ফুফাত **উপন্যাস:** তোর আমার প্রেম
**লেখিকা:** সুমাইয়া আক্তার
**পর্ব – ১৫
সিকদার ভিলার রাজকীয় লনের এক কোণে সন্ধ্যার ফুরফুরে বাতাস আর মৃদু আলোর রোশনাই এক স্নিগ্ধ আমেজ তৈরি করেছিল। অন্দরমহলে বিয়ের কেনাকাটা আর অতিথিদের আপ্যায়ন নিয়ে সবাই যখন ব্যস্ত, ঠিক তখনই লনের পাশ ঘেঁষে থাকা মার্বেলের ওয়াকওয়ের কাছে দাঁড়িয়ে আনমনে ডায়েরির পাতা ওল্টাচ্ছিল আয়রিন।
হঠাৎ করেই পেছনের পরিচিত এক মিষ্টি হাসির আওয়াজে আয়রিন চমকে পেছনের দিকে তাকাল। দেখল, হাতে দুটি কফির কাপ নিয়ে সেখানে এসে দাঁড়িয়েছে **রুদ্র মির্জা**!
আজ রুদ্রর পরনে ছাই রঙের একটি স্টাইলিশ শার্ট। ছোটবেলা থেকেই রুদ্রর এই শান্ত ও যত্নশীল রূপটা আয়রিনের ভীষণ প্রিয়। রুদ্র একটা কফির কাপ আয়রিনের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে খুব মায়াবী হাসিতে বলল—
— "সিকদার বাড়ির এই বিশাল হুল্লোড় থেকে পালিয়ে হঠাৎ একা একা এখানে চলে এলে যে, আয়রিন? একা একা কার কথা ভাবছিলে বলো তো?"
রুদ্রর এমন অমায়িক ব্যবহার আর চেনা ছোঁয়া পেয়ে আয়রিনের মুখটা আনন্দে চকচক করে উঠল। সে লজ্জামাখা হেসে কফির কাপটা হাতে নিয়ে খুব আদুরে গলায় বলল—
— "কই আর একা! তুমি তো এলে রুদ্র ভাইয়া। আসলে ওই শোরগোল আর ভিড়ভাট্টা আমার ঠিক ভালো লাগছিল না, তাই এখানে এসে দাঁড়ালাম।"
রুদ্র খুব স্নেহে আয়রিনের মাথায় একটা হালকা টোকা দিয়ে ওর আরও একটু কাছে এসে দাঁড়াল। ঠিক তখনই সিকদার ভিলার মূল দরজা দিয়ে লনে এসে পৌঁছালেন **নিলয় চৌধুরী**।
হাতে এক কাপ কফি নিয়ে তিনি ঠিক লনে পা রাখতেই উনার তীক্ষ্ণ চোখ দুটো আটকে গেল সামনে দাঁড়িয়ে থাকা দৃশ্যটার ওপর। রুদ্র আর আয়রিনের এই খোশগল্প, রুদ্রর স্নেহের ছোঁয়া আর আয়রিনের সেই লাজুক মুখভঙ্গি—নিলয়ের চোখের সামনে যেন এক পলকে আগুন জ্বালিয়ে দিল!
নিলয়ের সেই বরফশীতল ও শান্ত মুখাবয়বটা নিমেষেই শক্ত হয়ে গেল। উনার চশমার পেছনের চোখ দুটো ক্রোধ ও তীব্র জেলাসি (Jealousy) বা হিংসেয় লাল হয়ে উঠল। দীর্ঘদিন ধরে যে সুহাসিনীকে তিনি নিজের মনের গহীনে সর্বস্ব দিয়ে ভালোবেসেছেন, অন্য কোনো পুরুষের সাথে তাকে এত ঘনিষ্ঠভাবে হাসিখুশি দেখতে হবে—এটা নিলয়ের সহ্য ক্ষমতার বাইরে চলে গেল। উনার হাতের কফির কাপ ধরা আঙুলগুলো রাগে শক্ত হয়ে কাঁপতে লাগল।
নিলয় আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়িয়ে রইলেন না। অত্যন্ত ক্ষিপ্র ও গম্ভীর পায়ে হেঁটে তিনি সোজাসুজি গিয়ে দাঁড়ালেন আয়রিন আর রুদ্রর ঠিক সামনে।
নিলয়ের হঠাৎ এই আকস্মিক উপস্থিতিতে রুদ্র ও আয়রিন দুজনেই চমকে উঠল।
নিলয় রুদ্রর দিকে এক পলক শীতল দৃষ্টিতে তাকিয়ে, অত্যন্ত বরফশীতল ও ভরাট গলায় বলে উঠলেন—
— "মিস্টার মির্জা, ভেতরে মুরুব্বিরা সবাই আপনাদের খুঁজছেন। একজন মেয়েকে এভাবে একা পেয়ে অহেতুক সময় নষ্ট না করে ভেতরে যাওয়াটাই বোধহয় শ্রেয় হবে।"
নিলয়ের গলায় এমন তীব্র তিরস্কার আর কঠোরতা শুনে রুদ্র একটু অবাক হয়ে ভ্রূ কুঁচকে ফেলল। সে ভদ্রভাবেই বলল—
— "ওহ, আচ্ছা মিস্টার চৌধুরী! আমরা এখনই ভেতরে যাচ্ছি।"
রুদ্র চলে যাওয়ার জন্য পা বাড়ালেও, যাওয়ার আগে আয়রিনকে আশ্বস্ত করে মৃদু হাসল। রুদ্রর সেই হাসিতে নিলয়ের ভেতরে জমে থাকা জেলাসি যেন দাবানলের মতো জ্বলে উঠল।
রুদ্র লন থেকে ভেতরে চলে যাওয়ার সাথে সাথেই নিলয় এক ঝটকায় আয়রিনের হাত ধরে তাকে টেনে সিকদার ভিলার ছায়ার নিচে, পিলারের আড়ালে নিয়ে গেলেন!
আয়রিন ভয়ে ও লজ্জায় কেঁপে উঠল। সে হাঁপাতে হাঁপাতে ফিসফিস করে বলল—
— "ম... মিস্টার চৌধুরী! কী করছেন এটা? কেউ দেখে ফেললে..."
নিলয় নিজের রাগ আর তীব্র জেলাসি আর লুকিয়ে রাখতে পারলেন না। তিনি আয়রিনের আরও কাছে ঝুঁকে এসে, উনার সেই প্রখর ও গভীর চোখে চোখ রেখে অত্যন্ত নিচু ও থমথমে কণ্ঠে বলে উঠলেন—
— "দেখে ফেলুক! আজ সারা দুনিয়া জানুক যে এই সুহাসিনী কার! বারবার ওই অন্য যুবকের সাথে তোমার অমন হাসাহাসি আর আমার চোখের সামনে তার অতিরিক্ত যত্ন নেওয়ার ভঙ্গি—আর সহ্য হয় না, আয়রিন!"
নিলয়ের মুখে হঠাৎ এমন অধিকারবোধ আর তীব্র অনুভূতির প্রকাশ দেখে আয়রিনের বুকটা ধক করে উঠল। সে বাকরুদ্ধ হয়ে কেবল নিলয়ের সেই জ্বলন্ত চোখের দিকে তাকিয়ে রইল।
নিলয় অত্যন্ত কাছে এসে ফিসফিস করে বললেন—
— "তোমার এই চঞ্চল মনকে অন্যের দিকে একটুও ঝুঁকতে দেখলে আমার ভেতরের মানুষটা ধ্বংস হয়ে যায়, সুহাসিনী। আজ পরিষ্কার করে বলে দাও—তোমার এই অবুঝ হৃদয়ে কি কেবলই আমার নাম লেখা?"
সিকদার ভিলার ফুরফুরে বাতাসে নিলয়ের এই উন্মাদনাভরা জেলাসি আর ভালোবাসার তীব্রতা আয়রিনের পুরো অস্তিত্বে।
সিকদার ভিলার রাজকীয় লনের পেছনের সেই নিভৃত কোণে পিলারের আড়ালে থমকে গিয়েছিল সময়টা। নিলয়ের চাউনিতে থাকা তীব্র অধিকারবোধ আর কথার গভীরতা আয়রিনের হৃৎস্পন্দন যেন এক পলকে বাড়িয়ে দিয়েছিল। দীর্ঘদিন ধরে দূর থেকে ভালোবেসে যাওয়া সেই গম্ভীর মানুষটির এমন উন্মাদনাভরা জেলাসি বা হিংসে আয়রিনকে সম্পূর্ণ বাকরুদ্ধ করে দিয়েছিল। সে কেবল বড় বড় চোখে নিলয়ের জ্বলন্ত ও আকুল চোখের দিকে তাকিয়ে রইল, মুখে কোনো টু শব্দ করার সাহস পেল না।
নিলয় যখন আয়রিনের আরও একটু কাছে ঝুঁকে তার উত্তরের অপেক্ষায় ছিলেন, ঠিক তখনই লনের অন্য পাশ থেকে এক চনমনে ও পরিচিত গলার আওয়াজ ভেসে এল—
— "আরে আয়রিন! তুই এখানে লুকিয়ে কী করছিস বল তো? ভেতরে সবাই মিলে তোকে খোঁজ করছে!"
হঠাৎ এই দূরন্ত গলার আওয়াজে দুজনেই চমকে দূরে সরে দাঁড়াল। নিলয় দ্রুত নিজের বরফশীতল ও রাশভারী ব্যক্তিত্বের খোলসে ফিরে গেলেন, আর আয়রিন তাড়াতাড়ি ওড়নাটা ঠিক করে এদিক-ওদিক তাকাতে লাগল।
লনের ছায়াঘেরা পথ ধরে হেঁটে এগিয়ে এল **মাসুম**—আয়রিনের দূরসম্পর্কের সেই দুষ্টু ও চঞ্চল ফুফাতো ভাই, যে ঢাকার বাইরে থাকে কিন্তু যেকোনো পারিবারিক অনুষ্ঠানে ঠিক হাজির হয়ে যায়। মাসুমের পরনে রঙিন একটা প্রিন্টেড শার্ট, হাতে স্টাইলিশ ঘড়ি আর মুখে সেই চিরচেনা দুষ্টু হাসি।
মাসুম সোজা হেঁটে আয়রিনের সামনে এসে দাঁড়াল। এসেই সে কৌতূহলী চোখে একবার আয়রিনের লাজুক ও ফর্সা মুখটার দিকে তাকাল, আর ঠিক তার পাশেই দাঁড়িয়ে থাকা অত্যন্ত গম্ভীর ও ব্যক্তিত্বময় চেহারার নিলয় চৌধুরীকে দেখতে পেল। মাসুমের চঞ্চল চোখ দুটো এক সেকেন্ডের জন্য কুঁচকে গেল। সে ভুরু উঁচিয়ে সন্দিগ্ধ গলায় বলে উঠল—
— "কিরে আইরিন ? তুই এই অন্ধকারের কোণে একা একা কী করছিস? আর এই ভদ্রলোক কে? তোদের এভাবে পিলারের আড়ালে দাঁড়িয়ে কী কথা হচ্ছিল একটু আমাদেরও শোনা!"
মাসুমের এই হঠাৎ হানা দেওয়া এবং খামাখা প্রশ্ন করায় আয়রিনের ফর্সা গাল দুটো ভয়ে ও লজ্জায় আরও বেশি লাল হয়ে উঠল। সে কোনোমতে তোতলাতে তোতলাতে বলে উঠল—
— "না... মানে মাসুম ভাইয়া! উনি... উনি হলেন নিলয় চৌধুরী... আমাদের... মানে ওনার সাথে এমনি একটু কথা হচ্ছিল!"
নিলয় পকেটে হাত গুঁজে অত্যন্ত শান্ত, ভাবলেশহীন অথচ তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে মাসুমের দিকে তাকালেন। উনার চেহারার সেই স্বাভাবিক গাম্ভীর্য ও আভিজাত্য দেখে মাসুমের ভেতরের চটুল ভাবটা এক মুহূর্তের জন্য থমে গেল। মাসুম একটু আমতা আমতা করে নিলয়কে উদ্দেশ্য করে বলল—
— "ওহ... আসসালামু আলাইকুম, মিস্টার চৌধুরী! আমি আসলে বুঝতে পারিনি..."
নিলয় সংক্ষেপে মাথা দুলিয়ে অত্যন্ত ভারী ও গম্ভীর কণ্ঠে উত্তর দিলেন—
— "ওয়ালাইকুমুস সালাম। কথা শেষ হয়ে থাকলে মিস আয়রিনকে নিয়ে ভেতরে চলুন, বাইরে এভাবে একা একা দাঁড়িয়ে থাকাটা বাড়ির পরিবেশের সাথে মানানসই নয়।"
নিলয়ের কথার সেই কড়া ও শাসানোর সুরে মাসুম সামান্য অপ্রস্তুত হয়ে গেল। সে দ্রুত হাসির ভাব এনে আয়রিনের হাত ধরে বলল—
— "চল রে আপু, ভেতরে যা কাণ্ড হচ্ছে দেখলে মাথা ঘুরে যাবে! বড় ভাইয়া আর তাসু আপুর ফোটোশুট চলছে, সবাই তোকে খুঁজছে।"
মাসুম আয়রিনকে টেনে নিয়ে ভেতরের দিকে হাঁটা শুরু করল। যাওয়ার আগে আয়রিন একবার পেছনের দিকে তাকিয়ে নিলয়ের বরফশীতল অথচ মায়ায় ভরা চোখ দুটোর দিকে তাকাল। নিলয় ঠোঁটের কোণে এক চিলতে অদৃশ্য হাসি ঝুলিয়ে নীরবে ইশারায় তাকে ভেতরে চলে যেতে বললেন।
মাসুমের এই হুট করে চলে আসা এবং তাদের ব্যক্তিগত মুহূর্তে বাধা পড়ায় নিলয়ের ভেতরের জেদ ও অধিকারবোধ যেন আরও কয়েক গুণ বেড়ে গেল। তিনি মনে মনে দৃঢ় প্রতিজ্ঞা করলেন—এই লোকগুলোর নজর এড়িয়ে খুব শীঘ্রই তিনি তার সুহাসিনীকে পাকাপাকিভাবে নিজের করে নেবেন।
**(চলবে...)**