উপন্যাস: তোর আমার প্রেম
লেখিকা: সুমাইয়া আক্তার
পর্ব – ১
আজকের সকালটা যেন অন্য দিনের চেয়ে একটু বেশি সুন্দর। হালকা বাতাস, নীল আকাশ আর রোদের মিষ্টি উষ্ণতা—সব মিলিয়ে মন ভালো করে দেওয়ার মতো একটা সকাল।
—"আজকের দিনটা অনেক সুন্দর, কী বলিস আয়রিন?"
হেসে জিজ্ঞেস করল তাসনিম।
—"হুম, তুই ঠিকই বলছিস। আচ্ছা চল, কলেজে দেরি হয়ে যাচ্ছে।"
দুজন পাশাপাশি হাঁটতে শুরু করল।
আয়রিন সিকদার, সিকদার পরিবারের বড় মেয়ে। তার বাবা বেলাল সিকদার বাংলাদেশের একজন স্বনামধন্য ব্যবসায়ী। মা নয়না সিকদার একজন গৃহিণী হলেও শখ-আহ্লাদে ভরপুর একজন মার্জিত নারী। বড় ভাই আরিয়ান সিকদার বাবার ব্যবসার দায়িত্ব সামলায়। আর পরিবারের সবচেয়ে ছোট মেয়ে নিধি সিকদার, যে এবার এসএসসি পরীক্ষার্থী। বয়স মাত্র ষোলো।
অন্যদিকে তাসনিম তালুকদার তালুকদার পরিবারের ছোট মেয়ে। তার বাবা হুমায়ুন তালুকদারও একজন প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী এবং বেলাল সিকদারের সবচেয়ে কাছের বন্ধু। মা হুমায়রা তালুকদার একজন স্নেহশীলা গৃহিণী। বড় ভাই নেহাল তালুকদার কাজের সূত্রে ছয় বছর ধরে জাপানে থাকে। শতবার বলার পরও দেশে ফেরার সময় যেন তার আর হয় না।
হাঁটতে হাঁটতেই আয়রিন বিরক্ত মুখে ব"কিরে, তাড়াতাড়ি হাঁট। দেরি হলে আবার ওই টাকলা বুড়ো ক্লাসে ঢুকতেই দিবে না!"
আয়রিনের কথা শুনে তাসনিম হেসে ফেলল।
—"তুই জমিল স্যারকে এত সহ্য করতে পারিস না কেন?"
আয়রিন নাটকীয় ভঙ্গিতে বলল,
—"আর বলিস না! একদিন অসুস্থ ছিলাম বলে হোমওয়ার্ক করতে পারিনি। তারপর এমন লেকচার দিল যে মনে হলো আমি বুঝি দেশের সবচেয়ে বড় অপরাধ করে ফেলেছি! বজ্জাত বুড়ো একটা!"
তাসনিম এবার আর হাসি চেপে রাখতে পারল না। ওর হাসি দেখে আয়রিন ভান করে রেগে বলল,
—"শালী, তোর সাথে আর কথা বলব না। তোর মতো বান্ধবী থাকার চেয়ে না থাকাই ভালো!"
হাসতে হাসতেই তাসনিম বলল,
— "তোর এসব বাচ্চাদের মতো কথা শুনে না হেসে উপায় আছে?"
— "হয়েছে, আর হাসতে হবে না। কলেজে এসে গেছি, চল ক্লাসে।"
ঠিক তখনই পিছন থেকে কেউ ডাকল,
— "এই, তাসনিম!"
দুজনেই ঘুরে দেখল সৌরভ দাঁড়িয়ে আছে। ওদেরই সহপাঠী। তাসনিমের সঙ্গে ভালো বন্ধুত্ব থাকলেও আয়রিনের সঙ্গে শুধু টুকটাক কথাবার্তা হয়।
তাসনিম হেসে বলল,
—"কিরে সৌরভ, আজ এত লেট?"
সৌরভ মাথা চুলকে বলল,
— "আর বলিস না বইন, রাস্তায় একটা রিকশাও পাচ্ছিলাম না। তাই দেরি হয়ে গেল। আচ্ছা, চল ক্লাসে যাই।"
— "হুম, চল।"
কথা বলতে বলতে সৌরভ মাঝে মাঝেই আয়রিনের দিকে তাকাচ্ছিল। তার চোখের ভাষা অনেক কিছুই বলে দিচ্ছিল। সে আয়রিনকে পছন্দ করে—এটা আয়রিন বুঝলেও কখনো গুরুত্ব দেয়নি।
কারণ আয়রিনের বড় ভাই আরিয়ান তাকে ছোটবেলা থেকেই শিখিয়েছে, অযথা কোনো ছেলের সঙ্গে অতিরিক্ত মেলামেশা করবে না। তাই স্বভাব যতই চঞ্চল হোক, ছেলেদের সঙ্গে একটা দূরত্ব সে সবসময় বজায় রাখে।
তবে একজন মানুষ ব্যতিক্রম।
রুদ্র মির্জা।
আরিয়ানের সবচেয়ে কাছের বন্ধু। ছোটবেলা থেকেই রুদ্রকে চেনে আয়রিন। গম্ভীর স্বভাবের, কম কথা বলা, কিন্তু অসম্ভব সুদর্শন। ছোটবেলা থেকেই রুদ্রকে ভালো লাগত আয়রিনের। তবে সেই অনুভূতির কথা সে কখনো মুখ ফুটে বলেনি। আর রুদ্র বুঝেছিল কি না, সেটাও আজও অজানা।
সৌরভ আবার "তোরা আজকের প্রজেক্ট এনেছিস?"
— "হুম, এনেছি।" জবাব দিল তাসনিম।
আয়রিন মুখ বাঁকিয়ে বলল,
—"দূর! ওই টাকলার ক্লাস করতে একদম ইচ্ছা করে না!"
তাসনিম সঙ্গে সঙ্গে কপালে ভাঁজ ফেলে বলল,
— "শোন আয়রিন, এটা কিন্তু শেষবারের মতো বলছি। তোর মুখে যদি আর কোনো গালি শুনি, তাহলে আন্টিকে সব বলে দেব। এটা লাস্ট ওয়ার্নিং।"
আয়রিন দুই হাত জোড় করে নাটকীয় ভঙ্গিতে বলল,
"আচ্ছা মা, আপনি যা বলিবেন তাই করিব!"
ওর কথা শুনে সৌরভ হেসে ফেলল।
— "তুই সত্যিই পারিস বইন!"
— "পারব না কেন? আমি কার মেয়ে দেখতে হবে না?" বলে জিভ বের করে দিল আয়রিন।
হঠাৎ পিছন থেকে ভেসে এল এক গম্ভীর কণ্ঠস্বর—
—"তোমরা ক্লাসের সময় এখানে কী করছ?"
তিনজনই চমকে পিছনে ফিরে তাকাল।
সামনে দাঁড়িয়ে আছে এক অচেনা যুবক। শ্যামবর্ণ, সুঠাম গড়ন, পরনে সাদা শার্ট আর কালো প্যান্ট। চোখে এক ধরনের কঠোরতা, অথচ মুখে অদ্ভুত মায়া। তাকে দেখলে যে কোনো মেয়ের এক মুহূর্তের জন্য হলেও তাকিয়ে থাকতে ইচ্ছে করবে।
আয়রিন ভ্রু কুঁচকে বলল,
—"কে আপনি? আপনাকে আবার বলতে যাব আমরা এখানে কী করি?"
যুবকটি শান্ত গলায় বলল,
— "আমি নিলয় চৌধুরী। আজ থেকে তোমাদের ডিপার্টমেন্টের নতুন শিক্ষক। এবার বলো, ক্লাসে না গিয়ে এখানে দাঁড়িয়ে আছ কেন?"
আয়রিন অবিশ্বাসের সুরে বলল,
—"আপনি বললেই বিশ্বাস করব? আমাদের স্যার তো জমিল স্যার!"
নিলয় সংক্ষেপে উত্তর দিল,
— "আগে ছিলেন। তিনি পদত্যাগ করেছেন। আজ থেকে আমি দায়িত্ব নিয়েছি।"
কথাটা শুনে আয়রিন আর সৌরভ দুজনেই আনন্দে লাফিয়ে উঠল।
—"সত্যি! টাকলা বুড়ো আর নেই!"
অন্যদিকে তাসনিম যেন বাকরুদ্ধ হয়ে নিলয়ের দিকেই তাকিয়ে ছিল। কেন জানি অচেনা মানুষটাকে দেখে তার চোখ সরছিল না।
নিলয় কড়া গলায় বলল,
— "এভাবে একজন শিক্ষক সম্পর্কে কথা বলা ঠিক নয়। শিক্ষককে সম্মান করতে শিখো। এবার সবাই ক্লাসে যাও।"
আয়রিন মুখ বাঁকিয়ে তাসনিমের হাত টেনে নিয়ে চলে গেল। সৌরভও মাথা নিচু করে বলল,
—"সরি, স্যার।"
সবাই চলে যাওয়ার পর নিলয় স্থির দৃষ্টিতে আয়রিনের চলে যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে রইল।
মৃদু হেসে মনে মনে বলল,"এই সুহাসিনীর জন্যই তো এই কলেজে চাকরিটা নেওয়া... শুধু একবার, প্রতিদিন, তাকে দেখার জন্য..."
চলবে...