#কবুলের_আড়ালে_চুক্তি
১৩.
#𝐀𝐧𝐯𝐞𝐬𝐡𝐚_𝐍𝐢𝐡𝐚𝐫𝐢𝐤𝐚
কায়ান আবেশে ধীরে ধীরে দুচোখ বন্ধ করে নিল। মনে হচ্ছিল, বহু দিনের অস্থিরতার পর সে যেন প্রথমবারের মতো শান্তি নামের কোনো অনুভূতির ছোঁয়া পেল। যেন এই স্পর্শটার জন্যই সে এতগুলো বছর অজান্তে অপেক্ষা করে ছিল।
কিছুক্ষণ দু’জনেই নিঃশব্দে বসে রইল। চারপাশে সন্ধ্যার নরম বাতাস বইছে। দূরে শিশুদের হাসির শব্দ ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাচ্ছে। আকাশের রঙ আরও গাঢ় হচ্ছে। অথচ সেই বেঞ্চটার উপর যেন সময় থমকে গেছে। কিছুক্ষণ পর কায়ান ধীরে ধীরে চোখ খুলল। তারপর নিচের দিকে তাকিয়েই মৃদু স্বরে বলল,
“প্রায় পাঁচটা বছর পর তোমাকে দেখলাম!”
গলাটা কেমন ভারী হয়ে এলো তার।
“এত বছর পর দেশে এসেও বাড়িতে গেলে না কেন, ফুপ্পি?”
মারিয়া- মায়ানের কাকাতো বোন। তিনি কায়ানের মাথা থেকে হাত সরিয়ে ধীরে সোজা হয়ে বসলেন। মুখের শান্ত ভাবটা মুহূর্তেই কেমন ম্লান হয়ে গেল। চোখের কোণে চাপা কষ্ট স্পষ্ট হয়ে উঠল। তিনি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে ধীরে বললেন,
“ওই মৃ'ত্যুপূরীতে যেতে ইচ্ছে করে না রে বাপ।
কথাটা বলেই তিনি দূরের দিকে তাকালেন। যেন বহু বছরের পুরোনো কোনো স্মৃতি আবার সামনে ভেসে উঠেছে।
“ওই বাড়িতে গেলেই নিজেকে নিজের কাছেই অপরাধী লাগে। মনে হয়, ওই বাড়ির প্রতিটা দেয়ালে এখনও একটা মেয়ের চাপা কান্না লেগে আছে।”
তার গলাটা ধীরে ধীরে ভারী হয়ে উঠল।
“ওই বাড়ির পূর্ণবয়স্ক স্বার্থপর মানুষগুলোর দায় এড়াতেই আর যাওয়া হয় না। আর সেখানে গেলে…”!
তিনি থেমে গেলেন। চোখের পাতা কেঁপে উঠল তার।
“তোর প্রশ্নগুলোর জবাব দেওয়ার মতো পরিস্থিতিও থাকবে না।”
কায়ান চুপ করে মারিয়ার কথাগুলো শুনছিল। তার বুকের ভেতরটা কেমন হালকা কাঁপছে। মনে হচ্ছিল, সে এমন একটা সত্যের সামনে দাঁড়িয়ে আছে, যেটা জানার পর হয়তো আর আগের মতো থাকতে পারবে না। এক মুহূর্তের জন্য তার ভীষণ ইচ্ছে করল সবকিছু না জানতে। অজানাই থাকুক। কারণ কিছু সত্য মানুষকে ভেতর থেকে শেষ করে দেয়। কিন্তু পরক্ষণেই সে নিজের মনকে শক্ত করল। না, আজ তাকে জানতেই হবে। নয়তো হাওয়া আম্মুর গল্পটা চিরকাল অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। কায়ান গভীর একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে ধীরে বলল,
“আম্মু অজ্ঞান হওয়ার পর, মানে তারপর কী হয়েছিল বল?”
কায়ানের প্রশ্নটা শুনে মারিয়ার চোখ দুটো হঠাৎ করেই ছলছল করে উঠল। চোখের কোণে জমে থাকা জল চিকচিক করে উঠতেই বহু বছর আগের সেই বিষাদময় দিনগুলোর স্মৃতি আবারও জীবন্ত হয়ে উঠল তার সামনে। সন্ধ্যার নরম বাতাসটা যেন হঠাৎ ভারী হয়ে গেল।
মারিয়া কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। মনে হচ্ছিল, বুকের গভীরে চাপা পড়ে থাকা পুরোনো ক্ষতগুলো আবার ধীরে ধীরে রক্ত ঝরাতে শুরু করেছে। তারপর খুব ধীরে, কাঁপা গলায় বলতে শুরু করল,
* সেদিন বিকেলে হাওয়া ভাবিকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার জন্য কনিকা ভাবি আর বড়’মা বের হয়েছিল। বাড়ি থেকে বের হওয়ার আগে মায়ান ভাইও বলেছিল, সে সঙ্গে যাবে। কিন্তু কনিকা ভাবি তাকে থামিয়ে দিয়ে শান্ত গলায় বলেছিলেন,
“তোমার এখন যেতে হবে না। আমরাই ডাক্তার দেখিয়ে নিয়ে আসবো। আর আমিও একবার ডাক্তারের সঙ্গে দেখা করে আসি, সব ঠিকঠাক আছে কিনা।”
মায়ান ভাই কনিকা ভাবির কথায় খুব স্বাভাবিকভাবেই সম্মতি দিয়েছিল।
“ঠিক আছে, সাবধানে যেও।”
তখন কেউ বুঝতেই পারেনি, সেদিনের সেই হাসপাতাল যাত্রা একটা জীবনের মোড় পুরোপুরি বদলে দিতে চলেছে। হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে ডাক্তার দেখানোর পর! ডাক্তার কিছুক্ষণ রিপোর্ট দেখলেন। তারপর শান্ত গলায় বললেন,
"হাওয়া ভাবি তিন মাসের অন্তঃসত্ত্বা।
কথাটা শুনে যেন মুহূর্তের মধ্যে সময় থেমে গিয়েছিল। বড়’মা অবাক হয়ে হাওয়া ভাবির দিকে তাকিয়ে ছিলেন। সেই দৃষ্টিতে বিস্ময়, অবিশ্বাস আর চাপা আতঙ্ক একসাথে মিশে ছিল। কারণ তিনি কখনো বুঝতেই পারেননি। অথবা হয়তো কখনো বুঝতে চাননি। সাধারণত প্রেগন্যান্সির সময় মেয়েদের নানা রকম পরিবর্তন দেখা যায়, বমি বমি ভাব, মাথা ঘোরা, খাবারে অরুচি, ক্লান্তি, গন্ধে অস্বস্তি কিন্তু হাওয়া ভাবির দিকে কি কখনো কেউ এতটা মন দিয়ে তাকিয়েছিল?
তার না খেয়ে থাকা, হঠাৎ দুর্বল হয়ে পড়া, চুপচাপ হয়ে যাওয়া সবকিছুকেই তো সবাই “অভিমান” বা “বাহানা” ভেবেছিল। বড়’মা কিছুটা কাঁপা কণ্ঠে ডাক্তারকে বলেছিলেন,
“ভালো করে চেকআপ করে দেখুন। আপনি নিশ্চিত হাওয়া প্রেগন্যান্ট?”
ডাক্তার শান্তভাবে কনিকা ভাবির দিকে তাকিয়ে মাথা নেড়ে সম্মতি দিয়েছিলেন। আর কনিকা ভাবি, তিনি তখন সম্পূর্ণ নির্বাক হয়ে বসে ছিলেন। মুখের সমস্ত রঙ যেন মুহূর্তের মধ্যে হারিয়ে গিয়েছিল। কারণ তখন! তিনি নিজেও প্রেগন্যান্ট ছিলেন। এখন হাওয়া ভাবিও প্রেগন্যান্ট। একই মানুষকে ঘিরে দু’জন নারীর মাতৃত্ব!
এই সত্যটা যেন তাকে ভেতর থেকে কাঁপিয়ে দিচ্ছিল। তিনি বুঝতে পারছিলেন না, এখন কী করবেন। কীভাবে এই খবরটা মায়ান ভাইকে বলবেন। কীভাবে এই পরিস্থিতি সামলাবেন। কিছুক্ষণ চুপ থাকার পর কনিকা ভাবি ডাক্তারকে ধীরে জিজ্ঞেস করেছিলেন,
“হাওয়ার প্রেগন্যান্সিতে কোনো জটিলতা আছে কি? মানে, কোনো সমস্যা হবে না তো?”
কথাটা শুনে ডাক্তার কিছুটা অবাক হয়ে গিয়েছিলেন। কারণ নতুন প্রাণের খবর শুনে যেখানে একজন মানুষের চোখে আনন্দ ঝলমল করার কথা, সেখানে কনিকা ভাবির চোখে তখন ভয়, অস্থিরতা আর অদ্ভুত এক অনিশ্চয়তা ভাসছিল। ডাক্তার হয়তো ভেবেছিলেন, তিনি অতিরিক্ত চিন্তা করছেন। তাই আশ্বস্ত করে বলেছিলেন,
“আপাতত তেমন কোনো সমস্যা নেই। তবে উনি অনেক দুর্বল। ঠিকমতো খাওয়া-দাওয়া করেন না মনে হচ্ছে। যত্ন নিতে হবে। বাকিটা অনেকটাই নির্ভর করছে ওনার শারীরিক অবস্থার উপর।”
ডাক্তারের কথাগুলো শুনে কনিকা ভাবি কিছুক্ষণ চুপ করে ছিলেন। মনে হচ্ছিল, তিনি খুব গভীর কিছু ভাবছেন। তারপর ধীরে বলেছিলেন,
“ঠিক আছে, আমরা খেয়াল রাখবো।”
একটু থেমে আবার বলেছিলেন,
“আর উনি যে প্রেগন্যান্ট, সেটা এখন কাউকে বলার দরকার নেই। আমরা পরে সবাইকে সারপ্রাইজ দিবো। আপনি ব্যাপারটা একটু ঘুরিয়ে অন্য কিছু বলে দিয়েন, প্লিজ।”
শেষের “প্লিজ” শব্দটার ভেতরেও কেমন এক অসহায়তা লুকিয়ে ছিল। ডাক্তার সামান্য হেসে সম্মতি দিয়েছিলেন। আর হাওয়া ভাবিকে জানানো হয়েছিল, দু’দিন না খেয়ে থাকার কারণেই তিনি দুর্বল হয়ে অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলেন।বাড়ির সবাইও সেটাই জানত। শুধু সত্যিটা জানত। কনিকা ভাবি, বড়’মা আর আমার আম্মু। আর সেই সত্যটাই ধীরে ধীরে সবার জীবনকে এমন এক অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিয়েছিল, যেখান থেকে আর কেউ পুরোপুরি ফিরে আসতে পারেনি।"
এতোটুকু বলেই মারিয়া থেমে গেল। মনে হচ্ছিল, কথাগুলো বলতে বলতেই সে যেন আবার সেই ষোলো বছর আগের অন্ধকার সময়টায় ফিরে গেছে। গলাটা ভারী হয়ে এসেছে, শ্বাসগুলো কেমন কাঁপছে। চোখের কোণে জমে থাকা জল চিকচিক করে উঠছে পার্কের হলুদ আলোয়।
কায়ান নিঃশব্দে বসে আছে। বুকের ভেতরটা ধড়ফড় করছে। এতক্ষণ ধরে যা শুনেছে, তাতেই তার ভেতরের পৃথিবী ওলটপালট হয়ে গেছে। তবুও একটা প্রশ্ন বারবার মাথার ভেতর ঘুরছে, কনিকা কেন হাওয়ার প্রেগন্যান্সির কথা লুকিয়েছিল? সে অস্থির গলায় জিজ্ঞেস করল,
“তারপর কী হয়েছিল, ফুপ্পি?”
মারিয়া আকাশের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সন্ধ্যার আকাশটা তখন আরও গাঢ় হয়ে এসেছে। দূরে পার্কের আলো ঝাপসা লাগছে তার চোখের জলের জন্য। গাল বেয়ে নেমে আসা জলটা মুছে নিয়ে সে আবার ধীরে ধীরে বলতে শুরু করল,
“সেদিন রাত প্রায় আটটার দিকে কনিকা ভাবি আর বড়’মা হাওয়া ভাবিকে নিয়ে বাসায় ফিরল। আমি তখন ড্রয়িংরুমে সোফায় বসে টিভি দেখছিলাম। বড়’মা আমাকে ডেকে বলল,
"হাওয়াকে তোমার ঘরে নিয়ে যাও। আর আজ থেকে কয়েকদিন ও তোমার ঘরেই থাকবে।’
হাওয়া ভাবি তখন নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে ছিল। চোখদুটো কান্নায় ফুলে লাল হয়ে ছিল, অথচ মুখে কোনো শব্দ নেই। এমন লাগছিল, যেন পৃথিবীর সব কথা বলার শক্তিটুকু তার ভেতর থেকে শেষ হয়ে গেছে।
কনিকা ভাবি কোনো কথা না বলেই সোজা উপরে উঠে গেল। আমি বড়’মার কথা শুনে একটু বিরক্তই হয়েছিলাম। হাওয়া ভাবিকে আমি ঘৃণা করতাম না ঠিকই, কিন্তু খুব একটা পছন্দও করতাম না। কারণ তখন পর্যন্ত আমি বিশ্বাস করতাম, হাওয়া ভাবিই কনিকা ভাবি আর মায়ান ভাইয়ের মাঝে এসে সবকিছু এলোমেলো করেছে।
কিন্তু ওই কয়েকদিনে যা যা দেখেছি, তাতে বুঝেছিলাম, এই বাড়ির কেউই আসলে হাওয়া ভাবিকে মন থেকে মেনে নেয়নি। আর আমার কী জানি কেন? সবসময় সবার অপছন্দের মানুষগুলোর প্রতিই মায়া জন্মায় বেশি। হাওয়া ভাবির মুখটা দেখেই সেদিন বুকের ভেতরটা কেমন মোচড় দিয়ে উঠেছিল। মনে হচ্ছিল, মানুষটা খুব করে ভেঙে গেছে। তাই আর কিছু না বলে ওকে আমার ঘরে নিয়ে গেলাম। রাতে সবাই একসাথে ডিনার করলাম।
"আশ্চর্যের ব্যাপার কী জানিস?
মায়ান ভাই একবারের জন্যও হাওয়া ভাবির কথা জিজ্ঞেস করল না। একটা মানুষ, যে মেয়েটার কান্নায় কিছুদিন আগেও অস্থির হয়ে যেত, সে আজ যেন তাকে দেখছেই না। আমি খুব অবাক হয়েছিলাম। কিন্তু কিছু বলিনি। পরে আম্মু আমার হাতে হাওয়া ভাবির জন্য খাবার দিয়ে বলল রুমে নিয়ে যেতে। আমি প্লেটটা নিয়ে ঘরে ঢুকলাম।
রুমে ঢুকেই দেখি, হাওয়া ভাবি বালিশে মুখ গুঁজে নিঃশব্দে কাঁদছে। সেই কান্নার শব্দটা আজও আমি ভুলতে পারিনি, কায়ান। মনে হচ্ছিল, একটা মানুষ না ভাঙা একটা জীবন কাঁদছে। আমি খাবারের প্লেটটা টেবিলে রেখে ওয়াশরুমে চলে গেলাম।
ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে এসে দেখি কান্নাটা আরও বেড়ে গেছে। হয়তো ও খেয়ালই করেনি আমি রুমে আছি। আমি ধীরে ধীরে গিয়ে ওর মাথায় হাত রাখতেই হাওয়া ভাবি চমকে উঠল। সাথে সাথে কান্না থামিয়ে ফেলল। যেন কান্না করাটাও তার জন্য অপরাধ। আমি নরম গলায় বললাম,
'‘ভাবি, খাবারটা খেয়ে নিন। এমনিতেই আপনি অসুস্থ। না খেলে আরও অসুস্থ হয়ে পড়বেন।’
হয়তো খুব ক্ষুধা পেয়েছিল! আমার এক কথাতেই উঠে বসে খাবারের প্লেটটা হাতে নিল। আমি গিয়ে দরজাটা বন্ধ করে দিলাম। তারপর খাটে বসে ওর দিকে তাকিয়ে রইলাম।
অদ্ভুত না? কাল পর্যন্ত এই মেয়েটাকে আমি তেমন পাত্তাই দিতাম না। অথচ সেদিন ওকে দেখে বুকের ভেতর এমন মায়া হচ্ছিল, যেন বহুদিনের আপন কেউ কষ্ট পাচ্ছে। হাওয়া ভাবি খাবারের চার ভাগের এক ভাগও খেতে পারল না। হাত ধুয়ে এসে নিঃশব্দে আমার পাশে শুয়ে পড়ল।
আমার খুব জানতে ইচ্ছে করছিল, ওর জীবনে আসলে কী হয়েছে। অনেক জোরাজুরির পর অবশেষে হাওয়া ভাবি সব বলল আমাকে। বিয়ের পর থেকে ওর সঙ্গে ঘটে যাওয়া প্রতিটা ঘটনা, প্রতিটা অপমান, প্রতিটা কান্না! সব। আমি শুনতে শুনতে হেঁচকি তুলে কাঁদছিলাম। মনে হচ্ছিল, বুকের ভেতর কেউ আগুন ধরিয়ে দিয়েছে।
রাত তখন প্রায় একটা কি দুইটা হবে। ঘরের ভেতর শুধু দুইটা মেয়ের কান্নার শব্দ ভাসছিল। হাওয়া ভাবির চোখ দিয়েও অঝোরে জল গড়িয়ে পড়ছিল। আর আমি, আমি নিজের পরিবারকে ঘৃণা করতে শুরু করেছিলাম সেদিন। যাদের এতদিন মানুষ ভাবতাম, সেদিন মনে হয়েছিল, এরা মানুষ না, ভয়ংকর স্বার্থপর কিছু প্রাণী। আর হাওয়া ভাবির পরিবারের ওপরও ভীষণ ঘৃণা জন্মেছিল।
সে তাদের আপন মেয়ে না-ই হোক! তাই বলে একটা মানুষকে এভাবে ঠকাতে পারে? নিজেদের স্বার্থের জন্য একটা মেয়ের পুরো জীবন শেষ করে দিতে পারে? সেদিন আমার সত্যি সত্যিই ইচ্ছে করেছিল, কনিকাকে মে'রে ফেলি!”
রাতে আর কিছুতেই ঘুম আসছিল না। চোখ বন্ধ করলেই মনে হচ্ছিল বুকের ভেতর জমে থাকা কষ্টগুলো আরও জেগে উঠছে। চারপাশটা নিস্তব্ধ, অথচ আমার মাথার ভেতর যেন হাজারটা শব্দ একসাথে ধাক্কা খাচ্ছিল। কী করবো, কোথায় যাবো, কিভাবে এই অদ্ভুত ভারটা নামাবো, কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। ঘরের হালকা অন্ধকারে হাওয়া ভাবি চুপচাপ শুয়ে ছিলেন। হঠাৎ খুব ক্ষীণ গলায় বললেন,
“তোমার ঘরের পানির জগটা খালি, গলাটা খুব শুকিয়ে আসছে। একটু পানি পান করতে পারলে ভালো লাগতো!
উনার কণ্ঠটা এতটাই দুর্বল শোনাচ্ছিল যে আমার বুকটা হু হু করে উঠল। আমি সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়াতে গেলাম।
“আমি এনে দিচ্ছি।”
কিন্তু হাওয়া ভাবি তাড়াতাড়ি আমাকে থামিয়ে দিয়ে মৃদু স্বরে বললেন,
“না, তুমি বসো। আমি নিয়ে আসছি।”
আমি অনেকবার বারণ করলাম। “তুমি অসুস্থ, তোমার যাওয়ার দরকার নেই।” কিন্তু সে শুধু একবার ম্লান হেসে জগটা হাতে তুলে নিল। সেই হাসিটার ভেতরও কেমন যেন ভাঙা ক্লান্তি লেগে ছিল। আমি আর কিছু বলতে পারলাম না। নির্বাক হয়ে বসে রইলাম।
মিনিটখানেকও পেরোয়নি…!
হঠাৎ করেই নিচ থেকে কিছু একটা পড়ে যাওয়ার বিকট শব্দ ভেসে এলো। সঙ্গে মিলেমিশে ছিল হাওয়া ভাবির খুব চাপা, ব্যথাভরা একটা চিৎকার। আমার বুক ধক করে উঠল। মনে হলো শরীরের সব রক্ত এক মুহূর্তে শুকিয়ে গেছে। আমি তড়িঘড়ি করে খাট থেকে নেমে দৌড়ে সিঁড়ির দিকে গেলাম। ফেয়ারি লাইটের ম্লান আলোয় যা দেখলাম, তাতে আমার পুরো শরীর কেঁপে উঠল।
হাওয়া ভাবি সিঁড়ির মাঝামাঝি কুঁকড়ে পড়ে আছে। জগটা গড়িয়ে দূরে পড়ে গেছে। পানি ছড়িয়ে পুরো ফ্লোর ভিজে গেছে। ওনি দু’হাতে নিজের পেট শক্ত করে চেপে ধরে রেখেছেন। ব্যথায় পুরো শরীর কাঁপছে। কিন্তু সবচেয়ে কষ্টের ব্যাপার ছিল, ওনি জোরে কাঁদতেও পারছিলেন না। শুধু গুনগুন করে কেঁদে যাচ্ছিলেন। যেন নিজের কষ্টের শব্দটুকুও কাউকে শুনতে দিতে ভয় পাচ্ছেন।
আমি দৌড়ে নিচে নামতে গিয়ে নিজেই সিঁড়িতে পিছলে গেলাম। কোনো রকমে দু’হাতে গ্রিল আঁকড়ে নিজেকে সামলে নিলাম। তারপর ছুটে গিয়ে হাওয়া ভাবির পাশে হাঁটু গেড়ে বসে পড়লাম।
“ভাবি! কি হয়েছে? উঠো, প্লিজ উঠো।”
আমি উনাকে ধরে তুলতে চাইলাম, কিন্তু ওনি দাঁড়াতেই পারছিলেন না। ব্যথায় শরীরটা অবশ হয়ে যাচ্ছিল। উনার কাঁপা ঠোঁট আর চোখের পানি দেখে আমার বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠছিল। ভয়ে আমার হাত-পা ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছিল। আমি আর কিছু না ভেবে নিচতলায় দৌড়ে গেলাম। আব্বুর রুমের দরজায় ধাক্কা দিতে লাগলাম।
“আব্বু! দরজা খোলেন! প্লিজ!
বড় আব্বুর রুমের সামনেও গিয়ে চিৎকার করে ডাকলাম। কিন্তু কারও ঘুম ভাঙল না। সেই মুহূর্তে নিজেকে পৃথিবীর সবচেয়ে অসহায় মানুষ মনে হচ্ছিল। শেষমেশ বাধ্য হয়ে আমি দৌড়ে উপরে মায়ান ভাইয়ের রুমের সামনে গিয়ে দরজায় জোরে জোরে ধাক্কা দিতে লাগলাম। কিছুক্ষণ পর দরজা খুললেন কনিকা ভাবি। আমি হাঁপাতে হাঁপাতে প্রায় কেঁদে ফেলেই বললাম,
“ভা-ভাইয়া হাওয়া ভাবি সিঁড়ি থেকে পড়ে গেছে। খুব ব্যথা পেয়েছে, তাড়াতাড়ি চল!
আমার কণ্ঠে আতঙ্ক এতটাই স্পষ্ট ছিল যে মায়ান ভাই এক মুহূর্ত দেরি না করে খাট থেকে নেমে দাঁড়ালেন। কিন্তু উনি বের হতে যাবেন, ঠিক তখনই কনিকা ভাবি উনার হাত চেপে ধরে বললেন,
“পড়ে ব্যথা পেয়েছে, মলম লাগিয়ে নিলেই হবে। এখন এই রাতে তোমাকে যেতে হবে কেন?”
আমি স্তব্ধ হয়ে গেলাম। একজন মানুষ এত শান্তভাবে এমন কথা কীভাবে বলতে পারে? মায়ান ভাই এবার একটু বিরক্ত হয়েই বললেন,
“এবার তুমি একটু বেশি বেশি করে ফেলছো না? ব্যথা পেয়েছে, দেখে আসাটা উচিত না?”
কনিকা ভাবি আর কিছু বললেন না। শুধু ড্রয়ার খুলে ধীরে ধীরে একটা মলম বের করলেন। আমি কাঁদো কাঁদো গলায় আবার বললাম,
“ভাইয়া, তাড়াতাড়ি আসো। ভাবি খুব ব্যথা পেয়ে কান্না করছে।”
কনিকা ভাবি আমার হাতে মলমটা ধরিয়ে দিয়ে শান্ত স্বরে বললেন,
“এত রাতে মায়ানের যাওয়ার দরকার নেই। তুই এই মলমটা ব্যথা পাওয়া জায়গায় লাগিয়ে দে।”
সেই মুহূর্তে আমার ভীষণ ইচ্ছে করছিল চিৎকার করে বলতে “ও শুধু ব্যথা পায়নি ও ভেঙে যাচ্ছে!” কিন্তু আমি কিছুই বলতে পারলাম না। মায়ান ভাই হয়তো রাত হওয়াতে কোনো ঝামেলা বাড়াতে চাননি। তাই ড্রয়ার থেকে একটা পেইনকিলার বের করে আমার হাতে দিয়ে বললেন,
“এটা খাইয়ে দিস। ব্যথা কমে যাবে। কালকে একবার ডাক্তার দেখিয়ে নিলেই হবে।”
কথাটা বলেই উনি আর এগোলেন না। আমি আর কিছু বললাম না। মাথা নিচু করে চুপচাপ রুম থেকে বেরিয়ে এলাম। বড় ভাইয়ের বউ বলে কনিকা ভাবিকে কিছু বলার সাহসও হলো না। বুকের ভেতরটা শুধু ক্ষোভ আর অসহায়তায় জ্বলছিল।
নিচে এসে যা দেখলাম, তাতে আমার বুক কেঁপে উঠল। হাওয়া ভাবি ব্যথায় কাতরাতে কাতরাতে ফ্লোরে কুঁকড়ে শুয়ে পড়েছেন। দু’হাতে পেট শক্ত করে চেপে ধরে আছেন। ঠোঁট কামড়ে কান্না আটকানোর চেষ্টা করছেন, কিন্তু তবুও চাপা গোঙানির শব্দ বেরিয়ে আসছে। আমি তাড়াতাড়ি ওনার পাশে বসে পড়লাম।
“ভাবি! উঠো প্লিজ…!”
কোনোমতে ওনাকে ধরে টেনে-হিঁচড়ে রুম পর্যন্ত নিয়ে আসলাম। আমার নিজেরই হাত-পা কাঁপছিল। হঠাৎ করেই চোখ চলে গেল ফ্লোরের দিকে! আর পরমুহূর্তেই আমার বুকের ভেতরটা যেন থেমে গেল। ফ্লোরজুড়ে র'ক্ত ছড়িয়ে আছে। টুপটুপ করে পড়ে থাকা র'ক্তগুলো মেঝের ওপর লাল দাগ এঁকে রেখেছে। আমি ভয় পেয়ে চিৎকার করে উঠলাম,
“ভাবি! তোমার কোথায় কে'টে গেছে? দেখো কত র'ক্ত!”
হাওয়া ভাবি হয়তো এতক্ষণ খেয়ালই করেননি। রক্ত দেখে উনিও ভয়ে জমে গেলেন। তারপর হঠাৎ করেই ওনার কান্নার জোর আরও বেড়ে গেল। সেই কান্নাটা ছিল অসহায়, ভাঙা, নিঃস্ব একটা মানুষের কান্না। আমি তাড়াতাড়ি ওনাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে কাঁদতেই বললাম,
“তুমি ভয় পেয়ো না। আমি এখনই মায়ান ভাইকে নিয়ে আসছি। তোমাকে হাসপাতালে নিতে হবে।
হাওয়া ভাবি ব্যথায় বারবার কুঁকড়ে উঠছিলেন। ঠিকমতো কথাও বলতে পারছিলেন না। কোনো রকমে মাথা নেড়ে সম্মতি দিলেন। তারপর ভাবিকে অনেক কষ্টে রুমে নিয়ে এলাম। তারপর আবার দৌড়ে ভাইয়ার কাছে গেলাম। হাঁপাতে হাঁপাতে মায়ান ভাইয়ের রুমের সামনে গিয়ে দরজায় ধাক্কা দিলাম। কিছুক্ষণ পর দরজা খুললেন কনিকা ভাবি। আমাকে দেখেই বিরক্ত গলায় বললেন,
“আবার কী হয়েছে মারিয়া? এত রাতে বারবার ডাকছো কেন?”
এই প্রথম কনিকা ভাবি আমার সাথে উঁচু গলায় কথা বললেন। আমি ভয়ে কেঁপে উঠেছিলাম। তবুও সাহস করে কান্না মেশানো গলায় বললাম,
“হাওয়া ভাবি সিঁড়ি থেকে পড়েছে। অনেক রক্ত যাচ্ছে, ডাক্তার দেখাতে হবে!
কনিকা ভাবি একদম শান্ত স্বরে বললেন,
“তোমার ভাই ঘুমিয়ে গেছে। সকালে উঠলে ডাক্তার দেখাবে। এখন রক্ত বন্ধ হওয়ার মলম দিচ্ছি, লাগিয়ে দাও।”
কথাটা বলেই উনি আরেকটা মলম এনে আমার হাতে ধরিয়ে দিলেন। আমি নির্বাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। সেই মুহূর্তে আমার ভীষণ কান্না পাচ্ছিল। একজন মানুষ এতটা নির্দয় কীভাবে হতে পারে? কিন্তু কিছু বলার সাহস হলো না। আমি মলমটা হাতে নিয়ে আবার দৌড়ে রুমে ফিরে এলাম। রুমে ঢুকতেই দেখি হাওয়া ভাবি নিথর হয়ে খাটের ওপর পড়ে আছেন। মুহূর্তের জন্য আমার বুক কেঁপে উঠল। আমি তাড়াতাড়ি গিয়ে ওনাকে ডাকলাম,
“ভাবি, ভাবি…!”
তারপর কোনোমতে মায়ান ভাইয়ের দেওয়া ব্যথানাশক ওষুধটা খাইয়ে দিলাম। হাত কাঁপছিল এতটাই যে ঠিকমতো গ্লাসও ধরতে পারছিলাম না। তারপর নিজের একটা ওড়না পানিতে ভিজিয়ে সিঁড়ির কাছ থেকে রুম পর্যন্ত পড়ে থাকা রক্তের ফোঁটাগুলো মুছতে লাগলাম। প্রতিটা রক্তের দাগ মুছতে মুছতে মনে হচ্ছিল এই বাড়িটার দেয়ালেও বুঝি পাপ লেগে আছে।
রুমে ফিরে এসে দেখি তখন আর রক্ত ঝরছে না। কিন্তু হাওয়া ভাবির চোখ দিয়ে নীরব অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে অবিরাম। ব্যথায় তিনি ঠিকমতো কথাও বলতে পারছিলেন না। শুধু নিঃশব্দে কাঁদছিলেন। আমি কাঁদতে কাঁদতে নিজের গলার স্বরটাই হারিয়ে ফেলেছিলাম। সেই মুহূর্তে সত্যিই মনে হচ্ছিল, এই বাড়িতে কোনো মানুষ থাকে না। এখানে শুধু অনুভূতিহীন কিছু জা'নোয়ার বাস করে। দু’জন মানুষের কান্না কি সত্যিই কারও কানে পৌঁছায়নি? নাকি সবাই ইচ্ছে করেই মরণ ঘুম ঘুমিয়েছিল…!
--------চলবে~~~--------
এটাই হাওয়া’র কষ্টের শেষ পর্ব! পরের পর্বে হয়তো অল্প একটু স্বস্তি আসবে, যদিও কিছু কষ্ট এখনো বাকি। প্লিজ, ধৈর্য ধরে গল্পটা পড়ুন। হাওয়া’র প্রতিটা কান্না, প্রতিটা নীরবতা আর ভাঙাচোরা অনুভূতির সাথে যারা এতদূর ছিলেন, তাদের প্রতি অনেক কৃতজ্ঞতা। ভুল-ত্রুটি হলে ক্ষমা ও সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। 🙏🙏