ফন্ট সাইজ:
থিম:
কবুলের আড়ালে চুক্তি

২য় পর্ব

লেখক: অন্বেষা নীহারিকা

#কবুলের_আড়ালে_চুক্তি

০২.

#𝐀𝐧𝐯𝐞𝐬𝐡𝐚_𝐍𝐢𝐡𝐚𝐫𝐢𝐤𝐚

সবার আগে গিয়ে ওনাদের আনা গাড়িতে উঠে বসলাম। রওনা হলাম সেই অচেনা এক গন্তব্যে। এরপর কী হবে, জীবনের মোড় কোথায় গিয়ে থামবে, কিছুই জানি না…!

ওনাদের বাড়িতে আসতে আসতে রাত এগারোটা বেজে গেল। একজন বয়স্ক মহিলা আমাকে একটা রুমে রেখে গেলেন। যাওয়ার সময় কিছু খচ্চর-টাইপ কথাও বলে গেলেন। শুনলাম, তিনি নাকি ওনার দাদি। আমি ছোট মানুষ, তেমন কিছু বুঝি না, তাই দাদির কথাগুলো শুনে একটু ভয় পেয়ে গেলাম।

কিছুক্ষণ পর আমার শাশুড়ি এলেন আমাকে খাবার খাওয়ার জন্য নিতে। আমি ঘোমটা দিয়ে বসে থাকায় শাশুড়ি আমাকে ভালো করে দেখেননি। বাড়িতে ঢোকার সময়ও আমি ঘোমটা দিয়েই ছিলাম। উনি কেমন যেন একটু দূরত্ব রেখে ব্যবহার করলেন আমার সাথে। বললেন,

“ঘোমটা সরাও, এভাবে থাকার কী আছে? এখানে তো কোনো পুরুষ মানুষ নেই।”

শাশুড়ির কথায় আমি একটু ভয় পেয়ে গেলাম। ওনার কণ্ঠটা শক্ত, তীক্ষ্ণ, ধারালো। আমি ভয়ে ভয়ে ঘোমটা সরালাম। উনি আমার দিকে তাকিয়ে বললেন,

“এতটুকু একটা মেয়ে! আবার বিয়েও দিয়ে দিল! তোমার কি কোনো সমস্যা আছে? নাহলে এত ছোট মেয়েকে বিয়ে দেয় কেন?”

আমি অবাক হয়ে শাশুড়ির দিকে তাকিয়ে রইলাম। এসব কী বলছেন উনি! আমার আবার কী সমস্যা থাকবে? আর উনি কি আমার খোঁজখবর না নিয়েই ছেলের বিয়ে করিয়েছেন? আমার ভাবনার মাঝেই শাশুড়ি আবার বললেন,

“নিচে চলো, খাবার খাবে।” (অন্বেষা নীহারিকা)

আমি শাশুড়ির সাথে নিচে চলে এলাম। ডাইনিং টেবিলে বসেছি, এমন সময় উনি (আমার স্বামী) বাসায় ঢুকলেন। কিন্তু কোনো দিকে না তাকিয়ে সোজা সিঁড়ি বেয়ে নিজের ঘরে চলে গেলেন। মনে হলো, উনি যে আজই বিয়ে করেছেন তার কোনো ভাবই নেই! দাদি শাশুড়ি আমাকে মৃদু ধাক্কা দিয়ে বললেন,

“মায়ানকে ডেকে নিয়ে আসো, যাও একসাথে খাবে।”

আমি অবাক হয়ে দাদির দিকে তাকালাম। আজব ব্যাপার! আমি এই বাড়িতে আসলাম দুই ঘণ্টাও হয়নি, আর উনি আমাকে বলছেন ‘মায়ান’কে ডেকে আনতে! আমি একটু ইতস্তত করে বললাম,

“আসলে আমি তো মায়ান কে সেটা জানি না। আমি কীভাবে ডেকে আনব? আর এই বাড়িটাও তো চিনি না, কোথা থেকে ডেকে আনব, দাদি?”

দাদি শাশুড়ি আমার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে বললেন,

“হায় হায়! এই মাইয়া কয় কী! নিজের জামাইয়ের নাম জানে না! এডা কেমন বউ?”

দাদির কথা শুনে আমি জিভে কামড় দিলাম। “এই রে! আমি তো সত্যিই ওনার নাম এতক্ষণ জানতাম না!” আমার কী দোষ! কেউ তো আমার সামনে ওনার নাম নেয়নি, আর আমিও কাউকে জিজ্ঞেস করিনি! দাদি শাশুড়ীকে থামিয়ে দিয়ে শাশুড়ী বলল,

“তুমি বসো তো, মায়ান একটু পরে চলে আসবে।”

খাওয়া-দাওয়া শেষ করে আমি ওনার রুমের সামনে দাঁড়িয়ে আছি। একটা ছোট পিচ্চি মেয়ে আমাকে এখানে দিয়ে গেল। এটা নাকি ননদের মেয়ে।

দুইবার দরজায় টোকা দিলাম। কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে নিজেই রুমে ঢুকে গেলাম। আমার আবার কারও অনুমতি নিয়ে রুমে ঢোকার অভ্যাস নাই। উনি যেহেতু আমাদের বাড়িতে রুমে ঢোকার সময় অনুমতি নিয়েছিল, তাই ভাবলাম আমিও একটু নেই। কিন্তু তার কোনো প্রয়োজনই পড়ল না। রুমে ঢুকে দেখি পুরো রুম খালি! খাটের একপাশে গিয়ে বসলাম।

একটু পরে উনি রুমের ভেতর থেকে গুপ্ত রুমের মতো একটা ঘর থেকে বের হয়ে আসল। আমি মনে মনে চমকে উঠলাম,

"এই বেডা কি নারী পাচারকারী নাকি! নিজের রুমের সাথে আবার গুপ্ত রুম!

উনি আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ সেজেগুজে নিল। আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে আছি। মনে মনে বললাম,

"বেডা, তুই এমনিতেই অনেক সুন্দর, এত সাজার কি দরকার!

উনি হয়তো খেয়াল করলো আমি ওনার দিকে ভ্যাবলার মতো তাকিয়ে আছি। তাই হালকা গলা খাঁকারি দিয়ে বলল,

“আমি কি বেশি সুন্দর? তোমার সাথে দেখা হওয়ার পর থেকে এভাবে তাকিয়েই থাকো। তোমারই তো জামাই, এত তাকিয়ে থাকার কি আছে?”

ওনার কথায় আমি অনেক লজ্জা পেলাম। মনে হচ্ছিল মাটি ফেটে যাক আর আমি নিচে ঢুকে যাই। পরে আবার ভাবলাম,

"না না, এমন হলে তো আমার এই সুন্দর জামাই অন্য মাইয়া লইয়া যাইবো!(অন্বেষা নীহারিকা)

আমার এসব আজগুবি ভাবনার উপর ব্রেক কষে উনি বলল,

“বাসর রাতে স্বামীকে প্রথম দেখে সালাম দিতে হয়, জানো না? কেউ শিখিয়ে দেয়নি?”

আমি একেবারে বেয়াক্কেল বনে গেলাম। আরে, দাদি তো আমায় শিখিয়ে দিয়েছিল! আমি-ই ভুলে গিয়েছিলাম। তড়িঘড়ি করে উঠে ওনার কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম। মাথা ঝুঁকিয়ে পায়ে সালাম করতে যাব উনি থামিয়ে দিয়ে বলল,

“পায়ে ধরে সালাম করতে হবে না, মুখে সালাম দিলেই হয়।”

আমি ওনাকে মুখে সালাম দিয়ে বললাম,

“দাদি তো বলে গেল পায়ে ধরে সালাম করতে।”

আমার কথা শুনে উনি ড্রেসিং টেবিল থেকে সরে আমার কাছে এসে দাঁড়াল। আমি ওনাকে এত কাছে আসতে দেখে দু’পা পিছিয়ে গেলাম। উনি কেমন যেন করে তাকাল, আমি কিছুই বুঝলাম না! তাই না বুঝেই বলে ফেললাম,

“ভাইয়া, আপনাদের লেপটিনটা কোথায়?”

উনি কপাল কুঁচকে আমার দিকে তাকিয়ে বলল,

“হোয়াট কাইন্ড অফ লেপটিন ইজ দিস?”

আমি মনে মনে বলি,

"এই রে! এই ইংরেজের বাচ্চা আমার সাথে ইংরেজি বলছে! আমি আবার ইংরেজি কম বুঝি! কিন্তু এটা এই বেডারে কেমনে বুঝাই!

যাই হোক, বুঝলাম বেডা ‘লেপটিন’ চিনে না। আমি হাতের সব আঙুল মুড়িয়ে কাইনা আঙুল দেখিয়ে বললাম,

“আরে টয়লেট! এক নাম্বারে যাবো!”

এতক্ষণে উনি বুঝলেন। আমাকে ঘরের ভেতরে সেই গুপ্ত রুমটার দিকে দেখিয়ে বলল,

“যাও।”

আমি চোখ বড় বড় করে বললাম,

“ছিঃ! আমি টয়লেটে যেতে চেয়েছি বলে আপনি আমাকে পাচার করে দিবেন নাকি!”

উনি আমার কথায় পুরো অবাক হয়ে বলল,

“হোয়াট ননসেন্স! আমি তোমাকে পাচার করার কথা কখন বললাম? আর আমি পাচার করি এটা তোমায় কে বলল?”

আমি বললাম,

“তাহলে ওই গুপ্ত ঘরে যেতে বলছেন কেন? আমি তো টয়লেটে যাব বলেছি!”

উনি হতাশার শ্বাস ছেড়ে বলল,

“এটা ওয়াশরুম, এটা কোনো পাচারখানা না। যাও, তাড়াতাড়ি ফ্রেশ হয়ে এসো।”

আমি ফ্রেশ হয়ে এসে দেখি উনি খাটে শুয়ে পড়েছেন। আমি দোনোমনা করছ। কি করবো বুঝতে পারছি না। উনি খাটে শুয়ে পড়লেন, আমি কোথায় ঘুমাব? এক জায়গায় দাঁড়িয়ে অস্বস্তিতে মোচড়ামুচড়ি করতে দেখে উনি বললেন,

“কি সমস্যা? ওখানে দাঁড়িয়ে আছো কেন? ঘুমাতে আসো।”

আমি ওনার কথা শুনে ধীরে ধীরে এগিয়ে গেলাম। খাটে উঠতে যাবো, ঠিক তখনই দাদির শিখিয়ে দেওয়া কথাগুলো হঠাৎ মাথায় ভেসে উঠল। আমি আবার পিছিয়ে গেলাম। উনি আমার দিকে তাকিয়ে নরম গলায় বললেন,

“কি হলো? আসো। অনেক রাত হয়ে গেছে। ঘুমাবে না?”

আমি একটু ইতস্তত করে বললাম,

“ঘুমাব, আপনি কি এখন আমার সাথে দাদি যেগুলো শিখিয়ে দিয়ে গেছে সেগুলো করবেন?”

আমার কথাটা শেষ হতেই উনি কেমন যেন এক অদ্ভুত হাসি দিলেন, না পুরো হাসি, না পুরো গম্ভীর। আমি সেই হাসি দেখে ভেতর থেকে একটু কেঁপে উঠলাম। উনি হঠাৎ উঠে এসে আমার হাতটা ধরলেন। আমি কিছু বুঝে ওঠার আগেই এক টানে ওনার খুব কাছে চলে গেলাম। কিছু একটা যেন থমকে গেল আমার ভেতরে। হৃদস্পন্দন বেড়ে গেল অজান্তেই। হঠাৎ কোমরে ঠান্ডা একটা স্পর্শ লাগতেই আমার পুরো শরীর কেঁপে উঠল। নিশ্বাস যেন আটকে গেল। জীবনে প্রথম কোনো পুরুষের এমন স্পর্শ আমাকে অস্থির করে দিল। ধীরে ধীরে সেই স্পর্শটা আরও দৃঢ় হলো। আমার শরীরের প্রতিটা লোমকূপ যেন একসাথে কেঁপে উঠল। আমি আতঙ্কে দুই হাতে ওনাকে ঠেলে সরাতে চাইলাম। কিন্তু ওনার শক্তির সামনে আমি যেন একেবারে অসহায়, ছোট্ট একটা পাখির মতো। উনি আমার কানের কাছে মুখ এনে খুব নিচু স্বরে বললেন,

“দাদি কি করার কথা বলেছে?”

আমি কাঁপা কণ্ঠে খুব সরলভাবে বললাম,

“আ-আপনি এ-এখন যে-যেগুলো ক-করছেন!”

আমার কথাটা শেষ হতে না দিতেই উনি ধীরে ধীরে আমার ভয়টা থামিয়ে দিলেন। আমি ঠিকভাবে শ্বাস নিতে পারছিলাম না। একটু পর যখন আমার দমবন্ধ ভাবটা বেড়ে গেল, উনি আমাকে ছেড়ে দিলেন। আমি হাঁপাতে হাঁপাতে ওনার বুকে হালকা করে ঢলে পড়লাম। যেন সেই মুহূর্তে শক্তি হারিয়ে ফেলেছি আমি। উনি আর কিছু না বলে খুব সাবধানে আমাকে কোলে তুলে নিলেন। তারপর যত্ন করে বিছানায় শুইয়ে দিলেন।

রুমের লাইটটা নিভে গেল। উনিও আমার পাশে শুয়ে পড়লেন। আমি ভেবেছিলাম, হয়তো এবার শান্ত ঘুম আসবে, কিন্তু না। ভেতরের অজানা একটা অনুভূতি আমাকে ঘুমোতে দিচ্ছিল না। বাল্যকালেই যেন হঠাৎ করে এক অচেনা পরিপক্ব সম্পর্কের ভেতরে নিজেকে হারিয়ে ফেললাম।

হালকা ভোরের আলো ধীরে ধীরে পৃথিবীর বুকে ছড়িয়ে পড়েছে। চারদিকে আজানের শব্দ ভেসে আসছে। জ্বরের তাপে আমার পুরো শরীর থরথর করে কাঁপছে। উনি পাশ ফিরে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। বহু কষ্টে কাঁপতে থাকা শরীরটা নিয়ে উঠে দাঁড়ালাম। ধীরে ধীরে, টলতে টলতে ওয়াশরুমে গিয়ে ওযু করে এলাম। নামাজ পড়লাম। কয়েকবার ওনাকে ডাক দিলাম। কোনো সাড়া না পেয়ে আবার নিঃশব্দে শুয়ে পড়লাম…

————চলবে~~————

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ২য় পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন