ফন্ট সাইজ:
থিম:
হুটহাট পরিনীতা

৭ম পর্ব

লেখক: নওরিন কবির তিশা

#হুটহাট_পরিনীতা—— #পর্ব_৭

লেখনী—— #নওরিন_কবির_তিশা

পুরুষ মানুষের সবচেয়ে সুন্দর রূপটি কখন প্রকাশ পায় জানেন? যখন সে তীব্র কামনার মুহূর্তেও নিজেকে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রেখে প্রিয়তমার স্বাচ্ছন্দ্য ও সুরক্ষার সর্বোচ্চ খেয়াল রাখে। প্রাপ্তবয়স্ক নারী-পুরুষের জীবনে শারীরিক চাহিদা যেমন চিরন্তন এক সত্য, তেমনই সেই সম্পর্কের গভীরতম প্রকাশে সংযম আর দায়িত্ববোধের পরিচয় দেওয়াটা আরও বড় সত্য।

গত রাতেই তরী নিজের জীবন দিয়ে এই পরম সত্যের প্রমাণ পেয়েছে। অন্তিক আর সে যখন সমস্ত লোকলজ্জা আর জড়তার দেয়াল ভেঙে একে অপরের নিবিড়তম সান্নিধ্যে হারিয়ে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই তীব্রতম অনুভূতির চূড়ান্ত মুহূর্তে নিজেকে ইস্পাতকঠিন নিয়ন্ত্রণে সামলে নিয়েছিল অন্তিক। ওনার ভাষ্যমতে, তরী এখনো আইনত ও শারীরিকভাবে পুরোপুরি প্রাপ্তবয়স্ক নয়, আর এই বয়সে কোনো অসতর্ক পদক্ষেপ ওনার প্রিয়তমার জন্য শারীরিক ক্ষতির কারণ হতে পারে।

চশমাছাড়া সেই নেশাক্ত চোখেও তরীর প্রতি যে গভীর শ্রদ্ধা আর আগলে রাখার আকুলতা দেখেছিল সে, তাতেই ডক্টর অন্তিক শাহরিয়ার তরীর মনের মনিকোঠায় চিরদিনের জন্য এক অনন্য আসনে বসে গিয়েছেন।

★

রাঙা প্রভাতের আগমনে গোটা ধরিত্রী এক নতুন আনন্দের আবহে জেগে উঠেছে। সকালের সোনাঝরা রোদ্দুর নানুবাড়ির মস্ত বড় আমবাগানের পাতার ফাঁক গলে মাটিতে আল্পনা আঁকতেই শুরু হলো আমাদের চড়ুইভাতির মহোৎসব। এই সাতসকালে এত বড় আয়োজনের মূল উদ্যোক্তা আর কেউ নয় আমি নিজেই! আর এই গুরুকর্মে আমার সঙ্গ দিচ্ছে আমার কাজিন মহল। মেহেজাবিন-ওয়াহিদ-নাহিদ আমার বড় ফুপির দুই ছেলে। একজন আমার বড় অন্যজন ছোট।আর ছোট ফুপির মেয়ে।

নানুবাড়ির উত্তর পাশের বাগানটা এক কথায় অসাধারণ। প্রাচীন সব আম আর কাঁঠাল গাছের সুশীতল ছায়া, নিচে সবুজ ঘাসের গালিচা, আর ঢিল ছোঁয়া দূরত্বেই কলকল ধ্বনিতে বয়ে যাওয়া বিলের শান্ত জল। এমন মনোরম প্রাকৃতিক পরিবেশে চড়ুইভাতি না করলে জীবনটাই বৃথা!

আমাদের এই চঞ্চলতা দেখে বড়রাও আর ঘরে বসে থাকতে পারেননি। একে একে মামা, মামনি, কাকিমণি, চাচ্চু— সবাই এসে যোগ দিয়েছেন এই আনন্দের হাটে। মামা আর চাচ্চু মিলে কোমর বেঁধে লেগে গেছেন ইট দিয়ে অস্থায়ী মাটির চুলা তৈরিতে। মামনি আর কাকিমণি ধোঁয়া ওঠা বড় ডেকচিতে মসলার সুবাস ছড়াতে ব্যস্ত।

আমি চঞ্চল পদক্ষেপে দৌড়ে দৌড়ে কাজ করছি। আকস্মিক পার্শ্ববর্তী জামতলায় দৃষ্টি গেল আমার। সঙ্গে সঙ্গে মিলিত হলো একজনের চশমা বদ্ধ আকুল নেত্রে। মুহূর্তের মাঝে বুঝলাম এতক্ষন যাবৎ তৃষ্ণার্ত দৃষ্টিতে আমাকেই অবলোকন করছিলেন তিনি। লাজুক ভঙ্গিতে ‌চকিতে দৃষ্টি ঘুরিয়ে পাশে থাকা ওয়াহিদের দিকে চাইলাম।

আনমনা আমি। মন টিকছেনা কোথাও। বেহায়া দৃষ্টি ফের নিবদ্ধ হলো অদূরের মানবটির উপর। তবে সরাসরি নয়,অগোচরে চাইলাম। তবে উনি মনোযোগ এবার ল্যাপটপে নিবদ্ধ করেছেন।

--------

প্রধান রাধুনীর দায়িত্ব আমার আম্মুর উপর বর্তেছে। কাকিমনি আর মামনি পাশ থেকে টুকটাক সাহায্য করছে এই যা। আমি তখন ছোটদের সঙ্গে হইহুল্লোড়ে তৎপর। নানু এক গ্লাস লেবুর শরবত এনে দিলেন। আমি জিজ্ঞাসু দৃষ্টি মেলা বললাম,,,

- এটা কি নানু? আমি এখন এসব খেতে পারবো না। সরাও।

নানু শাড়ির আঁচল দিয়ে আমার কপালের স্বেদকণা মুছে দিতে দিতে বললেন,,

- পাগলী! এটা আমার নাতজামাই এর জন্য। নিজে তো খেয়াল করে কিছুই করিস না। এই গরমের ভেতর বাছাটা তখন থেকে বসে কাজ করছে। এখন এত খামখেয়ালি হলে হয়?

নানুর কথার গুঢ় অর্থ বুঝে চুপসালাম। কথা না বাড়িয়ে ট্রেতে থাকা গ্লাস'টি হাতে তুলে নিলাম। অতঃপর অগ্রসর হলাম কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে।

-----

এক মনে ল্যাপটপে টাইপ করে যাচ্ছেন আমার যন্ত্র মানব। অবশ্য তিনি যান্ত্রিক নন, রোম্যান্টিক আছেন বহুৎ।তবে, মাঝে মাঝে তাকে যন্ত্র মানব হিসেবেই ঠাওর হয় আমার। এই যেমন এখন, তার পাশে এসে দাঁড়িয়েছি তবে তার কোনো ভ্রূক্ষেপ নেই।বোধ হয় টের-টি অবধি পান নি। লোকটা যে প্রচন্ড রকম কর্মনিষ্ঠ সেটা প্রথম দিনেই টের পেয়েছিলাম আমি।

তবে আপাতত ওনার কর্মনিষ্ঠায় ক্ষুব্ধ আমি। ক্ষিপ্র গতিতে শরবতের গ্লাসটা ওনার পাশে রেখে জলদি পায়ে প্রস্থান প্রস্তুতি নিচ্ছি। দু’পা বাড়াতেই আকস্মিক পিছন থেকে ওড়নায় টান অনুভব করলাম। আমি ঝড়ো বেগে পিছন ঘুরে দেখলাম যেমনটা ভেবেছিলাম তেমনটাই। উনি ওড়নার আঁচল টেনে ধরেছেন। নিজের চোখকেই বিশ্বাস করতে পারছি না!

পুলকিত নেত্রে পুনর্বার দৃশ্যটা মন ভরে অবলোকন করে উচ্ছসিত কন্ঠে বললাম,,

- কিছু,‌বলবেন?

উনি গম্ভীর স্বরে বললেন,,

- এটা কার জন্য?

বিরক্ত হলাম আমি! বুঝে না বোঝার ভান করার কি আছে? মস্তিষ্ক তরাক গতিতে গরম হলো, কিঞ্চিত রাগত স্বরে বললাম,

- আশেপাশে যেহেতু কেউ নেই অবশ্যই আপনার জন্য।

- সেটা আমিও বুঝতে পারছি। কিন্তু বলে যাওয়া উচিত হয়নি?

- এমা! এখানে বলার কি আছে?

- কিছু নাই?

- না,তো!

বলেই আমি প্রস্থান করতে গেলে উনি ফের ওড়নায় টান দিলেন। আচ্ছা মসিবত! বিরক্তিতে বললাম,,

- সমস্যা কি?

- সমস্যা আমার না তোমার?

- আমার সমস্যা?

- অবশ্যই।

- তা কি সমস্যা,শুনি?

- এত অশান্ত কেন তুমি?

- একদমই না! ভীষণ শান্ত আমি।

- নমুনা দেখতেই পাচ্ছি।

- এখানে নমুনা দেখার কি হলো? আপনি কি আমাকে বলেছেন শান্ত থাকার জন্য? বললেই শান্ত থাকতাম।

- বলিনি?

- নাহ!

- ওহ,স্যরি। মাই মিস্টেক। বাট এখন বলছি, চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকো।

বিরক্তিরা সীমা ছাড়ছে ক্ষণে ক্ষণে। মানে,এখানে দাঁড়িয়ে থাকার কি আছে? উনি কি ছোট বাচ্চা? ১০০০ ডিগ্রি ছাড়ানো মেজাজেও হিমশীতল বরফ খণ্ডের ন্যায় শান্ত রইলাম। খানিক বাদে উনি গ্লাসে চুমুক দিলেন। আমি অন্যমনস্ক হয়ে দাঁড়িয়ে আছি। হঠাৎ ওনার কন্ঠস্বর কানে এলো,,

- চিনির পরিবর্তে কি নুন দিয়ে ফেলেছেন, ম্যাম?

আমি উদ্বিগ্ন দৃষ্টিতে চাইলাম,,

- মানে?

- মানে,শরবতে মিষ্টতা কোথায়?

- সে আমি কি জানি? নানুর কাছে শুনেন গিয়ে।

- মানে?

- মানে,শরবতটা নানু বানিয়েছে। আমি না!

গুরুগম্ভীর অন্তিক শাহরিয়ার অপ্রস্তুত হয়ে উঠলেন মুহূর্তের তরে। তবে,পরক্ষনেই নিজেকে সামলিয়ে তিনি বলেন,,

- ওহ।

- কিন্তু, এমন তো হওয়ার কথা না। নানু মিষ্টিপ্রেমী। প্রচুর মিষ্টি খান তিনি। তার দ্বারা এমন ভুল?

- অবিশ্বাস করছেন?

- ঠিক,তেমনটা না। কিন্তু?

- তাহলে আর কি? নিজেই টেস্ট করে দেখুন।

আমি অবাকের চূড়ান্তে। নানুর দ্বারা এমন ভুল হবে না এটা নিশ্চিত। আর উনিও মিথ্যা বলতে পারেন না! দোনামনা করে বললাম ,,

- আচ্ছা,দিন।

উনি গ্লাসটা হাতে তুলে দিতেই, বেশ অপটু ভঙ্গিতে তা গ্রহণ করে আলতো ঠোঁট ছোঁয়ালাম।না, স্বাদতো ঠিকই আছে-উপযুক্ত! তবুও এমন মিথ্যার মানে মস্তিষ্কে বোধগম্য হলো না। আমি ওনার দিকে চেয়ে কিছু বলতে যাবো,তার আগেই উনি গ্লাসটা আমার হাত থেকে প্রায় কেড়ে নিয়ে ধকধক করে বেশ খানিকটা শরবত শেষ করে বললেন,

- নাও পার্ফেক্ট!

আগাগোড়া কিছু না বুঝে বেকুবের মত চাইলাম।উনি বাঁকা দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকালেন। অতঃপর কিঞ্চিৎ হাস্যে বললেন,,

- নাও, ইয়্যু ক্যান লিভ।

আমি তখনও বিষ্ময়ের চূড়ান্তে। তবুও নিজেকে ধাতস্থ করে বললাম,,

- আপনি যাবেন না? মানে, আম্মুরা বলছিল আপনার কথা এখনো কাজ করছেন।

- আপনি যান, আমি ২ মিনিটে আসছি।

- জলদি আসবেন কিন্তু।

- আচ্ছা, জান।

আমি যেতেই উদ্যত হচ্ছিলাম। আকস্মিক ওনার এমন সম্বোধনে পদযুগল থমকে গেল আমার। বিস্মিত দৃষ্টিতে পেছন ঘুরে বললাম,,

- কি বললেন?

অন্তিক একদম স্বাভাবিক দৃষ্টিতেই আমার দিকে তাকিয়ে বলল,,

- কি বললাম?

- মাত্র বললেন।

- ওহ, যেতে বলেছি।

- উঁহু, অন্য কিছু বলেছেন।

- অন্যকিছু কি?

- সেটা তো আপনিই ভালো জানেন।

- আরে বলুন।

আমি বিরক্ত! মুখ বাঁকিয়ে প্রস্থানের উদ্দেশ্যে বাড়ালাম। কিছুদূর এগিয়েছি সবে,ফের প্রতিধ্বনিত হলো একই সম্বোধন,,

- জান?

এবার আর ভ্রম নয়, স্পষ্ট শুনলাম। সুতীব্র এক বৈদ্যুতিক তরঙ্গ মুহূর্তের মাঝে মেরুদণ্ড বেয়ে নেমে গেল। চট করে পেছন ঘুরতেই দেখি, অন্তিক ওনার ল্যাপটপে এখনো একমনে কার্যত। মুখে সেই চিরচেনা, নির্বিকার গাম্ভীর্য। যেন এইমাত্র কোনো নিষিদ্ধ মন্ত্র উচ্চারণ করেননি তিনি! আমি ওনার টেবিলের একদম মুখোমুখি এসে দাঁড়ালাম। দুহাতে কোমর বেঁধে, রাগত গলায় বললাম,

- এই যে মিস্টার ডক্টর!

অন্তিক ল্যাপটপ থেকে চোখ না তুলেই ওনার চশমাটা নাকের ডগায় সামান্য ঠিক করে নিলেন। অতঃপর বড্ড নিস্পৃহ গলায় বললেন,

— এখনো দাঁড়িয়ে আছেন? বললাম তো, টু মিনিটস। আই অ্যাম কামিং।

— উঁহু! একদম মিথ্যা বলবেন না। মাত্র আরেকটা শব্দ বলেছেন আপনি। আমি স্পষ্ট শুনেছি! বলুন কি বলেছেন?

এবার অন্তিক টাইপিং থামালেন। ল্যাপটপের স্ক্রিনটা সামান্য নামিয়ে, ওনার সেই তীক্ষ্ণ, সম্মোহনী চোখ দুটো দিয়ে সোজা আমার দিকে তাকালেন; চতুর বাঁকা হাস্যে চেয়ারে পিঠ ঠেকিয়ে বড্ড আয়েশি ভঙ্গিতে বললেন,

— ওহ, রিয়্যালি? কী শুনেছে তাহলে আমার মিমোসা, শুনি একটু?

ওনার এই সরাসরি কাউন্টারে আমি মুহূর্তেই আমতা আমতা করতে লাগলাম। ‘জান’ শব্দটা নিজের মুখে উচ্চারণ করতে গিয়ে জিভ যেন আড়ষ্ট হয়ে আসছিল। কান-মাথা ঝাঁ ঝাঁ করতে লাগল লজ্জায়। তবুও রাগের ভান করে বললাম,

— আপনি... আপনি আমাকে ‘জান’ বলে ডেকেছেন! এই মাত্র বললেন!

অন্তিক এবার একটা গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেললেন, যেন উনি এক চরম অবুঝ বাচ্চার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। ওনার চাপদাড়ির আড়ালে লুকানো হাসিটা এবার আর ঢাকা রইল না। উনি অত্যন্ত ক্যাজুয়াল টোনে বললেন,

— কাম অন, তরী! আই জাস্ট সেড, ‘আচ্ছা, যান।’ মানে আপনাকে যেতে বলেছি। আপনার এই সেভেনটিন প্লাস ব্রেইনটা যে এত ওভারথিংকিং করতে পারে, ওহ গড! ইউ আর জাস্ট ইমাজিনিং থিংস, ম্যাম।

— আমি একটুও কল্পনা করছি না! আপনি ইচ্ছে করে আমাকে খেপাচ্ছেন। প্রথমে শরবতে মিষ্টি নেই বলে আমার এঁটো করালেন, আর এখন...

অন্তিক ওনার এক হাত টেবিলের ওপর রেখে আমার দিকে সামান্য ঝুঁকে এলেন। ওনার পুরুষালি পারফিউমের সুবাস আর চশমার আড়ালের নেশাক্ত চাউনি আমার সব যুক্তিকে নিমেষেই ওলটপালট করে দিল। উনি গলার স্বর একদম খাদে নামিয়ে ফিসফিস করে বললেন,

— শরবতের মিষ্টতা কোথায় ছিল, সেটা তো আপনি টেস্ট করার পরই টের পেয়েছিলাম। ডক্টররা কখনো উইদাউট এক্সপেরিমেন্ট কথা বলে না। আর সেকেন্ডলি... আমি কেন শুধু শুধু ‘জান’ বলতে যাব, হুম?

আমি আমতা আমতা করে ওনার যুক্তি খন্ডন করতে গিয়েও বাধাগ্রস্ত হলাম। এই সুযোগে উনি ফের বললেন,,

- বাই দ্য ওয়ে, আপনি কি চান? আমি আপনাকে ওটা বলে সম্বোধন করি?

ওনার এই চতুর জালে আটকা পড়ে আমার পায়ের তলার মাটি যেন সরে যাওয়ার উপক্রম হলো। লোকটা নিজে অন্যায় করে কেমন সুন্দর আমার ঘাড়েই দোষ চাপিয়ে দিচ্ছে! রাগে, ক্ষোভে আর লজ্জার চূড়ান্ত সীমায় পৌঁছে আমার চোখ দুটো কান্নায় ভরে ওঠার জোগাড় হলো, খেই হারিয়ে লজ্জা রাগের সংমিশ্রণে বললাম ,

— আপনি আস্ত একটা খচ্চর পুরুষ! ডক্টর নামের কলঙ্ক আপনি! তলে তলে এত শয়তানি বুদ্ধি আপনার! আমি আর এক মুহূর্তও দাঁড়াব না এখানে!

বলেই আর ওনার উত্তরের অপেক্ষা না করে, ওড়নার আঁচলটা এক ঝটকায় টেনে নিয়ে আমি হনহন করে বাগানের দিকে ছুটে চলে এলাম। পিছন থেকে অন্তিকের প্রসস্থ ভরাট ড্যাশিং হাসির শব্দ আমার কানে এসে বিঁধল। বুকের ভেতর বুনো হরিণের দল তখন অনবরত অবাধ্য হয়ে নৃত্য করে চলেছে, কোনোমতে নিজেকে সামলে স্থান ত্যাগ করলাম।

--------

অপরাহ্নের ম্রিয়মাণ আলোয় আমবাগানের চড়ুইভাতির আসর তখন জমে ক্ষীর। খাওয়া-দাওয়া পর্বের সমাপ্তি ঘটিয়ে গল্পের পাঠ চুকিয়ে পর বড়রা যার যার মতো জিরিয়ে নিতে ঘরের দিকে পা বাড়ালেন। আর আমরা, মানে অবাধ্য কাজিন মহল বাগানের এক প্রান্তে মস্ত বড় একটা শীতলপাটি বিছিয়ে আড্ডায় মগ্ন হলাম। এই আড্ডার মধ্যমণি অবশ্য আমার বড় ফুপির ছেলে, সাহাব ভাইয়া।

আমার চেয়ে বছর পাঁচেকের বড়, বেশ চটপটে আর বন্ধুবৎসল। অন্তিকের চেয়ে বয়সে তুলনামূলক ছোট হলেও ওনার সাথে ভাইয়ার সমীকরণটা শুরুতেই বেশ জমে উঠেছে। মিষ্টি বিকেলের মৃদু হাওয়া আর চারপাশের অলস পরিবেশের মধ্যে হুট করেই সাহাব ভাইয়া অন্তিকের দিকে ঝুঁকে ফেস্টিভ টোনে বলে উঠল,

— আচ্ছা ব্রো, একটা রিউমার শুনেছি। তোমার নাকি গানের গলা চমৎকার?

ভাইয়ার এমন আকস্মিক দাবিতে আমি বেশ অবাক হয়ে অন্তিকের দিকে তাকালাম। লোকটা ল্যাপটপ ছেড়ে এখন একদম ক্যাজুয়াল মুডে বসে আছেন, চোখের চশমাটা বিকেলের আলোয় চকচক করছে। ওনার সেই চিরচেনা গম্ভীর মুখে মৃদু হাসির রেখা ফুটে উঠল। উনি বেশ মার্জিত ভঙ্গিতে মাথা নেড়ে বললেন,

— না না, আবরার। ওটা একদমই গুজব। আই অ্যাম আ ডক্টর, নট আ সিঙ্গার। ওটিতে গান গাইলে পেশেন্টের হার্টবিট স্টেবল হওয়ার চেয়ে আরও ফ্লাকচুয়েট করবে।

মেহেজাবিন ওপাশ থেকে হাততালি দিয়ে কোরাস ধরল,

- না ভাইয়া, বাহানা চলবে না! আজ আপনাকে গাইতেই হবে।

আমি এক কোণে বসে চোরের মতো ওনার প্রতিক্রিয়া দেখছিলাম। অন্তিক একবার আড়চোখে আমার দিকে তাকালেন। উনি দমে যাওয়ার পাত্র নন, তবুও কিছুটা অনীহা প্রকাশ করে বললেন,

— রিয়্যালি, আই ক্যান্ট। গিটার ছাড়া তো আমার আবার সুরই আসে না। সো, আজকের মতো মাফ পাওয়া যাক?

— নো চান্স, ব্রো! আমার ডার্লিংয়ের রুমে গিটার আছে, আমি এখনই নিয়ে আসছি!

ডার্লিংটা আমার নানু। সাহাব ভাইয়া এক লাফে পাটি ছেড়ে দৌড়ে ঘরের দিকে গেল এবং মিনিট দুয়েকের মাথায় একটা সেমি-অ্যাকোস্টিক গিটার এনে এক প্রকার জোর করেই অন্তিকের কোলে সঁপে দিল। বাগানের চারপাশটা তখন অদ্ভুত শান্ত। বিলের দিক থেকে আসা হাওয়া আমপাতার ফাঁকে ফিসফিসানি তুলছে। অন্তিক গিটারটা কোলের ওপর অ্যাডজাস্ট করে নিলেন। গিটারের ফ্রেটে আঙুল বোলাতে বোলাতে চশমার আড়াল থেকে সরাসরি আমার চোখের দিকে ওনার সেই সম্মোহনী, তৃষ্ণার্ত দৃষ্টি নিবদ্ধ করলেন।

চারপাশের কাজিনদের উপস্থিতি যেন ওনার কাছে তখন গৌণ, ওনার পুরো কনসেনট্রেশন শুধু আমার ওপর। ওনার সেই ভরাট, মেলোডিয়াস কণ্ঠে গিটারের তারে মৃদু টোকা দিয়ে গাইতে শুরু করলেন,,

পূর্ণিমা সন্ধ্যায় তোমার রজনীগন্ধায়...

রুপ সাগরের পাড়ের পানে...

উদাসী মন ধায়....

তোমার প্রজাপতির পাখা...

আমার আকাশ চাওয়া মুগ্ধ চোখের...

রঙিন স্বপন মাখা...

তোমার চাঁদের আলো...

মিলায় আমার দুঃখ-সুখের সকল অবসান....

ফাগুন হাওয়ায় হাওয়ায় করেছি যে দান....

চলবে.....

[ আপনাদের লেখিকা গল্প রিচেক করার মত অবস্থায় নাই। পেজটা আমি অর্থাৎ ওর আপুর(কাজিন) কাছে থাকায় গল্পটা পেলেন। তাই ভুল ত্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন]

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৭ম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন