**উপন্যাস:** তোর আমার প্রেম
**লেখিকা:** সুমাইয়া আক্তার
**পর্ব – ২**
কলেজের বেল বাজতেই তাসনিম আর আয়রিন তাড়াতাড়ি ক্লাসের দিকে ছুটল। করিডোর দিয়ে যাওয়ার সময় তাসনিম আয়রিনের হাত চেপে ধরে উত্তেজিত গলায় বলল,
— "আয়রিন, একটু দাঁড়া না! ওড়নাটা ঠিক আছে তো? লিপবামটা ঠিক আছে?"
আয়রিন অবাক হয়ে বলল,
— "কিরে, হঠাৎ এত সাজুগুজুর ভূত চাপল কেন তোর মাথায়?"
— "আরে, একটু পরেই তো নিলয় স্যারের ক্লাস! নতুন স্যার, প্রথম দিনেই যদি উনার সামনে বিচ্ছিরি লাগে, কেমন দেখায় বল তো?" তাসনিম লাজুক হেসে বলল।
আয়রিন চোখ উল্টে বলল,
— "ধুর! ওই গম্ভীর স্যারের ক্লাসের জন্য এত রূপচর্চা করার কিছু নেই।"
দুজনে ক্লাসে ঢুকে নিজের সিটে বসল। কিছুক্ষণের মধ্যেই পুরো ক্লাসে এক অদ্ভুত নীরবতা নেমে এল। দরজা দিয়ে ভেতরে পা রাখলেন **নিলয় চৌধুরী**।
আজ পরনে নেভি ব্লু শার্ট, চোখে চশমা। উনার হাঁটার ভঙ্গি আর ব্যক্তিত্বেই এমন একটা তেজ, যা দেখে যে কারো চোখ আটকে যাবে। তাসনিম তো একদৃষ্টিতে গালে হাত দিয়ে নিলয়ের দিকে তাকিয়ে রইল। মনে মনে ভাবল—*এত নিখুঁত কোনো মানুষ কীভাবে হতে পারে!*
নিলয় ডেস্কে বই আর ডায়েরিটা রেখে ধীর গম্ভীর গলায় বলল,
— "গুড মর্নিং। আমি নিলয় চৌধুরী। আজ থেকে আমি তোমাদের এই সাবজেক্টটা পড়াব। ক্লাসে কথা বলা বা মনোযোগ না দেওয়া আমি একদম পছন্দ করি না।"
নিলয়ের গম্ভীর কণ্ঠ শুনে পুরো ক্লাস একদম নিস্তব্ধ হয়ে গেল। সে সোজা বোর্ডে গিয়ে টপিকের নাম লিখে পড়া বোঝাতে শুরু করল।
পড়াতে পড়াতেই নিলয়ের তীক্ষ্ণ নজর বেঞ্চগুলোর দিকে যাচ্ছিল। তাসনিম এখনও অপলক দৃষ্টিতে ওর দিকেই চেয়ে আছে, যা নিলয় খেয়াল করলেও পুরোপুরি এড়িয়ে গেল।
কিন্তু নিলয়ের নজর এসে থমকে গেল আয়রিনের ওপর। আয়রিন জানালার বাইরে তাকিয়ে মন দিয়ে পাখির ওড়াউড়ি দেখছিল!
নিলয় চক হাতে নিয়ে সোজা আয়রিনের বেঞ্চের সামনে এসে দাঁড়াল।
— "মিস সিকদার।"
নিলয়ের গভীর ও গম্ভীর কণ্ঠ শুনে আয়রিন চমকে উঠে সোজা হয়ে দাঁড়াল।
— "ইয়েস... ইয়েস স্যার!"
নিলয় চশমাটা একটু ঠিক করে বরফশীতল কণ্ঠে বলল,
— "আমার ক্লাসে জানালা দিয়ে বাইরের পাখি দেখার চেয়ে বোর্ডে মনোযোগ দেওয়াটা বেশি জরুরি। আশা করি প্রথম দিনেই আমাকে এসব আলাদা করে বুঝিয়ে বলতে হবে না?"
আয়রিন নিচু মুখে ঢোক গিলে বলল,
— "না স্যার... সরি, ভুল হয়ে গেছে।"
নিলয় ওর দিকে কিছুক্ষণ স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। আয়রিনের ভয় পাওয়া মিষ্টি চেহারাটা দেখে নিলয়ের কঠোর গম্ভীর ভাবটা এক সেকেন্ডের জন্য নরম হয়ে এসেছিল, কিন্তু সে তা প্রকাশ হতে দিল না।
গভীর ও শান্ত গলায় বলল,
— "বসো। ক্লাসে মনোযোগ দাও।"
আয়রিন বসে পড়ে একটা বড় শ্বাস ফেলল। পাশে থাকা তাসনিম আয়রিনের হাতে একটা ছোট চিমটি কেটে ফিসফিস করে বলল,
— "তুই সত্যি একটা গাধা! স্যার এত সুন্দর করে পড়াচ্ছিলেন, আর তুই কিনা জানালার বাইরে তাকাচ্ছিলি!"
আয়রিন মুখ বেঁকিয়ে মনে মনে বলল, *হয়েছে রে ভাই! তোর স্যারের এত প্রেমে পড়তে হবে না!*
ক্লাস শেষ করে নিলয় যখন ডিপার্টমেন্টের করিডোর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিল, তখন কলেজের অন্য মেয়েরা দূর থেকে উনাকে দেখে ফিসফিস করছিল। কিন্তু নিলয় সেদিকে বিন্দুমাত্র নজর না দিয়ে সোজা হেঁটে চলে গেল।
কারো ওপর অনর্থক রাগ না দেখালেও, নিলয়ের চারপাশে এমন এক রাশভারী আর আভিজাত্যের দেয়াল ছিল, যা ভেদ করা কারো পক্ষে সম্ভব নয়। কেবল একজন ছাড়া—যার চঞ্চলতার খবর নিতেই এই কলেজে আসা!
কলেজের করিডোরে দাঁড়িয়ে থাকা আয়রিন তখনও জানে না, নিলয় স্যারের এই কঠিন আর গম্ভীর আড়ালে শুধু তারই নাম লেখা রয়েছে...।
**(চলবে...)**