#হৃদতরঙ্গের_নিঃশব্দী_সুর
#তাহিরাহ্_ইরাজ
[৩২]
" দূর হও আমার সামনে থেকে। "
তানসীভ চমকে উঠলো! ভয়ে ফ্যাকাসে মুখ।
" সারাক্ষণ শুধু ঘ্যানঘ্যান করো। একদম আমার কাছে আসবে না। যাও.. তোমার মায়ের কাছে গিয়ে খেলো। "
নিস্তব্ধ হয়ে গেল ঘর। দূরে পড়ে থাকা বলের দিকে প্রথমে তাকালো তানসীভ। তারপর ধীরে ধীরে বড় ভাইয়ার দিকে তাকালো। অবুঝ দু'চোখে জমলো অসংখ্য প্রশ্ন। সে কি ভুল করেছে? সে তো খেলা করতে চেয়েছে। ভাইয়ার সঙ্গে। একটু। খুব বেশি না। তাতেই ভাইয়া রাগ করেছে? দুঃখ পেয়েছে? কণ্ঠনালী কেঁপে উঠলো অবুঝ শিশুর। ঠোঁট ফুলে উঠলো অভিমানে। অশ্রুতে ঝাপসা হলো চোখ। মনে ঘুরপাক খেতে লাগলো কত কত প্রশ্ন। ভাইয়া কি তাকে একটুও ভালোবাসে না? সে কি খুব দুষ্টু? পঁচা? খারাপ ছেলে? ভাইয়া কেন কখনো তার সঙ্গে খেলা করে না? সে তো প্রতিদিন অপেক্ষা করে। ভাইয়া স্কুল থেকে ফিরবে। তারপর দু'জনে একসঙ্গে খেলা করবে। যেমন কার্টুন গল্পের ভাই-বোন, বন্ধুরা খেলা করে। তার তো কোনো বন্ধু নেই। বোন নেই। শুধু বড় ভাইয়া আছে? তাহলে ভাইয়া কেন তার সঙ্গে খেলা করে না?
শিশু তানসীভ ধীরপায়ে এগিয়ে গেল। হাতে তুলে নিলো বল। শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো বুকের সঙ্গে। যেন এই গোলাকার জড়বস্তু ই তার একমাত্র বন্ধু। চোখের পানি আটকাতে ব্যর্থ হলো বাচ্চাটা। ফোঁপাতে ফোঁপাতে অগ্রসর হলো নিজের ঘরের দিকে। হাঁটতে হাঁটতে ছোট্ট কাঁধ কেঁপে কেঁপে উঠছে। চলতি পথে পিছু ঘুরে তাকালো একবার। নিষ্কলুষ মনে আশা জেগেছিল। হয়তো ভাইয়া ডাকবে। আদুরে গলায় বলবে,
' আয়, খেলা করি। রাগ করিস না। '
কিন্তু কেউ ডাকলো না তাকে। নিরাশ হয়ে চলে গেল তানসীভ। সেদিনের পর আরো অনেকগুলো দিন, তানসীভ বারবার ছুটে গিয়েছে বড় ভাইয়ার কাছে। কখনো খেলনা গাড়ি নিয়ে। কখনো ড্রয়িং খাতা নিয়ে। কখনো নতুন শেখা ছড়া শোনাতে। প্রতিবারই ফিরে এসেছে একই রকম প্রত্যাখ্যান নিয়ে। ধীরে ধীরে ছোট মনটা গুটিয়ে নিলো নিজেকে।
--
তানসীভের বয়স তখন আট বছর। ঘটনাচক্রে জহুরুল সাহেবের কুৎসিত, গোপন সত্য জানতে পারলেন মিনারা বেগম। জানতে পারলেন ওনার সতীনের করুণ পরিণতি। কিছুতেই মেনে নিতে পারলেন না উনি। যে স্বামীকে এতকাল মনের সিংহাসনে ঠাঁই দিয়েছিলেন, সে মানুষটা এত জ'ঘন্য? এতটা পৈ'শাচিক? সে রাতে মিনারা বেগমের সঙ্গে কথা কাটাকাটি হলো জহুরুল সাহেবের। প্রথমবারের মতো স্ত্রীর গালে চ'ড় মা'রলেন তিনি। তবুও অটল সে নারী। এ যেন ইতিহাসের বি'ষাক্ত পুনরাবৃত্তি। জহুরুল সাহেব অনুধাবন করতে পারলেন, এ নারী ওনার তিলে তিলে গড়ে তোলা সিংহাসন কাঁপিয়ে দিতে প্রস্তুত। সেদিনের বাকবিতন্ডা অতিবাহিত হলো। তার ঠিক এক মাস পর থেকে ধীরে ধীরে রহস্যজনক ভাবে অসুস্থ হয়ে পড়লেন মিনারা বেগম। অসাড় হয়ে আসছে শরীর। স্বাভাবিক কোনো অসুস্থতা নয়। বরং স্বামীর ইশারায় প্রাপ্ত স্লো পয়জনিংয়ের ফলাফল। তিলে তিলে ওনাকে চূর্ণ বিচূর্ণ করা হলো। একসময় বিছানায় একপ্রকার পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে পড়ে গেলেন। থেমে গেল পয়জন পুশ করা। একই ব্যক্তির দুই স্ত্রীর মৃ'ত্যু। সন্দেহজনক বটে। তাই তো দ্বিতীয় স্ত্রীকে জীবিত লা'শ বানিয়ে ঘরের এক কোণে বন্দী করে ফেললেন জহুরুল সাহেব।
শৈশবের শেষ ভাগ। মা শয্যাশায়ী। বাবা ব্যস্ত নিজস্ব নোং'রা ব্যবসায়ীক দুনিয়ায়। ধীরে ধীরে তানসীভের চেনা জগৎ ভেঙ্গে টুকরো টুকরো হয়ে গেল। মায়ের তীব্র অভাব। বাবার চরম অবহেলা। বড় ভাই রায়হান যেন সম্পূর্ণ অদৃশ্য। অচেনা মানুষ। কখনো স্নেহের হাত বাড়িয়ে দেয়নি বড় ভাইয়া। বরং নিজেকে লুকিয়ে রেখেছে দুর্ভেদ্য দেয়ালের আড়ালে।
শৈশব পেরিয়ে কৈশোরে পা রাখলো তানসীভ। মা-বাবার অপরিমেয় শূন্যতা মনের গহীনে বড় ক্ষত সৃষ্টি করলো। কোনো আদরযত্ন নেই। নেই কোনো আগলে রাখার মানুষ। তীব্র একাকীত্ব ভেতরে ভেতরে কুড়ে কুড়ে খেতে লাগলো। সে যন্ত্রনাই ধীরে ধীরে রূপ নিলো ভ'য়ঙ্কর রাগ, জেদে। চারপাশের চরম নি'র্দয় পরিবেশ তাকে বানিয়ে তুললো হৃদয়হীন। শিলাখণ্ডের ন্যায় দৃঢ়। কৈশোরের সেই মনস্তাত্ত্বিক ক্ষোভ প্রকাশ করতে আরম্ভ করলো বেপরোয়া, রুক্ষ আচরণের মাধ্যমে। দিনে দিনে হয়ে উঠলো অবাধ্য, বেয়াড়া স্বভাবের। মহান রব দিয়েছিলেন ক্ষুরধার, তুখোড় বুদ্ধিমত্তা। কিন্তু সঠিক দিকনির্দেশনার অভাবে তা অবহেলিত হয়ে রইলো। স্কুল, কলেজে নামমাত্র পড়ালেখা করতো তানসীভ। অসৎ সঙ্গে পড়ে গেল। সিগারেটের নে'শা পেয়ে বসলো। একদিকে জন্মদাতা পিতার অন্ধকার জগতে পথনির্দেশিকা। অন্যদিকে নিজ বেয়াড়া স্বভাব। দুইয়ের সংমিশ্রনে ছোট্ট তানসীভের অবুঝপনা আজ অতলে হারিয়ে।
প্রথম প্রথম জহুরুল সাহেব নিজ স্বার্থে ছোট ছেলেকে বেশ লাই দিতেন। আহ্লাদে মাথায় তুলে রাখতেন। কিন্তু একসময় এই বুনো, অবাধ্য রূপ ওনার মনে বিদ্বেষের জন্ম দিলো। অবাধ্যতা ওনার চিরকালের অপছন্দ। তাই তো এবার আরো একবার স্বার্থের জন্য ঝুঁকে গেলেন বড় ছেলের দিকে। একসময়ের অবহেলিত ছেলেটা আজ বড় হয়েছে। বাধ্য। নম্র ভদ্র। এমনটাই তো চাই ওনার। ধীরে ধীরে বদলে গেল ওনার দৃষ্টিভঙ্গি। ছোট ছেলেকে শুধু কাজেই প্রয়োজন। দুই ছেলেকে দুই মেরুর বাসিন্দা করে রাখলেন জহুরুল সাহেব। স্বেচ্ছায় এমনটা করলেন উনি। দেখতে দেখতে দুই ভাইয়ের জগৎ সম্পূর্ণ ভিন্ন হয়ে গেল। রায়হান হয়ে উঠলো আলোর পথের এক আদর্শ ভদ্রলোক। তানসীভ হয়ে গেল অন্ধকারের বেপরোয়া যুবক। দুই ভাইয়ের পথ, চিন্তাধারা, দুনিয়া আলাদা হয়ে গেল চিরতরে।
--
রায়হান কখনোই বাবার অন্ধকার জগতে পা রাখতে চায়নি। নিজ ইচ্ছা অনুযায়ী আলোর পথে রয়ে গেল সে। শিক্ষাজীবন শেষে একসময় হয়ে উঠলো সফল আর্কিটেক্ট। বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হলো ইফরাতের সঙ্গে। বহু আগেই তাদের নতুন বাড়ির নামকরণ হয়েছে মরহুমা মায়ের নামে। গুলবাহার মঞ্জিল। আহা! প্রথমার প্রতি সে কি ভালোবাসা!
অন্যদিকে ভার্সিটি জীবনে ছাত্র রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েছিল তানসীভ। কিছুকাল ব্যয় করলো রাজনীতিতে। আরো দুর্নাম কুড়ালো। স'হিংসতায় জড়িয়ে পড়লো কয়েকবার। বছর দুই শেষে তা-ও ত্যাগ করলো। সারাবছর পড়ালেখা নেই। নামমাত্র পাশ করলো অনার্স, মাস্টার্স। মির্জা উত্তরসূরী যেকোনো মূল্যে উচ্চশিক্ষিত হওয়া চাই যে। জহুরুল সাহেবের কড়া নির্দেশ। প্রখর বুদ্ধিমত্তার যথাযথ প্রয়োগ করলো না তানসীভ। সমাজের চোখে হয়ে উঠলো গু'ণ্ডা, চাঁদাবাজ, জমি দখলদার প্রমুখ। নামের পাশে অপরাধী ট্যাগের অভাব নেই।
--
বছর তিনেক পূর্বে মেঘাচ্ছন্ন এক রাত। অফিসের একটি কেবিন। বাইরে গুড়ুম গুড়ুম মেঘ ডাকছে। অন্ধকারাচ্ছন্ন পরিবেশ। কেবিনে তেমন আলো অনুপস্থিত। জহুরুল সাহেবের কড়া নির্দেশ। পার্সোনাল পুরনো ল্যাপটপ থেকে কিছু ডিলেট হওয়া ব্যবসায়ীক ফাইল রিকভার করতে হবে। নির্দেশনা মোতাবেক তানসীভ দায়িত্ব অর্পণ করে বন্ধু নিজামের কাঁধে। জিনিয়াস আইটি এক্সপার্ট নিজাম। ডিপ-স্ক্যান প্রোটোকল চালিয়ে হার্ডডিস্কের একদম গভীরের ডিলিটকৃত ফাইল রিকভার করতে থাকে। পাশেই বসা তানসীভ। দৃষ্টি নিবদ্ধ যান্ত্রিক পর্দায়। আকস্মিক থামার নির্দেশ দেয় সে। নিজাম থেমে যায়। বছর পাঁচেক পুরোনো একটা ডিলিট করা ব্যাকআপ ফাইল। সাধারণ ফাইলের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা। ফাইলটি শুধু এনক্রিপ্টেডই নয় বরং বেশ শক্তিশালী পাসওয়ার্ড দিয়ে প্রটেক্টেড। এত এত ফাইলের ভীড়ে আব্বা কেন এই নির্দিষ্ট ফাইলটাকে এত গভীরভাবে লুকিয়ে রেখেছেন? কী এর বিশেষত্ব? তানসীভের মনে বেশ খটকা লাগে। ফাইল খোলার নির্দেশ দেয় নিজামকে। কাজে লেগে পড়ে নিজাম। তুখোড় বুদ্ধিমত্তা, ব্রুট-ফোর্স অ্যালগরিদম ব্যবহার করে প্রায় আধঘণ্টার চেষ্টায় পাসওয়ার্ড ক্র্যাক করে ফেলে।
পাসওয়ার্ড ক্র্যাক করতেই স্ক্রিনে ভেসে ওঠে একটি আর্কাইভ ফোল্ডার। ল্যাপটপ নিজের কোলে তুলে নেয় তানসীভ। দেখতে পায় জহুরুল সাহেবের বহু বছরের পুরোনো বেশ কিছু অপরাধের নথিপত্র। ব্যাংকের অবৈধ লেনদেন। কিছু অডিও ক্লিপ। সুনিপুণভাবে ফোল্ডার করে সাজানো। ধূর্ত ব্যক্তি ছিলেন জহুরুল সাহেব। সর্বদা এককাঠি ওপরে। প্রতিপক্ষ যদি কখনো ওনাকে ফাঁ'সানোর চেষ্টা করে তবে নিজেই ফেঁ'সে যাবে। ব্ল্যাকমেইলিংয়ের অ'স্ত্র হিসেবে জহুরুল সাহেব ওনার পুরোনো অপরাধের ডিজিটাল কপিগুলো এখানে নতুন করে ব্যাকআপ করে রেখেছিলেন। প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে সদা সতর্ক থাকার ট্রাম্প কার্ড। অনাগ্রহ সহকারে স্ক্রল করছিল তানসীভ। জন্মদাতার অপরাধ জগৎ সম্পর্কে যথেষ্ট জ্ঞাত সে। সহসা স্ক্রল করা আঙ্গুল জমে বরফ হলো। সংকুচিত হয়ে এলো চোখের মণি। স্ক্রিনের এক কিনারে একটা ফাইল। নাম,
' Project_MB_2006 '
এম.বি! অজান্তেই ধক করে ওঠে বুকের ভেতর। কম্পিত হাতে ফাইল ওপেন করে তানসীভ। ভেতরে জহুরুল সাহেবের সাথে ওনার পার্সোনাল ফার্মাসিস্ট বন্ধুর পুরোনো কিছু ই-মেইলের আদান-প্রদান। স্ক্যান করা প্রেসক্রিপশন। একটি অজ্ঞাত রাসায়নিক উপাদানের নাম। ২০০৬ সালের একটা চ্যাট লগ। তাতে ফার্মাসিস্ট ব্যক্তির মেসেজ,
' ডোজ একদম ঠিকঠাক আছে। পয়জনিংয়ের বিষয়টা কেউ ঘুণাক্ষরেও টের পাবে না। রোগী ধীরে ধীরে পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে পড়বে। চিন্তা করবেন না। '
' ম-রে যাবে না তো? '
' না। লিমিটেড ডোজ দিচ্ছি। '
নিমিষেই তানসীভের পায়ের তলা থেকে মাটি সরে গেল। এম.বি। মিনারা বেগম! লহমায় চেনা পৃথিবী হেলে পড়লো অন্ধকার অতলে। মা। তার জন্মদাত্রী মা। শৈশব থেকেই পক্ষাঘাতগ্রস্ত। আজ পর্যন্ত কোনো চিকিৎসা সফল হয়নি। সবটার মূলে তার জন্মদাতা পিতা! স্লো পয়জনিংয়ের শিকার হয়েছেন মা! সে রাতে প্রথমবারের মতো নিজ অস্তিত্বে ফাটল ধরে। চরম দিশেহারা হয়ে পড়ে তানসীভ। নারকীয় টানাপোড়নে বুকের ভেতর দুমড়েমুচড়ে ওঠে। একদিকে জন্মদাতা পিতার এমন বি'ভৎস সত্য। অন্যদিকে গর্ভধারিনী মায়ের করুণ পরিণতি। ঘরের বদ্ধ বাতাসে দম আটকে এলো তানসীভের। কাঁপা কাঁপা হাতে সিগারেট ধরালো। এক টানে বুক ভরা বি'ষাক্ত ধোঁয়া ছাড়লো। বাম হাত দিয়ে জোরে জোরে ডলতে লাগলো বুকের বাঁ পাশ। পাঁজরের ভেতরে হৃৎপিণ্ড এই বুঝি ফেটে চৌচির হবে। অকথ্য শারীরিক, মানসিক যন্ত্রণা গিলে খাচ্ছে তাকে। নেই কোনোরূপ উপশম। চোখের পাতা ভিজে উঠেছে। অন্তরে তীব্র দহন। তবে অতটাও দুর্বল প্রাণ নয় তার। ধীরে ধীরে নিজেকে সামলাতে সক্ষম হলো। অবচেতন মনের দিশেহারা ভাব, তীব্র হাহাকার ধীরলয়ে ভ'য়ঙ্কর রূপ ধারণ করলো। হিমশীতল, অশান্ত ভাব রূপান্তরিত হলো ধিকিধিকি জ্বলতে থাকা এক টুকরো কয়লায়। সবটুকু জ্বালিয়ে পুড়িয়ে দিতে সক্ষম। চোখের ফোঁটা ফোঁটা অশ্রু কণা শুকিয়ে গেল। বক্ষমাঝে ঠাঁই নিলো পা'ষণ্ড, নি'ষ্ঠুর প্রতিশোধের আগুন। দুর্বলতার সময় নয় এখন। আব্বাকে হারাতে হলে ধীরে ধীরে বুনতে হবে অতল মায়াজালের চাটি। সেদিন, সে রাতে জন্ম নিলো এক ইস্পাতকঠিন, ঠান্ডা মাথার শিকারি।
একদিকে নিজ অস্তিত্বে ফাটল। অপরদিকে বুকের মাঝে ধিকিধিকি প্রতিশোধের আগুন। সিদ্ধান্তে উপনীত হয় তানসীভ। এর শেষটা রচিত হবে স্রেফ তার হাতে। কোনোরকম তাড়াহুড়ো করলো না তানসীভ। ধূর্ত শিকারীকে হারাতে ভেতরকার সবটুকু আবেগ বিসর্জন দিলো প্রথমে। অত্যন্ত গোপনে, নিখুঁত সতর্কতায় এগোতে লাগলো লক্ষ্যে। জহুরুল সাহেবের অতীত, বর্তমানের সমস্ত ব্যবসায়ীক নথিপত্র, ব্যক্তিগত জীবনের গোপনীয়তা সম্পর্কে খোঁজ নিতে আরম্ভ করলো। অতল অন্ধকারে ডুব দিতেই বেরিয়ে এলো হাড়হিম করা চাঞ্চল্যকর তথ্য। জহুরুল সাহেবের প্রথম স্ত্রী, তার বড় ভাইয়ের মায়ের মৃ'ত্যু রহস্য। হার্ট অ্যাটাকে স্বাভাবিক মৃ'ত্যু নয়। সেখানেও ষ'ড়যন্ত্রের নিখুঁত নীল নকশা। তানসীভ উপলব্ধি করতে পারে, মির্জা জহুরুল শাহ্ কোনো সাধারণ অপরাধী নন। বন্য এক মাংসাশী জা'নোয়ার। ঠাণ্ডা মাথায় দু'জন নারীর জীবন ধ্বং'স করেছেন তিনি।
--
অতঃপর সূচনা হলো তানসীভের জীবনের সবচেয়ে বড় এবং জটিল 'মাস্টারপ্ল্যান'। ততদিনে শ্যাডো ওয়ার্ল্ডের ক্ষমতাধর এক সদস্য জহুরুল সাহেব। যার পকেটে ঘোরাফেরা করে আইন, প্রশাসন, ক্ষমতা। ওনাকে স্রেফ গায়ের জোরে হটানো অসম্ভব। আকস্মিক আক্রমণ করেও দমানো মুশকিল। ছোট্ট একটা কাঁচা চাল। তার এবং অসুস্থ মায়ের জীবন নিমিষেই শেষ। ফলস্বরূপ দীর্ঘমেয়াদি, ঠাণ্ডা মাথায় দাবাড়ুর চাল চাললো মির্জা তানসীভ শাহ্।
সমাজের চোখে সাধারণ গুণ্ডা, চাঁদাবাজ, জমি দখলদার ইত্যাদি। বাবার বাধ্যগত অনুচর। জেদী, স্বল্পভাষী, রগচটা। তবুও একবাক্যে বাবার হুকুম পালন করে সে। এর দ্বারাই একদিন বিশ্ব জয় করবে জহুরুল সাহেবের দল। তিনি নির্দ্বিধায় মনোযোগ হটিয়ে নিলেন ছোট ছেলের ওপর থেকে। বরং বড় ছেলের প্রতি আদরযত্ন নিবেদন করলেন। ঠিক এমনটাই চেয়েছিল তানসীভ। নিজের ওপর থেকে বাবার মনোযোগ সরে যাওয়া। বেপরোয়া মুখোশের আড়ালে তানসীভ নিজেকে গড়ে তুলতে লাগলো অতন্দ্র শিকারী হিসেবে। বাবার প্রতিটি পদক্ষেপ, প্রতিটি ব্যবসায়ীক ডিল ছায়ার মতো নজরদারি করতে লাগলো। বাধ্য অনুচর রূপে ওনার অগোচরে খুঁড়তে লাগলো সুগভীর কবর। একসময় তানসীভের এই বাধ্যবাধকতাই তার জীবনে নিয়ে এলো নূর'কে। দূরদর্শী পরিকল্পনার এমন পিক টাইমে বাবার কথা অমান্য করার তুচ্ছ, নগন্য ভুল করলো না সে। বাবা বুঝেশুনে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। শান্তশিষ্ট, ভদ্র মেয়ে আমিরুলের। কখনোই গলা উঁচু করে কথা বলবে না। কখনো ওনার ছেলেকে পথভ্র'ষ্ট করতে পারবে না। এই ভীতু মেয়েটাই ওনার নির্দয় ছেলের জন্য মানানসই। বাবার পরিকল্পনা মোতাবেক তানসীভ অনিচ্ছুক মনে বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নিলো লাজুককে। বিয়ের আগে যথেষ্ট খোঁজখবর নিলো। আড়ালে আবডালে তথ্য সংগ্রহ করলো। নিশ্চিত হলো এই মেয়ে তার পথের কাঁটা হতে অক্ষম। বড় নাজুক সে। অতঃপর ধীরে ধীরে সময়ের পরিক্রমায় নাজুক মেয়েটাই হয়ে উঠলো হৃদয়ের অধিকারিণী। তার নূর! তার অন্ধকার অতীতের জন্য বারংবার বিপদের সম্মুখীন হয়েছে এই কোমলমতী। সেজন্য অন্তরে বড় আফশোস! কেন এলো এই রমণী তার জীবনে? তার অতীত কি কখনো ভালো থাকতে দেবে ওকে? মন যে মানতে নারাজ। দূরছাই করতে গিয়েও আর করা হলো না। অবশেষে নত হলো আবেশী অনুভূতির তরে। নিজ স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে মন হারালো নূর-এ।
একদিকে জীবন সঙ্গিনীর মানসিক সাপোর্ট। অন্যদিকে নিজ পরিকল্পনা। সে অনুযায়ী কাজ চালিয়ে যায় তানসীভ। বাবার সিন্ডিকেটের ভেতরকার রিয়েল লুপহোল, অবৈধ পার্টনারশিপ, শুল্ক ফাঁকি। অতীতের মুছে ফেলা সমস্ত ডিজিটাল ডেটার নিখুঁত ক্রোনোলজি বা প্রমাণ তৈরি করতে থাকে তানসীভ, নিজাম বাহিনী। প্রতিটি ফাইল, প্রতিটি চ্যাট লগ এমনভাবে আইনি আদালতের উপযোগী করে গুছিয়ে নেয়, যেন একবার মোক্ষম আঘাত করলেই চিরতরে জহুরুল সাহেবের বাঁচার পথ বন্ধ। একে একে পরম ধৈর্যের সাথে তানসীভ গুছিয়ে নেয় তার চূড়ান্ত আঘাতের প্রতিটা পরিকল্পনা। অবশেষে আজ তিন বছরের সেই র'ক্তক্ষয়ী নীরব সাধনা সফল। তাসের ঘরের মতো ভেঙ্গে পড়েছে জহুরুল সাহেবের পাপের সুবিশাল দুর্গ। হাজত বন্দী তিনি। বাস্তবায়িত হয়েছে দীর্ঘদিনের লালিত প্রতিশো'ধস্পৃহা।
.
নিঝুম, গূঢ় অন্ধকার। থামলো তানসীভ। অতীতের যতটুকু জানা ছিল আজ প্রকাশ্যে এলো। অন্ধকারাচ্ছন্ন জীবন নামক ক্যানভাসের প্রতিটি পাতা মেলে ধরলো অর্ধাঙ্গিনীর নিকটে। বুকের গহীনে পাথরচাপা সত্য আজ উজাড় করে দিলো। ভ'য়ঙ্কর, নি'র্মম অতীতের একেকটি শব্দ তীরবিদ্ধ হলো লাজুকের কান গহ্বরে। স্তব্ধ রমণী! চেনা, হৃদয়হীন মানুষটির অন্তরালে লুকিয়ে ছিল এতবড় ঝড়! কল্পনাও করেনি সে। পুরো শরীর কেমন অবশ হয়ে আসছে। মনের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে একটাই প্রশ্ন। একটা মানুষ কীভাবে এত কিছু সহ্য করতে পারে? মনুষ্য সহ্যক্ষমতার সীমানা এতখানি বিস্তর! ভাবতেই লাজুকের বক্ষস্থলে মোচড় দিয়ে উঠলো। সহানুভূতি, অন্তরে লালিত অনুভূতি একত্রে ভিজিয়ে দিলো চোখ জোড়া। অশ্রুবিন্দু হয়ে ঝড়ে পড়লো নোনাজল। নিজেকে সামলাতে ব্যর্থ হলো লাজুক। হৃদয়াঙ্গনের দ্বিধা ঝেড়ে আশ্রয় নিলো স্বামীর বুকে। শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো মানুষটাকে। আলিঙ্গনে মুছে নিতে চাইলো সবটুকু বেদনাদায়ক ক্ষত। রমণী নরম হাত বাড়িয়ে দিলো প্রশস্ত, শক্ত পিঠে। ধীরে ধীরে পরম মমতায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগলো সেখানে। অকৃত্রিম এ স্পর্শ। শান্ত করার আকুল প্রয়াস। সঙ্গিনীর কোমল স্পর্শে তানসীভের অন্তঃস্থ শক্ত বাঁধ ভেঙে পড়লো। পৃথিবীর বুকে ইস্পাতকঠিন তার ব্যক্তিত্ব। আপন রমণীর কাছে আজ বড় অসহায়। অর্ধাঙ্গিনীর কাঁধে নিভৃতে মুখ গুঁজে দিলো তানসীভ। গড়িয়ে পড়লো একফোঁটা তপ্ত তরল। বছরের পর বছর ধরে বয়ে বেড়ানো একাকীত্ব, কষ্টের অবশেষে হলো অবসান। আরো নিঝুম হলো চারপাশ। স্বামীকে আরেকটু কাছে টেনে নিলো লাজুক। দৃঢ়, অস্ফুট স্বরে বললো,
" আল্লাহ্ ছাড় দেন। ছেড়ে দেন না। "
•
নীরবতায় ছেয়ে আছে লিভিংরুম। পাশাপাশি বসা লাজুক, ইফরাত। অবর্ণনীয় ক্লান্তি, অসহায়ত্ব স্পষ্ট ইফরাতের মুখাবয়বে। ফ্যাকাশে মুখমণ্ডল। লাজুক আলতো করে বড় জায়ের হাত ধরলো।
" ভাবী, নিজেকে যে সামলাতে হবে। "
" আমি.. পারছি না লাজুক। ওর মুখের দিকে.. তাকানোই যাচ্ছে না। কাল থেকে কেমন ছটফট করে চলেছে। খাওয়া-দাওয়া, ঘুম সব ছেড়ে দিয়েছে। "
ভেজা কণ্ঠস্বর ইফরাতের।
" ভাইয়া খুব ভেঙে পড়েছেন। এতগুলো বছর ধরে যে মানুষকে বাবা হিসেবে জেনেছেন আজ তার কুৎসিত সত্য সামনে এসেছে। মায়ের.. খু'নি ওই লোকটা। সন্তান হিসেবে এটা মেনে নেয়া কষ্টের। "
" পাথর হয়ে গেছে ও। বারবার নিজেকে দোষারোপ করছে। "
" ভাইয়াকে বোঝানোর চেষ্টা করুন ভাবী। এক আপনি ছাড়া কেইবা রয়েছে ওনার? ভাইয়া কোনো অপরাধ করেননি। বাবাকে বিশ্বাস করেছিলেন শুধু। সে-ই বিশ্বাসের ভ'য়ঙ্কর প্রতিদান মিললো আজ। "
" এসব কি থেকে কি হয়ে গেল বোন? সবটা.. দুঃস্বপ্নের মতো ভ'য়ঙ্কর। "
" জ্বি। কালবৈশাখীর ঝড় এসেছিল আমাদের জীবনে। যা কিছু পেয়েছে, তছনছ করে দিয়ে গেছে। এবার ঘুরে দাঁড়ানোর পালা। "
ইফরাত নিশ্চুপ।
" ওদিকে আপনার দেবর। ওনার অবস্থা ভাবতে পারছেন? এতদিন একা একা বুকের ভেতর সবটা চেপে রেখেছিলেন। লড়াই করলেন জন্মদাতা পিতার বিরুদ্ধে। দুই ভাইই ভেঙে পড়েছে ভাবী। কেউ প্রকাশ্যে। কেউ গোপনে। "
ইফরাত চোখ তুলে তাকালো। বয়সের চেয়ে বেশি পরিপক্ক আজ লাজুক। কথাগুলো মনে শান্তি দিলো। ইফরাতের হাত দু'টো নিজ হাতের মুঠোয় নিলো রমণী। তার চোখও ছলছল করছে। কিন্তু স্পর্শে আকাঙ্ক্ষিত মানসিক ভরসা।
" ভেঙে পড়ার সময় নয় এখন। আমাদের দায়িত্ব হলো এই বিধ্ব'স্ত পরিবারকে টেনে তোলা। পুনরায় গড়ে তোলা। আমি আর আপনার দেবর সবসময় আপনাদের পাশে আছি ভাবী। নিজেকে কখনোই একা ভাববেন না। আল্লাহ্ আছেন তো ন্যায়ের পক্ষে। "
লাজুকের মুখনিঃসৃত বিশ্বাসের বাণী। গভীর আশ্বাস। ইফরাতের অন্তঃস্থ পাথর যেন কিছুটা হালকা হলো। তপ্ত শ্বাস ফেললো সে। দু'জনে অপেক্ষায় এক নতুন ভোরের।
চলবে।