসীভ। এক হাতে এলোমেলো চুলে বিলি কাটতে লাগলো। অপর হাতে কম্পিত পিঠে মায়াবী পরশ বুলাতে লাগলো। কপালে দীর্ঘ চুমু এঁকে দিলো মানুষটি। অমোঘ আশ্বাসের শব্দগুলো মিশে গেল বাতাসে,

' আই অ্যাম হিয়ার ফর ইয়্যু। '

অভেদ্য দুর্গের অন্তরালে তানসীভ আগলে নিলো অর্ধাঙ্গিনীকে। একান্ত আপন, নিরাপদ আশ্রয়ে ধীরে ধীরে কমে গেল রমণীর কান্না। থেমে গেল অন্তঃস্থ ঝড়ের দাপট। শান্ত নিস্তব্ধতা নেমে এলো ঘরজুড়ে। আস্তে করে স্থির হলো শরীর। কলার চেপে ধরা হাত দু'টো শিথিল হয়ে এলো। বুকের চেনা ওম, আপন সুবাসে খুঁজে পেল মানসিক শান্তি। বুকভাঙা কষ্টের পর চোখের পাতায় নেমে এলো একরাশ ঘুম। পিঠে হাত বুলিয়ে চলেছে তানসীভ। শান্ত, ছন্দময় স্পর্শে ভার ছেড়ে দিলো শরীর। ধীরে ধীরে ভেজা চোখের পাতা বুঁজে গেল। স্বামীর বুকে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়লো লাজুক। চওড়া এ বুকেই পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়। অন্ধকারে ঘুমন্ত স্ত্রীর দিকে তাকালো তানসীভ। কপালে আলতো করে ঠোঁট ছুঁয়ে দিলো। নিভৃতে জড়িয়ে নিলো নিজের সঙ্গে। সতর্ক ভঙ্গিতে আস্তে ধীরে বেডের হেডবোর্ডে হেলান দিলো সে। বন্ধ হলো চোখের পাতা।

•

" এই তো আপু। আছি আলহামদুলিল্লাহ্। পুচু কি করে? "

" পুচু খেলা করে। তাই না সোনা? তাই না? "

পড়ন্ত এক বিকেল। বিছানায় শুয়ে হাত-পা নেড়ে খেলা করছে কয়েক মাস বয়সী শিশুপুত্র শাদাফ। পাশেই বসা আফসানা। বোনের সঙ্গে কথা বলছে। মা'কে দেখে দাঁত বিহীন হাসি উপহার দিচ্ছে বাচ্চাটা। ওদিকে বেডের একপাশে বসে আছে লাজুক। কানে ফোন। ভাগ্নের আউ আউ ভাষা শুনে মুচকি হেসে ওঠে।

" সোনাটা কথা বলছে মিমির সঙ্গে? "

আফসানা ফোন ধরে শাদাফের কাছাকাছি। নিজ ভাষায় কিছু অর্থহীন শব্দ শুনিয়ে দেয় বাচ্চাটা। একসাথে হেসে ওঠে দুই বোন।

" তোকে আসতে বলছে। কতদিন হয় মিমি আসে না যে। "

" আসবো ইনশাআল্লাহ্। গিয়ে তখন মিমি আর পুচু একসাথে খেলু খেলু করবো। ঠিকাছে? "

শব্দহীন হেসে ওঠে শাদাফ।‌ হাসে আফসানা, লাজুক। ধীরে ধীরে হাসি মিলিয়ে যায়। জানালার বাইরের খোলা আকাশে তাকায় লাজুক। বিগত এক মাসে বি'ধ্বংসী ঝড় বয়ে গেছে তার ওপর দিয়ে। নিজের জন্মদাতা পিতার অপরাধী রূপ উন্মোচন। ওনার কারাবাস। সন্তান হিসেবে মেনে নেয়া বড় কষ্টকর। আলহামদুলিল্লাহ্ সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিষাদের সেই কালো মেঘ থেকে নিজেকে বাঁচাতে সক্ষম হয়েছে সে। এর পুরো কৃতিত্ব তার জীবনসঙ্গীর। এছাড়া বড় বোন, শ্বশুরবাড়ির মানুষগুলো তো ছিলই। সকলে ভালোবেসে তাকে আগলে রেখেছে। হেয় কিংবা তুচ্ছতাচ্ছিল্য করেনি। এই যন্ত্রনাপ্রদ মুহূর্ত কাটাতে পদে পদে সহায়তা করেছে।

" লাজুক? "

" হু? "

ভাবনায় ছেদ পড়ে লাজুকের।

" তুই ঠিক আছিস তো? "

" আল্লাহ্ যেমন রেখেছেন ভালো রেখেছেন। "

" মন খারাপ করিস না বোন। এটাই বাস্তব। জীবনে কখনো যে এই দিন দেখা লাগবে কল্পনাও করিনি। আমাদের বাবা.. উনি কিনা.. "

" অর্থের কাছে বিক্রি হয়ে গেলেন। হারাম উপার্জনে বড় করলেন আমাদের। "

কণ্ঠরোধ হয়ে আসে লাজুকের। অশ্রু জমে চোখে। আফসানা আলতো করে চোখের পানি মুছে নেয়। ছেলের দিকে তাকিয়ে কৃত্রিম হাসি উপহার দেয়। শাদাফ ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে মায়ের মুখে। ছেলের সামনে একটু কান্নাও করা যায় না।

" মা তোর কথা বলছিল বারবার। "

" জোর করো না আপু। সবটা জানো তুমি। এ মুহুর্তে একসাথে এতকিছু সামলাতে পারবো না আমি। আমিও একটা মানুষ। ন্যায়, অন্যায় বিবেকবোধ রয়েছে। "

" জানি বোন। তবুও.. মা হন উনি। "

" হ্যাঁ, উনি আমাদের মা হন। গর্ভধারিনী মা। সবটা জানতেন উনি। জেনেশুনে বাবাকে অন্যায়ে সাপোর্ট করেছেন। ভুল পথে চালিত করেছেন আমাদের। "

আফসানা নিশ্চুপ। লাজুক বলে চলেছে,

" আপু! আমরা তো খেয়েপরে আলহামদুলিল্লাহ্ ভালোই ছিলাম বলো? তাহলে.. কিসের এত অভাব পড়লো বাবার? উনি কেন এমনটা করলেন? কেন জড়িয়ে পড়লেন অন্ধকার জগতে? অবুঝ ছিলেন না তো। "

" জানি না রে। আল্লাহ্ এ কোন পরীক্ষা নিচ্ছেন আমাদের! সন্তান হয়ে আজ বাবাকে কাঠগড়ায় দাঁড়ানো দেখতে হচ্ছে। "

দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে আফসানা।‌ লাজুক হাতের উল্টো পিঠে মুছে নেয় অশ্রুবিন্দু। মায়ের প্রতি তীব্র অভিমান তার। মা সবটা জানতেন। জেনেশুনে বাবার লোভ, অন্যায়ের ভাগীদার হয়েছেন। সঙ্গ দিয়েছেন নীরবে। মায়ের এই নীরব সমর্থন কিছুতেই মানতে পারছে না সে। ব্যথা হচ্ছে বুকের মাঝে। ক্ষণে ক্ষণে র'ক্তক্ষরণ হচ্ছে। স্বামীর গ্ৰেফতারের পর সুমনা বেগম এখন বড় মেয়ের ফ্ল্যাটে উঠেছেন। অভিমানে, কষ্টে লাজুক গত এক মাস সেভাবে কথা বলেনি মায়ের সঙ্গে। যতটুকু বলে দায়সারা। এতে কষ্ট পান সুমনা বেগম। যা করেছেন ওনারা সন্তানের মঙ্গলের জন্যই তো করেছেন। ওনার এই অযৌক্তিক যুক্তিতে লাজুকের মন গলতে ব্যর্থ।‌ বরং আরো কষ্ট হয়। যন্ত্রনা হয়।

বোনের সঙ্গে কথোপকথন শেষে ফোন কেটে দেয় লাজুক। চোখের পানি মুছে নেয়। সকল অভিমান, কষ্ট ভুলে উঠে দাঁড়ায়। বেডের একপাশে আধখোলা লাগেজ। কাপড়চোপড় গুছানো এখনো কিছুটা বাকি। বিয়ের পর কেটে গিয়েছে দীর্ঘ এগারো মাস। ইনশাআল্লাহ্ আগামীকাল বরের সঙ্গে প্রথমবারের মতো ভ্রমণে যাচ্ছে সে। মানুষটির সঙ্গে এই প্রথম ট্যুর। সিলেট যাচ্ছে তারা। বিগত কয়েক মাসের মানসিক চাপ, কান্নাকাটি, ঘরোয়া গুমোট ভাব এখন দূরীকরণ করা প্রয়োজন। মনের বিষাদ কাটাতে, নিজেদের নতুন করে গুছিয়ে নিতে হাওয়া বদলের বেশ প্রয়োজন। তানসীভের একটি শার্ট গুছানোর সময় ঠোঁটের কোণে লজ্জালু হাসি ফুটে ওঠে রমণীর। আলতো করে শার্টে হাত বুলিয়ে দেয় সে। ইনশাআল্লাহ্ সিলেট সফরে শুরু হতে চলেছে তাদের জীবনের নতুন এক ভোর।

•

সড়কপথের দীর্ঘ জার্নি শেষে সিলেট পৌঁছালো কপোত কপোতী। গাড়ি থেকে নেমে এলো লাজুক। চুলে বিলি কেটে গেল শীতল হাওয়া। নির্মল হাওয়ায় উবে গেল সকল ক্লান্তি, বিষাদ। প্রাণভরে নিঃশ্বাস ছাড়লো রমণী। পাশে দাঁড়িয়ে একান্ত আপন মানুষটি। চোখে রোদচশমা। একহাতে সঙ্গিনীর নরম হাত ধরলো সে। অপর হাতে লাগেজ। দু'জনে অগ্রসর হলো তাদের গন্তব্যে।

-

পাহাড়ের ঢালে গড়ে ওঠা লাক্সারি রিসোর্ট। ফ্রেশ হয়ে খালি পায়ে বারান্দায় এলো লাজুক। তাকালো বাইরের প্রকৃতিতে। রিসোর্টের চারপাশ যেন কোনো পটুয়ার নিখুঁত ক্যানভাস! যতদূর চোখ যায় সবুজ আর সবুজ। ঢেউ খেলানো চা বাগানগুলো পাহাড়ের গা ঘেঁষে নেমে গিয়েছে নিচে। দুপুরের মিঠে রৌদ্র মেঘের আড়ালে লুকোচুরি করে চলেছে। বহু দূরে অস্পষ্ট দেখা যাচ্ছে খাসিয়া পাহাড়। পাহাড়ের মাথায় আলতো করে জমে আছে সাদা তুলোর ন্যায় মেঘের ভেলা। চারপাশ বেশ শান্ত। পাতার মর্মর শব্দ, পাহাড়ী পাখির কিচিরমিচির গান। ভেসে বেড়াচ্ছে বাতাসে। দু হাত দুদিকে প্রসারিত করে বুক ভরে শ্বাস নিলো লাজুক। ঘ্রাণেন্দ্রিয়ে পৌঁছালো ভেজা মাটি, কাঁচা চা পাতার মায়াবী সুবাস। প্রকৃতির অপরূপ রূপে বিমোহিত সে!

' মাশাআল্লাহ্! '

নিঃশব্দে পেছনে উপস্থিত হলো মানুষটা। গোসল শেষে উদোম দেহের উপরিভাগ। বিন্দু বিন্দু জলকণা লেপ্টে শরীরে, চুলে। দু'হাতে পেছন থেকে সঙ্গিনীকে বাহুডোরে আবদ্ধ করে নিলো সে। শিউরে উঠলো রমণী। শিরশিরানি ছড়িয়ে পড়লো রন্ধ্রে রন্ধ্রে। কাঁধে মুখ গুঁজে দিলো তানসীভ। ঠোঁটের উষ্ণ ছোঁয়ায় কাঁধের খোলা ত্বকে মৃদু কম্পন সৃষ্টি হলো।

" ডিড ইয়্যু লাইক ইট? "

নিচু, গভীর কণ্ঠস্বর। রমণীর কানে ছড়িয়ে পড়লো মা'দকতা।

" খুব ভালো লেগেছে! জায়গাটা এত সুন্দর, এত শান্ত! মনে হচ্ছে কোনো রূপকথার রাজ্যে চলে এসেছি যেন। মাশাআল্লাহ্! কি সুন্দর! "

কাঁধে মুখ গুঁজে আলতো হাসলো মানুষটা। দৃঢ় আলিঙ্গনে বদ্ধ করে নিলো কোমড়। লাজুক আঙ্গুলের ইশারায় চঞ্চলতার সহিত দূরের পাহাড় দেখালো,

" ওটা কোন পাহাড়? খাসি? "

" হু। "

হরেকরকম কথা বলতে বলতে রমণী আলতো করে হাত রাখলো স্বামীর ভেজা, শক্ত হাতের ওপর। ভেজা চুল গড়িয়ে ঝরে পড়লো একফোঁটা পানি। রমণীর ঘাড় বেয়ে নিচে নেমে গেল। শীতল জলকণা, স্বামীর দেহের তপ্ত ওম। লাজুকের দেহে মধুর শিহরণ জাগিয়ে তুললো। থেমে গেল চঞ্চলতার কিচিরমিচির। আলতো করে পেছনে হেলিয়ে দিলো মাথা। রাখলো প্রশস্ত কাঁধে। আশেপাশে চা বাগান। মেঘের ভেলা। দুনিয়াবি কোলাহল ভুলে দু'জনে হারিয়ে গেল নিজস্ব জগতে। সঙ্গিনীর মুখখানি ধীরে ধীরে নিজের দিকে ঘুরিয়ে নিলো তানসীভ। গভীর দৃষ্টিতে তাকালো লজ্জাবনত মুখে। পাহাড়ি বাতাসে মুখের ওপর লেপ্টে রয়েছে একগাছি চুল। সযত্নে গাল ছুঁলো সে। আঙ্গুলের স্পর্শে সরিয়ে দিলো মুখের ওপর পড়ে থাকা চুল। ধীরলয়ে আরো নিকটবর্তী হলো মুখ। চোখে চোখে গূঢ় ইশারা। হটে গেল মধ্যকার সকল দূরত্ব। দীর্ঘ, গভীর ঠোঁটের আলিঙ্গন। দু'জনে মত্ত হলো একে অপরেতে।

•

পাহাড়ি ঝর্নার কোলে দাঁড়িয়ে তানসীভ, লাজুক। পাথুরে বুক চিরে বয়ে চলেছে স্ফটিকের মতো স্বচ্ছ জলধারা। পাহাড়ের গা বেয়ে নেমে আসছে বিশুদ্ধ পানির তোড়। শাড়ির কুঁচি একটুখানি উঁচুতে তুলে ধরলো লাজুক। সাবধানে পা রাখলো পাথরের ওপর। পাশেই তানসীভ। এক হাতে শক্ত করে ওকে ধরে রাখা। ঝর্নার ঠান্ডা জল পাথরে বাধা পেয়ে চারদিকে কুয়াশার ন্যায় উড়ে বেড়াচ্ছে। বাতাসে সে জলকণা এসে লাগছে লাজুকের চোখে মুখে। পানির ছোঁয়া পেতেই নিঃশব্দে নির্মল হাসলো সে।

" আস্তে। "

সাবধানী কণ্ঠস্বর। সতর্ক করে দিলো ওকে। লাজুক একগাল হাসি উপহার দিলো,

" কচ্ছপের গতিতে হাঁটছি তো। এছাড়াও আপনি সাথে আছেন না? তবুও এত ভয়? "

গূঢ় দৃষ্টিতে তাকিয়ে মানুষটা। স্বল্প শব্দে জবাব দিলো,

" পা ভেঙে যাবে। "

পাথরের বুকে এঁকেবেঁকে হাঁটতে হাঁটতে নাটুকেপনা করলো লাজুক,

" কি পঁচা আপনি! বিয়ের মাত্র এগারো মাসেই বউয়ের পা ভাঙার অভিশাপ দিচ্ছেন? ছিঃ! "

চোখে হাসলো তানসীভ। সাড়াশব্দ না পেয়ে লাজুক বলে চলেছে আপনমনে,

" বুঝি বুঝি। আপনার ক্যালকুলেশন সবই বুঝি। পাঁচটা না দশটা না একটা মাত্র বউয়ের পা ভেঙে গেলে লস তো আপনারই। গোটা সিলেট সফরে তখন বউ কোলে নিয়ে ঘুরতে হবে যে। "

এক পা এগিয়ে কাছাকাছি এলো মানুষটা। খুবই কাছে। হকচকিয়ে গেল লাজুক। অবুঝ চোখে তাকিয়ে।

" আই ডোন্ট মাইন্ড। ওয়ানা ট্রাই? "

আকস্মিক বেশরম এই শব্দমালায় হারিয়ে গেল রমণীর চপলতা। থমকে গেল চোখের মণি। এত কাছে দাঁড়িয়ে মানুষটি। চোখের ভাষা গভীর। দুষ্টুমি ভরা চাহনি। ঠোঁটের কোণে বক্ররেখা। রমণীর বুকে অচেনা তোলপাড় উঠলো। এক লহমায় বিদ্যুৎ খেলে গেল সারা অঙ্গে। লাবণ্যময়ী মুখের লালচে আভা কান থেকে ঘাড় অবধি ছড়িয়ে পড়লো। লজ্জার তীব্র আবেশে আপনাআপনিই নত হলো চোখের পাতা। মোহময় চোখে তাকাতে ব্যর্থ। আনমনে দু'পা পিছিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলো লাজুক। পিঠ ঠেকে গেল পেছনের শক্ত পাথুরে দেয়ালে। পালানোর কোনো পথ নেই। ধীরপায়ে এগিয়ে এলো তানসীভ। দু হাত স্থাপিত হলো সঙ্গিনীর দু'পাশ ছাড়িয়ে পাথরের দেয়ালে। মধ্যখানে বন্দিনী লাজুক। অন্যপাশে মুখ ঘুরিয়ে নিলো লাজে। মায়াবী, অভিমানী সুরে বললো,

" ছাড়ুন না। কেউ এসে পড়বে। "

" ধরে নেই।‌ স্যি। "

দুষ্টু ধাঁধায় ফেঁ'সে গিয়েছে রমণী। বাকশূন্য হয়ে পড়লো নিমিষেই। তার কম্পমান ঠোঁট, আরক্ত মুখের সৌন্দর্য! মোহগ্রস্ত নয়নে তাকিয়ে তানসীভ। তৃপ্ত হলো মন।

•

প্রাসাদোসম বাড়ি আজ জনশূন্য। বিশালাকার দরজা হাঁ করে খোলা। একে একে লাগেজপত্র নেয়া হচ্ছে বাড়ির বাইরে। শূন্য লিভিংরুমের একপাশে দাঁড়িয়ে রায়হান। ফোনে কথা বলছে।

" হ্যাঁ, সব নেয়া হয়েছে। একটু পর বের হবো। "

" কোনো হেল্প? "

" না রে। লাগলে জানাবো ইনশাআল্লাহ্। তোদের কি খবর বল? ঠিকঠাক এনজয় করছিস তো? "

" হু। "

ক্ষীণ কণ্ঠে জবাব দিলো তানসীভ। বিগত কয়েক মাসে ভাইয়ে ভাইয়ে দূরত্ব কিছুটা হলেও লাঘব হয়েছে। টুকটাক কথা হয় দু'জনের। ভাই ব্রাদার টাইপ আলাপচারিতা নয়। সৌজন্যমূলক সাধারণ কথাবার্তা। এতেই যথেষ্ট সন্তুষ্ট দুই ঘরণী। ইনশাআল্লাহ্ ধীরে ধীরে সবটা ঠিক হয়ে যাবে একসময়। ফোনালাপ অল্পতেই সমাপ্ত হলো। পকেটে মোবাইল গুঁজে রায়হান তাকালো আশেপাশে। একদা এই ঘরেই ছিলো তাদের পুরো পরিবার। আজ একে একে জনশূন্য। পাপাচারের প্রাসাদ ছেড়ে তানসীভ, লাজুক বহু আগেই বিদায় নিয়েছে। আজ চিরতরে চলে যাচ্ছে তারা। রায়হান নতুন ফ্লাট কিনেছে। সেখানে শিফট হবে। ওদিকে আশুলিয়ার বাড়িটা ছেড়ে দেয়ার চিন্তায় রয়েছে তানসীভ। বাবার দেয়াই তো বাড়িটা। স্ত্রী, মা'কে নিয়ে নিজের উপার্জনে কোনো বাড়িতে ওঠার পরিকল্পনা রয়েছে তার। হোক না ছোটোখাটো। তবুও পাপের অভিশা'পে মোড়ানো না হোক। সেখানে অন্তত শান্তির নিশ্বাস ছাড়া যাবে।

শোল্ডার ব্যাগ চেক করতে করতে সিঁড়ি বেয়ে নেমে এলো ইফরাত। রায়হান সামনে গিয়ে দাঁড়ালো।

" সব ঠিকমতো নিয়েছো? "

" হ্যাঁ গো। আপাতত কিছু তো মিসিং লাগছে না। "

" ওকে। চলো তাহলে। বেড়োনো যাক। "

" হুম। "

ইফরাত শূন্য চোখে তাকালো আশেপাশে। একদা এ বাড়ির পুত্রবধূ হয়ে আগমন হয়েছিল। আজ একগাদা সুখকর স্মৃতি, বিষাদ, অপরাধের কালো ছায়া ফেলে চলে যাচ্ছে। আগত দিনগুলো মহান রবের কৃপায় শান্তিপূর্ণ হোক। দীর্ঘশ্বাস ফেললো ইফরাত। হাত ধরে দু'জনে বেরিয়ে গেল গুলবাহার মঞ্জিল হতে। পেছনে রাজকীয় বাড়িটি আজ বড্ড ম্লান। কালো মেঘে ঢাকা।

•

এশিয়ার একমাত্র সোয়াম্প ফরেস্ট বা জলমগ্ন বন রাতারগুল।জলছাপ দেয়া মায়াবী বন। চারিদিকে শুধু পানি আর পানি। সে পানির বুক চিরে দাঁড়িয়ে হাজারো হিজল, করচ, বরুণ গাছ। সিলেট সফরের আজ তৃতীয় দিন। তানসীভ, লাজুক এসেছে রাতারগুল। বনের ভেতর ঢোকার জন্য তানসীভ ছোট একটা কাঠের ডিঙি নৌকা ভাড়া করেছে। সাবধানে স্বামীর হাত ধরে নৌকায় উঠলো লাজুক। ঘাট ছেড়ে দিলো নৌকা। এগোতে লাগলো বনের সরু জলপথ ধরে। মোহনীয় রূপকথার জগতে হারিয়ে গেল রমণী। বনের ভেতর বেশ থমথমে, শান্ত। গাছের ডালপালাগুলো পানির ওপর ঝুঁকে আছে। যেন এক সবুজ সুড়ঙ্গ তৈরি হয়েছে। ওপরের ঘন পাতার ফাঁক গলিয়ে অল্পস্বল্প সূর্যের আলো এসে পড়ছে স্বচ্ছ কালচে পানির ওপর। সেই পানিতে গাছের প্রতিচ্ছবি আয়নার মতো দৃশ্যমান। মাঝে মাঝে কোনো বুনো পাখি ডানা ঝাপটে উড়ে যাচ্ছে। বনের নীরবতা ভেঙে চলেছে গাছের ডালে থাকা কাঠবিড়ালির আনাগোনা। নৌকার একদম সম্মুখভাগে বসা লাজুক। পানিতে ডুবে রাখা হাত। শীতল অনুভূতি ছুঁয়ে যাচ্ছে শরীর মন। পেছন হতে ভেসে এলো নির্লিপ্ত কণ্ঠস্বর,

" হাত ডুবিয়ো না। "

পানিতে হাত ঝাপটা দিয়ে,

" কেন? "

" সাপ থাকতে পারে। "

ঝট করে হাত উঠিয়ে নিলো লাজুক। ভয়ে ছোট চোখ। ফিসফিসিয়ে উঠলো,

" সত্যিই? "

" মেইবি। "

এক লহমায় গা ঝাড়া দিয়ে উঠলো রমণী। দৃষ্টি সরিয়ে নিলো। কম্পিত চিত্তে বললো,

" নাহ্! আপনি ঢপ মা'রছেন। এত সুন্দর একটা জায়গা! কি মনোরম পরিবেশ! এখানে সাপটাপ থাকবে না। "

" ওকে। ভয় পেলে কেউ যেন বুকের মাঝে ছুটে না আসে।"

মোবাইল স্ক্রল করতে করতে জানিয়ে দিলো মানুষটা।

" আসবো না আসবো না। প্রয়োজনে মাঝি ভাইয়ের বৈঠা জাপটে ধরবো। তবুও আপনাকে নয়। নিজেকে এত ইম্পর্ট্যান্স না দেয়ার অনুরোধ রইলো। "

ফিচেল হাসলো তানসীভ। মোবাইলে বুঁদ হয়ে পড়লো। মাঝেমধ্যে তাকালো উৎফুল্ল সঙ্গিনীর দিকে। পানিতে পুনরায় হাত ডুবিয়ে পানি ঝাপটাচ্ছে সে। তবে কিছুটা সতর্ক অঙ্গভঙ্গি। আপন মনে নৌকার বৈঠা বাইছেন মাঝি। বৈঠায় পানি কাটার ছপ ছপ শব্দ। বনের ভেতরের বুনো সুবাস। সে এক নয়ানাভিরাম সৌন্দর্য!

•

শহরের এক গোপন, জনমানবহীন আন্ডারগ্রাউন্ড বেজমেন্ট। চারদিকের দেয়াল ভারী কংক্রিটের। বহিরাগত আলো, বাতাস ভেতরে পৌঁছাতে ব্যর্থ। গা ছমছমে লালচে আলোয় আচ্ছাদিত ঘর। ভূতুড়ে, রহস্যময় পরিবেশ। ঘরের ঠিক মধ্যখানে দামী কাঠের টেবিল। টেবিলের ওপর ল্যাপটপ। স্ক্রিনে তানসীভ, লাজুক দম্পতির একটা ছবি। টেবিলের ওপাশে রাজকীয় বিশাল চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে আছেন শ্যাডো ওয়ার্ল্ডের বর্তমান মহারাজ ইলিয়াস সাহেব। হাতে চুরুট। আঙুলের ফাঁকে থাকা চুরুট থেকে ক্রমাগত বি'ষাক্ত ধোঁয়া বের হচ্ছে। মিলিয়ে যাচ্ছে ঘরের লালচে আলোয়। চুরুটে শেষ টান দিয়ে ধোঁয়া সরাসরি ছাড়লেন ল্যাপটপের স্ক্রিনে। চোখের মণি স্থির তানসীভের ছবির ওপর।

" একে একে সবাইকে খত্তম করে দিলে ছোকড়া? ডার্ক ওয়ার্ল্ড থেকে মুক্তি পেয়ে গেছো, ভাবছো তো? "

পৈ'শাচিকতা ফুটে উঠলো ঠোঁটের কোণে। কিবোর্ডে টুকটাক আঙ্গুল চললো। অতঃপর মাউসে চেপে বসলো আঙুল। মাত্র এক ক্লিক। অজ্ঞাত পরিচয়ে এনক্রিপ্টেড মেসেজ পৌঁছে গেল নির্দিষ্ট গন্তব্যে,

' এনজয় ইয়্যর পিস ফর নাউ, মির্জা। দ্য গেম ইজ স্টিল অন.. '

•

নিঝুম রাত। মায়াবী ঘরের আবহাওয়া। বেডের হেডবোর্ডে হেলান দিয়ে বসা তানসীভ। হাতে মোবাইল। পুরো মনোযোগ যান্ত্রিক ডিভাইসে। সহসা মৃদু শব্দে খুলে গেল ওয়াশ রুমের দরজা। চোখ তুলে তাকালো মানুষটা। লহমায় থমকে গেল চোখের পলক! ধক করে উঠলো বুকের ভেতর। ওয়াশ রুমের বাইরে দাঁড়িয়ে লাজুক। পড়নে কালো রঙের শাড়ি। ফিনফিনে পাতলা শিফন শাড়ি। শাড়ির হালকা, ফুরফুরে ভাঁজ অনিন্দ্য রূপে মিশে গৌরবর্ণ ত্বকে। চেহারায় কোনো কৃত্রিম মেকআপের ছোঁয়া নেই। অকৃত্রিম, সতেজতা দৃশ্যমান।‌ কিছু ভেজা চুল লেপ্টে গালে। সেখান থেকে জলকণা গড়িয়ে পড়ছে অলকানন্দার ন্যায়।‌ স্বামীর অলপক, তৃষ্ণার্ত চাহনি। লাজে অবনত হলো রমণীর চোখ। দু হাতের আঙুল চেপে ধরলো শাড়ির আঁচল। মেঝেতে লজ্জার নকশা এঁকে চলেছে পায়ের নখ। অর্ধাঙ্গিনীর অকল্পনীয় সৌন্দর্যে মোহাচ্ছন্ন তানসীভ! হাতে থাকা মোবাইল পড়ে গিয়েছে বিছানায়। সেদিকে খেয়াল নেই। অজ্ঞাত সম্মোহন টেনে তুললো বিছানা হতে। অজান্তেই অগ্রসর হলো পদযুগল। অন্তর্ভেদী চাহনি স্থির সঙ্গিনীর ওপর। একবিন্দুও নড়চড় হলো না। গভীর সে চাহনিতে লুকিয়ে আদিম, তীব্র অধিকারবোধ।

লাজুকের অতি সন্নিকটে এসে দাঁড়ালো তানসীভ। নিঃশ্বাস ছুঁয়ে গেল একে অপরকে। মানুষটার শরীরের তপ্ত ওম, পুরুষালি সুবাস। রমণীকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে নিলো। দুরুদুরু কাঁপছে বক্ষস্থল। মধ্যকার দূরত্ব ঘুচিয়ে ফেললো তানসীভ। দু'হাত বাড়িয়ে লাজুকের মুখখানি আলতো করে নিজ হাতের মুঠোয় তুলে নিলো। তপ্ত আঙুলের ছোঁয়ায় লাজুকের সারা শরীরে মধুর শিরশিরানি বয়ে গেল। চেনা আবেশে বুঁজে গেল চোখ। সঙ্গিনীর কপালে চুমু এঁকে দিলো তানসীভ। দীর্ঘ, পবিত্র সে স্পর্শ। ধীরে ধীরে ঠোঁট ছুঁয়ে গেল চোখের পাতা, নাকের ডগা। নেমে এলো নরম, তুলতুলে গালে। ঠোঁট ডাবিয়ে রাখলো কিছুক্ষণ। শিহরিত রমণী খামচে ধরলো পেশিবহুল বাহু। কম্পিত ঠোঁটের ওমে ডুবে গেল তৃষ্ণার্ত মানব। ভুলে গেল পার্থিব সকল অনুভূতি। মগ্ন হয়ে পড়লো নিজ সুখানুভূতির জগতে। ধীরে ধীরে হৃদতরঙ্গের নিঃশব্দী সুরে চির বন্দী হলো দু'জনে।

-

স্তব্ধ চিত্তে বসে আছেন ইলিয়াস সাহেব! চুরুট হাত ফসকে পড়ে গিয়েছে মেঝেতে। ভ'য়ঙ্কর হতবিহ্বল চাহনি! ল্যাপটপের স্ক্রিনে চেনা সেই মেসেজ,

' এনজয় দ্য ইলিউশন অব কন্ট্রোল। ইট ওন্'ট লাস্ট। গুডবাই। '

•• সমাপ্ত ••

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৩৩তম পর্ব শেষ করেছেন।

আগের পর্ব উপন্যাস সমাপ্ত

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন