ফন্ট সাইজ:
থিম:
কে তুই বল

১ম পর্ব

লেখক: নওরিন কবির তিশা

—'আজ থেকে দুই দিন চার ঘণ্টা একুশ মিনিট আগে আমার কাছে আই লাভ ইউ লিখে মেসেজ এসেছে। লাইক আমার মত মানুষের কাছে।আর তোরা এখনো সেটা ট্র্যাক করতে পারিস নি।আর ইউ ফাকিং কিডিং উইথ মি!

বিশাল হলরুমের পিনপতন নীরবতার মাঝে সুঠামদেহি মানবটার বজ্র কন্ঠের হুংকার প্রতিধ্বনিত হল।মেক্সিকোর অন্ধকার জগতের অঘোষিত সম্রাট কৃশ;পরনে কুচকুচে কালো শার্টের হাতা গোটানো, যার নিচে পেশিবহুল হাতের উল্কিগুলো আগুনের শিখার মতো দেখাচ্ছে। যে হাতে সামান্যতম কম্পন ছাড়া শত শত শত্রুর বুক চিরে বুলেট চলে যায়, সেই হাতে ধরা ফোনটার দিকে সে এমনভাবে তাকিয়ে আছে যেন ওটা কোনো আগ্নেয়াস্ত্র।

সাধারণত এই হলরুমে কৃশের সামনে যখন তার লোকরা দাঁড়ায়, তখন সেখানে খবর আসে ড্রাগ চালানের, খুনের কিংবা কোনো রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের। কিন্তু আজকের খবরটা বড়ই বিসদৃশ, বড়ই অদ্ভুত। রক্তের ঘ্রাণে অভ্যস্ত এই ঘরে প্রেমের বার্তা যেন এক চরম উপহাস।

কৃশের হুংকারে সামনে দাঁড়িয়ে থাকা দুঁদে হ্যাকার আর বডিগার্ডদের বুক কেঁপে উঠল। কারোর সাহস নেই মাথা তুলে তার চোখের দিকে তাকায়। দীর্ঘ কয়েক সেকেন্ডের শ্বাসরুদ্ধকর নিস্তব্ধতা ভেঙে একজন থরথর করে কাঁপতে থাকা হ্যাকার মাথা নিচু করেই বলে উঠল,

—'বস, আমরা... আমরা পেরেছি। অনেকগুলো প্রক্সি সার্ভার আর এনক্রিপশন ভেঙে শেষ পর্যন্ত লোকেশনটা পাওয়া গেছে।

কৃশ সোফায় হেলান দিয়ে বসে একটা চুরুট ধরাল। ধোঁয়া ছেড়ে শান্ত অথচ তীক্ষ্ণ গলায় প্রশ্ন ছুঁড়লো, —'কোথায়?

—'বস, মেসেজটা অনেক দূর থেকে এসেছে। আটলান্টিক পাড়ি দিয়ে দক্ষিণ এশিয়ার একটা দেশ... বাংলাদেশ। ওখানকার রাজধানী ঢাকা থেকে এক মেয়ে আপনার পার্সোনাল নাম্বারে এই মেসেজ পাঠিয়েছে।

কৃশের ঠোঁটের কোণে এক চিলতে বিদ্রূপের হাসি ফুটে উঠল। বাংলাদেশ? যে দেশের নাম সে হয়তো মানচিত্রে দেখেছে কিন্তু কখনো যাওয়ার প্রয়োজন বোধ করেনি, সেই সুদূরপ্রান্ত থেকে কেউ তাকে ভালোবাসার স্পর্ধা দেখিয়েছে!

সে ধীরলয়ে উঠে জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়াল। বাইরে মেক্সিকো সিটির রাতের আলো জ্বলজ্বল করছে, ধোঁয়ার কুণ্ডলীগুলো আকাশে উড়িয়ে দিয়ে কৃশ জানালার কাঁচের ওপারে মেক্সিকো সিটির নিয়ন আলোর দিকে একপলক তাকালো। তার দীর্ঘদেহী অবয়বটা অন্ধকার জানালার কাঁচে প্রতিফলিত হচ্ছে। ৬ ফুট ১ ইঞ্চির এই সুঠামদেহী আকৃতির অধিকারী সে।তার পৌরুষ চওড়া কাঁধ আর পেশিবহুল বুক শার্টের ভেতর থেকেও তার অদম্য শক্তির জানান দিচ্ছে।

কৃশের গায়ের রঙটা বড্ড উজ্জ্বল। তার তীক্ষ্ণ চোয়াল আর চিলড্রেন-ব্লাড চোখের মণি দুটো দেখলে যে কারো আত্মা কেঁপে ওঠে। হাতের পেশিতে আঁকা উল্কিগুলো চুরুটের মৃদু আলোয় জীবন্ত হয়ে উঠছে, যেন কোনো বিষাক্ত সাপ লতার মতো তার সারা শরীরে জড়িয়ে আছে। তার শরীরের প্রতিটি ভাঁজে দৃশ্যমান ট্যাটুর আঁচড়।

কৃশ ধীরলয়ে ঘুরে দাঁড়ালো। তার পায়ের জুতোর শব্দ ওই বিশাল হলরুমে কামানের গোলার মতো বাজছে। সোফায় এসে রাজকীয় ভঙ্গিতে বসে সে তার ডান হাতের আঙুল দিয়ে কপাল ঘষলো। তার আঙুলে থাকা খুলি আকৃতির আংটিটা ঝিলিক দিয়ে উঠলো।

“বাংলাদেশ?”——কৃশ বিড়বিড় করলো। তার কণ্ঠস্বর যেন কোনো গভীর খাদ থেকে উঠে আসা এক গম্ভীর নিনাদ।সামনে দাঁড়িয়ে থাকা হ্যাকাররা ভয়ে আড়ষ্ট হয়ে আছে। কৃশ তার হাতের চুরুটটা অ্যাশট্রেতে পিষে নিভিয়ে দিয়ে উঠে দাঁড়ালো। তার শান্ত কিন্তু ভয়াবহ শীতল চাহনি এবার সরাসরি হ্যাকারের দিকে।

—'আই ওয়ান্ট টু মিট দিস ডেয়ারিং গার্ল।

এক মুহূর্তের জন্য থামলো সে। পরমুহূর্তেই বজ্রকণ্ঠে আদেশ ছুঁড়ল,,

—'জেট রেডি কর। কাল ভোরেই আমি বাংলাদেশের উদ্দেশ্যে রওনা হবো। আই ওয়ান্ট হার... ডেড অর এলাইভ, জাস্ট ইন ফ্রন্ট অফ মি!

পুরো হলরুমে আবার পিনপতন নীরবতা নেমে এলো। নিস্তব্ধতার মাঝে শুধুই দৃশ্যমান হলো কৃশের ঠোঁটের কোণে তখন এক লুক্কায়িত অথচ আকর্ষনীয় বিদ্রূপের হাসি।

★

বাইরে তখন কাঠফাটা রোদে দুপুরের তন্দ্রা লেগেছে, কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলের এই ছোট ঘরটিতে যেন একঝাঁক চড়ুইপাখির মেলা বসেছে। পড়ার টেবিলের ওপর ছড়ানো-ছিটানো বইখাতা আর আধখাওয়া চানাচুরের ঠোঙা সাক্ষ্য দিচ্ছে—এখানে পড়াশোনার চেয়ে আড্ডার দাপটই বেশি।

হলের সেই ঘিঞ্জি ঘরের কোণে দুপুরের রোদ এসে পড়েছে আয়ন্তির বিষণ্ণ মুখের ওপর।সে বিছানার এক কোণে পা গুটিয়ে বসে তার ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে ছিল, তিন দিন আগে বান্ধবীদের চাপে পড়ে, স্রেফ এক মুহূর্তের পাগলামিতে সে একটা অচেনা বিদেশি নাম্বারে ‘আই লাভ ইউ’ লিখে পাঠিয়েছিল। তখন হাসাহাসি হলেও, যত সময় যাচ্ছে, আয়ন্তিকার বুকের ভেতরটা ততই দুরুদুরু করছে।

আর উদ্বিগ্ন আয়ুকে ঘিরে ধরেছে তার তিন মক্কেল বান্ধবী—তুলি, নিপা আর সেঁজুতি। আয়ন্তিকার সেই উদ্বিগ্ন চাহনি্ তাদের সন্দেহটা তখন ঘনীভূত হয়ে আকাশ ছুঁয়েছে।সেঁজুতি ওর কপালে ভাঁজ দেখে হোহো করে হেসে উঠল,

—'ওরে আয়ন্তিরে, তুই তো দেখি ভয়েই আধমরা হয়ে গেলি! ওটা নির্ঘাত কোনো বন্ধ হয়ে যাওয়া নাম্বার, কিংবা হয়তো সাত সমুদ্র ওপারের কোনো বৃদ্ধ লোক ভুল ভেবে উড়িয়ে দিয়েছে। তুই শুধু শুধু পাহারাদারের মতো ফোনের ওপর বসে আছিস কেন?

আয়ন্তি ফোনের স্ক্রিনটা একবার দেখে নিয়ে ধরা গলায় বলল, —'না রে সেঁজুতি, তিন দিন হয়ে গেল, কোনো উত্তর নেই অথচ মনের ভেতরটা কেমন কু ডাকছে। যদি লোকটা মন্দ কেউ হয়?

তুলি তখন আয়ন্তির চিবুকটা আলতো করে নেড়ে দিয়ে রসিকতা করে বলল, —'আরে ধুর! সুইজারল্যান্ড হোক আর আমেরিকা, অত দূর থেকে কেউ তোকে ধরতে আসছে না। বরং তুই এখন বাস্তবের দিকে তাকা। শোন, কাল যে ছেলেটা তোকে ল্যাব থেকে ফেরার পথে গোলাপ দিতে চেয়েছিল, সে আজ আবার তোর হলের নিচে রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে। যা তো দেখি, একটু বেলকনিতে গিয়ে দাঁড়া।

আয়ন্তিকা প্রথমে রাজি হতে চায়নি, কিন্তু বান্ধবীদের অবিরাম ঠ্যালায় শেষ পর্যন্ত সে উঠে দাঁড়াল।

আয়ন্তিকা মেয়েটি যেন প্রকৃতির এক আপন সৃষ্টি। তার গায়ের রঙটি ঠিক যেন শরতের দুপুরের রোদে ভেজা শিউলি ফুলের মতো—অত্যন্ত কোমল আর উজ্জ্বল। যেন করো স্বর্গীয় অপ্সরা ভুলবশত ধরণীতে নেমে এসেছে। সুদীর্ঘ অক্ষিপল্লব বিশিষ্ট তার ডাগর চক্ষুদ্বয়ে যেন সর্বদাই এক চঞ্চলতা খেলা করে, যেন কোনো অজানাকে খুঁজে বেড়াচ্ছে।

পরনে তার সাধারণ নীল রঙের কামিজ, যার ওড়নাটা গলায় অবিন্যস্তভাবে জড়ানো। তার রেশমি কালো চুলগুলো হাঁটু ছাড়িয়ে আরও দু ইঞ্চি নিচে এসে থেমেছে। তার নাকের ছোট নোলকটি দুপুরের আলোয় মাঝে মাঝে ঝিলিক দিয়ে উঠছে।

আয়ন্তিকা ধীর পায়ে বেলকনিতে গিয়ে দাঁড়াল। বেলকনির গ্রিল ধরে নিচে তাকাতেই তার চোখে পড়ল রাস্তার ধারের সেই পরিচিত তরুণটিকে। নিচে দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেটির আকুল চাহনি দেখে আয়ন্তিকা ধীর পায়ে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াল। বেলকনির গ্রিল ধরে নিচে তাকাতেই তার কপালে বিরক্তির সূক্ষ্ম ভাঁজ ফুটে উঠল। রাস্তার ওপারে নিমগাছটার নিচে দাঁড়িয়ে আছে তাদের ভার্সিটির সেই সিনিয়র, যে গত কয়েক মাস ধরে ছায়ার মতো আয়ন্তিকাকে জ্বালিয়ে মারছে। ছেলেটির চোখেমুখে এক ধরণের মেকি ব্যাকুলতা, যা দেখে আয়ন্তিকার পিত্তি জ্বলে গেল।

চলবে.....

#সূচনা_পর্ব

গল্প——#কে_তুই_বল

লেখিকা——#নওরিন_কবির_তিশা

(প্রেমের নীলকাব্যের রেসপন্স আমাকেও দোষ করছে বারংবার তাই নতুন একটা গল্প শুরু করলাম। আশা করছি ভালো লাগবে ১কে কমপ্লিট হলেই পরবর্তী পর্ব দিব ইনশাল্লাহ)

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১ম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন