* নীল জামা, সাদা পাজামা পরে, গলায় সিফনের সাদা ওড়না জড়িয়ে, কাঁধে স্কুল ব্যাগ ঝুলিয়ে ব্যস্ত রাস্তার পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছি। আজকে বাবা অনেক বকা দিবে। বাবা স্কুল থেকে সেই কখন বাসায় চলে গিয়েছে, কিন্তু আমি এখনো যেতে পারছি না। মনে হচ্ছে আজ মায়ের হাতের মার আমার কপালেই লেখা আছে- তাই রাস্তাটাও যেন শেষই হচ্ছে না।
একটু পরেই মাগরিবের আজান দিয়ে দেবে। তার আগেই আমাকে বাড়িতে পৌঁছাতে হবে, না হলে মা আজকে ঘরে ঢুকতেই দেবে না। সব দোষ ওই তিনটা বাঁদরের! এরা বন্ধু-বান্ধবী নামের কলঙ্ক। যেখানে যাই, কট খাইয়েই ছাড়ে। যেমন আজ আমাকে মায়ের হাতে কেলানি খেতে হবে, সেটাও ওদের জন্য।
স্কুল ছুটির পর বাবার সাথেই বাড়ি চলে যেতাম, কিন্তু তা আর হয়নি। বাবার কাছ থেকে অনুমতি নিয়েই রিয়া, মিনা, মিনাজ আর আমি এক বান্ধবীর বাসায় দাওয়াত খেতে গেলাম। কিন্তু সেখান থেকে ফিরতে ফিরতে এত দেরি হয়ে গেল! এখন তাড়াতাড়ি বাড়ি যাওয়ার জন্য যেন রাস্তাটার সাথে যুদ্ধ করছি। রাস্তাটাও দেখি আমার থেকেও বেশি বেয়াদব, আমি যত সামনে এগোচ্ছি, এর দৈর্ঘ্য ততই বাড়ছে! আর আমি যে বেয়াদব- এটা আমি বলি না। এটা বলে আমার মা আর বড় আপু।
অবশেষে রাস্তার সাথে যুদ্ধে আমিই জয়ী হলাম। আজানের পাঁচ মিনিট আগে বাড়িতে এসে পৌঁছালাম। কিন্তু কপালে যা লেখা থাকে, তা তো হবেই! এই যে বললাম কেলানি খাব- ব্যাস, খেয়েও নিলাম। তবে বেশি খেতে হয়নি। কারণ ততক্ষণে আরেক ভক্ষক থুক্কু, রক্ষক আমার জন্য বসার ঘরে অপেক্ষা করছিল।
আমাদের তো বড় দালান নেই যে আলাদা ড্রয়িং রুম থাকবে। টিনের ঘর, তাই “বসার ঘর” বললেই বেশি মানায়। যাই হোক, মায়ের হাতের দুইটা ভাতের কাঠির বাড়ি খেয়ে চলে গেলাম কাকিদের ঘরে। আমি নিজে থেকে যাইনি, মা বলেছে যেতে। আমাদের ঘরে নাকি মেহমান বসে আছে।
আমি অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী। নাম হাওয়া। যা, ফুঁ দিলেই উড়ে যাবে! আমার নামের সাথে আমার বেশ মিল আছে। নাম হাওয়া, দেখতে মাশাআল্লাহ হাড্ডি! দুইটার কম্বিনেশন একদম জোস। সবাই বলে আমার গায়ে নাকি একটু জোরে বাতাস লাগলেই উড়ে যাব।
আমি মধ্যবিত্ত ঘরের মেয়ে। আমার বাবা একজন প্রাইমারি স্কুলের সাধারণ শিক্ষক। আমরা পাঁচ বোন। আল্লাহ আমাদের কোনো ভাই দেননি। বাবা বলে, তার জন্য নাকি পাঁচটা জান্নাতের দরজা প্রস্তুত আছে। কিন্তু মা এতে তেমন খুশি না, তার একটা ছেলে দরকার।
সবার থেকে মা আমার উপর একটু বেশিই ক্ষেপে থাকেন। শুনেছি, আমার জন্মের সময় নাকি কোনো ডাক্তার বলেছিল ছেলে হবে। মা তখন খুব খুশি, ভাবছিলেন আল্লাহ তার দিকে মুখ তুলে তাকিয়েছেন। কিন্তু মায়ের সব আশায় এক বালতি কনকনে ঠান্ডা পানি ঢেলে দিয়ে ধরনীর বুকে উদয় হলাম আমি!
ছেলের জায়গায় আমি হওয়াতে মা একটু নারাজ ছিল। তবে মা আমাকে অনেক ভালোবাসে। সব আপুদের দিয়ে কাজ করায়, কিন্তু আমাকে দিয়ে করায় না। এমনিতেই আমি অনেক আলসেমি করি, মাও করায় না, আমিও নিজ থেকে করি না।
আমার বড় তিনটা আপুর বিয়ে হয়ে গেছে। সব দুলাভাইয়ের পারিবারিক অবস্থা মোটামুটি ভালো। আমার বড় আপু আনিকা, মেজো আপু সুমি, সেজো আপু রুবি আর ছোট আপু কনিকা। কনিকা আপুর এখনো বিয়ে হয়নি। আপু এবার এইচএসসি পরীক্ষা দেবে। আপুর জন্য বিয়ের প্রস্তাব এলে বাবা না করে দেন। কারণ আপুর ইচ্ছে, সে পড়াশোনা করে অনেক বড় কিছু হবে। বাবাও তার ইচ্ছার গুরুত্ব দিয়ে তাকে পড়াশোনা করাচ্ছেন।
কাকিদের ঘরে আনিকা আপু আমাকে শাড়ি পরাচ্ছে। আমি বারবার জিজ্ঞেস করছি,
"আমাকে কেন শাড়ি পরানো হচ্ছে। আমি তো স্কুল থেকে এসেছি, এখন গোসল করব।
আনিকা আপু বলল,
"এখন গোসল করতে হবে না, কাল করিস। আজ এত গোসলের জন্য পাগল হয়েছিস কেন? অন্য সময় তো মা মারলেও গোসল করতে চাস না!
আপুর কথায় আমি চুপ করে গেলাম। এভাবে কেউ সত্যি কথা বলে! আমি না হয় তিন-চার দিন পরপর গোসল করি, তাতে কী এমন হয় বুঝি না? প্রতিদিন তো সেই গোসল করে, যার শরীরে পচা গন্ধ হয়! আর প্রতিদিন গোসল করলে আমি মোটা হব কী করে? গোসল না করলেই তো চামড়ার সাথে ময়লা জমে চামড়া ভারি হবে, তারপর আমি মোটা হব! না হলে এই জন্মে আমি কখনো মোটা হব নাকি? কিন্তু আমার এই দুর্দান্ত বুদ্ধিগুলো কি আর ওদের মতো বোকা মানুষের মাথায় ঢুকবে!
আমাকে শাড়ি পরিয়ে সবাই চলে গেল। কাকিদের খাটের ওপর বসে আনিকা আপুর মেয়ের কাছ থেকে চিপস খাচ্ছিলাম। হঠাৎ দরজার বাইরে থেকে কেউ গলা খাঁকারি দিল। আমি ভাবলাম দুলাভাই হয়তো। তাই চিৎকার দিয়ে বললাম,
“আপু নাই, এই ঘরে আমি আর ময়না একা!”
ময়নার হাত থেকে মুঠোভরে চিপস নিয়ে বললাম,
“আমার ব্যাগে দুইটা আইস'ললি আছে, নিয়ে আয়। তোকে একটা দিব, আমি একটা খাব। এই বালের শাড়ি, কি গরম!”
ময়না “আচ্ছা” বলে চলে গেল। আমি একা রুমে বসে রইলাম। বাইরে থেকে আবার কেউ বলল,
“ভেতরে আসতে পারি?”
আমি কণ্ঠটা খেয়াল না করেই বলে উঠলাম,
“কি বা'ল! এটা কি আমার ঘর নাকি যে আমি অনুমতি দিব? এই ঘর যেহেতু আমার না, তাই যার ইচ্ছে আসবে, যার ইচ্ছে যাবে!”
আমার এই বকবকানির মাঝেই কেউ দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকল। আমি ঘুরে তাকাতেই,
“আল্লাহ! কি সুন্দর একটা বেডা!”
মনে মনে ভাবলাম, এ আবার কোন ইংরেজের বাচ্চা! আমাদের বাড়িতে এলো কীভাবে? মনে হয় কোনো নায়ক শুটিং করতে এসেছে। আমার এই আজগুবি চিন্তার মাঝেই বেডায় আমার থেকে প্রায় তিন হাত দূরে খাটে বসে পড়ল। আর আমি এখনো একইভাবে তার দিকেই তাকিয়ে আছি। আমাকে এভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে ওনি বললেন,
“এভাবে তাকিয়ে আছো কেন? নজর লেগে যাবে।”
ওনার কথায় একটু লজ্জা পেলাম, কিন্তু পাত্তা দিলাম না। আবারও ওনার দিকে তাকিয়ে বললাম,
“আপনি কে? আর এখানে কী করেন?”
আমার কথায় উনি কিছু বললেন না। কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন,
“কিছুক্ষণ পর তুমি চিরকালের জন্য যার নামে হয়ে যাবে, আমি সেই।”
ওনার কথার কোনো মানে আমি ঠিক বুঝলাম না। তাই বোকার মতো ওনার দিকে তাকিয়ে রইলাম। উনি আমার হাতের মুঠো থেকে একটা চিপস মুখে নিয়ে বললেন,
“এগুলো কি হাতে সাজিয়ে রাখার জন্য রেখেছো নাকি?”
ওনার কথায় খেয়াল হলো, আমি তখন ময়নার কাছ থেকে চিপস নিয়ে রেখেছিলাম। নিজের মুখে একটা চিপস দিয়ে বললাম,
“সাজিয়ে রাখব কেন, খাওয়ার জিনিস অবশ্যই খেয়ে ফেলব।”
উনি আমার দিকে তাকিয়ে বললেন,
“একটু পরে কী হবে, তুমি কি কিছু জানো?”
আমি এবার একটু বিরক্ত হলাম। চিনিনা, জানিনা তবুও ঘরে ঢুকে গেছে, আবার আমার সাথে বকবক করছে। কি আজব মানুষ! আমি কিছু বলতে যাব, এমন সময় ময়না আইস'ললি নিয়ে ঘরে ঢুকল। আমার হাতে একটা আইস'ললি ধরিয়ে দিয়ে বলল,
“খালামুনি, তুমি খাও। আমারটা নিয়ে গেলাম। একটু পরে বিয়ে খাব।”
আমি কিছু না বুঝেই জিজ্ঞেস করলাম,
“এই, তুই এখন কার বিয়ে খাবি? আর এখন এই সময় কারও বিয়ে হবেই বা কী করে?”
উনি আমার দিকে কেমন অদ্ভুত চোখে তাকিয়ে আছেন। মনে হলো, উনি আমার কাছ থেকে এমন কথা আশা করেননি। তাই অবাক হয়ে তাকিয়ে থেকেই বললেন,
“সেকি, তুমি জানো না কার বিয়ে? জিজ্ঞেস করছো কেন?”
আমি বললাম,
“আমি কী করে জানব কার বিয়ে হচ্ছে? আমি তো মাত্র বাড়িতে আসলাম, আর আপু জোর করে শাড়িটা পরিয়ে দিল।”
উনি শান্ত গলায় বললেন,
“আর দশ মিনিট পর তোমার আর আমার বিয়ে হচ্ছে। আর তুমি বলছো তুমি জানো না?”
আমি অবাক হয়ে বললাম,
“এহহ, আপনার সাথে আমার বিয়ে হবে কোন দুঃখে? আর আমি অনেক ছোট! আমার আপুর এখনো বিয়ে হয়নি, আর আমি বিয়ে করবো কেন? আজব!”
উনি বললেন,
“বিশ্বাস না হলে তোমার বাবাকে জিজ্ঞেস করো। কাজী এসেছেন, আসলেই তোমার বিয়ে হচ্ছে। আজকেই তোমাকে আমরা নিয়ে যাব।”
ওনার কথা আমার মাথায় কিছুই ঢুকছিল না। কী বলছে এসব! আমাকে কি সত্যিই বিয়ে দিয়ে দেবে নাকি? না না, এখনই বাবার সাথে কথা বলতে হবে। বাবা হঠাৎ করে আমায় বিয়ে দিবে কেন? এটা কোন ধরনের কথা! আমি আর কিছু ভাবতে পারছিলাম না। কোনো দিকে না তাকিয়ে, ওনাকে ঘরেই রেখে আমি দৌড়ে বেরিয়ে গেলাম। বাবাকে খুঁজে পেলাম বসার ঘরে, কয়েকজন মুরব্বির সাথে কথা বলছেন। আমি বাবার সামনে দাঁড়িয়ে বললাম,
“এসব কী বাবা? তুমি নাকি আমায় বিয়ে দেবে, তাও আবার এখন! আমি তো অনেক ছোট!”
সবার সামনে দাঁড়িয়ে বাবাকে এমন কথা বলায় তিনি একটুও ইতস্তত করলেন না। আমাকে টেনে নিয়ে গেলেন খাবার ঘরে। বাবা আমাকে বুঝানোর স্বরে বললেন,
“ওনারা আমাদের অনেক বড় উপকার করেছেন। তুমি বিয়ে করলে তোমার আপু পড়তে পারবে। তোমার বড় দুলাভাই তাদের কোম্পানিতে চাকরি পাবে। প্লিজ মা, বিয়েটা করে নাও।”
আমি খুব কষ্ট পেলাম। বাবা এসব কী বলছেন? বাবা তো এমন ছিলেন না! তাহলে এখন কেন এমন করছেন? আর আমার বিয়ের সাথে আপুর পড়াশোনার কী সম্পর্ক? আমার নিজের পড়াশোনারই বা কী হবে? এই ভাবনার মাঝেই কাজী চলে এলেন। বাবা বললেন,
“চুপচাপ ভদ্র মেয়ের মতো কবুল বলে দেবে। তুমি এতটা অবুঝ না যে পরিবারের আর্থিক সমস্যাটা বুঝতে পারছ না।”
বাবা চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে মা বললেন,
“কবুল বলবে না কেন? বলতে তো হবেই। আজাইরা বসে বসে অন্ন ধ্বংস করলে হবে না।”
মায়ের কথা শুনে এই প্রথম খুব কান্না পেল। কিন্তু কাঁদলাম না। হঠাৎ করেই কেমন যেন পাথর হয়ে গেলাম। মনে হচ্ছিল গলাটা কেউ চেপে ধরেছে। ভীষণ বলতে ইচ্ছে করছিল,
"আমি এখনো ছোট, প্লিজ তোমরা আমায় বিয়ে দিও না।
কিন্তু বলতে পারলাম না। অগত্যা বাবার কথামতো চুপচাপ “কবুল” বলে দিলাম। হয়ে গেলাম নাম না জানা কোনো এক পুরুষের অর্ধাঙ্গিনী।
বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সময় কেন যেন কান্না আসল না। কিন্তু ভেতরে ইচ্ছে হচ্ছিল, খুব করে কাঁদতে, সবাইকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে। কিন্তু কাঁদলাম না। সবার আগে গিয়ে ওনাদের আনা গাড়িতে উঠে বসলাম। রওনা হলাম সেই অচেনা এক গন্তব্যে। এরপর কী হবে, জীবনের মোড় কোথায় গিয়ে থামবে, কিছুই জানি না…!
—————চলবে~——————
#কবুলের_আড়ালে_চুক্তি
০১.
#𝐀𝐧𝐯𝐞𝐬𝐡𝐚_𝐍𝐢𝐡𝐚𝐫𝐢𝐤𝐚
🚫কপি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ🚫