দুই.
_______________
ধান বোনার মৌসুম। ঠাডা পরা রোদ কমে একটু ছায়া নেমেছে চারপাশে। দমকা বাতাসে তিরতির করে নাচছে অন্য জমির ফসলগুলো। দূরে কোথাও মেঘ ডাকার আওয়াজ এলো বুঝি। বাউলবাবা, হাতে একতারা নিয়ে নদীর পাড় ধরে এগিয়ে চলেছেন। সারদার কোল ঘেঁষে দাঁড়ানো মির্জা বাড়ির বড় ছেলেটার নিজ হাতে , মাথার ঘাম পায়ে ফেলে ওই এক কালু মিয়া আর ছোট ভাই টাকে সঙ্গে করে গড়া ফসলে জমিগুলোর দিকে তাকালে বড়ো ঈর্ষা হয় অন্য মানুষ গুলোর। খোদার ভয়ে কেও সেই ঈর্ষা প্রদর্শন করতে পারেনা। ওরে বাবা! সে মির্জা বাড়ির বড় ছেলে। ভবিষ্যৎ পীর সাহেব৷ আলেম ওলামার বংশধর। তার ওপর হিংসা করে কে নিজের ওপরে অভিশাপ ডেকে আনবে! কালু মিয়া হাঁকাতে হাঁকাতে আসছে লুঙ্গি কোমরে বেঁধে। ঘাড়ে ধানের বোঝা। ধপ করে বোঝা মাটিতে ফেলে এগিয়ে গিয়ে কাকতাড়ুয়ার মাথাটা ঠিক করে দিল সে। মিনমিন করে বলল,
“আল্লায় ক্ষেমতাও দিছে! হারাডাদিন টুকটাক এডাওডা করতাছে তো করতাছেই। থামার নামই নাই৷ হেইয়া কি মানুষ নাকি পানি তোলা স্যালো মেশিন!”
গোড়ালিডোবা মাঠের মধ্যে উবু হয়ে ধান লাগাচ্ছে তরুণ ।মাথায় গামছা পেঁচানো। কড়া রোদে পুড়েও যথেষ্ট ফরসা চামড়ার অধিকারী সে। এলাকাবাসীর মত, খোদাতায়ালার বিশেষ রহমত আছে জন্যই ছেলেটার এই চমৎকার সুরত রোদে পুড়েও নষ্ট হয় না। সোজা হয়ে দাড়িয়ে কপালের ঘাম মুছলো সে।গলা উচিয়ে জিজ্ঞেস করল,
“ অয় মাঙ্গের পোলা, তুই আমারে স্যালো মেশিন কইলি ক্যান রে?”
“ নাইলে কি কমু? হারাডাদিন রথের ঘোড়ার মতো চলছেন তো চলছেনই।ব্রিটিশগো গাড়িও এত জুড়ে চলে না। আপনের কি হরান লাগে না? “
অন্তিম গাল টেনে হেসে দুইদিকে ঘাড় নাড়ালো মানে তার ক্লান্তি লাগেনা।অন্তিমের ছাগলের বাচ্চাটা দৌড়ে চলে গেলো ফসলে জমির দিকে। এক কোনায় দাড়িয়ে আগাছার মতো জন্মে থাকা ঘাস খেতে ধরল। আচমকা মাঠের মধ্যে ফসল নড়তে দেখে মাথার গামছা খুলে ঘাড়ে নামালো অন্তিম। চেহারায় জমা ঘাম মুছে কালু মিয়ার দিকে ইশারা করে বলল,
“ এই কালু চুপ এক্কের আওয়াজ করবিনা খরবদার।”
কালু কপাল কুচকে বলল, “কেন ভাইজান কি হইলো গা?”
অন্তিম ফিসফিসিয়ে বলল, “ আইক্কা কুঞ্চিডা দে। আইজকা শিয়াল খানকির বেটারে আইক্কাঅলা কঞ্চি দিয়া গারামু।সাহস কত শালার দিনের বেলায়ও ভাতার বাড়ি আইসে! “
কালু বড় সাবধানতার সঙ্গে কাকতাড়ুয়ার হাত হিসেবে ব্যাবহৃত বাঁশের ফলাটাই অন্তিমের দিকে এগিয়ে দিলো। অন্তিম সেটা হাতে নিয়েই দৌড়ানি দিলো মাঠের মধ্যে। শেয়ালটার বড় সাহস বেড়েছে। পরপর তিনদিন অন্তিমের শখের তিনটে হাঁস নিয়ে গেছে! বাগানে ঢোকার জন্য আশরাফুল মাখলুকাতগুলোর অনুমতি লাগলেও ইতর জংলী প্রাণীগুলো অনুমতি নেয়না। বেশ খানিকটা দূর পর্যন্ত শেয়ালটাকে দৌড়ানি দিলো দুজন। হাতে পেলে আজ অন্তিম শেয়াল সমাচার বুঝিয়ে দিতো। পেছন থেকে ডাক পরল কাজের মেয়ে জরিনাটার। ছোটখাটো আকারের মেয়ে টার শ্যামলা চেহারায় উপচে পরে মায়া। কানের দুপারে ফেলে রেখেছে লালফিতে বাধা দুটো বিনুনি। ছোট হাতে ছোটছোট রেশম চুড়ি।
“ আরে ও ভাইসাব, কালুউ? এই কোনে যান আপনেরা? আব্বায় ডাকে তাত্তাড়ি আইসেন।”
আব্বা ডাকে কথা টা শুনে অন্তিম আবার বাড়ির পথে ছুটলো। ছাগল ছানাটাকে বাগানে ছেড়ে বলল,
“ এট্টুশখানি কইলজা, দিলের মায়া থাকলি আর সারদার ঘাটে যাওয়া মারাইওনা। আমাগো খাইলো ব্রিটিশরা। তুমারে খাইবো শেয়ালে বুঝা পারছা? যাও ভিতরে যাও।”
বলেই বাড়ির দিকে যাচ্ছিলো ও। বাগানে তার জিনিসপত্র রাখার জন্য কুঁড়েঘরের মতো করে একটা ছাউনি দিয়েছে নিজেই। সেখানে অচেনা এক নারীছায়া দেখতে পেয়ে সতর্ক হলো অন্তিম। দিনে দুপুরে বাগানে চুন্নি ঢুকলো কি করে তাও এই চড়ুইপাখি সাইজের চুন্নি! এটাতো অনু বুবু না। এগিয়ে গিয়ে চুপটি করে দাঁড়ালো মেয়ে টার পিছে। মেয়ে টা পেছনে ফিরে ওকে দেখে ঈষৎ চমকে উঠলো! অন্তিম সুশ্রী বালিকাটির ভয়ার্ত চোখের দিকে চেয়ে রইলো নিষ্পাপ দৃষ্টে। ওর চোখের পাতাকে যেন আটকে ধরেছে বালিকাটির কাজলটানা চোখ। কিছুতেই পলক ফেলতে ইচ্ছে করছে না ওর। পাছে মেয়েটার এই অবাধ্য চঞ্চল চক্ষুদ্বয় উধাও হয়ে যায় মরীচিকার মতো! মেয়ে টা মোটেও শান্তশিষ্ট নয়। হাত উচিয়ে জিজ্ঞেস করল,
“ এই যে, কি হলো? কে তুমি? চোর টোর নাকি?”
অন্তিম নিরুত্তর দেখে সে আবারো প্রশ্ন করল,
“ এই সুন্দর কুঁড়েঘর টা কি তোমার?”
অন্তিম প্রথমে একবার নিজের খড়ের গাদা দিয়ে চাপা মারা বেতের বেড়ায় ঘেরা ছাউনির দিকে তাকালো। বোকা মেয়ে টা ঠিক কোন দিক দিয়ে এটাকে কুঁড়েঘর দেখতে পাঁচ্ছে! সেসব এড়িয়ে অন্তিম একপা পিছিয়ে দাড়িয়ে জিজ্ঞেস করল,
“ কেডা তুমি? বাগানে ঢুকছাও কেন লো?”
“ এটা আমার ভাবির বাপের বাড়ি। তুমি কে?”
অন্তিম ব্যাপারটা ঠিক ঠাওর করতে পারলোনা। মাঝার বয়সী মেয়েটাকে সঙ্গে করে বাড়ির ভেতরে ঢুকতেই নজরে পরল একপাল অচেনা লোকজন। তাদের মধ্যে একজন সহাস্য মুখের লোক হাসিটা চওড়া করে বললেন,
“ আইসো বাবা অন্তিম। আমার নাম নাসিরুদ্দিন পাটোয়ারী। তোমার বইনের হবু শশুড়।”
অন্তিম বোনের দিকে তাকালো। সে সলাজ্য চেহারায় চিবুক নামিয়ে মাটির দিকে মুখ করে তাকিয়ে আছে। মির্জা আব্বাস বললেন,
“ এইটে তোমার বইনের হবু শশুড়।এইটে শাশোড়ি আর এইটে তোমার দুলেভাই।”
অন্তিম মাথা নেড়ে বোঝালো সে বুঝেছে। অতঃপর কোনো প্রশ্ন ছাড়াই বালিকাটির দিকে তাকালো৷ আব্বাস সাহেব আবারো বললেন, “ওইডা হইলো গিয়ে তুমার বেয়াইন সাহেবা। তোমার আপার হবু ননদিনী। “
অন্তিম ঘাড় ফিরিয়ে আবারো বালিকার দিকে তাকালো। বালিকাটি মুচকি করে হাসলো। যাওয়ার আগে সে বলেছিলো তোমার কুঁড়েঘর ঠিক করে নিও। বেশ খানিকটা হাসি-হাসির পরে কুটুম্ব বিদায় নিলে অন্তিম বুবুর কাছে গেলো। অনু অন্তিমকে বুঝিয়ে বলল,
“ পর শুক্কুরবার হেইয়ার লগে আমার বিয়া। অরা সব শশুড়বাড়ির লোকজন।” অন্তিম বুঝলো। বোঝার মতো তার যথেষ্ট বয়স হয়েছে। কুরআনের হাফেজ সে এখন। বাংলা বিদ্যায়ও সর্বেসর্বা। শহরে এত সুযোগ সুবিধা তবুও শহরে মন টেকে না। আর মাত্র এই বছর পরে ফিরে এসে আর শহরে যাবনা যাবনা করতে করতে পেরিয়ে গেলো বেশ কটা বছর। বুবুর বাড়িতে গেলেও বালিকাটাকে আর দেখেনি সে। বুবু যখন বাচ্চা হতে বাড়ি এলো তখন আাবার মেয়ে টার সঙ্গে দেখা হয়েছিল। এখন মেয়ে টা গায়ে পায়ে বড় হয়েছে। সামাজিক স্বাভাবিক আচরণ বিরাজমান হলেও বছরে যে এক অথবা দুবার ওদের দেখা হয় বেশ ভালো দিন যায়। সেবারো বালিকাটি অন্তিমের কুঁড়েঘর নিয়ে প্রশ্ন করে গেলো। অন্তিম বাগানে বসে সেটাই ভাবছিলো। হঠাৎই গাছের ডালে নজর পরল তার। চড়ুই দম্পতি বাসা গাঁথছে। সেটা দেখে অন্তিম একটু হাসলো অতঃপর একা হাতে তিনদিনের মধ্যে একটা ঠিকঠাক কুড়েঘর বানিয়ে ফেলল, দেয়ালে মাটির লেপ লাগাতে সাহায্য করল নয়ন মিয়ার পোয়াতি বউ আর জরিনা। মদিনাবানুর বিধবা মেয়ে টা এখন মির্জা বাড়িতেই থাকে। সবার সঙ্গে বনিবনা হলেও অন্তিমের সঙ্গে সবসময় ঠুকঠাক কথা কাটাকাটি লেগেই থাকে। রুম্পা ফুপু নামেই চেনে সবাই। ফুপুর কথা হলো আমার ভাইপুত কেন রোদে কেটে মাঠে কাজ করে? মানুষ কি বলে? সবসময় কেন টুপি পরে মওলানা সেজে ঘোরে না? আর ফুপুর এক বাটি বেশি ভালোবাসাটাই অন্তিমের পছন্দ হয় না। দুজনের মধ্যের ঝগড়া দেখে মনে হয় দুই সতীন! কিন্তু অন্তিম রুম্পা ফুপু কে অনেক সম্মান করে এবং ভালোও বাসে।
______________
তখন একেবারে ভোর চারেদিকে শুনশান নিরবতা হলেও মির্জাবাড়িতে আলো জ্বলে উঠলো। রুম্পা ফুপু অন্তিমের দরজার কড়া নেড়ে ডাকলেন,
"ওই ছেড়া, কিয়ের মরার ঘুম ঘুমাস৷ উঠ ধান সিদ্ধ করন লাগবোনা? অন্তিমমা?"
চেঁচামেচি করে গলা ফাঁড়তে মানা করে মদিনাবানু নিজেও কাজে লেগে পরলেন। বাড়ির পেছনদিকে বিশাল মাটিরচুলো। এগুলো মূলত শীতকালে খেজুর বা কুশুরের রস জ্বাল করতে ব্যাবহৃত হয়। ধান সিদ্ধ করতেও ব্যাবহার হয়। টিনের শক্ত ড্রামে মাটির লেপ লাগালেন মদিনাবানু। নয়ন মিয়ার বউও এসে গেছে এতখনে। খড়িখেড় গোছাতে ব্যাস্ত হয়ে পরল সে। খানিক পরে আহির, কালু মিয়া, অন্তিম সকলে জমা হলো পেছন উঠোনে। বড় পরিমাণের ধান সেদ্ধ করতে হবে যাতে একেবারে অনেকদিন পর্যন্ত আর খাটতে না হয়। বারবার ধান সেদ্ধ শুকনো করতে ভিষণ বিরক্ত লাগে অন্তিমের। মির্জা আব্বাস এইসব সাংসারিক কাজে খুব একটা আগ্রহী নন। তিনি সবসময় নিজের ব্যাবসা নিয়েই ব্যাস্ত থাকেন। এইতো মাত্রই একপাক বাইরে এসেছিলেন। আহির বলল,
"আব্বা তুমিও একটু হাত লাগাও।"
"হাত তো লাগামু বদলে আমি কি পামু?"
রুম্পা ফুপু বিরক্ত হলেন। সবকিছুতেই লেনদেন দেনা পাওনা করতে দেখতে দেখতে বিরক্ত হয়ে গেছে ও।
"হেইয়া আবার কেনকা কথা ভাইজান? বদলে খাওন পাইবেন। বছর জুইড়া ভাত পাইবেন।"
মির্জা আব্বাস যেতে যেতে হাই তুলে বলে গেলেন,
"এত কষ্ট করনের কি দরকার? কিইননা আইনা গিললেই তো হয়। চাকরবাকর থাকতি আবার গতর খাটার কি দরকার হুদাই?তরা কর এসব ফাউল ফাউল সময় নষ্ট। আমি অহন মজ্জিদে যামু। দোয়া কালামে তাও কিছু সাওয়াব লাভ হইবো।"
অন্তিম বিরক্ত হয়ে বলল,
"এ চেংড়ী আক্কাস আলীর বেটি, এত কথা কস ক্যান ব্যাঁকামুখী? কাম কর। জাইনা শুইনা আব্বারে কোঁচাস।"
"আমি তর ফুপু বুজা পারছস? আমি তর থে অনুমতি নিয়া কথা কমুনা৷ বেশি কথা কইবি তো গরম ধান লইয়া মাথাত ঢাইলা দিমু এক্কেরে!"
"আয় না আয়, আমি তুমারে ধইরা ধানের লগেই সিদ্ধ কইরালামু।"
মদিনাবানু ক্ষেপে উঠলেন, "দুইডারের ঘেডি ধইরা পুকুরে চুবামু। একটা কথা কেও কবিনা আর। নইলে দেহিস কি করি।"
দুজনেই চুপ করল। সবগুলো ধান সিদ্ধ করতে করতে বেলা বেরে গেলো। ধানগুলো দুই উঠোনজুড়ে নেড়ে দিয়ে যে যার মতো বিশ্রাম করতে চলে গেলো। গায়ে খাটার বদৌলতে মদিনাবানুর বেশ গায়েগতরে ব্যাথা করে। তাইসে একবারে গভীর ঘুমে নিমগ্ন। এই সুযোগে খেলতে দৌড়লো আহির। তাকে বেশ বারবার করে মানা করা হয় এখন বড় হয়েছিস খেলাধুলা বাদ দিয়ে পড়াশোনা কর। কাজবাজ কর। তার ওসব শোনার ধৈর্য নেই। একেই নাচনেওয়ালা বুড়া। তারওপর তার বড় ভাই ভাইয়ের ভালোবাসা খাড়া। অন্তিমকে খেলতে ডাকতে সাহস হয়না কারো। সে আর পাঁচটা বাচ্চার মতো নয়। সে শিক্ষিত মার্জিত, হাফেজে কুরআন। তাকে এসব খেলাধুলা শোভা পায়না। মির্জা আব্বাসের এই নিরব হুকুম অমান্য করেনা অন্তিম। তবে মাঠে কাজ করার নিষেধাজ্ঞা পালন করেনা সে। তার সেই জমিতে যেন তার প্রাণভোমরা।
সারদার দিকে ছুটে গেলো আহির। জহির আর মিরনকে দেখা যাচ্ছে কিন্তু লিটন আজকে আসেনি দেখে দলবেঁধে খবর নিতে যাচ্ছে তারা। পথে দেখা গেলো একদলব্রিটিশ লোকেরা কিছুজনকে মারপিট করছে।হাতপা দড়ি দিয়ে বাঁধা তাদের। বাচ্চারা ভিড় জমিয়ে আছে। আহিরের দল গেলোনা সেখানে। ওরা জানে খাজনা অনাদায়ের দোষে গন্ডগোল হচ্ছে। ছোট থেকে প্রতিটি মৌসুমে এসব দেখে দেখে অভ্যাস্হ ওরা।
লিটন বাড়িতে নেই৷ শহরে গিয়েছে বোনের বিয়ের জন্য। ফিরার পথে নুরাজানের বাড়িতে একবার ঢু মেরে আসবে বলে ঠিক করল। পথিমধ্যে যুক্ত হলো কালু মিয়াও। বাড়ির বাইরে পৌছতেই ভেতরের কান্নাকাটি শোনা গেলো। উৎকণ্ঠিত হয়ে ভেতরে ঢুকলো ওরা। নুরাজান কেঁদে চলেছেন। আহির জিজ্ঞেস করল,
"কান্দেন কেন চাচি? কি হইছে?"
"ওরে... ওরে আহিররা আমার ফাতিমারে খুইজা পাইতাছি না রে। কোনে গেলো আমার নাতিনডারে! সারারাইত বাড়িত আছেলোনা। গেরামবাসী জাইননা গেলো রে! ওরে.... ছিলান মাগির লাইগা আর সমাজে মুখ দেহাইতি পারমুনা রে!"
রুম্পা ফুপু আগে থেকেই সেখানে উপস্থিত ছিলো। অন্তিমকে বাগান থেকে আসতে দেখে ধানের কাছে ওকে বসিয়ে নুরাজানের বাড়িতে এসেছিল কাঁথা সেলাইয়ের ব্যাপারে কথা বলতে। এসেই দেখলো বাড়িতে কান্নার রোল। নুরাজান ফাতিমার আম্মা ফারিহার দিকে আঙ্গুল তুলে আবারো সুর তুললেন,
"যত দুষ এই নডির! আমি কইছেলাম ছেড়ি বড় হইতাছে বিয়া দিয়া দে। আমার কতা শুনলোনা। আমারে চ্যযাট টা দিয়াও গুনলোনা। ও আল্লাগো! বাড়ির ইজ্জত শেষ কইরা দিলো এ্যারা মা বেটি ছিলানেরা গো!"
আহির কিছু বলার আগে রুম্পা ফুপু ক্ষেপে উঠলে,
"ব্যাস করেন চাচি।ছেড়ির কুনো বিপদ আপদও তো হইতি পারে। হেইয়ারে কেন বিনা দুষে দুষিত করতাছেন? ভাবিরে বকেন ক্যান হেইয়া কি নিজ মাইয়ার খারাপ চাইবো?"
নুরাজান শাড়ির আঁচলের মাথা দাঁতে চেপে চুপ করে কাঁদতে ধরলেন। এই মুহূর্তে কিছু বলতে চাইছেন না। রুম্পা ফুপু আবারো ঠান্ডা কণ্ঠে বললো,
" আপনের চেঁচামেচিতিই বেশি সম্মান যাইতাছে। আরে ছেড়িরে খুঁজেন তো আগে। আল্লাহ না করুক কেও যদি ধইরা টইরা লয়?"
"তুই চুপ কর ছেড়ি! নিজেতো বছর না ঘুরতেই স্বামী রে খাইছস। অপয়া ছেড়ি আমারে জ্ঞান দেস?"
রুম্পা ফুপু একেবারে চুপ করে গেলো। যাবে না-ই বা কেন একেবারে সবচে সংবেদনশীল জায়গায় আঘাত করেছে নুরাজান। আহিরের মেজাজটা খারাপ হয়ে গেল। গলা ফেড়ে বলল,
"হায়াত মওত কি তুই লেহস ডাইনি বুড়ি! আমার ফুপুরে কইবার আগে নিজেরে দেখ নিজের স্বামী রে তুই চাবাইয়া খাইছস। নূরু কাকা তোর লাইগা মানসিক চাপে পইরা মরছে।"
রুম্পা ফুপু আহিরকে শান্ত হতে বললে আহির উল্টে নিজের ফুপুর হাত ধরে টানতে টানতে বেরিয়ে গেলো বাড়ি থেকে। নুরাজানের ছোট নাতি খগেনকে ছুটে আসতে দেখা গেলো।
"তাত্তাড়ি চলো তুমরা।সব্বনাশ হইছে গা।"
নুরাজান, ফারিহা, রুম্পা ফুপুও ফিরে তাকালো। আহিরো দাড়িয়ে পরলো। খগেন হাঁকাতে হাঁকাতে বলল,
"সব্বনাশ হইছে গা। সব্বনাশ! নয়ন মিয়াগো পুকুরের বটগাছে..."
আহির ধমকে উঠলো,
"নাটক মারাইও না। কও কি হইছে?"
"ভাই, গাছের লগে ফাতি আপা ঝুলতাছে৷ তাত্তাড়ি চলো।"
ফারিহা বেগম কথা টা শুনতেই জ্ঞান হারিয়ে ফেললেন। নুরাজান সঙ্গে বাড়ির আরো কজন মিলে দৌড়ের ওপরে বড় বটগাছ তলার দিকে দৌড়লো।সে এক মর্মান্তিক দৃশ্য। বটগাছের বড় ডালের সঙ্গে ঝুলছে ফাতিমা। আপাতদৃষ্টিতে আত্মহত্যা মনে হলেও আহির রুম্পা ফুপুর কানে কানে বলল,
"ফুবু, দেহো দেইকখা মনে হইতাছে কেও ইচ্ছা কইরা হেইয়ারে ওইহানে ঝুলাইছে।"
"আল্লাহ! একি গজব বর্ষালে! লা হাওলা ওয়ালা কুআতা। আহিররা বাড়িত চল আম্মা আর ভাইজানরে খবর দেওন লাগবো।
মদিনাবানুর ততখনে ঘুম ভেঙে গেছে। বাইরে এসে মাথায় কালো ছাতি ধরে ধানে পা দিচ্ছিলেন তিনি। মির্জা আব্বাস উঠোনে বসে হিসাবের খাতা দেখছিলো।অন্তিম হয়তো ঘেটুকে সঙ্গে করে দোকানের দিকে গেছে। আহির আর রুম্পা আসতেই মদিনাবানু চেঁচানো শুরু করলেন,
" বাবাহ! দুই ফুবু ভাইপুত কোন লাংঙের বাড়িত গেছিলি? আমি আইয়া দেহি চেইমেই কইরা কবুতরে ধান খাইতাছে।"
রুম্পা ফুপু ঘোষণা করল,
" আম্মা, ফাতিমাজান মইররা গেছে।"
"কিই!? " চমকে উঠলেন মদিনাবানু। মাত্র তো কালকেও বাচ্চাটা কতখন গালগল্প করে গেলো।"
ফাতিমার মৃত্যু রহস্য রয়ে গেল।কেও তার আত্মহত্যার রহস্য খুঁজে পেলোনা
______________
বুবুর ছোট্ট মেয়েটার নাম শখ করে রাখা হলো নেহা।সে এক চৈত্র মাসের সমাপ্ত দিনের কথা। অন্তিম তাদের দোকানে বসেছিলো। এমনসময় কালুমিয়া ছুটতে ছুটতে এসে বলল,
“ভাই, আপনে কি বুবুর বাড়ি যাবেননা?”
“কেন? কি হইলো?হেইয়াতো কাইলকা মাত্র গেলো।”
“ ওইযে বুবুর নইনদা, হেইয়া না ভয় পাইছে।”
“ ইমা পাটোয়ারী? কি দেইকখা?”
“আপনেতো শহরে আছিলেন শুনা পান নাই মনেহয়।নয়ন মিয়াগো বড় পুকুরে এক চেংড়ির লাশ পাওয়া গেছে। গলায় দড়ি দিছিলো।”
“ আয় হায় কস কি?”
“ হুউ। হেইয়া দেইখা ইমা বুবু মুর্ছা গেছিলো গা। পরে কাইলকাই গেছে গা।”
অন্তিম কালুর কথা শুনলো বেশ মনোযোগী হয়ে। আর যাইহোক বড় পুকুর পাড়টা সে পছন্দ করে না। ইচ্ছে করেই সেদিকে যায় না। অতীতের দুর্ঘটনা বারবার ভেসে ওঠে স্মৃতিপটে। তাই যতটা সম্ভব এড়িয়ে চলে ওই এলাকা। মদিনাবানু পানের পিক ফেলে অন্তিমের দিকে এগিয়ে এলেন। আস্তে করে ডাকলেন,
“নূর?”
অন্তিম গম্ভীর ভাবে বসে মাঠের দিকে তাকিয়ে কি যেন ভাবছে। দাদির ডাক কানে গেলনা তার। দাদি আবারো ডাকলেন, “কিলো ছ্যেড়া! এ নূর!”
“ কি রে বুড়ি ডাকো ক্যান?”
“ মন কোনহানে থাকে? ওইযে সুজনরে চিনস তো, হেইয়ার বাড়িত যা একটু। যাইয়া একটু শান্তনা দিয়া আয়।”
“কেন? হেইয়ার আবার কি হইলো?”
“ আরে অর ছেড়িডা যে সোরাইয়া, ছেড়িয়েতো মরছে৷”
“ কেমনে মরছে?”
“ বড়ই রহস্যময় মওত দিছে মওলা।গায়ে পায়ের আঁচড়ের দাগগুলি দেইকখা মন কইতাছিলো জংলী জানোয়ারে হামলা কইরা ওমনে ছিঁড়ছে। ফাতিমার মতন রে। মানে বুঝাই পারতাছস ।”
দাদির ঘুরে ফিরে বলা কথাটা কান পেতে শুনেই গায়ে সাফেদ ফতুয়া জড়িয়ে বেরিয়ে গেলো অন্তিম। এরকমভাবে আচমকা ঘটনাগুলো একে অপরের সঙ্গে জড়িত বলে মনে হয় ।এই পর্যন্ত অনেকগুলো নারী এভাবে মারা গেলো। তারা বিভিন্ন বয়সের বিভিন্ন বাড়ির। ঘটনারা তে অন্তিম মনোনিবেশ করায় মির্জা আব্বাস অবশ্য পরবর্তীতে গাছটাকে অভিশপ্ত ঘোষণা করেছেন। অন্তিম যখন বাবার কাছে গিয়ে অভিযোগ করলো, মির্জা আব্বাস তার কথায় কর্ণপাত করেনি।
সারদার স্রোত বেড়েছে।দূর আকাশের কালো মেঘে ভিজে উঠেছে চারদিক। বড় করে হাওয়া দিলে সারদা নদীর বুক চিরে সো সো শব্দ ভেসে আসে যেন অস্থির কোনো দীর্ঘশ্বাস ছড়িয়ে পড়ছে শান্তি আর নিস্তব্ধতায়। নদীর ঢেউগুলোও আজ কেমন উন্মনা, তীর ছুঁয়ে ছুঁয়ে বারবার ফিরে যাচ্ছে অজানা গভীরের দিকে। অন্তিমের ছাগলের বাচ্চাটার পিছে পিছে দৌড়ে এসেছে কালু মিয়া। তার কাজই তাই। সবসময় অন্তিমের বিষয়াদি নিয়ে দেখাশোনা করা। এমনিতেও ফসল তোলা বা মাড়াইয়ের কাজ বাদে অন্য কাওকে নিজ সীমানায় ঢুকতে দেয়না অন্তিম।আগে মাঠের চারেদিকে ব্যাড়া ছিলোনা তবে মোহনলাল ব্যাপারীর ছেলেটার অন্তিমের ওপর বড্ড হিংসা। ছেলেটার নাম মাধব মুখার্জি । চরম বেয়াদব একটা ছেলে। বয়সে অন্তিমের সমানই হবে। এর আগে একবার জরিনার শরীরে নিজের জঘন্য হাতের স্পর্শের অপরাধে অন্তিম খুব মেরেছিলো ওকে। কিন্তু মির্জা আব্বাসের সঙ্গে মোহনলাল মুখার্জির ব্যাবসায়িকভাবে বেশ ভালো সম্পর্ক থাকায় মির্জা আব্বাস উল্টে নিজের ছেলেকেই তিরস্কার করেছিলেন। গ্রামের মুসলমানদের ওপরে যেমন মির্জা বংশের দাপট রয়েছে ঠিক সেভাবেই সনাতন ধর্মাবলম্বীদের ওপরে মুখার্জি দেরো দাপট বিদ্যমান।
অন্তিম ওর থেকে দুরত্ব বজায় রাখলেও মাধব নিজ ইচ্ছে তে ওকে বিরক্ত করে। মোহনলালের দুই পুত্র মাধব আর মিরন। মিরন ও তার ভাইয়ের চেয়ে কোনোদিক থেকে কম না। চোখের মণিদুটো সবসময় নারীদেহের ভাঁজে চিপকে থাকে। ছোটছোট বালিকা থেকে বুড়িরাও তাদের নজর থেকে রেহাই পায় না। গ্রামের নারীগুলোর মধ্যে তাদের জন্য এক আলাদা রকম ভীতি কাজ করে।
ব্যাপারটা অন্তিম বুঝতে পারলেও কিছুই বলেনা। কিন্তু যখন সুযোগ পায় আচ্ছা মতো কষে দেয় দু এক ঘা। মাধবকে খুব একটা ধরতে না পারলেও মিরনকে আচ্ছা করে গলা টিপে ধরা যায়। আহির একবার রেগে গিয়ে রামদা নিয়ে তেড়ে ধরেছিল মিরনকে। তারপর থেকে সে এদিকটাতে কমই আসে।
চলবে..........
#মির্জাপীর
#জাবিন_ইশতিয়াক_মল্লিকা
#সুমনা_খাতুন_মল্লিকা