#কে_তুই_বল——#পর্ব_২
#নওরিন_কবির_তিশা
মানচিত্রের ক্ষুদ্র এক বিন্দুর মতো এই বাংলাদেশ—আয়তনে হয়তো সে নগণ্য, কিন্তু বিশ্বের অপরাধ জগতের পিচ্ছিল অন্ধকার গলিঘুঁজিতে তার পদচিহ্ন অতিশয় গভীর। আন্তর্জাতিক মাদক সিন্ডিকেট কিংবা মারণাস্ত্রের চোরাচালান—সবকিছুর জন্যই এই ভূখণ্ড যেন এক নিভৃত ও নিরাপদ করিডোর। সীমান্তের কাঁটাতার তুচ্ছ করে চোরাবালির মতো এ দেশে ঢুকে পড়ে বিষাক্ত মাদকের নেশা আর অবৈধ বারুদের গন্ধ; সেই গন্ধে এখানকার আকাশ-বাতাস মাঝেমধ্যেই ভারী হয়ে ওঠে। অপরাধীদের কাছে এই মাটি যেন এক অঘোষিত স্বর্গরাজ্য, যেখানে আইনের শাসনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে অনায়াসেই গড়ে তোলা যায় বিনাশের এক সুসংগঠিত সাম্রাজ্য।
মেক্সিকোর উত্তপ্ত ভূমি থেকে বিদায় নিয়ে এই জীর্ণ ঢাকা শহরের বুকে পা রাখার মাত্র তিন দিনের মাথায়, কৃশ নিজের জন্য এক দুর্ভেদ্য ও গোপন আস্তানা গুছিয়ে নিয়েছে। শহরের একপ্রান্তের এক জরাজীর্ণ, পরিত্যক্ত গুদামঘর—বাইরে থেকে দেখলে মনে হয় কালের গর্ভে লীন হওয়া এক কঙ্কাল। কিন্তু তার জঠর চিরে ভেতরে প্রবেশ করলে দেখা যায় সম্পূর্ণ ভিন্ন এক জগৎ। সেখানে এখন অত্যাধুনিক প্রযুক্তির শীতল ঔজ্জ্বল্য আর ভারী আগ্নেয়াস্ত্রের ধাতব ঝনঝনানি—যা বাইরের ধ্বংসস্তূপের সঙ্গে এক বিসদৃশ বৈপরীত্য তৈরি করেছে।
বাইরে ভ্যাপসা গরমের ভ্যাপানি থাকলেও, ঘরের ভেতর এসি চলছে তার পূর্ণ বিক্রমে। জমাট বাঁধা নিস্তব্ধতার মাঝে কেবল এসির একটানা মৃদু গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে। সেই ঘরের প্রশস্ত এক কাষ্ঠাসনের ওপাশে স্থাণুর মতো বসে আছে কৃশ। তার চোখের দৃষ্টি তীক্ষ্ণ, যেন শিকারি চিল আকাশের উচ্চতা থেকে শিকারের হৃদস্পন্দন মাপছে।
তার ঠিক উল্টো দিকে বসে আছে স্থানীয় দুই মাদক ব্যবসায়ী—জহির আর সায়েম। তাদের কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমছে, চোখেমুখে এক অবর্ণনীয় আতঙ্কের ছায়া। কৃশের মতো মানুষের সম্মুখে এক টেবিলে বসা মানে যে স্বয়ং যমরাজের সঙ্গে পাশা খেলা, সেটা তারা মর্মে মর্মে উপলব্ধি করছে। কৃশের নির্লিপ্ত মৌনতা তাদের হাড়ের ভেতর পর্যন্ত কাঁপিয়ে দিচ্ছে; মনে হচ্ছে, এই বুঝি সেই মৌনতা ভেঙে কোনো এক কালবৈশাখী ঝড়ের তাণ্ডব শুরু হবে।
কৃশ চুরুটে একটা টান দিয়ে ধোঁয়াটা সরাসরি জহিরের মুখের ওপর ছাড়ল। ঠান্ডা গলায় বলল,
—'আমি মেক্সিকো থেকে এখানে বসে চুরুট ফুঁকতে আসিনি। আমার নতুন কনসাইনমেন্ট এই সপ্তাহের মধ্যেই চট্টগ্রাম পোর্ট থেকে ক্লিয়ার হতে হবে। তোমাদের এই করিডোর যদি ব্লক হয়, তবে মনে রাখিস, তোদের জীবনের রাস্তাও চিরতরে ব্লক হয়ে যাবে।
জহির আমতা আমতা করে বলল,,
—'বস, বর্ডার গার্ডরা ইদানীং খুব কড়াকড়ি করছে। তাছাড়া যে ড্রা*গ*সটা এবার আসার কথা, সেটার সাপ্লাই লাইন নিয়ে কিছুটা ঝামেলা...!
কৃশ হঠাৎ টেবিলের ওপর রাখা একটা ধারালো ছুরি তুলে নিয়ে আঙুলের ফাঁকে নাচাতে লাগল। তার চোখের মণি দুটো যেন আগুনের গোলার মতো জ্বলছে। সে হিসহিসিয়ে বলল,,
—'ঝামেলা শব্দটা আমার ডিকশনারিতে নেই। সাউথ এশিয়ায় আমার ড্রা*গস ডিলিংয়ের নেটওয়ার্ক আমি আরও বাড়াতে চাই। যারা বাধা দেবে, তাদের হাড় দিয়ে আমি আমার বাগান সাজাব। মনে রেখো, আমি কৃশ। আমি কালি দিয়ে নয় র*ক্ত দিয়ে ইতিহাস লিখি।
সায়েম মাথা নিচু করে বলল,,
—'জি বস, আমরা সব ব্যবস্থা করছি। কাল রাতের মধ্যেই মাল খালাস হবে।
দীর্ঘক্ষণ ধরে চলল ডিলিংয়ের নানা খুঁটিনাটি আলোচনা। কৃশ খুব সূক্ষ্মভাবে হিসেব বুঝে নিচ্ছিল। কোটি কোটি টাকার লেনদেন আর প্রাণের ঝুঁকির এই খেলায় সে এক পাকা খেলোয়াড়। প্রায় ঘণ্টা দুয়েক পর যখন ডিলাররা ঘামতে ঘামতে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল, তখন পুরো ঘরে আবার সেই থমথমে নীরবতা ফিরে এল।
কৃশ ক্লান্তভঙ্গিতে পেছনের ইজি চেয়ারটায় গা এলিয়ে দিল। তার শরীরের ট্যাটুগুলো ঘরের মৃদু আলোয় এক অদ্ভুত রহস্যময়তা তৈরি করছে। সে চোখ বন্ধ করে কিছুক্ষণ ঝিমোল। কিন্তু তার মস্তিষ্কে এখন ড্রাগস ডিলিংয়ের চেয়েও বড় এক অস্বস্তি ঘুরপাক খাচ্ছে। সেই মেয়েটা!
সে দরজার দিকে না তাকিয়েই ডাকল, —'রাহুল!
তার বিশ্বস্ত বডিগার্ড রাহুল ভেতরে এসে মাথা নিচু করে দাঁড়াল। কৃশ চোখ না খুলেই জিজ্ঞেস করল,,
—'সেই মেয়েটার কোনো খবর পেলি? স্পাইরা কী বলছে?
রাহুল কিছুটা ইতস্তত করে বলল, —'বস, আমরা ট্রাই করছি। কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্ভারে আর ওই এলাকার জ্যামারগুলোতে কিছুটা সমস্যা হচ্ছে। হ্যাকাররা এখনো তার বর্তমান সঠিক লোকেশনটা পিনপয়েন্ট করতে পারছে না। শুধু এটুকু শিওর যে, সে হলের ভেতরেই কোথাও আছে।
কৃশ হুট করে চোখ মেলল। তার দৃষ্টিতে এক ধরণের বিদ্রূপের হাসি। সে নিচু গলায় বলল,,
—'আর ইউ ফাকিং কিডিং উইথ মি?ঢাকা ভার্সিটির একটা মেয়েকে ট্রেস করতে তোর হ্যাকারদের ঘাম ছুটে যাচ্ছে? শী ইজ প্লেয়িং হাইড অ্যান্ড সিক উইথ দ্য ডেভিল, ইন্টারেস্টিং!বাট রিমেমবার ইট রাহুল, আমি কিন্তু হারতে পছন্দ করি না!
রাহুল কাঁচুমাচু হয়ে বলল,,
—'আসলে বস, এখানকার লোকাল নেটওয়ার্ক খুব আনপ্রেডিক্টেবল। তবে আমরা প্রায় কাছাকাছি পৌঁছে গেছি।
কৃশ চেয়ার থেকে উঠে জানালার দিকে এগিয়ে গেল। পর্দা সরিয়ে দেখল ঢাকার ঘিঞ্জি রাস্তা। মনে মনে বিড়বিড় করল
—'মাই ব্রেইব লেডি... তোমার এই লুকোচুরি খেলা আর বেশিক্ষণ চলবে না। আমি চলে এসেছি। খুব শিগগিরই তোমার সেই দুর্ধর্ষ সাহসের শেষটা আমি নিজের চোখে দেখব। ডেড অর এলাইভ—ইউ আর মাইন!
★
ঢাকার হৃদপিণ্ডে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে সেই বিশাল বিপণিবিতান—এক আধুনিক কেল্লা বললেও ভুল হয় না। কাঁচ আর ইস্পাতের এক সুউচ্চ ইমারত সেটি। ভেতরে প্রবেশ করতেই হিমশীতল বাতাসের ঝাপটা আর দামী সুগন্ধির এক মিশ্র আঘ্রাণ নাকে এসে লাগে। ওপরের দিকে তাকালে চোখ ধাঁধিয়ে যায়; কয়েক তলা জুড়ে ঝুলে থাকা বিশালাকার ঝাড়লণ্ঠনগুলো থেকে ঝরছে স্নিগ্ধ আলোর বৃষ্টি। প্রতিটি তলার অলিন্দে বিচিত্র সব বিপণীর পসরা—কোথাও বিলেতী পোশাকের ঔজ্জ্বল্য, কোথাও আবার দামী মণিরত্নের ঝিলিক।
চলমান সিঁড়িগুলো নিরন্তর মানুষের স্রোত নিয়ে ওঠানামা করছে, যেন এক যান্ত্রিক গঙ্গা বয়ে চলেছে এই কাঁচের প্রাসাদের অন্দরে।সবচেয়ে ওপরের তলায় আয়না দিয়ে ঘেরা সুসজ্জিত এক প্রসাধন-কক্ষ। সেখানেই আজ অয়ন্তিকাদের আস্তানা। তার প্রাণের সখী ইরার বিয়ে, সেই উপলক্ষেই সখীদের এই মহাসমারোহ। চারদিকে রূপটানের হাজারো আয়োজন—কেউ গালে রঙের ছোঁয়া দিচ্ছে, কেউ বা কেশবিন্যাসে মগ্ন। অথচ এই সাজসজ্জার ভিড়ে অয়ন্তিকা যেন এক সম্পূর্ণ ব্যতিক্রমী ছবি।
সে কোনো উগ্র প্রসাধনী দিয়ে নিজের সহজ রূপকে আড়াল করেনি। তার তন্বী দেহকে জড়িয়ে রেখেছে একখানা আকাশে নীলরঙা শাড়ি। প্রসাধনী বলতে চোখে গাঢ় করে আঁকা এক টানে কাজল;ঠোঁটে কিঞ্চিৎ রাঙা রঞ্জক; যেন ফাল্গুনের প্রথম পলাশটি তার ওষ্ঠে এসে আশ্রয় নিয়েছে। তার হাঁটু ছাড়িয়ে নেমে আসা সেই মেঘবরণ লম্বা চুলগুলো আজ অবাধ্য হয়ে উড়ছে।
সেঁজুতি, আরু,রুহি সহ বাকি বান্ধবীরা তাকে টিটকিরি কেটে বলল,,
—'বুঝলাম তুই একটু সুন্দর, তাই বলে আমাদের অসুন্দর প্রমাণ করার জন্য সাজবি না?
আয়ন্তিকা বিরক্তিতে চোখ কুঁচকে বলল,,—'আরে ধুর! আমার সাথে যায় না। মুখে কিছু দিলেই পিম্পলস ওঠে।
আরু মুখ বাকিয়ে বলল,,—'নাটক কম করো পিও। বুঝি বুঝি সব বুঝি।
আয়ন্তিকা মুখ বাঁকিয়ে বলল,,—'ঢং না করে বের হবি তোরা। বিয়ে তো তোদের মনে হচ্ছে। দেখা গেল তাদের সেজেগুজে বের হতে হতে ইরা বেচারি বিয়ে বুড়ি হয়ে গেল।
রুহি: হ্যাঁ হ্যাঁ চল।হয়ে গিছে আমাদের এভাবে অপমান করার কিছু নেই।
সেঁজুতি: হুম।চল। কিন্তু এই আয়ু তুই দাঁড়া।
সব কয়টা মিলে বের হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলো। হুট করেই অায়ন্তিকা থমকে দাঁড়ালো সেঁজুতির কথায়। প্রশ্নাত্মক দৃষ্টিতে তাকাতেই সে যদি কোত্থেকে যেন একটা রক্ত লাল জবা এনে গুঁজে দিল আয়ন্তিকার কানের পেছনে চুলের ভাঁজে। অতঃপর দু'চোয়ালে হাত ঠেকিয়ে বলল,
—'আভি লাগতি হে পারফেক্ট! কি ঝাক্কাস মাইরি, আমি তো নিজেই তো তোর উপর ক্রাশ খাচ্ছি আয়ু।
আয়ন্তিকা মুখ বাঁকিয়ে বলল,,—'তুই কেমিস্ট না হয়ে মেকআপ আর্টিস্ট হলে ভালো করবি। না মানে সাজাতে ভালো না পারলেও পাম মেরে মানুষের মন ভরাতে পারবি। চল এখন ।
বলেই বেরিয়ে গেল অায়ন্তিকা ।পেছন থেকে সেঁজুতি মুখ বাঁকিয়ে বলল,,--'ত্যাড়ামির জন্য যদি কোন দেওয়া হতো তাহলে নিঃসন্দেহে সেটা তুইই পেতিস।
আয়ন্তিকা বেরিয়ে যেতে যেতে বলল,,--'হ্যাঁ এখন আয়।
★
অয়ন্তিকা আর তার দল বল সবে নিচ তলার উদ্দেশ্যে নামছিল ।এদিকে কৃশ তার দলবল নিয়ে সেই বিশাল অট্টালিকার গোলকধাঁধা পেরিয়ে বেরোচ্ছিল। তার পরনে কালো পোশাক, চোখেমুখে সেই হিমশীতল কাঠিন্য। ঠিক লিফটের সামনের জংশনটায় যখন দুই স্রোতের মিলন হলো,তখনই ঘটল অঘটন। ভিড়ের চাপে আর দ্রুত গতির অসতর্কতায় কৃশের সুঠাম দেহের সঙ্গে অয়ন্তিকার সজোর ধাক্কা লাগল। অয়ন্তিকার হাতের মুঠো থেকে তার প্রিয় ফোনটি ঠিকরে গিয়ে পড়ল মেঝের কঠিন পাথরে।
অয়ন্তিকা আর্তনাদ করে ওঠার আগেই কৃশের দেহরক্ষীরা গ্রাহ্য না করেই বুটের তলায় সেটাকে পিষে দিয়ে গটগট করে এগিয়ে চলল। ফোনটার দশা তখন জীর্ণ কঙ্কালের মতো।অয়ন্তিকার বিস্ময় নিমেষেই ক্রোধের অগ্নিশিখায় রূপ নিল।সেই বিশাল শপিং কমপ্লেক্সের রাজকীয় অলিন্দ পেরিয়ে সে দ্রুত পায়ে ওই কালো পোশাকের মানুষটার পিছু নিল সে। পিছন থেকে আরু রুহি সেঁজুতি চেঁচিয়ে চলেছে কিন্তু সেদিকে হেলদোল নেই অায়ন্তিকার। কেন ফোনটা তার বড্ড শখের ছিল, তাই এর ভঙ্গনকারীকেও যথাযথ শাস্তি দিবে সে। সেই উদ্দেশ্যেই সে এগিয়ে চলল অজ্ঞাত মানবটার পিছু পিছু।
কৃশ দীর্ঘ পদক্ষেপে এগিয়ে যাচ্ছে, আর তার পেছনে তন্বী আয়ন্তিকা যেন এক নাছোড়বান্দা শিকারি। লোকগুলো ভিড় ঠেলে নিচে নামছে, পার্কিংয়ের দিকে এগোচ্ছে— আয়ন্তিকাও ছাড়বার নয়। শাড়ির আঁচলটা সামলে নিয়ে সে একরকম প্রায় দৌড়েই তাদের নাগাল ধরল সদর দরজার কাছে।একেবারে শেষ মুহূর্তে কৃশের পথ আগলে দাঁড়িয়ে আয়ন্তিকা উচ্চকণ্ঠে বলে উঠল,,
—'এই যে মিস্টার! কানে কি তুলো গুঁজে রেখেছেন? নাকি দুনিয়াটাকে নিজের বাপের সম্পত্তি মনে করেন?
কৃশ থমকে দাঁড়াল। তার ইশারায় বডিগার্ডরা মুহূর্তেই যান্ত্রিক পুতুলের মতো স্থির হয়ে গেল। সে ধীরলয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল। দেখল, তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানবাটিকে। এদিকে কৃশের তীক্ষ্ণ দৃষ্টিকে অবজ্ঞা করে আয়ন্তিকা ফোনের ভাঙা অবশেষটা উঁচিয়ে ধরে বলল,,
—'আপনার ওই জলহস্তির মত সাঙ্গোপাঙ্গরা আমার ফোনটা ভেঙে তছনছ করে দিয়ে গেল,আর আপনি দিব্যি মডেলের মতো ক্যাটওয়াক দিয়ে চলে যাচ্ছেন? ভাবছেনটা কী শুনি? ফোনটা কি গাছের পাতা যে ছিঁড়লাম আর হয়ে গেল? এটার ইএমআই দিতে দিতে আমার জান কয়লা হয়ে যাচ্ছে, আর আপনাদের হাতির মতো পা ওটার ওপর দিয়ে ডলে দিয়ে চলে গেলেন! ক্ষমা চাওয়া তো দূর, মনে হচ্ছে যেন মশা মেরেছেন! ঠিকমতো ফোনের ক্ষতিপূরণ দিয়ে তারপরে এখান থেকে নড়বেন, নয়তো...!
আয়ন্তিকা পরবর্তী কথাটুকু মনে না করতে পেরে থামলো। কিন্তু তার এমন কাণ্ডে কৃশ স্তম্ভিত। মেক্সিকোর ড্রা*গ লর্ড থেকে শুরু করে ঢাকার আন্ডারওয়ার্ল্ড— সবাই যার চোখের ইশারায় থরথর করে কাঁপে, আজ এক সাধারণ তরুণী তার সম্মুখে আঙুল উঠিয়ে কথা বলার মত সাহস দেখাচ্ছে! সে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে অয়ন্তিকার মুখের দিকে চাইল। কাজল কালো মেয়েটির আঁখিজোড়া। ঘন কালো কেশরাজ, যেখানে গাঁথা একখানা রক্ত জবা।ঝগড়া করার সময় মেয়েটার নাকের নথটা কাঁপছে, কপালে জমেছে বিন্দু বিন্দু ঘাম, আর তার রাঙা ঠোঁট দিয়ে তুবড়ির মতো ঝরছে শাসনের বাণী।
কৃশ দেখল, রাগের মাথায় মেয়েটাকে কি অদ্ভুত সুন্দর লাগছে! তার প্রতিটি বাচনভঙ্গি যেন এক একটি ছন্দের ঝংকার। রাগের আগুনে রূপ যেন আরও ফেটে পড়ছে। কৃশের মনে হলো, এই মেয়েটি কেবল মানবী নয়, এ যেন এক জীবন্ত অগ্নিশিখা; যা শীতল মানুষকেও দগ্ধ করতে জানে। সে মন্ত্রমুগ্ধের মতো অয়ন্তিকার এই প্রগলভতা দেখতে লাগল। এক অদ্ভুত সঙ্গাহীন অনুভূতি; তার পাথুরে হৃদয়ের গহীনে চুঁইয়ে পড়তে লাগল।
বাঁকা হেসে সে বলল,,—'নয়তো?
—'নয়তো আপনাকে জ্যাম বানিয়ে ব্রেডের সাথে খেয়ে নিব!
কৃশ ধূর্ত কন্ঠে কিছু বলার আগেই পাশ থেকে একটা বডিগার্ড কিছুটা চমকে আয়ন্তিকার উদ্দেশ্যে কিছুটা ধমকের স্বরে বলল,,
—'এই মেয়ে এই? তুমি জানো কার সাথে কথা বলছো ইনি হচ্ছেন ক...!
বাকি কথা শেষ করতে পারল না ছেলেটা। আয়ন্তিকা তাকে উল্টো ধমকে বলল,,
—'কি করিম নাকি? সে যাই হোক করিম-রহিম যা ইচ্ছা! আমার ফোন ভেঙেছেন টাকা দিন। নইলে এক পা নড়তে দিব না।
কৃশ এক ভ্রু উঁচিয়ে বলল,,—'ড্যাম! ব্রেড দিয়ে জ্যাম খাওয়ার আইডিয়াটা মন্দ না, তবে আমি মানুষটা বড্ড বেশি স্পাইসি, হজম করতে পারবে তো? দিস ইজ মাই কার্ড। নতুন আইফোন বা আইল্যান্ড, যা কিনতে মন চায় কিনে নিও, বিল আমি পে করব। বাট রিমেম্বার ওয়ান থিং সুইটহার্ট, আমার দেওয়া কোনো কিছুর ঋণ কিন্তু আমি কড়ায়-গণ্ডায় উসুল করি। সো, বি কেয়ারফুল হোয়াট ইউ আর আস্কিং ফর!
অয়ন্তিকা কিছু বলার সুযোগ পাওয়ার আগেই কৃশ তার কানে মুখ ঠেকিয়ে ফিসফিস করে ফের বলল,,
—'তোমার কানের পেছনের ওই রক্তজবাটা বড্ড বেশি সুন্দর, জাস্ট লাইক ইওর অ্যাটিটিউড। সি ইউ সুন, মাই ফায়ারি লেডি!
কথাটা বলেই সে হেচকা টানে আয়ন্তিকার কানে গুঁজে রাখা রক্ত জবাটা নিজের মুঠোয় নিল।আর এক মুহূর্ত ব্যায় না করছ তার দলবল নিয়ে উদ্ধত ভঙ্গিতে চলে গেল। আয়ন্তিকা কার্ড হাতে নিয়ে সেখানে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে আছে, রাগে আর বিস্ময়ে তার মুখ দিয়ে কথা সরছে না। পিছন থেকে সেঁজুতিরা এসে তাকে আলতো ধাক্কা দিয়ে বলল,,
—'হাবা কোথাকার! ও সব লোকের সাথে কেউ ঝামেলায় জড়ায়! নিশ্চিত কোন বড় ব্যক্তিত্ব দেখলি না সাথে কতগুলো বডিগার্ড! আর ওগুলো কি ভ"য়ং*কর দেখতে!
তাদের পাশ থেকে আরু বললো,,----'ভ"য়"ঙ্ক'র কই দেখলি তুই? আমি তো বরং লোকটার উপর ক্রাশ খাইছি! কি দেখতে মাইরি! তার উপর কথার স্টাইল, উফস। হাই মেরা দিল!
আয়ন্তিকা বিরক্তিতে বলল,,---'তোরা এখানে দাঁড়িয়ে ওই লোকের বায়োডাটা চেক করবি নাকি যাবিও। হাঁদা ভোঁদা দেখতে পারে নাকি আবার ভাল লাগছে এদের!
রুহি অয়ন্তিকার হাতের কার্ডটার দিকে তাকিয়ে চোখ টিপে বলল,,
—'বললেই হলো? তুই চিলি চিকেন পছন্দ করিস না বলে কি চিলি চিকেন খারাপ হয়ে যায়? স্বীকার কর না যে লোকটা জাস্ট আগুন ছিল! তোর তো বরং খুশি হওয়া উচিত, ভাঙা ফোনের বদলে আইফোনের অফার পেয়ে গেছিস। ওই যে বলে না সবুরে মেওয়া ফলে, তোর ক্ষেত্রে সবুরে আইফোন ফলল!
আয়ন্তিকা দাঁত কিড়মিড় করে বলল,,
—'রাখ তোর আইফোন! লোকটা অসভ্যের একশেষ। আমার কানের জবাটা নিয়ে গেল কোন সাহসে? আর তুই কি ভাবিস আমি ওই লোকের টাকায় ফোন কিনব? আমি অয়ন্তিকা, কারও দয়ায় চলি না। চল এখন এখান থেকে, কালকের মধ্যে ফোন ঠিক না করলে মামি আমার হাড় মাংস আলাদা করে ফেলবে।
বান্ধবীদের সাথে গটগট করে হাঁটতে হাঁটতে শপিং মল থেকে বেরিয়ে এল অয়ন্তিকা। কিন্তু মনের ভেতরটা যেন কোনোভাবেই শান্ত হতে পারছে না। বাইরের ভ্যাপসা গরমের চেয়েও তার বুকের ভেতর এক অজানা অস্বস্তি দলা পাকিয়ে উঠছে।
চলবে........
(বাসায় পিকনিক আর আমি গল্প লিখতেছি তারপরও যদি তোমরা রেসপন্স না করো😒1k কমপ্লিট কর তাহলে পরবর্তী পর্ব পাবে, নইলে দিব না 😼)