#কবুলের_আড়ালে_চুক্তি
১৪.
#𝐀𝐧𝐯𝐞𝐬𝐡𝐚_𝐍𝐢𝐡𝐚𝐫𝐢𝐤𝐚
আমি কাঁদতে কাঁদতে নিজের গলার স্বরটাই হারিয়ে ফেলেছিলাম। সেই মুহূর্তে সত্যিই মনে হচ্ছিল এই বাড়িতে কোনো মানুষ থাকে না। এখানে শুধু অনুভূতিহীন কিছু জা'নোয়ার বাস করে।দু’জন মানুষের কান্না কি সত্যিই কারও কানে পৌঁছায়নি? নাকি সবাই ইচ্ছে করেই মরণ ঘুম ঘুমিয়েছিল!
কায়ানকে কথাগুলো বলতে বলতে মারিয়ার গলা বারবার কেঁপে উঠছিল। একপর্যায়ে সে হেঁচকি তুলে কেঁদে ফেলল। তার চোখ বেয়ে টুপটুপ করে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে।
কায়ানের অবস্থাও তখন প্রায় একই। বুকের ভেতরটা যেন কারও নিষ্ঠুর হাতে চেপে ধরা। শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল তার। সে আর নিজেকে সামলাতে পারল না। দু’হাত বাড়িয়ে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল তার ফুপ্পিকে। মনে হচ্ছিল, এই গল্পটা শুধু হাওয়া নামের একটা মেয়ের না, এই গল্পটা অসংখ্য নীরব কান্নার, অসংখ্য অব্যক্ত কষ্টের।
মারিয়া কিছুক্ষণ কাঁদার পর নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করল। তারপর দীর্ঘশ্বাস ফেলে ভাঙা গলায় বলল,
“আর শুনবি নাকি? আজ এতটুকুই থাক, পরে কখনো বাকি অংশ শুনিস। বেশি রাত হয়ে গেলে বাড়ি ফিরতে সমস্যা হবে।”
কায়ান ধীরে ধীরে মারিয়াকে ছেড়ে দিল। তারপর হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে চোখের পানি মুছে নিজেকে স্বাভাবিক করার বৃথা চেষ্টা করল। কিন্তু গলার ভারী কাঁপনটা কিছুতেই কমছিল না। সে নিচু স্বরে বলল,
“না, আজকেই শুনবো। পরে যদি আবার সুযোগ না পাই?"
শেষ কথাটার মধ্যে অদ্ভুত এক ভয় লুকিয়ে ছিল। যেন সে ভয় পাচ্ছিল, এই গল্পের শেষটা জানার আগেই আবার সবকিছু হারিয়ে যাবে।
মারিয়া কিছুক্ষণ চুপ করে কায়ানের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর ধীরে মাথা নাড়িয়ে সম্মতি দিল। আরেকটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সে আবার ফিরে গেল সেই ষোলো বছর আগের বিষাদময় স্মৃতির পাতায়!
* রাতটা আমাদের এভাবেই কেটে গেল। যেন প্রতিটা মুহূর্ত ভারী হয়ে বুকের ওপর চাপ দিয়ে বসেছিল। ফজরের আজান দিতে দিতেই আমি উঠে ফ্রেশ হয়ে নামাজ পড়ে নিলাম। সিজদায় মাথা রাখতেই মনে হচ্ছিল, এই পৃথিবীতে আর কিছু চাই না। শুধু হাওয়ার ভাবির জন্য একমুঠো শান্তি। আল্লাহর কাছে হাত তুলে বারবার চাইলাম, ওর এই যন্ত্রণাময় জীবনটা যেন একটু থেমে যায়, একটু স্বস্তি পায়। জানি না আল্লাহ কবুল করেছেন কি না, কিন্তু আমি কান্না করতে করতে খুব করে চাইছিলাম। এই জাহান্নামের মতো জীবন থেকে ভাবির মুক্তি হোক।”
নামাজ শেষ করে আমি ধীরে ধীরে ভাবিকে ধরে ওয়াশরুমে নিয়ে গিয়ে ফ্রেশ করিয়ে আনলাম। কিন্তু একটা জিনিস বারবার মাথায় ঘুরছিল, ভাবির তো পা কেটে গিয়েছিল তাহলে কোনো দাগই কেন নেই?
হালকা খুঁড়িয়ে হাঁটছে ঠিকই, কিন্তু আমি ভালো করে দেখে কোথাও কোনো কাটা বা ক্ষতের চিহ্ন পেলাম না। আমি চিন্তিত গলায় জিজ্ঞেস করলাম,
“তোমার না পা কেটে গিয়েছিল? বেশি কেটেছে কি? সেলাই লাগবে কিনা এত রক্ত তো বের হয়েছিল।”
ভাবি এক মুহূর্ত চুপ থেকে শান্ত গলায় বলল,
“কোথাও তো কাটেনি! আমি নিজেই বুঝতে পারছি না কী হয়েছে। তবে পেটটা প্রচণ্ড ব্যথা করছে। তুমি কি আমাকে একটা সাহায্য করবে?”
আমি সাথে সাথে বললাম,
“অবশ্যই করব। বলো, কী সাহায্য লাগবে?”
ভাবি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে যেন অনেক ভারী সিদ্ধান্তের কথা বলল,
“আমি এই বাড়ি ছেড়ে চলে যাবো। যাওয়ার আগে একবার মা-বাবার সাথে দেখা করে যাব। তুমি কি আমাকে সাহায্য করবে?”
তার কথায় আমি থমকে গেলাম। ভাবি যাবে, এটা ভালো, কিন্তু যাবে কোথায়? আর ও কাউকে চেনেও না! মনে জমে থাকা প্রশ্নটা আর চেপে রাখতে পারলাম না,
“তুমি তো কাউকে চেনো না, কোথায় যাবে? আর মা-বাবার সাথে কীভাবে দেখা করবে? তারা তো অনেক দূরে। আর তোমাকে আগে হসপিটালে যেতে হবে।”
হাওয়া ভাবি শান্ত গলায় বলল,
“ঠিক আছে, আগে হসপিটালে যাবো। তারপর তুমি আমাকে একটা গাড়িতে তুলে দিও। আমি চলে যাবো। আর তুমিও বাড়িতে ফিরে এসো।”
আমি কিছুক্ষণ চুপ থেকে শেষ পর্যন্ত মাথা নেড়ে রাজি হলাম। কিছুক্ষণ পরই মায়ান ভাই আর কনিকা আপু রুমে এলো। মায়ান ভাই ধীরে ধীরে বসে হাওয়া ভাবির দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল,
“পেটের ব্যথাটা কি একটু কমেছে?”
হাওয়া ভাবি কোনো উত্তর দিল না। শুধু মুখটা অন্যদিকে ফিরিয়ে নিল। মায়ান ভাই একটা ভারী দীর্ঘশ্বাস ফেলল। কনিকা আপু শান্ত স্বরে বলল,
“দেখে তো মনে হচ্ছে ব্যথা কমেছে। একটু ব্রেকফাস্ট করে রেস্ট নিলেই ঠিক হয়ে যাবে। হসপিটালে যাওয়ার দরকার নেই।”
কথাটা শেষ হতেই মায়ান ভাই একটু শক্ত গলায় বলল,
“না, ওকে হসপিটালে যেতেই হবে। আমি নিয়ে যাব। তুমি উপরে গিয়ে রেস্ট নাও।”
তার কথা শুনে হাওয়া ধীরে ধীরে বলল,
“আমাকে হসপিটালে নিতে হবে না। আমি ঠিক আছি।”
মায়ান ভাই এবার আরও নরম কিন্তু দৃঢ় কণ্ঠে ওর দিকে ঘুরে বলল,
“না, তোমাকে অবশ্যই যেতে হবে। তুমি ভালো নেই, এটা আমি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি।”
হাওয়া ভাবি মায়ান ভাইয়ের কথা শুনে খুব ধীরে, মিনমিনে গলায় বলল,
“খুনি এসে নিজের শিকারের মৃত্যুর জন্য আফসোস করছে, কী জঘন্য ব্যাপার!"
কথাটা শুনে আমার বুকটা ধক করে উঠল। মায়ান ভাইও নিশ্চয়ই শুনেছিল। কারণ তার চোখের দৃষ্টি এক মুহূর্তের জন্য থেমে গিয়েছিল। কিন্তু সে কিছু বলল না। শুধু নিঃশব্দে মাথা নিচু করে রইল। কনিকা ভাবি তখন শান্ত স্বরে বলল,
“আজ তোমার কলেজ আছে। আব্বুরও অফিসে মিটিং আছে, তাড়াতাড়ি বের হতে হবে। এখন রেডি হয়ে নাও। আর এখন হাসপাতালে না গেলেও চলবে, পরে ফ্রি হলে নিয়ে যেও।”
মায়ান ভাই হয়তো কাজের চাপের কাছে নিজের দায়িত্ববোধটাকে হার মানিয়ে ফেলল। সে আমার দিকে তাকিয়ে বলল,
“যদি পারিস, বিকেলে ওকে নিয়ে একটু ঘুরে আসিস। ওর ভালো লাগবে। পরে আমি হাসপাতালে নিয়ে যাব।”
কথাগুলো বলে ভাই আর কনিকা ভাবি রুম থেকে বেরিয়ে গেল। তাদের চলে যাওয়ার পর পুরো রুমটা আবার নিস্তব্ধ হয়ে গেল। হাওয়া ভাবি নির্বাক হয়ে খাটে হেলান দিয়ে বসে রইল। সে যেন আর এই পৃথিবীতেই নেই। তার চারপাশে কী হচ্ছে, কে কী বলছে এসবের প্রতি তার আর কোনো অনুভূতি অবশিষ্ট নেই। চোখদুটো ফাঁকা, নিঃশেষ, প্রাণহীন।
সেই নির্বাক মুখটা দেখে আমার নিজের চোখও ভিজে উঠল। আমি আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারলাম না। নিঃশব্দে রুম থেকে বেরিয়ে নিচে চলে এলাম ব্রেকফাস্ট আনার জন্য।
কিচেনে গিয়ে দেখি আম্মু আর বড় মা রান্না করছেন। চারপাশে গরম তেলের গন্ধ, থালা-বাসনের শব্দ সবকিছু স্বাভাবিক, অথচ একটা মানুষ ভেতরে ভেতরে শেষ হয়ে যাচ্ছে। আমি আম্মুকে বললাম,
“আমার আর হাওয়া ভাবির ব্রেকফাস্ট এক প্লেটে দিয়ে দাও। আমি আর ভাবি রুমে একসাথে খাব।”
আমার কথা শুনে আম্মু কিছু বলতে যাচ্ছিলেন, ঠিক তখনই পেছন থেকে বড় আব্বুর গলা ভেসে এলো,
"এসব তুমি কী বলছ আম্মু? তোমার ভাবির নাম তো কনিকা! হাওয়া বলছ কেন?”
কথাটা শুনে আমি থমকে গেলাম। অবাক হয়ে বড় আব্বুর দিকে তাকালাম। আম্মু আর বড় মা দু’জনেই স্পষ্ট চমকে উঠলেন। মুহূর্তের জন্য কিচেনের বাতাসটাই যেন ভারী হয়ে গেল। তারপর বড় মা তড়িঘড়ি করে পরিস্থিতি সামলানোর চেষ্টা করে বললেন,
“আরে না না, ও বলতে চেয়েছে ওর ভাবি আর এই হাওয়া মেয়েটা একসাথে খাবে। তুমি না সবকিছু বেশি বুঝো! যাও, ডাইনিং টেবিলে বসো। আমি নাস্তা দিচ্ছি।”
বড় আব্বু আর কিছু না বলে ধীরে ধীরে ডাইনিংয়ের দিকে চলে গেলেন। আমি অবাক হয়ে বড় মার দিকে তাকিয়ে বললাম,
“তুমি মিথ্যা বললে কেন বড় মা? আমি তো হাওয়া ভাবির কথাই বলছিলাম!”
বড় মা প্লেটে নাস্তা সাজাতে সাজাতে নিচু স্বরে বললেন,
“তোমার বড় আব্বু কিছু জানে না। এখন তুমি কিছু বলতে যেও না।”
তার গলায় ভয় ছিল, চাপা অস্থিরতা ছিল। আমি আর কিছু বললাম না। শুধু নিঃশব্দে মাথা নেড়ে সম্মতি দিলাম। তারপর নাস্তার প্লেটটা হাতে নিয়ে ধীরে ধীরে আবার নিজের রুমের দিকে হাঁটতে লাগলাম। যেখানে একটা মানুষ নিঃশব্দে নিজের সমস্ত স্বপ্ন হারিয়ে বসে আছে।
আমি আর হাওয়া ভাবি চুপচাপ নাস্তা করে নিলাম। পুরো সময়টাতে ভাবি একটাও অপ্রয়োজনীয় কথা বলেনি। মনে হচ্ছিল, সে শুধু বেঁচে থাকার দায়ে খাবার মুখে তুলছে, বাঁচার ইচ্ছেতে নয়। নাস্তা শেষ হতেই আবারও ওর পেটের ব্যথাটা শুরু হলো। মুহূর্তের মধ্যেই ভাবির মুখটা কাগজের মতো সাদা হয়ে গেল। কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমে উঠল। ঠোঁট কামড়ে কোনোভাবে ব্যথা চেপে রাখার চেষ্টা করছিল, কিন্তু তবুও বুঝা যাচ্ছিল, ও ভেতর থেকে ভেঙে পড়ছে। আমি ভয় পেয়ে আবার হাসপাতালে যাওয়ার কথা বললাম। কিন্তু ভাবি কিছুতেই রাজি হচ্ছিল না। মৃদু কাঁপা গলায় শুধু বলছিল,
“আমার কিছু হবে না, হাসপাতালে যেতে হবে না!
কিন্তু তার সেই “কিছু হবে না” কথাটার মধ্যেও আমি ভয় শুনতে পাচ্ছিলাম। একটা মানুষ যখন বারবার নিজের কষ্ট অস্বীকার করে, তখন বুঝতে হয় সে আসলে বেঁচে থাকার আশা ছেড়ে দিয়েছে।
আমি এবার জোর করলাম। অনেক বুঝিয়ে, অনেক অনুরোধ করে শেষ পর্যন্ত একপ্রকার বাধ্য করেই রাজি করালাম। তারপর নিচে গিয়ে সবাইকে বললাম,
“আমরা বাইরে একটু ঘুরে আসবো।”
বড় মা প্রথমে রাজি হতে চাইলেন না। মুখের ভেতর কেমন অদ্ভুত টান পড়ে গেল। চোখেমুখে ভয় মিশ্রিত অস্বস্তি ফুটে উঠেছিল। কিন্তু আমি যখন বড় আব্বুর সামনেই কথাটা বললাম, তখন আর না করার উপায় রইল না। বাধ্য হয়েই অনুমতি দিলেন।
প্রায় বারোটার দিকে আমি হাওয়া ভাবিকে নিয়ে বের হলাম। তখন পুরো ড্রয়িংরুমটা অস্বাভাবিক রকম নিস্তব্ধ ছিল। মনে হচ্ছিল, এই বাড়ির প্রতিটা দেয়াল, প্রতিটা আসবাব, সবকিছু কোনো না কোনো অপরাধের নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ভাবি ঠিকমতো হাঁটতেই পারছিল না। আমি শক্ত করে ওর হাত ধরে ধীরে ধীরে বাড়ির বাইরে নিয়ে এলাম। ওর শরীরটা বারবার কেঁপে উঠছিল। মাঝে মাঝে মনে হচ্ছিল, এখনই হয়তো পড়ে যাবে। তবুও একবারও অভিযোগ করল না। একবারও বলল না “আমার কষ্ট হচ্ছে।” যেন সমস্ত কষ্টের সীমা পেরিয়ে গেলে মানুষ আর কাঁদতেও পারে না।
যেহেতু ভাবি সেখান থেকে নিজের বাড়িতে চলে যাবে, তাই আমরা বাড়ির গাড়ি নিলাম না। আমি ইচ্ছে করেই বাইরের একটা গাড়ি ডাকলাম। ভাবি চুপচাপ গিয়ে গাড়িতে বসে পড়ল। জানালার পাশে মাথা ঠেকিয়ে বাইরে তাকিয়ে ছিল। তার চোখদুটো এতটাই নিস্তেজ লাগছিল যে মনে হচ্ছিল ও হয়তো এই শহর, এই মানুষগুলো, এই জীবন সবকিছুর কাছ থেকেই বিদায় নিচ্ছে।
আমি আর ভাবি, দু’জনই তখন খুব ছোট। জীবনের এত ভয়ংকর বাস্তবতা, সম্পর্কের এত নিষ্ঠুরতা বোঝার মতো বয়স তখনো হয়নি। তাই কিছু না ভেবেই আগের সেই হাসপাতালেই নিয়ে গেলাম ওকে।
হাসপাতালটা প্রায় আমাদের পারিবারিক হাসপাতালের মতোই ছিল। বাড়ির কেউ অসুস্থ হলেই সাধারণত সেখানেই আনা হতো। কিন্তু সেদিন! সেদিন আমরা কেউই বুঝতে পারিনি, এই হাসপাতালের সাদা দেয়ালের ভেতরেই হাওয়া ভাবির জীবনের সবচেয়ে ভয়ংকর সত্যটা আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিল।
ভাবিকে হসপিটালে নিয়ে আসার পর থেকেই সবকিছু কেমন অদ্ভুত লাগছিল। ডক্টর কেবিনে ঢুকেই আশপাশে কোনো বড় মানুষ না দেখে একের পর এক প্রশ্ন করতে শুরু করলেন। আমরা দু’জনই তখন ভীত, অস্থির, দিশেহারা। কী বলবো, কীভাবে বলবো, কিছুই বুঝে উঠতে পারছিলাম না। শেষমেশ ডক্টরের মুখ বন্ধ করার জন্য আমি কাঁপা গলায় বললাম,
“মায়ান ভাই আমাদের আসতে বলেছে। উনি একটু পরেই আসবেন!
আমার কথা শুনে ডক্টর আর কিছু বললেন না। তিনি হাওয়া ভাবিকে ভালো করে চেক-আপ করলেন। তারপর দুর্বলতা কাটানোর জন্য একটা স্যালাইন লাগিয়ে চিন্তিত মুখে কেবিন থেকে বেরিয়ে গেলেন।
কেবিনের ভেতর তখন শুধু আমি, হাওয়া ভাবি আর একজন নার্স। চারপাশে কেমন চাপা নীরবতা। শুধু স্যালাইনের ফোঁটা পড়ার টুপটাপ শব্দটা কানে এসে লাগছিল। নার্সটা ভাবির হাতে লাগানো স্যালাইনের সূঁচটা ঠিক করতে করতে হঠাৎ বলল,
“আপনি এমন অবস্থায় খাওয়া-দাওয়া বন্ধ করে দিলেন কেন? আপনি তো এমনিতেই অসুস্থ এখন তো রিস্ক আরও বেড়ে গেল।”
আমি আর ভাবি দু’জনেই একসাথে চমকে উঠলাম। অবাক চোখে একে অপরের দিকে তাকিয়ে আবার নার্সটার দিকে তাকালাম।
আমি কাঁপা কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলাম,
“এমন অবস্থা মানে? কেমন অবস্থার কথা বলছেন? আর কিসের রিস্ক?”
নার্সটা খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতেই উত্তর দিল,
“আরে, প্রেগন্যান্সির সময় এভাবে না খেয়ে থাকলে মা আর বাচ্চা- দু’জনের জন্যই ঝুঁকি বেড়ে যায়।”
কথাটা শুনে মনে হলো, এক মুহূর্তে পুরো পৃথিবী থেমে গেছে। আমি আর হাওয়া ভাবি দু’জনেই স্তব্ধ হয়ে গেলাম। কথা বলার শক্তিটুকুও যেন হারিয়ে ফেললাম।
ভাবি ধীরে ধীরে নিজের ডান হাতটা পেটের উপর রাখল। তারপর! চোখ দিয়ে নিঃশব্দে জল গড়িয়ে পড়তে লাগল। সেই চোখের জলটা কেমন ছিল জানেন? সেখানে আনন্দ ছিল না! ছিল না মাতৃত্বের কোনো উচ্ছ্বাসও! ছিল শুধু ভাঙা একটা জীবনের অসহায় আর্তনাদ।
আমি নির্বাক চোখে নার্সটার দিকে তাকিয়ে রইলাম। মাথার ভেতর যেন প্রচণ্ড শব্দে কিছু একটা ভেঙে পড়ছিল। কোনোমতে শুকনো ঠোঁট ভিজিয়ে তোতলাতে তোতলাতে বললাম,
“প্রে, প্রেগন্যান্ট? মা-মানি, ভাবি…?”
নার্সটা স্যালাইনের তার ঠিক করে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে বলল,
“হ্যাঁ। উনি তো তিন মাসের অন্তঃসত্ত্বা। কালকেই নাকি চেক-আপ করানো হয়েছে।”
কথাটা বলেই সে কেবিন থেকে বেরিয়ে গেল। আমি যেন পাথর হয়ে বসে রইলাম। তার মানে, তারা সবাই জানত? কনিকা ভাবি, বড় মা সবাই? জানত যে হাওয়া ভাবি মা হতে চলেছে! তবুও কেউ তাকে বলেনি? কেউ তাকে আগলে রাখেনি? উল্টো তাকে এই অবস্থায় একা একা কষ্ট পেতে দিয়েছে?
আমার বুকের ভেতর হঠাৎ তীব্র ঘৃণা আর কষ্ট জমে উঠল। মনে হচ্ছিল এই বাড়ির মানুষগুলো মানুষ না অনুভূতিহীন পাথর। আমি ধীরে ধীরে ভাবির দিকে তাকালাম। তার কান্নার বেগ তখন আরও বেড়ে গেছে। ঠোঁট কাঁপছে, নিঃশ্বাস কাঁপছে, পুরো শরীরটা কাঁপছে।
হয়তো সে নিজেও বুঝতে পারছিল না এই সন্তানকে নিয়ে তার খুশি হওয়া উচিত, নাকি আরও ভেঙে পড়া উচিত। কারণ যে মানুষটা তার জীবনে এই সন্তান এনে দিয়েছে! সেই মানুষটাই তো তার সমস্ত শান্তি কেড়ে নিয়েছে। আমি আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলাম না। ধীরে ধীরে এগিয়ে গিয়ে শুয়ে থাকা ভাবিটাকে আলতো করে জড়িয়ে ধরলাম। আর ঠিক তখনই, হাওয়া ভাবি আমাকে শক্ত করে ঝাপটে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে উঠল। সেই কান্নাটা কোনো সাধারণ কান্না ছিল না। মনে হচ্ছিল, বুকের ভেতরে বছরের পর বছর জমে থাকা সমস্ত যন্ত্রণা একসাথে বেরিয়ে আসছে। আমি নিজেও আর নিজেকে সামলাতে পারলাম না। দুচোখ বেয়ে টপটপ করে জল পড়তে লাগল।
কেবিনের সাদা দেয়াল, স্যালাইনের ধীর ফোঁটা, আর দুইটা মেয়ের ভাঙা কান্না।
সেদিন পুরো পৃথিবীটা যেন শুধু কষ্ট দিয়েই তৈরি হয়েছিল। ডক্টর কেবিন থেকে বেরিয়ে এসেই অস্থির হাতে কনিকা ভাবিকে দু’বার কল দিলেন। কিন্তু দু’বারই কলটা কেটে গেল। হাসপাতালের করিডোরে তখন কেমন চাপা গন্ধ, ওষুধ, স্যালাইন আর উদ্বেগ মিশে থাকা এক অদ্ভুত ভারী পরিবেশ।
ডক্টরের মুখেও স্পষ্ট বিরক্তি আর দুশ্চিন্তার ছাপ। তিনি আর দেরি না করে তৃতীয়বার নম্বরটা ডায়াল করলেন। এবার কলটা রিসিভ হতেই ওপাশের মানুষটাকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে রাগ আর হতাশা মিশ্রিত কণ্ঠে বলে উঠলেন,
“আপনাদের কি কোনো কমনসেন্স নেই? এভাবে কেউ একজন অসুস্থ মানুষকে একা হসপিটালে পাঠায়? কালকেও তো উনি মোটামুটি ভালো ছিলেন! আজ হঠাৎ এত বড় দুর্ঘটনা কীভাবে ঘটল? আর ঘটার পরও সঙ্গে সঙ্গে হসপিটালে আনলেন না কেন?”
ডক্টরের একের পর এক কথায় মায়ান ভাই ভ্রু কুঁচকে ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকাল। তারপর বুকের ভেতরটা হঠাৎ কেমন ধক করে উঠল। সকালের তাড়াহুড়োয়! সে ভুল করে কনিকা ভাবির ফোনটাই নিয়ে চলে এসেছে। কিন্তু ডক্টর কার কথা বলছে? কোন “উনি”? মায়ান ভাই কিছুটা বিভ্রান্ত, কিছুটা বিরক্ত গলায় বলল,
“আপনি হয়তো ভুল নম্বরে কল করেছেন। আমাদের তো কেউ অসুস্থ না যে হসপিটালে যাবে।”
তার কথা শেষ হতেই ডক্টর যেন আরও রেগে গেলেন। চোয়াল শক্ত করে বললেন,
“মানে? আপনি কি আমার সাথে মজা করছেন? আপনি কে? এটা তো কনিকার ফোন! আর ওর বোন এখন হসপিটালের বেডে অসুস্থ হয়ে পড়ে আছে!”
“ওর বোন! দুইটা শব্দ যেন বিদ্যুতের মতো আঘাত করল মায়ান ভাইকে। মুহূর্তের মধ্যে হাওয়ার কান্নাভেজা মুখটা চোখের সামনে ভেসে উঠল। সকালের সেই নিঃশব্দ, ভাঙা চোখদুটো! অভিমানে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া মেয়েটা! তার বুকের ভেতরটা কেমন হিম হয়ে গেল। কণ্ঠ কেঁপে উঠে সে তাড়াহুড়ো করে বলল,
“কী, কী হয়েছে ওর? আপনি প্লিজ ওর খেয়াল রাখুন। আমি, আমি দশ মিনিটের মধ্যে হসপিটালে পৌঁছে যাচ্ছি!”
শেষের কথাগুলো বলতে গিয়েও তার গলা জড়িয়ে যাচ্ছিল। কথাটা বলেই সে তড়িঘড়ি করে কল কেটে দিল। কিন্তু কলটা কাটার সঙ্গে সঙ্গেই আবার ফোনটা বেজে উঠল। স্ক্রিনে ভেসে উঠল,
“বাবা”।
মায়ান ভাই দ্রুত অফিস কক্ষ থেকে বেরিয়ে আসতে আসতে কলটা রিসিভ করল। ওপাশ থেকে ভেসে এলো কনিকার বাবার স্বাভাবিক, শান্ত কণ্ঠ—
“হ্যালো কনিকা মা, আমি আর তোর মা তোদের বাড়ির পাশেই আছি। মায়ান বাবাজিকে একটু পাঠা তো।”
কিন্তু মায়ান ভাইয়ের নিঃশ্বাস তখন অস্বাভাবিক ভারী। তার মাথার ভেতর শুধু একটা কথাই ঘুরছিল “হাওয়া হসপিটালে”! সে তাড়াহুড়ো করে বলল,
“বাবা, আমি এখন হসপিটালে যাচ্ছি। ভুল করে কনিকার ফোনটা আমি নিয়ে চলে এসেছি। আপনি আমার নম্বরে কল করে কনিকাকে বলেন আপনাদের নিয়ে যেতে!
“হসপিটাল?” শব্দটা শুনেই ওপাশে নীরবতা নেমে এলো। তারপর উদ্বিগ্ন কণ্ঠে উনি জিজ্ঞেস করলেন,
“হসপিটালে কেন বাবা? কার কী হয়েছে?”
মায়ান ভাই তখন প্রায় দৌড়ে গাড়ির দিকে যাচ্ছে। হাত কাঁপছে। মনে হচ্ছিল বুকের ভেতর কেউ পাথর চেপে ধরেছে। সে কষ্ট করে বলল,
“হাওয়া অসুস্থ, বাবা আমাকে এক্ষুনি হসপিটালে যেতে হবে!
কথাটা শুনে ওপাশের মানুষটার গলাতেও আতঙ্ক নেমে এলো। হাওয়া ভাবির বাবা অস্থির হয়ে বললেন,
“ঠিকানাটা বলো! আমরাও আসছি!”
মায়ান ভাই আর কোনো কথা বাড়াল না। এক নিঃশ্বাসে হাসপাতালের ঠিকানাটা বলে দিল। তারপর কাঁপা হাতে গাড়ির স্টিয়ারিং আঁকড়ে ধরল। ইঞ্জিন স্টার্ট হতেই গাড়িটা দ্রুত ছুটে চলল শহরের ব্যস্ত রাস্তা পেরিয়ে। কিন্তু গাড়ির চেয়েও দ্রুত ছুটছিল একটা অদ্ভুত ভয়, একটা অজানা আশঙ্কা! কারণ জীবনে প্রথমবারের মতো মায়ান ভাইয়ের মনে হচ্ছিল- হয়তো কিছু একটা সত্যিই ভেঙে যাচ্ছে। এমন কিছু! যেটা আর কোনোদিনও আগের মতো ঠিক করা যাবে না।
আমরা হসপিটালে এসেছি প্রায় দুই ঘণ্টারও বেশি হয়ে গিয়েছে। এর মধ্যেই হাওয়া ভাবির স্যালাইনটা শেষ হয়ে যায়। ছোট স্যালাইন ছিল বলে মাত্র পঁয়ত্রিশ মিনিটেই ফুরিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু স্যালাইন শেষ হলেও ভাবির কান্না থামেনি। বরং সময় যত যাচ্ছিল, উনার ভেতরের অস্থিরতাটা যেন আরও বাড়ছিল। বারবার কাঁপা গলায় শুধু একটাই কথা বলছিলেন,
“আমি বাড়ি যাব আমাকে বাড়ি নিয়ে চলো, প্লিজ!
সেই “বাড়ি” শব্দটার ভেতর এতটা ভাঙাচোরা আকুতি ছিল যে আমার বুকটা মোচড় দিয়ে উঠছিল। মনে হচ্ছিল, উনি আর কোথাও থাকতে চাইছেন না। না এই শহরে! না এই সম্পর্কের ভেতরে! না এই অসহনীয় যন্ত্রণাময় জীবনে।
আমি কিছুতেই রাজি হচ্ছিলাম না।এই অবস্থায় উনাকে একা পাঠানো সম্ভব না। শরীরের অবস্থাও ভালো না, তার উপর মানসিকভাবে উনি পুরোপুরি ভেঙে পড়েছেন।।অনেক বুঝানোর পর শেষমেশ ঠিক হলো, আমি নিজেই উনাকে পৌঁছে দিয়ে আসব।
ভাবিও বাধ্য হয়ে আমার কথায় রাজি হলেন। ডক্টর তখন কেবিনে ছিলেন না। হয়তো লাঞ্চে গিয়েছিলেন। কেবিনে শুধু একজন নার্স ছিল। আমি গিয়ে তাকে বললাম আমরা বাড়ি চলে যাব। প্রথমে তিনি একদমই রাজি হচ্ছিলেন না। বারবার বলছিলেন,
“ডক্টর না আসা পর্যন্ত রোগীকে নিয়ে যাওয়া যাবে না।”
কিন্তু তখন আমাদের কারও মাথাই ঠিকভাবে কাজ করছিল না। আমারও শুধু একটাই চিন্তা ছিল, কীভাবে যেন ভাবিকে এই জায়গা থেকে সরানো যায়। শেষমেশ অনেক অনুরোধের পর কাঁপা হাতে আমি উনার হাতে পাঁচশো টাকার একটা নোট গুঁজে দিতেই তিনি অনিচ্ছাসত্ত্বেও যেতে দিলেন।
আমি ধীরে ধীরে ভাবিকে ধরে কেবিন থেকে বের করলাম। ভাবির শরীরটা তখন এতটাই দুর্বল হয়ে গিয়েছিল যে ঠিকমতো হাঁটতেও পারছিলেন না। মনে হচ্ছিল, একটু জোরে বাতাস এলেও হয়তো ভেঙে পড়ে যাবেন। আমি এক হাতে উনার কাঁধ জড়িয়ে ধরে খুব সাবধানে হাসপাতালের সামনে নিয়ে এলাম। বাইরে তখন দুপুরের তীব্র আলো। রাস্তাজুড়ে গাড়ির শব্দ, মানুষের ব্যস্ত হাঁটাহাঁটি সবকিছু যেন স্বাভাবিকভাবেই চলছিল।
শুধু আমাদের জীবনটাই এলোমেলো হয়ে গিয়েছিল। আমরা হাসপাতালের সামনে মেইন রোড পার হয়ে অপর পাশে গিয়েছিলাম গাড়িতে ওঠার জন্য। ঠিক তখনই দু’দিক থেকে আমাদের বাড়ির দু’টো গাড়ি এসে হাসপাতালের সামনে থামল। আমার বুকটা ধক করে উঠল। গাড়ির দরজা খুলে একে একে নেমে এল মায়ান ভাই, কনিকা ভাবি, আর ভাবির বাবা-মা। তারা প্রথমে কিছু বুঝতে পারেনি। কিন্তু পরমুহূর্তেই আমাদের দিকে চোখ পড়তেই সবাই থমকে গেল। ওপাশ থেকে মায়ান ভাই আর ভাবির বাবা প্রায় একসাথেই হাত বাড়িয়ে অস্থির কণ্ঠে ডাক দিলেন,
“হাওয়া!”
সেই ডাকটা কানে যেতেই ভাবির পুরো শরীরটা হঠাৎ কেঁপে উঠল। আমি বুঝতে পারছিলাম না, উনি নিজের বাবাকে দেখে কেঁপে উঠেছেন নাকি নিজের সন্তানের বাবাকে দেখে। কিন্তু উনার চোখে তখন হঠাৎ এক অদ্ভুত অস্থিরতা নেমে এলো। হয়তো উনি আর নিজেকে সামলাতে পারছেন না। আমি শক্ত করে উনার হাত ধরে রাস্তা পার হচ্ছিলাম। ভাবিও কাঁপতে কাঁপতে তাদের দিকেই তাকিয়ে ছিলেন। আর ঠিক সেই মুহূর্তে, আমার বুকের ভেতর হঠাৎ অকারণে ভয় জমতে শুরু করল। ভীষণ ভয়, অজানা এক আতঙ্ক, মনে হচ্ছিল, পরের কয়েকটা সেকেন্ডই হয়তো আমাদের সবার জীবন চিরতরে বদলে দিতে চলেছে…।
******** চলবে~~~ *******
বিদ্রঃ “সব কষ্টেরও একটা শেষ থাকে… হাওয়ার জীবনেও হয়তো সেই শেষ অধ্যায়টা খুব কাছে এসে দাঁড়িয়েছে।
আর মাত্র একটা পর্ব বাকি… বড় হলে হয়তো দুই ভাগে দিব। এতদূর পর্যন্ত ধৈর্য ধরে গল্পটা পড়ার জন্য অসংখ্য কৃতজ্ঞতা। ভুল-ত্রুটি ক্ষমা'সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন।🙏🙏