#হুটহাট_পরিনীতা—— #পর্ব_৩
লেখনী—— #নওরিন_কবির_তিশা
যেহেতু বিবাহ অনুষ্ঠান আকস্মিক সংঘটিত হয়েছে তাই বৌ-ভাতটাও ছিমছাম ধাচের ছিলো। খুব বেশি জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠান হয়নি,তবে খুব বেশি সাধারনও নয়। মোটামুটি ঘরনার বলা যায়। আমাদের পারিবারিক আত্মীয়-স্বজনদের নিয়েই মূলত অনুষ্ঠানটা হয়েছে। বহিরাগত বলতে অন্তিকের কিছু বন্ধুরা এসেছিলেন এই যা। তবে উনি আমাকেও বলেছিল আমার বন্ধুবান্ধবকে দাওয়াত করতে। কিন্তু,দুর্ভাগ্যবশত ওদের নাম্বার আমার মুখস্ত নয়।
বড় কথা এমন হুট করেই সবকিছু হয়েছে যে ওদেরকে একবারও জানাতেও পারিনি। মূলত আমার বন্ধু মহলের সদস্য সংখ্যা অনেক হলেও,খুব কাছের রয়েছে দুজন। ওদেরকেও জানাতে পারিনি! আমার একটু মন কেমন করছিল। হ্যাঁ আমার বাবার বাসা থেকেও লোকজন এসেছে তবে, আব্বু আম্মু আসেননি। চাচ্চু-ফুপ্পি আর কাজিনরা এসেছিলো।
আব্বু আম্মুকে একদিন দেখিনি তাতেই মনে হচ্ছে কত যুগ-যুগান্তর পার হয়ে গিয়েছে। এখন বুঝছি, আম্মু কেন বারবার নানু বাড়ি যেতে চাইত। আমিও আমার বাড়িতে যেতে চাই। আমার বিছানায় শুয়ে পছন্দের উপন্যাসের বইগুলো শেষ করতে চাই। ইস,কিছুদিন আগেই না কতগুলো বই উপহার পেলাম! পড়াই তো হলো না। এবার বাড়ি গিয়েই শেষ করব।
সাত-পাঁচ ভাবতে ভাবতেই কক্ষে কারো উপস্থিতি টের পেলাম। বুঝলাম আমার মিস্টার এসেছেন! ধীরে ধীরে আমার পিছনে এসে দাঁড়াচ্ছেন বুঝলাম। অদ্ভুত এক শিরশিরানি ছেয়ে যাচ্ছে সমগ্র শরীর। আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ধরেছে আমায়। এই কি তবে সেই অনুভূতি? যেটা এতদিন যাবত উপন্যাসে পড়েছি,‘পিঠ বেয়ে নেমে যাওয়া শীতল স্রোত!’ নামে?
মুহূর্তটাকে অনুভব করছি চোখ বন্ধ রেখেই। আকস্মিক পিছনের অস্তিত্বটা সরে গেলো। তীব্র গতিতে চোখ মেলে তাকাতেই দেখলাম, আসলে কেউ ছিলোই না! মানে কি? টিপিক্যাল বাংলা সিরিয়ালের মত হলো? না না, আমি তো স্টার জলসা,জি বাংলা দেখিনা! ভালো করে নজর বোলালাম সমগ্র কক্ষে। কিন্তু, বাস্তবতা এটাই যে, কক্ষে আসলেও কেউ নেই।
কিঞ্চিত দ্বিধাগ্রস্থ হলাম। বলাবাহুল্য ভীতু আমি বড্ড। আর সময়টা প্রায় রাত আটটা। ফাঁকা কক্ষে ভূতের উপদ্রব হলো নাকি? শুকনো ঢোক গিলে ভয়ার্ত নেত্রে চাইলাম, অতঃপর দৃষ্টি বড় বড় করে ছুট্টে পালাতে গিয়ে চিৎকার করে উঠলাম,,
‘আম্মুউউ?’
তবে কথাগুলো বের হলো না আর মুখ দিয়ে। তার আগেই বেশ একখানা শক্তপোক্ত পৌরুষ হাত আষ্টেপিষ্টে ধরল আমার মুখখানা। ভয়ের তোপে জ্ঞান হারানোর উপক্রম! চোখ ফেটে অশ্রুকণা বেরিয়ে আসতে চাইছে! কামড় দিতে গিয়ে টের পেলাম আনাড়ি দাঁতগুলো হাতের তালুতে কামড় দিতে সক্ষম হচ্ছে না। ইয়া আল্লাহ বাঁচাও আমাকে! হাত পা ছড়াছড়ি শুরু করেছি ইতিমধ্যেই, আকস্মিক মুখ থেকে হাতটা সরে গেল!
আমি ফের পুরো দমে চিল্লিয়ে উঠতে যাব, ঠিক তখনই উনি আমার দুই কাঁধ শক্ত করে ধরে নিজের দিকে ঘুরিয়ে নিলেন। আমি ভয়ে-আতঙ্কে চোখ-মুখ একদম খিঁচে বন্ধ করে রেখেছি। হঠাৎ ওনার সেই পরিচিত ভরাট কণ্ঠস্বরের ফিসফিসানি কানে এলো,
‘আরে, শান্ত হোন! আমি, অন্তিক! চিৎকার করছেন কেন?’
আমি পিটপিট করে চোখ মেলে তাকালাম। দেখলাম ডক্টর সাহেব আমার দিকে চেয়ে একটা চরম বিরক্তিকর মুখভঙ্গি করে আছেন। ওনার চেহারা দেখে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, এতক্ষণ মনে মনে যে রোমান্টিকতার জাল বুনছিলেন, আমার এই ‘আম্মুউউ’ মার্কা চিল্লানিতে তাতে এক বালতি বরফ-ঠান্ডা পানি ঢেলে দিয়েছি আমি! ওনার হাতের বাঁধন একটু আলগা হতেই আমি চোখ বড় বড় করে তড়বড় করে বলে উঠলাম,
‘আপনি... আপনি এভাবে চোরের মতো পেছন থেকে এসে মুখ চেপে ধরলেন কেন? আর রুমে তো কেউ ছিল না, হুট করে কোত্থেকে এলেন?’
অন্তিক নিজের কপালে হাত দিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। ওনার চশমাটা নাকের ডগায় খানিকটা নেমে এসেছে। উনি অত্যন্ত আক্ষেপের সুরে বললেন,
‘ইয়্যু স্টুপিড গার্ল! ওয়াশরুমের দরজাটা যে খোলা ছিল, সেটা কি আপনার ওই পুঁচকে চোখে পড়েনি? আর আমি চোরের মতো আসব কেন? এটা আমার রুম! মানুষজন শুনলে ভাববে বৌভাতের রাতে আমি বৌকে নিয়ে পালাতে করতে এসেছি! এই জন্যই বলে, পিচ্চি মানুষকে বিয়ে করার এই এক জ্বালা!’
‘পিচ্চি’ শব্দটা শোনামাত্রই আমার কান দিয়ে ধোঁয়া বের হতে লাগল। রাগে গা রি রি করে উঠল আমার। আমি ওনার দিকে এক পা এগিয়ে গিয়ে তর্জনী উঁচিয়ে বললাম,
‘দেখুন, একদম আমাকে পিচ্চি বলবেন না! আমি কিন্তু এখন আর কোনো কথা শুনছি না আপনার! আপনি বারবার আমাকে অপমান করছেন!’
উনি আমার এই রাগী চিলড্রেন লুক দেখে মুচকি হাসলেন। ওনার সেই মায়াবী চাপদাড়ির আড়ালে লুকিয়ে থাকা হাসিটা বড্ড মারাত্মক সংক্রামক। উনি বললেন,
‘অপমান কোথায় করলাম? আপনি আসলেই পিচ্চি, কিচ্ছু বোঝেন না। এই যে এতক্ষণ ধরে একটা রোমান্টিক আবহাওয়া তৈরি করার চেষ্টা করছি, আর আপনি ভূত ভেবে আম্মু আম্মু করে চিল্লাচ্ছেন!’
কথাটা শুনে আমি হুট করে চুপসে গেলাম। আর তখনই খেয়াল করলাম, উনি আমার কতটা কাছাকাছি দাঁড়িয়ে আছেন! লোকটা আসলেই বড্ড লম্বা। আমি ওনার ঠিক বক্ষদেশ বরাবর গিয়ে ঠেকেছি। ওনার দিকে তাকাতে হলে আমাকে রীতিমতো ঘাড় বাঁকিয়ে ওপরের দিকে চোখ তুলে তাকাতে হয়। এত কাছ থেকে ওনাকে এর আগে দেখা হয়নি।
এবার ওনাকে আরও বেশি ‘ড্যাশিং’ লাগছে। নিখুঁত জ-লাইন, তীক্ষ্ণ চোখ দুটো চশমার আড়ালে আবৃত। অবাধ্য কয়েকটা চুলের গোছা কপালে এসে পড়েছে। একদম হুবহু আমার পছন্দের উপন্যাসের নায়ক! বুকের ভেতরটা কেমন যেন তোলপাড় করে উঠল। একেই কি তবে চরম পর্যায়ের ক্রাশ খাওয়া বলে?
তবে পরক্ষণেই নিজের ব্যক্তিত্বের ভারিক্কি সামলে নিলাম। ঘাড়ত্যাড়া স্বভাবটা তো আর এক নিমেষে হাওয়া হয়ে যাবে না! আমি ওনার দিক থেকে চোখ সরিয়ে নিয়ে, একটু ঝগড়া লাগানোর ভঙ্গিতে মুখটা বেঁকিয়ে বললাম,
‘হ্যাঁ, আমি তো কিছুই বুঝি না! আপনিই তো দুনিয়ার সব বোঝেন, মিস্টার ডক্টর সাহেব! তা এতই যদি পিচ্চি মনে হয়, তবে বিয়ে করতে রাজি হয়েছিলেন কেন, শুনি?’
আমার এই তাৎক্ষণিক ধারালো কাউন্টার অ্যাটাকে অন্তিক শাহরিয়ার মহাশয় এবার বেশ খানিকটা থতমত খেলেন। ওনার সেই গম্ভীর চশমা জোড়া ঠিক করতে করতে উনি আমার দিকে এক অদ্ভুত মুগ্ধতা নিয়ে তাকিয়ে রইলেন, যেন আমার এই পুঁচকে মুখের বড় বড় কথা উনি বেশ উপভোগ করছেন! কিন্তু আমি থামার পাত্রী নই! পুনরায় বললাম,,
‘ কি হলো বলুন?’
উনি এবার অদ্ভুত দৃষ্টিতে চাইলেন। একদম,একদম হৃদগহ্বরে তীক্ষ্ণ হুলের মতো ফোঁটা সে দৃষ্টি। সেই সম্মোহনী জাদু মিশ্রিত দৃষ্টি এক নিমেষে আমার সমস্ত ঘাড়ত্যাড়ামোকে স্থবির করে দিল। আমি কিছু বুঝে ওঠার আগেই উনি এক কদম এগিয়ে এলেন আমার দিকে। ওনার আকস্মিক এই অগ্রসরণে আমি ঘাবড়ে গিয়ে এক কদম পিছিয়ে গেলাম। কিন্তু মিস্টার ডক্টরের থামার কোনো লক্ষণ নেই! উনি ফের এক কদম এগোলেন, ওনার সাথে পাল্লা দিয়ে আমিও ভয়ার্ত হরিণীর মতো আরও এক কদম পেছনে সরলাম।
এভাবে উনি এগোচ্ছেন আর আমি পিছিয়ে যাচ্ছি, যতক্ষণ না আমার পিঠটা গিয়ে ঠেকল পেছনের শক্ত দেয়ালে;পালানোর সব পথ বন্ধ! অন্তিক দু’দিকে দেয়ালের ওপর হাত রেখে আমাকে ওনার বাহুডোরে প্রায় বন্দী করে ফেললেন। এত কাছে যে ওনার গায়ের সেই মৃদু পুরুষালী পারফিউমে আমার নিশ্বাস বন্ধ হওয়ার উপক্রম হলো। উনি আমার দিকে কিঞ্চিৎ ঝুঁকে, সেই ভরাট কণ্ঠে ফিসফিস করে শুধালেন,,
‘কী যেন বলছিলেন ম্যাডাম? আমি কেন বিয়ে করতে রাজি হলাম, তা-ই তো?’
আমার তখন হৃদস্পন্দন দ্বিগুণ গতিতে ছুটছে। গলার কাছে এসে হৃদযন্ত্রটা ধড়ফড় করছে। আমি কোনোমতে আমতা আমতা করে বললাম,,
‘ম-মানে... আপনি তো আমাকে পিচ্চি বলেন, তাই...’
ওনার ঠোঁটের কোণে সেই চেনা মায়াবী হাসির রেখাটা আবার ফুটে উঠল। চশমার আড়ালের চোখ দুটোতে দুষ্টুমির আভাস। উনি আরও একটু ঝুঁকে এলেন, ওনার উষ্ণ নিশ্বাস এখন স্পষ্ট আমার গালে আছড়ে পড়ছে। ভরাট কন্ঠে তিনি বললেন,
‘পিচ্চি তো অবশ্যই। তবে এই পিচ্চি মেয়ের ঘাড়ত্যাড়ামো আর ধারালো কথার ধার যে আমার বেশ ভালো লেগেছে। এখন ভাবছি, সারাজীবনের জন্য এই মিষ্টি উপদ্রবটা ঘরে এনে একদম পারফেক্ট ডিসিশনই নিয়েছি!’
ওনার এই মারাত্মক সুইট আর ফ্লার্টেটিং স্বীকারোক্তিতে আমার কান-মাথা গরম হয়ে লাল হয়ে গেল। লজ্জায় আর আড়ষ্টতায় চোখ দুটো বন্ধ করে নিতে বাধ্য হলাম। তখনই অনুভব করলাম, উনি আরও খানিকটা ঝুঁকে ওনার ঠোঁট দুটো আলতো করে ছোঁয়াতে গেলেন আমার ঘাড়ের স্পর্শকাতর অংশে।
শরীরে যেন এক তীব্র বিদ্যুতলতা খেলে গেল! লজ্জার চূড়ান্ত সীমায় পৌঁছে হুট করেই কোত্থেকে যেন এক অদ্ভুত শক্তি ভর করল আমার ওপর। আমি ওনার বুকে দুই হাত দিয়ে কিঞ্চিৎ ধাক্কা দিয়ে, ওনার বাহুর ফাঁক গলে একদম নিচু হয়ে চকিতে বেরিয়ে গেলাম। জীবনে প্রথমবারের মতো নিজের উচ্চতা নিয়ে গর্ববোধ করতে ইচ্ছা করছে। খুব বেশি লম্বা না হয় ভালোই হয়েছে মনে হচ্ছে।
এক মুহূর্তও আর ওমুখো হলাম না। হাতের মুঠোয় শাড়ির কুচিটা কোনোমতে চেপে ধরে, একপ্রকার ঝড়ের গতিতে দরজা খুলে রুমের বাইরে ড্রইংরুমের দিকে ছুটে চলে গেলাম।
★
রাতের খাবার শেষে দিবার ঘরে গিয়েছিলাম। গল্প করতে করতে কখন যে ঘুমের রাজ্যে পাড়ি জমিয়েছে জানা নেই। হঠাৎ ঘুমের মাঝে অনুভূত হলো শূন্যে ভাসছি আমি। এরপরে আমার মনে হয়েছে আমার মনের ভ্রান্তি কিন্তু প্রথমে ভাবলাম হয়তো কোনো মিষ্টি স্বপ্নের গভীর আচ্ছন্নতা, মনের তীব্র ভ্রান্তি। কিন্তু পরক্ষণেই দোলাচলটা আরও স্পষ্ট হলো। মনে হলো কেউ একজন আমাকে খুব সাবধানে, পরম মায়ায় আগলে নিয়ে হেঁটে চলেছে।
তন্দ্রাচ্ছন্নতার রেশ কাটিয়ে তৎক্ষণাৎ পিটপিট করে চোখ মেলতেই আমার বিস্ফোরিত নেত্র জোড়া গিয়ে ঠেকল ওনার চিবুকে! আবছা আলো-আঁধারিতে স্পষ্ট দেখতে পেলাম, আমি অন্তিকের শক্তপোক্ত দু’হাতে কোলবালিশের মতো আবদ্ধ হয়ে আছি! উনি বেশ ধীরস্থির পায়ে করিডোর পেরিয়ে ওনার রুমের দিকে এগোচ্ছেন।
লজ্জা আর বিস্ময়ের চূড়ান্ত সীমায় পৌঁছে আমি ওনার শার্টের কলারটা খামচে ধরে প্রায় আর্তনাদ করে উঠলাম,
‘এ-কী! কী করছেন কী আপনি? নামান আমাকে, পড়ে যাব তো!’
ডক্টর সাহেব আমার এমন আকস্মিক জেগে ওঠায় এতটুকুও চমকালেন না। ওনার সেই চিরচেনা ভরাট, গম্ভীর কণ্ঠে চশমার আড়াল থেকেই মৃদু হেসে চাইলেন। ওনার পায়ের গতি সচল রেখেই বললেন,
‘এতক্ষণ কি পড়ে গিয়েছেন?’
আমি ওনার বুকের সাথে প্রায় লেপ্টে থাকা অবস্থাতেই কোনোমতে নেতিবাচক মাথা নাড়লাম। উনি ঠোঁট বাঁকিয়ে বললেন,
‘তাহলে এখনো পড়বেন না। আপনার হাসবেন্ডের গ্রিপ যথেষ্ট স্ট্রং ম্যাডাম।’
ওনার এই অতি আত্মবিশ্বাসী জবাবে আমার কান-মাথা আবার গরম হতে শুরু করল। আমি আমতা আমতা করে কাঁপা কাঁপা গলায় শুধালাম,
‘তা... তা বলে এভাবে মাঝরাতে চোরের মতো কোলে তুলে নিয়ে যাচ্ছেন কেন?’
আমরা ততক্ষণে ওনার অন্ধকার শয়নকক্ষে প্রবেশ করেছি। বিছানার পাশে আসতেই উনি আমাকে খুব আলতো করে, যেন কোনো কাঁচের পুতুলকে রাখছেন, সেভাবে বিছানায় নামিয়ে দিলেন। কিন্তু ওনার হাতের বাঁধন পুরোপুরি আলগা করলেন না। ওনার এক হাত আমার কোমরের নিচে, অন্য হাত পিঠে। ওনার সেই গভীর, সম্মোহনী চোখ দুটো আমার চোখের ওপর স্থির রেখে ফিসফিস করে বললেন,
‘চোরের মতো কেন হবে? নিজের হালাল অধিকার খাটিয়ে নিয়ে আসছি। আর তাছাড়া, বিয়েটা তো করেছি বউকে কোলবালিশের মতো আগলে ঘুমানোর জন্য, তাই না? এখন বউ যদি বাসর রাতের পরদিনই ননদের রুমে গিয়ে একা একা রাত কাটায়, তাহলে আমি কি ফাঁকা রুমে একা একা ছাদ দেখবো? তাহলে বিয়েটা করলাম কেন, বলুন?’
ওনার এই অবলীলায় বলা মারাত্মক রোমান্টিক আর অধিকার মেশানো কথাবার্তায় আমার মুখের সমস্ত খই ফুটে যাওয়া কথা যেন গলার কাছে এসে আটকে গেল। ঘাড়ত্যাড়া তরী যেন এক নিমিষে ডক্টর অন্তিক শাহরিয়ারের ভালোবাসার প্রেসক্রিপশনের সামনে একদম কুপোকাত! আমি লজ্জায় মুখ লুকানোর জন্য ওনার বুকের দিকেই আরও কিছুটা সেঁধিয়ে গেলাম।
★
আহ! জীবনের শ্রেষ্ঠ দিন আজ। বাসায় যাবো, নিজের বাসায়। শান্তি শান্তি লাগছে,ভীষণ! আমি একখানা শাড়ি হাতে সবে ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়েছি। হঠাৎ ড্রেসিং টেবিলের আয়নায় ওনার প্রতিবিম্ব ফুটে উঠতেই আমার হাতজোড়া শাড়ির ভাঁজেই থমকে গেল। সবেমাত্র গোসল সেরে বের হয়েছেন মিস্টার ডক্টর। ওনার সেই অবাধ্য বাবরি চুলগুলো থেকে ছোট ছোট পানির কণা চুইয়ে পড়ছে চওড়া কাঁধে।
কাঁধের ওপর ঝুলতে থাকা তোয়ালেটা দিয়ে চুলগুলো হালকা ঝাড়তে ঝাড়তে উনি আমার ঠিক পেছনে এসে দাঁড়ালেন। চোখে তখনো চশমাটা ওঠেনি, তাই ওনার তীক্ষ্ণ চোখ দুটোকে এই মুহূর্তে বড্ড বেশি মায়াবী আর চিত্তাকর্ষক লাগছে। আমি আয়নার দিকে তাকিয়েই ওনার সৌন্দর্য গিলছিলাম, হঠাৎ উনি আয়নাতেই আমার চোখের দিকে সোজা তাকিয়ে ভ্রু জোড়া সামান্য কুঁচকালেন। ওনার সেই স্বভাবসুলভ ভরাট কণ্ঠে শুধালেন,
‘কী ব্যাপার, ম্যাম? আবার শাড়ি পরার প্ল্যানিং করা হচ্ছে বুঝি?’
আমি শাড়িটা বুকের কাছে চেপে ধরে আয়নাতেই মাথা নেড়ে সায় দিয়ে বললাম,
‘জি।’
উনি তোয়ালেটা পাশে রেখে এক হাত প্যান্টের পকেটে পুরে একদম সটান বলে দিলেন,
‘একদম না। আজকে আর শাড়ি পরার কোনো প্রয়োজন নেই।’
ওনার এমন সোজাসাপ্টা বারণ শুনে আমার সেই চিরাচরিত ঘাড়ত্যাড়ামো মাথাচাড়া দিয়ে উঠল। আমি ঝট করে ওনার দিকে ঘুরে দাঁড়িয়ে একটু ক্ষোভ মেশানো সুরে বললাম,
‘কেন? সবাই তো বাপের বাড়ি যাওয়ার সময় নতুন বউকে শাড়ি পরতেই বলে! সব স্বামীরাই চায় তাদের স্ত্রীরা শাড়ি পরে থাকুক, আর আপনি অদ্ভুত মানুষের মতো বারণ করছেন!’
অন্তিক আমার এই ঝাঝালো কথার পিঠে এতটুকুও রাগলেন না। বরং শীতল হাস্যে আমার আরও এক কদম কাছাকাছি এসে আমার চোখের দিকে চাইলেন। ওনার সেই সম্মোহনী চাহনি আমার ভেতরের সব রাগ নিমেষেই শুষে নিল। উনি অত্যন্ত শান্ত গলায় বললেন,
‘আমি আর দশটা সাধারণ স্বামীর মতো হতে চাই না, তরী; যারা নিজের স্ত্রীর স্বাচ্ছন্দ্যের চেয়ে বাইরের লোক দেখানো সাজগোজকে বেশি প্রাধান্য দেয়। আমি কাল থেকে নোটিশ করছি, আপনি শাড়ি পরে একদম কমফোর্ট ফিল করছেন না। কখনো শাড়ির কুচি সরে যাচ্ছে, কখনো আঁচল সামলাতে গিয়ে আপনার চোখে-মুখে একটা চরম অস্বস্তি ফুটে উঠছে। এত অস্বস্তি নিয়ে বাবার বাড়ি যাওয়ার কোনো দরকার নেই। আপনি বরং চেঞ্জ করে অন্য কোনো কমফোর্টেবল ড্রেস পরে নিন।’
ওনার এই সূক্ষ্ম খেয়াল রাখার ব্যাপারটা আমার মনের একদম গহীনে গিয়ে ধাক্কা দিল। ইশ! লোকটা এত কেয়ারিং কেন? কিন্তু পরক্ষণেই আমার মনে পড়ল এক চরম সত্য। আমি একটু আমতা আমতা করে নিচু স্বরে বললাম,
‘কিন্তু... আমি তো সাথে করে অন্য কোনো ড্রেস তো আনিনি। সব তো বাড়িতেই রয়ে গেছে।’
উনি আমার কথা শুনে মৃদু হাসলেন। তারপর খাটের পাশের ড্রয়ার থেকে একটা রুপালী চাবি বের করে আমার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললেন,
‘এই নিন ওনার আলমারির চাবি। আলমারিটা খুলে দেখুন, ওখানে আপনার প্রয়োজনীয় সব রাখা আছে।’
আমি চরম অবাক হয়ে ওনার হাত থেকে চাবিটা নিলাম। কৌতূহল নিয়ে আলমারির পাল্লাটা খুলতেই আমার চোখ জোড়া যেন চড়কগাছ! আমি জাস্ট ‘থ’ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। আলমারির একটা পুরো তাক জুড়ে সারিবদ্ধভাবে সাজানো রয়েছে বেশ কিছু আধুনিক ও চমৎকার ডিজাইনের থ্রি-পিস আর কুর্তি।
আমি অবিশ্বাস্য চোখে ওনার দিকে তাকালাম। এত ড্রেস এখানে কখন এলো? উনি আলমারির দিকে না তাকিয়ে ওনার চশমাটা চোখে পরতে পরতে ক্যাজুয়াল ভঙ্গিতে বললেন,
‘এতগুলো ড্রেস দেখে অবাক হওয়ার কিছু নেই। কালকে হয়তো আলমারি খোলেননি, তাই দেখেননি।’
কথাটা শুনে আমার ঠোঁটের কোণে এক চিলতে সুখের হাসি ফুটে উঠল। মনে মনে ভাবলাম— ঠিক এই রকম দৃশ্যই তো আমি কত শত উপন্যাসে পড়েছি! নায়কের এমন সারপ্রাইজ দেওয়া ড্রেস দেখে নায়িকা মনে মনে কত খুশি হয়। আজ আমার বাস্তব জীবনেও ঠিক তাই হচ্ছে! এক অদ্ভুত ভালো লাগার রেশ আমার পুরো মনটাকে ছুঁয়ে গেল।
নিজেকে একটু সামলে নিয়ে আমি চাবিটা আবার ওনার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললাম,
‘এই নিন আপনার চাবি। ড্রেস তো পেয়ে গেছি, এটা এখন আপনিই রাখুন।’
অন্তিক আমার বাড়ানো হাতের দিকে চাইলেন, তবে চাবিটা নিলেন না। ওনার সেই গভীর চোখ দুটো আমার মুখের ওপর স্থির করে বললেন,
‘একদম না। চাবিটা এখন থেকে আপনার কাছেই থাকবে। এই ঘরের, এই আলমারির— সবকিছুর দায়িত্ব এখন থেকে আপনার।’
আমি একটু ভড়কে গেলাম। চোখ দুটো গোল গোল করে বললাম,
‘ধুর! একদম না, দেখুন আমি এমনিতেই ভীষণ চঞ্চল মানুষ, কোনো কিছু সামলে রাখতে পারি না। হারিয়ে ফেললে তখন বুঝবেন!’
উনি আমার এই ছেলেমানুষি কথা শুনে আর নিজেকে সামলাতে পারলেন না। ওনার চাপদাড়ির আড়ালে লুকিয়ে থাকা সেই মায়াবী ড্যাশিং হাসিটা এবার পুরোপুরি চওড়া হলো। উনি আমার ঠিক কানের কাছে মুখটা নামিয়ে এনে, অত্যন্ত গভীর স্বরে ফিসফিস করে বললেন,
‘যে মেয়ে আমার মতো এত বড় একটা খ্যাপাটে বরকে অবলীলায় সামলে নিতে পারছে, তার কাছে একটা সামান্য আলমারির চাবি সামলানো কোনো ব্যাপারই না, আমার ঘাড়ত্যাড়া পরিণীতা সুতরাং, আলমারি, সমস্ত ঘর এবং বর— দুটোই এখন আপনাকে সামলাতে হবে।’
ওনার এহেন কথায় আমার পুরো শরীর যেন আবার অবশ হয়ে এলো। ধুর, লোকটা কথায় কথায় ফ্লার্ট করে! লজ্জায় লাল-নীল অবস্থা আমার! চাবিটা শক্ত করে মুঠোয় চেপে ধরে আর এক মুহূর্তও ওনার সামনে দাঁড়ালাম না। ড্রেসটা হাতে নিয়ে দ্রুত ওয়াশরুমের দিকে প্রায় দৌড়ে পালালাম।
চলবে.......