এক
“বইয়া বইয়া কি করস? চল যাই আহিররারে ডাইকা লইয়াহি।”
লিটন নামের ছোট বাচ্চার কণ্ঠে ফিরে তাকালো জহির।হাতে বাটুল আর ময়লা মাটিমাখা প্যান্টের পকেটে মার্বেল। লিটনের কথার সায় দিয়ে বলল,
“চল যাই। খাড়া গুল্লিডি রাইকখা যাই। চাচায় দেখলে গাইলাইবো।”
লিটন অপেক্ষা করলো ততখনে জহির মার্বেলগুলো জড়ো করে একটা জায়গায় রেখে দিলো। তারপর দুইজনে টায়ার বাড়ি দিয়ে ঘুরাতে ঘুরাতে দৌড়ে চলল মির্জাবাড়ির দিকে। মধ্যাহ্নের সময়। বিকেল হতে বেশ কিছু সময় দেরি।মির্জাবাড়ির পেছনে একটা মোটামুটি আকারের নিমগাছ। গাছের ছায়া তাপদাহ প্রতিরোধ করারজন্য তাকে কাটা হয়নি। পা টিপে টিপে পশ্চিম দিকের ঘরের একটা জানালার সামনে গিয়ে দাঁড়ালো দুজন। জানালা ভেদ করে উঁকি মারলো ঘরের ভেতর৷ উজ্জ্বল চামড়ার একটি শিশুপুত্র। ওদেরই সমবয়সী। গালে হাত দিয়ে বসে আছে। সামনে পর আছে বই। ভর দুপুরে পড়তে বসে ঝিমুচ্ছে বেচারা। জহির ফিসফিস করে ডাকলো,
“আহিররা? আরে অয় আহিররা?”
“এই তরা এইহানে কি করস?”
কারো কণ্ঠে হিম হয়ে গেল দুজনেই৷ ঘাড় ফিরে পেছনে তাকাতেই নজরে পরলো তাদেরই এক বান্ধবী বিন্তি। দুইদিকে লম্বা দুটো বেনী করে রেখেছে। নাকে সদ্য বসানো সোনার বালি। কানেও গোল গোল হালকা অলংকার। হাতে দুটো কাঁচের চুড়ি। মেলা থেকে এনে দিয়েছিলো ওর বাবা। লিটন বলল,
“অহঃ তুই? দেখনা আহিররারে ডাকপার আইছি। হেইয়াতো ঘুমাইতেছে।”
বিন্তি উঁকি মেরে ভেতরে তাকালো। একই দৃশ্য দর্শন করে কোমরে হাত গুজে অভিজ্ঞের ন্যায় বলল,
“ এমনে ডাকলে হইবো নাকি? সর আমি ডাইকা দেই।”
“এই না না। জুড়ছে ডাকিসনে। অর দাদিয়ে এহনো জাগনা। টের পাইলে গাড়াইবো।”
“ আরে চেচামু না। সর।”
বিন্তি নিজের শাড়ির খুট থেকে টেনে বের করলো অজ্ঞাত এক ফল। গ্রাম বাংলাতে কাঠলিচু বলে চেনা যায়। জহির আর লিটন হা করে তাকিয়ে অপেক্ষায় রইলো বিন্তির পরবর্তী পদক্ষেপ দেখার জন্য। জানালার কাছে একটু এগিয়ে গিয়ে কাঠলিচুটা আস্তে করে ছুঁড়ে মারলো বিন্তি। কাঠলিচুটা একদম আহিরের গায়ে গিয়ে লাগলো। ঘুমের ঝুলে ঝিমুতে থাকা আহির চমকে উঠলো। জানালার কাছে বন্ধুদের দেখে এগিয়ে এলো। ফিসফিসিয়ে বলল,
“তরা এইহানে কি করস? আমারে মারতাছস ক্যান?”
জহির জিজ্ঞেস করলো, “দাদিয়ে ঘুমায়নাই?”
“হ। গেছে গা,দুনিয়াত নাই।” ফিসফিসিয়ে চলছে সাওয়াল জওয়াব।বিন্তি বলল,
“আস্তে কইরা বাইরায়া আয়।খেলমু। মৌটুসী রেও ডাকছি। শ্যামলীরাও আইছে। আয়।”
আহির প্রথমে ভিষণ খুশি হলো। তারপর বলল,
“আব্বায় যুদি পিডায়?”
“সন্ধ্যার আগে আইয়া পরিস। আয় রে ছেড়া।”
“ওইহানেই খাড়া। আইতাছি।” বলেই বইপুস্তক গুটিয়ে ফেলল সে। সামনে ফেলে রাখা সাদা গেঞ্জিটা তুলে চট করে গায়ে পরে নিলো। একবার তাকিয়ে দেখে নিলো পাশে শোয়া দাদি আসলেই ঘুমিয়েছে কিনা। অতঃপর দরজা খুললে শব্দ ভেবে জানালা টপকে বাইরে বেরিয়ে এলো। ওপার থেকে লিটন আর জহির ওকে ধরলো যাতে পরে না যায়। অতঃপর লাগালো ছুট। সে এই না সেই ছুট। ভিষণ ছুট! এক ছুটে মির্জাদের বাগান পেরিয়ে গেলো। ক্ষেতের মধ্যে দিয়ে দৌড়ে চলে গেলো সারদা নদীর দিকে। এ আনন্দ কোনো বিশ্বজয়ের চে কম নয় বইকি। পথের মধ্যে দু’টা শুকনো বিরাট সুপারি পাতা ঢসে পড়লো গাছ থেকে। আহির আর লিটন গিয়ে দৌড়ে ধরলো সেটা। বিন্তি বলল,
“আমি আহিরের গাড়িত চড়মু।”
মৌটুসী বলল,
“আর আমি লিটুর।”
জহির ওদের তুলনায় একটু রোগা পাতলা। কিন্তু ও একা পরে গেলো৷ মুখ বেঁকিয়ে বলল,
“আমারতো কোনো জোড়া নাই। শ্যামলী আমারে টানা পারবোনা। আমিও ওরে টানা পারুম না।যে মোডি!” আহির জহিরকে একটু বেশিই ভালোবাসে। সমবয়সী পিঠাপিঠি চাচাতো ভাই। বাপ চাচার মধ্যে মিল না থাকলেও এদের মধ্যে গলাধরা বন্ধুত্ব! আহির মাজায় হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে বলল,
“জহিররা, যা তুই বিন্তির পিছে ব। আমি টানমু তরে।শ্যামলী তুই আমার লগে টান।”
জহির খুশিখুশি এক লাফে বিন্তির কাঁধে হাত রেখে বসে পরলো। শ্যামলী আর আহির দুজনে কটা পত্রশিখা ভাগাভাগি করে টেনে নিতে শুরু করল। বাচ্চাদের হাসিখুশি খেলতে দেখে গাল টেনে হাসলেন মোল্লা মাস্টার। সঙ্গে ভাইপো জয়নাল মোল্লা কে নিয়ে বাড়ির পথে যাচ্ছিলেন তিনি। টানতে টানতে হাঁপিয়ে বসে পরলো ওরা। গাছের ছায়াঘেরা সারদার ঘাট। বাড়ির বউয়েরা জল নিতে ব্যাস্ত। এখনো ঘরে ঘরে টিউবয়েল প্রচলিত হয়নি। সুদখোর নেতারা টিউবওয়েল স্হাপন করতে দেয়নি। দুটো ঘোড়ার গাড়িতে করে ব্রিটিশ মানবদের উত্তরদিকে যেতে দেখা যাচ্ছে। খেলতে খেলতে বেলা বিকেলে গড়ালো। মার্বেলেলের আঘাতে চিহ্ন পরছে মাটিতে। সেন্ডেলতোলা খেলায় জিতে গেলো জহিরের দল। তারপর একে একে লাইন ধরলো মেয়ে দুটোকে বসিয়ে। একে একে ছড়া কেটে লাফদিতে ধরল ওদের হাতের ওপর দিয়ে।
আপেল শক্ত, বেদানার রক্ত
মিষ্টির ঝোল, কপাকপ তোল।
ও ডিসকো ভাবি
পিঠা বানাতে যাবি,
কাজলা দিদির বিয়ে,
কচকো সাবান দিয়ে
কচকো সাবান ভালোনা,
দিদির বিয়ে হলোনা
এই দিলুম একলাফ!
পুরোটা বিকেল প্রায় এভাবেই শেষ হলো। শেষ দানে লিটনের সঙ্গে একটা ঢের গন্ডগোল লেগে গেলো মৌটুসী আর জহিরের। শেষমেশ ক্লান্ত হয়ে গাছের নিচে বসে পরলো সবে মিলে। একটু পরই
বিন্তি আহিরের দিকে তাকিয়ে বলল,
“আহিররা, তোর ঘাড়ে মাকড় পরছে ঝাড়ি মার।”
আহিরের ঘাড়ের ওপরে এসে পরা মাকড়শাটাকে ঝাড়ি মেরে ফেলে দিলো জহির। ছোট্ট মিষ্টি গৌরি কে নিয়ে ওদের দিকেই এগিয়ে আসছে শ্যামলী। শ্যামলীর জেঠাতো বোন গৌরি৷ হাটতে আর দৌড়তে শিখেছে কিছুদিন শ্যামলীকে ডেকে গৌরিকে নিয়ে যেতে বলল ওর ঝেঠিমা। ওর পড়নে টুকটুকে লাল শাড়ি। বিন্তি ধুপ করে বলে বসলো চল বিয়া বাড়ি খেলমু। দূরে দেখা গেলো মিন্টু পাগলের দুইবোন ফাতিমা আর রুকাইয়া কে। মিন্টু জন্মগ্রহণ করেছে প্রতিবন্ধী মতোন। তাই ওর নাম পরেছে মিন্টু পাগল। গলা ফেঁড়ে ডাকলো বিন্তি।
“ও-ই ফাতিমা, রুকু, এমমে আয়। বিয়াবাড়ি খেলুম।”
চোখে দেখতে যেটুক দেরি। এমনিতেও আসতে দেরি করেছে ওরা। ঝড়ের বেগে বেনী উড়িয়ে ছুটে এলো ওরা। বিন্তির জেঠুতো বোন বুনোলতাও এসেছে। বয়সে একদিনের ছোট সে। বিন্তি বাইরে আসাযাওয়া করতে পারলেও বুনোলতার বাবা তাকে বাড়ি থেকে খুব একটা বের হতে দেয়না। বিন্তির সহযোগিতায় যা একটু আসতে পারে। মোটামুটি একটা ছোটখানো সভা জমা হলো সেখানে। ফাতিমা, রুকাইয়া, আহির, জহির, লিটন,গৌরি, বিন্তি,বুনোলতা, মৌটুসী, শ্যামলী। দশজনে মিলে গোল করে বিয়ের পিড়ি সাজালো। বিন্তি গৌরীর মাথায় আঁচল তুলে বলল,
“আইজ আমগো বউ হইবো পুচকি সুনা। কিন্তু বর কেডা হইবো?”
আহির আর লিটন ঝাপিয়ে এলো,” আমি হবো।” বিন্তি বলল, “আহিররার বাইচ্চা তুই একটা টেম্পু। তর বর সাজন লাগতোনা। লিটু তুই বয়।”
লিটনঝুপ করে বসে পরলো। গৌরী মিটমিট করে হাসছে। বুনো,শ্যামলী,ফাতিমা আর রুকাইয়াও ততখনে ফুলপাতা নিয়ে এসে বিয়ের মন্ডপ সাজিয়ে ফেলল। গৌরী ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে দেখে লিটন ওর মাথার ঘোমটা ঠিক করে দিয়ে বলল,
“ল, তরে আমার বউ বানামু। লাল টুকটুকি বউ। হেরপর তরে খুব আদর করমু ।ফুল দিয়া চুল সাজাইয়া দিমু।লাল নীল চুড়ি পিন্দাই দিমু।বুজছাও সুনা?”
জহির চেঁচিয়ে উঠলো,
“হ, আব্বাও আম্মারে চুল বাইন্দা দেয় আমি দেকছি।আমিও বড় হইলে আমার বউয়ের চুল বাইন্দা দিমু।”
গৌরী কিছু বুঝলোনা। জহিরের বলার ভঙ্গিতে হাসলো ঠোঁট চেটে। সবার মধ্যে খিলখিলি হাসি ছড়িয়ে পরলো।শ্যামলী ওকে নিয়ে বসিয়ে রাখলো। ততখনে বুনোলতা আর বিন্তিলতা ফুলের মালা বানিয়ে ফেলেছে। ফাতিমা একগোছা পাতা নিয়ে এসে ফেলে বলল,
“এইযে, অগ্নিকুন্ড।”
“আর এইযে সিন্দুর।” এক মুঠ মাটি এনে বলল মৌটুসী। নিজেরা নিজেরাই গান গেয়ে ছড়া কাটতে কাটতে বর কনের চারপাশে ঘুরতে রইলো।বিকেলের বাতাসে ক্লান্ত হচ্ছে না কেও। যেদিনই এই বিয়ে বিয়ে খেলা হয় চারপাশে বাচ্চাদের ধুম পরে যায়। গ্রামের বড় ব্যাপারী মোহনলাল মুখার্জির ছেলেদুটোই যা আসেনা। ওদের বাড়ির দীপা আসে কিন্তু খুব কম। ওই মাঠের আইলের ধার দিয়ে এগিয়ে চলছিলেন নুরাজান বেগম। বাচ্চাদের দেখে হেসে ফেললেন। মাটিকে সিঁদুর বানিয়েছে। ওদের মনে কোনো প্যাচ নেই। নেই অমঙ্গলের চিন্তা। নেই ধর্মের আর গোত্র বর্ণের ভেদাভেদ৷ গাছের সাথে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে দেখছিলেন কিছুক্ষণ। অতঃপর ফাতিমা আর রুকুকে সঙ্গে করে নিয়ে বাড়ি চলে গেলেন তিনি। শ্যামলী আর গৌরী কেও তাড়া করতে এলো ওদের দিদি ঠাকুমা। সন্ধ্যা হয়েছে। বিয়ের মন্ডপ সেখানেই পরে রইলো। যে বাড়ির দিকে দৌড়লো৷ জহির বিন্তি আর বুনোলতা একসঙ্গে বাড়ি ফেরে। জহিরের সঙ্গে বাড়ির পথে বাড়াবার সময় বিন্তি আহিরকে মনে করিয়ে দিলো,
“আহিররা, আইজ তো তর ভাইজান আওনের কথা।”
আহিরের যেন টনক নড়লো। ওকে চমকাতে দেখে জহির বলল,
“অন্তিম ভাইজান আইবো? এই লাইগাই দাদি বুড়ি আইজ লাঠি নিয়া দৌড়ানি দেয়নাই।চাচায়ও আইয়েনাই।”
আহির উঠে দাঁড়ালো। বলল,
“আরে আমার ভাই আইবো। ভাই আইবো,চলি রে বিন্তি।এলুম লিটু!”
বলতে বলতেই ছুট লাগালো সে। খেলার মন্ডপ ভঙ্গ হলো সেদিনের মতো।আকাশে গোধূলি সাজতে ধরেছে।গগনের রঙ ক্রমাগত রক্তাক্ত হয়ে উঠছে। সাজছে নিজ মতো।আহির ছুটতে ছুটতে বাড়ি ফেরার পথে দৌড়ে এলো। আইলের ওপর দাঁড়িয়ে দেখলো একটা গরুর গাড়ি হেলেদুলে এসে থামলো। একছুটে চলে গেল আহির। গাড়ি থেকে নামলো তার বড় ভাই। অন্তিম মির্জা। সেও বালক। শহরে পড়াশোনা করে। এই বয়সেই মাশাল্লাহ কোরআন মুখস্ত করে ফেলেছে সে। আহির গিয়ে দাঁড়ালো তার সামনে। গাল টেনে চমৎকার একটা হাসি উপহার দিলো ও। অন্তিম ওর মাথায় হাত বুলিয়ে বলল,
“কিরে আহিররা, আইজ এত আগেই টের পাইছোস?”
“হ ভাই। আইয়া খাড়ায় আছিলাম।”
অন্তিম উবু হয়ে আহিরের হাত ধরে হাতে লাগা ধুলো পরিষ্কার করে দিচ্ছিলো। আহির সরল মুখে জিজ্ঞেস করল,
“গঞ্জের থেন আমার লাইগা কি আনছো?”
“ তোর পছন্দের খেলনা লইয়াইছি। পছন্দের রঙের জামাও আনছি। খেলতে গেছিলি?”
আহির ওপর নিচে মাথা নাড়লো। যার অর্থ সে ভাইয়ের কাছে মিথ্যে কথা বলেনা।সত্যি স্বীকার করল। অন্তিম ওর হাত ধরে বাড়ির দিকে রওনা হলো। আহির বলল,
“জানো, আইজ একবারো দাদি দৌড়ানি দেয় নাই।”
“কেন?”
“মন কয় এহনো ঘুমাইতাছে।আইসো বাড়িত যাই। তারপর তুমার লাইগা লিচু আনছিলাম হেইডি দিমু তোমারে।”
অন্তিম আহিরকে পাঁজা কোলে তুলে নিলো।
“ওরে সুনা আমার রেহ! আইচ্ছা জনাব চলো বাড়িত যাই।”
আহির ভাইয়ের ঘাড় জড়িয়ে ধরলো। খিলখিল শব্দে এলোমেলো আর মুখরিত হলো চারপাশ।
বাড়ির কাছে পৌঁছতেই বাড়ির মধ্যে থেকে কান্নাকাটির রেশ পাওয়া গেল। রুম্পা ফুপু চিৎকার করে আব্বা বলে হাক ছেড়ে কাঁদছে। ভেতর থেকে আজাদ চাচা, আফসার ভাইয়েরও কণ্ঠ শোনা যাচ্ছে। অন্তিমের ভেতরটা আচমকা ঝাঁকি দিয়ে উঠলো। আহিরকে কোল থেকে নামিয়ে বাড়িতে ঢুকলো ও। বাড়ি ভর্তি লোকজন। পাড়াপড়শির ভীরে পা রাখার জায়গা নেই। কিছু ব্রিটিশ চৌকিদারেরও দেখা মিলছে।অন্তিমকে দেখে আরো জোড়ে হাহাকার জুড়ে দিলো দাদি। রুম্পা ফুপু অন্তিমের প্রায় সমবয়সী। অন্তিমের আব্বাকে জড়িয়ে বসে কাঁদছে সে। উঠোনের মধ্যে একটা খাটিয়া তাতে শুইয়ে রাখা হয়েছে অন্তিমের দাদাজান কে। লাশ দেখে ভেতরটা মুচড়ে উঠলো ছেলেটার। কাধ থেকে ব্যাগ পরে গেল। প্রথমে বিশ্বাস হচ্ছিল না। অতঃপর রুম্পা ফুপু এসে ওকে জড়িয়ে ধরলো আর অন্তিম নিজেও হাহাকার করে কাঁদতে শুরু করলো৷
“ওরে তোরা আমারে গঞ্জে পাডাইয়া আমারে দাদাজানরে মাইরা দিলি রে!”
আহির, জহির, অন্তিম মির্জার দাদাজান মির্জা আক্কাস আলী কে গলা কেটে হত্যা করেছে কেও। এই খুনের আসামী কে তা কেও জানেনা। তিনিতো মির্জাপীর আক্কাস আলী৷ তাকে হত্যা করার মতো মহাপাপ কে করতে পারে! অন্তিমকে জড়িয়ে ধরে দাদিজানও কান্নাকাটি শুরু করলেন।
দাদাজানকে মাটি দেয়া হলো আজ দুদিন। দাদি ঠিকঠাক করে খাচ্ছেন না ঘুমাচ্ছেন না। থেকে থেকে জীবনসঙ্গী বিয়োগবেদনায় আর্তনাদ করছেন। কাঁদতে কাঁদতে জ্বর চলে এসেছিলো রুম্পার। সেদিন সন্ধ্যেবেলায় বাড়িতে কিছু ব্রিটিশ মানুষ আসলো। একজনের বুকের ওপর পোশাকে খোদাই করা জন কেইফার। আরেকজনের নাম টেলর আর অন্যজন রবার্ট। রবার্ট এর তুলনায় কেইফারের বয়সটা একটু কম।তারা এসেছিলেন মির্জা আক্কাস আলীর সঙ্গে কথা বলতে। মির্জা আব্বাস বাড়ির কর্মীদেরকে ডেকে বলল, সাহেবদের জন্যি চা বানাইস। আব্বাস তখন তাগড়া জোয়ান মর্দ৷ গ্রামের সবাই তাদের ধর্মগুরু পীর সাহেবকে হারিয়ে প্রায় মনমরা। গ্রামের বড়বড় বিজ্ঞ ব্যাক্তিরা জানালো আব্বাসকে এবারে পীরের আসনে বসানো হোক। যেহেতু পূর্বের পীর মৃত্যু বরণ করেছে। উপস্হিত ব্রিটিশরাও সম্মতি জানালো। তাদেরো মত অতিদ্রুত মির্জা আব্বাসকে নয়া মির্জাপীর হিসেবে নির্বাচিত করা হোক। গ্রামের মানুষের তুলনায় মিস্টার রবার্ট আর কেইফারের শএরই আগ্রহ বেশি মির্জা আব্বাসকে মির্জাপীর বানানোতে। অন্তিম বিষয়টি সেভাবে লক্ষ্য করেনি। পরেরদিন ছিলো শুক্রবার। জুম্মার নামাজের পর ঘটা করে জানিয়ে দেয়া হলো এখন থেকে চোঙ্গাপাড়ার মাথা মির্জাপীর মির্জা আব্বাস আলী। সবাই হইহই রইরই করে তাকে সাদরে গ্রহণ করলো।অন্তিমের মন দাদাজানের জন্য কাতর রইলেও আব্বার নতুন পদের জন্য সেও সবটা হাসিমুখে গ্রহণ করছিলো। সেদিন এক বাউল বাবার সঙ্গে তার সাক্ষাৎ হয়েছিলো। সে তখন মাঠের মধ্যে আইলের ধারে বসে বিষন্ন আকাশে জমা কালো মেঘ দেখছে। বাউল বাবা এলেন বসলেননা দাঁড়িয়েই বললেন,
“জন্ম মৃত্যু এক মুদ্রার দুই পিঠ। মন খারাপ করিসনে বাপ। যে আইছে তারে যাইতেই হইবো৷ আমি জানি তুই কি ভাবতাছস। আসলে আমরা বড় হইতে জইতে না আমগো মইদ্যে একটা স্বার্থের বীজ বপণ কইরা ফালাই। আর এমনই স্বার্থপর হই যে, বাপ মায়ের বিয়োগবেদনার চাইতে সম্পত্তির ভাগ, ক্ষমতা, জোশ জৌলুশ বেশি দরকারি মনে হয়।"
অন্তিম বাউল বাবার কথা মন দিয়ে শুনেছিলো। একতারা বাজাতে বাজাতে দূর মাঠের আইলের মধ্যে অদৃশ্যমান হয়ে গেল সে।
***
বছরখানেক পেরোলো। কালু মিয়া নামের এক ছেলেকে সঙ্গে করে নিয়ে এলেন মির্জা আব্বাস। আহিরের উৎসাহ ছিলো সবচে বেশি। জহির চাচার সামনে সবসময় চুপচাপ আর ভদ্র বাচ্চা হয়ে থাকে। মদিনাবানুর প্রশ্নের জবাবে আব্বাস সাহেব বললেন,
"ছেড়ার দুইকুলে কেও নাই বুঝলা আম্মা। হেইয়ারে রাইকখা দেই। কাম কাইজ করব। গায়ে গতরে খাটবো ট্যাকা পায়সা আর খাওন দাওন দিমু। আমগোতো আর কম নাই।"
মদিনাবানু ছেলের উদারতা দেখে খুশি হলেন। গ্রামের মানুষের মুখেও প্রচলিত হলো মির্জাপীর আসলেই একজন সাচ্চা দিলের অধিকারী ইনসান। একটা ফকিন্নির বেটারে আইনা আশ্রয় দিলো।"
প্রথমে কিছুদিন সে কারো সাথে খুব একটা মিশতোনা। মির্জা আব্বাসের পায়ে পায়ে ঘুরে বেড়াতো৷ অন্তিম তখন আবারো নিজের পড়াশোনার পরীক্ষার জন্য শহরে গিয়েছে৷ সেদিন জহির এসে আগ্রহ দেখালো,
"আরে অয় আহিররা, চলনা নতুন ছেড়ার লগে কতা কইয়াহি।"
"হেইয়া হইলো আব্বার চামচা! কহন জানি যাইয়া কান পড়া দিবো। হেইয়ার লগে মিশন লাগতো না।"
জহির বাধা দিলো। তার ভুল ধারণা বদলানোর চেষ্টা করে,
"আরে, ছেড়া হইলো নতুন৷ আমরা না নিলে আমগো দলে আইবো কেমনে। চল ছে যাই।"
আহির ভেবে দেখলো কথা সত্য। অতঃপর বাকি বন্ধুদেরো একজোট করে সেদিন মাঠে পুচকে পাচকার সভা বসলো। মধ্যমণি কালু মিয়া ।
লিটন জিজ্ঞেস করল,
"তুমার বাড়ি কোনহানে?"
" জে আজ্ঞে আমি পথের ফইন্নি৷ আমার কুনো ঘরবাড়ি নাই।"
বিন্তি গভীরভাবে তাকে পর্যবেক্ষণ করছে৷ ঝন্টুর মেয়ে শ্যামলী জিজ্ঞেস করল,
"আহারে তাই বুঝি? খাইতে দেয় না কেও?"
"না। কাম কাইজ কইরা দিলে মাইনষে দুইমুঠ ভাত দিতো।"
আহির প্রশ্ন করল,
"তোর নাম কিতা রে?"
"আমার নাম কামাল মিয়া। দেখতে কালা তো তাই কালু কয় সক্কলে।"
জহির দুঃখ প্রকাশ করল,
"তাই বইলা নামখান বদলাই দিলো? আহাহা।"
মোল্লা মাস্টারের ছোট মেয়ে জোনাকিটাও সভাতে শামিল ছিলো। আহির বহুত চিন্তিত ভঙ্গিতে জোনাকির দিকে তাকালো। বলল,
"ছেড়া লাইগা অর লগে বৈষম্য হইছে গা।"
বিন্তি জিজ্ঞেস করল,
"কিয়ের বৈষম্য? ঠিকিতে আছে। অয় কালা তোই অর নাম কালু মিয়া। "
আহির জোনাকির দিকে আঙুল তুলে বলল,
"তে অর নামও তো জোনাকি। জোনাকিরও তো পুটকি বাদে সব কালা হয়। অন্ধাইরে তো খালি হেইয়ার পাছাতেই আলো দেহন যায়।অর নাম তইলে কালি মিয়া থোয় নাই ক্যান?"
আহিরের যুক্তিতে সকলের মাথায় গিঁট পেকে গেলো।জোনাকিকে কালি বলায় ফ্যাচ করে ঠোঁট উল্টালো মেয়েটা। বিন্তি ক্ষেপে উঠে বলল,
"নিজে লেংটা হইয়া অন্যেরে পর্দার জ্ঞান দেস কেন? চুপ কইরা বইয়া থাক হারামি।"
কারো কথার তোয়াক্কা করার মতো বান্দা অন্তত আহির মির্জা নয়। তবে বিন্তির দাপট যেন আহিরেরও ওপরে। আহির আর কারো বকা গিলে ফেললেওবিন্তির রাগ সইতে পারেনা। লিটন কালু মিয়ার ঘাড়ে হাত দিয়ে বলল,
"শুনো কালু, আমগো লগে খেলবা তুমি। আমরাও তো কালাই। তে কি হইছে? গায়ের রঙ দিয়া কি ডাব খাইবা? আইয়ো যাই সারদাত সাঁতার দিমু। দেহি কে কেমন পারো।"
কালু মিয়া লিটনের বন্ধু সুবল আচরণে সন্তুষ্ট হলো।।কিন্তু এসে থেকে তার ইচ্ছে ছিলো বাড়ির ছেলেদের বন্ধু হবে। ওদের সব কাজে সাহায্য করবে। তারণ ওদের বাবা তাকে ঠাঁই দিয়েছে। কালু মিয়া আহিরের দিকে তাকালো। আহির একটু বাব ধরে রেখে বলল,
"ল, হইছে নাটক মারাইসনা। আমরা আমরাইতো। চল খেলিগা। আইজকাতথে তুইওআমগো দলের। এই চেংরী রা ওঠ।"
মৌটুসী এতখন নিরব দর্শক ছিলো। বলল,
"হুন, ফাতিমা আর শ্যামলীগরে ডাকমু না?"
আহির উঠে হাতের ধুলে ঝেড়ে বলল,
" ওই রাক্ষসনী নুরাজান বুড়ির যা চ্যাটের জোড়! আইতে দিবোনা অগো। আমরাই যাই চল।"
মৌটুসী কথা বারালো না। যেতে যেতে আহির কালু মিয়াকে বোঝাতে থাকলো, "সারদা ঘেষা এই সব জমি আমার ভাইয়ের নামে। আমার দাদা দিয়া গেছে।হেইয়া দু'দিন পরে আইবো। আমার বড়ভাই অর জমিত ঢুকা একদম পছন্দ করে না।আব্বাও যায় না । হের বাগান হেই নিজে সাজায়। মাঠেও চাষের সুময় বাদে কাউরে যাইতে দেয়না। তুইও যাবিনা।"
"আইচ্ছা আপনে কইলেন মনে রাকলাম।"
"সাঁতার পারস?"
"জে পারি। আগে বহুত মাছ ধইরা দিছি।"
"ল যাই ঝাপ দিমু।"
"জে।"
বিন্তি যেতে শ্যামলীকে ডেকে নিলো। এরা সবাই এক পাঠশালায় পড়তে যায়। একসঙ্গেই যায় একসঙ্গেই আসে। এদের মধ্যে দুয়েক শ্রেনির পার্থক্য। তবু সবাই সবার বন্ধুমতো।
আকাশ ফুঁড়ে বৃষ্টি নামলো। একে একে দৌড়ে দৌড়ে এসে লাফিয়ে পরলো সারদার জলে। এদিকটায় গভীরতা কম। ডোবার ভয়ও কম।
_____
“আম্মা, আমার ডর করতাছে আম্মা।আমার খোকার কিছু হইবোনা তো?” ভয়ার্ত চোখে মদিনাবানুর দিকে তাকিয়ে আছে কালিন্দী বেগম।চোখেমুখে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে। বাইরে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে প্রখরভাবে। এক একটা গর্জন হৃদয়ে ভয় ধরিয়ে দেবার জন্য যথেষ্ট। বাড়ির মধ্যে এই বিধবা মদিনাবানু আর বউটারই বসবাস।সঙ্গে কিছু চাকরবাকর থাকে যারা রাতে অন্দরের বাইরে থাকে।মধ্যে রাতে উঁচু আট’মাসি পেটের বউমার হাত ধরে বারবার দুআ কালাম পাঠ করছেন তিনি। বরাবরই দুই শাশুড়ি বউমার মধ্যে এটাওটা নিয়ে ঠোকাঠোকি লেগে থাকে সারাটা বছরই।সাঁঝবেলার অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনায় একটা বিরাট ভুল করে ফেলেছেন মদিনাবানু। ক্রোধের বশবর্তী হয়ে কথা বন্ধ করেছিলেন। বউমা যখন রাগ ভাঙাতে এলো ঝাড়ি মেরে হাত সরিয়ে নিলেন তিনি। ভয়ানক গোঙানির আর্তনাদের সুরে তড়িঘড়ি করে পেছনে তাকালেন৷ দেখলেন বউমা মাটিতে পড়ে আছে পেটে হাত দিয়ে। মাটি ক্রমশ ভিজে উঠছে দগদগা লাল রক্তে। যেহেতু তখন জনবসতি কম ছিলো, হাঁকাহাঁকি করেও কাওকে পেলেননা মদিনাবানু। শেষমেশ পরবর্তী বাড়ির এক ঘরনী ছুটে এলো৷ টেনে বিছানায় শুইয়ে তাকে একটু সহ্য করতে বলল। বেশ কিছুক্ষণ পরেও যখন কাজ হলোনা, হিন্দু মহিলাটি বলল,
“ এতে কাজ হবেনা মাসিমা। পরিষ্কার কাপড় আর গরম পানি নিয়া আইসেন।”
মদিনাবানু দৌড়ের ওপর সব কাজ করলো। ক্রমাগত বউমার মাথায় হাত বুলিয়ে শান্তনা দিতে দিতে ক্ষমা চাইলো। দিনশেষে নিজেই হলো তার প্রশ্রয়স্হল। অনাকাঙ্ক্ষিত রক্ত দেখে ভরকে গিয়েছেন কালিন্দী! দ্বিতীয় বাচ্চাটার কোনো ক্ষতি না হয়। তারওপর যদি হয় ছেলে এবং তার যদি ক্ষতি হয়! মির্জা আব্বাস মা বউ দুজনকেই খুন করে ফেলবে। ছোট্ট অনুলেখা মির্জাও বাড়িতে নেই। বাইরে খেলতে গিয়ে ঝড়ে আটকে পরেছে। নিশ্চয়ই চাচা আজাদ মির্জার বাড়িতেই থাকবে আজ।
চারপাশে ভোরের আজান পরেছে। ধরনী আলোকিত হচ্ছে নতুন আলোয়।কিছু ভয়ানক চিৎকারে কানে ধাপা ধরলো মদিনাবানুর। কালিন্দী মুর্ছা গেলেন। পেটটা নেমে গেলো।হিন্দু নারীটির হাত রক্তাক্ত হলো। হাতে একটি ফুটফুটে শিশুদেহ। মুহুর্তে চারপাশে নিরবতা! মদিনাবানু ভয়ে ঢোকটাও গিলতে পারছেননা। মহিলাটি যা বলল,তাতে মদিনাবানুর সর্বাঙ্গ কম্পিত হয়ে উঠলো। সে বড় নিষ্ঠুর কণ্ঠে বলল,
“খুড়িমা গে, ছোল তো বাইচ্চা নাই।উপর হইয়া পরছেলো, ছোলের গায়ে গভীর আঘাত লাইগেছে।”
“কি… কি? কি কও দিব্যি? এ হইতে পারেনা। কি কইলা তুমি! ও দিব্যি কিছু করনা, আব্বাইসা সবডিরে খুন কইরালাইবো!”
মহিলাটি দ্রুতহাতে নিষ্প্রাণ দেহটাকে সাদা পরিষ্কার থানে জড়িয়ে ফেলল। ভয়ে তারও কপালে ঘামের দেখা দিয়েছে। কম্পিত কণ্ঠে বলল,
“খুড়িমা আর কিছু করনের নাই। এহন উপায় একখানি! সগ্গলরে কইবেন ছোল মেলা সুন্দর হইছেলো। জিনে তুইললা লইয়া গেছে গা।”
“কি কও, কিন্তু…”
“কথা কওনের সময় যে নেই খুড়িমা।আমি অরে লইয়া চইলা যাইতাছি। চিন্তা কইরেননা অরে পুড়ামু না। মাডিতই দিমু। পাশের গঞ্জের হুজুররে কইয়া।অর মুখে পানির ছিডা মারতে থাকেন। অরেও একই কথা কইবান ।”
জোশে হুশ খুইয়ে মদিনাবানু তাতেই রাজি হয়ে গেল। মেয়ে টা বাবু নিয়ে বেরিয়ে যেতেই সে ঘরের সবকিছু এটাওটা গোছাতে ধরলো। চারদিকে সকাল পরেছে৷ ধীর ধীরে একে একে আগমন হবে সবার। নিজেকে প্রস্তুত করছিলেন তিনি। কালিন্দী তখনো বেহুশ। অনুলেখা দৌড়ে দৌড়ে বাড়ি ঢুকলো। মদিনাবানুর সামনে গিয়ে দাড়ালো আচমকা।
“কি লো ছেড়ি ছুটোস ক্যান লো?”
“ ও দাদি… দাদি, তাতাড়ি চলো,পেছন ভুঁইয়ে একখান পরীর ছা পইরা আছে। আইসো তাতাড়ি।”
কথার মানে বুঝতে পারলো না মদিনাবানু। হিন্দু মেয়ে টা তবে ভোরবেলা বাচ্চাটাকে মাঠে ফেলে যায়নি তো! আতঙ্কে আর উত্তেজনায় কলিজায় মোচড় ধরছিলো তার। বউমার ঘরে শেকল তুলে অনুর সামনে হাসি বজায় রেখে বাড়ির পেছনের ফসলে জমিতে ছুটলো মদিনাবানু। অনু পিছে আর সে সামনে। গিয়ে যা দেখলো তাতে সে শান্ত হবে নাকি আরো উত্তেজিত হবে সেটাই বুঝতে পারছিলো না।
মাঠের মধ্যে, খড়েড় গাদার ওপরে নকশিকাঁথা বিছানো। তারওপরে আবার বালিশও রয়েছে। সেখানেই শুয়ে শুয়ে হাত পা ছোড়াছুড়ি করে বেড়ালছানার ন্যায় আ্যা উঁ করছে একটি অদ্ভুত সুন্দর শিশুবাচ্চা। সুরতে উপস্থিত নূর দেখে ঠাওর করা গেলোনা সে পুত্র নাকি কন্যা নাকি বাস্তবই কোনো পরীর শিশু! ভয়ে ভয়ে এগিয়ে গেলো মদিনাবানু। শিশুটির মাথার একপাশে মির্জাবাড়ির ছোট্ট এক ছাগলছানা দাড়িয়ে দাড়িয়ে তাকে দেখছে। অন্যপাশে পরে আছে গুটিকতক বেলি ফুল আর একটা সাদা চিঠির খাম।মদিনাবানুর ভয় হলেও অনুলেখা ছুটে গিয়ে চিঠিটা তুলল। মদিনাবানু মনে মনে কালেমা পরে শিশুর ওপর ফুঁক দিলেন। না পরী বা জিনের শিশু নয়। নইলে নিশ্চয়ই গায়েব হয়ে যেতো। অনু চিঠিটা দাদির দিকে এগিয়ে দিলো। মদিনাবানু সেকেলে হলেও স্বামীর সোহাগে চিঠি পড়ার জন্যই মূলত কিছু বাংলা শব্দ রপ্ত করেছিলেন। হুটোপুটি করে চিঠির খাম খুলে ধবধবে পাতাটা আবিষ্কার করলেন তিনি। তাতে চকচক করছে কার্বন কালির লেখা,
সুধী,
সালাম গ্রহণ করিবেন।যে শিশুটিকে দেখিতেছেন, খুদা তায়ালার এক অদম্য নেয়ামত ভাবিয়া নিজের ঘরে লইয়ে যান। ইফতেখার মাহমুদকেতো আপনি এবং আপনার পরিবার বেশ ভালো করে চেনেন। তিনি আপনাদের পরিবারের একজন অতি পরিচিত শুভাকাঙ্খী।আফগানিস্তানের মহাপীর প্রমুখ ইফতেখার মাহমুদের বয়ানে, সে একটা কল্যাণ ডাকিনী শিশু।প্রথম দেখাতেই বলেছিলেন তিনি। তিনি এও বলেছিলেন এই চোঙ্গাপাড়ার দিল হিসেবে তার নসিব লেখা হইয়াছে। এই শিশুতেই একসময় চোঙ্গাপাড়ার পথপ্রদর্শক হইবে। এই শিশুতেই হবে পাপের অন্তিম।তাকে আঘাত কিংবা বর্জন করিয়া ব্রিটিশদের হাতে প্রেরণ করিবার মতো দুঃসাহস করিলে খুদা তায়ালার গজব বর্ষিত হইতে পারে। হক মাওলাকে নারাজ করিবেননা। আমি আদিষ্ট তাই তাহারে আপনার নিকট পৌঁছাইয়া গেলাম সঠিক প্রহরে। শিশুর আসল পরিচয় জানিয়া রাখুন সে ভিনদেশী এক পবিত্র মহামানবের পুত্র। স্বপ্নাদিষ্ট হইয়া তিনি তাঁহার শিশুপুত্র কে আপনার নিকট প্রেরণ করিয়াছেন। তাহাকে যথাযোগ্য ধার্মিক এবং প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় দীক্ষিত করিবেন। এই শিশু আপনার সংসারে উন্নতি বয়ে আনুক। আল্লাহর কাছে সর্বদা শুকরিয়া আদা করিবেন।
ইতি
শিশুর বাহক,
আফগানি শুভাকাঙ্ক্ষী।
অনু দাদির দিকে হা করে তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করেও যখন ব্যাপারটা বুঝলোনা সে শিশুর দিকে তাকিয়ে গাল টেনে হাসতেই শিশুটি চরম শব্দে হেসে উঠলো। তার ওই হাসিমুখের দিকে তাকিয়ে মদিনাবানু উপলব্ধি করলেন তার হৃদয়ে এক অদ্ভুত প্রশান্তি ছেয়ে গেলো।তিনি চিঠিটা মলিন ব্লাউজের ভাঁজে লুকিয়ে শিশুকে কোলে তুলে অনুকে বললেন,
“এ কোন পরীর ছাও নয় রে ধিঙ্গি! এইটে তোর ছুডো ভাই। তোর মায়ের পেট যে ফুলা আছিলো না? হেইয়ার থে বাইর হইছে।বুঝা পারছস?”
অনু মাথা দুদিকে নেড়ে বলর,
“এডিতো বিদেশী শিশু।ওইযে আফগান থেইকা কাবুলিরা আইসে হেইয়াগো মতন। দেহোনা খ্যাতাডাও তো অমনি!”
মদিনাবানু অনুলেখা কে বেশ ভালো করে বুঝিয়ে দিলেন এই ব্যাপারে কাওকে না বলতে নাহলে তোর বিয়ে হবেনা বলে ভয় দেখালেন। মাকেও বলতে মানা করলেন।অনু বাধ্য বাচ্চার মতো তা কথা শুনলো। মদিনাবানু বাচ্চাটাকে কোলে তুলে আকাশের দিকে তাকিয়ে বললেন,
“ হে নসিবের লেখক, হে দয়ালু সৃষ্টিকর্তা, তুমি আমারে নূরের সাক্ষাৎ দিছাও।এই নাদান শিশুর কাছে আমার সকল ইচ্ছাকৃত পাপকর্মের অন্তিম হইলো। তাই আমি অর নাম ঠিকাই দিলাম অন্তিম! সকল পাপের অন্ত তার হৃদয়ে! সে আমার নাতি অন্তিম মির্জা নূর! “
চোখের দু’ফোটা শান্তির পানি পেলে তিনি বাড়ির দিকে এগিয়ে গেলেন একবুক সাহস ও আত্মবিশ্বাস নিয়ে। তার পরিকল্পনা সফল হলো।অনুও কাওকে কিছু বলল না। কালিন্দীও শিশুপুত্র কে পরম সোহাগে নিজের মনে করে টেনে নিলেন। মদিনাবানু ভেবেছিলো কালিন্দী কে ব্যাপারটা জানাবেন কিন্তু পরে তার মানসিক দিক বিবেচনা করে আর বলেননি।
চলবে........
( স্বাভাবিকভাবেই বাংলাদেশী গ্রামগুলোতে মুখের ভাষাখারাপ শুনলে আপনে ল্যাতায়া যাবেন। তবে এসবের উর্দ্ধে একটা নিদারুণ গল্প হতে চলেছে আমাদের মির্জাপীর।
সালামের জবাব দিতে হয়। আসসালামু আলাইকুম 🤩)
#মির্জাপীর
#জাবিন_ইশতিয়াক_মল্লিকা
#সুমনা_খাতুন_মল্লিকা