উপন্যাস: তোর আমার প্রেম
লেখিকা: সুমাইয়া আক্তার
পর্ব – ১৭
মাসুমের টানে সিকদার ভিলার অন্দরমহলে ফিরে আসার পর থেকেই আয়রিনের বুকটা যেন দুকূপিয়ে কাঁপছিল। ড্রয়িংরুমের ঠিক মাঝখানে তখন এলাহি কাণ্ড চলছে। আলোকসজ্জা, ক্যামেরার ফ্ল্যাশ লাইট আর কাজিনদের হইচইয়ে চারপাশটা একদম গমগম করছে।
তাসনিম আর আরিয়ানের এনগেজমেন্টের আগের এই ছোটখাটো ফোটোশুট ও রিহার্সাল অনুষ্ঠানে চারদিকে হাসিখুশির রোল উঠেছে। সোফায় বসে তাসনিম লজ্জায় লাল হয়ে বারবার ওড়না ঠিক করছে, আর আরিয়ান হবু স্ত্রীর পাশে দাঁড়িয়ে মিষ্টি হেসে পোজ দিচ্ছে।
আয়রিন এক পাশে এসে দাঁড়াতেই তাসনিম দূর থেকে তাকে হাত ইশারায় ডেকে নিজের পাশে বসাল। ফিসফিস করে বলল—
— "কিরে আয়রিন? এতক্ষণ কোথায় ছিলি বল তো? লনের দিকে তো বেশ হাওয়া খাচ্ছিলি! এদিকে মাসুম ভাইয়া তো তোর নামে কত কী লাগাল!"
আয়রিন ঢোক গিলে কোনোমতে নিজেকে সামলে নিয়ে স্বাভাবিক গলায় বলল—
— "কই আর! এমনি একটু ফ্রেশ বাতাসে দাঁড়িয়ে ছিলাম। তা হঠাৎ মাসুম ভাইয়া কী বলল?"
তাসনিম চোখ টিপে দুষ্টু হেসে কিছু একটা বলতে যাবে, ঠিক তখনই ভিড়ের মধ্যে চোখ পড়ল ড্রয়িংরুমের এক কোণে দাঁড়িয়ে থাকা নিলয় চৌধুরীর ওপর।
নিলয়ের পরনে আজ একটি কালো রঙের ফরমাল শার্ট। তিনি সোজা হয়ে পকেটে হাত গুঁজে দাঁড়িয়ে আছেন, আর তাঁর প্রখর ও তীক্ষ্ণ দৃষ্টি যেন পুরো ঘরে একমাত্র খুঁজে ফিরছে আয়রিনকেই। লনে ঘটা সেই মুহূর্তটার পর নিলয়ের চোখের চাউনিতে যে এক তীব্র অধিকারবোধ ও না-বলা দাবি লুকিয়ে ছিল, তা কেবল আয়রিনের হৃৎস্পন্দন বাড়িয়ে দেওয়ার জন্যই যথেষ্ট ছিল।
ঠিক সেই মুহূর্তেই ড্রয়িংরুমে প্রবেশ করলেন বাড়ির বড়রা। বেলাল তালুকদার আর হুমায়ুন সিকদার একসাথে হেসে হেসে সবার উদ্দেশ্যে বললেন—
— "কী রে, তোদের ফোটোশুট শেষ হলো? এবার একটু রাতের খাবারের আয়োজনটা দেখা যাক!"
বড়দের কথায় চারপাশের হইচই আরও বেড়ে গেল। সবাই মিলে ডাইনিং হলের দিকে এগোতে শুরু করল। ভিড়ের চাপে আয়রিন যখন একটু পেছনে পড়ে গেল, তখন হঠাৎ করেই কেউ একজন তার হাত হালকা করে টেনে ধরল।
চমکه পেছনে ফিরে আয়রিন দেখল—সিঁড়ির ঠিক আড়ালে, যেখানে অতিথিদের ভিড়টা একটু কম, সেখানে এসে দাঁড়িয়েছেন নিলয় চৌধুরী।
আয়রিনের গলা দিয়ে কোনো আওয়াজ বের হলো না। সে ফিসফিস করে ভয়ে ভয়ে বলল—
— "ম... মিস্টার চৌধুরী! এখানে কেন? কেউ দেখে ফেললে..."
নিলয় অত্যন্ত কাছে ঝুঁকে এসে, তাঁর সেই মায়াবী ও গম্ভীর চোখে আয়রিনের চোখে চোখ রেখে বরফশীতল অথচ এক মায়াকড়া গলায় বলে উঠলেন—
— "সবাইকে সামলানোর দায়িত্ব কি শুধু আমার একাই, সুহাসিনী? লনে মাসুমের সামনে যেভাবে আমতা আমতা করছিলে, তার হিসাব কিন্তু এখনও চুকানো বাকি আছে।"
নিলয়ের এই হঠাৎ নিখাদ অধিকার ফলানোর ভঙ্গি আর অসম্ভব রকমের কাছাকাছি চলে আসায় আয়রিনের মাথার ভেতর যেন রিমঝিম বৃষ্টি শুরু হয়ে গেল। সে লজ্জায় চোখ নামিয়ে নিল।
নিলয় একটু নিচু হয়ে তাঁর কানের কাছে অত্যন্ত আলতো অথচ ধীর কণ্ঠে বলে উঠলেন—
— "খুব শীঘ্রই এই লোকগুলোর চোখের আড়ালে তোমাকে আমার মনের সব কথাগুলো শুনতে হবে, আয়রিন। পলায়নপর ভাবটা এবার একটু কমাও।"
বলেই নিলয় আর এক মুহূর্ত সেখানে দাঁড়ালেন না। গম্ভীর পায়ে ভিড়ের মধ্যে মিশে গেলেন। আর আয়রিন স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল, তার বুকের ভেতর তখন বইছে এক অচেনা ঝোড়ো হাওয়া!
(চলবে...)