ফন্ট সাইজ:
থিম:
হুটহাট পরিনীতা

৮ম পর্ব

লেখক: নওরিন কবির তিশা

#হুটহাট_পরিনীতা—— #পর্ব_৮

লেখনী:#নওরিন_কবির_তিশা

পলকে ভস্মীভূত হাওয়া ক্ষণগুলো কখনো বড্ড মধুর স্মৃতির বহন করে কখনোবা জীবনের গতিপথ রুদ্ধ করে। তবে তরীর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য কেবল প্রথমটাই। হ্যাঁ, জীবনের প্রাত্যহিক ছন্দে গাঁ ভাসিয়েছে ও। তবে সকলের ভালোবাসাকে সঙ্গ করে। তরী এখন আর সেই প্রথম দিনের হুট করে পরিণীতা হওয়া উথাল-পাথাল মেয়েটি নেই। জীবনের প্রাত্যহিকী নিজের চেনা ছন্দে ফিরেছে। তরীর যে ইয়ার ফাইনাল পরীক্ষাটি নিয়ে ঘরের সবাই চিন্তিত ছিল, ক’দিন আগেই তার সফল সমাপ্তি ঘটেছে।

আর এই বদলে যাওয়ার দিনগুলোতে তরী নামের চঞ্চল অবুঝ মেয়েটাকে ভাঙা-গড়ার খেলায় আগলে রেখেছেন ও'র শাশুড়ি মা। নিজের মায়ের মতোই পরম মমতায়, ভালোবেসে সংসারের প্রতিটি খুঁটিনাটি কাজ তিনি শিখিয়েছেন তরীকে। এক গ্লাস পানিও যে মেয়েটি নিজে ঢেলে খেত না, সে-ই এখন মিস্টার ডক্টরের গুছিয়ে রাখা সংসারে বেশ পরিপক্ক এক ঘরণী।

দুদিন হলো পরীক্ষার পাট চুকেছে। তরীর হাতে এখন অফুরন্ত অবসর। সারাদিন দিবা কিংবা শাশুড়ি মায়ের সাথে রান্নাঘরের খুনসুটি— এসবের মাঝেই কেটে যায়। তবে এই অলস দিনগুলোতে তরী বড্ড বেশি মিস করে একজন মানুষকে। ডক্টর সাহেব ইদানিং বড় বেশি ব্যস্ত। হসপিটালের ওটি, চেম্বার আর পেশেন্ট হিস্ট্রি— সব মিলিয়ে ওনার নিঃশ্বাস ফেলার সময়টুকু নেই।

আজকের অলস অপরাহ্নে জানলার পাশে বসে আমগাছের পাতার দোলা দেখতে দেখতে তরীর বুকের ভেতরটা কেমন যেন খাঁ খাঁ করে উঠল। অন্তিকের জন্য মনটা বড্ড আকুল হয়ে উঠেছে। কোনো কিছু না ভেবেই সে ওনার পার্সোনাল নাম্বারে কল লাগাল।

প্রথমবার রিং হয়ে কেটে গেল, কেউ ধরল না। তরী দমে যাওয়ার পাত্রী নয়। ওনার ব্যস্ততার কথা মাথায় রেখেও পর পর আরও চার-পাঁচবার ডায়াল করল। ষষ্ঠবারের মাথায় ওপাশ থেকে ফোনটা রিসিভ হলো। তবে তরীর চেনা সেই ভরাট, গম্ভীর পুরুষালি কণ্ঠস্বর ভেসে এলো না; বরং এক অতি মিষ্টি, মার্জিত নারী কণ্ঠের আওয়াজ কানে আসতেই তরীর বুকের ভেতরটা ছ্যা্ৎ করে উঠল।

— ‘হ্যালো, আসসালামু আলাইকুম।’

তরী মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। চেনা নাম্বারে অচেনা নারী কণ্ঠ! সে নিজের গলার স্বর কিছুটা শক্ত করে, কুণ্ঠিত অথচ স্পষ্ট স্বরে বলল,

— ‘ওয়ালাইকুম আসসালাম। আমি... আমি শাহরিয়ারের সাথে একটু কথা বলতে চাচ্ছিলাম।’

ওপাশ থেকে মেয়েটি বড্ড পেশাদারী ভঙ্গিতে, কিঞ্চিৎ নরম গলায় উত্তর দিল,

— ‘আই অ্যাম সরি ম্যাম। স্যার এই মুহূর্তে একটা ক্রিটিক্যাল ওটিতে আছেন। উনি এখন কোনোভাবেই ফোনে কথা বলতে পারবেন না।’

ওনার ফোন একটা মেয়ের কাছে! তাও আবার ওনার পার্সোনাল নাম্বার! তরীর সতেরো বছরের ঘাড়ত্যাড়া আর অধিকারবোধে জড়ানো মগজে মুহূর্তেই যেন আগুন ধরে গেল; মেজাজ ছাড়ালো হাজার ডিগ্রি। সে বেশ রাগত স্বরে, খাদের শেষ সীমানায় কণ্ঠস্বর নামিয়ে বলল,

— ‘ওনার ফোন আপনার কাছে কেন? আর আমি ওনার পেশেন্ট নই যে ওটি শেষ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করব। আমি এখনই কথা বলব, ওনাকে ফোনটা দিন!’

মেয়েটি তরীর এই আকস্মিক ক্ষোভ আর চড়া সুর শুনেও বিন্দুমাত্র উত্তেজিত হলো না। বড্ড শান্ত ও যান্ত্রিক গলায় বলল,

— ‘আই আন্ডারস্ট্যান্ড ম্যাম। বাট ওটির ভেতরে ফোন অ্যালাউড নয়। স্যার ওনার পার্সোনাল ফোনটি আমার কাছে রেখে গিয়েছেন জরুরি কোনো কলের রেসপন্স করার জন্য। আপনি প্লিজ আর এক ঘণ্টা পর ট্রাই করুন।’

— ‘আমি কেন এক ঘণ্টা পর ট্রাই করব? আর,আপনি কে ওনার ফোন রাখার?’

— ‘আমি ওনার ডিউটি অ্যাসিস্ট্যান্ট, ইকরা জান্নাত। সো ম্যাম, কাইন্ডলি ওনার ওটি শেষ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করুন। থ্যাঙ্ক ইউ।’

বলেই ওপাশ থেকে লাইনটি কেটে দেওয়া হলো। টুংটুং শব্দে ফোনটা কেটে যেতেই তরী স্তব্ধ হয়ে বিছানায় বসে রইল। ইকরা জান্নাত! সেই মেয়েটি, যার সাথে গাড়িতে বসে অন্তিক মেসেঞ্জারে চ্যাট করছিলেন! তরীর চোখের কোণ বেয়ে এক ফোঁটা তপ্ত জল টুপ করে গড়িয়ে পড়ল হাতের স্ক্রিনের ওপর। বোকা মেয়েটা বেমালুম ভুলে গেলো তার ডক্টর তাকে বলেছিল ইকরা তার কলিগ ভিন্ন অন্য কিছু নয়।

★

জটিল এক অপারেশন সফল করে কিঞ্চিৎ ক্লান্তিভরে দেহটা সবে রকিং চেয়ারে এলিয়ে দিয়েছে অন্তিক। হঠাৎ চেম্বারের দরজায় কারো উপস্থিতি অনুভব করতেই,ও নিজেকে গুছিয়ে নিয়ে বলল,,

- কাম ইন।

ইকরা কিছু ফাইল হাতে প্রবেশ করতে করতে বলল,,

- আপনার ফোনে মিসেস কল করেছিলো,ড.অন্তিক।

- কখন?

- আপনি তখন ওটি তে ছিলেন।

- কল আপনি ধরেছিলেন?

- জ্বি।

- কি বলছিলো?

- নাথিং, জাস্ট কথা বলতে চাচ্ছিলো।

- আইসি।

খানিক ইতস্থ করে শেষমেষ ইকরা বলল,,

- মিসেস মেবি, একটু অভিমানী গোছের?

- ভীষণ।

ইকরা হেসে ফেললো,,

- হ্যাঁ, কথা বলে বুঝলাম। বয়স কত তার?

- সতেরো চলে।

- আল্লাহ, নিতান্তই বাচ্চা মেয়ে।

অন্তিকের চোখের সামনে ভেসে উঠলো এক অভিমানি সপ্তদশীর র'ক্ত জবার ন্যায় প্রস্ফূটিত মুখাবয়ব। অন্তর ছাপিয়ে একচিলতে প্রশান্তির দেখা মিলল গম্ভীর বদনে। তবে, অতি ক্ষুদ্র পরিসরে। কারণটা নির্দিষ্ট; পেশাদারিত্বে অনড় অন্তিক কর্মস্থলে হাসতে জানে না। আর পরনারী হলে তো আরোই না। তবে,ওর সংক্ষিপ্ত হাসিটা লক্ষ্য করে ইকরা বলল,,

- ড. অন্তিক,আপনি চাইলে এখন যেতে পারেন। সন্ধ্যার শিফটে কোনো অপারেশনের শিডিউল নাই। আর বাদবাকি ডক্টর রাফিম হ্যান্ডেল করে নিতে পারবে।

- ওকে।

বরাবরের ন্যায় খুদে জবাব। ইকরা মৃদু হেসে ঘাড় নাড়িয়ে বেরিয়ে গেলো। অন্তিক সমস্ত কিছু যথাস্থানে রেখে খানিক বাদে বেরিয়ে পড়লো,ললনার রাগ ভাঙাতে।

★

- মিসেস শাহরিয়ার?

ফোনের ওপাশ থেকে ভেসে আসা সেই অতি চেনা, ভরাট কণ্ঠস্বর শুনেও তরী পাথরের মতো নিশ্চল হয়ে বসে রইল। চোখের জল ততক্ষণে শুকিয়ে গালে দাগ কেটেছে। বুকের ভেতর জমে থাকা অভিমানের মেঘগুলো এখন বজ্রপাত ঘটানোর জন্য ব্যাকুল। ফোনের স্ক্রিনে ‘মিস্টার ডক্টর’ নামটা জ্বলজ্বল করছে। তরী ফোনটা কানের কাছে ধরে রাখলেও মুখ দিয়ে একটা শব্দও উচ্চারণ করল না। ওপাশের নীরবতা ভাঙতে অন্তিক আবার ডাকলো,

- এই যে ম্যাডাম, শুনছেন?

তরী তবুও নীরব। ওপাশে একটা গভীর দীর্ঘশ্বাসের শব্দ পাওয়া গেল। অন্তিক এবার কণ্ঠস্বর সামান্য নরম করে আবার বললো,

- কী হলো মেরি দিলনাশি? রাগ করে কি বোবা হয়ে গেলেন? একটা শব্দ তো অন্তত বলুন।

দিলনাশি’---- নামটা কর্নোগোচর হতেই তরী চরম অনীহা আর এক গাদা ক্ষোভ মিশিয়ে বড্ড হিমশীতল গম্ভীর গলায় শুধু বলল,

- কী বলবো? আপনার অ্যাসিস্ট্যান্ট তো বললেন এক ঘণ্টা পর ট্রাই করতে। আমার তো এক ঘণ্টা হয়নি এখনো।

ওপাশ থেকে অন্তিকের একটা মৃদু, চাপা হাসির শব্দ ভেসে এলো। ওনার এই অসময়ের হাসি তরীর রাগের আগুনে যেন আরও ঘি ঢেলে দিল। তরী লাইনটা কেটে দিতে উদ্যত হতেই অন্তিক চটপট বলে উঠলো,

- আচ্ছা ম্যাডাম, স্যরি। মিস ইকরা ওনার প্রফেশনাল ডিউটি পালন করছিলেন মাত্র, ওতে ওনার কোনো দোষ নেই। বাট,আপনার হাসব্যান্ড যে এতক্ষণ যাবৎ বাসার নিচে অপেক্ষা করছে,তার জন্য কি একটু নিচে আসা যাবে?

তরীর কিশোরী অবাধ্য মনটা হঠাৎ বড্ড চঞ্চল হয়ে উঠল।ও কোনো জবাব না দিয়ে ফোনটা বিছানায় ফেলে রেখে হুট করে উঠে দাঁড়াল। গুটিগুটি পায়ে এগিয়ে গেল ঘরের সাথে থাকা ব্যালকনিটায়। রেলিং ধরে গেটের বাইরে পথের দিকে তাকাতেই তরীর সমস্ত অস্তিত্ব যেন এক নিমেষে থমকে গেল।

সত্যিই তো! সন্ধ্যার ঘনিয়ে আসা আলো-আঁধারীর মাঝে একখানা হুডখোলা রিকশা দাঁড়িয়ে আছে। আর তার ওপর বড্ড আয়েশি ভঙ্গিতে বসে আছেন ডক্টর অন্তিক শাহরিয়ার। পরনে একটা ক্যাজুয়াল নীল শার্ট, চোখে সেই চিরচেনা রিমেড চশমাটা। তরী ব্যালকনিতে এসে দাঁড়াতেই অন্তিক ওনার সেই তীক্ষ্ণ, সম্মোহনী চোখ দুটো দিয়ে সোজা ওপরে তরীর দিকে তাকালো। ওর ঠোঁটের কোণে সেই চেনা ড্যাশিং হাসিটা ঝুলছে। ও চোখের ইশারায় তরীকে নিচে নেমে আসার জন্য এক নিবিড় অনুরোধ জানালো।

ওনার ওই চশমার আড়ালের চোখের চাউনিতে বোধহয় এক জাদুকরী টান ছিল, যা তরীর সতেরো বছরের অভিমানী মনটা আর উপেক্ষা করতে পারল না। সে না চাইতেও একটা স্নিগ্ধ সুতি শাড়ি টেনেটুনে জড়িয়ে নিয়ে চটজলদি নিচে নেমে এলো।

গেটের বাইরে আসতেই অন্তিক রিকশা থেকে নেমে ওনার চওড়া অবয়ব নিয়ে তরীর সামনে এসে দাঁড়ালেন। ওনার শরীর থেকে ভেসে আসা সেই পরিচিত পুরুষালি পারফিউমের সুবাস তরীর চঞ্চল মগজটাকে আবার মাতাল করে তুলল। অন্তিক তরীর ওই সামান্য ফুলে থাকা লালচে মুখটার দিকে চেয়ে বড্ড মায়াবী গলায় ফিসফিস করে বললো,

- তা ম্যাম, রাগ কি কিছুটা কমল?

তরী মুখটা একটু বাঁকিয়ে, মৃদু স্বরে বলল,

- নাহ।

অন্তিক আলতো হাসলো সামান্য!তরীর হাতটা পরম অধিকারবোধে নিজের শক্ত মুঠোয় পুরে নিয়ে রিকশার দিকে এগিয়ে যেতে যেতে বললো,

- ওকে, ফাইন। রাগ না কমলে রাগ ভাঙানোর অন্য প্রেসক্রিপশন অ্যাপ্লাই করতে হবে। রিকশায় উঠুন, মিসেস শাহরিয়ার।

তরী আর দ্বিরুক্তি করল না। গুটিসুটি মেরে রিকশার এক কোণে গিয়ে বসল সে। রিকশা চলতে শুরু করতেই সে মুখটা একদম বাইরের দিকে ঘুরিয়ে রাখল। রিকশার হুডটা খোলাই ছিল। সন্ধ্যার ফুরফুরে হাওয়া তরীর শাড়ির আঁচল উড়িয়ে দিচ্ছিল বারবার। অন্তিক তরীর এই মৌনব্রত দেখে ওনার চশমাটা নাকের ডগায় সামান্য ঠিক করে নিলো। অতঃপর বড্ড ধীর পায়ে, ইঞ্চি ইঞ্চি করে তরীর দিকে সরতে লাগলো।

এমনিতেই হুডখোলা রিকশায় বসার জায়গা বড্ড কম, তার ওপর অন্তিকের সুঠাম চওড়া অবয়ব। তরী টের পেল, মিস্টার ডক্টর ওর একদম গায়ের সাথে এসে লেগেছেন। ওর গায়ের সেই তপ্ত ওম আর পারফিউমের তীব্র সুবাসে তরীর নিশ্বাস ভারী হয়ে আসতে লাগল। ও আরও একটু চেপে বসার চেষ্টা করতেই রিকশার লোহার রডে গিয়ে পিঠ ঠেকল। জায়গা আর এক চুলও অবশিষ্ট নেই!

তবুও অন্তিক থামলো না।নিজের কাঁধটা তরীর কাঁধের সাথে একদম লেপ্টে দিয়ে বড্ড আয়েশি ভঙ্গিতে বসলো। তরী এবার আর থাকতে না পেরে তীব্র বিরক্তি আর চোখে এক গাদা কৃত্রিম রাগ ফুটিয়ে ওর দিকে তাকাল। কণ্ঠস্বর খাদে নামিয়ে বলল,

- সমস্যা কী আপনার? রিকশায় এত জায়গা থাকতে একদম আমার গায়ের ওপর এসে পড়ছেন কেন? ওদিকে সরুন!

অন্তিক ওনার সেই চশমার আড়ালের নেশাক্ত, তৃষ্ণার্ত চোখ দুটো দিয়ে তরীর রাগে প্রস্ফুটিত মুখের দিকে তাকালো। ঠোঁটের কোণে সেই চেনা চতুর হাসিটা ঝুলিয়ে রেখে বড্ড নিস্পৃহ গলায় বললো,,

- আই অ্যাম আ ডক্টর, তরী। আমার মেডিকেল সায়েন্স বলে, প্রিয়তমা রাগ করলে তার বডি টেম্পারেচার হাই হয়ে যায়। আর সেটা কন্ট্রোল করার বেস্ট থেরাপি হলো-ক্লোজ কন্ট্যাক্ট। সো, আমি জাস্ট আমার থেরাপি অ্যাপ্লাই করছি, ম্যাম।

- রাখুন আপনার ফালতু থেরাপি! শয়তানি বুদ্ধি সব ওনার!

বলেই তরী মুখটা ফের ঘুরিয়ে নিতে চাইল। ঠিক তখনই, যেন ওদের এই খুনসুটিতে সুর মেলাতেই, আকাশ জুড়ে কোনো মেঘের ডাক ছাড়াই হঠাৎ টুপটাপ করে বৃষ্টি নামল। শ্রাবণের বাদল দিন নয়, অথচ অলস সন্ধ্যার এই অসময়ের বৃষ্টি যেন এক মায়াবী আবহের সৃষ্টি করল। রিকশার খোলা হুড বেয়ে বড় বড় জলের ফোঁটা ওদের ভিজিয়ে দিতে লাগল মুহূর্তেই।

তরী চমকে উঠে হাত দিয়ে মাথা ঢাকতে যাবে, ঠিক তখনই অন্তিক ওনার বাঁ হাতটা বাড়িয়ে তরীর ডান হাতটা পরম শক্তিতে নিজের উষ্ণ মুঠোয় পুরে নিলো। ওর হাতের সেই শক্তপোক্ত গ্রিপ আর তীব্র অধিকারবোধে তরীর সমস্ত চঞ্চলতা এক নিমেষেই স্তব্ধ হয়ে গেল।

অন্তিক তরীর ভেজা হাতটা নিজের ঠোঁটের কাছাকাছি এনে, ওনার তামাটে ওষ্ঠজোড়া তরীর আঙুলের ডগায় আলতো করে ছুঁইয়ে দিলো। চশমাটা বৃষ্টিতে ভিজে ঝাপসা হয়ে গেছে, অথচ ওর চোখ দুটো এই মুহূর্তে বড্ড বেশি স্পষ্ট, বড্ড বেশি ভালোবাসায় মাখামাখি। ও বৃষ্টির শব্দের মাঝেই গভীর, ভরাট কণ্ঠে বললো,

- ইট’স আ পারফেক্ট কম্বিনেশন, মিসেস শাহরিয়ার। রেইন, আ ওপেন হুড রিকশা, অ্যান্ড মাই বিউটিফুল অ্যাংগ্রি ওয়াইফ। এখনো কি বলবেন রাগ কমেনি, হুম?

বৃষ্টির জল তরীর চিবুক বেয়ে নেমে যাচ্ছিল, আর অন্তিকের এই প্রগাঢ় স্পর্শে তার বুকের ভেতর বুনো হরিণের দল আবার অবাধ্য গতিতে নাচতে শুরু করল।কোনমতে নিজেকে ধাতস্থ করে এক কোণে গুটিসুটি মেরে বসলো সে। না,রাগ আজকে কিছুতেই কমবে না! অসভ্য লোকটা একদন্ডও টাইম দেয় না তাকে। আর এখন এসেছে ঢং দিতে! অথচ বেচারী যদি একটিবার পাশে ফিরত তাহলে দেখতে পারতো তার এই বাচ্চাসুলভ অভিমানটা পাশে বসা মানুষটা ঠিক কতটা আগ্রহের সঙ্গে উপভোগ করছে!

★

খুলনার বেশ অনেকটা ঘুরে রিকশাটা শেষমেষ থামল শিববাড়ি মোড়ে। ভাড়া পরিশোধ করে, অবুঝ বালিকার হাত নিজের শক্ত বন্ধনে আবদ্ধ করে ডক্টর অন্তিক শাহারিয়ার এগিয়ে চলল সম্মুখ পানে। গন্তব্য আজ অজানা। তরী তখনো গম্ভীর মুখে, অন্তিক পাশের একটা ফুচকা স্টলের কাছে গিয়ে দাঁড়িয়ে বলল,,

- ফুচকা খাবেন?

- নাহ!

- আচ্ছা। অ্যাজ ইওর উইশ।

বলে অন্তিক অন্যদিকে হাঁটা লাগাতে গেলেই তরী ফোঁস করে উঠলো! মানে কি? এই লোক কি বেকুব নাকি! ও না বলেছি আর তাতেই চলে যাবে। মনে হচ্ছে, ওর সব কথা শোনে! অন্তিক থমকে দাঁড়ালেন। চশমাটা নাকের ডগায় সামান্য নামিয়ে তরীর রাগে ফুঁসতে থাকা মুখটার দিকে চাইলেন। ওনার ঠোঁটের কোণে সেই চেনা চতুর হাসিটা আবার উঁকি দিল। বড্ড ক্যাজুয়াল টোনে বললো,

- দাঁড়িয়ে আছেন যে?আপনিই তো বললেন খাবেন না। পেশেন্টের চয়েসকে রেসপেক্ট করা একজন গুড ডক্টরের প্রথম ডিউটি, মিসেস শাহরিয়ার।

- আপনি কোনো ডক্টরই না! আপনি একটা রসকসহীন কাঠখোট্টা পুরুষ! একটা মেয়ে যখন রাগ করে ‘না’ বলে, তখন তার মানে যে ‘হ্যাঁ’— এই সিম্পল সাইকোলজিটা আপনার ওই মেডিকেল সায়েন্সে পড়ায়নি?

অন্তিক এবার তরীর একদম মুখোমুখি এসে দাঁড়ালো। ওনার চওড়া অবয়বটা শিববাড়ি মোড়ের নিয়ন আলোয় বড্ড ড্যাশিং লাগছিল। গলার স্বর কিছুটা নামিয়ে ও বললো,

- ওহ, সো ফিমেল সাইকোলজি বলে ‘নো’ মিনস ‘ইয়েস’? তাহলে তো বড় প্রবলেম, তরী। কাল রাতে যখন আপনি কাঁপছিলেন আর আমাকে বলছিলেন ‘না, ছাড়ুন’— তার মানেও কি ‘ইয়েস’ ছিল? মেবি আই মেড আ বিগ মিস্টেক বাই স্টপিং দ্যান!

আকস্মিক মান-অভিমানী মুহূর্তে কাল রাতের চরম ব্যক্তিগত প্রসঙ্গ টেনে আনায় তরীর কান-মাথা মুহূর্তেই ঝাঁ ঝাঁ করে উঠল। লজ্জায়, আবেশে সে‌ আরক্তিম বর্ণ ধারণ করে অন্তিকের শার্টের হাতাটা খামচে ধরে দাঁতে দাঁত চেপে বলল,

- আপনি... আপনি একটা চরম অসভ্য লোক! রাস্তার মাঝে এসব কী আজেবাজে কথা বলছেন? তলে তলে এত শয়তানি আপনার?

- আজেবাজে কোথায়? আই অ্যাম জাস্ট ট্রায়িং টু আন্ডারস্ট্যান্ড ইওর সাইকোলজি, ম্যাম। বাই দ্য ওয়ে, এখন বলুন— ফুচকা খাবেন?

তরী রাগে মুখটা ফুলিয়ে অন্যদিকে তাকিয়ে বলল,

- খাব! ঝাল বেশি, টক কম! আর একটাও কথা বলবেন না আমার সাথে!

অন্তিক একটা গভীর তৃপ্ত দীর্ঘশ্বাস ফেলে ফুচকাওয়ালাকে ইশারা করলো। ফুচকা প্লেটে আসতেই তরী একটা মুখে পুরে দিয়ে চোখ-মুখ কুঁচকে ফেলল। ঝালের চোটে ওনার চোখ দিয়ে টুপ করে পানি বেরিয়ে এলো। ও ‘উহ, আহ’ করতে করতেই অন্তিক চট করে পকেট থেকে ওনার নিজস্ব রুমালটা বের করে তরীর ঠোঁটের কোণটা আলতো করে মুছে দিলো;ওর চশমার আড়ালের চোখ দুটোতে এখন আর কৌতুক নেই, বড্ড অস্থিরতা সেথায়। ও, ফুচকাওয়ালার দিকে তাকিয়ে ধমকের সুরে বললো,

- এই যে ভাই, এত ঝাল দিয়েছেন কেন? বাচ্চা মেয়ে একটা, স্পাইসি সহ্য করতে পারে না। ওয়ান প্লেট নরমাল করুন, কুইক!

তরী ঝালের মাঝেই ওনার এই কেয়ারিং রূপটা দেখে ভেতরের সব রাগ নিমেষেই ভুলে যেতে চাইল। কিন্তু না! এত জলদি গললে চলবে না। সে নাক টেনে বলল,

- আমি বাচ্চা নই! আমার সেভেনটিন প্লাস বয়স, মনে থাকে যেন!

- হ্যাঁ, দেখতেই পাচ্ছি। রাগ ভাঙাতে এসে ঝাল খেয়ে চোখ-মুখ লাল করে ফেলেছেন। ইউ আর জাস্ট আ কিড, তরী। বাট লাকিলি, ইউ আর মাই কিড!

তরী আর কথা বাড়ালো না। বক্ষদেশে অবাধ্য অশ্বের দাপাদাপি শুরু হয়েছে ইতিমধ্যেই! ফুচকা খাওয়া শেষ হতেই অন্তিক তরীর হাতটা আবার নিজের শক্ত মুঠোয় পুরে নিলো। তরী হাতটা ছাড়ানোর একটা দুর্বল চেষ্টা করে বলল,

- কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন আবার? আমি বাড়ি ফিরব।

- বাড়ি ফিরবেন তো অবশ্যই। তবে প্রেসক্রিপশনের লাস্ট ডোজটা এখনো বাকি আছে, মিসেস শাহরিয়ার।

- মানে?

- দেখলেই বুঝবেন!

- আমি কিছু দেখতে চাই না!

- বাট, আমি তো দেখাতে চাই।

আর বাক্যব্যয় না করে অন্তিক তরীর হাতটা ধরে এগিয়ে গেল শিববাড়ি মোড়ের নবনির্মিত চুড়ির শোরুমটায়। তরী বন্ধু মহলের কাছ থেকে এটার কথা বহুবার শুনেছে। তবে, অন্তিকের ব্যস্ততা আর একা একা বেরবার সাহস না থাকার দরুন আসা হয়নি কখনো। আজ লোকটা নিজে থেকে এনেছে দেখে ভালো লাগারা উপচে পরতে চাইছে,তবে তা দক্ষ হাতে মুঠোবন্দি করছে তরী। রাগ আজ ভাঙছে না কিছুতেই।

★

জমকালো কাঁচের শোরুমে পা রাখতেই তরীর চোখ ধাঁধিয়ে গেল। চারদিকের নিয়ন আলো যেন দেয়ালে ঝোলানো হাজারো রঙের কাঁচের গায়ে প্রতিবিম্বিত হয়ে এক মায়াবী আলোকছটার সৃষ্টি করেছে। ভেতরে শুধু চুড়ি আর চুড়ি—রেশমি, মেটালিক, জেলি, জয়পুরী, আর ওপাশে ঝকমক করছে মখমলের বাক্সে রাখা কাশ্মীরি চুড়ি। লাল, নীল, ফিরোজা আর বাসন্তী রঙের সেই সমাহারে যেকোনো নারীর মন উদাস হতে বাধ্য।

তরী তখনও ভেতরটা চেপে রেখে কাঠের পুতুলের মতো গম্ভীর মুখে দাঁড়িয়ে রইল। অন্তিক কাউন্টারের দিকে এক ঝলক তাকিয়ে তরীর হাতটা আলতো করে ছেড়ে দিল। ওর চশমার আড়ালে থাকা চোখ দুটো তখন তরীর মুখের প্রতিটি সূক্ষ্ম অভিব্যক্তি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছে।অন্তিক সেলসম্যানের দিকে ইশারা করে বড্ড নিস্পৃহ গলায় বললো,

- ভাই, ওই ওপরের কাশ্মীরি লাল আর ফিরোজা রঙের ‌জেলি,অফ হোয়াইট রেশমি চুড়িগুলো দেখান তো।

সেলসম্যান ঝটপট কয়েক ডজন চুড়ি এনে কাউন্টারে সাজিয়ে রাখল। কাঁচের ওপর কাঁচের মৃদু ঠুনঠুন শব্দ তরীর বুকের ভেতর কেমন একটা দোলা দিল। কিন্তু ও মুখ ঘুরিয়ে অন্যদিকে চেয়ে রইল।

অন্তিক এক গোছা লাল রেশমি চুড়ি হাতে নিয়ে তরীর দিকে ঘুরলো। ভরাট কণ্ঠে বড্ড মায়াবী সুরে বললো,

- কী হলো ম্যাম? পছন্দ হচ্ছে না? নাকি..

তরী মুখটা আরও একটু বাঁকিয়ে বলল,

- আমার কোনো কিছুই পছন্দ হচ্ছে না। আপনি ওনার কাছ থেকে যা ইচ্ছা কিনুন, ওনাকে গিয়েই পরাবেন। আমার হাত খালি থাকাই ভালো।

অন্তিক মৃদু হাস্যে তরীর আরও এক কদম কাছে এসে, ওনার সুঠাম চওড়া অবয়ব দিয়ে তরীকে চারপাশের লোকচক্ষু আড়াল করে দাঁড়ালো। অতঃপর তরীর ডান হাতটা আলতো করে নিজের বাম হাতের মুঠোয় নিলো। তরীর ফর্সা কবজিটা ওর আঙুলের ছোঁয়ায় মুহূর্তেই যেন অবাধ্য হতে চাইল।

- আপনি বড্ড বেশি কথা বলেন, মিসেস শাহরিয়ার। ডক্টরদের একটা নিয়ম আছে জানেন? অতিরিক্ত ছটফট করা পেশেন্টকে আগে শান্ত করতে হয়।

- ছাড়ুন বলছি! আমি আপনার কোনো পেশেন্ট নই, আর শান্ত হওয়ার তো প্রশ্নই ওঠে না!

তরী হাতটা টানার চেষ্টা করল কিন্তু অন্তিকের গ্রিপ বড্ড শক্ত। ওনার পুরুষালি পারফিউমের কড়া সুবাসে শোরুমের এসি-র ঠান্ডা বাতাসও যেন উধাও হয়ে গেল। অন্তিক বড্ড যত্ন করে, এক এক করে লাল রেশমি চুড়িগুলো তরীর নরম হাতে গলাতে লাগলো। কাঁচের চুড়ির মৃদু ঘর্ষণে তরীর ফর্সা চামড়াটা সামান্য লালচে হয়ে উঠল।

- আহ্, লাগছে তো! কাঠখোট্টা পুরুষ কোথাকার!

অন্তিক বড্ড ধীর কন্ঠে বললো,

- হুম, আমি তো কাঠখোট্টাই। তবে এই কাঠখোট্টা লোকটার প্রেসক্রিপশন কিন্তু আপনার বড্ড পছন্দ, মিসেস শাহরিয়ার।

ওনার উষ্ণ নিশ্বাস তরীর কপালে এসে আছড়ে পড়ছে। উনি চশমাটা নাকের ডগায় সামান্য ঠিক করে নিয়ে তরীর কানের কাছে মুখ নামালো,

- ইউ নো হোয়াট? এই লাল রঙটা আপনার ওই রাগী মুখের সাথে বড্ড পারফেক্ট ম্যাচ করে। একদম মিমোসা ফুলের মতো দেখায় আপনাকে।

তরী আর পারল না। সব প্রতিরোধ, সব কৃত্রিম রাগ ওনার এই নিবিড় স্পর্শ আর সরাসরি করা প্রশংসার সামনে তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ল। ও চোখ মেলে অন্তিকের চশমার আড়ালের ধোঁয়াটে, তৃষ্ণার্ত চোখ দুটোর দিকে তাকাল। অন্তিকের চোখে কোনো লুকোচুরি নেই, আছে কেবল এক বুক অধিকারবোধ। তরী নাক টেনে, ধরা গলায় বলল,

- আপনি সত্যিই বড্ড খারাপ। সবসময় আমাকে এভাবে নাজেহাল করেন কেন? আর ওই মেয়েটার কাছে আপনার ফোন থাকবে কেন? জানেন,ও যখন ফোন ধরেছিলো আমার যে কেমন লাগছিল...

অন্তিক এবার তরীর দু’হাত ওনার নিজের হাতের মধ্যে নিয়ে সামান্য চাপ দিলো। ওর কণ্ঠস্বর এবার একদম খাদের শেষ সীমায় নেমে এলো,,

- আই অ্যাম সরি, জান। আই রিয়্যালি অ্যাম। ইকরা জাস্ট ওনার ডিউটি করছিল। বাট আই প্রমিস, নেক্সট টাইম থেকে আমার পার্সোনাল ফোন অন্য কেউ টাচও করবে না। নাউ, লুক অ্যাট ইওর হ্যান্ডস।

তরী নিজের হাতের দিকে তাকিয়ে দেখল— দুই হাত ভরে গেছে লাল আর ফিরোজা রঙের রেশমি ও কাশ্মীরি চুড়ির মেলায়। ও ঠোঁটের কোণে অবশেষে একচিলতে মিষ্টি হাসি ফুটে উঠল। অন্তিক বিল পরিশোধ করে তরীর কাঁধে আলতো করে হাত রেখে ওর বুকের সাথে জড়িয়ে নিলো। তরী এবার আর সরলো না, ওর ভেজা শার্টের ওম আর চওড়া বুকের আশ্রয়ে নিজেকে পুরোপুরি সমর্পণ করে দিয়ে ফিসফিস করে বলল,

- আচ্ছা, এবারের মতো মাফ করলাম। কিন্তু আর কখনো এমন হলে,আমি সত্যি সত্যি চলে যাব!

- কোথায় যাবেন?

- যেখানে ইচ্ছা।

- ওকে,আমাকেও সাথে নিয়েন্।

তরী নাকের পাটা ফুলিয়ে অন্তিকের দিকে চাইলো।

- আ'ম সিরিয়াস!

- আ'ম অলসো!

- ডক্টর!

- আ'ম ইয়্যুর হাসবেন্ড ম্যাম!

তরী লাজুক হাসলো শেষমেষ। ওর দেখাদেখি হাসলো অন্তিক নিজেও। এমনই হাজারো খুনসুটিময় মুহূর্ত পার করতে করতে এগিয়ে চললো সম্মুখ পানে।

★

ফিরতি পথেও রিকশায় চেপেছে কপতো-কপতি। তবে এবার ধরনটা ভিন্ন। তরী নিজ থেকেই মাথায় এলিয়ে দিয়েছে অন্তিকের চওড়া কাঁধে। ঠোঁটের কোণে লেগে থাকা এক চিলতে প্রশান্তির হাসির সরছেনা কিছুতেই। রিকশা এগিয়ে চলেছে নিজ গতিতে। অন্তিক এক হাতে আঁকড়ে রেখেছে প্রিয়তমার হাত।

দুই হাত ভর্তি কাঁচের চুড়িগুলো রিকশার ঝাঁকুনিতে মৃদু টুংটাং শব্দ তুলছে, যা এই নিস্তব্ধ রাতে কোনো মধুর ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিকের চেয়ে কম নয়। হুট করে অন্তিক বললো,

- মামা, রিকশাটা একটু সাইড করুন তো।

তরী চমকে মাথা তুলল। ভ্রূ কুঁচকে শার্টের হাতা টেনে জিজ্ঞেস করল,

- কী হলো? এখানে থামাচ্ছেন কেন? বাসা তো আরও সামনে।

অন্তিক কোনো জবাব দিল না। রিকশা থামতেই তরীকে অবাক করে দিয়ে সে নেমে গেল। তরী স্তব্ধ হয়ে চেয়ে রইল ওর দিকে। রাস্তার পাশে একটা পুরোনো একতলা বাড়ির পাঁচিল ঘেঁষে মস্ত বড় এক বাগানবিলাস গাছ দাঁড়িয়ে আছে। রাতের মৃদু আলোয় বেগুনি আর গোলাপি ফুলের স্তবকগুলো দেয়াল বেয়ে যেন উপচে পড়ছে। অন্তিক লম্বা পায়ে রাস্তা পার হয়ে গাছটার কাছে গিয়ে দাঁড়াল। চশমাটা নাকের ডগায় একটু ঠিক করে নিয়ে, বড্ড নিখুঁত ভঙ্গিতে একটা সতেজ গোলাপি রঙা বাগানবিলাস ফুল ছিঁড়ে নিল।

তরী রিকশায় বসে চোখ গোল গোল করে দেখছিল সবটা। অন্তিক আবার রাস্তা পার হয়ে ফিরে এলো। রিকশায় উঠে তরীর একদম মুখোমুখি বসে, কোনো গৌরচন্দ্রিকা না করেই ওনার দীর্ঘ আঙুল দিয়ে তরীর কানের পাশে আলগা হয়ে থাকা চুলের গোছায় ফুলটা বড্ড মায়ায় গুঁজে দিল। ফুলের নরম পাপড়ি তরীর গালে ছোঁয়া লাগতেই ও একচিলতে মুচকি হাসল। চোখ নামিয়ে আড়ষ্ট গলায় কিছু একটা বলতে যাবে, ঠিক তখনই একটা চলন্ত বাইক ওদের রিকশার পাশ ঘেঁষে চলে গেল। বাইকে থাকা দুই যুবক ওদের এমন দৃশ্য একগাল হেসে চড়া সুরে টিজ করে বলে উঠল,

- উফ! এভাবেই চালিয়ে যাও মামু! হেব্বি লাগছে!

তরীর কান-মাথা মুহূর্তেই লজ্জায় রাঙা হয়ে উঠল। সে চোখ বড় বড় করে তাকাল। কিন্তু অন্তিক? সে বিন্দুমাত্র লজ্জিত বা দমে না গিয়ে, ওনার সেই ভরাট গম্ভীর কণ্ঠে বাইকের উদ্দেশ্যে হাত নাড়িয়ে বেশ রসিকতার সুরে পাল্টা জবাব দিল,

- অফকোর্স! দোয়া করবেন!

বাইকটা ততক্ষণে হাওয়া। তরী এবার অন্তিকের বুকে হালকা একটা কিল বসিয়ে অভিমানী সুরে ফোঁস করে উঠল,

- অসভ্য লোক একটা! আপনি ওদের কথায় এভাবে সায় দিলেন কেন? একটুও লজ্জা করল না আপনার?

অন্তিক রিকশায় তরীর আরও কাছে ঘেঁষে বসে, ওর দুই হাত নিজের শক্ত মুঠোয় পুরে বড্ড নিস্পৃহ গলায় বলল,

- কেন? ওরা কী এমন ভুল বলল যে প্রতিবাদ করতে হবে? আর আমি তো ওনাদের দোয়াই চাইলাম।

- রাখুন আপনার কথা! ওরা ভেবেছে আমরা বুঝি ছ্যাঁচড়া বয়ফ্রেন্ড-গার্লফ্রেন্ড! এই সন্ধ্যারাতে রিকশায় প্রেম করে বেড়াচ্ছি!

অন্তিক ওনার চশমাটা খুলে পকেটে রাখল। চশমা ছাড়া সেই গভীর, নেশাক্ত চোখ দুটো সরাসরি তরীর চোখের ওপর নিবদ্ধ করে ওনার তামাটে ঠোঁটে এক চিলতে চতুর হাসি ঝুলিয়ে বলল,

- বয়ফ্রেন্ড-গার্লফ্রেন্ড? প্রেমিক-প্রেমিকা?

তরী আলতো করে মাথা নাড়িয়ে সায় জানাল। অন্তিক তরীর কপালে নিজের ভেজা চুলগুলো সামান্য ছুঁইয়ে দিয়ে, গলার স্বর একদম খাদের শেষ সীমায় নামিয়ে ফিসফিস করে বলল,,

- তবে,আমি আপনার প্রেমিক হলে মন্দ হতো না।

- আপনি তো আমার প্রেমিকই, মিস্টার... একদম আমার একান্ত নিজস্ব, হালাল প্রেমিক!

অন্তিক মৃদু হেসে বুকের মাঝে আগলে নিলো তরীকে। ওদের খুনসুটি আর কাঁচের চুরির টুংটাং সুরের মাঝে রিকশাটা খুলনার সোডিয়াম আলোর পথ ধরে ‌ এগিয়ে চলল ওদের ভালোবাসার নীড়ের উদ্দেশ্যে।

অসমাপ্ত....

[ওদের গল্পটা আদেও কখনো সমাপ্ত হবে? আমার উত্তর না। ওরা আমার লেখা এক অবিনশ্বর জুটি। যতবার আমার মাথায় নতুন কিছু আসবে, কোনো মিষ্টি খুনসুটিময় মুহূর্ত, ততবার আমি ওদের মাধ্যমে তা ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করব। তবে পর্যায়ক্রমিক পর্বের সমাপ্তি ঘটল আজ। সবাই গল্পটা সম্বন্ধে নিজ নিজ অনুভূতি অবশ্যই কমেন্ট বক্সে জানাবেন!]

১১-০৭-২০২৬ (শনিবার)

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৮ম পর্ব শেষ করেছেন।

আগের পর্ব উপন্যাস সমাপ্ত

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন