৩.
বছর খানেক পরের কথা,
“ভাই-ও বোনেরা, চাচা, চাচি জুয়ান বুড়া খালারা, আমাগের চোঙ্গাপাড়া রাজনৈতিক দিকে বহু বাজে অবস্থায় অবস্হান করছে৷ আমার দিকে ভোট দেন। নিঃসন্দেহে জিতবেন কইলাম।”
স্টেজে দাড়িয়ে চড়া গলায় ভাষণ দিচ্ছে মাথায় টুপি পরিহিত এক ব্যাক্তি। বয়স তার খুব একটা বেশি না। নব্য বিবাহিত যুবক৷ রাজনীতি করছে হাতে গোনা কয়েকবছর । তারই নাম অন্তিম মির্জা নূর। পিতা মির্জাপীর অর্থাৎ আল্লামা মির্জা আব্বাস। মাতা মোসাম্মত নাসিরা মির্জা । ইন্তিকাল করেছেন বহু আগে। পরিবারে রয়েছে আরেকটি ভাই বয়স ১৫ মতো হবে। নাম আহির মির্জা। বড় যে বোনটি তার আবার বিগত বছর পাশের গ্রামের পাটোয়ারী বাড়িতে বিয়ে হয়েছে। তার স্ত্রী তার বোন জামাইয়ের বোন। অর্থাৎ জামাইয়ের পিতা নাসিরুদ্দিন পাটোয়ারীর ছোট মেয়ে ইমা পাটোয়ারী। বিয়ের বয়স মাত্র দু সপ্তাহ। এর মাঝে একটা সপ্তাহ গেছে বিয়ের অনুষ্ঠানের গন্ডগোল এ। পরবর্তী সপ্তাহে তার স্ত্রী মহোদয়া তার পিতৃ নিবাসে অবস্থান করছেন।
গ্রামের নাম চোঙ্গাপাড়া। মূলত এর নাম চতুরঙ্গপাড়া। তবে লোকমুখে প্রচলিত হতে হতে নাম পরেছে চোঙ্গা পাড়া। মির্জা বংশ বরাবরই মৌলবি বংশ। ধর্মকে পুঁজি করে ব্যাবসার মাধ্যমে চোঙ্গাপাড়ার মাতব্বর হয়েছে মির্জা আব্বাস। তার ছেলেগুলোও এখন তার সারিতেই দাড়িয়ে। পুরো পাড়ার মধ্যে সবাই জানে অন্তিম ছোটবেলায় একটু চঞ্চল ছিল। কিন্তু ছেলে বড্ড ভালো বটে৷ খাঁটি সোনার ছেলে। কারণটা তারাই জানে৷ যেই ছেলে মানুষের গাছের ফল চুরি করে, কুটির মুরগি চুরি করে,আবার কেও ধরতে গেলে হাদিস শুনিয়ে দেয় তাকে চোঙ্গাপাড়া গ্রামের মানুষ কেন যে সোনার ছেলে বলে তা ওরাই ভালো জেনে থাকবে৷ ভাষণ শেষে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হোলো বাপ ছেলে। ফেরার পথে মসজিদ থেকে জামায়াতের সহিত নামাজ পড়ে, দোয়া করে বাড়ি ফিরলো মির্জা আব্বাস আর অন্তিম মির্জা।নিজের ঘরে গিয়ে বসতেই অন্তিমের ঘরে ঢুকলো আহির। বলল,
“ ভাই, ভাবিরে কি আনতেন না?”
“ সময় পাইনা রে। যামু তো কখন যামু! আবার ফেরত আসমু তো কেমনে আসমু। সময়ের কত অভাব! বালের মাথা, দিনে যদি ২৪ ঘন্টা না হইয়া ৪৮ ঘন্টা হইতো ভালো হইতো বাল।“
বড় ভাইয়ের কথায় হাসলো আহির৷ মির্জা আব্বাসের মা, মদিনাবানু। বেশ বয়সাল। হাতে লাঠি ঠকঠকিয়ে তিনি কামরায় প্রবেশ করলেন। নরম বেতের কেদারায় গা এলিয়ে বসে হুকুম করলেন,
“ হুতুম, তরে বিয়া দিয়া লাব কি হইলো? হেইয়া তো গেরামের মাইনষে কয় বউ গেছেগা নাকি, আইসে না ক্যা লো? “
অন্তিম মাথার টুপি নামিয়ে বলল, “ এই বুড়ি, তুমি আমারে হুতুম ধুতুম বলা বন্ধ করো। মাইনষে কি কয়! আমারতো মান ইজ্জত আছে নাকি? বউ আইলে সে কি কইবো!“
রুম্পা ফুপু বসে বসে যাতা ঘুরিয়ে গম পিষছেন। মদিনাবানুর বয়স হয়েছে। তিনি এত কঠিন কাজ করতে পারেন না। দাঁত কেলিয়ে বললেন,
“ এহহ, হইছোছ তো বাপের মতন হুতোমপেঁচা! কথা কম ক। আইজি যাইয়া ইমা রে লইয়াই”
“ আইচ্ছা যামু । বিয়ার দিন ভাইগা যাওয়া বউয়ের কি কদর!”
কথা টা শুনে দাদি রুষ্ট হলেন। কপালখানা কুঁচকে তাতে একাধিক ভাজ দৃশ্যমান হোলো।
মাটিতে লাঠি ঠক করে বললেন,
“ হুতুমের ঘরের হুতুম! নয়া বউরে যুদি এ নিয়া কিছু কইছোছ৷ তরে আমি কাচ্চা চাবাই খাইলামু৷ তোর মতো দামড়ার লগে বিয়া দিতে চাইলে ইমা বুবু একা ক্যান আমিও পলাইতাম। ”
“ নিজের নাতিরে অপমান করলা, সইবোনা সইবোনা, থাক যাইগা। নিয়াসি তোমার নবাবজাদি রে। “
“ এই নূর হুন, খুব সুন্দর কইরা নরম সুরে কথা কবি। বয়স কম। বুদ্ধি বিবেক কম। তুইতো দামড়া নাকি! যা ফি আমানিল্লাহ “
রুম্পা ফুপু বললেন, “ হেইয়া মাঠে কাম করা ছাড়া আর কিছু পারে? ছেড়িডারে নিয়া আইসা ঘরে তুলগা ভদ্রমতো। একদম কটু কথা কবিনা।”
হয়নি।
জানালা দিয়ে হুহু করে দখিনের মাতলা বাতাস আসছে। মিষ্টিগন্ধের মোহন্ধতায় শিউরে উঠলো রমনী। অন্তিম ওর আরো কাছে এগিয়ে গেলো। মুখে সুমিষ্ট হাসি বজায় রেখে নব বিবাহিতা স্ত্রীর চোখে কোমল দৃষ্টি রেখে বলল,
“ তুমি যে আমারে পছন্দ করোনাই হেইয়া তো বুঝছিই। আর আমার দিক থেকে ভালোলাগা নাকি ভালোবাসা জানিনা কিন্তু , আমার যে তোমার টানা টানা রসোগোল্লার মতন চোখ দুখানা হেবি পছন্দ ইমাবিবি। ”
ইমাবিবি! সম্বোধন টা রমনীর কর্ণকুহর ভেদ করে অন্তরে গেঁথে যায়৷ কিন্তু বুঝতে দেয়না অপছন্দের স্বামী কে। কথা সত্য বিয়েতে মত নেই কিন্তু সম্পর্ক টা যতদিন বেয়াই বেয়াইন পর্যন্ত ছিলো ততদিন পর্যন্ত ইমা অন্তিমকে দেখলেই একটা কথা চিন্তা করত,
“ ছেলেটা দেখতে দারুণ! গেয়ো হলেও দেখতে শহুরে সাহেবদের মতো। একটু শিক্ষিত হলে অনেক ভালো জায়গায় যেতে পারত। তা না করে কেনো যে এই অজপাড়াগ্রামে পড়ে থাকে কে জানে! ”
অন্তিম মির্জা, তার ইমাবিবির হাত ধরে বিছানা পর্যন্ত নিয়ে গেলো। পকেট থেকে একটা সোনার আংটি বের করে বউয়ের হাতে পরিয়ে দিয়ে বলল,
“ আর যাইহোক আংটি টারে সন্মান কইরো। এই আংটি, দাদির শাশুড়ি দাদিরে দিছিলো।আমার দাদি বুড়ি আমার মায়েরে দিছিলো।মা নাকি মরার আগে কইয়া গেছে আমার বউরে দিতে।” একটু থেমে আবার বলল,
“ সবসময় পইরা থাকতে মন না চাইলে যত্নে গুছাইয়া রাইখো। তাতেও অপারগ হইলে, বুড়ির কাছে নাহলে আমার কাছেই রাইখে দিও। সারাডা দিন বহু খাডাখাডি করছো। যাও, ঘুমাও।”
কোনো মাতিবদল না করে পাশের টেবিল থেকে দুধের গ্লাস টা তুলে অন্তিমের দিকে বাড়িয়ে ধরলো সে।অন্তিম জিজ্ঞেস করল, “ কি এডি?”
“ জানিনা। দাদি বলে দিয়েছে বাসরের নিয়ম এটা।”
অন্তিম গ্লাস নিয়ে ঢকঢক করে গ্লাস ফাঁকা করে ফেলল। মিনমিন করে বলল,
"তোমার লগে আর বাসর মারানি হইছে! পরে কাইলকা ফের চাতালে উইঠা বসবা৷তারচে লও একখান গান শুনাও। "
“ পারিনা। “
“ আমি অবশ্য করলেই অনেক কিছু করতে পারি। কিন্তু করমু না। কারণ এখনো করার অনুমতি নেই।”
“কিছু বললেন?”
“ ভুইত্তামারা কপাল আমার। যাও ঘুমাও। ব্রিটিশরা জানি কি কয়! ওই হেপি ফাস্ট নাইট।”
ইমা কোনো কথা বলল না।চুপচাপ নিজের জায়গায় গিয়ে ঘুমিয়ে পরল। বাতি নিভিয়ে অন্তিম নিজের জানালার কাছে গিয়ে দাড়ালো। চাঁদনি রাতের আলোয় তার মুখখানা চকচক করছে। বাতাসে দুলছে কপালে পরে থাকা অবাধ্য চুলগুলো । হাতে একটা সিগারেটে ফুক দিয়ে ক্লান্ত দৃষ্টিতে বাইরে তাকিয়ে রইল। মনে মনে ঠিক করল অন্তত ওকে একটু ধাতস্থ হওয়ার সময় দেয়া যাক তারপর নাহয় নিজের কাজে ফিরে যাবে৷ কিছুদিন গেলে ইমা নিশ্চয়ই বাড়ির লোকের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলা শিখে যাবে। কারণ, নারীর বুক ফাটে তবু মুখ ফোটেনা কথাটা বড্ড বিশ্বাস করে অন্তিম। পরেরদিন মেম্বার নির্বাচনের কাজে বাবার সঙ্গে ব্যাস্ত হয়ে যায় ও। মদিনাবানুর সুপারিশে কিছুদিনের জন্য ওকে পাটোয়ারী বাড়িতে রেখে এসেছিলো অন্তিম আর আহির। আজ অন্তিম একাই ওকে আনতে যাচ্ছে ।
ঘোড়ার গাড়ি ছুটছে চোঙ্গা পাড়ার বুক কাঁপিয়ে। এটাতো আর বরযাত্রার গাড়ি নয় যে হেলেদুলে ধিরে ধিরে চলবে। পালকিতে করে বউকে বাড়ি নিতে চেয়েছিলো কিন্তু বেশি রাত হয়ে যাওয়ায়, বেয়ারা রা ভেবেছিল বিয়ে হবেনা তাই সামান্য কিছু টাকা নিয়ে চলে গিয়েছিলো। চোঙ্গা পাড়া পিছনে ফেলে এগিয়ে চলেছে অন্তিম। চলন্ত গতিশীল গাছপালাগুলোর দিকে তাকিয়ে অন্যমনষ্ক হয়ে চিন্তা করল অন্তিম বেচারা এক মরিচীকার পেছনে ছুটে চলেছে। তবে মরিচীকার ধাচ একটু অন্যরকম। এই মরিচীকা অন্তিমের হৃদয়ে ভিষন ধোঁকার সৃষ্টি করেছে। হৃদয়ের ধূলিঝর কাওকে দেখাতে পারছেনা বেচারা। সেই বড় বোনের বিয়ের দিন থেকে বোনের ননদটাকে মনে ধরেছিলো অন্তিমের। মরুভূমিতে প্রাণের সঞ্চার যেমন হয় তেমনটা অনুভব করেছিলো অন্তিম। বোনের পারিবারিক দিক বিবেচনা করে এবং বাবার আদর্শ মতো চলতে গিয়ে মনের কথা গোপনে পুষে রেখেছিল বেচারা। অতঃপর এতগুলো বছর ধরে জানার চেষ্টা করেছে কোন গোপনে মন ভেসেছে, জানা সম্ভবপর হয়নি৷ যখনি খবর পেতো শহর থেকে বড় আপার ননদ এসেছে, আপাকে দেখে আসার নাম করে এমনি এক ঘোড়ার গাড়িতে করেই ছুটতো সে।
চলবে....