ফন্ট সাইজ:
থিম:
হুটহাট পরিনীতা

২য় পর্ব

লেখক: নওরিন কবির তিশা

#হুটহাট_পরিনীতা—— #পর্ব_২

লেখনী—— #নওরিন_কবির_তিশা

প্রভাতী নরম রোদ্দুরে সদ্য জাগ্রত হয়েছে গোটা ধরিত্রী। ফজরের আজান প্রতিধ্বনিত হতেই ঝটপট নামাজ সেরে নেওয়ার অভ্যাস আছে আমার। আজকেও ব্যতিক্রম হয়নি। নামাজ পড়ে সবে ওনার রুমের পার্শ্ববর্তী বিশাল ঝুল বারান্দাটায় এসে দাঁড়িয়েছি। মিষ্টি হাওয়ারা এসে অবাধ্য হয়ে ছুঁয়ে যাচ্ছে আমায়। তাদের মৃদুমন্দ স্পর্শে ললাটে পতিত ক্ষুদে কেশগুচ্ছ বিশৃংখল নিত্যে মেতেছে আমার।

আমার বাসা খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলায়। প্রত্যন্ত অঞ্চল নয় মোটেই। মোটামুটি উন্নত বলা যায়। এদিকে আমার যার সাথে বিয়ে হয়েছে ওনার বাসাও খুলনাতেই। আমাদের বাড়ি থেকে মাইল খানেক দূরে। খুলনার সোনাডাঙ্গা। খুলনার নামকরা সিটি হাসপাতাল থেকে কিঞ্চিৎ দূরত্বে।

এমন ভাবনায় আমি যখন পুরোপুরি নিমগ্ন,ঠিক তক্ষুনি আকস্মিক পাশে কারো উপস্থিতি অনুভূত হলো। বেশ চমকে চাইতেই দেখলাম, উনি দাঁড়িয়েছেন। ধুর, এই উনি সম্বোধন একদম পছন্দ নয় আমার। বড্ড সেকেলে সেকেলে লাগে! কিন্তু করবো কি? এই লোকের নাম জানলে তো, সেটা বলে ডাকবো! পাজি লোকটা এখনো নাম বলেনি।

হঠাৎ আমার ধ্যান ছুটিয়ে তিনি বললেন,,

‘কী ব্যাপার? এত ভোরে উঠে বারান্দায় দাঁড়িয়ে কী করা হচ্ছে? আবার ঘুমাতে যাবেন না?’

আমি ওনার দিকে না তাকিয়েই জবাব দিলাম,

‘না, এখন আর ঘুমাতে যাব না।’

উনি একটু অবাক হওয়ার ভান করে হাতঘড়ির দিকে চাইলেন। তারপর বললেন,

‘এখনো তো ভোর হতে অনেকটা দেরি। এই সাতসকালে ঘুম থেকে ওঠার কারণ কী? নাকি নতুন জায়গায় ঘুম আসছে না?’

আমি একটু আমতা আমতা করে বললাম,

‘না, মানে... আমি ফজর নামাজের পর আর ঘুমাই না। অভ্যাস আছে।’

উনি বারান্দার গ্রিল ধরে বাইরের ভোরের কুয়াশামাখা আলোটার দিকে তাকালেন। চশমার কাচে ভোরের আলো ঠিকরে পড়ছে। বেশ কৌতূহল নিয়ে শুধালেন,

‘তাই নাকি? প্রতিদিন নামাজের পরে জাগা হয়? তা এত ভোরে উঠে কী করা হয়? পড়াশোনা?’

পড়াশোনা! এই শব্দটা শুনেই আমার বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল। সর্বনাশ! এখন ওনাকে সত্যিটা কীভাবে বলি? বড়দের সামনে বানিয়ে বানিয়ে মিথ্যা বলার অভ্যাস আমার নেই, আবার সত্যিটা বলতেও লজ্জায় মাথা কাটা যাচ্ছে। আমার এমন কিংকর্তব্যবিমূঢ় অবস্থা দেখে উনি আমার দিকে তাকালেন। ঠোঁটের কোণে হঠাৎ মুচকি হাসির রেখা ফুটলো ‌ওনার। উনি হয়তো আমার মনের অবস্থা বুঝতে পারলেন অতঃপর বেশ আশ্বস্ত করে বললেন,

‘ব্যাপার না, বলতে পারেন। ভয়ের কিছু নেই।’

আমি ওনার দিকে আড়চোখে তাকিয়ে একটু সাহস সঞ্চয় করে বললাম,

‘সত্যি কথা বলব?’

উনি মাথা নেড়ে সায় দিয়ে বললেন,

‘হ্যাঁ, অবশ্যই।’

আমি মাথা নিচু করে, গলার আওয়াজ একদম খাদে নামিয়ে চটপট বলে ফেললাম,

‘আসলে... রিলস দেখতাম।’

বলেই আমি দ্রুত দৃষ্টি সরিয়ে নিলাম। ইশ! লজ্জায় আমার কান-মাথা গরম হয়ে যাচ্ছে। কোনো ভদ্র বাড়ির মেয়ে কি বরের সামনে প্রথম সকালে দাঁড়িয়ে এমন কথা স্বীকার করে? যে,সে ভোররাতে নামাজ শেষে উঠে ফেসবুকের রিলস দেখত! ধরণী দ্বিধা হও, আমি ভেতরে যাই!

খানিকক্ষণ পুরোপুরি নিস্তব্ধতা। আমি চশমা পরা লোকটার কোনো প্রতিক্রিয়া না পেয়ে একটু সাহস সঞ্চয় করে ওনার দিকে তাকালাম। চেয়েই আমার চোখ জুড়িয়ে গেল। ভোরের এই স্নিগ্ধ আলোয় ওনাকে বড্ড বেশি হ্যান্ডসাম লাগছে। আমার ভাষ্যমতে ‘বড্ড ড্যাশিং’! এলোমেলো চুলগুলো কপালে এসে পড়েছে, একদম আমার সারাজীবনের আকাঙ্ক্ষিত মানবের মতোই সব কিছু ওনার।

চাপদাড়ির আড়ালে উনি মৃদু মৃদু হাসছেন। হাসলে ওনার গাল দুটো কেমন যেন মিষ্টি দেখায়। ইশ! একটা মানুষ হাসলে এত সুন্দর লাগে কী করে? আমার দিকে তাকিয়ে উনি নিজের হাসিটা একটু আড়াল করার চেষ্টা করলেন। তারপর ওনার সেই ভরাট, গম্ভীর কণ্ঠে শুধালেন,

‘তা... চা খাবেন?’

আমি পুরোপুরি অপ্রস্তুত হয়ে পড়লাম। এই লোকটার মুড বোঝা বড় দায়! এই হাসছেন, আবার পরক্ষণেই একদম গম্ভীর হয়ে চায়ের অফার করছেন! আমি আমতা আমতা করে কিছু বলতে যাব, তার আগেই উনি বললেন,

‘আচ্ছা দাঁড়ান, আমি তৈরি করে আনছি।’

বলেই উনি চটপট বারান্দা থেকে ঘরের ভেতর দিয়ে করিডোরের দিকে পা বাড়ালেন। আর আমি ওনার যাওয়ার পথের দিকে হাঁ করে তাকিয়ে রইলাম। লোকটা নিজে চা বানিয়ে আনবে? ভালোই হলো, ওনার হাতের চায়ের স্বাদ কেমন, সেটাও আজ পরীক্ষা করা যাবে!

মিনিট দশেক পার হতে না হতেই ওনার পায়ের আওয়াজ পাওয়া গেল। দরজায় এসে দাঁড়ালেন উনি, দুই হাতে দুটো ধোঁয়া ওঠা সিরামিকের মগ। লিকার চা নয়, আমার পছন্দ একদম পারফেক্ট দুধ-চা। চায়ের সুবাসে ভোরের তাজা হাওয়াটা যেন এক নিমিষে আরও গাঢ় হয়ে উঠল। উনি একটা মগ আমার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললেন,

‘নিন, আপনার চা। চিনি মিডিয়াম দিয়েছি। চলবে তো?’

আমি থতমত খেয়ে মগটা হাতে নিলাম। ওনার আঙুলের অগ্রভাগ আমার আঙুলে সামান্য ছোঁয়া লাগতেই কেমন যেন একটা অদ্ভুত শিহরণ খেলে গেল শরীরে। নিজেকে সামলে নিয়ে বললাম,

‘থ্যাঙ্ক ইউ। আপনি নিজে বানালেন?’

উনি নিজের মগে একটা চুমুক দিয়ে রেলিংয়ে হেলান দিয়ে দাঁড়ালেন। চশমার আড়ালে আবৃত অতি তীক্ষ্ণ চোখ দুটো আমার দিকে স্থির। বললেন,

‘হুম। ব্যাচেলর লাইফে এই একটা গুণ অন্তত রপ্ত করেছিলাম। কেমন হয়েছে? খেয়ে দেখুন।’

আমি আলতো করে চুমুক দিলাম। গরম চায়ের মিষ্টি স্বাদটা জিভে লাগতেই চোখ দুটো বুজে এলো আবেশে। সত্যি বলতে, চা-টা চমৎকার হয়েছে। আমি মাথা নেড়ে ওনার দিকে চেয়ে বললাম,

‘দারুণ! আম্মুর হাতের চায়ের পর আপনার হাতের চা-টাই বেস্ট লাগছে।’

আমার কথায় উনি মৃদু হাসলেন। হাসিটা বড্ড মায়াবী। এককথায় ক্রাশ খাওয়ার মতো। আমার কিন্তু বেশ লাগছে। কিন্তু চিন্তাও হচ্ছে, বউ হয়েই কাল থেকে এ পর্যন্ত,এতবার ক্রাশ খেলাম! না জানি বাইরের মেয়েরা কিভাবে নিজেকে সামলায়। নাকি ওরাও...আমার ভাবনার সমাপ্তি ঘটিয়ে উনি বললেন,

‘প্রশংসার জন্য ধন্যবাদ। তা, বিয়ের পরদিনই হাসবেন্ডের হাতের চা পেয়ে নিজেকে স্পেশাল মনে হচ্ছে তো?’

ওনার এই রসিকতায় আমার গাল দুটো নিশ্চয় রক্তবর্ণ ধারণ করেছে,মানে অহরহ উপন্যাসে তো তাই পড়েছি,নায়ক কিছু বললেই নায়িকা নাকি লাল হয়ে যেতো। কিন্তু সেসব বাদ,লোকটা তো দারুণ ফ্লার্ট করতে পারে! আমি মুখটা অন্য দিকে ঘুরিয়ে চায়ের মগে মন দিলাম। সকালের আলো এখন অনেকটাই পরিষ্কার। আকাশে মেঘেদের আনাগোনা বেড়েছে।

চা শেষ করে মগটা বারান্দার ছোট্ট টেবিলে রাখলাম। হুট করেই বুকের ভেতরটা কেমন যেন ফাঁকা ফাঁকা লাগতে শুরু করল। নতুন ঘর, নতুন মানুষ, চারপাশের পরিবেশটা যতই সুন্দর হোক না কেন, মনটা কেমন যেন আনচান করে উঠল। আমি তো আম্মু-আব্বুকে ছাড়া কোথাও থাকি না। নানুবাড়ি গেলেও দুই দিনের বেশি মন টেকে না। আর এখানে পুরো একটা রাত কাটিয়ে দিলাম এক অচেনা পুরুষের সাথে! যদিও লোকটা খারাপ না, তাও নিজের চেনা ঘরটার জন্য মনটা হু হু করছে।

আমি কিঞ্চিৎ দ্বিধা আর আড়ষ্টতা নিয়ে ওনার দিকে তাকালাম। আঙুলগুলো একটা আরেকটার সাথে পেঁচাতে পেঁচাতে বেশ কুণ্ঠিত স্বরে বললাম,

‘ইয়ে... একটা কথা বলব?’

উনি ওনার খালি মগটা রেখে আমার দিকে পূর্ণ দৃষ্টিতে চেয়ে বললেন,

‘হ্যাঁ, বলুন। কী বলবেন?’

‘আপনার ফোনটা একটু দেওয়া যাবে? মানে... আমি একটু আম্মুর সাথে কথা বলতাম।’

উনি এক মুহূর্তের জন্য আমার মুখের দিকে চাইলেন। হয়তো আমার চোখের কোণের লুকানো মন খারাপটা ওনার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি এড়াতে পারে নি। অতঃপর পকেট থেকে ওনার লেটেস্ট মডেলের আইফোনটা বের করে আনলক করে আমার দিকে বাড়িয়ে দিলেন,,

‘এই নিন। আম্মুর নাম্বার মুখস্থ আছে তো?’

‘জ্বী।’

ফোনটা হাতে নিয়ে ডায়াল প্যাডে আম্মুর নাম্বারটা তুললাম। আমি জানি, আম্মু ফজরের নামাজের পর আর ঘুমায় না। এই সময়টায় আম্মু হয় বারান্দায় বসে থাকে, না হয় রান্নাঘরের দিকে যায়। মাত্র দুইবার রিং হতেই ওপাশ থেকে আম্মুর চেনা কণ্ঠস্বর ভেসে এলো,

‘আসসালামু আলাইকুম। কে বলছেন?’

আম্মুর গলাটা শুনতেই আমার চোখের কোণটা কেমন যেন ভিজে উঠল। ঠোঁট কামড়ে কান্না চেপে বললাম,

‘আম্মু, আমি... তরী।’

‘তরু! মা আমার! কেমন আছিস তুই? শরীর ভালো আছে তো? জামাই কেমন আছে? কোনো কষ্ট হচ্ছে না তো তোর?’

একটানা এতগুলো প্রশ্ন শুনে আমার বুক ঠেলে কান্না আসতে চাইল। কিন্তু পাশে এই চশমা পরা গম্ভীর লোকটা দাঁড়িয়ে আছে, ওনার সামনে কাঁদলে তো কেলেঙ্কারি হয়ে যাবে! আমি নিজেকে সামলে নিয়ে স্বাভাবিক গলায় বললাম,

‘আমি ভালো আছি আম্মু। ওনারাও খুব ভালো। এই মাত্র ওনার হাতের স্পেশাল দুধ-চা খেলাম। তুমি কী করছ?’

ওপাশ থেকে আম্মু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বলল,

‘আমি তো কেবল রান্নাঘরে এলাম রে। নে তোর আব্বুর সাথে কথা বল।’

আম্মুর সাথে কথা বলাকালীন সময়েই পাশে এসে দাঁড়িয়েছে, বুঝেছিলাম আগেই। তবে আম্মু কথা বলায় কিছু বলিনি। আম্মু ফোনটা আব্বুকে দিলেন,,

‘আম্মাজান?’

ব্যাস! আমাকে আর আটকায় কে? আব্বুর কন্ঠ শুনলে না চাইতেও কান্না আসে আমার। ওই যে বললাম ছিচকাঁদুনি আমি! তবুও নিজেকে যথাসম্ভব শান্ত রেখে কান্নার সংবরণ করে ঢোক গিলে বললাম,,

‘আব্বু?’

‘আম্মাজান? তুমি কি কান্না করছো?’

আব্বুর কণ্ঠস্বরটাও ভেঁজা। স্পষ্ট বুঝতে পারছি।

‘কান্না তো তুমি করছো আব্বু!’

চট করে ধরা খাওয়ার ভঙ্গিমাতে প্রসঙ্গ বদলালেন তিনি,,

‘একদমই না মা।আচ্ছা, এসব বাদ। জামাইকে ফোনটা দাও তো দেখি, একটু কথা বলি ওর সাথে।

আমি আব্বুর কথা শুনে একটু ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে ফোনের ওপরে হাত চাপা দিলাম। তারপর ওনার দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বললাম,

‘আব্বু‌ আপনার সাথে কথা বলতে চাইছে।’

উনি একটুও বিরক্ত হলেন না, বরং বেশ সহজ ভঙ্গিতে আমার হাত থেকে ফোনটা নিলেন। ওনার সেই ভদ্রোচিত কণ্ঠে বললেন,

‘আসসালামু আলাইকুম, আব্বু। কেমন আছেন?’

ওপাশ থেকে আব্বু কী বলল জানা নেই, তবে ওনার মুখের অভিব্যক্তি দেখে মনে হলো উনি বেশ উপভোগ করছেন কথোপকথনটা। উনি বললেন,

‘জ্বী আব্বু, একদম চিন্তা করবেন না। তরী ঠিক আছে। হ্যাঁ, ... জ্বী, ও তো বেশ লক্ষ্মী মেয়ে, একদম শান্ত হয়ে বসে আছে।’

শান্ত হয়ে বসে আছি! আমি মনে মনে ওনাকে একটা ভেঙচি কাটলাম। লোকটা বানিয়ে বানিয়ে মিথ্যা বলছে! আমি নাকি শান্ত! গোটা ডুমুরিয়ার সবাই জানে নিহিরা জাহান তরী কতটা ঘাড়ত্যাড়া আর চঞ্চল! উনি আরও কিছুক্ষণ আম্মুর সাথে হেসে হেসে কথা বললেন। শেষে বললেন,

‘আচ্ছা আব্বু ভালো থাকবেন। আম্মুকে সালাম জানাবেন।’

ফোনটা কেটে উনি আমার দিকে চেয়ে বললেন,

‘আপনার আব্বু তো বললেন আপনি নাকি ভীষণ দুষ্টু। অথচ আমার সামনে তো একদম বিড়ালছানার মতো গুটিসুটি মেরে আছেন। কাহিনী কী, তরী?’

ওনার এই ‘তরী’ ডাকটা হুট করেই আমার কানের লতিতে গিয়ে ধাক্কা খেল। প্রথমবার ওনার মুখে নিজের নামটা শুনে বুকের ভেতর কেমন যেন ওলটপালট হয়ে যাচ্ছে যেন। আমি আমতা আমতা করে বললাম,

‘আমি... আমি মোটেও দুষ্টু নই। আব্বু বানিয়ে বলেছে।’

উনি বারান্দার দেয়াল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে চশমাটা একটু ঠিক করে বললেন,

‘আচ্ছা? তা না হয় মেনে নিলাম। তবে একটা জিনিস খেয়াল করেছেন?’

আমি ভ্রু কুঁচকে তাকালাম, ‘কী?’

‘আপনি কিন্তু এখনো আমার নামটা জানতে চাননি। পুরো একটা রাত আর একটা সকাল একসঙ্গে পার হয়ে গেল,অথচ আপনি এখনো নিজের হাসবেন্ডের নামটা অবধি না জেনেই দিব্যি কাটিয়ে দিচ্ছেন?’

কথাটা সত্যি! লজ্জায় আর অভিমানে কাল থেকে ওনার নামটাই জিজ্ঞেস করা হয়নি। এখন উনি নিজেই যখন তুললেন, তখন সুযোগটা হাতছাড়া করা যায় না। আমি ওনার চোখের দিকে তাকিয়ে মুখ খুললাম,

‘আপনার নাম কী?’

উনি আমার দিকে এক পা এগিয়ে এলেন। ভোরের সোনালী আলো ওনার চশমার কাচ ভেদ করে চোখে এসে পড়েছে। উনি গভীর কন্ঠে বললেন,

‘আমার নাম অন্তিক। অন্তিক শাহরিয়ার।’

‘অন্তিক শাহরিয়ার!’ নামটা শুনেই আমার বড্ড চেনাচেনা লাগলো। আমি ভ্রু কুঁচকে, কিছু একটা মনে করার ভঙ্গিতে চোখ দুটো সরু করে ওনার দিকে তাকালাম। চট করে স্মৃতি হাতড়ে বললাম,

‘আরে! আপনি কি সিটি মেডিকেলের সেই ডক্টর শাহরিয়ার? যার কাছে গত মাসে অ্যাপয়েন্টমেন্ট নেওয়ার কথা ছিল? কিন্তু ওনার সিরিয়াল পাওয়া যাচ্ছিল না বলে অন্য ডাক্তার দেখালাম!’

ডক্টর অন্তিক আমার এই হুট করে চিনে ফেলার ভঙ্গিমায় বেশ মজা পেলেন। ওনার চশমা জোড়া নাকের ডগায় একটু নামিয়ে, সেই চিরচেনা মায়াবী হাসিতে ঠোঁট বাঁকিয়ে বললেন,

‘হ্যাঁ, আমিই সেই।’

অতঃপর উনি আমার দিকে আরও এক পা এগিয়ে এসে ফিসফিস করে বললেন,

‘ কিন্তু দেখুন কান্ড! একবার ভিজিটের অ্যাপয়েন্টমেন্টের জায়গায় একেবারে আমার পুরো জীবনের অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিয়ে ঘরে বসে আছেন, তরী মহাশয়া! এটার সিরিয়াল কিন্তু আর কখনোই শেষ হবে না।’

ওনার এই মারাত্মক সুইট ফ্লার্টেশনে আমার পুরো শরীর যেন অবশ হয়ে এলো। ইশ! এই লোক এত সুন্দর করে কথা বলে কেন? লজ্জায় লাল হয়ে আমি আর এক মুহূর্তও ওখানে দাঁড়ালাম না, চায়ের খালি মগটা হাতে নিয়ে একপ্রকার দৌড়ে ঘরের ভেতর পালিয়ে এলাম।

আমার এহেন কাণ্ডে কিঞ্চিত শব্দ করে হেসে উঠলেন তিনি। রুমের ভেতরে আসার পরও এখনো স্পষ্ট শ্রবণগোচর হচ্ছে তা।

★

বেলা সামান্য চড়তেই আমার মানে মিস্টার ডক্টরের রুমে মানুষের আনাগোনাও বাড়ালো বেশ। হঠাৎ দরজা ঠেলে বেশ চটপটে স্বভাবের একটি মেয়ে ঢুকলো, পরনে সালোয়ার কামিজ,ও ঢুকেই আমার দিকে চেয়ে অভিযোগের স্বরে বলল,,

​‘ হায়,ভাবী! আমি দিবা। তোমার ননদ প্লাস তোমার সেভ ইয়ার ফ্রেন্ড। ভাইয়া তো কাল রাত থেকে তোমাকে একাই আগলে রেখেছে, আমাদের তো দেখাই করতে দিচ্ছিল না!’

​দিবার এই চটুল কথায় ঘরের গুমোট ভাবটা এক নিমেষেই কাটল যেনো। আমি একটু লাজুক হাসলাম। এর মধ্যেই ঘরে প্রবেশ করলেন আমার শ্বাশুড়ি আম্মা। চেনার কারণ, কালকেই উনাকে দেখেছি।না, কথা হয়নি কিন্তু কাল যখন অন্তিক ফোনে কথা বলছিলেন তখন ওনাকে দেখেছিলাম পাশের কারো সাথে বলতে,‘আমার বৌমা!’ আমি আমার বুদ্ধিমতী কিনা! বুঝে ফেলেছিলাম তৎক্ষণাৎ। এখন ভালো করে দেখলাম ওনার মুখাবয়বে এক অন্যরকম স্নিগ্ধ শান্ত ভাব আছে। উনি এসে আমার মাথায় হাত রেখে বললেন,

​‘বৌমা, নতুন জায়গা, কোনো অসুবিধা হচ্ছে না তো? অন্তিক তোমাকে আবার ডাক্তারী গম্ভীরতা দেখায়নি তো?’

​আমি মাথা নেড়ে বললাম,

‘না আম্মু, উনি অনেক ভালো।’

​দিবা পাশ থেকে টিপ্পনী কাটল,

‘ভালো তো হবেই মা! ভাইয়া, ২৬ বছরের সিঙ্গেল জীবনের অবসান ঘটিয়ে শেষমেষ মিঙ্গেল হলো না !’

​শ্বাশুড়ি আম্মু হাসলেন। একে একে ঘরে আরও কয়েকজন আত্মীয় এলেন। আম্মু ইশারা করতেই আমি সালাম দিলাম তাদের। আজ তো আমাদের বৌভাতের অনুষ্ঠান, তাই আর‌কি ওনাদের আগমন।মুরুব্বী্ গোছের একজন আমার চিবুক নেড়ে বললেন,

‘বৌ তো খাসা হয়েছে গা! তবে একটু বেশিই কচি মনে হচ্ছে।’

​আম্মু তৎক্ষণাৎ সামাল দিয়ে বললেন,

‘কচি হলেই ভালো, মনের মতো করে গড়ে নেওয়া যাবে। তোমরা বসো, আমি একটু রান্নাঘরটা দেখে আসি।’

আম্মু যাওয়ার পরপরই অন্তিকের কাজিনমহল প্রবেশ করলো কক্ষে। তিন চার জনের একটা মেয়ে দল। ওদের সাথে কুশল বিনিময় করেই গল্পে মশগুল হলাম। বলাবাহুল্য আমার থেকে বেশ বড় ওরা।তবে খুব বেশি না ওই দু-তিন বছরের হবে! এমন সময় হঠাৎ করে কক্ষে প্রবেশ করলেন অন্তিক। ওনার পরনে এখন একটা নেভী ব্লু শার্ট, বাবড়ি চুলগুলো সুন্দর করে সেট করা। চোখে সেই চশমা। ওনাকে ঘরে ঢুকতে দেখেই উপস্থিত সকলে কেমন যেন উসখুস করতে লাগলেন। একজন ফিসফিস করে বললেন,

‘জামাই তো এসে গেছে, চল আমরা ওদিকের কাজগুলো দেখি। নতুনদের একটু সময় দেওয়া দরকার।’

এই বলে ওনারা দ্রুত ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। ​ঘরে তখনো দিবার সাথে অন্তিকের কাজিন বোনরা দাঁড়িয়ে। অন্তিককে দেখে ওনার এক কাজিন বোন বেশ রসিকতা করে বলল,

‘কী ভাইয়া? সাতসকালেই ভাবীর খোঁজ নিতে চলে এলছ? হসপিটালের রাউন্ড শেষ না হতেই ঘরের রাউন্ড শুরু?’

​আরেক বোন হেসে বলল,

‘ডক্টর সাহেব, ভাবীর প্রেশার-টেশার ঠিক আছে তো? নাকি আপনার প্রেসেন্সে প্রেশার হাই হয়ে গেছে?’

​অন্তিক একটুও অপ্রস্তুত হলেন না। উনি ওনার সেই স্বভাবসুলভ শান্ত ভঙ্গিতে চশমাটা ঠিক করে বললেন,

‘তোমরা যদি একটু কাইন্ডলি রুমটা খালি করো, তাহলে প্রেশারটা নিজে চেক করে দেখতে পারি। আর হ্যাঁ, নিচে কিন্তু পিয়াস এসেছে, গিয়ে ওদিকটা হ্যান্ডেল কর।’

​‘বুঝেছি, আমাদের তাড়ানো হচ্ছে!’

বলে কাজিনরা হাসতে হাসতে দিবা সহ ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। যাওয়ার আগে দিবা আমাকে চোখ টিপে দিয়ে গেল। ​ঘরটা মুহূর্তেই ফাঁকা হয়ে গেল। রজনীগন্ধার সুবাস আর জানলার বাইরের চড়তে থাকা রোদের আলোয় রুমটা কেমন যেন থমথম করছে। অন্তিক আমার দিকে দু’পা এগিয়ে এলেন। ওনার সেই গভীর, ভরাট কণ্ঠে শুধালেন,

​‘তা, ম্যাডাম? বাড়ির লোকজনের সাথে পরিচিত হয়ে কেমন লাগছে? ওনারা কি আপনাকে খুব বেশি জ্বালিয়েছেন?’

এমা,জ্বালাবে কেন? ওদের সাথে তো বরং ভালোই সময় কাটছিল! কথাগুলো নিজের মাঝেই চেপে রেখে, মুখে শুধু বললাম,,

‘নাহ!’

‘তাহলে কি আমি জ্বালাচ্ছি?’

এটা আবার কোন ধরনের মানুষ রে বাবা! আমি এটা কখন বললাম? মনগড়া কথা বলে নাকি? বললাম,,

‘এটা কখন বলেছি?’

’ওহ,তার মানে জালাচ্ছি না?’

‘না অবশ্যই!’

’তাহলে জ্বালানো উচিত?’

‘এই আপনি এত কথা প্যাঁচান কেন?’

বলেই দিয়েছি এবার! মানে একটা কথাকে কিভাবে ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে লম্বা করছে! আমার যা ভাবে উনি হাসলেন, প্রলম্বিত একখানা হাসি। অতঃপর বললেন,,

‘কেননা আমার সহধর্মিনী নিজে থেকে কথা বলতে জানে না।’

‘আমি কথা বলতে জানিনা?’

‘অবশ্যই না!’

’আপনি কি জানেন? আমি বেশিরভাগ ক্লাস করতে পারিনি এই বকবকানির কারণে। স্যার অনেক সময় ক্লাসরুম থেকে বেরও করে দিয়েছেন!’

‘কিন্তু আমার সামনে তো কথা বলছে না। তাই বললাম আর কি!’

‘আসলে,আমি না টপিক খুঁজে পাচ্ছি না!’

‘আচ্ছা?’

‘হুম!’

’তাহলে টপিক বাড়ানোর জন্য এখন আমার করনীয়?’

‘কিছুই না।’

‘কিছুই না?’

‘হু!’

আমার বাচ্চামিতে হেসে উঠলেন অন্তিক। আমিও হাসলাম। কেন হাসলাম? জানিনা! তবে ওনার হাসিটা ভালো লেগেছে খুব! ভীষণ! একেবারে ক্রাশ খাওয়ার মত!

চলবে.......

[নোট: ইন্তেজার গল্পটা রাত আটটার দিকে পাবেন! দয়া করে কেউ স্টিকার কমেন্ট করবেন না, আর এটা যেহেতু আমার নিজের অনেক পছন্দের প্লট তো প্রতিদিনই দিব ইনশাআল্লাহ।তাই, নেক্সটপার্ট-ও কমেন্ট করবেন না প্লিজ! একটু গঠনমূলক মন্তব্য করুন যেটাতে মন চট করে ভালো হয়ে যাবে]

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ২য় পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন